বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহার ১৯৭৩

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহার ১৯৭৩ । যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহার ১৯৭৩

 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহার ১৯৭৩

 

দীর্ঘদিনের পরাধীনতার জিঞ্জির ভঙ্গ করে বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। লাখো লাখো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে, হাজার হাজার মা-বোনের অশ্রু নিংড়ানো। আশীর্বাদ নিয়ে গাঢ় সবুজ আস্তরণে রক্ত বর্ণের সূর্যখচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা আজ উড্ডীয়মান। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলা নামে একটি দেশ, বাঙালী নামে একটি জাতি আজ পরম শ্রদ্ধা আর মর্যাদার সাথে দেশ-বিদেশে সমাদৃত। আমাদের সম্পদের উপর আমাদের অধিকার, আমাদের দেশের উপর বাংলার জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত। যুগ যুগ ধরে বাংলা মায়ের বিপ্লবী দামাল ছেলেরা এদেশের জন্য যে মর্যাদার দাবী করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মহান নেতৃত্বে আজ তা একটি বাস্তব, একটি অবিনশ্বর সত্য। আমাদের ক্ষুদ্রায়তন মাতৃভূমি আজ পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম রাষ্ট্র।

১৯৭০-এর নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ পাষাণ দৃঢ় ঐক্য নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের উপর আস্থা অর্পণ করেছিল। পাকিস্তানী উপনিবেশিক শোষকদের কূট সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ছিন্ন করে জাতীয় সভার শতকরা আটানব্বইটি আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের জয়যুক্ত করেছিল। তারা আশা করেছিল আওয়ামী লীগ হচ্ছে সেই মহান রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন সেই অতুলনীয় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর অপূর্ব রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সংগঠনী শক্তি সমগ্র বাঙালী জাতিকে উপনিবেশিক শাসনের অন্ধকারাচ্ছন্ন অমানিশার কালরাত্রির মধ্য থেকে টেনে তুলে আনবে।

কারণ বঙ্গবন্ধুই দুর্বার আন্দোলনের তরঙ্গমালা সৃষ্টি করে আটচল্লিশ ও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দৃঢ় প্রত্যয় ও অভূতপূর্ব নিষ্ঠা দিয়ে বাঙালীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের দিগন্ত সম্প্রসারিত করেছিল। আওয়ামী লীগের পতাকা তলে সমবেত ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাঙালী জাতি এমন এক অবিস্মরণীয় দুর্জয় ক্ষমতার অধিকারী হতে পেরেছিল যার প্রবল আঘাতে সাম্রাজ্যবাদী অগণতান্ত্রিক ও উপনিবেশিক শোষকদের পার্টিসমূহ ধসে পড়েছিল।

‘৭০-এর নির্বাচনী বিজয়ের পটভূমিকায় বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের রেসকোর্সের ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ নিরস্ত্র বাঙালী জাতিকে নবতর সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, যার হাতে যা আছে তাই নিয়ে তৈরী থাকো।’ সম্ভাব্য আঘাতের মোকাবেলা করার জন্য সাবধান বাণী উচ্চারণ করে দক্ষ সিপাহসালার বলেছিলেন, তিনি যদি সেই ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তি সংগ্রামের দিনে তাঁর প্রাণপ্রিয় বাংলার জনগণের মাঝে না থাকতে পারেন এবং তাদের উপর যদি কোন আঘাত আসে, তাহলে যেন প্রতিঘাত হেনে সেই আক্রমণকে প্রতিহত করা হয়। বাঙালী জাতি, তাদের প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগ এবং জনগণ বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক নির্দেশ পালন করেছে। পৃথিবীর নৃশংসতম শত্রুর মরণাঘাতকে প্রতিহত, নিষ্ঠুরতম সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পরাজিত করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে। তিরিশ লাখ তাজা প্রাণের লাল রক্ত ঢেলে দিয়ে বাংলার গৃহশীর্ষে বাংলার পতাকা উঠেছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাঙালী জাতির হাজার বৎসরের পরাধীনতার গ্লানি পরিষ্কার করেছেন।

