আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –নির্বাচনী ইশতেহার, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, ১৯৭০। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
নির্বাচনী ইশতেহার, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, ১৯৭০

জনগণকে ক্ষমতা অর্জন করতেই হবে। মানুষের উপর মানুষের শোষণ, অঞ্চলের উপর অঞ্চলের শোষণের অবসান ঘটাতেই হবে। যে শক্তিশালী চক্র গত ২২ বছর ধরে পাকিস্তান শাসন করেছে, জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিরোধ করার ব্যাপারে তারা সম্ভাব্য সকল প্রকারের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। এরা সেইসব গোষ্ঠী যারা সাধারণ নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছেন। এমনকি নির্বাচনের পরেও তারা শোষণের অবসান ঘটানোর প্রত্যেকটি প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করার জন্যে সক্রিয় থাকবে।
এজন্য প্রয়োজন হলে তারা তাদের বিপুল সম্পদ নিয়োজিত করবেন। তাদের অর্থ আছে, প্রভাব আছে, জনসাধারণের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতাও তাদের রয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ মানুষ আপসহীনভাবে সাফল্যের সাথে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে এবং শেষ পর্যন্ত জনতার জয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে।
আওয়ামী লীগের প্রতিশ্রুতি
পাকিস্তানের জনগণের কাছে আওয়ামী লীগ এ প্রতিশ্রুতি দিতে পারে যে, তারা জনগণের পাশে পাশেই থাকবে। স্বৈরাচারী ও শোষকগোষ্ঠীর মোকাবেলার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেবে। কোনো জাতি কোনোদিনই আত্মাহুতি না দিয়ে মুক্তি ও ন্যায়বিচার পায়নি। তাই আজ আওয়ামী লীগ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলিকে জানিয়ে দিতে চায় যে, পাকিস্তানের জনগণকে সাথে নিয়ে তাদের মোকাবেলা আওয়ামী লীগ অবশ্যই করবে।
গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থা বিঘ্নিত করা হলে আওয়ামী লীগ সব শক্তি দিয়ে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেই আওয়ামী লীগের জন্ম, আর সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগের বিকাশ।তদানীন্তন ক্ষমতাসীন দল সমগ্র দেশকে একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, সে হীন চেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্যেই আমাদের মহান নেতা মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
এভাবেই আমরা পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আপসহীন সংগ্রাম শুরু করি। আমাদের সে সংগ্রাম আজও শেষ হয়নি। ক্ষমতাসীনচক্র সংগ্রামী আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্যে হামলার পর হামলা চালিয়েছেন। আঘাতের পর আঘাত হেনেছেন। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও কর্মীদের একের পর এক কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে, জীবনের সম্ভাবনাময় দিনগুলো কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। সর্বপ্রকার নির্যাতন ও নিপীড়নকে আমরা পরাভূত করেছি- বিজয়ী হয়েছি। এ বিজয়ই আমাদেরকে গণতন্ত্র বিরোধী শক্তিসমূহের মোকাবেলা করার জন্যে উদ্বুদ্ধ করেছে।
জাতীয় সংকটের মোকাবেলায় আওয়ামী লীগ
যে সংকট আজ জাতিকে গ্রাস করতে চলেছে সে সংকটসমূহের অবসান ঘটাতেই হবে। আজকে জাতীয় সংকটের প্রথম কারণ, দেশবাসী রাজনৈতিক অধিকার হতে বঞ্চিত, দ্বিতীয় জনগণের এক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অর্থনৈতিক বৈষম্যের কবলে পতিত, তৃতীয় অঞ্চলে অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের জন্যে সীমাহীন অবিচারের উপলব্ধি জন্মেছে। প্রধানত এগুলি বাঙালিদের ক্ষোভ ও অসন্তোষের কারণ। পশ্চিম পাকিস্তানের অবহেলিত মানুষেরও আজ একই উপলব্ধি।
আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টোতে এসব মৌলিক সমস্যা সমাধানের একটা সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ করা হয়েছে। দেশে প্রকৃত প্রাণবন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। সেই গণতন্ত্রে মানুষের সকল মৌলিক স্বাধীনতা শাসনতান্ত্রিকভাবে নিশ্চিত করা হবে। আমাদের মেনিফেস্টোতে রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংস্থা স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু বিকাশের রূপরেখা নির্দেশ করা হয়েছে। সংবাদপত্র ও শিক্ষার পূর্ণ স্বাধীনতায় আমরা বিশ্বাসী। সমাজে ক্যানসারের মতো যে দুর্নীতি বিস্তার করে আছে, তাকে অবশ্যই নির্মূল করতে আমরা দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ।
শোষণের অবসান অবশ্যই করতে হবে
বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শোষণ ও অবিচারের যে অসহনীয় কাঠামো সৃষ্টি করা হয়েছে, অবশ্যই তার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। জাতীয় শিল্প সম্পদের শতকরা ৬০ ভাগের অধিক আজ মাত্র দু’ডজন পরিবার করায়ত্ত করেছে। ব্যাংকিং সম্পদের শতকরা ৮০ ভাগ এবং বীমা সম্পদের শতকরা ৭৫ ভাগ এ দু’ডজন পরিবারের কুক্ষিগত। ব্যাংকের লগ্নিকৃত অর্ধেক শতকরা ৮০ ভাগ আজ মাত্র শতকরা তিনজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
দেশে যে কর প্রথা কায়েম রয়েছে তা বিশ্বের সবচাইতে পশ্চাদমুখী ব্যবস্থা। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলিতে যখন প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে মোট জাতীয় উৎপাদনের শতকরা ৬ ভাগ আদায় করা হয়, সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে মোট জাতীয় উৎপাদনের শতকরা ২ ভাগ অর্থ আদায় হয়। অপরপক্ষে লবণের মতো অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যাদির উপরেও নিপীড়নমূলক পরোক্ষ কর বসানো হয়েছে। সংরক্ষিত বাজার, ট্যাক্স হলিডে, বোনাস ভাউচারের মাধ্যমে সাবসিডি প্রদান এবং কৃত্রিমভাবে নিম্ন হারে বিদেশি মুদ্রার ঋণ ও অর্থ বরাদ্দ প্রভৃতি ব্যবস্থা একচেটিয়াবাদ ও কার্টেল প্রথার সৃষ্টির সুযোগ করে দিয়েছে।
একদিকে সম্পদের পাহাড় অন্যদিকে
ছিটেফোঁটা ভূমি সংস্কার সত্ত্বেও অধিকারী রয়েছে। তারা সীমাহীন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। তাদের সমৃদ্ধি ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। কিন্তু তারই পাশাপাশি অসহায় দরিদ্র কৃষকদের অবস্থার দিন দিন অবনতি ঘটছে। কেবলমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে জনসাধারণ দিনের পর দিন গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমশক্তির এক-পঞ্চমাংশ অর্থাৎ প্রায় ৯০ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষ আজ বেকার।
জীবনযাত্রার দ্রুত ব্যায়বৃদ্ধির সম্পূর্ণ চাপ এসে পড়েছে শিল্প শ্রমিক ও মেহনতি সম্প্রদায়ের উপর। মজুরি যা বাড়ছে তার তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত গতিতে বেড়ে চলেছে। জীবনযাত্রার সীমাহীন ব্যয়বৃদ্ধির চাপ স্কুল-কলেজের শিক্ষক, স্বল্পবেতনভুক্ত কর্মচারী, বিশেষ করে চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি কর্মচারী আজ তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে।
বাংলাদেশ কি পেয়েছে
অর্থনৈতিক বৈষম্যের ভয়াবহ চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে গত ২২ বছরে সরকারের রাজস্ব খাতের মোট ব্যয়ের মাত্র ১৫ শত কোটি টাকার মতো (মোট ব্যয়ের এক-পঞ্চমাংশ মাত্র) বাংলাদেশে খরচ করা হয়েছে। অথচ এর পাশাপাশি পশ্চিম পাকিস্তানে খরচ করা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। দেশের সর্বমোট উন্নয়ন ব্যয় খাতে বাংলাদেশে মোট ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ মাত্র ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
গত ২২ বছরে পশ্চিম পাকিস্তান মাত্র ১৩ শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। কিন্তু ৩ হাজার কোটি টাকার বিদেশি দ্রব্য তারা আমদানি করেছে। বাংলাদেশের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানে তিন গুণ বেশি বিদেশি দ্রব্য আমদানি করা হয়েছে। নিজস্ব বিদেশি মুদ্রা আয়ের চাইতেও পশ্চিম পাকিস্তান বাড়তি ২ হাজার কোটি টাকা মূল্যের বিদেশি দ্রব্য আমদানি করতে পেরেছে।
