আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় স্বদেশী যুগ : ১৯০৫-১৯১৯ দেশাত্মবোধের চেতনায় উজ্জীবিত নারী – পর্ব ২।
এটির প্রথম পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন : স্বদেশী যুগ : ১৯০৫-১৯১৯ দেশাত্মবোধের চেতনায় উজ্জীবিত নারী – পর্ব ১
স্বদেশী যুগ : ১৯০৫-১৯১৯ দেশাত্মবোধের চেতনায় উজ্জীবিত নারী – পর্ব ২

বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি আরেকটি ধারা ছিল সশস্ত্র বিপ্লবী সংগ্রাম, যা অনেকক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদ বলে আখ্যায়িত হয়ে থাকে। বর্তমান অভিসন্দর্ভে সন্ত্রাসবাদ শব্দটি ব্যবহৃত হবে না এর নেতিবাচক অর্থের কারণে। বাংলায় সশস্ত্র বিপ্লববাদের জন্ম বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে, যদিও এর বীজ রোপিত হয়েছিল উনিশ শতকেই।
১৮৯৩-এ অরবিন্দ ঘোষ বিলেত থেকে কলকাতায় ফিরে বাঙালিকে স্বাদেশিকতার নতুন আদর্শে উদ্বুদ্ধ করবার চেষ্টা করেছিলেন।* তবে সে প্রচেষ্টা বিশেষ সাফলের মুখ দেখে নি। তবে বাংলার তরুণ প্রজন্ম ইউরোপের কতিপয় দেশের বিপ্লবী আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন। পরবর্তীকালে বিশ শতকের প্রথম দিকেই বাংলায় বিপ্লববাদের পটভূমি রচিত হয়।
এর এই কাজের পুরোভাগে ছিলেন সরলা দেবী চৌধুরানী। বাংলার যুবশক্তিকে বৈপ্লবিক চেতনায় দীক্ষা দেওয়া এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তিতে সমৃদ্ধ করে সর্বপ্রকার ভয়মুক্ত হয়ে শক্তির পথে পরিচালিত হবার পথটি তার সূত্র ধরেই রচিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৯০২-এ বাংলায় অরবিন্দ ঘোষ-এর দূত হয়ে আসেন যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।”
১৯০২ সালে অরবিন্দ ঘোষ বাংলায় বিপ্লবী কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং এর সভ্য জোগার করবার ভার দিয়ে যতীন্দ্রনাথকে একটি চিঠি দিয়ে সরলা দেবীর কাছে পাঠান। সরলা দেবীর সহায়তায় ১০৮ নং আপার সার্কুলার রোডে ইষ্ট ক্লাব নাম নিয়ে গড়ে ওঠে বাংলার প্রথম বিপ্লবী সংঘ। এই ক্লাবেই ছেলেদের মধ্যে বক্তৃতা দিতেন ভগিনী নিবেদিতা।
এখানে উল্লেখ্য যে বাংলায় বিপ্লববাদ বিস্তারে যে দুজন নারী বিশেষ ভূমিকা রাখেন তাদের একজন হচ্ছেন সরলা দেবী, অপরজন যদিও বাংলার নন তথাপি ভারতঅন্তপ্রাণ স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতার নাম বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে অবশ্যই নিতে হয়। বাংলায় যে পাঁচজন সভ্য নিয়ে Revolutionary National Council গঠিত হয়, তাঁদের অন্যতম ছিলেন ভগিনী নিবেদিতা।
১৯০১-এ সরলা দেবীর সঙ্গে নিবেদিতা পরিচিত হন। এর পর তিনি অরবিন্দ ঘোষের সংস্পর্শে আসেন এবং তাঁর মধ্যে নিজ আদর্শের সন্ধান পান। বলা হয় নিবেদিতার সঙ্গে আইরিশ বিপ্লবী দলের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল।” ১০৮ নং আপার সার্কুলার রোডের বিপ্লবী কেন্দ্রের গ্রন্থাগারটি তাঁর সংগ্রহের বই দ্বারা গঠিত হয়।
সতীশ মুখোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত ডন সোসাইটির সঙ্গেও তিনি ঘনিষ্টভাবে যুক্ত ছিলেন।* ১৯০৫-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে লর্ড কার্জন যে বক্তব্য প্রদান করেন সেখানে নিবেদ্বিতা উপস্থিত ছিলেন এই অভিভাষণে ভারত প্রসঙ্গে তান যে মতবাদ নাছ করেছিলেন তা ছিল নিতান্ত অপমানসূচক । কার্জন বলেন
I hope I am making no false or arrogant claim when I say that the highest ideal of truth is to a large extent a Western conception. I do not thereby mean to claim that Europeans are universally or even generally truthful, still less do I mean that Asiatics deliberately or habitually deviate from the truth.
The one proposition would be absurd, and the other insulting. But undoubtedly truth took a high place in the moral codes of the West before it had been similarly honoured in East.79
নিবেদিতার নেতৃত্বে কার্জনের এই ভারতবিদ্বেষী মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত হয়। এবং তাঁর প্রচেষ্টাতেই ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯০৫, অমৃতবাজার পত্রিকায় কার্জনের এই মনোভাবে ভ্রান্ততা প্রমাণ করে প্রবন্ধ প্রকাশ করে।° তিনি এই সময়ে বাংলার তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও বিপ্লবী চেতনা বিস্তারে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন। ১৯০৬-এ বরিশালে বন্যা-দুর্ভিক্ষের সময় তিনি সেখানে যান এবং জনসাধারণের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেন।
তিনি সেখানে বাড়ি বাড়ি ঘুরে দুর্গতদের সাহায্য করতেন এবং পরামর্শ দিতেন। তিনি সেখানে নারীদের স্বদেশী দ্রব্য উৎপাদনে ও ব্যবহারে তৎপর হতে পরামর্শ দেন। সেই সময়েই তিনি সেখানকার নারীদের আর্থিক সংস্থানের উপায় হিসেবে চরকা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই দুর্ভিক্ষ সম্পর্কিত রচনায় পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের স্বরূপ উৎঘাটন করে তিনি উল্লেখ করেন
Under Western imperialism the methods of exploitation are different from those of the past. The subjection has become financial and growing exploitation proceeds along building of rail-roads, the destruction of native industries and the creation of widespread famine – there are so many landmarks, as it were, in a single process of subordination and exploitation. বাংলায় বিপ্লববাদের প্রসারে নিবেদিতার ভূমিকা ফরাসী ভাষায় রচিত তাঁর জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে
She [Nivedita] taught them first the mechanism of secret societies, such as Ireland had known. These samities existed already plentifully in the Indian villages, but they remained fragmentary.
Then Nivedita insisted on the absolute security of the immense network of secret communication stretched throughout the country like the protecting spider’s web. It was necessary that orders should be transmited as rapidely as by post, from man to man by signs and messages learnt by heart.
