আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –জাতীয় মহাসমাবেশ। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
জাতীয় মহাসমাবেশ

সংগ্রাম ও আন্দোলনের বাণী ও কর্মসূচীর সাথে সমগ্র জাতিকে সম্পৃক্ত করে স্বৈরাচার ও সামরিক শাসনের অবসান “রান্বিত করে জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠা এবং গণমানুষের অধিকার ও মৌলিক দাবীসমূহ পূরণের বলিষ্ঠ প্রত্যয় নিয়ে ২রা অক্টোবর ১৫ দলীয় ও দলীয় জোট যুগপৎ ১৪ই অক্টোবর জাতীয় মহাসমাবেশের ডাক দেয়। তুই অক্টোবর উভয় জোট সরকার ঘোষিত নির্বাচনী কর্মসূচী প্রত্যাখ্যান করে।
১৪ই অক্টোবর ‘৮৪ বাংলাদেশে গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য দিন। ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ শ্লোগানে মুখরিত হলো বাংলার প্রতিটি জনপদ। সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে ছুটে এলো অধিকার বঞ্চিত সংগ্রামী মানুষ ঢাকার মানিক মিয়া এভিন্যুতে- শেরে বাংলা নগরে। লাখো লাখো সংগ্রামী মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুব, জনতার দৃপ্ত পদভানো অধিকার আদায়ে বন্ধু-শপথে প্রকম্পিত হলো রাজধানী ঢাকার আকাশ-বাতাস।
সেই ঐতিহাসিক সমাবেশে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, “আর প্রতিবাদ নয়, এবার প্রতিরোধ। এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। আর এ লক্ষে ২৭শে অক্টোবর হতে প্রতিরোধ পক্ষ পালনের এবং ৮ই ডিসেম্বর সারা দেশে ২৪ ঘণ্টার হরতাল পালনের ডাক দেওয়া হলো। মহাসমাবেশ হতে গণমানুষের অধিকার ও দারী প্রতিষ্ঠার ২১ দফা কর্মসূচীও ঘোষণা করা হলো।
২১ দফা কর্মসূচীতে কৃষক, শ্রমিক, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, শিক্ষকসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষের মৌলিক দাবীসমূহ স্থান পায়। অথচ এত বড় জাতীয় মহাসমাবেশের খবর কোন জাতীয় সংবাদপত্রে পরদিন আসল না। সরকার সংবাদপত্রের সেন্সরের কড়াকড়ি আরোপ করে এখবর আসতে দিল না সেন্সরের প্রতিবাদে পরের দিন অনেক পত্রিকা প্রকাশিত হয়নি।
২৮শে অক্টোবর থেকে শুরু হলো প্রতিরোধ পক্ষ। সারা দেশে ১৫ দলীয় জোট প্রতিরোধ পক্ষের কর্মসূচী নিয়ে জনতার অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে করে তুলল তীব্রতর।
৩১শে অক্টোবর বাংলাদেশের জনগণের দুর্দিনের বন্ধু, গণতন্ত্র ও প্রগতির নিষ্ঠিক কণ্ঠ, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের নেত্রী, ভারতের স্বনামধন্য প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ঘাতকের হাতে নিহত হলেন। তার অডোরিয়ায় যোগদানের জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিপ্লবী নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলীয় নেতা সাবেক দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আবদুস সামাদ আজাদ ও ড. কামাল হোসেন যান।
৩রা নভেম্বর জাতীয় চার নেতার স্মরণে জেলহত্যা দিবস পালিত হলো পূর্ণ মর্যাদায়। ১০ই নভেম্বর ১৫ দলের আহ্বানে অনুষ্ঠিত হলো গণসমাবেশ। অন্যদিকে সরকার নির্বাচনের নামে প্রহসনের নীলনক্সা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। ২০শে নভেম্বর আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বললেন, নির্বাচনের নামে প্রহসনের নীলনক্সা বাস্তবায়িত হতে দেয়া হবে না।
২২শে নভেম্বর তিনি পূবালী ব্যাংক ব্যক্তিমালিকানায় ে দেওয়ার বিরুদ্ধে কটোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করলেন। ৮ই ডিসেম্বর পালিত হলো ২৪ ঘণ্টার হরতাল এবং ২২ ও ২৩শে ডিসেম্বর হরতালের ইতিহাসকে স্থান করে দিয়ে পালিত হলো একনাগাড়ে ৪৮ ঘণ্টা হরতাল। গণআন্দোলন পেলো নতুন মাত্রা।
পুলিশের গুলীতে রাজশাহীতে নিহত হলেন শাহজাহান সিরাজসহ ২ জন। জনগণের সংগ্রাম ও আন্দোলন হলো আরো জোরদার। এরই মাঝে সারা জাতি পূর্ণ মর্যাদায় পালন করল শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এবং মহান বিজয় দিবস। বাস্তা ১৯৮৪ সাল আন্দোলন ও সংগ্রামের বছর হিসাবে সমগ্র জাতির ইতিহাসে চিহ্নিত করে।
উল্লেখ্য যে, জাতীয় দারী পাঁচ দফা আদায়ের সংগ্রামে সভা, সমাবেশ, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, বিক্ষোভ, মিছিল, অবস্থান ধর্মঘট, উপজেলা নির্বাচন প্রতিহত করুন এবং পর্যায়ক্রমিকভাবে হরতাল পালন এবং ঐতিহাসিক মহাসমাবেশ অনুষ্ঠান প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে জাতির-মমহীন রায় ঘোষণার ফলে আন্দোলনের ধারার স্বৈরাচারী সরকার তাদের প্রস্তাবিত ২৪শে মার্চের উপজেলা নির্বাচন, ২৭শে মে যুগপৎ সংসদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ৮ই ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনের কর্মসূচী স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