তার কারণ বাংলাদেশের অর্জিত ৫০০ কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তান কুক্ষিগত করেছে। তার উপরও সর্বপ্রকার বিদেশি সাহায্যের শতকরা ৮০ ভাগ পশ্চিম পাকিস্তান ব্যবহার করছে। কেন্দ্রীয় সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রের পরিসংখ্যানও একই রকমের মর্মান্তিক। স্বাধীনতার ২২ বছর গত হয়েছে কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরিতে বাঙালির সংখ্যা আজও শতকরা মাত্র ১৫ ভাগ। দেশরক্ষা সার্ভিসে বাঙালির সংখ্যা শতকরা ১০ ভাগেরও কম। সার্বিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই প্রকট বৈষম্যের ফলে বাংলার অর্থনীতি আজ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসের মুখে।
বাংলায় অর্থনৈতিক দুরবস্থা
বাংলার বেশির ভাগ গ্রামাঞ্চলে দুর্ভিক্ষজনিত অবস্থা বিরাজ করছে। জনগণকে শুধুমাত্র অনাহারের কবল থেকে রক্ষা করার জন্যে ১৫ লক্ষ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হচ্ছে। দেশে যে মুদ্রাস্ফীতি প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে, তার শিকারে পরিণত হয়ে চলেছে বাংলার অসহায় মানুষ। পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যের মূল্য শতকরা ৫০ থেকে ১০০ ভাগ বেশি।
পশ্চিম পাকিস্তানে যে ক্ষেত্রে প্রতিমণ মোটা চালের দাম ২০ টাকা থেকে ২৫ টাকা সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে সে চালের দাম গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। বাংলায় যে আটার দাম ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, পশ্চিম পাকিস্তানে তা ১৫ থেকে ২০ টাকা। পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিসের সরিষার তেলের দাম আড়াই টাকা, কিন্তু বাংলাদেশে সরিষার তেলের দাম ৫ টাকা। করাচিতে যে সোনার দাম প্রতিভরি ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা, ঢাকায় সে সোনার মূল্য ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা। তার পরেও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে সোনা আনার ব্যাপারে কাস্টমসের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
গত ২২ বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকার দেশের অর্থনীতির যে কাঠামো গড়ে তুলেছেন, এসব অবিচার তারই পুঞ্জিভূত ফলশ্রুতি। এ অবিচার দূর করার সাধ্য কেন্দ্রীয় সরকারের নেই। এ সত্যটি প্রমাণিত হয়েছে চতুর্থ পাচশালা পরিকল্পনায়। কেন্দ্রীয় সরকার যত বড় শক্তিশালীই হোক না কেন, অতীতের অন্যায়- অবিচার দূরীকরণে সে যে সম্পূর্ণ ব্যর্থ চতুর্থ পরিকল্পনার ব্যয় বরাদ্দে সে ব্যর্থতার স্বীকৃতি লিপিবদ্ধ রয়েছে।
৬-দফাতেই রয়েছে সমাধান
আওয়ামী লীগের ৬-দফা কর্মসূচি যে কর্মসূচিতে ১১-দফা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সে কর্মসূচি আঞ্চলিক অন্যায়- অবিচারের বাস্তব সমাধানের পথ নির্দেশ করেছে। কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রে যেখানে বাঙালির প্রতিনিধিত্ব মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ এবং দেশে যে ধরনের শাসনব্যবস্থা কায়েম রয়েছে তাতে কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কাছ থেকে সুবিচার আশা করা যায় না।
বাংলাদেশ ও অন্যান্য অনুন্নত অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা বৃহত্তর ব্যয় বরাদ্দ আদায়ের চেষ্টা করলে আঞ্চলিক উত্তেজনাই বৃদ্ধি পাবে এবং তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে ফেডারেল সরকারের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। এ অবস্থায় সমস্যাসমূহের একমাত্র সমাধান হতে পারে, শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস করে এবং ফেডারেশনের ইউনিটগুলিকে আওয়ামী লীগের ৬-দফা ভিত্তিতে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে।