The appeal was heard. The couriers allowed themselves to be butchered rather than let themselves be corrupted. The ends assigned were pursude with a devotion almost superhuman. From one village to another the cry re-echoed “we are ready. 82
এভাবেই ভগিনী নিবেদিতার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বাংলার বিপ্লবী দলগুলো সমৃদ্ধ হতে থাকে। এই পটভূমিতে ১৯০৫-এ ঘোষিত হলো বঙ্গভঙ্গ। বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলন বিপ্লবী দলগুলোকে প্রকাশ্য কাজের সুযোগ করে দিল।
অরবিন্দ ঘোষ বঙ্গভঙ্গকে বাঙালির জন্য পরম আশীর্বাদ মনে করলেন। তিনি বললেন, ” বাঙ্গালী জীবনে এক নতুন চেতনার জন্ম হল। বাঙ্গালী যেন দেড়শত বছরের ঘুমঘোর থেকে জেগে উঠল। অরবিন্দের সম্পর্কিত বোন সঞ্জীবনী পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্ণকুমার মিত্রের কন্যা কুমুদিনী মিত্র সুপ্রভাত পত্রিকায় লিখলেন মাতৃভূমির রক্তের প্রয়োজন।
বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলনের সময়কালে সশস্ত্র বিপ্লববাদের জন্ম হয়, যদিও প্রথম পর্যায়ে এতে মেয়েদের সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হতো না। বঙ্গভঙ্গবিরোধী নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে যেরূপ নারীদের প্রকাশ্য সম্পৃক্ততা দেখা যায়,তাদের এই আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করবার যে প্রচেষ্টা দেখা যায়, বিপ্লববাদের ক্ষেত্রে তা এই পর্যায়ে ছিল অনুপস্থিত। তবে সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকলেও বিপ্লববাদের পরোক্ষ সংস্পর্শে কেউ কেউ এসেছিলেন, আর তাঁরা ছিলেন বিপ্লবীদের পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।
অগ্নিযুগের কথা-তে বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশী বলেন মেয়েদের রাজনীতি শিক্ষা ও সামাজিক অধিকার না থাকায় তাদের দলে আনার কোন কল্পনা তখন ছিল না। কিন্তু মা, বৌদি, স্ত্রী ও বোনরূপে তাদের সাহায্য অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া গেছে। ফেরারী বা পলাতক কর্মীদের অতি সংগোপনে আশ্রয় দেওয়া, পিস্তল-রিভলবার রাখা বা স্থানান্তরে নিয়ে যাওয়া, চিঠি আদান প্রদানের পোষ্টবক্স হিসেবে কাজ করা – কোন কোন বিপ্লবী পরিবারের মেয়েরা এ সকল কাজ করেছেন।
কাজেই প্রাথমিক পর্যায়ে দেখা যায় বিপ্লববাদে মেয়েদের ভূমিকা ছিল : বিপ্লবীদের আশ্রয়দান; বিপ্লবীদের অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রাখা ও ক্ষেত্রবিশেষে গোপন তথ্য আদানপ্রদান করা এবং এই কাজে জড়িত নারীরা সকলেই বিপ্লবীদের সঙ্গে পারিবারিক বা আত্মীয়তার সম্পর্কে সম্পর্কিত। জানা যায় মেদিনীপুরের চারুশিলা দেবীর সঙ্গে পরিচয় ছিল ক্ষুদিরাম-এর। ১৯০৫-এ ক্ষুদিরাম বিপ্লবীদলে যোগদান করলে চারুশীলা দেবীকেও একদিন রক্ততিলক পরিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেন।
পরবর্তীকালে ১৯০৮ সালে মজঃফরপুরে ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে যাওয়ার আগে ক্ষুদিরাম চারুশীলা দেবীর বাড়িতে কিছুদিন ছিলেন এবং ক্ষুদিরামের মামলার সময় পুলিশ চারুশীলা দেবীকে খোঁজ করতে থাকে। তিনি তখন আত্মগোপন করে থাকেন। ৮৬ আবার মোস্তফা কামাল তাঁর বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে শ্রীহট্ট গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ক্ষুদিরামকে লুকিয়ে রেখে ইংরেজদের হাত থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন একজন মুসলিম নারী।
এই অজ্ঞাতনামা মুসলিম নারী মৌলভী আবদুল ওয়াহেদের ভগিনী এবং তিনি ঐ সময় সমগ্র ভারতে ‘কিংবদন্তি দিদি’ নামে পরিচিত ছিলেন এবং বৃটিশদের গ্রেফতার এড়ানোর জন্য তিনি জার্মানীতে আশ্রয় নেন। প্রভাবতী মির্জা যিনি পরবর্তীকালে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে জড়িত ছিলেন, তিনি ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসির সময়ে দশ বছরের ছিলেন এবং ঐ সময়ে তিনি তাঁর বিপ্লবী ভাই-এর প্রভাবে ক্ষুদিরামের ফাঁসির প্রতিবাদে অনশনে যোগদেন।
লীলাবতী মিত্র এ সময়ে বিপ্লবী ছাত্রদের আশ্রয় দিতেন। ১৯০৮-এ তার স্বামী কৃষ্ণকুমার মিত্র স্বদেশী আন্দোলনে জড়িত থাকবার অভিযোগে কারাবরণ করলে তিনি সরকার প্রদত্ত ভাতা গ্রহণে অসম্মতি প্রকাশ করেন এবং ১৯০৯-এ অরবিন্দ ঘোষ কারাগার থেকে মুক্ত হলে তিনি তাঁকে আশ্রয় প্রদান করেন।
১৯১১-তে তার স্বামী কারামুক্ত হলে তিনি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে সড়ে দাঁড়ান এবং ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচারে ব্রতী হন। কুমুদিনী মিত্র শিক্ষিত ব্রাহ্মণ মহিলাদের একটি দল গঠন করেন যারা আত্মগোপনে থাকা বিপ্লবীদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করতো।
১৯১১-তে বঙ্গভঙ্গ রদ হবার পরে এবং ১৯১৪-এ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার প্রেক্ষাপটে বিপ্লববাদ জোরদার হতে থাকে। বিপ্লবীদের কার্যক্রমের বড় শর্ত ছিল পুলিশের চোখের অন্তরালে থেকে কাজ করা। যে কারণে দেখা যায় তাদের অধিকাংশ সময় আত্মগোপন করে থাকতে হতো। এই আত্মগোপনে থাকবার জন্য তাদের প্রয়োজন হতো কোন না কোন নারীকে আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বাসা ভাড়া নেবার।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার পর যুগান্তর দলের বিপ্লবীরা পরিকল্পনা করলেন জার্মানীর কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে ভারতে বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যূত্থান ঘটানোর। এটি ইতিহাসে ভারত-জার্মান পরিকল্পনা নামে খ্যাত। পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়, পুলিশ বিপ্লবীদের খুঁজতে থাকে এবং স্বাভাবিকভাবে বিপ্লবীরা আত্মগোপন করে।
এই সময়ে দেখা যায় বিপ্লবীদের নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজনে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসেন নারীরা। ১৯১৫ সালে যুগান্তর দলের নেতা যদুগোপাল মুখার্জি ও তাঁর সহযোগী অমর চ্যাটার্জি, নলিনীকান্ত কর ও অতুল ঘোষের আত্মগোপন করবার প্রয়োজন হয়। এগিয়ে আসেন ননীবালা দেবী।
তিনি ছিলেন বিপ্লবী অমর চ্যাটার্জির পিসীমা। অমর চ্যাটার্জির মাধ্যমে তিনি বিপ্লবী দলে যোগ দেন। তিনি ছিলেন বিধবা এবং বিপ্লবীদের প্রয়োজনে তিনি পরিবারকে ছেড়ে বিপ্লবীদের আশ্রয় দেবার জন্য বার হয়ে আসেন।
প্রথমে তিনি রিষড়ায় এক বাগানবাড়ি ভাড়া নিয়ে গৃহকর্ত্রী সেজে দুইমাস বিপ্লবীদের সঙ্গে থাকেন। এসময়ে বিপ্লবী রামচন্দ্র মজুমদার গ্রেফতার হন। গ্রেফতারের সময় তিনি একটি মসার পিস্তল লুকিয়ে রেখে যান, যার সন্ধান তিনি তাঁর দলের লোকদের দিয়ে যেতে পারেন নি। তখন ননীবালা দেবী রামচন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী সেজে জেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করে সেই পিস্তলটির সন্ধান জেনে আসেন।
সেই সময়ের প্রেক্ষিতে একজন বিধবা নারীর পক্ষে অপরিচিত লোকের স্ত্রী পরিচয়ে দিয়ে, পুলিশের দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে এভাবে বিপ্লবীদের সহায়তা করা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এরপর পুলিশ রিষড়ায় বিপ্লবীদের সন্ধান পেলে বিপ্লবীরা ১৯১৫-এর সেপ্টেম্বর মাসে চন্দননগরে পালিয়ে যান। এখানেও তাঁদের বাড়িভাড়া নেবার জন্য প্রয়োজন হয় ননীবালা দেবীর সহায়তার, কারণ একজন নারীর উপস্থিতি ভিন্ন বাড়ি ভাড়া নেওয়া সম্ভবপর হতো না।
বিপ্লবীরা দিনে ননীবালা দেবীর আশ্রয়ে থাকতেন এবং রাতের অন্ধকারে বের হয়ে যেতেন। পর্যায়ক্রমে চন্দননগরে বিপ্লবীদের এই কার্যক্রমের দিকেও পুলিশের নজর পরে। বিপ্লবীরা চন্দননগর ত্যাগ করলে ননীবালা তাঁর এক বাল্যবন্ধুর দাদার সঙ্গে পেশোয়ারে চলে যান। প্রায় ষোল সতেরো দিন পরে পুলিশ তাঁকে পেশোয়ার থেকে গ্রেফতার করে। তাঁকে প্রথমে নেয়া হয় পেশোয়ার জেলে, সেখান থেকে তাঁকে কাশী জেলে স্থানান্তর করা হয়।
