দেশকে নিয়ে চক্রান্ত

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –দেশকে নিয়ে চক্রান্ত। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

দেশকে নিয়ে চক্রান্ত

 

দেশকে নিয়ে চক্রান্ত

 

আপনারা জানেন, বিগত কাউন্সিল থেকে সোনার বাংলা গড়ার দৃপ্ত শপথ বুকে নিয়ে দেশব্যাপী জনগণের সাথে মিশে আমরা দেখলাম জনগণের আশা ভঙ্গের নিদারুণ যন্ত্রণা। দেশবাসী প্রত্যক্ষ করলো স্বৈরাচার বিরোধী গণঅভ্যুত্থানে তিন জোটের রূপরেখাকে পদদলিত করে ১৯৯১-এর নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলটি অচিরেই নতুন রূপে নতুন পোশাকে স্বৈরশাসক হিসেবে আবির্ভূত হলো।

রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় বিশ্বাসী বিএনপিকে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মেনে নিতে আমরা বাধ্য করি। কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করলেও শহীদ নূর হোসেন, ময়েজ উদ্দিন, ফাত্তাহ, তাজুল তিতাসসহ অগণিত শহীদের রক্তধারায় অভিষিক্ত জাতীয় সংসদকে অচিরেই অকার্যকর করে ফেলা হলো।

নির্বাচিত স্বৈরাচার’ গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার অঙ্গীকার ভুলে গিয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও গণতন্ত্রের মর্মবাণীকে পদদলিত করে প্রতিষ্ঠিত করলো এক ব্যক্তির শাসন। গণতন্ত্র মুক্তি পেল না ।

আমরা সংসদের ভেতরে ও বাইরে থেকে করলাম প্রতিবাদ। আমরা বললাম সংসদকে কার্যকর করতে হবে, সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করলাম গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য।

জনজীবনের সংকট মোচন ও দেশকে উন্নয়নের ধারায় অগ্রসর করে নেয়ার লক্ষ্যে বহু ইতিবাচক প্রস্তাব আমরা সংসদে পেশ করেছি, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু আমাদের কথায় কর্ণপাত করা হলো না, বরং দেশবাসী অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলো এক এক করে সংসদকে এড়িয়ে অর্ডিন্যান্স জারী করে জনগণের অধিকারকে খর্ব করার হীন প্রচেষ্টা।

দেশে সৃষ্টি হলো এক শাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। জনজীবনে নেমে এল চরম বিপর্যয়। সামাজিক অর্থনৈতিক সংকট মোচন করে জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের প্রচেষ্টার বদলে নতুন করে শুরু হলো দুর্নীতি, লুটপাট, দলীয়করণ । কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতির সর্বক্ষেত্রে নেমে এল স্থবিরতা।

কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে যুব সমাজকে ঠেলে দেয়া হলো হতাশার অন্ধকার জীবনে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য চরম আকার ধারণ করলো। আইন-শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়লো। আইনের শাসন হলো অন্তর্হিত। নারী ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতন, পাচার, কালোবাজার ও চোরাকারবার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হতে শুরু করলো। ইয়াসমিন হত্যা ও তাঁর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রক্তাক্ত রোমহর্ষক কাহিনী দেশবাসী আজও বিস্মৃত হয়নি। রেডিও, টেলিভিশনসহ রাষ্ট্রীয় গণপ্রচার মাধ্যমগুলোকে দলীয় প্রচারযন্ত্রে পরিণত করা হলো।

১৯৯৩ সালে বাবরি মসজিদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশেও সংঘটিত হলো কলংকজনক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করতে ব্যর্থ হলো বিএনপি সরকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাসকে বিকৃত এবং খণ্ডিত করার নির্লজ্জ চক্রান্ত কার্যকর হতে থাকলো।

অপসংস্কৃতির জোয়ারে ভেসে গেল মাতৃভূমি বাংলাদেশ। উৎপাদনের রাজনীতির ঢক্কা নিনাদের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল বুভুক্ষু মানুষের করুণ আর্তনাদ। কৃষি খাত ও গ্রামীণ অর্থনীতি হলো চরম উপেক্ষার শিকার। ফলে খাদ্য শস্যের উৎপাদন হ্রাস পেলো। সেচের আওতায় জমি গেলো কমে। অনুকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও বিএনপি শাসনামলের পাঁচ বছরে কৃষি উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার ২% শতাংশের উপরে উঠতে পারেনি।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সঙ্গতি রেখে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি না পাওয়ায় জনগণের গড়পড়তা খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমে যায়। লুটপাট ও দলীয়করণের চরম অভিব্যক্তি ঘটে ১৯৯৫ সালের সার কেলেংকারীর ঘটনায়। ন্যায্যমূল্যে সারের দাবীতে দেশের বিভিন্নস্থানে কৃষক অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়।

