আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় গিয়াসউদ্দিন বলবন – যা দিল্লি সালতানাত এর অন্তর্ভুক্ত।
গিয়াসউদ্দিন বলবন

১২৬৬ খ্রিস্টাব্দে সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদের মৃত্যু হলে উলুঘ খান বলবন দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। সুলতান নাসিরউদ্দিনের মৃত্যুর জন্য কেউ কেউ বলবনকে দায়ী করেছেন। বারাণী এ সম্পর্কে নীরব থাকলেও ইবনে বতুতা ও ইসামী বলেছেন যে, বলবন সুলতানকে হত্যা করেছিলেন।
বলবন ছিলেন তুর্কিদের ইলবারি উপজাতির লোক। তাঁর পিতা ছিলেন দশ হাজার তুর্কি পরিবারের খান বা নেতা। যৌবনে মোঙ্গলদের হাতে বন্দি হয়ে তাঁকে বাগদাদে নিয়ে যাওয়া হয়। খাজা জামালউদ্দিন বসরী তাঁকে ক্রয় করে দিল্লিতে এনে ইলতুৎমিশের কাছে বিক্রি করেন। নিজের দক্ষতা ও গুণের বলে বলবন ক্রমে উন্নতি লাভ করেন এবং ‘বন্দেগান-ই-চেহেলগান’ বা চল্লিশ জন আমীরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেন। ইলতুৎমিশের আমলে বলবন প্রথমে খাসবরদার বা সুলতানের ‘খাসনফর’ পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন ।
সুলতান রাজিয়ার উচ্ছেদে বলবন প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তী সুলতান মুইজউদ্দিন বাহরামের রাজত্বকালে তিনি ‘আমীর-ই-আখুর’ বা রাজকীয় অশ্বশালার অধিপতি নিযুক্ত হন। নাসিরউদ্দিন মাহমুদের সিংহাসনারোহণের পর উলুখ খান বলবন ‘ভকিল-ই-দার’ বা রাজ্যের সর্বোচ্চ পদের অধিকারী হন। নাসিরউদ্দিন মাহমুদ সহজ ও অনাড়ম্বর জীবন-যাপন করতেন এবং তাঁর রাজত্বকালে বলবনই প্রকৃতপক্ষে শাসনকাজ পরিচালনা করতেন। অধ্যাপক হাবিবুল্লাহ্ বলেছেন যে, নাসিরউদ্দিন প্রায় বিশ বছর রাজত্ব করেছিলেন, কিন্তু শাসন করেননি। ইসামী বলেছেন যে, সুলতান রাজপ্রাসাদে থাকতেন এবং উলুঘ খানই সাম্রাজ্যের শাসন কাজ পরিচালনা করতেন।
১২৪৯ খ্রিস্টাব্দে সুলতান নাসিরউদ্দিন বলবনের কন্যাকে বিয়ে করেন, ফলে বলবনের ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পায়। বলবন রাজ প্রতিনিধি বা ‘নায়েব-ই-মামলুকাৎ’ নিযুক্ত হন। প্রশাসন ও সেনাবাহিনী তাঁর নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত করা হয়েছিল । ১২৫৩ খ্রিস্টাব্দে পদচ্যুত হলেও এক বছর পরই বলবন আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন। বস্তুত, নাসিরউদ্দিনের রাজত্বকালে বলবনই ছিলেন রাজ্যের প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী এবং তিনি দক্ষতার সঙ্গে রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন।
অসীম ক্ষমতার অধিকারী হলেও বলবন সাম্রাজ্যের স্বার্থেই তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিলেন। প্রশাসনকে গতিশীল করে তিনি দিল্লি সালতানাতের অবনতি রোধ করেন। তিনি হিন্দুদের আগ্রাসনের মোকাবেলা করেছিলেন এবং কূটনীতি ও সামরিক কর্মোদ্যোগের বিচক্ষণ সমন্বয় ঘটিয়ে মোঙ্গলদের আক্রমণের হাত থেকে সাম্রাজ্যকে রক্ষা করেছিলেন।
বলবনের সমস্যাবলী
সিংহাসনে আরোহণের পর বলবন বহুবিধ সমস্যার সম্মুখীন হন। ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পর তাঁর অযোগ্য উত্তরাধিকারীদের রাজত্বকালে সাম্রাজ্যের সর্বত্র বিশৃক্মখলা দেখা দিয়েছিল। এ সুযোগে তুর্কি আমীররা ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন। তুর্কি আমীরদের দুটি উদ্দেশ্য ছিল- প্রথমত, সুলতানকে শক্তিশালী হওয়া থেকে বিরত রাখা এবং দ্বিতীয়ত, সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করা।
সে সময় সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং দিল্লি সাম্রাজ্যে সব সময়ই মোঙ্গলদের আক্রমণের ভয় ছিল। তাছাড়া স্থানীয় হিন্দুদের বিদ্রোহ ও দস্যুদের উপদ্রব তাঁকে ব্যস্ত করে তুলেছিল। এ প্রসঙ্গে বারাণী বলেছেন, “শাসকগোষ্ঠীর প্রতি ভীতি যা সকল সুষ্ঠু প্রশাসনের ভিত্তি এবং রাষ্ট্রের মহিমা ও গৌরবের উৎস, তা জনগণের মন থেকে মুছে গিয়েছিল এবং দেশ এক শোচনীয় অবস্থায় পতিত হয়েছিল।” এ পরিস্থিতিতে একজন শক্তিশালী একনায়কের প্রয়োজন ছিল।
