আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –গুপ্তহত্যার কবলে আওয়ামী লীগ কর্মী। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
গুপ্তহত্যার কবলে আওয়ামী লীগ কর্মী

কিন্তু এ সময়ে আমাদের সংগঠন এক চরম হুমকির সম্মুখীন হলো। প্রায় প্রতি জেলায় আমাদের সংগঠনের উপর এক গুপ্তঘাতকের মারণাঘাতে জীবন দান করলেন খুলনা জেলার গফুর ভাই, আবু সুফিয়ান, তবীবুর রহমান, সরদার সুপরিকল্পিত আঘাত এলো। শুরু হলো কাপুরুষোচিত গুপ্তহত্যা, বহু নিঃস্বার্থ ত্যাগী কর্মী এর শিকারে পরিণত হলেন।
খলিলুর রহমান, প্রদীপ কুমার দত্ত, আবদুল হক, পরেশ কুমার দেব, রাধাকান্ত মল্লিক, বরিশাল জেলার সওগাতুল আলম সগীর, রতন চৌধুরী, খলিলুর রহমান, আলাউদ্দিন আহমেদ, ময়মনসিংহ জেলার মোহাম্মদ আলী, পাবনা জেলার আজীজ মেহের, আমজাদ হোসেন, আবুবকর, প্রফেসার আবুল হোসেন, ফজলুর রহমান, আবদুর রহমান, সুনীল কুমার সরকার, আক্কাস আলী, মোজাম্মেল হক ময়েজ, হাবিবুল ইসলাম, আজিম উদ্দিন, আবদুল হামিদ, সেলিম জাহাঙ্গীর, আকবর আলী মিয়া, সাদেক আলী শেখ, ফকরুল ইসলাম, বগুড়া জেলার মাহতাবউদ্দিন, ডাক্তার দবীরউদ্দিন, আফসার উদ্দিন
রামাচরণ মজুমদার, হাসেম আলী, আতাউর রহমান, মজিবর রহমান আক্কেলপুরী কুমিল্লা জেলার দীপক কুমার সাহা, কালান্দর আলী, সিদ্দিকুর রহমান, সুরেশ চন্দ্র বিশ্বাস, কুষ্টিয়া জেলার আফসার উদ্দিন, ওয়াজেদ আলী, ডাঃ শাহাদাৎ, সিরাজুল ইসলাম, নুরুজ্জামান, সবিরউদ্দিন, হাজী জাফর আলী, আক্কাস আলী, রাজশাহী জেলার মজিবর রহমান, আবদুল মালেক, আজহার আলী, রেফাজ সরকার, ইয়াসীন আলী, আফাজউদ্দিন আবদুস সামাদ, মহীউদ্দিন, মিজান, সৈয়দ আহম্মদ মিয়া, রুস্তম বিশ্বাস, ফজলুর রহমান, কাইউম উল্লাহ, নাসের আলী, সতীন্দ্র নাথ পাল, নূরুল ইসলাম
কাজেমউদ্দিন, সিলেট জেলার মোজাম্মেল হোসেন আলী, আবদুল মুকিত হায়দার, গণেশ দেবরায়, আবদুল মতিন চৌধুরী, রংপুর জেলার মোহাম্মদ আলী, কাজী রশীদ, আবদুর রহিম, মহফিল উদ্দিন, খলিলুর রহমান, ঢাকা জেলার কাজী শামসুদ্দিন, শচীন্দ্র নাথ রায়, ডাঃ আনসার আলী, জালালউদ্দিন, হারুন মালিক, রওশন আরা চৌধুরী, আবু সাঈদ, গিয়াস উদ্দিন খান, আনসার আহম্মদ, আবদুর রাজ্জাক, যশোর জেলার মোহাম্মদ আলী, নিমাই বিশ্বাস, খাইরুল ইসলাম, জহীরউদ্দিন খন্দকার, নিরোদ কৃষ্ণ সরকার, আলী আকবর, মঈনুদ্দিন বিশ্বাস, আবদুল গণি, আনসার উদ্দিন, আবদুর রশিদ, মোস্তফা আলি, মাকিয়াদ্দিন মণ্ডল, হাবিবুর রহমান, জমীর উদ্দিন, চাঁদ মিয়া মল্লিক, পুলীন বিহারী দাস, ফরিদপুর জেলার ওমর আলী মোল্লা, নুরুল হক, হাসেম আলী।
মাত্র সেদিনও জাতীয় সংসদ সদস্য বরিশালের মোতাহার উদ্দিন আহমদ নৃশংসভাবে গুপ্ত ঘাতকের হাতে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়াও অনুরূপভাবে নিহত হয়েছেন শত শত আওয়ামী লীগ কর্মী ও নেতা। এই হত্যাকাণ্ড আমাদের মাঝখান থেকে বলিষ্ঠ নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক কর্মীদের ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। দুঃসহ বেদনা বুকে করে আমরা অগ্রসর হয়েছি। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রাত অবিচল শ্রদ্ধা রেখে সেই গুপ্তঘাতকদের বিরুদ্ধে আমরা এতোদিন প্রতিঘাত হানিনি । আমাদের কর্মীরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি এক বিরল নজীর স্থাপন করেছেন।
