১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় ১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট

১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট

 

১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট

১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট

পূর্ববাংলার মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাঙালি জাতি, বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি এবং বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগ নেতৃত্বের কার্যকলাপ ও পাকিস্তানি শাসকদের ছয় বছরের শোষণের বিরুদ্ধে এই নির্বাচন ছিল ব্যালট বিপ্লব।

যদিও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র ও অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের ফলে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করেও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। যদিও এটি ব্যর্থ হয় কিন্তু ১৯৫৪ সালের নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য স্ব-স্ব জনসমর্থন যাচাইয়ের একটি সুযোগ সৃষ্টি করে। পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতিতে পরবর্তীকালে এ নির্বাচন সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে।

নির্বাচনের পটভূমি

পাকিস্তানের জন্মের কয়েক বছরের মধ্যেই জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক উপদলসমূহের মধ্যকার ভাষা ও আঞ্চলিক রাজনীতি, স্বাধিকারের প্রশ্নে অব্যাহত মতানৈক্য এবং দ্বন্দ্ব দেশটিতে নতুন নতুন রাজনৈতিক দল গঠন আবশ্যক করে তোলে।

তারই পথ ধরে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি, নিজাম-ই-ইসলামী, পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস প্রভৃতি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়।

পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানিদের ওপর জোরপূর্বক উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেয়া সহ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের ক্রমবর্ধমান বৈষম্যনীতি ও নিপীড়ন পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য করে।

১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও ক্ষমতাসীন দল নানা অজুহাতে নির্বাচন বিলম্বিত করতে থাকে। ১৯৪৯ সালে অনুষ্ঠিত টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে সরকার দলীয় প্রার্থীর চরম ভরাডুবি সরকারকে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের বিষয়ে আরো সন্দিহান করে তোলে। আইন পরিষদের ৩৪টি শূন্য আসনে উপনির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়।

এসব ঘটনা এ অঞ্চলের রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে উৎসাহিত করে। অবশেষে সরকার ১৯৫৩ সালে ভারত শাসন আইনের নির্বাচন সংক্রান্ত ধারায় কিছুটা সংশোধন করে ১৯৫৪ সালের ৮ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচনের দিন ধার্য করে।

যুক্তফ্রন্ট গঠন ও এর কর্মসূচি

নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগকে চরম শিক্ষা দেয়ার লক্ষে এ অঞ্চলের কয়েকটি সমমনা দল জোট গঠন করে। ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যুক্তফ্রন্ট মূলত চারটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত হয়।

এগুলো হলো- মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগ, ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক-শ্রমিক পার্টি, মাওলানা আতাহার আলীর নেতৃত্বাধীন নিজাম-ই-ইসলামী এবং হাজী দানেশের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী গণতন্ত্রী দল। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট প্রতীক হিসেবে বেছে নেয় ‘নৌকা’ এবং ‘বাংলা’কে রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনাধিকারের দাবিসহ ২১ দফাভিত্তিক নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে।

নির্বাচনের প্রাক্কালে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে সমাজের সর্বস্তরের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম যুক্তফ্রন্ট ২১ দফা সম্বলিত এমনই একটি বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করে। এটি রচনায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন আবুল মনসুর আহমদ। এই ২১ দফা কর্মসূচি ছিল নিম্নরূপ-

১. বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দান ।

২. বিনা ক্ষতিপূরণে সমস্ত খাজনা আদায়কারী স্বত্ব উচ্ছেদ ও রহিতকরণ এবং ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে উদ্বৃত্ত জমি বিতরণ।

৩.পাট শিল্প জাতীয়করণ। মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভার আমলে পাট সংক্রান্ত কেলেঙ্কারির তদন্ত ও শাস্তি বিধান ।

৪. কৃষির উন্নতির জন্য সমবায় কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং সরকারি সাহায্যে সকল প্রকার কুটির ও হস্তশিল্পের উন্নতি সাধন ।

৫. লবণ তৈরির কারখানা স্থাপন। মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভার আমলে লবণ কেলেঙ্কারির তদন্ত ও শাস্তি বিধান ।

৬. শিল্প কারিগর শ্রেণীর মোহাজেরদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।

৭. খাল খনন ও সেচের ব্যবস্থা করে দেশকে বন্যা ও দুর্ভিক্ষের কবল হতে রক্ষা করা।

৮. শিল্প ও খাদ্যে দেশকে স্বাবলম্বী করা। আই.এল.ও’র মূলনীতি অনুযায়ী শ্রমিকদের সকল প্রকার অধিকার নিশ্চিত করা।