সর্বশেষ সর্বয়ে ৬ই এপ্রিল জাতীয় সংসদের নির্বাচনের দিন-তারিখসহ নির্বাচনী তফসীল ঘোষণার মধ্য দিয়ে জেনারেল এরশাদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাঁর আন্তরিকতার প্রমাণ রাখতে ব্যর্থ হন। এই সময়ে তাঁর প্রদত্ত বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্য দিয়ে একথা সন্দেহাতীতরূপে প্রকাশিত হয়ে পড়ল যে, আসলে তিনি বিরোধী রাজনৈতিক জোট ও দলগুলিকে নির্বাচনের বাইরে রেখে তাঁর নীলনক্সার আওতায় একটি এক তরফা তথাকথিত নির্বাচন অনুষ্ঠানের পাঁয়তারা করছেন।
১৬ই ডিসেম্বর তারিখে বিষ দিবা উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে তাঁর ভাষণ এবং একই দিনে সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বাণী এবং ভার একদিন পর শিল্পকলা একাডেমীতে জনদল আমার দল”, “সংসদ নির্বাচন ২৫০টি আসন পাবে” ইত্যাদি বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে এরশাদের কথিত নির্বাচনের প্রকৃত চেহারা মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে ধা ১৭ এবং ১৮ই ডিসেম্বর তারিখে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় এরশাদের প্রস্তাবিত ৬ই এপ্রিল ‘৮৫ তারিখের নির্বাচন সম্পর্কে বিস্তারিত আলাপ আলোচনা ও মূল্যায়ন করা হয়। সভায় ঘোষিত এই এপ্রিল-এর নির্বাচনকে অর্থবহ করার দাবীসহ কতিপয় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সংগ্রাম ও আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে এল ১৯৮৫ সাল। ২রা জানুয়ারী সরকার প্রেসনোট জারি করে প্রেসিডেন্টের ভাষণের ব্যাখ্যা প্রদান করে বিরোধী দলসমূহকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। আওয়ামী লীগসহ ১৫ দলীয় ঐকাভোট প্রেসনোট-এর ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করে দেখল এবং ৫ দফার সংগ্রামকে আরও জোরদার করার আহবান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ৫ই জানুয়ারী কক্সবাজার ও ৬ই জানুয়ারী চকোরিয়ায় দুটি পৃথক বিশাল জনসভায় ঘোষণা করলেন, “আওয়ামী লীগ এবং ১৫ দলীয় ঐক্যজোট নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে দৃঢ় বিশ্বাসী।
আমাদে দাবী ৫ দফার মর্মকথা সামরিক শাসনের প্রভাবমুক্ত, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সার্বভৌম সংসদ জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠা। গণরায় প্রতিফলনের নিশ্চয়তা থাকলে তবেই আমরা নির্বাচনে যাব।” তিনি আরও বলেন, “আমরা নির্বাচন চাই, কিন্তু সে নির্বাচন অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধ করার জন্য নয়।”
১৮ই জানুয়ারী ১৫ দলীয় ঐক্যজোটের পক্ষ হতে দাবী করা হলো, প্রস্তাবিত নির্বাচনে রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তাসহ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের শর্ত মেনে নিলে ১৫ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নিবে ।
এরই মধ্যে নির্বাচন প্রশ্নে সরকারী তালবাহানা ও ষড়যন্ত্র ক্রমশঃ উন্মোচিত হতে থাকল। ১৫ দলীয় জোট ৩১শে জানুয়ারী সরকারের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলল, “শর্ত মেনে নিয়ে ৬ই এপ্রিল নির্বাচন করতেই হবে।” ৪ঠা ফেব্রুয়ারী ১৫ দল ঘোষণা করল, “শর্ত পূরণ না হলে ১৪ই ফেব্রুয়ারী হতে ব্যাপকতর আন্দোলন শুরু হবে।
৭, ৮, ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারী তারিখে অনুষ্ঠিত হলো আওয়ামী লীগ সংগঠনের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বর্ধিত সভা। দেশের থানা সংগঠনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক হতে শুরু করে জেলা সংগঠনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় কমিটি ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের যৌথ সভা। এ বর্ধিত সভার মতামতের আলোকে আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদ সভানেত্রী শেখ হাসিনার উপর নির্বাচন প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করল।
আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দলের অংশ গ্রহণের প্রশ্নে ভীত এরশাদ সরকার নির্বাচন বন্ধ করার অজুহাত খুঁজছিল। এরশাদ সরকারের নির্বাচন ঘোষণার প্রতি আওয়ামী লীগসহ গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ প্রথম হতেই সন্দেহ পোষণ করে আসছিল। আর সে সন্দেহ যে কত সঠিক ছিল তা প্রমাণিত হলো ১৪ই ফেব্রুয়ারীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ছাত্রনেতা রাউফুন বসুনিয়ার হত্যার মধ্য দিয়ে। সরকারী গুণ্ডাবাহিনীর হাতে গুলীবিদ্ধ হয়ে প্রাণ দিলেন বসুনিয়া।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে গেলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও ১৫ দলীয় জোটের নেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তীব্র ভাষ হত্যার প্রতিবাদ জানালেন এবং বিচারদারী করলেন। ১৬ তারিখে বসুনিয়ার হত্যার প্রতিবাদে শোক মিছিল বের করা হলো উভয় জোটের পক্ষ হতে। সরকারের নির্বাচন বন্ধের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত বসুনিয়ার হত্যার মধ্য দিয়েই বাস্তবায়িত করার সুযোগ করে নিল।
বসুনিয়া হত্যার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিস্ফোরণে হলো। এই সুযোগে খালেদা জিয়া বসুনিয়া হত্যাকে উপেক্ষা করে ঘোষণা করলেন, “নির্বাচনে যাবে যারা, জনগণের শত্রু তারা।” এইভাবে পরোক্ষভাবে নির্বাচন বন্ধের সরকারী ষড়যন্ত্রের সহায়ক শক্তির ভূমিকা পালন করলেন খালেদা জিয়া।
২০শে ফেব্রুয়ারী পূর্ব নির্ধারিত ২৪শে ফেব্রুয়ারী মনোনয়নপত্র দাখিলের ঘোষণা স্থগিত ঘোষিত হলো এবং এতে সরকারের মুখোশ আবার উন্মোচিত হলো। সরকারের দূরভিসন্ধি বুঝতে কারো বাকী থাকল না। এমনিতর এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে জাতি ভাব-গম্ভীর পরিবেশে পালন করল মহান একুশে ফেব্রুয়ারী, শহীদ দিবস।
জাতি শপত নিল গণতন্ত্রের জন্য, জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য। অন্যদিকে সামরিক সরকার নির্যাতনের খড়গ উচিয়ে জনতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। ২৮শে ফেব্রুয়ারী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, “নির্যাতন করে মানুষকে কেউ দারিয়ে রাখতে পারবে না।”
১লা মার্চ আবার সামরিক আইন আরো কঠোর করা হলো। সামরিক আদালত পুনর্বহাল করা হলো। নিষিদ্ধ করা হলো সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হলো। একই সাথে ২১শে মার্চের তথাকথিত ‘গণভোটের’ ঘোষণা দেওয়া হলো ।
২রা মার্চ তারিখে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে গৃহবন্দী করা হলো। গণভোটবিরোধী সকল প্রকার প্রচারণা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ফরমান জারি করা হলো। এই ঘোষণার পর সব বাধা উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগ নেতা কর্মী প্রতিরোধ গড়ে তুলল । ১৪ই মার্চ পূর্ব ঘোষিত প্রতিবাদ দিবস পালন করতে গিয়ে ১৫ দলীয় বহু নেতা ও কর্মী গ্রেপ্তার হলেন।
এত প্রতিকূলতার মাঝেও আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিবস পালন করলাম ১৭ই মার্চ। ২১শে মার্চ অনুষ্ঠিত হলো প্রহসনের তথাকথিত গণভোট। ভোট কেন্দ্রসমূহে ভোটারের অনুপস্থিতি সরকারের গণসমর্থনহীনতা নগ্নরূপে প্রকাশ করল। অথচ নির্লজ্জ এরশান দাবী করলেন, জনগণ বিপুলভাবে তাঁর কর্মসূচীকে সমর্থন করেছে। বিদেশী প্রচার- মাধ্যমসমূহে এরশানের এই তথাকথিত গণভোটকে প্রহসনের ও জালিয়াতির গণভোট হিসাবে চিহ্নিত করা হলো।
দুঃসহ এ পরিবেশে জাতি পালন করল মহান স্বাধীনতা দিবস। জাতীয় স্মৃতিসৌধে জাতীয় দাবী ও দার আলোকে জনতার হারানো অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে জনতার উদ্দেশ্যে ১৫ নলের ঘোষণা পাঠ করলেন আওয়ামী লীগ নেতা জনাব আবদুল মান্নান।
জাতীয় স্মৃতিসৌধে আওয়ামী লীগসহ বহুসংখ্যক নেতা-কর্মী গ্রেফতার হলেন। সেনাবাহিনী হামলা চালালো সমবেত রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের উপর। নির্মমভাবে প্রছত হলেন আওয়ামী লীগ নেতা জনাব তোফায়েল আহাম্মদ ও জনাব মোহাম্মদ নাসিম। সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেত্রী বেগম: সাজেদা চৌধুরী ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ |
এভাবেই গণধিকৃত সামরিক সরকার জনতার বিপরীতে দাঁড় করালেন সেনাবাহিনীকে।
৯ই এপ্রিল উপজেলা নির্বাচনের তফসীল ঘোষনা করা হলো এবং গভীর রাতে গ্রেফতার করা হলো আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জনাব তোফায়েল আহাম্মদকে, গ্রেফতার করা হলো আওয়ামী লীগ নেতা জনাব আবুল কাশেমকে। সভানেত্রী শেখ হাসিনা তখনও গৃহবন্দী।
নেতৃবৃন্দকে আটক রেখে রাজনীতিকে সামরিক আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার উপজেলা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিল। তবুও আন্দোলনরত জনতা নিশ্চুপ বসে থাকল না। সামরিক শাসনের কড়া বিধি-নিষেধ অমান্য করে আওয়ামী লীগ কর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সচেষ্ট হলো। লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ও গ্রেফতার সত্ত্বেও প্রতিরোধ আন্দোলন চলল।