এখানে বিপ্লবীদের সম্পর্কে তথ্য জানার জন্য কাশীর ডেপুটি পুলিশ-সুপারিনটেন্ডেন্ট প্রতিদিন তাঁকে জেরা করতেন, তথ্য আদায়ের জন্য নানা ধরনের নির্যাতন তাঁর উপর করা হয় এমনকি মাটির নীচের পানিশমেন্ট সেলে (সম্পূর্ণ বদ্ধ একটি ঘর, যেখানে কোনো আলো-বাতাস প্রবেশ করে না) তাঁকে প্রতিদিন আধঘণ্টা করে আটকে রাখা হতো। এরপরেও ননীবালা দেবী বিপ্লবীদের সম্পর্কে কোন তথ্য পুলিশকে দেন নি। এরপর তাঁকে কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেলে নিয়ে আসা হয় এখানে তিনি টানা ২০ দিন অনশন করেন।
ননীবালা দেবীকে ১৯১৮ সনের ৩নং রেগুলেশনে স্টেট প্রিজনার করে রাখা হয় কলকাতা জেলে এবং তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের একমাত্র মহিলা স্টেট প্রিজনার। ১৮১৯ সালে তিনি মুক্তি পান তবে তাঁর পরিবার তাঁকে গ্রহণ করে নি। পরবর্তীতে তিনি বিপ্লবীদের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কিনা সে সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায় না।
ভারত-জার্মান পরিকল্পনায় বিপ্লবীদের আশ্রয়দানের সঙ্গে জড়িত থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন সিন্ধুবালা ঘোষ। তাঁর স্বামী দেবেন ঘোষ ছিলেন তিলজলা রেলওয়ে কেবিনের কেরানি। ১৯১৭-এ স্বামীর সহযোগিতায় তিনি রেল কোয়ার্টারে যুগান্তর দলের আত্মগোপন করা বিপ্লবী ভুপেন্দ্রকুমার দত্ত, কুন্তল চক্রবর্তী ও অমর চ্যাটার্জিকে আশ্রয় দেন। পুলিশ খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছাবার আগেই বিপ্লবীরা সরে যায়।
পুলিশ সিন্ধুবালা ঘোষের স্বামী দেবেন ঘোষকে গ্রেফতার করে। সিন্ধুবালা ঘোষ তখন ছিলেন বাকুড়া জেলার ইন্দাস গ্রামে। পুলিশ সেই গ্রামে যায়। সেখানে দুজন সিন্ধুবালার সন্ধান পেলে পুলিশ দু’জনকেই গ্রেফতার করে।
দেবেন ঘোষের স্ত্রী সিন্ধুবালা তখন আসন্নপ্রসবা, সেই অবস্থায় পুলিশ তাঁকে হাঁটিয়ে ইন্দাস গ্রাম থেকে বাকুড়া রেল স্টেশন পর্যন্ত নিয়ে আসে এবং বাকুড়া জেলে বন্দী করে রাখে। সেই বছর হুগলিতে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক কংগ্রেস অধিবেশনে সভাপতি অখিলচন্দ্র দত্ত এই বর্বর ঘটনার তীব্র পতিবাদ করেন এবং আসন্নপ্রসবা হবার কারণে তাঁকে মাসখানের পরে মুক্তি দেয়া হয়।
এই পর্বে আরো একজন নারীর সন্ধান পাওয়া যায়, তিনি ময়মনসিংহের ক্ষীরোদা সুন্দরী চৌধুরী। তিনি ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী ক্ষিতীশ চৌধুরীর জেঠীমা। ময়মনসিংহের বিপ্লবী নেতা সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ এবং ক্ষিতীশ চৌধুরীর মাধ্যমে তিনি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পরেন। ১৯১৬-এর জুন মাসে কলকাতার গোয়েন্দা পুলিশের ডেপুটি পুলিশ-সুপারিনটেন্ডেন্ট বসন্ত চৌধুরীর হত্যার পর গ্রেফতারী পরোয়ানা বের হয় সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ এবং ক্ষিতীশ চৌধুরীর নামে।
বিপ্লবীরা এসময়ে ময়মনসিংহে একটি বাড়ি ভাড়া করে আত্মগোপন করে। সেখানে বিধবা ক্ষিরোদাসুন্দরী বিপ্লবীদের মা সেজে বাড়ির গৃহকর্ত্রীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। পুলিশের নজর এড়াতে এরপর বিপ্লবীরা যান নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ এবং তারপর জামালপুর।
ক্ষিরোদাসুন্দরী তাদের সাথেই ছিলেন। জামালপুরে দেড়মাস থাকার পর বিপ্লবীরা আশ্রয় নেন সিরাজগঞ্জে। সেখানেও ক্ষিরোদাসুন্দরী বিপ্লবীদের অসুস্থ মায়ের ভূমিকায় থাকেন। এখান থেকে বিপ্লবীরা তিনমাস পর তাঁকে নিয়ে চলে যায় আসামের ধুবড়ীতে এবং সেখান থেকে তাঁরা চলে যান আসামের বিন্নাখাতা গ্রামে।
দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে পরিবারের লোকজন তাঁর খোঁজ করতে শুরু করে। এসময়ে নিরাপত্তার কারণে বিপ্লবীরা প্রথমে তাঁকে কাশীতে পাঠিয়ে দেয়, সেখান থেকে তিনি তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহের খাড়ুয়া গ্রামে চলে যান।
পুলিশ প্রথমে তাঁকে সন্দেহ করলেও ধরতে পারে নি, কারণ তিনি কাশীতে থাকাকালীন দলের পরামর্শমত সেখানে বাড়িতে নিজের নাম ঠিকানা লিখে আসায় পুলিশের সন্দেহ করার অবকাশ না থাকায় তিনি গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হন। ১
এই পর্যায়ে বিপ্লববাদকে কেন্দ্র করে যেমন বাংলার প্রথম মহিলা রাজবন্দী হলেন ননীবালা দেবী, তেমনিভাবে এইপর্যায়ে ভারতের অস্ত্র আইনে দণ্ডিত প্রথম নারী হলেন দুকড়িবালা দেবী। ১৯১৪ সালের আগস্ট মাসে কলকাতার বন্দুক ব্যবসায়ী রডা কোম্পানীর আমদানী করা অস্ত্রবোঝাই জাহাজে ছিল জার্মানীর তৈরি করা মসার বা মাউজার পিস্তল।
জাহাজ থেকে মাল কলকাতায় আনার পথে পঞ্চাশটি পিস্তল এবং পঞ্চাশ হাজার গুলিবোঝাই বাক্স রাস্তা থেকে নেই হয়ে যায়। আত্মোন্নতি সমিতির নেতা অনুকুলচন্দ্র মুখার্জী, বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী, শ্রীশচন্দ্র মিত্র প্রমুখ নেতাদের পরিকল্পনা অনুসারে অতুল নামে এক বিপ্লবী (মতান্তরে যুগান্তর দলের বিপ্লবী হরিদাস দত্ত) গাড়ির গাড়োয়ান সেজে অস্ত্রসহ গাড়িটি আত্মোন্নতি সমিতির আড্ডায় নিয়ে আসেন।
নেতারা এইসব অস্ত্র বিভিন্ন বিপ্লবী গোষ্ঠীকে ভাগ করে দেন। এরই সাতটি পিস্তল ও কিছু কার্তুজ লুকিয়ে রাখার দায়িত্ব পান যুগান্তর দলের বিপ্লবী নিবারণ ঘটক। দুকড়িবালা দেবী ছিলেন নিবারণ ঘটকের মাসীমা। দুকড়িবালা দেবী প্রথম স্বাদেশীকতার মন্ত্রে দীক্ষা পান তার স্বামীর কাছে। ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের সময় তাঁর স্বামী তাঁকে স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহারে প্রতিজ্ঞা করান। তাঁর ভাষ্যে
আমার স্বামী তখন আসানসোলে রেলওয়ে টেলিগ্রাফি চাকরি করিতেন। ২রা কার্তিক তিনি কর্মস্থলে চলে যান। পৌষ কিংবা মাঘ মাসে তিনি কাজে ইস্তফা দিয়ে নিজে কিছু অসুস্থ হয়ে বাড়ি ফিড়ে আসেন এবং এসেই আমার বিলাতি কাপড়ের বাক্সের উপর নজর দেন এবং কয়খানি শান্তিপুরী শাড়ি ছাড়া ১০/১২ শাড়ি নিয়ে তাহা পোড়াইবার বন্দোবস্ত করেন।…
আমার পূজনীয়া শাশুড়িঠাকুরাণী ও মাতাঠাকুরানী এবং পিসিমাতা ঠাকুরানী সকলের অনুরোধে তিনি নিরন্ত হন। কিন্তু গোপনে তাঁর পা ছুঁয়ে দিব্যি করান যে জীবনে কখনও বিলাতি জিনিষ ব্যবহার করিব না। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন কাহার কাছে প্রতিজ্ঞা করিলে? আমি উত্তরে বলি আমার দেবতার কাছে, মৃত্যু পর্যন্ত একথা ভুলিব না। এই আমার স্বদেশী মন্ত্রে দীক্ষা।
এরপর তিনি নিবারণ ঘটকের মাধ্যমে বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহী হন। তাঁর বক্তব্য অনুসারে, “নিবারণের সমস্ত কথা শুনে আমার প্রাণেও দেশের কাজের জন্য একটা যেন সাড়া জেগে উঠলো।
নিবারণ কাজের গুরুত্ব বুঝিয়ে বলল, জেল ফাঁসি সংসার ত্যাগ-এগুলোর জন্য প্রস্তুত হতে হবে, পারবে কি? আমার অদম্য উন্মাদনায় আমি নিজ হাতে কাজের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়িলাম।” তিনি নিবারণ ঘটকের মাসীমা হিসেবে বিপ্লবী মহলেও মাসীমা নামে পরিচিত ছিলেন। বিপ্লবী বিপীন গাঙ্গুলী এবং জ্যোতিষচন্দ্র ঘোষের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল।
জ্যোতিষচন্দ্র ঘোষের লেখা গীতার ব্যাখ্যা দলের সদস্যদের মধ্যে বিলি করবার জন্য নকল করবার দায়িত্ব নিয়েছিলেন দুকড়িবালা। ১৯১৬-তে নিবারণ ঘটক অস্ত্র লুকিয়ে রাখার দায়িত্ব পেলে তা তাঁর মাসী দুকড়িবালার কাছে বীরভূমের নলহাটি থানার ঝাউপাড়া গ্রামে লুকিয়ে রাখেন। দুকড়িবালা অস্ত্রগুলি দুটি ট্রাঙ্কে লুকিয়ে রাখেন।
১৯১৭ সালের জানুয়ারিতে পুলিশ তথ্য পায় বীরভূমের ঝাউপাড়ায় বিপ্লবীদের ছিনতাই করা অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। পুলিশ দুকড়িবালার বাড়ি ঘিরে ফেললে তিনি অস্ত্র সহ ট্রাঙ্ক তার প্রতিবেশী সুরধনী মোল্লানীর বাড়ি রেখে আসেন।
পুলিশ দুকড়িবালার বাড়ি তল্লাশী করে কিছু না পেয়ে ফিরে যাচ্ছিল এমন সময় কেউ একজন অস্ত্রের অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য পুলিশকে জানিয়ে দেয়। পুলিশ সেখানে তল্লাশী করে এবং অস্ত্রের সন্ধান পায় এবং পরবর্তী ঘটনার বর্ণনা দুকড়িবালা দিয়েছেন আমার ডাক পড়িল সুরধনীর বাড়িতে।
আমি বলিলাম আমি রেখেছি। কি আছে বাক্স দুটিই রাখিলেন? বলিলাম বাক্স আমার নয় নিবারণের বন্ধু সিউড়ির সাবজজের ছেলে তার মা মারা গেছে)-র গয়না ও দামী শাড়ি আছে বলে রেখে গেছিলো। সে কোথা? বলিলাম তার যক্ষ্মা হয়েছে সে মধুপুরে গেছে। আপনার কাছে কে রেখে গেছে? বলিলাম নিবারণ ও অবনী দুজনেই এসেছিল।