আগামী ৭ই মার্চে বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গণতন্ত্রের মহান মন্ত্রে দীক্ষিত বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের ভিত্তিতে এই নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের দেশ-শাসনের অধিকার প্রয়োগ করবেন। এবারের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের তিনশ’টি জাতীয় সংসদীয় আসনে প্রার্থী দাঁড় করিয়েছেন। তাঁরা পাঁচ বৎসরের জন্য দেশ-শাসনের ম্যান্ডেট গ্রহণের জন্য এদেশের আপামর জনগণের আদালতে হাজির হচ্ছেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জনগণের নিকট কতিপয় ওয়াদা করেছিল। সে ওয়াদাগুলি

ছিল সংক্ষেপে এই-

(ক) আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক ৬-দফা কর্মসূচীর ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করবে। আর যদি ৬-দফা কর্মসূচী মেনে নেওয়া না হয় তাহলে বাংলাদেশে মুক্তি-সংগ্রাম শুরু করে দেওয়া হবে।

(খ) আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করবার চেষ্টা করবে এবং সেই লক্ষ্যে উপনীত হবার প্রাথমিক কর্মসূচী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথে ব্যাঙ্ক, বীমা, পাটশিল্প, বস্ত্রসহ সকল মৌলিক ও প্রধান শিল্পসমূহ জাতীয়করণ করবে। 

(গ) আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ভূ-সংস্কারের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং ভূ-মালিকানার পুরাতন

নীতি পরিবর্তন করে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে চাষযোগ্য জমি বিতরণের ব্যবস্থা করবে।

 (ঘ) আওয়ামী লীগ খাজনা, ট্যাক্স প্রথার পরিবর্তন সাধন করবে। এবং লবণকর ও পঁচিশ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিকদের খাজনা মওকুফ করে দেবে। 

(ঙ) আওয়ামী লীগ জোট-নিরপেক্ষ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে এবং সিয়াটো-সেন্টোসহ

সর্বপ্রকার সাম্রাজ্যবাদী চুক্তি বাতিল করে দেবে।

(চ) আওয়ামী লীগ দেশে গণতন্ত্র কায়েম করবে এবং প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনগণ যাতে করে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে ও জাতীয় প্রশ্নে তাদের মতামত ব্যক্ত করতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করবে।

(ছ) আওয়ামী লীগ বাংলার মানুষের মধ্যে ছাড়িয়ে দেওয়া সাম্প্রদায়িকতার বীজাণু ধ্বংস করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করবে। ওয়াদাগুলি আওয়ামী লীগ পালন করেছে।

 

১৯৭০-এর নির্বাচনের সময় আমরা ছিলাম ইতিহাসের একটি বিশেষ পর্যায়ে। ‘৭৩-এর নির্বাচনের লগ্নে আমরা একটি নব পর্যায়ে উত্তরণ করেছি। আমাদের ন’মাসের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী বর্বর হানাদার বাহিনী আমাদের জনসাধারণের বিরুদ্ধে গণহত্যা পরিচালনা করেছে। আমাদের অর্থনৈতিক উপকরণসমূহ বিনষ্ট করেছে। হাজার হাজার গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমাদের কৃষি ও শিল্পসমূহের উৎপাদন-শক্তি ধ্বংস করেছে। যুদ্ধের সময় আমাদের এক কোটি লোক দেশত্যাগ করে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল।

আমাদের দুই কোটি লোক সন্ত্রাসে বাড়িঘর ছেড়ে দেশের মধ্যে নিষ্কর্মা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ঘুরছিল। প্রায় আড়াই লাখ মা-বোন তাদের ইজ্জত খুইয়ে জীবনের অর্থ ও বেঁচে থাকার সঙ্গতি হারিয়ে ফেলেছিল। আমাদের তরুণ সম্প্রদায় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে, মায়ের স্নেহ ও ঘরের বাঁধন ভেঙে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। শত্রুরা বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই ভয়াবহ যুদ্ধে বাংলাদেশের মাটি ও এই সেনার মাটির সম্পদের ব্যবহার করেছে। আর পরাজয়ের পূর্বে পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করে আমাদের উৎপাদন শক্তিসমূহ নিঃশেষ করে দিয়ে গেছে।