৯. দেশের সর্বত্র একযোগে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন।

১০. কেবল মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা। সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়সমূহের মধ্যে ভেদাভেদ দূর করে একই পর্যায়ভুক্ত করা। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে সরকারি সাহায্যপুষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।

১১. ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রভৃতি কালাকানুন বাতিল ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ব্যবস্থা।

১২. শাসন ব্যয় হ্রাস করা। বেতনভোগীদের বেতনের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান। মন্ত্রীর বেতন এক হাজারের বেশি না হওয়া।

১৩. ঘুষ, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করার লক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।

১৪. জননিরাপত্তা আইন ও অর্ডিন্যান্স প্রভৃতি কালাকানুন রদ। বিনা বিচারে আটক বন্দিদের মুক্তি দেওয়া। সংবাদপত্র ও সভা-সমিতি করার অধিকার নিশ্চিত করা।

১৫. বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক করা ।

১৬. পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ‘বর্ধমান হাউস’কে আপাতত ছাত্রাবাস ও পরে ‘বাংলার ভাষার গবেষণাগারে’ (বর্তমানে এটি বাংলা একাডেমি) পরিণত করা ।

১৭. ‘৫২-এর ভাষা শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ।

১৮. ২১ ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা।

১৯. ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী পূর্ববাংলাকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান। দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যাতীত আর সবকিছু পূর্ববাংলার সরকারের হাতে ন্যস্ত করা। আত্মরক্ষার স্বার্থে পূর্ববাংলায় অস্ত্র নির্মাণ কারখানা স্থানান্তর ।

২০. যুক্তফ্রন্টের সরকার কোনো অজুহাতেই আইন পরিষদের আয়ু বাড়াবে না। আইন পরিষদের আয়ু শেষ হওয়ার ৬ মাস পূর্বে মন্ত্রিসভার পদত্যাগ এবং নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা ।

২১. আইন পরিষদের কোনো আসন শূন্য হলে, তিন মাসের মধ্যে উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তা পূরণ ।

প্রধান নির্বাচনী ইস্যু ও প্রচার কৌশল

নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট পূর্ববাংলার শিক্ষক, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক তথা আপামর জনসাধারণের ভাবাবেগের প্রতি লক্ষ রেখে কর্মসূচি গ্রহণ করে। নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে ফ্রন্ট ‘বাংলাকে’ রাষ্ট্রভাষার দাবি এবং পূর্ববাংলার আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনাধিকারকে প্রাধান্য দেয়। তাছাড়া ফ্রন্ট আঞ্চলিক বৈষম্য ও শোষণের নীতি ও শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, পাটশিল্প জাতীয়করণ, সমবায় ও ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য সাহায্য ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করে বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসে।

অপরদিকে মুসলিম লীগ গণমুখী কোন ইস্যু তুলে ধরতে পারেনি। ভোটারদের কাছে মুসলিম লীগের একমাত্র বক্তব্য ছিল, তারা ইসলামিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করবে। লীগের নির্বাচনী শ্লোগান ছিল দু’টি। একটি ‘ইসলাম বিপন্ন’, দ্বিতীয়টি ‘পাকিস্তান বিপন্ন’। মুসলিম লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় পূর্ববাংলার জনগণের মৌলিক সমস্যা ও প্রয়োজন উপেক্ষিত হয়। এর ফলে জনগণের কাছাকাছি পৌঁছাতে এ দলটি ব্যর্থ হয়।

উপরন্তু, যুক্তফ্রন্ট সমসাময়িক লবণ সংকটের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে এবং সরকারকে ঘায়েল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যা সরকারকে ‘গণবিরোধী’, দুর্নীতিপরায়ণ’ ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় ফেলে দেয়। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে যে যুবক, ছাত্র তরুণরা মুসলিম লীগের পক্ষে কাজ করে তারাই যুক্তফ্রন্টের সমর্থনে এ অঞ্চলের গণজোয়ার সৃষ্টি করে।

পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরা যুক্তফ্রন্টের পক্ষে জনসমর্থন আদায়ের জন্য সুদূর লোকালয়ে কাজ করে। পূর্ববাংলার খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ মাওলানা ভাসানী, আবুল মনসুর আহমদ, শেখ মুজিব, আতাউর রহমান, ফজলুল হক এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়ে প্রচারাভিযান চালান ।