প্রস্তাবিত এই স্বায়ত্তশাসনকে পুরোপুরি কার্যকরী করার জন্যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষমতাও অবশ্যই দিতে হবে। এজন্যেই মুদ্রা ব্যবস্থা ও অর্থনীতি এবং বিদেশি মুদ্রা অর্জনের উপর ফেডারেশনের ইউনিটগুলিকে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাদানের ব্যাপারে আমরা সব সময়ই গুরুত্ব দিচ্ছি। এ কারণে আমরা মনে করি যে, বৈদেশিক বাণিজ্য ও ঋণসমূহের ব্যাপারে আলাপ-
আলোচনার ক্ষমতাও ফেডারেশনের ইউনিট সরকারগুলোর হাতে অর্পণ করা উচিত। এভাবে আমরা কেন্দ্রকে সন্দেহ, সংশয় ও বিভেদ সৃষ্টির অভিযোগের আওতার উর্ধ্বে রাখতে চাই। ফেডারেশনের ইউনিটগুলিকে অর্থনৈতিক ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান, ফেডারেল সরকার পররাষ্ট্র বিষয়, দেশরক্ষা ও নিরাপত্তামূলক শর্তসাপেক্ষে মুদ্রা ব্যবস্থার দায়িত্ব দিয়ে একে ন্যায়সঙ্গত ভারসাম্যমূলক ফেডারেল সরকার কায়েম হতে পারে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
আমাদের ফেডারেল সরকারের পরিকল্পনায় নিখিল পাকিস্তান সার্ভিস ব্যবস্থার বিলোপ সাধন করা হবে এবং ফেডারেল সার্ভিস ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে সকল অঞ্চল থেকে ফেডারেল চাকুরিতে লোক নিয়োগ করা হবে। আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, ফেডারেশনের ইউনিটগুলো যদি মিলিশিয়া অথবা প্যারা মিলিটারি বাহিনী গঠন করে তবে তারা কার্যকরীভাবে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় সাহায্য করতে সক্ষম হবে। আমাদের প্রস্তাবিত ফেডারেল পরিকল্পনা সংশয় ও বিরোধের অবসান ঘটিয়ে শক্তিশালী পাকিস্তানের নিশ্চয়তা বিধান করবে।
যে অঞ্চলের মানুষ অপর অঞ্চলকে উপনিবেশ বা বাজার হিসাবে ব্যবহার করতে চান বোধগম্য কারণেই তারা আমাদের এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করবেন। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি আমাদের পরিকল্পনা পূর্ণ ও পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের পূর্ণ সমর্থন পাবে। আমাদের বিশ্বাস শাসনতান্ত্রিক এ কাঠামোর মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশে একটা সামাজিক বিপ্লব আনা সম্ভব। অন্যান্য অবিচার ও শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রয়োজন মেটানোর জন্যে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে দেশবাসী কঠোর পরিশ্রম ও বিপুল ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন। আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশবাসী তখনই সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করবেন যখন ত্যাগ স্বীকারের সাথে সাথে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সকল শ্রেণী ও সকল অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করার আশ্বাস আমরা দিতে পারব।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম- অংশ নিশ্চিত করার জন্যে অর্থনৈতিক কাঠামোতে অবশ্যই আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। জাতীয়করণের মাধ্যমে ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিগুলিসহ অর্থনীতির মূল চাবিকাঠিগুলোকে জনগণের মালিকানায় আনা, অত্যাবশ্যক বলে আমরা বিশ্বাস করি। অর্থনীতির এসব ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সাধিত হতে হবে সরকারি অর্থাৎ জনগণের মালিকানায়। নতুন ব্যবস্থায় শ্রমিকগণ শিল্প ব্যবস্থাপনায় ও মূলধন পর্যায়ে অংশীদার হবেন।
বেসরকারি পর্যায়ে এর নিজস্ব ভূমিকা পালন করার সুবিধা রয়েছে। একচেটিয়াবাদ ও কঠিন প্রথার সম্পূর্ণরূপে বিলোপ সাধন করতে হবে। কর ব্যবস্থাকে সত্যিকারভাবে গণমুখী করতে হবে। সৌখিন দ্রব্যাদির ব্যাপারে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। ক্ষুদ্রায়তন ও কুটির শিল্পকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করে তাদেরকে উৎসাহ দিতে হবে। এ সমর্থনের জন্যে কুটির শিল্পের ক্ষেত্রে কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তাঁতিদের ন্যায্যমূল্যে সুতা এবং রং সরবরাহ করতে হবে। তাদের জন্যে অবশ্যই বাজারজাতকরণ ও ঋণদানের সুবিধা করে দিতে হবে। সমবায়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্রাকৃতির শিল্প গড়ে তুলতে হবে। গ্রামে গ্রামে এসব শিল্পকে এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে, যার ফলে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে বিভিন্ন প্রকার শিল্প সুযোগ পৌঁছায় এবং গ্রামীণ মানুষের জন্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
