তুলনামূলক শক্তি

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ তুলনামূলক শক্তি। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।

তুলনামূলক শক্তি

 

তুলনামূলক শক্তি

 

তুলনামূলক শক্তি

যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় উভয়পক্ষের তুলনামূলক শক্তি ছিল নিম্নরূপ :

সিলেট-চট্টগ্রাম সেক্টর

পাকিস্তান

১১টি ব্যাটালিয়নের সমন্বয়ে ১৪তম ও ৩৯তম ডিভিশন। ৯১তম ও ৫৩তম ব্রিগেড (একটি ডিডিশন সাধারণত ৯ ব্যাটালিয়ন সৈন্য নিয়ে গঠিত হয়)।

ভারত

৮ম, ২৩তম ও ৫৭তম ডিভিশন, তিনটি সাঁজোয়া স্কোয়াড্রন, মুক্তিবাহিনী ব্রিগেড, মুক্তিবাহিনীর ৮টি সেক্টর ও একটি ডিশিনের শক্তিসম্পন্ন কিনোফোর্স সমন্বয়ে ৪র্থ কোর। ভারতের ৮ম ডিভিশনে ৬টি ব্রিগেড ছিল। আবার প্রতিটি ব্রিগেডে সৈন্য ছিল ৮ম ব্যাটালিয়ন (তিনটি ব্যাটালিয়ন নিয়ে সাধারণত একটি ব্রিগেড গঠিত হয়।)

ঢাকা-ময়মনসিংহ সেক্টর

পাকিস্তান

৯৩তম ও ৩১৪তম ব্রিগেডের সমন্বয়ে ৩৬তম ডিভিশন ।

ভারত

১০১তম কমিউনিকেশন জোন, ৯৫তম স্বতন্ত্র ব্রিগেড, ৬৩তম পদাতিক ব্রিগেড, একটি মুক্তিবাহিনী ব্রিগেড ও একটি প্যারো ব্রিগেড। ১১ই ডিসেম্বর এ প্যারা ব্রিগেডকে টাঙ্গাইল নামানো হয় ।

যশোর সেক্টর

পাকিস্তান

দুটি ব্রিগেডের সমন্বয়ে গঠিত ৯ম ডিভিশন এবং একটি স্বতন্ত্র সাঁজোয়া স্কোয়াড্রন (৮টি ট্যাংক)। ২৫শে নভেম্বরে এ সেক্টরে আরো ২টি ব্যাটালিয়ন পাঠানো হয় ।

ভারত

২৪ ও ৯ ডিভিশনের সমন্বয়ে হয় কোর, একটি স্বতন্ত্র ব্রিগেড ও দুটি সাঁজোয়া রেজিমেন্ট।

রাজশাহী সেক্টর

পাকিস্তান

১৬ ডিভিশন ও ২৯ ক্যাভালরি। আইএসএফ এবং ভিপি ফোর্সসহ ইপকাফ ১৮ হাজার। রাজাকার (প্রশিক্ষণবিহীন, সামান্য অস্ত্রে সজ্জিত, ৩০৩ ও ১২ বোরের রাইফেল ও বন্দুক সজ্জিত) ৬০ থেকে ৭০ হাজার ।

ভারত

২০ ও ৬ মাউন্টের ডিভিশনের সমন্বয়ে ৩৩ কোর, একটি স্বতন্ত্র ব্রিগেড, একটি মুক্তিবাহিনী ব্রিগেড, দুটি সাঁজোয়া রেজিমেন্ট। (২০তম ডিভিশনে ৪টি নিয়মিত ব্রিগেড ছিল।) পদাতিক হিসেবে মোতায়েন ৩৯টি বিএসফ এফ ব্যাটালিয়ন, কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ২৫ হাজার। মুক্তিবাহিনী সুপ্রশিক্ষিত ও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি, আরো ৪টি ব্রিগেড।

অন্যান্য

পাকিস্তান

পাকিস্তান এয়ার ফোর্স এফ-৮৬-এর এক স্কোয়াড্রন –৬ই ডিসেম্বর অকেজো, একটি বিমানঘাঁটি, ৪টি গানবোট।