বলবন তাঁর সমস্যাগুলো সম্যকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি সুলতানের মর্যাদা পুনরুদ্ধার, রাজতন্ত্রকে শক্তিশালী এবং পূর্বসুরীদের বিজয়কে সংহত করার লক্ষ্যে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি বুঝেছিলেন যে, এসব সমস্যার মোকাবেলা করার জন্য কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্র এবং প্রশ্নাতীত রাজতন্ত্র একান্ত আবশ্যকীয়। কাজেই তিনি প্রথমে বিভিন্নভাবে সুলতানের মর্যাদা বৃদ্ধির চেষ্টা করেন।
রাজতন্ত্র সম্পর্কে বলবনের মতবাদ
সম্ভবত বলবনই দিল্লির একমাত্র সুলতান যিনি রাজতন্ত্র সম্পর্কে তাঁর মতবাদ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। সুলতানের উঁচু মর্যাদা ও দায়িত্ব সম্পর্কে কিছু বলার কোনো সুযোগ তিনি হারাতেন না। রাজতন্ত্রকে উঁচু মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে এবং আমীরদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এড়াতে এটা যে অত্যাবশ্যকীয় ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সিংহাসনে তাঁর বংশগত কোনো দাবি না থাকায় তিনি তাঁর ব্যক্তিগত মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিজেকে ফেরদৌসীর শাহানামার বিখ্যাত তুর্কি বীর আফ্রাসিয়াবের বংশধর বলে প্রচার করেন। বংশ মর্যাদার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। নিচু বংশের কোনো লোককেই তিনি রাজ্যের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করতেন না। নিচু বংশজাত ব্যক্তিদের তিনি রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো থেকে অপসারণ করেন।
বলবন তাঁর কাজ ও কথার দ্বারা সবসময়ই সুলতানের দেহের পবিত্রতার গুরুত্ব প্রকাশ করতেন। পুত্র বুঘরা খানকে তিনি একবার বলেছিলেন যে, “রাজতন্ত্র হচ্ছে স্বৈরতন্ত্রের মূর্ত প্রকাশ। সুলতানের হৃদয় হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহের বিশেষ আধার এবং এ বিষয়ে মানবজগতে তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।” তাঁর মতে সুলতান হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তার প্রতিনিধি (নিয়াবত-ই-খোদায়ী) এবং মর্যাদায় রসুলের পরেই তাঁর স্থান ।
রাজকীয় দায়িত্ব পালনে সুলতান সবসময়ই খোদা কর্তৃক পরিচালিত ও অনুপ্রাণিত হন। বস্তুত এসব প্রচার করে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, সুলতানের ক্ষমতার উৎস হচ্ছেন আল্লাহ্, আমীর বা জনগণ নয়। ফলে তাঁর কার্যাবলীর সমালোচনা করার অধিকার কারো নেই।
বাহ্যিক মর্যাদা ও সাফল্য ছিল সুলতানের জন্য অপরিহার্য। এই কারণে বলবন সারা জীবনই জনগণের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলেছেন— এমনকি তিনি সাধারণ কোনো ব্যক্তির সঙ্গে কথাও বলতেন না। দিল্লির এক ধনী ব্যবসায়ী তার সমস্ত সম্পদের বিনিময়ে বলবনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলেন- বলাই বাহুল্য তার সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি। পূর্ণ রাজকীয় পোশাকে সজ্জিত না হয়ে বলবন কখনো দরবারে উপস্থিত হতেন না । এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত পরিচারকরাও কখনো তাঁকে রাজকীয় পোশাক ছাড়া দেখেনি ।
বলবন মনে করতেন যে, ইরানি রীতিনীতি ও জীবন ধারা অনুসরণ করা ছাড়া রাজত্ব করা সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রতিটি বিষয়েই তিনি সতর্কতার সঙ্গে ইরানি রীতিনীতি অনুসরণ করেছিলেন । সিংহাসনে বসার আগে জন্ম নেওয়া তাঁর পুত্রদের নাম তিনি রেখেছিলেন মাহমুদ, মুহাম্মদ ইত্যাদি। কিন্তু তাঁর সিংহাসনারোহণের পর জন্ম নেওয়া তাঁর পৌত্রদের নাম তিনি ইরানি রাজাদের নামের অনুকরণে রেখেছিলেন কায়কোবাদ, কায়খসরু, কায়মুস ইত্যাদি।
ন্যায় বিচারকে বলবন সুলতানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য রূপে বিবেচনা করেন। কিছু কিছু দোষ সত্ত্বেও তাঁর স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের এ ছিল এক প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য যা জনসাধারণের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল। সাধারণ মানুষের প্রতি অন্যায় ও নিষ্ঠুরতার কোনো ঘটনা জানলে তিনি তাঁর কর্মচারী বা নিজের আত্মীয়-স্বজনকেও কঠোর শাস্তি দিতে দ্বিধা করতেন না।
রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের সংবাদ তাঁর গুপ্তচররা (বারিদ) তাঁকে জানাতো এবং বিশ্বস্ততার সঙ্গে সংবাদ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে বারিদরাও কঠিন শাস্তি ভোগ করতো।বারাণী উল্লেখ করেছেন যে গৃহভৃত্যদের প্রতি নির্দয় আচরণের অপরাধে বাদাউনের ইকতাদার মালিক বকবক এবং অযোধ্যার ইকতাদার হায়বত খান যথাক্রমে মৃত্যুদন্ড ও আর্থিক জরিমানায় দন্ডিত হয়েছিলেন।
সুলতানের মর্যাদা বৃদ্ধি
সুলতানের মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বলবন ইরানি কায়দায় তাঁর দরবার সাজিয়েছিলেন। হাজির, সালাহদার, জানদার, নকীব প্রমুখেরা নীরবে তাঁর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকত। দরবারে প্রবেশাধিকার লাভকারীদের জন্য তিনি ‘সিজদা’ ও ‘পায়বস’ (পদ- চুম্বন) বাধ্যতামূলক করেছিলেন। দরবারে হাসি-ঠাট্টা ও লঘু আলাপ তিনি বন্ধ করে দেন। অল্প কয়েকজন বিশ্বস্ত মালিক ও তাঁর বন্ধু সুলতানের সিংহাসনের পিছন দিকে বসতেন- বাকী সকলকেই পদমর্যাদা অনুসারে তাঁর সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। দরবারে বলবনকে কখনো কেউ হাসতে বা লঘু আলাপ করতে দেখেনি, বহু গুরুতর ব্যক্তিগত শোকাবহ ঘটনাতেও তিনি কখনো দরবারে নিজের আবেগ প্রকাশ করেননি।
১২৮৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রিয় পুত্র ও মনোনীত উত্তরাধিকারী শাহজাদা মুহাম্মদ মোঙ্গলদের হাতে নিহত হলে তিনি প্রচন্ড মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন- এর কিছুদিন পরই সুলতান মারা যান। কিন্তু এ প্রচন্ড শোক বুকে চেপে তিনি দরবারে তাঁর স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য বজায় রেখেছিলেন। গভীর রাতে নিজ শয়নকক্ষে দুঃখে মাটিতে গড়াগড়ি করে কেঁদে তিনি বুকের জ্বালা কমাতে চেষ্টা করেছিলেন।
প্রথম জীবনে মদ্যপানে তাঁর প্রচন্ড আসক্তি ছিল। কিন্তু সিংহাসনারোহণের পর তিনি মদ্যপান ত্যাগ করেন এবং সভাসদদের মধ্যেও তা নিষিদ্ধ করেন। ড. হাবিবুল্লাহ্ যথার্থই বলেছেন যে সুলতানের মর্যাদা রক্ষার জন্য তিনি মানুষ বলবনকে বলি দিয়েছিলেন।
উৎসব-সংক্রান্ত অনুষ্ঠান উপলক্ষে বলবনের দরবারকে বিশেষভাবে সাজানো হতো। নকশি করা গালিচা, বুটিদার রেশমি পর্দা, সোনা ও রূপার পাত্র দর্শকদের চোখ ধাঁধিয়ে দিতো। বারাণী লিখেছেন যে উৎসব অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরও মানুষ দরবারের চোখ-ধাঁধানো অলঙ্করণের বিষয় আলোচনা করতো। বিদেশী দূতরা তাঁর দরবারের জাঁকজমক দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতো। সুলতান শোভাযাত্রায় বের হলে সিস্তানী সৈনিকরা খোলা তরবারি নিয়ে তাঁর সঙ্গে যেতো। শক্তি, কর্তৃত্ব ও মর্যাদার এ প্রদর্শনী ছিল রাজতন্ত্র সম্পর্কে তাঁর মতবাদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত এবং এটা অবাধ্য জনগণের মনে ভীতির সঞ্চার করে তাদের অনুগত করে তুলেছিল।
মোঙ্গলদের আক্রমণও বলবন ও তাঁর দরবারের মর্যাদা বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছিল। সে সময় দিল্লি সাম্রাজ্যই ছিল একমাত্র দেশ যেটা মোঙ্গলদের হাতে ধ্বংস হয়নি- ফলে বহু দেশের শাহজাদা ও গুণীজ্ঞানী ব্যক্তিরা নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে দিল্লিতে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। এর ফলে ভারতের বাইরের দেশগুলোতে মুসলমান সংস্কৃতির রক্ষকরূপে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল।
সালতানাতকে সুদৃঢ় করার পদক্ষেপসমূহ
সুলতানের মর্যাদা বৃদ্ধি করার পর বলবন দিল্লি সালতানাতের দৃঢ়ীকরণের দিকে মনোযোগ দেন। বিশ বছর স্থায়ী (১২৬৬-১২৮৬) বলবনের রাজত্বকালকে দিল্লি সালতানাতের সংহতকরণ বা দৃঢ়ীকরণের কাল বলে অভিহিত করা যেতে পারে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিধান, সামরিক সংস্কার ও মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করা ছিল এ দৃঢ়ীকরণ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত।