নির্বাচনের ফলাফল

১৯৫৪ সালের ৮ মার্চ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে মোট ৩০৯টি আসনের মধ্যে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ২৩৭টি আসনে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসনে (আওয়ামী লীগ এককভাবে ১৪৩টি) জয়ী হয় এবং প্রদত্ত ভোটের ৬৪% লাভ করে। সরকারি দল মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন যা প্রদত্ত ভোটের ২৭% মাত্র। বাকি ৫টি মুসলিম আসনের ৪টি পায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এবং ১টি পায় খেলাফত-ই-রব্বানী পার্টি।

এছাড়া মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ৯টি আসনের সবকটিই যুক্তফ্রন্ট লাভ করে। নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী যুক্তফ্রন্ট প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা গঠনের যোগ্যতা অর্জন করে ।

নির্বাচনের গুরুত্ব

প্রথমত, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন পূর্ববাংলার সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত প্রথম অবাধ নির্বাচন। এই নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। এ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে ব্যালটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করে। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় এ অঞ্চলের নেতৃবৃন্দের জনপ্রিয়তা ও তাদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি গভীরভাবে আলোকপাত করে এবং বাঙালি জাতির ঐক্যবোধকে আরো প্রগাঢ় করে তোলে।

নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ক্ষমতাসীন দলের বহু প্রভাবশালী নেতা, এমনকি মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন যুক্তফ্রন্টের তরুণ নেতা খালেক নেওয়াজ খানের কাছে পরাজিত হন। শিক্ষামন্ত্রী সৈয়দ আবদুস সালাম, মোনায়েম খান, খান এ. সবুর, সৈয়দ আফজাল, গমির উদ্দিন প্রধান বিপুল ভোটে পরাজিত হন।

নির্বাচনের মাধ্যমে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল এ অঞ্চলের গণমানুষের প্রাণের দাবি এবং এ অঞ্চলের নেতারাই ভবিষ্যত নেতৃত্বের বৈধ দাবিদার। তাছাড়া এ নির্বাচনে আওয়ামী মুসলিম লীগ এককভাবে সর্বাধিক আসনে জয়ী হওয়াতে এই দল ও দলীয় নেতৃবৃন্দের ভবিষ্যত উজ্জ্বল হয়ে যায়।

নির্বাচনের ফলাফল এটাই প্রমাণ করে যে, পূর্ববাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক স্বার্থ পশ্চিম পাকিস্তান হতে সম্পূর্ণ পৃথক এবং এ অঞ্চলের নেতৃবর্গই এদের স্বার্থ সংরক্ষণে সক্ষম। সর্বোপরি, এ নির্বাচনের ফলাফলের মধ্যে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের পুনঃপ্রতিফলন (দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র) ঘটে। যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের মধ্যদিয়ে পূর্ববাংলায় যে ঐক্যবোধ গড়ে ওঠে তা পরবর্তী জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে ।

দ্বিতীয়ত, এই নির্বাচন ও ফলাফলের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন ধারার সৃষ্টি হয়। বিভাগ পূর্ববর্তী রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রভাবের স্থলে ১৯৫৪ সাল থেকে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির সূচনা ঘটে। ইসলাম রক্ষা ও পাকিস্তান রক্ষার দোহাই দিয়ে বাঙালিকে শোষণের দিন শেষ হয়। নির্বাচনী কর্মসূচি বাঙালির বঞ্চনা ও শোষণের বিভিন্ন দিক পরিস্ফুটিত করে যা পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে স্বায়ত্ত্বশাসন আন্দোলনকে চাঙ্গা করে তোলে।

তৃতীয়ত, পূর্ববঙ্গের জনগণের স্বার্থে দলগুলোর জোট গঠনের ফলে রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শগত অমিল সত্ত্বেও বৃহত্তর স্বার্থে ঐকমত্য পোষণ পরবর্তীকালে আন্দোলনের বিজয়কে নিশ্চিত করে।

চতুর্থত, কৌশলগত কারণে কমিউনিস্টরা তাদের দলীয় প্রার্থী হওয়ার পরিবর্তে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয় এবং ১৫টি আসন লাভ করে। এছাড়া কংগ্রেস ও অন্যান্য দলের ৯জন সংখ্যালঘু যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী হয়ে জয়ী হন। এরা সকলে ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের মনোনীত। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ এদেশের রাজনীতিতে প্রধান দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের মূলে রাজনীতির এই মেরুকরণের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।

‘৫৪ সালের পর সরকার বিরোধী কর্মসূচিসহ সকল আন্দোলনে ধর্মভিত্তিক দল বনাম ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো স্বতন্ত্রভাবে অংশ নেয়। যুক্তফ্রন্টের সবচেয়ে বড় দল আওয়ামী লীগ ১৯৫৫ সালে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে ‘আওয়ামী লীগ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে ।

