আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃজেনারেল ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে অভু্যত্থান। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
জেনারেল ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে অভু্যত্থান

জেনারেল ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান
চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুল হাসানের সাথে ব্রিগেডিয়ার বাকির সিদ্দিকী যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি আমাকে তা অবহিত করেন। আমি ব্রিগেডিয়ার মমতাজ আলীর নেতৃত্বাধীন ১১১তম ব্রিগেড ও আরো ১০টি ব্যাটালিয়ন পাঠানোর এবং কামান ও ট্যাংকে আমার ঘাটতি পূরণের অনুরোধ করি।
এ অনুরোধ নিয়ে ব্রিগেডিয়ার বাকির জেনারেল গুল হাসানের সাথে বৈঠকে বসেন। জেনারেল হাসান ১১১তম ব্রিগেড, ১০টি ব্যাটালিয়ন ও আরো কয়েকটি সহায়ক ইউনিট পাঠাতে সম্মত হন। আলোচনাকালে দুপুরে খাবারের সময় হয়ে যায়। তাই দুপুরের পর আবার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল।
ব্রিগেডিয়ার বাকির লাঞ্চে যান এবং তখন তার এক বন্ধু আলোচনার ফলাফল সম্পর্কে জানতে চান। ব্রিগেডিয়ার বাকিরের ওই বন্ধু জানান যে, তাকে ১১১তম ব্রিগেড দেওয়া হবে না। কারণ, এ ব্রিগেডটি অভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য রাওয়ালপিন্ডিতে রেখে দেওয়া হয়েছে এবং ব্রিগেড কমান্ডার সিজিএস জেনারেল। গুল হাসানের সাথেই অবস্থান করছেন।
বিকেলে যখন আলোচনা শুরু হয়। তখন তাকে জানানো হয় যে, ১১১তম ব্রিগেড পাঠানো হবে না। মাত্র ৮ ব্যাটালিয়ন সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানো হবে। তাকে ঢাকা ফিরে আসার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় এবং জানানো হয় যে, এই মাত্র পাওয়া এক খবরে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর ঈদের দিনে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে হামলা করবে।
মাত্র দুটি ব্যাটালিয়ন আমাদের কাছে পৌঁছে। ইউনিটের বাকিরা আর কোনো দিনই এসে পৌঁছায় নি। দৃশ্যত জেনারেল গুল হাসান একটি অভ্যুত্থান ঘাটানোর জন্য আমাদের প্রতারিত করেছিলেন। তিনি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে ইয়াহিয়া খানকে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন।
ব্রিগেডিয়ার বাকির যে বৈঠকে জেনারেল গুল হাসানের সাথে আমার সুপারিশ নিয়ে আলোচনা করছিলেন সে বৈঠকে নৌবাহিনী প্রধান উপস্থিত ছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরু করা যাবে না বলে আমি যে সুপারিশ করেছিলাম ব্রিগেডিয়ার বাকিরের মুখ থেকে তা শোনা মাত্রই নৌবাহিনী প্রধান মন্তব্য করেন যে, সে ক্ষেত্রে তিনি তার বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেবেন। জেনারেল হামিদ তখন তড়িঘড়ি করে তাকে সাথে নিয়ে বৈঠক ত্যাগ করেন।
ব্রিফিঙের পর জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজে মন দিলাম। প্রথমেই ভাবতে শুরু করলাম চাঁদপুরের কথা। ১৪তম ডিভিশনকে চাঁদপুর রক্ষার দায়িত্ব দিয়েছিলাম। সে সামর্থ্য তাদের ছিল। কিন্তু তারা চাঁদপুর রক্ষায় ব্যর্থ হয় ।
তাই আমি মেজর জেনারেল এম. রহিম খানের নেতৃত্বে ৩৯তম এডহক ডিভিশন গঠন করি। মার্শাল ল’ সদর দপ্তর ও ৫৩তম ব্রিগেডের কিছু সৈন্য নিয়ে এ ডিভিশন গঠন করা হয়। ৫৩তম ব্রিগেড ছিল একটি কমান্ড রিজার্ভ এবং ঢাকার প্রতিরক্ষাই ছিল এর মূল কাজ।
কিন্তু জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স আরো ৮টি ব্যাটালিয়ন পাঠানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করে এ ব্রিগেডকে চৌদ্দগ্রাম- লাকসাম পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুত ব্যাটালিয়ন এসে না পৌঁছানোতে অন্যান্য ডিভিশন কাট-ছাঁট করে কিছু সৈন্য ঢাকায় এনে মোতায়েন করি। যে দুটি অতিরিক্ত ব্যাটালিয়ন এসে পৌঁছেছিল সে দুটি ব্যাটালিয়নকে যশোর সেক্টরে ৯ ডিভিশনের ঘাটতি পূরণে পাঠানো হয়।
আরো ৬টি ব্যাটালিয়ন এসে পৌঁছানোর কথা ছিল। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম যে, এ ৬টি ব্যাটালিয়নকে ঢাকায় মোতায়েন করা হবে। চাঁদপুরের কাছে একটি দ্বীপে ৩৯তম ডিভিশনের সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়। ৩৯তম ডিভিশন গঠন করায় ১৪তম ডিভিশনের ওপর চাপ কমে যায়।
ফলে এ দুটি ডিভিশনের দায়িত্ব পুনরায় বণ্টন করা হয়। ১৪তম ডিভিশন (৭ ব্যাটালিয়ন)-কে মেঘনা নদীসহ সিলেট থেকে কসবা পর্যন্ত এবং ৩৯তম ডিভিশন (৪টি ব্যাটালিয়ন)-কে কসবা থেকে ফেনী পর্যন্ত এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
জিওসি ইস্টার্ন কমান্ড লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা পূর্ব পাকিস্তানের চারিদিকে ৩ কোর সৈন্য ও একটি কমিউনিকেশন জোন মোতায়েন করেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল সগত সিংয়ের নেতৃত্বে একটি কোর চট্টগ্রাম সেক্টরে সিলেটের বিপরীত দিকে, মেজর জেনারেল জিএস গিলের নেতৃত্বে ১০১তম কমিউনিকেশন জোনকে ময়মনসিংহ সেক্টরের বিপরীতে।

৩৩তম কোরকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল থাপনের কমান্ডে রাজশাহী সেক্টরের বিপরীতে ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল রায়নার নেতৃত্বে দ্বিতীয় কোরকে যশোর সেক্টরের বিরুদ্ধে মোতায়েন করা হয়।