চাবি দেন। চাবি আমার কাছে নেই, পরের চাবি আমার কাছে রাখিব কেন? বা ভাঙ্গা হলো পিস্তল ৭টি পাওয়া গেলো এবং কার্টিজ ১২০০র কম। … পিস্তলের বাক্স কার্টিজ ও আমাকে ও সুরধনীকে সঙ্গে করে পুলিশ চলে গেলো রামপুরহাটে সাবজেলে, কিছুদিন থেকে সিউড়ির গেলাম।
স্পেশাল ট্রাইবুনালের বিচারে দুকড়িবালা ও নিবারণচন্দ্র ঘটকের শাস্তি হয়। রাজসাক্ষী হবার কারণে সুরধনী বেকসুর খালাস পান। দুকড়িবালার জেল হয় দু বছরের জন্য। রামপুরহাট ও সিউড়ির পর তাঁকে আনা হয় প্রেসিডেন্সী জেলে।
যেহেতু তাঁকে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল অতএব জেলে তাঁকে কঠিন পরিশ্রম করতে হতো। এই সময়ে রাজবন্দী হিসেবে প্রেসিডেন্সি জেলে আসেন ননীবালা দেবী। তিনি ব্রাহ্মণের রান্না ছাড়া খাবেন না এই দাবীতে অনশন শুরু করেন এবং ২০ দিন পর জেল কর্তৃপক্ষ ঐ কাজের দায়িত্ব অর্পণ করেন দুকড়িবালা দেবীকে ।
কারামুক্তির পর তিনি জাতীয় কংগ্রেসের সদস্যপদ গ্রহণ করেন। কংগ্রেসের কাজকর্মের সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন। তিনি জেল থেকে মুক্ত হবার কিছুদিন পরে তার স্বামী দ্বিতীয়বার বিয়ে করলে তিনি স্বামীগৃহ ত্যাগ করে পৈত্রিক বাড়িতে বসবাস শুরু করেন।
২ এপর্যায়ের অন্যান্য বিপ্লবী নারীদের বিশেষত ননীবালা দেবীকে যেমন দেখা যায় কারা পরবর্তী জীবনে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত, বিপরীতে দুকড়িবালা দেবী পরবর্তীকালে কংগ্রেস কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হন। পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে বিপ্লবী জীবনে প্রবেশ করলেও এর ফলে দুজনকেই পারিবারিক নিগ্রহের শিকার হতে হয়, কাজেই বলা যায় বিপ্লবী কর্মকাণ্ড যেমন সমাজের চলমান স্রোতের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, তেমনি এতে সম্পৃক্ত নারীদের সংখ্যা ছিল সীমিত এবং সমাজে অনাকাঙ্খিত।
ভারত-জার্মান পরিকল্পার সঙ্গে যুক্ত বিপ্লবীদের সহায়ক আরেকজন নারীর সন্ধান পাওয়া যায় নোয়াখালীতে। তাঁর নাম সুশীলা মিত্র। তিনি নোয়াখালীর গাবুয়া গ্রামের কুমুদিনীকান্ত মিত্রের স্ত্রী ছিলেন।
তাঁর দুই দেবর সত্যেন বসু ও শচীন বসু যুগান্তর দলের সদস্য ছিলেন, তাদের সূত্রে তিনি এই বিপ্লবীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। তাঁর বাড়িতে বিপ্লবীদের একটি আড্ডা ছিল এবং তিনি তাঁদের দেওয়া বিভিন্ন নিষিদ্ধ জিনিষপত্র লুকিয়ে রাখতেন। ১৩০ দুকড়িবালা দেবীর মত তিনিও পরবর্তীকালে কংগ্রেসের সদস্য হয়ে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন।
তবে এদের বিস্তারিত পরিচয় বা কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না, যা জানা যায় তা হচ্ছে দুর্গামনি পাইন ছিলেন হাটুরিয়ার নিশি পাইনের মা এবং তিনি ঢাকায় স্বগৃহে বন্দী ছিলেন।
বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী সময়ে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের ব্যপকতা বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে সাধারণ মহিলাদের এই কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্তা একেবারে সীমিত আকারে হলেও লক্ষণীয়, যদিও এই মহিলারা সকলেই ছিলেন কোন না কোনভাবে বিপ্লবীদের পরিবারভুক্ত। যেহেতু বিপ্লবী দলগুলি তাদের কার্যক্রম প্রকাশ্যে চালাতো না এবং সাধারণভাবে সমাজের কাছে বিপ্লবীদের কার্যক্রম ছিল নিষিদ্ধ অতএব মহিলাদের এক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করবার যে প্রচেষ্টা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী বিদেশী পণ্য বয়কট ও স্বদেশী পণ্যের প্রসার আন্দোলনে দেখা যায় বিপ্লববাদে তা দেখা যায় না ।
সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে যে, মুসলমান সমাজ বঙ্গভঙ্গের সপক্ষে অবস্থানগ্রহণ করেছিল এবং বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনে তাদের সংযোগ ছিল না বরং তারা ছিল এর বিরোধী। এর প্রমাণ হিসেবে ঐতিহাসিকরা উপস্থাপন করেন ১৯০৬-এ মুসলিম লীগ এর প্রতিষ্ঠাকে।
মূলত উপনিবেশিক শাসকবর্গের বাঙালিদের ঐক্যে ফাটল তৈরির নীতি অনুসারে কার্জন-ফুলার মহল বঙ্গভঙ্গের প্রথম থেকেই পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের মনে হিন্দু বিদ্বেষ সঞ্চারে সচেষ্ট হন। তারা প্রচার করতে থাকে পূর্ববঙ্গে হিন্দুরা সংখ্যালঘিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষা, চাকুরী, ব্যবসাসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রাধান্য বিস্তার করছে, বঙ্গভঙ্গের ফলে সে সুবিধা চলে আসবে মুসলমানদের হাতে।
অতএব হিন্দুদের স্বার্থানুকূল স্বদেশী আন্দোলন সমর্থন করা থেকে মুসলিমদের বিরত থাকা উচিত। বৃটিশদের এই অপপ্রচারের পাশাপাশি ঐতিহাসিকরা মুসলমানদের এই আন্দোলনে জড়িত না হবার অপর একটি কারণ উল্লেখ করেন, “রাজনীতির আবরণে হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবন যেখানে লক্ষ্য, কালী-ভবানীর আরাধনা ও শীবাজী-উৎসব যে-আন্দোলনের প্রাণ, গীতার আদর্শে ধর্মরাজ্য সংস্থাপনের প্রয়াস যেখানে সুস্পষ্ট, সেই আন্দোলনে মুসলমান সম্প্রদায়ের সহানুভূতি ও সহযোগিতা একরূপ অসম্ভৰ ।
বাঙালি সাধারণ মুসলিমসমাজের একাংশ যেমন বঙ্গভঙ্গের সমর্থক ছিল, বিপরীতে বঙ্গভঙ্গের বিপক্ষে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে সামান্য হলেও মুসলানদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ১৯০৪-এর ফেব্রুয়ারিতে কলকাতায় সেন্ট্রাল মহামেডান এসোসিয়েশন একটি সভা করে যেখানে বাংলার মুসলিম নেতৃবৃন্দ প্রায় সকলেই উপস্থিত ছিলেন।
বরিশালের জমিদার মীর মোতাহার হোসেন, চট্টগ্রামের প্রভাবশালী নেতা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, দ্যা মুসলিম ক্রনিকল পত্রিকার সম্পাদক আব্দুল হামিদের উপস্থিতিতে সৈয়দ আমির হুসানির মাধ্যমে এই সভা বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতা করে সরকারের কাছে প্রতিবাদলিপি প্রেরণ করে।
১৯০৫-এর ২৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার রাজাবাজারে আবদুল রসুলের সভাপতিত্বে কলকাতার মুসলিম নাগরিকদের এক সম্মেলন থেকে বয়কট আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানানো হয়।
এর পূর্বে ৭ আগস্ট, ১৯০৫ কলকাতার টাউন হলে ও ময়দানে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী যে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়, তাতে মুসলিমরা যোগদান করে, পাশাপাশি দেখা যায় ঐদিন দুপুরে কলকাতার কলেজ স্কোয়ার থেকে ছাত্রদের যে মিছিল বের হয় তাতে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে কলকাতা মাদ্রাসার মুসলমান ছাত্ররাও উপস্থিত ছিল। পূর্ববঙ্গেও মুসলমানদের মধ্যে বঙ্গবঙ্গ-এর প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
১৯০৫-এর ২৭ আগস্ট ঢাকার জগন্নাথ কলেজের মাঠে আনন্দ চন্দ্র রায়ের সভাপতিত্বে যে প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয় তাতে আবদুল হালিম গজনভী বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ও বয়কটের সমর্থনে বক্তব্য রাখেন। ১৯০৬-এর এপ্রিল মাসে বরিশালে যে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সেই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন ব্যারিস্টার আবদুল রসুল। তিনি সভাপতির ভাষণে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলেন
কোনো কোনো মুসলমান নেতা দলস্থ মুসলমানদের মধ্যে প্রচার করছেন যে, ইহা একটি হিন্দু আন্দোলন ও সেই কারণে ‘ডিস্লয়্যাল্’। আমি বলি, নেতাদের বাক্য অভ্রান্ত সত্য বলে মেনে না নিয়ে যদি তারা নিজেদের মনে একটু চিন্তা করে দেখে তাহলেই বুঝতে পারবে যে, হিন্দুগণ অপেক্ষা এই আন্দোলনে মুসলমানদের উপকার হচ্ছে বেশি।
কোনো মুসলমান একথা কি অস্বীকার করতে পারবে যে, স্বদেশী আন্দোলনে দেশের বয়ন শিল্পের যে উন্নতি হয়েছে, তাতে মুসলমান তাঁতিগণ উপকৃত হচ্ছে না? একথা কি কেউ অস্বীকার করতে পারবে যে কলিকাতার বহু দরিদ্র মুসলমান পরিবার, যারা এতদিন অনাহারে মারা পড়ছিল, তারা এক্ষণে বিড়ি শিল্পের উন্নয়নে ভালভাবে জীবিকা উপায় করছেন না?