ফলে স্বাধীনতার পরপরই আমরা এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পতিত হয়েছিলাম। আমাদের তিরিশ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছিল, আমাদের কোষাগারে বৈদেশিক মুদ্রা ছিল না, আমাদের কারখানাগুলি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বন্দরগুলি রুদ্ধ ছিল। রেল, স্থল ও নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। কৃষকদের নিকট চাষাবাদের উপকরণ ছিল না। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাবে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। পঙ্গু, আহত ও রোগগ্রস্তদের চিকিৎসার জন্য ছিল না পর্যাপ্ত ঔষধ। মোটকথা মানুষের সাধারণভাবে জীবন ধারণের জন্য যে-সকল উপকরণ একান্তভাবেই অত্যাবশ্যক সেগুলির অভাব দারুণভাবে পরিলক্ষিত হয়েছিল। সর্বোপরি যে এক কোটি নাগরিক দেশত্যাগ করেছিল তাদের মাথা গুঁজবার জন্য সামান্যতম ঠাঁই করে দেওয়া ছিল একটা বিরাট সমস্যা।

বাংলাদেশের সেদিনের সেই মহাসঙ্কট সমগ্র বিশ্বকে এতটা উদ্বেগাকুল করে তুলেছিল যে, পৃথিবীর প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে পঞ্চাশ লক্ষ লোক অনাহারে প্রাণ হারাবে। দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। এমনি একটি ভয়াবহ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন । মরণোন্মুখ বাঙালী জাতিকে দুঃখের ভাগাড় থেকে তুলে আনবার চ্যালেঞ্জ কাঁধে তুলে নেন।

তারপর এক বৎসর কাল অতিবাহিত হয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের অভিমতে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পৃথিবীর বৃহত্তম পুনর্বাসন কর্মসূচী বাস্তবায়িত করেছেন। আমাদের একজন লোকও অনাহারে মরেনি। দেশে ও দেশের বাইরে আজ বাঙালী জাতির মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় একশত রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

 আমাদের স্বাধীনতার প্রাক্কালে দেশে কোন প্রশাসনিক কাঠামো ছিল না। থানা, মহকুমা, জিলা পর্যায়ে কোন প্রশাসনযন্ত্র ছিল না। ছিল না কোন আইন-আদালত, নিয়ম-রীতি । লক্ষ লক্ষ অনিয়ন্ত্রিত অস্ত্র দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল। গত এক বৎসরে সরকারকে আইনের শাসন ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করতে হয়েছে। জাতি হিসাবে আমরা যাতে করে সংঘবদ্ধ হতে পারি, তার জন্য দেশের মৌলিক আইন প্রণীত হয়েছে। আমাদের গণ-পরিষদের সদস রেকর্ড সময়ে জাতীয় সংবিধান প্রণয়ন করে বাঙালী জাতির মুখোজ্জ্বল করেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব ঢাকা সফরে এসে বাংলাদেশের বাস্তবতা সরজমিনে দেখে গেছেন। তিনি আমাদের ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রচেষ্টায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন, সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

সংবিধানে জনগণের মৌলিক অধিকার ও সমাজতন্ত্রের অগ্রাভিযানের নিশ্চয়তা রয়েছে। শাসনতন্ত্র বাস্তবায়ন এবং দেশ-শাসনের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট গ্রহণের জন্য গণ-প্রতিনিধিরা ইস্তাফা দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগ সৃষ্টি করা দিয়েছেন। আমরা সার্থকভাবে জাতীয় পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের বিরাট ঝুঁকির মোকাবেলা করেছি। প্রথম বাজেটে ও বাৎসরিক পরিকল্পনায় আমাদের দুঃখী জনগণের জীবনযাত্রায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদেশ থেকে পণ্য আমদানী করে এনে এবং কারখানার জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ করে নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যের ঘাটতি পূরণ ও উৎপাদন শুরু করার চেষ্টা চালাচ্ছি।

সত্তর সালে আমাদের দেশের উপর দিয়ে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় প্রবাহিত হয়েছিল। আমরা বিপুল সম্পদ ও উপকরণ ছাড়াও দশ লাখ লোক হারিয়েছি। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলেছিল। তিরিশ লাখ লোকের জীবন ছাড়াও আমাদের আড়াই হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি ও সম্পদ ধ্বংস করা হয়েছে। বাহাত্তর সালে অনাবৃষ্টি হয়েছে। পর্যাপ্ত উপকরণ, বীজ, গবাদি পশু, কৃষি-সরঞ্জাম, কারখানার কাঁচামাল, খুচরা যন্ত্রপাতির অভাব এবং বৈদ্যুতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অরাজকতার ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।