১৭ই এপ্রিল ‘৮৫ গ্রেপ্তার করা হলো নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব আনসার আলীকে। ঐদিন কেন্দ্ৰীয় নেত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীকে গোয়েন্দা পুলিশ সারাদিন গোয়েন্দা অফিসে আটক রাখে।
গৃহবন্দী করা হলো আওয়ামী লীগ নেতা জনাব আবদুল মালেক উকিল, সাজেদা চৌধুরী ও আইভি রহমান এবং তল্লাশী চালানো হলো আওয়ামী লীগ নেতা জনাব আমির হোসেন আমু ও মোহাম্মদ নাসিমসহ অনেকের বাসায়। স্বৈরাচারের হাতে প্রহৃত ও নির্বাচিত হলেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা জনাব সালাউদ্দিন ইউসুফ।
২২শে এপ্রিল প্রতিরোধ দিবসের সমাবেশে হাজির হতে গিয়ে কেন্দ্রীয় নেত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী গ্রেফতার হলেন ও কারানির্যাতন ভোগ করলেন। এইভাবে চরম নির্যাতন ও শ্বেত সন্ত্রাসের মধ্যে নামমাত্র ভোটারের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হলো উপজেলা নির্বাচন যথাক্রমে ১৬ এবং ২০ তারিখে।২৫শে মে মুক্তি পেলেন আওয়ামী লীগের সংগ্রামী সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
২৬শে মে প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে উড়িরচরসহ উপকূল এলাকার হাজার হাজার লোক প্রাণ হারায়। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী সর্বশক্তি দিয়ে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য দেশবাসী, সরকার ও দলীয় কর্মীদের প্রতি আহবান জানালেন এবং আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সারা দেশে প্রথম দুর্গতদের সাহাযার্থে ত্রাণ কমিটি গঠন করে।
বিভিন্ন টিম দ্রুত ঘ্রাণসামগ্রী নিয়ে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা চালায়। ২৯শে মে সভানেত্রী শেখ হাসিনা প্রচুর ত্রাণসামগ্রীসহ দুর্গত এলাকায় দুঃস্থ মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। দুর্গত এলাকা সফর শেষ করে তিনি ঢাকায় এসে সাংবাদিক সম্মেলন করে ঘূর্ণি ও জলোচ্ছ্বাস-উপদ্রুত এলাকাকে সরকারীভাবে ‘দুর্গত অঞ্চল’ ঘোষণার দাবী জানান।
এরশাদ সামরিক আইনবলে রাজনৈতিক কর্মকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নেতাদের বন্দী রেখে নির্ধাতনের ষ্টীম রোলার চালিয়ে গ্রহসনমূলক পন্থায় তথাকথিত উপজেলা নির্বাচন সম্পন্ন করে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দলছুট নেতাদের নিয়ে একটি ফ্রন্ট গঠনের চেষ্টায় লিপ্ত হন।
মন্ত্রীত্ব, ক্ষমতা ও হালুয়া রুটির লোভে সেদিন তথাকথিত অতি বিপ্লবী কাজী জাফর, সিরাজুল হোসেন খান, আনোয়ার জাহিদ, জাফর ঈমাম গং আন্দোলনের পৃষ্ঠে ছুরিকামার করে এরশাদের সামরিক সরকারের মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করে। কতিপয় নেতানামধারী স্বার্থলোলুপদের এই বিশ্বাসঘাতকতায় আন্দোলন ও সংগ্রামরত জনতা বিক্ষুব্ধ হলো এবং সাময়িকভাবে হলেও হতাশ হলো।
দীর্ঘ প্রায় ৫ মাস একটানা বন্ধ থাকার পর দেশের ৪টি বিশ্ববিদ্যালয় ২৩শে জুলাই তারিখে পুনরায় খুলে দেওয়া হল। তখনও রাজনীতি নিষিদ্ধ। আওয়ামী লীগ সামরিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাজনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখল। সভানেত্রী শেখ হাসিনা সামরিক আইন উপেক্ষা করে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তৃতা করে চললেন।
জাতীয় শোক দিবসের প্রাক্কালে ১৩ই আগষ্ট আলোচনা সভা এবং ১৫ই আগষ্ট যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় শোক দিবস পালন করা হলো সারা দেশে।রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা অবস্থাতেই আওয়ামী লীগসহ ১৫ দলীয় ঐক্যজোট দ্রুত আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যাপক তৎপরতা শুরু করল।
১লা অক্টোবর হতে ঘরোয়া রাজনীতি পুনরায় চালু করা হলো। একথা সকলেই জানেন, আমরা আওয়ামী লীগ। কখনো কথিত ঘরোয়া রাজনীতি, রাজনীতি নিষিদ্ধ’ এসব বিধি-নিষেধ মানিনি। সমস্ত জুলুম নির্যাতন উপেক্ষা করে। আওয়ামী লীগ জনতার শক্তিতে সামরিক আইনকে তোয়াক্কা না করে সর্বদা প্রকাশ্য রাজনীতি ও সভা-সমিতি করেছি।
আওয়ামী লীগের বিপ্লবী সভানেত্রী এ সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলা সফর করে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের ডাক দিয়ে যাচ্ছিলেন। ২০শে সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জের জনসভায় তিনি বাংলার সোনালী আঁশ পাটকে ধ্বংস করার এবং এই সময় পাট চাষীদের অবর্ণনীয় দুর্দশার কথা উল্লেখ করে পাটের ন্যূনতম মূল্য প্রতি ৫০০/- টাকা নির্ধারণের দাবী জানান।