ইলতুৎমিশের আমল থেকেই তুর্কি আমীর ও মালিকরা শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। এদের মধ্যে চলি- শজনকে নিয়ে একটি দল গঠিত হয়েছিল যারা ‘বন্দেগান-ই-চেহেলগান’ নামে পরিচিত। বস্তুত, এরাই ছিল সালতানাতের সবচেয়ে শক্তিশালী দল এবং সুলতান নির্বাচনে ও বিতারণে এরাই মূল ভূমিকা পালন করতো। বলবন নিজেও ছিলেন এই দলের একজন প্রভাবশালী নেতা এবং তুর্কি শাসক শ্রেণীর শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছিল। তাঁর ক্ষমতা ছিল এদের সমর্থনের ওপর নির্ভরশলী, তবে তিনটি ব্যাপারে তাঁরা সুলতানের বিপদের কারণও হয়ে উঠতে পারতো বলে বলবনকে এদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হতো-
(ক) সুলতান ও অভিজাতদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, যা তাঁর সিংহাসনারোহণের আগে বহুবার ঘটেছে;
(খ) ক্ষমতা, বিশেষত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তুর্কি অভিজাতদের একাধিপত্য এবং
(গ) তাঁর মৃত্যুর পর দিল্লির সিংহাসনের জন্য তাঁর পুত্রদের সঙ্গে তুর্কি অভিজাতদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ।
এসব বিপদ এড়াবার জন্য বলবন বেশ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন, সেগুলো অবশ্য শেষ পর্যন্ত ভারতে তুর্কি শাসনের অবসানের জন্য কিছুটা দায়ী হয়েছিল। ফিরিশতা বলেছেন যে বলবন ইলতুৎমিশের সব বংশধরকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিলেন যাতে তাদের মধ্যে কেউ উত্তরাধিকারী হিসাবে তাঁর বা তাঁর পুত্রদের বিরুদ্ধে সিংহাসন দাবি করতে না পারে।
শক্তিশালী তুর্কি অভিজাতদের দমন করার উদ্দেশ্যে তিনি ঘাতকের তরবারি ও বিষ, উভয়ই অবাধে ব্যবহার করেছেন। ‘বন্দেগান-ই-চেহেলগানের’ নেতৃস্থানীয় সদস্যদের তিনি হত্যা করেন এবং বাকীদের ক্ষমতা লোপ করেন। তাঁর সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী সন্দেহে তিনি তাঁর আত্মীয় শের খানকেও হত্যা করেছিলেন।
মেওয়াটী দস্যুদের দমন
দেশে বিশৃক্মখলা দূর করে শান্তি-শৃক্মখলা প্রতিষ্ঠা করতে বলবন বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর সময়ে মেওয়াটী দস্যুরা নানারূপ গোলযোগ সৃষ্টি করছিল। তারা দিল্লির আশেপাশে লুটতরাজ ও দস্যুবৃত্তিতে তৎপর হয় এবং জনজীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। বারাণী মেওয়াটীদের সৃষ্ট বিশৃক্মখলার সুস্পষ্ট ও চিত্রবৎ বর্ণনা দিয়েছেন। তাদের অত্যাচারের ভয়ে দিল্লির পশ্চিম দিকের প্রধান ফটক আছরের নামাজের সময় বন্ধ করে দিতে হতো। এ সময় কেউ ভ্রমণ বা দরগাহ জিয়ারতের উদ্দেশ্যেও শহর থেকে বাইরে যেতে সাহস করতো না।
তাদের অত্যাচারের হাত থেকে পানি বহনকারী (ভিত্তি) বা ক্রীতদাসীরা, এমন কি ফকির- সন্ন্যাসীরাও রেহাই পেতো না। বলবন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করেন। তিনি এসব দস্যুদের আশ্রয়স্থল বন-জঙ্গল পরিষ্কার করেন। দিল্লির নিরাপত্তা বিধানের জন্য তিনি গোপালগিরে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন এবং দিল্লির আশেপাশে বেশ কয়েকটি ফাঁড়ি নির্মাণ করে বিশ্বস্ত ও দক্ষ আফগান দলপতিদের সেখানে নিয়োগ করেন। বারাণীর ভাষ্যানুযায়ী এরপর থেকে দিল্লিতে আর কখনো মেওয়াটীদের লুটতরাজ হয়নি।
অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা
মেওয়াটী দস্যুদের নির্মূল করার পর বলবন দোয়াবের দস্যু-দমনে মনোনিবেশ করেন। সেখানকার অবাধ্য প্রজাদের তিনি কঠোর শাস্তি দান করেন। কাম্পিল, পাতিয়ালি ও ভোজপুর ছিল দস্যুদের আশ্রয়কেন্দ্র। রাস্তা-ঘাটে পথিক ও ব্যবসায়ীদের জান-মালের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। তাদের দমনের উদ্দেশ্যে বলবন নিজেই কাম্পিল ও পাতিয়ালিতে গিয়ে পাঁচ-ছয় মাস অবস্থান করেন। তিনি নির্মমভাবে সেখানকার দস্যু ও বিদ্রোহীদের হত্যা করেন। ফলে রাস্তা-ঘাট আবারো পথচারী ও ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপদ হয়। কাম্পিল, পাতিয়ালি ও ভোজপুরে তিনি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেন। ষাট বছর পরেও বারাণী উল্লেখ করেছেন যে, দেশের কোথাও দস্যুদের উপদ্রব ছিল না।
এরপর বলবন কাটেহারের হিন্দু বিদ্রোহীদের দমন করেন। তাঁরা বাদাউন ও আমবোহার গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে রায়তদের ধন-সম্পদ লুট করতো। তাঁরা এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে, এসব জায়গার ইকতাদারদের কর্তৃত্বও তারা মানতো না। বলবন নিজে তাদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে তাদের দমন করেন।
