আজকের আলোচনার বিযয় পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-১, যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত, শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর যদি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করা হতো যে পাকিস্তানের জন্য একটা অর্থবহ যুগের সূচনা হয়েছে তাহলে অবস্থা খুবই আশাব্যঞ্জক হতে পারতো। কিন্তু অনেকেই এ ধরনের আশাবাদে অংশীদার হতে পারেনি। নির্বাচনের ফল কোনো বড় রকমের স্বস্তি নিয়ে আসেনি। বরং এটি বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাঝে বিভিন্ন কারণে, বিভিন্ন মাত্রায় অস্বস্তিকর প্রভাব ফেলে । অবশ্য এর সাধারণ কারণটি ছিল নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাফল্য।
পাকিস্তানের তৎকালীন ক্ষমতার কাঠামোটি —যা সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র এবং ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও সামন্ত অভিজাতদের সমন্বয়ে গঠিত, যাকে যথার্থই “ত্রিশূল”১ তথা ত্রয়ী শক্তি বলে অভিহিত করা হয়েছে— সেই শাসকগোষ্ঠী একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল জাতীয় পরিষদে আসায় প্রথমবারের মতো সত্যিকারের সমস্যায় পড়ে, কেননা পাকিস্তানী সমাজের ঐ অংশগুলির সাথে এই রাজনৈতিক দলের কোনো তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল না । এ রকম সঙ্কট আগেও হতে পারতো তবে পাকিস্তানী শাসকরা বিগত দু’দশক ধরে ঐ সম্ভাব্য সঙ্কট নিপুণ কৌশলে এড়িয়ে এসেছে। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতিতে ক্ষমতার ঐ “ত্রয়ী শক্তি” (প্রায়) রীতিমতো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।
পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-১
![পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-১ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ] 2 পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-১](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2007/01/আওয়ামী-লীগ02.jpeg)
সাবেকী ধরনের প্রবীণ রাজনীতিকরা হতাশাব্যঞ্জকভাবে রাজনীতির রণক্ষেত্রে পরাজয় বরণ করেন। তাঁরা পশ্চিম পাকিস্তানে ভুট্টো ও পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবের অভ্যুদয়ে নিজেদের অস্তিত্ব হারান । ভুট্টো দৃষ্টত পশ্চিমাঞ্চলের পক্ষে কথা বলার অধিকার জয় করেছিলেন। অন্তত গোড়ার দিকে হলেও তাঁর আশঙ্কা ছিল যদি শাসকচক্র আওয়ামী লীগের সাথে কোনো রকম রফা করে তাহলে তাতে তাঁর স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হতে পারে। আর যদি তা হয়ই তাহলে তাঁর দলের তো বটেই, আরো শঙ্কার কথা, তাঁর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও বিপন্ন হবে। নির্বাচনে শিকার হওয়া পক্ষগুলির মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা তাই অনিবার্য ছিল। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানে এ ধরনের সম্ভাবনাটি অদৃষ্টপূর্ব ছিল না।