জেনারেল এরশাদ শেখ হাসিনার এ বক্তব্যের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বললেন যদি কেউ পার্টের মূল্য মণপ্রতি ৫০০/- টাকা দিতে পারেন, তাহলে তিনি তাদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন। এরশাদের এ চ্যালেঞ্জ ছিল সরাসরি শেখ হাসিনার প্রতি। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা আওয়ামী লীগের সংগ্রামী সভানেত্রী দৃঢ়তার সাথে এরশাদের সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন।
২৩শে সেপ্টেম্বর তারিখে দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এক জমজমাট সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি ঘোষণা করলেন, “আমি আমার সংগঠনের পক্ষ হতে এরশাদের এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম। সুষ্ঠু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পাটের সর্বনিম্ন মূল্য আমরা মণপ্রতি ৫০০/- টাকা নিশ্চিত করতে পারব।” তিনি এরশাদকে তাঁর প্রদত্ত প্রতিববতি পালনের আহ্বান জানান।
নদীর ভাংগনে ছিন্নমূল মানুষের দুঃখ দুর্দশা দেখার জন্য ৪ঠা অক্টোবর সভানেত্রী সিরাজগঞ্জে গেলেন। ঐদিন তিনি সিরাজগঞ্জে এবং ৫ই অক্টোবর টাংগাইলে দু’টি বিশাল জনসভায় ভাষণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশে।। সার্বভৌম পার্লামেন্টের নির্বাচন দাবী করলেন এবং জাতীয় দাবী ৫ দফার সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানালেন।
১০ই এবং ১১ই অক্টোবর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের লক্ষ্যে দেশের প্রখ্যাত ব্যক্তিদের নিয়ে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে এক সেমিনারের আয়োজন করে। এই সেমিনার হতে সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে যে, সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছাড়া দেশের সত্যিকার উন্নয়ন এবং আপামর জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব নয়।
শর্তাধীন বৈদেশিক ঋণ এবং বৈদেশিক ঋণের অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় উন্নয়নের পরিবর্তে দেশকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেউলিয়া করে দিয়েছে। সেমিনার স্থির-সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, অনুৎপাদনশীল খাতে বরা কঠোরভাবে সংকোচিত করে পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে স্বনির্ভরতা অর্জন করতে না পারলে দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ সম্ভব নয় ।
এই সেমিনার থেকেই উচ্চারিত হলো বঙ্গবন্ধুর শাসনামলেই স্বাধীন জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয় এবং প্রকৃত অর্থে ঐ সময় কালেই দেশের সার্বভৌমত্ব ছিল সুসংহত ও অটুট। পরবর্তী সরকার সমূহের আমলে অনুসৃত নতজানু পররাষ্ট্রনীতি আমাদের জাতীয় মর্যাদাকে করেছে ক্ষুন্ন এবং বহু দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্যাকে রেখেছে অমীমাংসিত। বস্তুতঃ কোন অগণতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠির পক্ষে দেশের প্রকৃত সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।
সম্ভব নয়। এ ধরনের শাসকগোষ্ঠিকে বহিঃশক্তির নির্দেশে দেশের মানুষের বিরুদ্ধে কাজ করাতে হয়। তাই সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের অপরিহার্য পূর্বশর্ত হচ্ছে জনগণের নির্বাচিত সরকার। ইহা একটি সার্বজনীন সত্য যে, ঐক্যবদ্ধ জাতীয় অনমতই পররাষ্ট্রনীতির নিয়ামক শক্তি।
এছাড়া স্বৈরতান্ত্রিক সরকার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার স্থির করতেও স্বার্থ হয়। জনগণের প্রতিনিধি নয়- এধরনের সরকার এবং তার প্রতিনিধিরা আলোচনায় স্বভাবত প্রতিপক্ষের কাছে সুর্বল হয়। বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী সরকারসমূহ এ সমস্ত মৌলিক দুর্বলতার কারণে জাতীয় মর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষায় বরাবর ব্যর্থ হয়েছে।
প্রিয় সহকর্মীগণ,
১৫ই অক্টোবর জগন্নাথ হলের মিলনায়তনের ছাদ ভেংগে মারা যান ৩৭ জন ছাত্রসহ ৩৯টি তাজাপ্রাণ গণবিরোধী। সরকারের শিক্ষার প্রতি চরম অবহেলার কারণে। আওয়ামী লীগের পক্ষ হতে আমরা শোকসভা করে দেশবাসী কাছে অবহেলিত শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরলাম। এ কাউন্সিল দাঁড়িয়ে আমি নিহতদের স্মরণ করছি, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