পাট সমস্যার সমাধান
এ যাবত বাংলার সোনালি আঁশ পাটের প্রতি ক্ষমাহীন অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়েছে। বৈষম্যমূলক বিনিয়োগ হার এবং পরগাছা ফড়িয়া বেপারিরা পাট চাষিদের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করছে। পাটের মান উৎপাদনের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। পাট ব্যবসা জাতীয়করণ, পাটের গবেষণার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ এবং পাট উৎপাদনের হার বৃদ্ধি করা হলে জাতীয় অর্থনীতিতে পাট সম্পদ সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারে।
তুলার প্রতি একই ধরনের গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। সেজন্যে আমরা মনে করি তুলা ব্যবসাও জাতীয়করণ করা অত্যাবশ্যক। তুলার মান ও উৎপাদনের হার বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। বিগত সরকারগুলো আমাদের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল, চা, ইক্ষু ও তামাকের উৎপাদনের ব্যাপারেও যথেষ্ট অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছেন। এর ফলে এসব অর্থকরী ফসলের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।একটা স্বল্প সম্পদের দেশে কৃষি পর্যায়ে অনবরত উৎপাদন হ্রাসের পরিস্থিতি অব্যাহত রাখা যেতে পারে না। দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির সকল প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। চাষিদের ন্যায্য ও স্থিতিশীল মূল্য প্রদানের নিশ্চিয়তা দিতে হবে।
কৃষি বিপ্লব চাই
প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদের গোটা কৃষি ব্যবস্থাতে বিপ্লবের সূচনা অত্যাবশ্যক। পশ্চিম পাকিস্তানিদের জমিদারি, জায়গিরদারি, সরদারি প্রথায় অবশ্যই বিলুপ্তি সাধন করতে হবে। প্রকৃত কৃষকের স্বার্থে গোটা ভূমি ব্যবস্থায় পুনর্বিন্যাস সাধনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ভূমির সর্বোচ্চ সীমা অবশ্যই নির্ধারণ করে দিতে হবে। নির্ধারিত সীমার বাইরের জমি এবং সরকারি খাস জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে। কৃষি ব্যবস্থাকে অবশ্যই আধুনিকীকরণ করতে হবে। অবিলম্বে চাষিদের বহুমুখী সমবায়ের মাধ্যমে ভূমি সংহতি সাধনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সরকার এজন্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
ভূমি রাজস্বের চাপে নিষ্পিষ্ট কৃষককূলের ঋণভার লাঘবের জন্যে অবিলম্বে আমরা ২৫ বিঘা জমি পর্যন্ত খাজনা বিলোপ এবং বকেয়া খাজনা মওকুফ করার প্রস্তাব করেছি। আমরা বর্তমান ভূমির রাজস্ব প্রথা তুলে দেবার কথাও ভাবছি। প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বাধিক উন্নয়নের জন্যে বৈজ্ঞানিক তৎপরতা চালাতে হবে। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আমাদের বনজ সম্পদ, ফলের চাষ, গো-সম্পদ, হাঁস-মুরগির চাষ, দুগ্ধ খামার সর্বোপরি মৎস্য চাষের ব্যবস্থা করতে হবে। পানিসম্পদ সম্পর্কে গবেষণা এবং নৌ-পরিবহন গ্রহণ করার জন্যে অবিলম্বে একটি নৌ-গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন করা প্রয়োজন ।
অর্থনৈতিক ভিত্তির তিনটি স্তম্ভ
অর্থনৈতিক মৌলিক ভিত্তির যে প্রথম তিনটি স্তম্ভ সেগুলিকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই প্রথম কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। জরুরি অবস্থার ভিত্তিতে একটি সুসংহত ও সুষ্ঠু বন্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির বাস্তবায়ন করা আশু প্রয়োজন। পশ্চিম পাকিস্তানে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা দ্রুতগতিতে দূরীভূত করতে হবে। পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হচ্ছে বিজলি। বিপুলভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যাপকভাবে বিজলির সরবরাহ করতে না পারলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সাধিত হতে পারে না।