পঞ্চমত, এই নির্বাচনের আরো একটি উল্লেখ্যযোগ্য ফল হলো পূর্ববাংলার জাতীয় রাজনীতির চরিত্র পরিবর্তিত হয়। পূর্ববাংলায় এতোদিন এলিট শ্রেণী ও ভূস্বামীদের যে একক কর্তৃত্ব ছিল তা এ নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় শিক্ষিত এলিট গোষ্ঠী, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক ও ব্যবসায়ীদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়।

নির্বাচিতদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক ছিলেন তরুণ। এদের অনেকে পরবর্তীকালে স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালে রাজনীতিতে অসামান্য অবদান রাখেন।

ষষ্ঠত, এই নির্বাচনের মাধ্যমে মুসলিম লীগ ও অবাঙালি নেতৃত্ব সম্পর্কে বাঙালির মোহমুক্তি ঘটে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গবাসীরা পুনরায় স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে রায় দেয়। মুসলিম লীগের চরম ভরাডুবি ও জনগণ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়। মুসলিম লীগ আর কখনো জনসমর্থন পায়নি। ফলে এটি একটি কাগুজে দলে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে এটি বহুধা বিভক্ত হয় এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে কোন আসন লাভ করতে ব্যর্থ হয়।

 

মন্ত্রিসভা গঠন

নির্বাচনোত্তর যুক্তফ্রন্টের সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচনের পূর্বেই পূর্ববাংলার গভর্নর চৌধুরী খালেকুজ্জামান ফজলুল হককে মন্ত্রিসভা গঠনের আমন্ত্রণ জানান। ফ্রন্টের অন্যতম নেতা সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্ৰীয় রাজনীতিতে নিয়োজিত থাকায় এ.কে. ফজলুল হক ৪ সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রিসভা গঠন করেন।

তিনি নিজে মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও অর্থ, স্বরাষ্ট্র ও রাজস্ব বিভাগের দায়িত্বে থাকেন; আবু হোসেন সরকার বিচার, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার বিভাগের; আশরাফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী বেসামরিক সরবরাহ ও যোগাযোগ বিভাগের এবং সৈয়দ আজিজুল হক শিক্ষা, বাণিজ্য, শ্রম ও শিল্প বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।

কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ ও যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল

যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার শুরু থেকেই মন্ত্রীত্ব নিয়ে শরিক দলগুলোর মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দেয় যা ছিল যুক্তফ্রন্ট সরকারের চরম দুর্বলতা। মন্ত্রিসভা গঠনের কিছুদিন পর মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক কলকাতা সফরে যান এবং সেখানে দুই বাংলার অধিবাসী ও তাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি নিয়ে এক আবেগপ্রবণ ভাষণ দেন যা ক্ষমতাসীন সরকারকে ক্ষেপিয়ে তোলে।

যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২১ ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটির দিন এবং পূর্ববর্তী মুসলিম লীগ সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘বর্ধমান হাউজকে ভাষা আন্দোলনের স্মারক গবেষণাগার ঘোষণা দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরাগভাজন হয়। এ সময় দু’টি ঘটনা হক মন্ত্রিসভাকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়।

সেগুলো হল- ২ মে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের সম্মুখে জেল কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় মহল-বাসীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং ১৫ মে আদমজী পাটকলে বাঙালি ও বিহারি শ্রমিকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষকে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট সরকারের দুর্বলতা বলে আখ্যায়িত করে। সর্বশেষ, ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস্’ পত্রিকার সংবাদদাতা কালাহানকে দেওয়া ফজলুল হকের তথাকথিত সাক্ষাতকার কেন্দ্রীয় সরকারকে বিচলিত করে তোলে।

পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ফজলুল হক পূর্ববাংলার স্বাধীনতা ঘোষণার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক নানা চেষ্টা করেও কেন্দ্রীয় সরকারকে বোঝাতে ব্যর্থ হন। কেন্দ্রীয় সরকার ‘৫৪ সালের ৩০মে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের ৯২ (ক) ধারা বলে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বরখাস্ত এবং পূর্ববাংলায় গভর্নরের শাসন ঘোষণা করেন। এভাবে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার অবসান ঘটে।

যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল ও পূর্ববাংলায় প্রতিক্রিয়া