বর্ষ-পরিক্রমায় ফিরে এলো ওরা নভেম্বর। জাতীয় ৪ নেতার স্মরণে আমরা জেলহত্যা দিবস পালন করলাম। এই নভেম্বর পুলিশের গুলিতে আদমজী মিলে শ্রমিক নিহত হলো। ১১ই নভেম্বর শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে সারা দেশে অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়।
সরকারী নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৫ দল সমাবেশ করল ঢাকায় ২৮শে নভেম্বর। রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা দিবসে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সম্মুখস্থ সড়কে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলো। অস্ত্রোপাচার (অস্ত্রপচার) শেষে কিছুটা সুস্থ হয়েই ৬ই ডিসেম্বর সভানেত্রী দেশে ফিরলেন। ১৪ই ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী এবং ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস পালিত হলো সংগ্রাম ও আন্দোলনের শপথ নিয়ে।
৮৬-র পহেলা জানুয়ারী হতে প্রকাশ্য রাজনীতির ঘোষনা দেওয়া হলো। আগেই উল্লেখ করেছি, আমরা বস্তুতঃ
কখনও ঘরোয়া রাজনীতির ধার ধারিনি। প্রথম দিনেই ১৫ দলের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত হলো এক
বিরাট জনসমাবেশ। সমাবেশ হতে সভানেত্রী এবং ১৫ দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ৫ই জানুযারী অর্ধদিবস হরতাল
পালনের আহ্বান জানিয়ে বললেন, “যতই নির্যাতন আসুক, আন্দোলন চলবেই।” ৪ঠা জানুয়ারী হরতালের সমর্থনে মশাল মিছিল করে করা হলো। জাতীয় দাবী ৫ দফা আদায়ের লক্ষ্যে এবং ধর্মঘটি পাটকল শ্রমিক ও অন্যান্য পেশাজীবীর আন্দোলন ও
কর্মসূচীর সমর্থনে আবৃত ৫ই জানুযারী অর্ধদিবস হরতার জনতার স্বতস্ফূর্ত সমর্থনে সার্থক ও সফল হয়। ছাত্রলীগের ৩৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ৭ই জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় আয়োজিত পুনর্মিণী সভায় সভানেত্রী শেখ হাসিনা বললেন, “অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধ করার নির্বাচন হতে দেব না।”
১০ই জানুয়ারী বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে আওয়ামী লীগ আয়োজিত বায়তুল মোকাররম-এর বিশাল জনসভায় একাত্তরের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বৈরাচারবিরোধী দুর্বার সংগ্রাম গড়ে তোলার এবং বুলেটের ক্ষমতাকে বৈধ করতে না দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানালেন সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
১১ই জানুয়ারী ‘৮৬ জাতীয় পার্টি আয়োজিত বায়তুল মোকাররম-এর জনসভায় ৭২ সরকারের বৈধতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে’ মর্মে তোঃ এরশাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যে সারাদেশ ও জাতি বিক্ষোভে ফেটে পড়ল।
১৩ই জানুয়ারী বিপ্লবী নেত্রী শেখ হাসিনা বললেন, ৭২ সালের সরকারের বৈধতার প্রশ্ন তুলে রাষ্ট্রপতি এরশাদ মুক্তিযুদ্ধেনা প্রতি কেবল চরম অবমাননাই প্রকাশ করেননি, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ বীর সন্তানের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগকেও বিদ্রূপ করেছেন।”
১৪ই জানুয়ারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের এক জরুরী সভায় এরশাদের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ করে বলা হয় ‘৭২ সালের সরকারের বৈধতার প্রশ্ন তুলে জেঃ এরশাদ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মদান, বাংলাদেশের সংবিধান, সামরিক কর্মকর্তা হিসাবে তাঁর নিয়োগসহ সংবিধানের আওতায় পরিচালিত রাষ্ট্রীয় সকল কর্মকাণ্ডকেই মূলতঃ অস্বীকার করেছেন।
সভায় এরশাদের উক্তির প্রতিবাদে ১৯শে জানুয়ারী দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও সমাবেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ১৫ই জানুয়ারী ১৫ দলের আয়োজিত বায়তুল মোকাররমের বিশাল সমাবেশ হতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ১৯শে জানুয়ারীর মধ্যে জাতীয় দাবী ৫ দফা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান।
অন্যথায় হরতালসহ বৃহত্তর আন্দোলনের সূচনা করা হবে বলে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়। এরশাদের ‘৭২-এর সরকারের সম্পর্কে উদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের প্রতিবাদে ১৯শে জানুয়ারী সারা দেশে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ পালিত হয় এবং ৩রা ফেব্রুয়ারী অর্ধদিবস হরতালের ডাক দেওয়া হয়।