 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহার ১৯৭৩

 

বাংলাদেশ প্রায় যুগ যুগ ধরে বিদেশী শাসকদের দ্বারা শাসিত ও শোষিত হয়ে এসেছে। উপনিবেশিক রাজশক্তি পরিকল্পিতভাবে এদেশের অর্থনীতির নির্যাস অপহরণ করে তাদের দেশগুলিকে গড়ে তোলার বেনিয়া নীতি অনুসরণ করেছিল। কোনদিন পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। জনগণের সুখ-সুবিধা, কল্যাণের প্রতি নজর রেখে কোনদিন এখানকার সামাজিক বিন্যাস সাধনের চেষ্টা চলেনি। কখনও এখানকার জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালান হয়নি। বাংলাদেশের জনগণের প্রজ্ঞা, দক্ষতা ও শিক্ষাগত উৎকর্ষ বিধানের ক্ষেত্রে বিদেশী সরকারগুলি বোধগম্য ও ঐতিহাসিক কারণে বরাবর নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে এসেছে।

এরূপ একটি ঐতিহাসিক পটভূমিকায় স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও সামাজিক সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস সম্পাদনের দুরূহ দায়িত্ব আওয়ামী লীগ সরকারের স্কন্ধে এসে বর্তেছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সোনার বাংলা গড়ার দুঃসাহসিক স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার দুরতিক্রম সংকল্প নিয়ে বাঙালী জাতিকে অগ্রসর হতে হচ্ছে। তাই যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে পুনর্বাসন কার্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রযাত্রার প্রস্তুতি আমরা গ্রহণ করেছি।

 

 

দুটি কথা,

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনের ইস্তেহার প্রকাশ করা হলো। এই ইস্তেহারে সমকালীন সমস্যার আলোকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর একটা রূপরেখা দাঁড় করাবার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। এদিক দিয়ে আমাদের লক্ষ্যের সম্পূর্ণতা প্রতিভাত করা সম্ভব হয়নি।

একটি সদ্য-স্বাধীনতাপ্রাপ্ত জাতি এবং একটি বিধ্বস্ত সমাজের পুনর্গঠন ও পুনর্নির্মাণের ব্যাপক ও বিস্তৃত কর্মসূচী কোনক্রমেই একটি সংক্ষিপ্ত ইস্তেহারে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তাই বর্তমান দলিলে আমরা পার্টির প্রস্তাবিত সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর একটা রেখাচিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমাদের দলীয় ঘোষণাপত্রে আওয়ামী লীগের লক্ষ্য, আদর্শ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়া রয়েছে। তাই আমি দেশবাসীর নিকট আবেদন করব আমাদের দলীয় ঘোষণাপত্রের নিরিখে যেন নির্বাচনী ইস্তেহারটিকে বিবেচনা করা হয়।

 

গত ১১-১-৭৩ তারিখে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটির সভা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভা জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জনাব তাজউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক ইউসুফ আলী, জনাব আবদুর রব সেরনিয়াবাত, ড. কামাল হোসেন, জনাব আবদুস সাত্তার, জনাব কোরবান আলী ও জনাব শেখ ফজলুল হক মণিকে নিয়ে নির্বাচনী ইস্তেহার প্রণয়ন কমিটি গঠন করে এই কমিটির উপর নির্বাচনী ইস্তেহার প্রণয়নের দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপদেশ নিয়ে, দলীয় ঘোষণাপত্র এবং জাতীয় সংবিধানের মৌল আদর্শের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ দলিলটি কমিটি-প্রণয়ন করেন। শেখ ফজলুল হক মণি উক্ত কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। কমিটির ঐকান্তিক চেষ্টায় এই ইস্তেহার প্রণীত ও প্রকাশিত হচ্ছে। ঢাকার বাংলাদেশ কো- অপারেটিভ বুক সোসাইটির প্রেস কর্মীবৃন্দ আমাদেরকে সার্বিক সহযোগিতা দিয়েছেন। আমি এঁদের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

Leave a Comment