পাকিস্তান সরকার যুক্তফ্রন্টের নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেফতার শুরু করে। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হককে গৃহে অন্তরীণ রাখা হয়, মাওলানা ভাসানীর স্বদেশে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, শেখ মুজিব সহ বহু তরুণ নেতাকে গ্রেফতার করা হয় এবং যুক্তফ্রন্ট অফিসে তালা লাগানো হয়।

এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ পূর্ববাংলায় চরম অসন্তোষ দেখা দেয় এবং ফ্রন্ট কর্মীরা অফিসে মিটিং করতে ব্যর্থ হয়ে ফ্রন্ট নেতা আবু হোসেন সরকারের বাসভবনে মিটিং আহ্বান করে।

সভায় নেতৃবর্গ মন্ত্রিসভা বাতিল এবং সরকারের গণহারে গ্রেফতারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয় এবং প্রয়োজনে একযোগে কারাবরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, কিন্তু ফজলুল হক এ সিদ্ধান্ত পরিহার করে নেতৃবৃন্দকে গ্রামে গিয়ে বিপ্লবী ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম গ্রহণের পরামর্শ দেন। তাতে কোন ফল হয়নি।

একদিকে ফজলুল হকের অনীহা এবং ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর অনুপস্থিতি, অপরদিকে সরকারের কঠোর দমননীতির মুখে যুক্তফ্রন্টের আন্দোলন শেষপর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কিন্তু ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের রায়কে উপেক্ষা করে অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালুর বিরুদ্ধে পূর্ববাংলায় আন্দোলন থেমে যায়নি। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র রচিত হয়ে, এতে পূর্ববাংলার যথেষ্ট ভূমিকা ছিল।

সংবিধান রচনার পেছনে এ.কে. ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, আবুল মনসুর আহমদ, আতাউর রহমান খান এবং শেখ মুজিবুর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই শাসনতন্ত্রে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার কিছু কিছু বিষয় যেমন- স্বায়ত্তশাসন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদা দাবি অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীকালে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনে, ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ শেখ মুজিবের বক্তৃতায় যুক্তফ্রন্টের প্রতি অবিচার ও সরকারি বৈরীনীতি বারবার উল্লেখ করা হয় ।

যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা আপাতত দৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। কেন্দ্রের স্বৈরাচারী ক্ষমতাবলে মন্ত্রিসভা বাতিল ও সরকার বিরোধী আন্দোলনকে আপাতত দমন করা সক্ষম হলেও নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতির মধ্যে যে চেতনা ও ঐক্যবোধ গড়ে উঠেছিল তা স্তিমিত করতে পারেনি। ষাটের দশকে কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধী আন্দোলনে বাঙালিদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে তা প্রতীয়মান হয়।

সারসংক্ষেপ

পূর্ববাংলার মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাঙালি জাতি, বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি এবং বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগ নেতৃত্বের কার্যকলাপ ও পাকিস্তানি শাসকদের ছয় বছরের শোষণের বিরুদ্ধে এই নির্বাচন ছিল ব্যালট বিপ্লব। যদিও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র ও অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের ফলে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করেও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি।

যদিও এটি ব্যর্থ হয় কিন্তু ১৯৫৪ সালের নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য স্ব-স্ব জনসমর্থন যাচাইয়ের একটি সুযোগ সৃষ্টি করে। পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতিতে পরবর্তীকালে এ নির্বাচন সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র, ১ম খন্ড, ঢাকা, তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়, ১৯৮৩।

২। কামালউদ্দিন আহমেদ, ‘চুয়ান্ন সালের নির্বাচন: স্বায়ত্তশাসন প্রসঙ্গ’, সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত, বাংলাদেশের ইতিহাস ১৭০৪-১৯৭১, প্রথম খন্ড, ঢাকা, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ১৯৯৩।

৩। নূরুল ইসলাম মঞ্জুর, ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস ১৯৪৭-১৯৫৮’, সালাহ্উদ্দীন আহমদ ও অন্যান্য সম্পাদিত, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস ১৯৪৭-১৯৭১, ঢাকা, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৭।

 

১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নঃ

১। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী কর্মসূচি সংক্ষেপে লিখুন।

২। ১৯৫৫ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইস্যু ও প্রচার কৌশল লিখুন ।

৩। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের কারণ লিখুন।

রচনামূলক প্রশ্নঃ

১। ১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও এর ফলাফল সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করুন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর গুরুত্ব নির্ণয় করুন।

২। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের সরকার গঠন, বাতিল ও বাতিলের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লিখুন। যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পেছনে আপনি কি কারণ চিহ্নিত করবেন?

Leave a Comment