১লা ফেব্রুয়ারী বাকশাল এবং তার অংগ ও সহযোগী সংগঠনসমূহের বিপুল সংখ্যক নেতা ও কর্মীর বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ঘোষণার মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগে যোগদান উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন প্রাংগণে আয়োজিত সমাবেশে শেখ হাসিনা স্বাধীনতার পক্ষের সকল শক্তির ঐক্যের আহ্বান জানান।
ওরা ফেব্রুয়ারী সারাদেশে ১৫ দল ও ৭ দল আহূত অর্ধদিবস সফল হরতাল পালিত হয় এবং হরতাল দিবসে কেন্দ্রীয় সমাবেশ হতে ১৪ই ফেব্রুয়ারী জাতীয় মহাসমাবেশের কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়।৪ঠা ফেব্রুয়ারী ১৪ই ফেব্রুয়ারীর মহাসমাবেশ সফল করার লক্ষ্যে ১৫ দলীয় ঐক্যজোট কর্মপদ্ধতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
৫ ও ৬ই ফেব্রুয়ারী আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় ১৪ই ফেব্রুয়ারী মহাসমাবেশ এর বিভিন্ন নিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং মহান একুশে ফেব্রুয়ারী শহীদ দিবস উপলক্ষে দলীয় কর্মসূচী চূড়ান্ত করা হয়। ৮ এবং ৯ই ফেব্রুয়ারী কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় ১৪ই ফেব্রুয়ারীর মহাসমাবেশ সফল করে স্বাধীনতাকামী গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে মহাসমাবেশ হতে নবতর পর্যায়ে কর্মসূচী ঘোষণার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
ঐ সময় সরকারী দল জাতীয় পার্টি ১৩ই ফেব্রুয়ারী বায়তুল মোকাররম চত্বরে জনসভা অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করে। বস্তুতঃ তাদের এ আকস্মিক কর্মসূচী ছিল উস্কানিমূলক, অসৎ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত ও দূরভিসন্ধিমূলক। উল্লেখ্য যে, ৩রা ফেব্রুয়ারী হরতাল দিবসের সমাবেশ হতে ১৫ দলীয় জোট বায়তুল মোকাররম চত্বরে জোটের- সমাবেশ অনুষ্ঠানের কর্মসূচী ঘোষণা করে।
কিন্তু ৭ দলীয় জোট কোনরূপ মতবিনিময় ও পরামর্শ ছাড়াই একতরফাভাবে ঐ তারিখে বায়তুল মোকাররম চত্বরে তাদের জোটের মহাসমাবেশের পোষ্টার ও প্রচারপত্র বিলি শুরু করে। যুগপৎ আন্দোলনের ধারা বিঘ্নিত হলেও উভয় রাজনৈতিক জোটের তখনও এক মঞ্চে যাওয়ার কথা হয়নি, (ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়নি এবং সেই লক্ষ্যে বাস্তব ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গৃহীত হ্যানি।
আন্দোলনরত উভয় জোটের সকল নেতা ও বিরাট কর্মীবাহিনীর পূর্ব মানসিক সমঝোতা ও প্রস্তুতি ছাড়া একই দিনে দু’টি পৃথক মঞ্চ হতে বা একটি মঞ্চ হতে মহাসমাবেশ করা অভ্যস্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রস্তুতিহীন অবস্থায় অনুরূপ উদ্যোগ বৃহত্তর ঐক্যের পরিবর্তে জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা ও আন্দোলনের পৃষ্ঠে ছুরিকাঘাত করতে পারে বিবেচনায় ১৫ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দের সুচিন্তিত পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে ১৫ দলীয় ঐক্যজোট ১৪ই ফেব্রুয়ারীর পরিবর্তে ২৪শে ফেব্রুয়ারী শেরে বাংলা নগরে।
জাতীয় মহাসমাবেশের তারিখ ও কর্মসূচী ঘোষণা করে। ১৩ই ফেব্রুয়ারী দলের পক্ষ হতে আমি ২৪ তারিখের জাতীয় মহাসমাবেশকে সফল করার জন্য দলের এবং সহযোগী ও অংগ সংগঠনসমূহের সকল স্তরের নেতা ও কর্মীসহ দেশবাসীকে ব্যাপকভাবে সমাবেশে যোগদানের আহ্বান জানাই এবং সভানেত্রীর পক্ষ হতে সমাবেশের তারিখ। পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা সহকারে বিবৃতি প্রদান করা হয়।
১৫ই ফেব্রুয়ারী আমাদের বিপ্লবী সভানেত্রী ফিলিপাইনের নির্বাচনে প্রদত্ত গণরায় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তেজোদ্দীপ্ত পরিচালনার জন্য সেই দেশের বিপ্লবী জননেত্রী মিসেস কোরাজান একুইনোকে আন্তরিক ও সংগ্রামী অভিনন্দন জানান এবং ১৬ই ফেব্রুয়ারী ‘ফিলিপাইনের সংগ্রামী জনতা নির্বাচনে মিসেস কোরাজানের পক্ষে রায় দিয়েছে’ শিরোনামে বিবৃতি প্রদান করেন।
১৬ই এবং ১৭ই ফেব্রুয়ারী আওয়ামী লীগসহ ঐক্যজোট নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, শ্রমিক-কর্মচারী।ঐক্যপরিষদ, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে মহাসমাবেশের সফল প্রস্তুতির লক্ষ্যে আলোচনার মিলিত হই ও কর্মসূচী গ্রহণ করি।