আওয়ামী লীগ ও দলের ছাত্র অনুসারীরা নির্বাচনোত্তর ঘটনার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে কখনই খুব আশাবাদী ছিলেন না। নির্বাচনের পরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মতো বিপুল সাফল্য সত্ত্বেও দলনেতারা সন্দিহান ছিলেন। আর তারা জনসাধারণের কাছে এ কথা গোপন রাখেননি। এই জনগণ ছিল, বলাবাহুল্য, তাঁদের নব প্রতিষ্ঠিত আনুষ্ঠানিক বৈধতার উৎস যার বলে তাঁরা প্রদেশের (যদিও তা টেকনিক্যাল দিক থেকে পাকিস্তানের বৃহত্তর অংশকেই বোঝায়) পক্ষে কথা বলতে সক্ষম হলেন। পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণকে এই বলে সতর্ক করে দেওয়া হয় যে, যদিও নির্বাচনের ফল “বাংলাদেশ”-এর নির্যাতিত মানুষের জয় সূচিত করেছে, লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি। এ কারণে ছয়-দফা বাস্তবায়নের আন্দোলন চলতে থাকবে।
আগামীতে কী হবে না হবে—এ নিয়ে সন্দেহ-সংশয়ের বীজ পাকিস্তানের রাজনৈতিক অতীতেই নিহিত ছিল । প্রথমত, এ সন্দেহ-সংশয় জোরদার হয় এলএফও’তে সন্নিবেশিত কতিপয় বিধানের কারণে; দ্বিতীয়ত, পরে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বারংবার অঙ্গীকার ব্যক্ত করার সময় তাঁর কিছু মন্তব্যের কারণে। এ রকম একটি মন্তব্য ছিল, যে কোনো দল এলএফও মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালে ধরে নেওয়া হবে সেই দল কখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি।
এ মন্তব্যে জল্পনা-কল্পনার ঢেউ বয়ে যায় । অনেক পর্যবেক্ষক, প্রেসিডেন্ট আগে যা বলেছিলেন আর এখন যা বলছেন তার মধ্যে তারতম্য লক্ষ্য করেন। তাঁর আগের প্রস্তাবাবলি ও এলএফও’তে বলা ছিল যে, এলএফও কাঠামোর মধ্যে ও নির্ধারিত সময়ে শাসনতন্ত্রের খসড়া প্রণয়নে ব্যর্থ হলে জাতীয় পরিষদ আপনাআপনি বাতিল হয়ে যাবে ও সামরিক শাসন চলতে থাকবে।
কিন্তু তাঁর পরের মন্তব্য সম্পর্কে (পূর্ব পাকিস্তানে) সাধারণ ব্যাখ্যা এভাবে করা হয় যে, তিনি এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেছেন যা অশুভ ইঙ্গিতবাহক । কেননা, তাঁর এ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এলএফওপন্থী পরিষদ সদস্যদের নিয়ে জাতীয় পরিষদ চলতে থাকবে আর সম্ভবত এই ব্যবস্থার আওতায় উপনির্বাচনের মাধ্যমে এলএফও বিরোধীদের বাদ দেওয়া হবে। তারপর খয়ের খাঁ এমএনএদের সাহায্যে তাঁর পছন্দমাফিক একটি শাসনতন্ত্র তৈরি করে এ সব সদস্যের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য সামরিক আইন তুলে নেওয়া হবে।
পূর্ব পাকিস্তানীদের এই আশঙ্কার কথা গোপন ছিল না । এই অস্বস্তিতে আরো যুক্ত হয়, সরকারি আমলা মহলে ও পূর্ব পাকিস্তানের কোনো কোনো সরকারপন্থী ব্যক্তিদের মাঝে বিরাজমান কিছু অভিমত। তাঁদের অভিমত ছিল এই যে, পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ সংসদীয় ব্যবস্থা কিংবা পূর্ণ প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার—কোনোটিই উপযোগী নয়।
সে জন্য একটা মিশ্র পদ্ধতি বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তুরস্কের শাসনতন্ত্রের প্রায়ই উল্লেখ চলতে থাকে। তুর্কী শাসনতন্ত্রে আইন পরিষদের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের কথা থাকলেও ইসলামাবাদের সরকার হয়তো তুর্কী শাসনতন্ত্রের ১১১ অনুচ্ছেদের বিধানাবলি সন্নিবেশের বিষয় বিবেচনা করছিলেন। এ সব বিধানে প্রেসিডেন্ট জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মাধ্যমে তাঁকে প্রদত্ত ক্ষমতা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দিতে পারেন ।