আরেকটি বিশেষ ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। ২০ মে ১৯০৬, বরিশাল শহরে হিন্দু-মুসলমান জনতার এক যৌথ মিছিল বের হয়। এটি পরিচালনা করেন অশ্বীনীকুমার দত্ত, ব্যরিস্টার মোতাহার হোসেন, চরমুদ্দের জমিদার চৌধুরী ইসমাইল খাঁ ও মহম্মদ আসুফ এবং এই মিছিলে বন্দেমাতরম ধ্বনির পাশাপাশি আল্লা-হো- আকবর ধ্বনিও দেয়া হয় ।
অনেক মুসলমান লেখকরাও স্বদেশী আন্দোলনের পক্ষে তাদের বক্তব্য প্রকাশ করেন। আশ্বিন ১৩১২-তে নবনুর-এর তৃতীয় বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যায় মৌলভী একিন্উদ্দীন আহমদ লেখেন
লাট সাহেব ইঙ্গিত ইসারায় বলিয়াছেন যে, নতুন বাঙ্গালা প্রদেশের মুসলমান অধিবাসীর সংখ্যা বেশী হইবে; তাহাতে কিন্তু মুসলমানগণ সম্ভষ্ট নহে। মুসলমানগণ একমত হইয়া লাট বাহাদুরের এই প্রস্তাবের প্রতিবাদ করিতেছে।
দেশের শিক্ষার ভার ইন্ডিয়া গবর্ণমেন্ট নিজ হাতে লইয়াছেন। যে উদারনীতি লর্ড মেকলে, মেটকাফ ও ক্যানিং প্রবর্তন করিয়া গিয়াছেন, তাহার সুফল আমরা চারিদিকের উন্নতিতেই দেখিতে পাইতেছি। লাট সাহেবের নূতন ব্যবস্থা সে উদার উন্নতি-বিধায়িনী শিক্ষার মূলে কুঠারাঘাত করিয়াছে।
… দেশের যে সামান্য উন্নতি এখন আমরা দেখিতে পাইতেছি, তাহার প্রধান কারণ কলিকাতা মহানগরীর জ্ঞানী লোকগণের সমবেত চেষ্টা। গবর্নমেন্ট নতুন প্রদেশ সংস্থাপিত করিয়া এই উন্নতির মূলে কুঠারাঘাত করিতে যাইতেছেন।
অধুনা কলিকাতা ইউনিভার্সিটিতে যে সমস্ত কঠোর আইন প্রবর্তন হইয়াছে, শিক্ষা সম্বন্ধে গবর্ণমেন্ট যে সমস্ত কঠোর নিয়ম প্রণয়ন করিয়াছেন তাহাতে এতদ্দেশবাসী মুসলমানগণের শিক্ষালাভ করা অতীব কঠিন হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
মুসলমানগণ নূতন প্রদেশে সংখ্যায় বেশি হইলে কি উপকার হইবে? যদি তাহাদের অত্যাবশ্যক শিক্ষার পথই বন্ধ হয়, যদি তাহাদের উন্নতির আশা তিরোহিত হয়, তাহা হইলে কাঠ ও জলবাহকরূপী লোকের সংখ্যার বেশী করিয়া গবর্নমেন্ট মুসলমানগণের কি উপকার ও উন্নতি করিবেন
অৰ্চ্চনা, তৃতীয় বর্ষ, বৈশাখ ১৩১৩ সংখ্যায় মৌলভী আব্দুল করিম মুসলমানদের উদ্দেশ্যে লেখেন ইংরেজের ভেদনীতি আপাত মনোরম মাকাল ফল বই আর কিছুই নহে। উহার বাহ্য চাকচিক্যে মুগ্ধ হইয়া মুসলমানগণ যতই নাচিতেছেন, তঁতই যে তাহারা প্রতারিত হইতেছেন, তাহা আজও তাঁহারা বুঝিয়া উঠিতে পারেন নাই।
ইংরেজী শিক্ষার প্রবর্তন যুগে কাফেরী ভাষা অপাঠ্য ইত্যাদী হেতু দেখাইয়া আমাদের মৌলবী সাহেবগণ মুসলমানদিগকে উহা অধ্যয়নে বিরত করেন। তাহার ফলে আজ মুসলমানগণ মস্তিষ্ক ও মানসিক বলে সমান বলশালী হইয়াও হিন্দুর কত পশ্চাতে পড়িয়া গিয়াছেন।
বর্ত্তমান ক্ষেত্রেও আমরা যদি উদাসীন থাকি, তবে আমাদের সেইরূপ দুর্দশাই হইবে :- ব্যবসায় বাণিজ্যেও আমরা অধঃপতিত হইব।। স্বদেশীয় দ্রব্যাদির ব্যবহার প্রচলিত হইলে দেশে বহুবিধ কলকারখানার প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন হইবে। যদি সেরূপ শভদিন ঘটে, তাহাতে মুসলমানেরই বিশেষ সুবিধা ও লাভের সম্ভাবনা হইবে। অতএব আংস ভাই! সকলে মিলিয়া সমস্বরে সোণার বাদালার জয়গাও গাহিয়া জাবন সাধক কার। এস হিন্দু মুসলমানে মিলিয়া একপ্রানে সমস্বরে গাহি ‘বন্দে মাতরম্’ :
১৯০৬-এ কলকাতা কংগ্রেসে বঙ্গভঙ্গের নিন্দা করে প্রস্তাব আনেন ঢাকার নবাব পরিবারের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব খাজা আতিকুল্লা। মৌলবী লিয়াকত হোসেন, আবদুল কাশেম, আবদুল গফুর সিদ্দিকি, আবুল হোসেন, দীন মোহাম্মদ, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, দেদার বক্স প্রমুখ মুসলিম নেতা স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনে অংশ নেন । ১০০
কাজেই বলা যায় মুসলানদের একাংশ বঙ্গভঙ্গের নেপথ্যে বৃটিশ প্রসাশনের ষড়যন্ত্রমূলক দিকটি উপলব্ধি করেছিল এবং এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। বাঙলার মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি লক্ষণীয়, তা হলো বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে তাদের মনে উপনিবেশবিরোধী মনোভাব সৃষ্টি হলেও প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের মতো তারা তাদের মহিলাদের সচেতন করবার জন্য কোন কার্যকর পন্থা গ্রহণ করে নি বা সে সম্পর্কে সচেতনও ছিল না।
কারণ হিসেবে বলা যায় উনিশ শতকের সংস্কার আন্দোলনের পর্যায়ে স্ত্রী-শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের ফলে হিন্দু নারীদের সামাজিকায়নের ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল, মুসলমানদের ক্ষেত্রে তা ছিল অনুপস্থিত। ফলে উনিশ শতকের শেষার্ধে উপনিবেশিকতার বিপরীতে জাতীয়তাবাদী চেতনার যে উত্থান দেখা যায় তা হিন্দু নারীদের যতটা প্রভাবিত করে মুসলিম নারীদের তা করে নি।
মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত যে ব্যক্তিত্ব তিনি বেগম রোকেয়া। যে বছর বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হয়, সেই ১৯০৫-এ, বেগম রোকেয়া রচনা করেন Sultana’s Dream এবং সে বছরেই রচনাটি সরোজিনী নাইডু সম্পাদিত ইন্ডিয়ান লেডিজ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়।
১১ বেগম রোকেয়ার এই পর্যায়ের লেখনীসমূহ ছিল মহিলাদের বিশেষত মুসলিম মহিলাদের অশিক্ষা-কুশিক্ষা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, অন্যায় অবরোধ ও পর্দাপ্রথার বিরুদ্ধে। বেগম রোকেয়ার স্বাদেশিকতার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় পরবর্তীকালের (১৯২০ পরবর্তী) লেখনী ও কর্মকাণ্ডে।
বঙ্গভঙ্গ পর্বে তাঁর লেখনীতে বাঙালি মুসলিম নারীদের স্বাদেশিকতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করবার প্রয়াস দেখা যায় না। এর কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে মুসলিম নারীদের তৎকালীন সামাজিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে নারীদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা বিকাশের পরিবর্তে নারীর সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন বিষয়টি তাঁর নিকট অধিক গুরুত্ববহ হয়ে দেখা দিয়েছিল।
তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি সম্পূর্ণভাবে জাতীয়তাবোধ বা রাজনৈতিক সচেতনতার বাইরে ছিলেন সেটি বলা চলে না। ১৯০৪ সালে প্রকাশিত নিরিহ বাঙালি -তে বাঙালি জাতির হীন অবস্থার কারণ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন
আমরা অন্নোৎপাদনের চেষ্টা না করিয়া অর্থ উৎপাদনে স্বচেষ্ট আছি। আমাদের অর্থের অভাব নাই, সুতরাং অন্নকষ্টও হইবে না। দরিদ্র হতভাগা সব অন্নাভাবে মরে মরুক, তা’তে আমাদের কি? আমরা আরও অনেক প্রকার সহজ কার্য্য নির্ব্বাহ করিয়া থাকি। যথা:
(১) রাজ্য স্থাপন অপেক্ষা ‘রাজা’ উপাধি লাভ সহজ।
(২) শিল্প কার্যে পারদর্শী হওয়া অপেক্ষা ই ঝপ ও উ.ঝপ পাশ করা সহজ।
(৩) অল্পবিস্তর অর্থব্যায়ে দেশের কোন মহৎ কাৰ্য্য দ্বারা খ্যাতিলাভ করা অপেক্ষা “খা বাহাদুর” বা “রায় বাহাদুর” উপাধিলাভের জন্য অর্থ ব্যয় করা সহজ।
(৪) প্রতিবেশী দরিদ্রদের শোকে দুঃখে ব্যথিত হওয়া অপেক্ষা বিদেশীয় বড় লোকেদের মৃত্যুদুঃখে “শোক সভার” সভ্য হওয়া সহজ।
(৫) দেশের দুর্ভিক্ষ নিবারণের জন্য পরিশ্রম করা অপেক্ষা আমেরিকার নিকট ভিক্ষা গ্রহণ করা সহজ।