মহান শহীদ দিবস উদযাপনের কর্মসূচীর অংশ হিসাবে আওয়ামী লীগ কার্যালয় প্রাংগনে শেখ হাসিনার সভানেত্রীত্বে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে উল্লেখ্য, মহান ২১শে ফেব্রুয়ারী শহীদ দিবসের সূচ মধ্যরাতে শহীদ মিনার চত্বরে সশস্ত্র দুষ্কৃতিকারীদের পরিকল্পিত হামলার শিকার হয়ে আওয়ামী লীগ কর্মী সোহরাব হোসেন নিহত হন এবং ঢাকা নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জনাব মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াসহ অর্ধ শতাধিক কর্মী মারাত্মকভাবে আহত হন।
২১শে ফেব্রুয়ারীর মধ্য রাতের এই সন্ত্রাস ও হত্যার নিন্দনীয় ঘটনা জাতির সামনে রেখে গেল কিছু প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা। ২৪শে ফেব্রুয়ারী ৮৬ সারা বাংলা হতে অধিকার বঞ্চিত সংগ্রামী জনতা দলে দলে ছুটে এসে মিলিত হলো শেরেবাংলা নগরের ঐতিহাসিক জাতীয় মহাসমাবেশে।
শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, জনতা স্বৈরাচার ও সামরিক শাসন বিরোধী সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার শপথ নিল। সভানেত্রী শেখ হাসিনার বন্ধ ঘোষণা সামরিক শাসনের চির অবসান চাই। ২রা মার্চ জেঃ এরশাদ তাঁর ভাষণে ২৬শে এপ্রিল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলেন। একই দিনে ১৫ দলীয় ঐক্যজোটের সভায় প্রেসিডেন্টের ভাষণকে অস্পষ্ট ও অম্পূর্ণ অভিহিত করে জোটের প্রতিক্রিয়া ব্যক করা হলো। ৪ঠা মার্চ জাতীয় দাবী ৫ দফার ভিত্তিতে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবীতে ৮ই মার্চ অর্ধ দিবস
হরতালের আহ্বান জানানো হয়। আওয়ামী লীগের উদ্যোগে মহান ৭ই মার্চ পালন উপলক্ষে বায়তুল মোকাররমের এক বিশাল জনসভায় সভানেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করলেন: ‘গণ-ভোটের মত প্রহসনমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে দিব না।’
গণ-দাবীকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রপতি এরশাদের নির্বাচনী ঘোষণার প্রতিবাদে এবং জাতীয় দাবী ৫ দফার ভিত্তিতে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবীতে ৮ই মার্চ সারাদেশে সফল হরতাল পালিত হলো।
১০ই মার্চ ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, “অস্ত্রের জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না।” ১১ই মার্চ আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয় যে, ‘আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে ভয় পায় না। তবে বর্তমান সরকার নির্বাচনের নামে যে প্রহসন করাতে যাচ্ছে, তা করতে দেওয়া হবে না।’
১৪ই মার্চ ১৫ দলীয় এবং ৭ দলীয় ঐক্যজোট ২০ থেকে ২৪শে মার্চ পর্যন্ত একটানা কর্মসূচী ঘোষণা করেন। কর্মসূচীতে ২০শে মার্চ সারাদেশে বিক্ষোভ, ২১শে মার্চ মশাল মিছিল, ২২শে মার্চ পূর্ণ দিবস হরতাল এবং ২৪শে মার্চ সামরিক শাসনের ৫ম বর্ষ পূর্তি দিনটিকে ‘কালো দিবস’ হিসাবে পালনের আহ্বান জানানো হয়।
ঐদিনই ১৫ দলীয় ঐক্যজোট নেত্রী শেখ হাসিনা এবং ৭ দলীয় ঐক্যজোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনে এক এবং অভিন্ন প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে আহ্বান জানানো হয়। বেগম খালেদা জিয়া এবং ৭ দলীয় জোটও এই প্রস্তাবে তাদের সম্মতি প্রকাশ করেন।
বস্তুতঃ এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী রাজনৈতিক জোট ও দলসমূহের অংশ গ্রহণের নীতিগত সম্মতির প্রকাশ ঘটে। ১৫ই মার্চ সামরিক সরকার জাতীয় সংসদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন বিধি অবৈধভাবে সংশোধন করে এক বাড়ি ৫টিরা বেশী আসনে নির্বাচন প্রার্থী হতে পারবে না- এই মর্মে অধ্যাদেশ জারী করে সাংবিধানিক অধিকার হরণ করে। উভয় রাজনৈতিক জোটের পক্ষ হতে ‘জনপ্রতিনিধি নির্বাচন বিধি সংশোধনের তীব্র প্রতিবাদ করা হয় এবং ১৮ই মার্চ উক্ত আদেশ চ্যালেঞ্জ করে রীট আবেদন পেশ করা হয়।

আন্দোলন এবং সংগ্রামের দিনগুলিতে আমরা ১৭ই মার্চ পূর্ণ মর্যাদায় বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালন করি। ১৯শে মার্চ সভানেত্রী শেখ হাসিনার আনীত রীট আবেদনের শুনানী হয়। ঐদিন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ প্রদান করেন এবং দাবী পূরণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
২০শে মার্চ সামরিক অধ্যাদেশের বৈধতা পরীক্ষা করে দেখার এখতিয়ার না থাকায় শেখ হাসিনা কর্তৃক ‘জনপ্রতিনিধি নির্বাচন বিধি সংশোধন সংক্রান্ত অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে আনীত রীট আবেদন খারিজ করেন। ২১শে মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নিলে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনসহ কতিপয় নারী এরশাদ মেনে নেবেন বলে ঘোষণা প্রদান করেন।
