চতুর্থ অধ্যায়: তাঁতশিল্পের উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ ও বাণিজ্য,
চতুর্থ অধ্যায়: তাঁতশিল্পের উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ ও বাণিজ্য সূচিপত্র

- তাঁতশিল্পের উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ ও বাণিজ্য
- তাঁতপণ্য বাজারজাতকরণের মাধ্যমসমূহ
- প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার’ হয়ে ওঠার কথা
- ভুলতা গাউছিয়া তাঁতের পাইকারী বাজার
- জামদানী কাপড়ের হাট
- তাঁতপণ্যের ব্যবসা ও বিপণন
- তাঁতবস্ত্র বাণিজ্যের বিভিন্ন ঐতিহাসিক দিক
- বাণিজ্যে বৃটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর প্রভাব
- প্রাইভেট বস্ত্র ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম
- বাংলায় বা ব্যবসায়ে চ্যালেঞ্জসমূহ
- মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ
- অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বস্ত্র বাণিজ্যের কিছু নমুনা
- বন্ধু বাণিজ্যে দাদন ব্যবসায়ী এবং দালাল নিয়োগ
- কোম্পানীর বহির্ভূত ঢাকার তাঁত ব্যবসা
- বিশ শতক এবং তারপর
- চলমান ব্যবস্থাপনায় তাঁতীদের বস্ত্র উৎপাদনের কাঁচামাল ও সুতা সংগ্রহ
- তাতী থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে দামের পার্থক্য
- উৎপাদনশীলতা ও তাঁতীদের পারিবারিক আয়
- দেশীয় বাণিজ্যের বর্তমান অবস্থা
- বাজার সৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁত ও বস্ত্র মেলার আয়োজন
- ডিজিটাল মার্কেটিং
- মজুরি ও মুনাফার রকমফের: সাম্প্রতিক চিত্র
- জামদানি পল্লী ও অন্যান্য এলাকার তাঁত ব্যবসার বর্তমান অবস্থা
- বিশেষ উৎসব ও দিবসগুলিতে ব্যবহার্য তাঁতের শাড়ী
- তাঁত বস্ত্রের আন্তর্জাতিক বাজার
- সমুদ্রপথে বাণিজ্য
- আস্ত মহাদেশে বাণিজ্য
- ইউরোপীয় কোম্পানিসমূহের প্রতিযোগিতা
- বাংলার সাথে আমেরিকান ব্যবসায়ীদের বস্ত্র বাণিজ্য ও এ বিষয়ের প্রতি মার্কিন নীতি নির্ধারকদের গুরুত্ব
- অন্যান্য জাতি গোষ্ঠীর বস্ত্র ব্যবসা
- বন্ধু ব্যবসা বাণিজ্যে ব্রিটিশ ও ফরাসীদের দ্বন্দ্ব
- ঔপনিবেশিক বৃটিশ শাসকদের বৈরী নীতিতে ক্ষতিগ্রস্থ বা বাণিজ্য
- বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে তাঁত শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য
উপসংহার
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে স্বদেশী আন্দোলনের কারণে দেশীয় তাঁত শিল্প সাময়িকভাবে চাঙ্গা হলেও ১৯৪৭ সনের দেশ বিভাগের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের তাঁত শিল্পের অবস্থা ছিল ক্রমাবনতশীল। এর প্রধান কারণ ছিল মিলখাতের সাথে এ শিল্পের তীব্র প্রতিযোগিতা। তাছাড়া মাদ্রাজভিত্তিক তাঁতশিল্পের সাথেও এ অঞ্চলের তাঁত শিল্প প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হত। দেশ বিভাগের অব্যহতির পরে বাংলাদেশের তাঁতশিল্প সাময়িকভাবে তীব্র সুতা সংকটের মধ্যে কাটায়। সরকারি উদ্যোগে অচিরেই এ সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় এবং এর দ্রুত প্রসার লাভ ঘটে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন জরিপ ও মারিতে এ শিল্পের প্রবৃদ্ধি চোখে পড়ে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য কিছু বিষয় তাঁত শিল্পের জন্য সহায়ক হয়েছে যেমন- প্রথমতঃ তাঁতশিল্পের নিজস্ব সাংগঠনিক সুবিধা।
সাংগঠনিক সুবিধার মধ্যে রয়েছে উৎপাদন প্রক্রিয়ার পারিবারিক শ্রম ব্যবহারের পাশাপাশি সন্তান তাড়া শ্রমের ব্যবহার। তাছাড়া এ শিল্পে কারখানা সংগঠনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার প্রসারও ঘটেছে অনেক। দ্বিতীয়ত: এ শিল্পে প্রযুক্তি মোন্নতি ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পরে ক্রমান্বয়ে বেশি কাপড় উৎপাদনশীল – ভাত স্থাপন করা হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। সাথে সাথে প্রাক- বুনন কর্মকাণ্ডে প্রতিতে উন্নতি সাধিত হয়েছে।
তাঁত শিল্পে উৎপাদিত বস্ত্র বিশেষ করে শাড়ি ( বাংলাদেশের মোট নং ভোগের ৫০%-৬০%) ক্ষেত্রে ভোক্তারা তাঁতের তৈরি দ্রব্য অধিকতর পছন্দ করে। তৃতীয়ত, তাঁতশিল্প রক্ষায় সরকারি নীতির আঠারোও উনিশ শতকে বৃটিশ পুঁজি নিয়োজিত হয়েছিল তাঁতশিল্পে। সে কারণে বৃটিশ তাঁতশিল্প বা র জন্য নৈতিকতা ব্যবহার করে তারপণ্য আমদানি রপ্তানি বিষয়ে নানারকম নিয়ম কানুন করা হয়েছিল সে কথা আগেই বলা হয়েছে।