একটি সম্প্রসারিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে গ্রাম পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে এবং এর দ্বারা পল্লী অঞ্চলে ক্ষুদ্রায়তন শিল্প গড়ে উঠতে পারে। পাঁচ বছরে আমরা ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চাই। রূপপুর আণবিক শক্তি এবং জামালগঞ্জের কয়লা প্রকল্প অবিলম্বে বাস্তবায়িত করতে হবে। প্রাকৃতিক গ্যাস অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগাতে হবে।
তৃতীয় অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। যমুনা নদীর উপর সেতু নির্মাণ করে উত্তরবঙ্গের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের বিষয়টিকে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেই। সিন্ধু ও পাঞ্জাবের বিভিন্ন স্থানে সিন্ধু নদীর উপর এবং বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলী ও শীতলক্ষ্যার উপরেও সেতু নির্মাণ করতে হবে। অভ্যন্তরীণ নৌ-বন্দর এবং সামুদ্রিক বন্দরের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সড়ক ও রেল ব্যবস্থার উপরেও আমরা যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছি।
শিক্ষার উন্নতি
ই সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগ আর হতে পারে না। ১৯৪৭ সালের পর বাংল প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা হ্রাস পাবার পরিসংখ্যান একটা ভয়াবহ সত্য। আমাদের জনসংখ্যার শতকরা ৮০ জন প্রতিবছর ১০ লক্ষেরও অধিক নিরক্ষর লোক বাড়ছে। জাতির অর্ধেকের বেশি শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চি হচ্ছে। শতকরা মাত্র ১৮ জন বালক ও ৬ জন বালিকা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। জাতীয় উৎপাদনের শতকরা কমপক্ষে ৪ ভাগ সম্পন্ন শিক্ষা খাতে ব্যয় হওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। কলেজ ও স্কুল, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন। উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করতে হবে। নিরক্ষরতা অবশ্যই দূর করতে হবে।
পাঁচ বছর বয়স্ক শিশুদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্যে একটি ক্রাশ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। মাধ্যমিক শিক্ষার যার সকল শ্রেণীর জন্যে খোলা রাখতে হবে। দ্রুত মেডিকেল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যাল নয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দারিদ্র্য যাতে উচ্চ শিক্ষার জন্যে মেধাবী ছাত্রদের অভিশাপ হয়ে না সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে যাতে বাংলা ও উর্দু ও ইংরেজির স্থান দখল করতে পারে সে ব্যাপারে অবিলম্বে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আঞ্চলিক ভাষার বিকাশ ও উন্নয়নের ব্যাপারে উৎসাহ সৃষ্টি। করতে হবে।
বিত্তহীনদের বাসস্থান সমস্যা
নাগরিক জীবনের সমস্যাবলির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব নিম্ন আয়ের লোকজন অমানুষিক পরিবেশের মধ্যে বসবাস করছেন। তথাকথিত ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টগুলি বিত্তবানদের জন্যে বিলাসবহুল আবাসিক এলাকা নির্মাণে ব্যস্ত। আর এদিকে বাস্তুহারা ও বিত্তহীনের দল এতটুকু আশ্রয়ের সন্ধানে মাথাকুটে ফিরছে। ভবিষ্যৎ নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র নগরবাসীর সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অল্প খরচে শহরে বাসগৃহ নির্মাণের ব্যবস্থার প্রয়োজন।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে
চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক করুণ পরিবেশ বিদ্যমান। আমাদের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ সামান্যতম চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। প্রতি ইউনিয়নে একটি করে পল্লী চিকিৎসা কেন্দ্র এবং প্রতি থানা সদরে একটি করে হাসপাতাল অবিলম্বে স্থাপনের দরকার। চিকিৎসা গ্র্যাজুয়েটদের জন্যে ‘ন্যাশনাল সার্ভিস’ প্রবর্তনের প্রয়োজন। পল্লী এলাকার জন্যে বিপুল সংখ্যক প্যারা মেডিকেল পার্সোন্যালদের ট্রেনিং দেয়া দরকার।