সেদিন আমরা উপলব্ধি করেছিলাম কেন আমাদের কর্মী বাহিনীর উপর মানবতা-বিরোধী জঘন্য আক্রমণ চালানো হচ্ছে । কারণ একটি নবতর আদর্শে উত্তরণের মাধ্যমে জাতিকে প্রগতির পথে এগিয়ে যাবার সংগ্রামে আমাদের কর্মীরা ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাই প্রগতি ও অগ্রগতির দুশমন এক গণ-বিরোধী শক্তি জাতীয় স্বাধীনতাকে তাদের বিদেশী প্রভুদের হাতে তুলে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে।
এ সত্য উপলব্ধি করে সাথে সাথে আমরা সাংগঠনিক কমিটির প্রথম বৈঠকে মিলিত হই ২৯শে জুনে (১৯৭২)। এবং তীব্র প্রতিবাদ করে সরকারের কাছে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানাই। সারা দেশব্যাপী মানবতা বিরোধী গুপ্তহত্যা, ডাকাতি, রাহাজানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ অনুষ্ঠানের কর্মসূচী গ্রহণ করি। জনগণ অভূতপূর্ব নজীর সৃষ্টি করে আমাদের ডাকে সাড়া দেয়।
সমসাময়িক সময়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে জনগণের দুঃখ-দুর্দশা সৃষ্টিকারী, চোরাকারবারী, মুনাফাখোর, মজুতদার এবং কৃত্রিম উপায়ে দ্রব্য মূল্যের অস্বাভাবিক স্ফিতি সৃষ্টিকারী, অসাধু ব্যবসায়ী প্রভৃতি সমাজ বিরোধীদের বিরুদ্ধে আমরা কার্যকরী সংস্থার সভায় কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করি এবং সরকারকে অসাধু ব্যবসায়ীদের এ চক্রান্ত উদ্ঘাটন করার জন্য ক্রমাগত অনুরোধ জানাই ।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে পারি যে, ক্রমাগত প্রচেষ্টার ফলেই সরকার ভুয়া লাইসেন্সধারীদের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং তা কার্যকর করেন। এমনিভাবে প্রতিনিয়তই প্রতিকূল অবস্থার মোকাবিলার মধ্য দিয়ে আমরা অগ্রসর হই। এ ছাড়া জাতীয় রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক চক্রান্তের প্রভাব কাটিয়ে সঠিক লক্ষ্য পথে অগ্রসর হবার কর্মসূচী দ্রুত এগিয়ে নেয়ার কাজ অব্যাহত রাখি।
বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব বিশ্বের মানবগোষ্ঠীতে এক বিস্ময় । শ্রদ্ধার সাথে পৃথিবীবাসী আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা এবং প্রগতির পথ রুদ্ধ করার জন্য মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় হতেই চীনের মা-ও বাদী চক্র আমাদের বিরোধিতা করেছে। এমন কি স্বাধীনতার পর যখন আমাদের জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নটি পৃথিবীর সিংহভাগ দেশ অভিনন্দিত করে তখন। চীন মুক্তিযুদ্ধকালীন মনোভাব পরিবর্তন না করে আমাদের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে ভেটো প্রদান করে।
বিশ্ব-সংস্থায় আসন গ্রহণ করে আমাদের যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার যে মানবিক অধিকার তা হতে বঞ্চিত করে চীন। সাত কোটি চক্রান্তের বিরুদ্ধে যে ঘৃণার আগুন ছড়িয়ে পড়ে জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বাভাবিকভাবে তা সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব পড়ে আমাদের উপর। তাই সেদিন আমরা কর্মসূচীর মাধ্যমে চীনা ভেটোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দিবস পালন করি।