পূর্ব পাকিস্তানীরা সবচেয়ে বেশি বিমূঢ় হয় এ কারণে যে, তদবধি পূর্ব পাকিস্তানের, বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের এলএফও অগ্রাহ্য করার মনোভাব দেখেও দেখা হয়নি। আর আওয়ামী লীগ যে এলএফও’কে ধর্তব্য কোনো বিষয় নয় বলেছে, সে কথা না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল। এ পরিবর্তন কোন সুবাদে? সম্ভবত প্রেসিডেন্ট (যথার্থই) তাঁর আগেকার পরিকল্পনার কার্যকারিতা সম্পর্কে সন্দেহ করতে শুরু করেছিলেন।
এলএফও- নির্ধারিত একটি শাসনতন্ত্র মেনে নেওয়া অথবা সামরিক শাসন আইন চলতে থাকা—এ দুয়ের মধ্যে যে কোনো একটি পথ বেছে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার মধ্যে এ অনুমান স্পষ্টতই ছিল যে, পূর্ব পাকিস্তান কম খারাপ জিনিসটিই বেছে নেবে যেমনটি সে করেছিল ‘৫০-এর দশকের মাঝামাঝি। সে সময় আওয়ামী লীগ (প্রতিবাদসহকারে) সমতানীতি ও বহুলাংশেই অগ্রহণযোগ্য শাসনতন্ত্র মেনে নিয়েছিল এই আশায় যে, এতে সামরিক আইন জারি করা সম্ভব হবে না, একনায়কের শাসনও থাকবে না।
একজন পশ্চিম পাকিস্তানী ভাষ্যকার মনে করিয়ে দেন যে, “আমাদের পরিস্থিতি একই ধরনের, আর এ পরিস্থিতিতে একই পুরস্কার ও হুমকি রয়েছে।” আর তারপর ঐ ভাষ্যকার খুবই কঠিন ও তীক্ষ্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন: “তারা (পূর্ব পাকিস্তানীরা) কি মূলত সেই একই রেয়াত দেবে?”৭ স্পষ্টত পূর্ব পাকিস্তানের সাথে এ ধরনের সরল দরকষাকষি আর সম্ভব ছিল না । তাই প্রেসিডেন্ট স্বায়ত্তশাসনবাদীদের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন করে তোলার প্রয়াসে তাঁদেরকে বললেন, হয় এলএফও মেনে নিতে (অন্যভাষ্যে, তাঁর নির্দেশ) কিংবা জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁদের বৈধতার বাজেয়াপ্তির জন্য তৈরি থাকতে।
এ সব অনুমান করে শেখ মুজিব আগেই ঘোষণা করেছিলেন যে, দাবি না মেনে নেওয়া হলে, বাঙালিরা নিজেরাই স্বায়ত্তশাসনের বিকল্প স্থির করবে। তিনি আরো হুঁশিয়ার করে দেন যে, ২২ বছরের পুরানো ক্ষমতাসীনচক্রের জানা উচিত “এখন তাঁরা আগুন নিয়ে খেলছেন।
পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসকও প্রেসিডেন্টকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মোকাবেলার মনোভাব সম্পর্কে অবহিত করছিলেন। মোকাবেলার মনোভাব, অবশ্য, আওয়ামী লীগ প্রধানত মনে মনেই পোষণ করছিল । প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগ যা করছিল তাকে ব্যাপক ও তীব্র পরোক্ষ প্রতিরোধ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় ।
নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট তাঁর বেতার/টিভি ভাষণে প্রস্তাব করেছিলেন যে, নির্বাচন অনুষ্ঠান ও জাতীয় পরিষদের প্রথম সভার মধ্যবর্তী সময়টুকু রাজনীতিকদের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার কাজে লাগানো উচিত। এ নিয়ে আরেক দফা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে যায়। ঐকমত্যের অভাব পাকিস্তানী রাজনীতির অন্যতম মৌলিক বিষয়।