শিল্প শ্রমিক
শিল্প শ্রমিকরা গণ-আন্দোলনের মতোই অর্থনীতি ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, যৌথ দর কষাকষি এবং ধর্মঘটের ব্যাপারে তাদের মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে। তাদের নিজেদের এবং সন্তানদের জন্যে বেঁচে থাকবার মতো মজুরি, বাসগৃহ, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগের ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার খর্বকারী সকল শ্রম আইন বাতিল করতে হবে। শিল্প-কারখানায় শ্রমিকদের ন্যায্য হিস্যা দানের মাধ্যমেই তাদের কাছ থেকে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি আশা করা যায়। সমাজের চাহিদা মিটাতে হলে অর্থনীতির সকল খাতে সর্বোচ্চ পরিমাণ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে।অর্থনীতির সর্বত্র মজুরি কাঠামো ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির গ্রাস থেকে নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারী ও অল্প উপার্জনশীল ব্যক্তিদের বাঁচাবার জন্য দ্রব্যমূল্যে স্থিতিশীলতা আনতে হবে।
সকল নাগরিকের সমান অধিকার
সকল নাগরিকের সমান অধিকারে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের নিশ্চয়ই জানা আছে যে, আমরা সব সময়ই সবপ্রকারের সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করে আসছি। সংখ্যালঘুরাও অন্যান্য নাগরিকের মতোই সমান অধিকার ভোগ করবে। আইনের সমান রক্ষাকবচ সকল ক্ষেত্রেই পাবে। উপজাতীয় এলাকা যাতে অন্যান্য এলাকার সাথে পুরাপুরি সংযোজিত হতে পারে, তারা যাতে জীবনের সবক্ষেত্রে অপর নাগরিকদের মতোই সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, এই জন্য উপজাতীয় এলাকা উন্নয়নের ব্যাপারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম, উপকূলীয় দ্বীপসমূহ এবং উপকূলবর্তী এলাকার বসবাসকারীরা যাতে জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, সেজন্যে তাদের সম্পদের সদ্ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বিশেষ উদ্যোগ গৃহীত হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় জীবনের সাথে মোহাজেরদের একাত্ম হয়ে যাওয়া উচিত। এর ফলে স্থানীয় জনগণের সাথে মিলেমিশে সবক্ষেত্রে তারা স্থানীয় জনগণের মতোই সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন।
মিথ্যা প্রচারণা বন্ধ করুন
৬-দফা বা আমাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচি ইসলামকে বিপন্ন করে তুলেছে বলে যে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে সেই মিথ্যা প্রচারণা থেকে বিরত থাকার জন্যে আমি শেষবারের মতো আহ্বান জানাচ্ছি। অঞ্চলে অঞ্চলে এবং মানুষে মানুষে সুবিচারের নিশ্চয়তা প্রত্যাশী কোনো কিছুই ইসলামের পরিপন্থী হতে পারে না। আমরা এই শাসনতান্ত্রিক নীতির প্রতি অবিচল ওয়াদাবদ্ধ যে, কোরান ও সুন্নাহর নির্দেশিত ইসলামী নীতির পরিপন্থী কোনো আইনই এ দেশে পাস হতে বা চাপিয়ে দেয়া যেতে পারে না।
পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে
পররাষ্ট্র নীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, আজ বিশ্বজুড়ে যে ক্ষমতার লড়াই চলছে, সে ক্ষমতার লড়াইয়ে আমরা কোনোমতেই জড়িয়ে পড়তে পারি না। এজন্যে আমাদের অবশ্যই সত্যিকারের স্বাধীন ও জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে। আমরা ইতিপূর্বে ‘সিয়াটো’, ‘সেন্টো’ ও অন্যান্য সামরিক জোট থেকে সরে আসার দাবি জানিয়েছি। ভবিষ্যতেও এ ধরনের কোনো জোটে জড়িয়ে না পড়ার ব্যাপারে আমাদের বিঘোষিত সিদ্ধান্ত রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ এবং বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী নির্যাতিত জনগণের যে সংগ্রাম চলছে, সে সংগ্রামে আমরা আমাদের সমর্থন জানিয়েছি।