৩১শে আগস্ট (১৯৭২) বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক কমিটির জরুরী সভা আহ্বান করে এ আন্তর্জাতিক চক্রান্তসহ দেশে মুনাফাখোরী, চোরাচালানী, মজুতদার, ভোগ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধিকারী প্রভৃতি সামাজিক এক্রের বিরুদ্ধে এক কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করা হয় এবং সারা দেশে ৭ই সেপ্টেম্বর প্রতিবাদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অভূতপূর্ব সফলতার সাথে পালিত হয়। এ দিনে আমাদের স্বাধীনতার শত্রুদের চিহ্নিত করে জাতীয় স্বাধীনতা সংহত করার বজ্র-কঠোর শপথ গ্রহণ করা হয়। ঐদিন আমাদের বক্তব্যে সাড়া দিয়ে দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলসহ জনগণ আমাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন । এইভাবে যে কোন উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবিলা করি।
বিগত ১৯৭২ সালের ২৯শে জুলাই থেকে ৩১শে আগস্ট পর্যন্ত আমরা এক সুদীর্ঘ বর্ধিত সভার ব্যবস্থা গ্রহণ করি। এতে প্রতিটি জেলায় সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করেন ও মূল্যবান উপদেশ প্রদান করেন। বর্ধিত সভায় আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা পাকিস্তানে আটক বাংগালীদের স্বদেশে ফিরিয়ে আনা দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, গুপ্তহত্যা বন্ধ সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র নস্যাত সম্পর্কিত কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গ্রহণ করি।
এ সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- আমাদের প্রিয় নেতা লন্ডনে চিকিৎসারত ছিলেন। প্রিয় নেতার অনুপস্থিতে নিদারুণ মর্মবেদনা এবং মানসিক উদ্বিগ্নতার মধ্যে এ সময় অতিক্রম করেছি। প্রতি মুহূর্তে আমরা উৎকর্ণ ছিলাম তার সেই চিকিৎসারত থাকাকালীন দিনগুলিতে- সে কি উৎকণ্ঠা প্রতিটি কর্মীর তথা সমগ্র দেশবাসীর। আমরা জাতির পিতার সত্বর আরোগ্য লাভ এবং রোগ মুক্তির জন্য খোদার কাছে কায়মন বাক্যে প্রার্থনা জানিয়েছিলাম।
সংগঠনের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রার্থনা এবং মোনাজাতের ব্যবস্থা নিয়েছিলাম ৪ঠা আগস্ট ১৯৭২ সালে। দ্বিতীয় পর্যায়ের সাংগঠনিক সফরের সাথে সাথে আমাদের বিভিন্ন সাংগঠনিক কমিটিগুলির নাম বঙ্গবন্ধুর অনুমতিক্রমে ঘোষিত হলো। প্রতিটি জেলায় আমাদের প্রাথমিক সদস্য সংগ্রহ অভিযান অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চললো। ইতিমধ্যে পূর্বতন প্রশাসনিক জেলাগুলিকে ভেঙ্গে সাংগঠনিক জেলার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হলো।

এতে আমাদের কাজের পরিধির বিস্তৃতি ঘটলো। মহকুমাগুলিকে জেলার মর্যাদা দেওয়া হলো। সাংগঠনিক জেলার সংখ্যা ১৯টি থেকে ৫৯-এ উন্নীত হলো। এই বিস্তৃত কর্মক্ষেত্রে শৃংখলাবদ্ধ রাজনৈতিক কর্মীর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে প্রতিটি জেলায় আমি এবং আমার সহকর্মীরা উপস্থিত হয়ে আমাদের কর্মীবাহিনীকে মুজিববাদের মূল নীতিতে শিক্ষিত করে তোলার প্রয়াস পেয়েছি।
সহকর্মীদের এলাকায় এলাকায় পাঠিয়ে মুজিববাদের আদর্শ প্রচার করার সাধ্যমত চেষ্টা করেছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে ঊনষাটটি জেলায় সফর করে আমাদের আদর্শের বক্তব্য তুলে ধরি। এ সাংগঠনিক সফরের সময় যিনি আমার সার্বক্ষণিক সহযাত্রী ছিলেন তিনি আমাদের সংগ্রামী সাংগঠনিক সম্পাদক আদর্শনিষ্ঠ নেতা জনাব আবদুর রাজ্জাক। চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে রাজশাহীর চাঁপাই নবাবগঞ্জ পর্যন্ত যেখানেই সংগঠনের কোন অসুবিধা হয়েছে ছুটে গিয়েছি নিজে— ছুটে গিয়েছেন বন্ধু অনুজ আবদুর রাজ্জাক। এমনিভাবে সারা বাংলাদেশে আমাদের কার্যকালে মোট দুই শতাধিক বার সফর করি। সাংগঠনিক সম্পাদকও অনুরূপভাবে সফর করেন।