এই আলোকে প্রেসিডেন্ট হয় জটিলতার অবমূল্যায়ন করেছিলেন এই প্রত্যাশায় যে, স্বল্প সময়ের মেয়াদেই এগুলির নিষ্পত্তি হয়ে যাবে, নয় একটা কিছু ঘটবে। আর এ রকমটি হওয়ার সম্ভাবনাই ছিল বেশি। তিনি নির্বাচন অনুষ্ঠান ও জাতীয় পরিষদের প্রথম সভা অনুষ্ঠানের মাঝে একটা লম্বা সময়ের বিরতি বা ব্যবধানের কথা ধরে নিয়েছিলেন কিংবা কল্পনা করেছিলেন ।
কিন্তু তিনি কেমন করে ও কেন এত আগেই এই বিলম্বের আশঙ্কা বা আশা করেছিলেন বিশেষ করে যখন নির্বাচন তখনো অনুষ্ঠিত হয়নি? জাতীয় পরিষদে কোনো একক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হবে না বলে সরকারি গোয়েন্দা বিভাগের যে সব স্বস্তিদায়ক রিপোর্ট ছিল পর সেগুলির বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে কি তাঁর সন্দেহ ছিল? তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনো কোনো কনভেনশন লীগার ও কিছু লোককে১১ টাকা ধরিয়ে দিলেও তাতে কোনো কাজ হবে না? নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ের পূর্ব পাকিস্তানীদের মনোভাব কঠোর হয়ে ওঠার ঘটনা তাঁর কৌশল পরিবর্তনের জন্য আরেকটি সঙ্কেত হওয়া উচিত ছিল।
কোনো কোনো পর্যবেক্ষকের অবশ্য সুনিশ্চিত ধারণা যে, ইয়াহিয়া গোড়ার দিকে (১৯৭০ সালের এপ্রিল-নভেম্বরের মধ্যবর্তী সময়ে) মুজিবকে লম্বা ছাড় দিয়েছিলেন (মুজিবের এলএফও অগ্রাহ্য করার বিষয়টি দেখেও না দেখার আকারে) । এটি ঘটেছিল ইরানের শাহের পরামর্শে । ইরানের শাহ ১৯৭০ সালের এপ্রিলে পাকিস্তান (পূর্ব পাকিস্তানসহ) সফর করেছিলেন। এ সব সূত্রের মতে শাহ তাঁর ঐ সফরকালে দৃঢ়বিশ্বাস ব্যক্ত করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগ পাকিস্তানকে কমিউনিজমের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। এ কথা তিনি ইয়াহিয়াকে জানিয়েছিলেন ।
ইয়াহিয়া খানও তাঁর সে পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন শাহের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে। মুজিবের ব্যাপারে পরবর্তীকালে ইয়াহিয়ার মনোভাব কঠোর হওয়ার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে উল্লিখিত একই পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, চীন-মার্কিন সম্পর্কের বরফ ভাঙার নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রয়াসে বার্তাবাহকের ভূমিকার কারণে চীনা নেতাদের সাথে ইয়াহিয়ার নতুন ব্যক্তিগত সম্পর্কের ফল হিসেবেই তাঁর মনোভাবে এ কাঠিন্য দেখা দেয়। চীনাদের পরামর্শ ছিল এ রকম বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে যে, নির্বাচনের ফল যদি তেমনই নির্দেশ করে তাহলে আওয়ামী লীগকে যেন কোনোক্রমেই ক্ষমতা হস্তান্তর না করা হয়।
আওয়ামী লীগ আধিপত্যাধীন পাকিস্তানের ব্যাপারে চীনের অপছন্দ-সংশয়, বিশেষ করে, উল্লিখিত পর্যবেক্ষণ সঠিক হয়ে থাকলে বোধগম্য বটে। তথাকথিত ‘বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের (মস্কোপন্থী পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সম্মুখ সংগঠন সমর্থিত) প্রতি চীনা বিতৃষ্ণা স্বাভাবিক ব্যাপারই হতে পারতো।
“সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে” ক্রম উত্তরণের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের বারংবার অঙ্গীকারে চীনারা হয়তো “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী” সোভিয়েত ইউনিয়নের কোনো ক্রীড়নককে সন্দর্শন করে থাকবে আওয়ামী লীগ শাসিত পাকিস্তানে। অনুরূপভাবে, বেশি কিছু না হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের আওতায় অন্তত পাকিস্তান। ও ভারতের সম্পর্ক অধিকতর বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা তো ছিল। আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবির অন্তর্ভুক্ত ছিল প্রদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি করতে পারার অধিকার। এর অর্থ যথার্থই ছিল মূল্যবান বিদেশী মুদ্রা বাঁচানোর জন্য ভারতের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নত করা।
পাকিস্তানের বিদেশী মুদ্রার একটা মোটা অংশ তখন দূরদেশ থেকে পণ্য আমদানি খাতে অপচয় হচ্ছিল (আর সবচেয়ে ঘন ঘন উল্লিখিত আমদানি পণ্যটি ছিল কয়লা) । তাই স্পষ্টত ভারতের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতর বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ার অভিপ্রায়ে দুই পক্ষের মধ্যে আরো বন্ধুসুলভ পূর্বাভাস ছিল আর সেই সাথে তাতে ভারত ভীতির কোনো অন্তর্লীন জুজুর অনুপস্থিতিরও ইঙ্গিত ছিল। ১৯৭০ সালে চীন গণপ্রজাতন্ত্র আর যা-ই হোক কোনো ভারত-সোভিয়েতপন্থী পাকিস্তানকে সমর্থন জানাতে পারতো না ।
কেউ কেউ অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, চীন থেকে ফেরার পথে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত পূর্ব পাকিস্তানে বেশি দিন থাকতে পারেননি (তিনি চীনে যান, চীন-মার্কিন যোগাযোগে বার্তাবাহকের ভূমিকা পালনের জন্য), কেননা ঐ সময়ে সেনাবাহিনীতে আসন্ন এক সঙ্কট ঠেকানোর জন্য রাওয়ালপিণ্ডিতে তাঁর উপস্থিতির প্রয়োজন ছিল। বাহ্যত কিছু শীর্ষস্থানীয় পদস্থ সেনা কর্মকর্তার পদোন্নতির দাবি নিয়েই ঐ সমস্যা দেখা দেয়। তবে তাঁর নিজের আরো ভেতরের “চক্রে”১৩ ফেরার তাড়াটি এ জন্যেও হতে পারে যে, চীনের পরিকল্পনামাফিক একটি পরিকল্পনা ছকে ফেলাও হয়তো জরুরি হয়ে উঠেছিল।
আর সংশোধিত সিদ্ধান্তের জন্য তাঁর পরিতাপের কোনো প্রয়োজন ছিল না কেননা এই সিদ্ধান্তে হয়তো সশস্ত্র বাহিনী ও অসামরিক আমলা কট্টরপন্থীদের সাথে তাঁর আগের সম্পর্কটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখানে বলা দরকার, সরকারিভাবে ক্ষমতাবান হোক বা না হোক, এই কট্টর কর্মকর্তারা স্বায়ত্তশাসন মঞ্জুর দূরের কথা বরাবরই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গণতন্ত্রায়নের বিরোধী ছিলেন।
এই কট্টরপন্থী সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তারাই। গোলটেবিল সম্মেলন থেকে কোনো রকমের ন্যূনতম কার্যকর ফল যাতে না পাওয়া যায়। সে জন্য এ প্রয়াসে কূটাঘাত করেন এবং আইয়ুব খানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন। কারণ, তাঁদের আশঙ্কা ছিল, আইয়ুব হয়তো তাঁদের স্বার্থ বিকিয়ে একটা ‘আপোসরফা’ করে কোনো রকমে তাঁর গদিটির হেফাজত করবেন।