বারাণী বলেছেন যে, বিদ্রোহীদের রক্তে কাটেহারের ভূমি লাল হয়ে গিয়েছিল, গ্রামে গ্রামে মৃতদেহের স্তুপ গড়ে উঠেছিল এবং মৃতদেহের গন্ধ গঙ্গানদী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। বারাণী এও বলেছেন যে, সে সময় থেকে জালালউদ্দিনের রাজত্বকাল পর্যন্ত কাটেহারে বিদ্রোহীরা আর কোনদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। এভাবে কয়েক বছরের মধ্যেই বলবন দেশে শান্তি-শৃক্সখলা ফিরিয়ে এনেছিলেন।
অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃক্মখলা প্রতিষ্ঠার পর বলবন নতুন নতুন রাজ্য জয় করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেন নি। এর কয়েকটি কারণও ছিল। বলবন ছিলেন অভিজ্ঞ ও বাস্তববাদী সুলতান। অভ্যন্তরীণ গোলযোগ থেকে সালতানাতের সাংগঠনিক অসম্পূর্ণতা প্রকাশ পেয়েছিল। নতুন অঞ্চল জয় করলে সালতানাতের সমস্যা আরো বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরেই হিন্দু দলপতিদের বিদ্রোহ বলবনকে সাম্রাজ্য বিস্তার থেকে বিরত রেখেছিল। এসব হিন্দু দলপতি সুযোগ পেলেই দিল্লির শাসনকে উৎখাত করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। কাজেই তাদের প্রতি লক্ষ রাখা ও তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা ছিল অধিকতর জরুরি।
মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহতকরণ
সাম্রাজ্যের পশ্চিম সীমান্তে সব সময়ই মোঙ্গল-আক্রমণের আশঙ্কা ছিল। তাদের আক্রমণের ভয়ে বলবন প্রায় সব সময়ই দিল্লিতে অবস্থান করতে বাধ্য হন। মোঙ্গলদের আক্রমণের ফলে দিল্লির সঙ্গে মধ্য এশিয়ার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। যার ফলে সেখান থেকে নতুনভাবে তুর্কিদের আগমন বাধাগ্রস্ত হলে দিল্লিতে জনবলের অভাব দেখা গিয়েছিল। তাছাড়া প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের স্বাধীনতা এবং বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের অনুপস্থিতিও বলবনের সাম্রাজ্য বিস্তারের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মোঙ্গলদের আক্রমণের আশঙ্কাতেই বলবন নতুন রাজ্য জয়ের চেষ্টা করেননি। তিনি নিজেই বলেছেন যে, সেই পরিস্থিতিতে দিল্লি ত্যাগ করা বা সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করা উচিত হবে না। সম্প্রসারণের চেয়ে সংহতকরণকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে তিনি কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করেছিলেন।
তিনি সীমান্ত অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে পুরনো দুর্গ সংস্কার এবং বেশ কয়েকটি নতুন দুর্গ নির্মাণ করেন। সীমান্ত এলাকায় তিনি বিশ্বস্ত ও দক্ষ সেনাপতি নিয়োগ করেন। তাঁর আত্মীয় শের খান বহুদিন সীমান্তে মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। শের খানের মৃত্যুর পর বলবন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মুহাম্মদকে মুলতানে ও দ্বিতীয় পুত্র বুঘরা খানকে সামানা ও সুনামের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। ১২৭৯ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গলরা ভারত আক্রমণ করে শতদ্রু নদী পার হয়ে অগ্রসর হলে দুই ভাইয়ের সম্মিলিত বাহিনীর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। ফলে সাময়িকভাবে মোঙ্গলদের হাত থেকে দিল্লি সালতানাত রক্ষা পায় ।
সামরিক সংস্কার
বলবন উপলব্ধি করেছিলেন যে, একটি শক্তিশালী ও দক্ষ সেনাবাহিনী তাঁর শক্তি ও সালতানাতের নিরাপত্তার মূলস্তম্ভ। তাই তিনি সেনাবাহিনীর সংস্কার সাধন করেন। বলবন সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করেন এবং বহু বিশ্বস্ত ও দক্ষ সেনাপতি নিয়োগ করেন। তিনি তাদের বেতনও বৃদ্ধি করেছিলেন। সৈনিকদের বেতন বৃদ্ধি করে তাদের সন্তুষ্ট রাখা ছিল বলবনের সামরিক ব্যবস্থার এক আবশ্যিক নীতি । সেনাবাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য তিনি কখনো অর্থ ব্যয় করতে দ্বিধা করেননি। সৈনিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য তিনি সবসময়ই তাদের কুচকাওয়াজের ব্যবস্থা করতেন। তিনি সামরিক বিভাগের প্রধানকে (আরিজ-ই-মমালিক) ওয়াজিরের আর্থিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করেন।