(৬) স্বাস্থ্যরক্ষায় যত্নবান হওয়া অপেক্ষা স্বাস্থ্য নষ্ট করিয়া ঔষধ ও ডাক্তারের হস্তে জীবন সমর্পণ করা সহজ।
(৭) স্বাস্থ্যের উন্নতি দ্বারা মুখশ্রীর প্রফুল্পতা ও সৌন্দর্য্য বর্ধন করা (অর্থাৎ healthy & cheerful হওয়া) অপেক্ষা (তক্ষগণ্ডে!) কালিডোর, মিল্ক অন্ত রোজ ও ভিনোলিয়া পাউডার (kalydore, milk of rose & vinolia powder) মাখিয়া সুন্দর হইতে চেষ্টা করা সহজ। কাহারও নিকট প্রহারলাভ করিয়া তৎক্ষনাৎ বাহুবলে প্রতিশোধ লওয়া অপেক্ষা মানহানির মোকদ্দমা করা সহজ ইত্যাদি। এই লেখার মধ্যদিয়ে তিনি বাঙালিকে তাদের দেনাদন জাবনের হানমন্যতা কাটিয়ে উঠে আত্মসচেতন হবার
পরামর্শ দিয়েছেন। আর এভাবেই তিনি তাঁর দেশাত্ববোধ প্রকাশ করেছেন। ১৯০৮-এ বৃটিশবিরোধী বিপ্লবী কানাইলালের ফাঁসি হলে বেগম রোকেয়া তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন নিরুপম বীর কবিতায়।
১০০ তবে এই পর্যায়ে বয়কট আন্দোলন বা স্বদেশী কর্মকাণ্ডে বেগম রোকেয়ার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায় না। বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে যে অগ্রণী দল স্বদেশী আন্দোলনের স্বপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে মহিলাদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় না একটি ব্যতিক্রম ব্যতীত। এক্ষেত্রে যে নামটি একমাত্র হিসেবে পাওয়া যায় সেটি খায়রুন্নেসা খাতুন-এর।
সময়কালে তিনি বেগম রোকেয়ার প্রায় সমসাময়িক। তাঁর জন্মসাল ১৮৭৪-১৮৭৬ এর মধ্যে ১০৪ নবনূর পত্রিকায় খয়ের খাহ্ মুনসী ছদ্মনামে তিনি একাধিক রাজনৈতিক প্রবন্ধ লেখেন এবং সরাসরি বৃটিশবিরোধী ভূমিকা অবলম্বন করেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিম নারী হিসেবে তিনিই প্রথম মুসলমানদের স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে বলেন
মুসলমানগণ একযুগ ধরিয়া গবর্ণমেন্টের কৃপাভিখারী হইয়া রাজনৈতিক আন্দোলনে বিরত ছিলেন। কিন্তু তাহাতে কি ফল লাভ হইয়াছে? মুসলমানগণ এই দীর্ঘকালমধ্যে কোন অধিকার কোন স্বত্বলাভ করিতে সমর্থ হইয়াছে? মুসলমানগণের অবনতি চরমে উঠিয়াছে।
এখন আর বাকবিতণ্ডার সময় নাই। প্রকৃত কার্যের সময় আসিয়াছে; সর্ববিষয়ে উন্নতি সাধন জন্য যত্নশীল হইতে হইবে। সমাজ শরীরের একাঙ্গ অপুষ্ট রাখিয়া অন্যান্য অঙ্গের পুষ্টিসাধনের আশা সুদূর পরাহত। ফলতঃ রাজনৈতিক আন্দোলনেও যোগ দিতে হইবে। ১০৫
বঙ্গভঙ্গ-এর ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়ের উন্নয়ন ঘটবে বলে বৃটিশ সরকারের প্রচারণা যে ভ্রান্ত ও সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্য প্রণীত এ বিষয়টি মুসলমানদের মধ্যে যাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন খায়রুন্নেসা ছিলেন তাঁদের অন্যতম এবং উপনিবেশনিক শাসকের মানসিকতা বিশ্লেষণ করে তিনি বলে
গবর্ণমেন্টের নিকট হিন্দু মুসলমান উভয়েই বিজাতি, উভয়ের ক্ষমতা লাভই ইংরাজের সমান স্বার্থবিরোধী। ইংরাজের রাজনীতি শিক্ষিত মুসলমান সমাজে প্রকট হইয়া পড়িয়াছে। ইংরাজ গবর্ণমেন্টও বুঝিয়াছেন যে, শুধু ফাঁকা কথায় শিক্ষিত মুসলমানকে পরিতৃপ্ত রাখা সম্ভবপর নহে। ইহার ফলে ইংরাজের মুসলমানপ্রীতিতে ভাটা দেখা দিয়াছে।
লর্ড কার্জন ময়মনসিংহে গমন করিয়া তত্রত্য মুসলমান সভার রাজকার্য্য প্রার্থনার উত্তরে কর্কশ ভাষা প্রয়োগ করেন। ফলতঃ কি হিন্দু, কি মুসলমান সকলের পক্ষেই রাজনৈতিক আন্দোলন সমান প্রয়োজনীয়। এই জন্যই দেখা যাইতেছে যে, আজকাল হিন্দু মুসলমান পরস্পরের হাত ধরিয়া রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। ১০৬
বৃটিশবিরোধী অবস্থান গ্রহণের পাশাপাশি খায়রুন্নেসা নারীদের স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করবার জন্য নবনূর এই মহা আন্দোলনের সময় আমাদের চুপ করিয়া বসিয়া থাকা উচিৎ নয়। আমাদেরও সাধ্যমত চেষ্টা করা কর্তব্য। তাই বলিয়া আমি তোমাদিগকে বিরাট সভার আয়োজন করিতে বলিতেছি না, অথবা বক্তৃতার জন্য টাউন হলে ও রাস্তাঘাটে দণ্ডায়মান হইতে বলিতেছি না।
আমরা যদি ইচ্ছা করি তবে ঘরের একপার্শ্বে বসিয়াই পুরুষজাতির যথেষ্ট সাহায্য করিতে পারিব।….ভগ্নিগণ, আইস, আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়া বিদেশী শাড়ি পরিত্যাগ করি, বিলাতী বডিজ,সেমিজ ও মোজা ঘৃণার চক্ষে দেখি, লেভেন্ডারের পরিবর্তে আতর ও গোলাপ ব্যবহার করিতে শিখি এবং লেডি-সু পায়ে দিয়া হুচট্ খাওয়ার দায় হইতে নিষ্কৃতি পাই।
তবেই আমরা স্বদেশের অনেক উপকার করিতে পারিব। …… ভগ্নিগণ, তোমরা কি চেয়ে দেখ না যে আমরা একেবারে উৎসন্নে গিয়াছি। আমরা নির্ব্বোধ না হইলে সাত সমুদ্র পার হইতে বণিকগণ আমাদিগকে সামান্য জার্মান সিলভারের গহনা ও বেলোয়ারী চুড়ির দ্বারা প্রতারিত করিয়া জাহাজ ভরিয়া ভারতের ধন ও ধান্য লইয়া যাইতেছে আর আমরা মনে করিতেছি যে, বহুমূল্য দ্রব্য লাভ করিলাম।
এইসব কি আমাদের সর্ব্বনাশের কারণ নয়?…… তোমরা চিরনিদ্রায় নিদ্রিত থাকিলে এই দরিদ্র ভারতের আর উপায় নাই। এখন আমাদের ঘুম ভাঙিবার সময় হইয়াছে। এখনও চাহিয়া দেখিলে আমাদের চেষ্টায় অনেক কার্য হইবে, আশা করি । ১০৭
খায়রুন্নেসার জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণ করে গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ খায়রুন্নেসা খাতুনের এই রাজনৈতিক প্রবন্ধসমূহ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে, এমন কঠোর ও দ্ব্যার্থহীন ভাষায় লেখার দৃষ্টান্ত সমসাময়িক অনেক লেখকের লেখাতেও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
১৮ অসাম্প্রদায়িক এবং সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতিসচেতন মুসলিম নারী হিসেবে খায়রুন্নেসা বৃটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন তাঁর স্বদেশচেতনা মূলক লেখার মাধ্যমে, পাশাপাশি তিনি উনিশ শতকের শেষ দশক থেকে তিনি কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন শুরু হবার পর মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে অনেক মুসলিম নেতা কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন, কিন্তু খায়রুন্নেসা কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
১০৯ ১৯১০-এ অল্প বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে খায়রুন্নেসাকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখলে, সার্বিকভাবে বলা যায় বাঙালি মুসলিম মহিলাদের কেউই বিদেশী পণ্য বয়কট ও স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত হন নি তার কারণ প্রধানত মুসলিম সমাজের বৃহত্তর অংশের স্বদেশী আন্দোলনের বিরোধীতা এবং মুসলিম নারী সমাজের পশ্চাদপদ সামাজিক অবস্থান।
স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনের ফলে ১৯১১-তে বৃটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করলে কংগ্রেস পরিচালিত নিয়মতান্ত্রিক উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে ভাটা পরে এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমে ভাটা পরার কারণে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সাধারণ নারীদের উদ্বুদ্ধ করবার প্রচেষ্টাও মন্থর হয়ে পরে, এই সময়টি বরং বলা চলে নারীদের নিজেদের সংগঠিত হবার সময়।