কারণ যা-ই হোক, ইয়াহিয়া খানের মনোভাব দৃষ্টিগোচরভাবেই বদলে যায়। আর তাতে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে তাঁর সত্যিকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্তানে যথেষ্ট সন্দেহ দেখা দেয় । পূর্ব পাকিস্তানে (ও পশ্চিম পাকিস্তানেও) এমন ধারণার সৃষ্টি হয় যে, যবনিকার আড়ালে একটা কিছু ঘটছে যার প্রকৃতি সম্পর্কে যদিও ব্যাপক পর্যায়ে জানা ছিল না তবু যাঁরা বাস্তবিকপক্ষে কী ঘটতে পারে তা জানতে যত্নবান ছিলেন তাঁদের বোধের অগম্য ছিল না । যাঁরা পাকিস্তানের তৎকালীন অভ্যন্তরীণ ও বহিঃসামাজিক শক্তিগুলির ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন তাঁদের পক্ষে কী অনিবার্য সত্য তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি।
এ জন্য আসন্ন বিপদের প্রথম প্রকাশ্য আভাস পেতেই আওয়ামী লীগ পরিকল্পিতভাবেই শাণিত তীক্ষ্ণতা ও তীব্রতায় নিজ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এ সময় ভুট্টো দাবি করেছিলেন যে, তাঁর দলের সহযোগিতা ও অংশীদারি ছাড়া কোনো শাসনতন্ত্র প্রণীত হতে পারে না, কোনো সরকারও কাজ করতে পারবে না, কেননা তাঁর দল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আইন পরিষদগুলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়া ছাড়াও “ক্ষমতার কেন্দ্রীয় ঘাঁটি” পাঞ্জাব ও সিন্ধুর প্রতিনিধিত্ব করে।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন যে, জাতীয় আইন পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আওয়ামী লীগই কেবল শাসনতন্ত্র প্রণয়নে ক্ষমতাবান আর তা করতে গিয়ে অন্য দলগুলির সহযোগিতা
নেওয়া হবে কিনা সেটি বিচার-বিবেচনা করে স্থির করার পুরো এখতিয়ার আ লীগের। তাজউদ্দিন আহমদ আরো উল্লেখ করেন যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এক প্রদেশের ওপর আরেক প্রদেশের শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্ন একান্তই অবান্তর ও অনভিপ্রেত আর দুর্গ”-এর মতো ধারণাগুলির বাতিলকরণই ছিল বাস্তবিকপক্ষে গণতান্ত্রিক সংঙ্গাসে যথার্থ লক্ষ্য। এ কথার পুনরুক্তি করে এ বিবৃতির ছেদ টানা হয় যে, আওয়ামী লীগ তার নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি সজাগ, দলটি তার এ দায়িত্ব পালনে প্রয়াসের ক করবে না।
এ রকম এক অর্থপূর্ণ বিবৃতি দেওয়ার সময় তাজউদ্দিন আহমদ হয়তোবা মনে রেখেছিলেন যে ভুট্টো তাঁর ক্ষমতা সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করছেন। যে পাঞ্জাব ও সিন্ধুকে তিনি তাঁর ক্ষমতার দুর্গ বলছেন আসলে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তাঁর দল এ প্রদেশগুলিতে যথাক্রমে ৪১.৬৬ ও ৪৪.৯৫ শতাংশ ভোট এবং গোটা পাকিস্তানে মাত্র ৩৮.৩৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
তাৎপর্যের বিষয়, ভুট্টো তাঁর উল্লিখিত অবস্থানের কথা ১৯৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর সেনাবাহিনী সদরদপ্তরে ইয়াহিয়া খান ও কিছু শীর্ষস্থানীয় জেনারেলদের সাথে প্রায় এক দিনব্যাপী বৈঠকের পর প্রথম প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। উল্লেখ্য, ১৭ ডিসেম্বর ছিল পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদগুলিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন। উৎসুক পর্যবেক্ষকরা লক্ষ্য করেন, প্রেসিডেন্ট কিংবা সেনাবাহিনীর উক্ত জেনারেলরা কেউ ঐ দিন তাঁদের ভোট প্রদান করতে ভোটকেন্দ্রে আসেননি। পরের অনুসন্ধানের আলোকে উল্লিখিত পর্যবেক্ষকদের এই বিশ্বাস জন্মায় যে, জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করতে একটি পরিকল্পনা তৈরিই ছিল ঐ বৈঠকের উদ্দেশ্য।