সুলতান ইলতুৎমিশের আমলে প্রায় দুই হাজার অশ্বারোহী সৈন্যকে দোয়াবে জায়গীর দেওয়া হয়েছিল। তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে মারা গিয়েছিল বা যুদ্ধে অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছিল। তবুও তাদের পুত্ররা কোনো সামরিক দায়িত্ব পালন না করেও সেইসব জায়গীর ভোগ করছিল। সামরিক সংস্কারের অংশ হিসেবে বলবন এসব জায়গীরদারদের জায়গীর লাভ ও ভোগের শর্তাবলী তদন্তের এবং এসব জায়গীর বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দিল্লির কোতোয়াল ও বলবনের ব্যক্তিগত বন্ধু মালিক ফখরুদ্দিনের অনুরোধে তিনি সেই আদেশ প্রত্যাহার করেন।
বলবন দৃঢ় হাতে রাজনীতির সকল ক্ষেত্রে ঐক্য-নাশক প্রবণতা রোধ করেন। তিনি কেন্দ্র শাসনাধীন রাজনৈতিক কর্তৃত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের নির্দিষ্ট সময়ের বিরতিতে কেন্দ্রে প্রতিবেদন পেশ করতে হতো। দক্ষ নিরীক্ষকদের মাধ্যমে প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের আর্থিক কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণে রাখা হতো। প্রাদেশিক শাসনকর্তারূপে নিযুক্ত তাঁর পুত্ররাও কোনো জটিল বিষয়ে নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে সুলতানের নির্দেশ মত শাসন কাজ পরিচালনা করতে বাধ্য ছিলেন।
সুলতান হওয়ার আগে সুলতানের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্দেশ্যে নায়েব-ই-মামলুকাতের মতো কিছু পদ সৃষ্টিতে বলবন নিজেই এক সময় অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। সুলতান হওয়ার পর কোনো কর্মচারীর হাতে যেন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না হয় সেদিকে তিনি সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। এ কারণেই তিনি ওয়াজিরের হাত থেকে আর্থিক ও সামরিক ক্ষমতা নিয়ে নিয়েছিলেন।
বলবন উপলব্ধি করেছিলেন যে, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে একটি দক্ষ ও বিশ্বস্ত গুপ্তচর ব্যবস্থা অত্যন্ড্র প্রয়োজনীয়। এ উদ্দেশ্যে তিনি একটি গুপ্তচর বাহিনী সৃষ্টি করেন। এসব গুপ্তচর বিশ্বস্ততার সঙ্গে সুলতানের পুত্র, আত্মীয়, প্রাদেশিক শাসনকর্তা, সামরিক কর্মকর্তা, সরকারি কর্মচারী ও জনগণের কার্যকলাপ লক্ষ করতো এবং সে সম্পর্কে সুলতানকে অবহিত করতো।
নিয়োগের আগে গুপ্তচরদের চরিত্র, সততা, এমনকি বংশ পরিচয়ও তদন্ত করা হতো। বলবনের শাসনামলে দিল্লি সালতানাতের বিস্তৃতি ঘটেনি, তবে তিনি সালাতানাতে শান্তি-শৃক্মখলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন। ড. হাবিবুল্লাহ্ বলেছেন যে খলজীদের বিজয়াভিযানের উপযুক্ত পরিবেশ বলবনই সৃষ্টি করেছিলেন।
তুঘ্রিলের বিদ্রোহ দমন
তুঘ্রিল বেগের বিদ্রোহ ও স্বাধীনতা ঘোষণা বলবনের রাজত্বকালের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তুঘিল বেগ বলবনের ক্রীতদাসরূপে জীবন শুরু করেছিলেন। নিজের প্রতিভা ও দক্ষতার বলে তিনি উত্তরোত্তর উন্নতি লাভ করে লখনৌতির শাসনকর্তা পদে নিযুক্ত হন। বাংলার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখা দিল্লির সুলতানদের জন্য সব সময়ই ছিল একটি বড় সমস্যা। সুলতানদের দুর্বলতার সুযোগে বাংলার শাসনকর্তারা প্রায়ই স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন। দিল্লি থেকে বাংলার দূরত্ব, যোগাযোগ ব্যবস্থার অসুবিধা, বাংলার আবহাওয়া সব কিছুই ছিল বিদ্রোহের অনুকূল।
বাংলার শাসনকর্তাদের বারম্বার বিদ্রোহের কারণে বারাণী বাংলাকে ‘বলঘাপুর’ (বিদ্রোহীদের নগরী) নামে আখ্যায়িত করেছেন। তুমিলের অনুচরবৃন্দ তাঁকে বুঝিয়েছিল যে সুলতান এখন বৃদ্ধ ও অসুস্থ, তাঁর দুই পুত্র মোঙ্গলদের দমন করতে ব্যস্ত। কাজেই স্বাধীনতা ঘোষণা করার এখনই উপযুক্ত সময়। তুথ্রিল তাদের কথায় পথভ্রষ্ট হন। তিনি জাজনগর আক্রমণ করে প্রভূত ধন-রত্ন এবং হাতি লাভ করেন।
লুণ্ঠিত ধনের সুলতানের প্রাপ্য অংশ নিয়মানুযায়ী সুলতানকে না পাঠিয়ে তিনি নিজের জন্য রেখে দেন। লখনৌতির অধিবাসীদের মধ্যে প্রচুর ধন-রত্ন বিলিয়ে তিনি তাদের সমর্থন লাভ করেন। এরপর তিনি সুলতান মুগিসউদ্দিন উপাধি ধারণ করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং নিজ নামে মুদ্ৰা জারি ও খোৎবা পাঠ করান।