এই পর্যায়ে বিভিন্ন নারী সংস্থা গঠিত হয় এবং তা শুধু বাংলায় নয়, দেখা যায় সর্বভারতীয় পর্যায়ে নারী সংস্থা স্থাপিত হয়। আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলায় এই সময়ে যে দুটি উল্লেখযোগ্য নারী সংস্থা দেখা যায় সেদুটি হচ্ছে বঙ্গ-মহিলা সমাজ এবং অঘোরকামিনী নারী সমিতি।
উল্লেখযোগ্য নারী সংস্থা দেখা যায় সেদুটি হচ্ছে বঙ্গ-মহিলা সমাজ এবং অঘোরকামিনী নারী সমিতি। অঘোরকামিনী নারী সমিতির লক্ষ্য ছিল মেয়েদের স্বাবলম্বী করে তোলা এর পাশাপাশি তাদের অসুস্থদের সেবা করতে এবং নিজেদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের কাজেও প্রশিক্ষণ দেয়া হতো।
সরলাদেবী চৌধুরানী ১৯১০ সালে গড়ে তোলেন ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল যার একটি শাখা স্থাপিত হয় কলকাতায়। এই সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল সকল নারীর জন্য অধিকার আদায়ের লক্ষে সমাজের সর্বস্তরের নারীদের একত্রিত করা এবং এর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গটি সর্বসমক্ষে নিয়ে আসা।
তবে সর্বভারতীয় পর্যায়ে প্রথম সার্থক সংগঠন হিসেবে যে প্রতিষ্ঠানটির নাম আসে সেটি ‘উইমেন্স ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন’। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ডরোথী জিনারাদেশা মার্গারেট কুজিন্স ও এ্যানি বেসান্ত। ১৯১৬-তে হোমরুল আন্দোলনের মাধ্যমে এ্যানি বেসান্ত-এর ভারতীয় রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে যোগদান ভারতীয় নারীদের সাথে সাথে বাংলার নারীদেরও ভবিষ্যত রাজনৈতিক পথ সুগম্য হয়ে ওঠে।
হোমরুল লীগ প্রতিষ্ঠার পূর্বে এ্যানি বেসান্ত কলকাতা, লক্ষ্ণৌ, এলাহাবাদসহ বিভিন্ন স্থানে ‘“ভারত জাগো” শিরোনামে বক্তৃতা প্রদান করেন। এই বক্তৃতায় তিনি জাতীয়তাবাদ, হিন্দুধর্মের পুনঃজাগরণের পাশাপাশি নারী প্রসঙ্গেও বক্তব্য প্রদান করেন। ১১০ এ্যানি বেসান্ত প্রতিষ্ঠিত ‘উইমেন্স ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন’ এর লক্ষ্য ছিল
- To Present to women their responsibilities as daughters of India
- To help them to realise that the future of India lies largely in their own hands; for as wives and mothers they have the task of training and guiding and forming the character of the future rulers of India
- To secure for women the vote for Municipal and legisletive councils as it is or may be granted to men
- To secure for women the right to be elected as members of all Municipal and legislative councils.
- To band women into groups for the purpose of self-development, education and for the definite service of others.
বাঙালি নারীদের জন্য প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে ভোটাধিকারের দাবি এবং নির্বাচিত হবার অধিকারের দাবি এই প্রতিষ্ঠানটিই প্রথম সামনে নিয়ে আসে। সারা ভারতজুড়ে এই প্রতিষ্ঠানটির শাখা স্থাপিত হয় এবং সবধর্মের নারীরা এর সদস্য হতে পারত। সংস্থাটি স্ত্রী-ধর্ম নামে একটি নিজস্ব সাময়িকী প্রকাশ করত।
তবে প্রতিষ্ঠানটির সদস্যরা প্রতেকেই ছিলেন শিক্ষিত এবং সকলেই সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ও প্রগতিশীল পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এবং পরিবারের সমর্থনপুষ্ট। ১৯১৭-এর নভেম্বরে ভারত সচিব এডউইন মন্টেগু ভারত সফরে আসলে এই প্রতিষ্ঠানটি ভারতীয় নারীদের জন্য ভোটাধিকার এর দাবি তোলে।
কিন্তু মন্টেগু প্রথমে কেবল ভারতীয় পুরুষদের সঙ্গে হোমরুল-এর দাবি প্রসঙ্গে আলোচনা করে। এসময়ে মার্গারেট কসিন্স সহ মহিলারা মন্টেগুর সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেন এবং ১৮ ডিসেম্বর ১৯১৭ সরোজিনী নাইডুর নেতৃত্বে ১৪ জন মহিলা তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। এই প্রতিনিধি দলে সরোজিনী নাইডু ব্যতীত অপর একজন বাঙালি নারীর নাম পাওয়া যায়, সেটি অবলা বোসু-র। ১১২ নারীর অধিকার আদায়ে গুরুত্ব আরোপ করার জন্য সরোজিনী নাইডু নারীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণের বিষয়ে জোর দেন।
প্রতিনিধিদল বলেন আইনসভায় নারীর অনুপস্থিতির কারণে তাদের নারীর উন্নয়নের বিষয়টি উপেক্ষিত হচ্ছে। প্রতিনিধিদল বলেন, “When such a franchise is being drawn up, women may be recognised as ‘people’, and that it may be worded in such terms as will not disqualify our sex, but allow our women the same opportunities of representation as our men.” 113
এই প্রথম নারীরা তাদের নিজস্ব দাবি নিয়ে প্রকাশ্যে বের হলো, বলা চলে এটি ভারতীয় নারীদের সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচির সূচনা। এবং এইক্ষেত্রে বাঙালি নারীর প্রতিনিধিত্ব বাংলার নারীর রাজনৈতিকায়নের ইঙ্গিতবহ যদিও এই প্রতিনিধিত্ব ছিল অভিজাতশ্রেণির। স্বাভাবিকভাবে ১৯১৮-তে প্রদত্ত মন্টেগু-চেমসফোর্ড রিপোর্টে নারীদের এই দাবির বিষয়টি উল্লেখিত হয় নি। ভারতীয় নারীরা এর প্রতিবাদে সরব হয়ে ওঠে।
ভোটাধিকার তাদের জন্য ছিল একটি ন্যায়সঙ্গত দাবি। তারা যুক্তি দেখান যে, যেহেতু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতিসহ সব বিষয় নারী এবং গৃহকে প্রভাবিত করে অতএব দেশের উন্নয়নের জন্য নারী-পুরুষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
এই প্রতিবাদের ফলে নারীর ভোটাধিকারের বিষয় অনুসন্ধানে সাউথবরো ফ্রান্টাইস কমিটি গঠিত হয় এবং ১৯১৯-এ এই কমিটিতে ভারতীয় নারীর ভোটাধিকারে পক্ষে স্বাক্ষ্য প্রদানের জন্য একটি নারী প্রতিনিধিদল লন্ডন যান। ১১৪ এই প্রতিনিধিদলে সরোজিনী নাইডু অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
বৃটিশ সরকার এই বিষয়ে কোন সমাধান প্রদান না করে ভারতের বিভিন্ন প্রাদেশিক আইনসভার ওপর ন্যাস্ত করে। এভাবে নারীর ভোটাধিকার প্রসঙ্গটি প্রাদেশিক রূপ গ্রহণ করে এবং এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে অবিভক্ত বাংলায় বঙ্গীয় নারীসমাজ বাঙালি নারীদের ভোটাধিকার অর্জনের আন্দোলন করে।
১৯১৭-এর কলকাতা কংগ্রেস নারীর রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। এই অধিবেশনে এ্যানি বেসান্ত কংগ্রেসের প্রথম মহিলা সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।
এই কলকাতা কংগ্রেসে প্রথম জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নারীর ভূমিকার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হয়। তবে সরোজিনী নাইডু এবং এ্যানি বেসান্ত উভয়েই নারীর ভূমিকাকে মুখ্য হিসেবে না দেখে সহকারী হিসেবে নির্দিষ্ট করে দেন এবং বেসান্ত তাঁর সভাতির ভাষণে নারীদের পক্ষ থেকে বলেন
I am only a woman, and I would like to say to you all, when your honour strikes, when you need torch bearers in the darkness to lead you, when you need standard bearers to uphold your banner and when you die for want of faith, the woomanhood of India will be with you as the holders of your banner, and the sustainers of your strengh. And if you die, remember that the spirit of padmini of chittor is enshrined with the manhood of India. 115