ভারত

ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্স-১৭ স্কোয়াড্রন, এসইউ-৭ ও মিগ-২১; ৫টি বিমানঘাঁটি ও বিমানবাহী রণতরী ‘বিক্রম’। ভারতীয় নৌবাহী স্কোয়াড্রন এবং ‘বিক্রম’।

 

শত্রুর কয়েকটি ডিভিশন গঠিত হয়েছিল ৩ ব্রিগেডের চেয়ে বেশি সৈন্য নিয়ে এবং কয়েকটি ব্রিগেডে ছিল ৩ ব্যাটালিয়নের বেশি সৈন্য। তাদের ৮ মাউন্টেন ডিভিশনে ছিল ৬টি ব্রিগেড এবং ২০ মাউন্টেন ডিভিশনে ছিল ৪টি ব্রিগেড ও মুক্তিবাহিনীর আরো একটি ব্রিগেড।

সিলেট এলাকায় একটি ব্রিগেডে ৭ ব্যাটালিয়ন সৈন্য ছিল । শত্রুরা ১২ ডিভিশন শক্তি নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে হামলা চালায়। মেজর জেনারেল ডি. কে. পালিত ভারতীয় সেনাবাহিনীর শক্তি সম্পর্কে নিম্নোক্ত মন্তব্য করেছেন :

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীসহ নিয়োজিত সৈন্য সংখ্যা ১ মিলিয়নের এক-তৃতীয়াংশ ছাড়িয়ে যায়। উত্তরাঞ্চলে তিব্বত সীমান্ত মোতায়েন আরো ১ লাখ সৈন্যও এ হিসাবের মধ্যে ছিল। সুতরাং সব মিলিয়ে ইস্টার্ন কমান্ডের আওতায় ভারতের সৈন্য ছিল প্রায় অর্ধ মিলিয়ন এ হিসাবের মধ্যে নৌ ও বিমান বাহিনীকে ধরা হয় নি।

সামরিক ইতিহাসে একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এতো বড়ো বিশাল বাহিনীকে কখনো নেতৃত্ব দেন নি অথবা এমন একটি কৌশলগত দায়িত্বের বোঝা বহন করেন নি। দা লাইটনিং ক্যাম্পেইন, পৃষ্ঠা-১০৫ ভারতীয় ও আমাদের মধ্যে সৈন্য মোতায়েনের অনুপাত দাড়ায় ১০:১।

এ ছাড়া ভারতীয়রা স্থানীয় বৈরী জনগণের সমর্থনও পেয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানিরা ছিল আমাদের বিরুদ্ধে এবং যুদ্ধের ব্যাপারে পশ্চিম পাকিস্তানিদের কোনো আগ্রহ ছিল না। জেনারেল শ্যাম মানেকশ’র মতে, পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য মোতায়েনের অনুপাত ছিল ৪:১ (তার হিসাবের মধ্যে নৌ ও বিমান বাহিনী এবং বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি)। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নহিসেবে উভয়পক্ষের সৈন্য সংখ্যার অনুপাত ৬:১ বলে উল্লেখ করা হয় ।

প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতীয়রা ছিল আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। পাকিস্তান ইন্টার্ন কমান্ড পূর্ব পাকিস্তানে যে ধরনের প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছিল। আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে আর কোনো সেনাবাহিনী তেমন প্রতিকূলতার সম্মুখীন। হয় নি।

 

তুলনামূলক শক্তি

 

বিজয়ী হতে হলে প্রতিপক্ষের সাথে শক্তির অনুপাত হতে হবে ৩:১। কৌশলগত বিজয়ের জন্য এ ধরনের অনুপাত অপরিহার্য। প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতীয়দের অপ্রতিহত শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও তারা রণাঙ্গনে ক্ষুদ্র, ক্লান্ত অথচ সাহসী পাকিস্তান ইন্টার্ন গ্যারিসনকে পরাজিত করতে পারে নি। এটা শুধু অবিশ্বাস্য নয়, সামরিকভাবেও অসম্ভব।

Leave a Comment