তুথ্রিলের স্বাধীনতা ঘোষণার খবর পেয়ে বলবন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন এবং অযোধ্যার শাসনকর্তা আমিন খানের নেতৃত্বে একটি বাহিনী তুথ্রিলের বিরুদ্ধে পাঠান। কিন্তু দিল্লি-বাহিনী তুথ্রিলের হাতে পরাজিত হয় ও ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। দিল্লির অনেক আমীর ও সৈন্য দলত্যাগ করে তুম্রিলের বাহিনীতে যোগ দেয়।
রাগে অন্ধ হয়ে বলবন আমিন খানকে মৃত্যু দন্ডাদেশ দেন। তুরবাতি খানের নেতৃত্বে তুম্রিলের বিরুদ্ধে পাঠানো দ্বিতীয় অভিযানও ব্যর্থ হলে বলবন নিজেই বিশাল বাহিনী ও তাঁর দ্বিতীয় পুত্র বুঘরা খানকে নিয়ে তুথ্রিলকে দমন করার জন্য ১২৮০-৮১ খ্রিস্টাব্দে বাংলার উদ্দেশ্য যাত্রা করেন। তুলিকে পরাজিত না করে তিনি দিল্লিতে ফিরে আসবেন না বলেও ঘোষণা করেন। বাংলার প্রচন্ড বর্ষাও তাঁর অগ্রগতি রোধ করতে পারেনি। বৃদ্ধ সুলতানের সাহস ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি দেখে তুম্রিল ভীত হয়ে তাঁর রাজধানী ত্যাগ করে ধন-রত্ন, হাতি ও সৈন্যদল নিয়ে সোনারগাঁওয়ের দিকে পালিয়ে যান।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুলি বলবনের সৈন্যদের হাতে নিহত হন। এরপর তুম্রিলের পরিবার পরিজন, সভাসদ এবং অনুচরদের বন্দি করে লখনৌতিতে নিয়ে আসা হয় এবং সেখানে সকলকেই নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়। বিদ্রোহীদের শাস্তি দিয়ে বলবন তাঁর দ্বিতীয় পুত্র বুঘরা খানকে লখনৌতির শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন এবং তাঁকে শাসন সংক্রান্ত কিছু উপদেশ দিয়ে ও সতর্ক করে দিল্লি ফিরে আসেন। তুঘ্রিলের বিদ্রোহ দমন করতে বলবন প্রায় তিন বছর বাংলায় কাটিয়েছিলেন।
বলবনের মৃত্যু
দিল্লিতে ফিরে এসে বলবন আরেক বিপদের সম্মুখীন হন। ১২৮৫ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গলরা পাঞ্জাব আক্রমণ করলে মুলতানের গভর্নর শাহজাদা মুহাম্মদ লাহোর ও দিপালপুরের দিকে অগ্রসর হয়ে মোঙ্গলদের বাধা দেন। মোঙ্গলরা পরাজিত হলেও যুদ্ধে শাহজাদা মুহাম্মদ মোঙ্গলদের হাতে নিহত হন। ঐ যুদ্ধে আমীর খসরুও মোঙ্গলদের হাতে বন্দি হয়েছিলেন, তবে কিছুদিন পর তিনি মুক্তি লাভ করেন। মোঙ্গল আক্রমণের বীভৎসতা ও নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে আমীর খসরু বলেছেন যে, মুলতানে প্রতিটি পরিবারেই কেউ না কেউ মোঙ্গলদের হাতে নিহত হয়েছিল।
শাহজাদা মুহাম্মদ সুলতানের অত্যন্ত প্রিয় সন্তান ছিলেন। সুলতান তাঁকে তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শাহজাদা মুহাম্মদ নিজে জ্ঞানী ছিলেন এবং জ্ঞান- বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। বহু কবি সাহিত্যিক তাঁর দরবার অলংকৃত করেছিলেন। শোকাভিভূত আমীর-ওমরাহরা শাহজাদা মোহাম্মদের মৃত্যুর পর তাঁকে খান-ই-শহীদ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন । শাহজাদা মুহাম্মদ মোঙ্গলদের হাতে নিহত হলে বলবন শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন এবং অল্পদিনের মধ্যেই ১২৮৬ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
বলবনের মৃত্যুর তিন বছরের মধ্যেই তাঁর বংশধরদের রাজত্বের অবসান ঘটে। তবে দিল্লি সালতানাতকে তিনি যে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তা বহু শতাব্দী টিকে ছিল এবং সেখানেই তাঁর কৃতিত্ব ও সাফল্য। একটি বিষয়ে অবশ্য বলবনের নীতি সমালোচনার উর্ধ্বে নয়- তুর্কিদের প্রতি তাঁর আস্থা ও উচ্চবংশের প্রতি তাঁর মোহ তাঁর বংশের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তখন একদিকে মোঙ্গল আক্রমণের ফলে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে দিল্লির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে বিশাল সংখ্যায় তুর্কিদের ভারতে আগমন অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে ধর্মান্তকরণ ও অন্তর্বিবাহের ফলে অ-তুর্কি মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ড. হাবিবুল্লাহ যেমন বলেছেন- “ক্রমশ বিভিন্ন জাতিসত্তার সমন্বয়ে এক নতুন সমাজ গড়ে উঠেছিল এবং দিল্লি সালতানাত ধীর কিন্তু নিশ্চিত গতিতে তুর্কি থেকে ভারতীয় মুসলমান রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছিল। এ প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করা শুধু যে অর্থহীন ছিল তাই নয়, এটা ছিল অত্যন্ত অবিবেচনাপূর্ণ।
