আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ পরিদর্শন করা। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
পরিদর্শন করা

পরিদর্শন
আমি অপারেশনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করি এবং এ পরিকল্পনা সার্বক্ষণিকভাবে পর্যালোচনা করা হতো। এ সময়ে পাকিস্তানের বহু প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ সফরে গিয়েছিলেন। তাদের মূল্যবান পরামর্শ আমার জন্য সহায়ক হয়েছে। লাহোরে সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও আমাকে রাজনীতিবিদদের সংস্রবে আসতে হয়েছিল। তবে পূর্ব পাকিস্তানে রাজনী কাদের সফর ছিল সত্যি উৎসাহব্যঞ্জক।
গোটা পরিস্থিতি সম্পর্কে মাওলানা মুফতী মাহমুদের গভী অত্যন্ত মুগ্ধ হই। তিনি অভিমত প্রকাশ করেন যে, শক্তিপ্রয়োগ গণ-আন্দোলন বেশিদিন দমন করে রাখা যাবে না। তিনি আরো বলেছিলেন যে, স্বাভাবিক অবস্থা অনেকখানি ফিরে এসেছে। তাই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করার হবে এবং এবং একটি রাজনৈতিক নিষ্পত্তি খুঁজে বের করার এটাই মোক্ষম সময়। এ সমস্যা হচ্ছে মূলত রাজনৈতিক ।
মুজিব একতরফাভাবে স্বাধীনতা অথবা যুদ্ধ ঘোষণা করেন নি। ভারত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার হচ্ছে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার যার সাহায্যে একটি রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌঁছানো সম্ভব। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে অভিমত প্রকাশ করেন। কারণ তারাও পাকিস্তানি এবং লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এলএফও) অনুযায়ী তাদেরকে তাদের ন্যায্য অধিকার দিতে হবে।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনার ফলে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাবে। কারণ, পূর্ব পাকিস্তানিরা ভাবছে যে, তাদেরকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তাই তারা স্বাধীনতা চাইবে। তিনি আরো বলেছিলেন, ‘সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তান টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী নন।’ কতো সত্য কথাই না তিনি বলেছিলেন।
অন্যান্য নিয়মিত দর্শনার্থীদের মধ্যে রয়েছেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সাবেক স্পিকার ফজলুল কাদের চৌধুরী, জনাব আবদুস সবুর খান, জনাব সিরাজুল হক এবং মৌলভী ফরিদ আহমদ। তারা ছিলেন খুবই অনুগত পাকিস্তানি।
তারা দেশকে ভালোবাসতেন এবং দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে চেয়েছিলেন। তারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং অবিলম্বে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য বার বার অনুরোধ করছিলেন।
দুর্ভাগ্যক্রমে, মুক্তিবাহিনী মৌলভি ফরিদ আহমেদকে হত্যা করে । এ ছাড়া আরো বহু পূর্ব পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দ নিহত হন। চট্টগ্রাম থেকে পালানোর চেষ্টাকালে ফজলুল কাদের চৌধুরী ভারতীয় বাহিনীর হাতে বন্দি হন। সিরাজুল হক ছিলেন ডা. মালিকের মন্ত্রিসভার একজন সদস্য। তিনি কপাল গুণে বেঁচে যান। বিহারিরা ছিল শেষ দিন পর্যন্ত অনুগত। এ জন্য তাদের চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হয়।
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে রাওয়ালপিন্ডি থেকে ফিরে এসে ব্রিগেডিয়ার বাকির আমাকে জানান যে, তিনি বিশ্বস্ত সূত্রে জানাতে পেরেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের মোতায়েন সেনাবাহিনীকে বলির পাঁঠা বানানোর জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং জান্তা পূর্ব পাকিস্তান পরিত্যাগেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রাজনৈতিকমহলে গুজব ছিল যে, লারকানায় ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এসব কথা বিস্তারিত জানা সম্ভব হয় নি। আরো বলা হয় যে, তারা পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করতে এমএম আহমেদকে নির্দেশ দিয়েছেন।

চিফ অব স্টাফ জেনারেল হামিদ অক্টোবরে সফরে গেলে ব্রিগেডিয়ার বাকিরের কাছ থেকে আমি যা শুনেছি তা তাকে জানাই, কিন্তু তিনি তা অস্বীকার করেন। মনে হচ্ছিল যে, তিনি সত্য কথা বলছিলেন না। পরে প্রমাণিত হয়েছে। যে, গুজব কতো সত্য ছিল।