“কারুর প্রতি বিদ্বেষ নয়, সকলের প্রতি বন্ধুত্ব” এই নীতির ভিত্তিতে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের সাথে, বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে আমরা শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানে বিশ্বাসী ।
আমরা মনে করি, প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া উচিত। এর মধ্যে আমাদের জনগণের বৃহত্তম স্বার্থ নিহিত রয়েছে। সেজন্য প্রতিবেশীদের মধ্যে বিরোধসমূহের নিষ্পত্তির উপর আমরা সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করি। জাতিসংঘের প্রস্তাব মোতাবেক কাশ্মীর সমস্যার একটি ন্যায়সঙ্গত সমাধানের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছি।ফারাক্কা বাঁধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে ভয়ঙ্কর ও স্থায়ী সর্বনাশ করা হচ্ছে, অনতিবিলম্বে সে সর্বনাশের মোকাবেলা করতে হবে। কালবিলম্ব না করে এ সমস্যার ন্যায়সঙ্গত সমাধানের জন্যে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে।
গণ-প্রতিনিধিরাই কেবল শাসনতন্ত্র দিতে পারে
দেশবাসী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী হলেই এসব কর্মসূচি ও নীতিমালার বাস্তবায়ন সম্ভবপর। আগামী নির্বাচন জাতীয় মৌলিক সমস্যাসমূহ বিশেষ করে ৬-দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে গণভোটরূপে আমরা গ্রহণ করেছি। একমাত্র জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই দেশকে একটি শাসনতন্ত্র দিতে পারে যে শাসনতন্ত্র জনগণের একত্রে বসবাসে স্থায়ী ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হবে। এ কারণেই আমরা বারবার উল্লেখ করেছি যে, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনতন্ত্র রচনার ক্ষমতার উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা ন্যায়সঙ্গত নয়। আইনগত কাঠামো আদেশের বিধিনিষেধ সম্পর্কিত ধারাসমূহ বাতিলের জন্যে আমি পুনরায় প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
ছাত্র-শ্রমিক ও রাজনৈতিক কর্মীর মুক্তি
রাজনৈতিক কারণে রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শ্রমিকদের বিরুদ্ধে এবং বিগত গণ-অভ্যুত্থানকালীন দায়েরকৃত মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা ও দণ্ডাদেশ প্রত্যাহার করা হলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের জন্যে সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বিনা বিচারে আটক সকল রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে হবে।
সেনাবাহিনী ও রাজনীতি
জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর বেসামরিক প্রশাসনের গুরুভার বহন করা কোনো প্রকারেই উচিত নয়। রাজনীতিতেও সশস্ত্র বাহিনীর জড়িয়ে পড়া একেবারে অনুচিত। উচ্চতর শিক্ষাপ্রাপ্ত পেশাদার সৈনিকদের জাতীয় সীমানা রক্ষার গুরুদায়িত্ব এককভাবে পালন করা বাঞ্ছনীয়।

সর্বশেষে
পরিশেষে আমি বলতে চাই, জাতি হিসেবে আমাদের সামনে যে চ্যালেঞ্জ এসেছে আমরা সাফল্যের সাথে তার মোকাবিলা করবই। প্রকৃত ও প্রাণবস্তু গণতন্ত্র দেশে প্রতিষ্ঠিত করতেই হবে। যাদের নিয়ে পাকিস্তান গঠিত, তারা শুধুমাত্র একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যেই একত্রে বসবাস করতে পারে।
গণতন্ত্র ধ্বংসের যে কোনো উদ্যোগ পরিণতিতে পাকিস্তানকেই ধ্বংস করবে। আমাদের ৬-দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে ফেডারেশনের ইউনিটসমূহকে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন মঞ্জুর করে অঞ্চলে অঞ্চলে সুবিচারের নিশ্চয়তার বিধান করতে হবে। এই ধরনের ফেডারেল গণতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় দেশে সামাজিক বিপ্লবের সূচনার জন্য প্রগতিশীল অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।
আওয়ামী লীগ এই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে আজ দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আওয়ামী লীগ দেশবাসীর যে সমর্থন ও আস্থার অধিকারী হয়েছে, তাতে আমরা বিশ্বাস করি যে, ইনশাআল্লাহ, আমরা সাফল্যের সাথে এ চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে সক্ষম হব।