ধীরে ধীরে কমে আসা খাঁটি তুর্কিদের পক্ষে আধিপত্য বজায় রাখা ছিল অসম্ভব। বলবনের আপোষহীন মনোভাব একে কৃত্রিম অতিরিক্ত মেয়াদ দিয়েছিল। ফলে তাঁর মৃত্যুতে ভারতের ভাগ্য নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা থেকে তুর্কিদের অপসারণ ঘটে।” ড. এ.কে. নিজামীও অনুরূপ মত পোষণ করে লিখেছেন যে “বিলম্বিত কিন্তু অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তন এসেছিল বিপ-বের আকারে।”
মধ্যযুগের ভারতীয় ইতিহাসে সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের রাজত্বকাল এক বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। বিশ বছর নাসিরউদ্দিনের মন্ত্রী এবং বিশ বছর সুলতান হিসেবে বলবন দিল্লি সালতানাতের সমৃদ্ধি ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিলেন। মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করে এবং দেশীয় হিন্দু সামন্ত প্রভূ ও বিশৃক্মখলা সৃষ্টিকারী মুসলমান আমীরদের দমন করে তিনি সালতানাতের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেন। অধ্যাপক আবদুল করিম গিয়াসউদ্দিন বলবনকে দিল্লি সালতানাতের পুনর্জন্মদাতারূপে আখ্যায়িত করেছেন।
তাঁর ভাষায় : “যদিও সুলতান মুইজউদ্দিন মুহাম্মদ ঘোরী উত্তর পাক-ভারত জয় করেন, কুতুবউদ্দিন আইবক মুসলমান রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং সুলতান শামসউদ্দিন ইলতুৎমিশ ইহার স্থায়িত্ব ও সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করেন, ইলতুৎমিশের দুর্বল উত্তরাধিকারীদের সময় দিল্লি সালতানতের নানারূপ বিশৃক্মখলা দেখা দেয় এবং বলবনই স্বীয় সাহস, দক্ষতা ও বীরত্বের দ্বারা পুনরায় শৃক্মখলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।” অধ্যাপক কে.এ. নিজামী বারাণীর সঙ্গে একমত হয়ে বলেছেন যে, “দুর্গ ও সামরিক ফাঁড়ি নির্মাণ করে তিনি হরিয়ানা থেকে বিহার পর্যন্ত সাম্রাজ্যের প্রধান প্রদেশগুলোতে শান্তি ও শৃক্মখলা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রস্তুতিমূলক এ কাজ ছাড়া খলজী আমলের কীর্তিসমূহ ছিল অসম্ভব।”

সারসংক্ষেপ
১২৬৬ থেকে ১২৮৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বৎসরকাল দিল্লির সুলতান হিসেবে গিয়াসউদ্দিন বলবন কর্মদক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সিংহাসনারোহণের পর তিনি সালতানাতের সমস্যাবলী সঠিকভাবে নির্ধারণ করেন। সুলতানের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তিনি রাজতন্ত্রকে সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তুর্কি আমীর-ওমরাহদের ক্ষমতা খর্ব করার উদ্দেশ্যে তিনি কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করেন। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে বিশৃক্মখলা দূর করে তিনি শান্তি-শৃক্মখলা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সামরিক ক্ষেত্রেও তিনি বিভিন্ন সংস্কারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে শক্তি বৃদ্ধি করেন।
মোঙ্গল আক্রমণের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে তিনি দিল্লি সালতানাতকে মোঙ্গল আক্রমণের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করেছিলেন। তাঁর শাসনকালে তিনি সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের নীতি পরিহার করে সালতানাতকে সুদৃঢ় করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বিদ্রোহ দমনেও তিনি কঠোর নীতি অবলম্বন করেন। বাংলার মুসলিম শাসনকর্তা তুঘ্রিল স্বাধীনতা ঘোষণা করলে, তিনি নিজে আক্ৰমণ পরিচালনা করে বিদ্রোহী শাসনকর্তাকে পরাজিত করেন এবং বাংলায় দিল্লির শাসন পুনঃপ্রবর্তন করেন।
বলবনের শাসনকাল মূলত: ছিল সালতানাতকে সুদৃঢ় ও সুসংহতকরণের কাল। বলবনের সাফল্যই দিল্লির মুসলিম সালতানাতকে নতুন জীবন ও উদ্দীপনা দান করেছিল। এর ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী সময়ে গড়ে উঠেছিল খলজীদের সাম্রাজ্যবাদী নীতি ।