সারের পরিবর্তে বিএনপি সরকার গুলি চালায় কৃষকদের উপর। ১৮ জন কৃষকের রক্তে রঞ্জিত হয় বাংলার শ্যামল প্রান্তর। শ্রমিকেরা তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলনের কর্মসূচী দিলে, পবিত্র রমজান মাসে ১৭ জন শ্রমিককে বিএনপি নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করে।

 

বিএনপির পাঁচ বছরের দুঃশাসনে কেবলমাত্র গ্রামীণ কৃষক-ক্ষেতমজুর, কল-কারখানার শ্রমিক-কর্মচারী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, জেলে, তাঁতী, কামার, কুমার, রিক্সাওয়ালা, মুটে, মজুর ও ছোট ছোট দোকানদার, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ই শোষিত-বঞ্চিত হয়নি;

দেশের শিল্পায়নে ও কর্মসংস্থানে অবদান রাখতে সক্ষম উদ্যোক্তা-বিত্তশালী শ্রেণীর মানুষও হতাশ হয়েছিলেন। বিএনপি সরকারের অযোগ্যতা, ব্যর্থতা, দলীয়করণ, সিদ্ধান্তহীনতা, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপে অতিষ্ঠ হয়ে আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও কার্যত দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা দেশের শিল্পায়নের জন্য কাংখিত বিনিয়োগে এগিয়ে আসেনি। প্রকৃতপক্ষে দেশ যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই থেকে যায়।

উপনির্বাচনের নামে জনগণের ভোটাধিকারকেও ছিনতাই করা হলো। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুরের পর মাগুরা উপনির্বাচনে আরও ন্যক্কারজনকভাবে পুনরাবৃত্তি ঘটলো একই ঘটনার। দেশবাসীর মনে সৃষ্টি হলো গভীর শঙ্কার। ঢাকা মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়ার অপরাধে প্রকাশ্য দিবালোকে লালবাগে ৬ জনকে গুলি করে হত্যা করা হলো। ঢাকার জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়লো।

এরপরও হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। দেশবাসী নির্বাচন এমনকি গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাহীন হয়ে পড়লো। পরিস্থিতি হয়ে উঠলো বিস্ফোরণাখ। মাগুরা উপনির্বাচনে শাস্তিপ্রাপ্ত খুনী ও সন্ত্রাসীদের কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে ভোট চুরির কাজে লাগিয়ে ছিল।

মাগুরা উপনির্বাচনে বিএনপি’র সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে আহত মহিলা ভোটারদের আবেদন ছিল “আর নির্বাচন চাই না, ভোট চাই না, এ অত্যাচার সহ্য হয় না।” এ দুঃসহ অবস্থায় বাধ্য হয়ে জনগণের ভোটাধিকার সংরক্ষণ ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশের স্বার্থে আমরা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট দাবী উত্থাপন করলাম। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে জনমত গড়ে তুললো।

 

দেশকে নিয়ে চক্রান্ত

 

অচিরেই এই দাবী জাতীয় দাবীতে পরিণত হলো। বিএনপি ছাড়া দেশের সকল রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিসেবী, সাংবাদিক, বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশাজীবী সংগঠন, ছাত্র, যুব, নারীসমাজসহ সর্বস্তরের জনগণ এই দাবীতে একাত্ম হলো।

এমনকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এই দাবীর যৌক্তিকতা সম্পর্কে নিঃসংশয় হলো। আমরা সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করেছিলাম বিএনপি পঞ্চম সংসদে এই প্রশ্নে আমাদের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের বিল উত্থাপন করুক ।

চেয়েছিলাম সংসদকে কার্যকর করে সংসদেই এই প্রশ্নের মীমাংসা হোক। কিন্তু তারা আমাদের উপহাস করলেন। বললেন, নিরপেক্ষ কে? পাগল আর শিশু ছাড়া নাকি কেউ নিরপেক্ষ হতে পারে না। তারা বললেন, এই দাবী তারা মানেন না। কার্যত জনগণের বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধ ঘোষণা করলো।

Leave a Comment