যদিও পূর্ব বাংলা বা বাংলাদেশ ছিল পাট উৎপাদনর মূলকেন্দ্র, কিন্তু পাকিস্তান আমলের পূর্ব পর্যন্ত পাটকলগুলো ছিল মূলত কলকাতা ও হুগলির আশপাশের এলাকায়। পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় পূর্ব বাংলার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আদমজী জুট মিলসহ আরো অনেক ফু দিল।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর সত্তর ও আশির দশকে পাওয়ার সুমের পাশাপাশি হস্তচালিত তাঁতশিল্প প্রবাহমান ছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে পাওয়ার লুমের মাত্রা ব্যাপক বৃদ্ধি পায় এবং হস্তচালিত তাঁতশিল্প গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়।
লক্ষণীয় আশির দশক থেকে বাংলাদেশে পুঁজির একটা অংশ যেমন পাওয়ার দুর্মভিত্তিক বিভিন্ন মিল কারখানায় যুক্ত, পাশাপাশি পুঁজির একটা অংশ নরকেন্দ্রিক একটা নতুন বাজার তৈরির কাজেও সচেষ্ট। অনেক তাঁতি মহাজন সত্তর ও আশির দশকেও হস্তচালিত তাতে শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা ইত্যাদি তৈরি করে টিকে থাকতে পেরেছে। কিন্তু নব্বই এর দশকে দেখা যায়।
এই সব তাঁতি মহাজন কোন কোন ক্ষেত্রে কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। এর কারণ ছিল কারমান পুঁজি এসব ছোট পুঁজিকে গ্রাস করতে এরা করেছিল, যদিও তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক উদ্যোক্তা নতুন প্রযুক্তিনা সাথেও পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খেয়ে ঘুরে দাঁড়ায় এবং কিছু সংখ্যক উদ্যোতন হস্তচালিত তাঁতের ন্যায় পাওয়ারলুমে সুতি কাপড় ও লুঙ্গি উৎপাদন শুরু করেন।
এদিকে শহরালে পাওয়ার লুমের পণ্যের পাশাপাশি হস্তচালিত তাঁতশিল্পের নতুন বাজার তৈরি হয়। সত্তরের দশক থেকে শুরু হলেও মোটামুটি নব্বইয়ের দশকে এটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্থানীয় ছোট পুঁজি নয়, এর পেছনে নাগরিক পুঁজির একটা বড় অংশ সক্রিয়ভাবে কাজ করে। এই নগরকেন্দ্রিক বড় পুঁজি গ্রামের ছোট পুঁজির বাজার দখল করার পাশাপাশি তাঁতিদের নতুন ভূমিকাও নির্ধারণ করে দেয়। এই ভূমিকা হলো শ্রমিকের।
একশ বছর ধরে বিভিন্ন প্রকলে শুরু থেকেই প্রচুর তাঁতি শ্রমিক হিসেবে কাজ করে আসছে। তবে গ্রামের অধিকাংশ হাতি সাধারণ দালনের ভিত্তিতে। প্রান্তিক কিন্তু স্বাধীন তাঁতিও ছিল, কিন্তু তাদের সংখ্যা ছিল কম। মহাজনরা মূলত উৎপাদন ও বিপণনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাপালন করত। কিন্তু নগরের বড় পুঁজি বাজারগুলো দখল করার পর গ্রামের মহাজনরা সংকটে পড়ে। বড় পুঁজি এবার মহাজনদের ভূমিকাও নির্ধারন করে।
তাদের অনেকে এখন শহরের হস্তচালিত তাঁতপণ্যের নতুন বাজারের জন্য ফ্যাশন হাউসগুলোর চাহিদাও অর্ডারমাফিক কাপড় উৎপাদন ও সরবরাহ করার এজেন্ট বা প্রতিনিধি। যেসব মহাজন পরিবর্তিত এই পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পেরেছে, অর্থাৎ ভূমিকা পরিবর্তন করেছে, তারা বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে। অনেকে তাঁতের কাজ এর পাশাপাশি নতুন কোনো পেশায় যুক্ত হয়েছে। পুঁজির ক্রমবর্ধমান প্রভাবে গ্রামের প্রান্তিক ও স্বাধীন তাঁতি এখন খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
তবে প্রায় অধিকাংশ তাঁতসমৃদ্ধ এলাকায় মহাজনরা আছে। তাদের অনেকের কারখানায় শহরের পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য কাপড় তৈরি হয়। সেখানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে তাঁতিরা। এছাড়া দাদন পদ্ধতিতেও কাজ চলছে। দাদন পদ্ধতিতে তাঁতি তার বাড়িতেই তাঁতে কাপড় উৎপাদন করে দেয় মহাজনের দেয়া ডিজাইন ও নির্দেশ মাফিক।

মহাজনকে নির্দেশ দেয় শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ এভাবে হস্তচালিত তাঁতপণ্য উৎপাদন বিপণনে শহরের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস বা পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। তাঁতে উৎপাদিত পণ্যের ব্যবসা বাণিজ্যে গতি এসেছে তবে এর পেছনে পুঁজি, সংগঠন, অবকাঠামো, পণ্যের সহজলভ্যতার ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।