স্পষ্টতঃই তিনি নির্দিষ্ট করে দিলেন যখন প্রয়োজন হবে পুরুষের আন্দোলনে তখনই নারী তার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। সার্বিকভাবে বলা যায় অবিভক্ত বাংলায় বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন সমাপ্ত হবার পরবর্তী সময়ে এবং বিশের দশকে মহাত্মা গান্ধী প্রবর্তিত অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবার মধ্যবর্তী সময়টিতে বাঙালি নারীর রাজনৈতিকায়নের ক্ষেত্রে কোন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয় নি।
যদিও এই সময়কালে সর্বভারতীয় পর্যায়ে নারীর ভোটাধিকারের দাবি উত্থাপিত হয় এবং সেখানে বাঙালি নারীর প্রতিনিধিত্ব দেখা যায়, তথাপি সর্বস্তরের নারীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হবার জন্য পরবর্তী দশক (বিশের দশক) পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। স্বদেশী আন্দোলনে নারীর ভূমিকার সীমাবদ্ধতা হিসেবে এই পর্যায়ে প্রত্যক্ষ আন্দোলনে নারীনেতৃত্বের অভাবকে চিহ্নিত করা যায়।
পাশাপাশি এই আন্দোলনের রক্ষণশীল ভূমিকা নারীর অংশগ্রহণকে পরোক্ষ করে রাখে যার প্রমাণ পাওয়া যায় নারীর জন্য নির্ধারিত কর্মসূচির মধ্যে, যে কর্মসূচি নারীকে তার নির্দিষ্ট গণ্ডি অতিক্রম করার অনুমতি প্রদান করে নি। এছাড়া মুসলিম নারীদের অনুপস্থিতি এই আন্দোলনের সার্বজনীনতা অর্জনে ব্যর্থ করে।
এই সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে বলা যায় স্বদেশী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুরুষরা প্রথমবারে মত উপলব্ধি করলেন যে সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত না করেও নারীর মধ্যে জাতীয়তাবোধ এবং রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করা যায় তাদের আন্দোলনকে সাফল্যমণ্ডিত করবার জন্য আর নারীরা পুরুষদের নির্ধারিত পদ্ধতিতে নিজেরা নিজেদের সংগঠিত করতে থাকে এবং স্বদেশীব্রত গ্রহণ করতে থাকে।
এসময়ে বৃটিশ এম.পি (যিনি পরবর্তীতে বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী হন) জেমস্ ম্যাকডোনাল্ড-এর স্ত্রী ভারত ভ্রমনে এসে বাংলার নারীদের রাজনৈতিক সচেতনতা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন
A tremendous movement going on amongst the women. We are fond of labelling the Indian aspiration as sedition, when if they were amongst ourselves we should call them patriotism. This movement seems to be spreading as much amongst the women as amongst the men…. Take for instance the Swadeshi movement. This could not have succeeded in the way it has done without women.
They have meetings in each others houses and determine only to buy goods made at home and not to buy goods made by foreigners. The women in the Zenanas often do not know how to read or write. but inspite of this the Swadeshi movement is spreading very much in the places where one could hardly think there would be opportunity for its growth.
প্রায় একই বক্তব্য পাওয়া যায় একজন বৃটিশ সাংবাদিক Valentine Chirole – এর লেখায়। তিনি স্বদেশী আন্দোলনে বাংলার নারীদের সম্পৃক্তি সম্পর্কে বলেন
The revolt seems to have obtained a firm hold in the zenana and the hindu women behind the purdah often exercises a greater influsence on her husband and sons than the English Women who move so freely about the world….
In Bengal even small boys of so tender an age as still have the run of the zenana have, I have been told, been tought the whole pattern of sedition and go about from house to house dressed up as little sanyasis in little yellow robes preaching hatred of the English.”
উনিশ শতকের শেষার্ধে বৃটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলায় জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটে। এর ফলে বাঙালি শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণির নিকট গোষ্ঠী হিসেবে জাতিসত্তা প্রাধান্য পায়। আর এর মধ্যদিয়েই বাংলার নারীদের জন্য লিঙ্গ বৈষম্যের ভিত্তিতে আলাদা শ্রেণি হিসেবে বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, যার সূত্রপাত উনিশ শতকের শুরুতে সংস্কারবাদী শিক্ষিত বাঙালি নেতৃবৃন্দের সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে হয়েছিল।
যখন বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণি নিজেদের পরনির্ভরশীল এবং অধঃস্তন অবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে, এমন এক পরিস্থিতিতে বাঙালি নারীরসমাজের পক্ষে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য বা নারীর অধঃস্তন অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হবার সুযোগ সৃষ্টি হয় নি। এর বিপরীতে তারা বাঙালি জাতি হিসেবে উপনিবেশিক শাসকদের শোষণ এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতন হয়েছে স্বাভাবিক নিয়মেই।
এই প্রেক্ষাপটে উপনিবেশিক শাসকবর্গ কর্তৃক বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হলে বাঙালির উপনিবেশবিরোধী চেতনা তাত্ত্বিক ধারণা ও লেখার পর্যায় অতিক্রম করে বিধিবদ্ধ সক্রিয় রাজনীতির রূপ পরিগ্রহ করে এবং বাঙালি নারীর জন্য রাজনৈতিক অঙ্গণে প্রবেশের পথটির সূত্রপাত ঘটে এভাবে।
তবে দেখা যায় যে, এই পর্যায়ে বাঙালি নারী তাদের চিরায়ত ভূমিকার বাইরে বের হবার সুযোগ পায় নি। এই পর্যায়ে বরং তারা তাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে (বিদেশী পণ্য বর্জন ও স্বদেশী পণ্যের ব্যবহার) স্বদেশচেতনায় দীক্ষালাভ করে।
বলা যায় বাঙালি নারীর জন্য স্বদেশচেতনা তাদের গার্হস্থ জীবনের অংশ হিসেবেই বিকাশলাভ করে। একই সাথে অপর লক্ষণীয় বিষয়টি হলো, বিশ শতকের প্রারম্ভে বাঙালি নারী দেশাত্ববোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠার যে প্রক্রিয়া বা তাদের রাজনৈতিকায়নের যে সূত্রপাত হয়, সেটি কোন নির্দিষ্ট ঘটনা বা নিয়ামক না হয়ে বরং ঘটনার ফলাফল হিসেবেই ঘটে।

এ কারণে দেখা যায় যে, বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন সমাপ্ত হবার পর নারীর রাজনৈতিকায়নের বিষয়টি স্থবির হয়ে থাকে বিশ শতকের বিশের দশক পর্যন্ত। বঙ্গভঙ্গ রদ পরবর্তী এবং মহাত্মা গান্ধী প্রবর্তিত অসহযোগ আন্দোলনের পূর্ববর্তী সময়টি নারীর সামাজিকায়ন বা বা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সংগঠিত হবার পর্ব হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
পরিশেষে এটা বলা যায় যে, সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন বাংলার সাধারণ নারীদের প্রথমবারের মত তাদের গার্হস্থ্য জীবনের বাইরে একটি জগতের সঙ্গে পরিচিত করে তোলে। যদিও এই বহিঃজগতে প্রবেশের পূর্ণাঙ্গ অধিকার বাঙালি নারীরা এই পর্যায়ে লাভ করে নি। নিঃসন্দেহে বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন পরবর্তী দশকগুলোতে বাঙালি নারীর রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তির পথ প্রশস্ত করে যা পরবর্তী অধ্যায় সমূহে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