পিপিপির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো লাগাতার এই দাবি করতে থাকেন যে, পাকিস্তানের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে তাঁর দল অপরিহার্য। তিনি সম্ভবত নিশ্চিত হয়েছিলেন যে আওয়ামী লীগের পক্ষে তাঁর তিনটি মৌলিক অঙ্গীকার যথাঃ ইসলাম, সমাজতন্ত্র ও ভারতের সাথে হাজার বছরের যুদ্ধের বিষয় স্বীকার করে নেওয়া কার্যত সম্ভব হবে না। আর তাই তিনি এই অজুহাতে আওয়ামী লীগ ও পিপলস পার্টির মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাব দেন, কেননা, অন্যথায় তিনি তাঁর সমর্থকদের যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেগুলি রক্ষা করা সম্ভব হবে না । তিনি জাতীয় সংহতি বিপর্যস্ত হবে না সেইভাবে আগে থেকে স্বায়ত্তশাসনের সীমাচৌহদ্দি চিহ্নিত করার দাবি জানান।
” তাঁর এ দাবির প্রচ্ছন্ন তাৎপর্য ছিল এই যে, স্বায়ত্তশাসনের সীমারেখা নির্ধারণের একমাত্র লক্ষ্য ও মাপকাঠি ছয়-দফা (যেহেতু এ ক্ষেত্রে এ যাবৎ অন্য কোনো বিকল্প দেওয়া হয়নি) জাতীয় সংহতি বিপন্ন করবে। অবশ্য তিনি যুগপৎ এ কথাও স্বীকার করেন যে, আওয়ামী লীগ নেতারা বিচ্ছিন্নতাবাদী নন, আর শেখ মুজিব জনগণের কাছ থেকে যে অবস্থানের ম্যান্ডেট পেয়েছেন সেই অবস্থান থেকে তিনি বিচ্যুত হতে পারেন না। দৃষ্টত তিনি। অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছিলেন।
কিন্তু তাঁর সে সব কথাবার্তার একটা মনোনিবেশকেন্দ্র বা সারবিষয় ছিল। তাঁর এ সব ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলা কথাবার্তায় এই বাস্তবতার স্বীকৃতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়, গোড়ায় দরকষাকষির জন্যই ছয়-দফা দেওয়া হলেও জনগণের দেওয়া আনুষ্ঠানিক ম্যান্ডেটের পর আওয়ামী লীগ নেতারা পছন্দ করুন বা না-ই করুন ছয়-দফা আর দরকষাকষির বস্তু নয়।
তবে বাস্তবতা কবুল করা হলেও সেই পথ ধরে শোভনীয়তার সাথে সত্যতাকে গ্রহণ করা হয়নি। অপ্রশমা ভুট্টো বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোর শীর্ষের উৎকণ্ঠিত ত্রয়ী কর্তৃপক্ষের উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। সহজেই বোধগম্য যে, এ সব হৈ চৈমূলক কথার খৈ ফোটানোর ব্যাপারগুলি আসলে তাদের স্বার্থের (অর্থাৎ ত্রয়ী কর্তৃপক্ষ ও ভুট্টোর) অভিন্ন প্রকৃতির আভাস। এ সব নিশ্চয়ই ক্ষমতাসীনচক্রের দৃষ্টি এড়ায়নি।
আর সেই সাথে তাঁরা এও উপলব্ধি করেছিলেন যে, নির্বাচনকালে পাঞ্জাবে যে ধারায় ভোট পড়েছে তাতে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর সর্বস্তরের পরিষ্কার সমর্থনের সাক্ষ্য রয়েছে ভুট্টোর পক্ষে। এভাবে স্বার্থের এই একত্র সমাবেশ ভুট্টোর দৃঢ় অবস্থানকে আরো জোরদার করে এবং দেশের গণতন্ত্রায়ন প্রক্রিয়া বন্ধ করতে ইয়াহিয়া খানকে প্রয়োজনীয় মদদ যোগায়। ক্ষমতার কায়েমি গোষ্ঠীর সাথে ভুট্টোর যোগাযোগের বিষয়টি গোপন ছিল না। বাস্তবিকপক্ষে, ১৯৬৯ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার মার্শাল নূর খান এক প্রকাশ্য বিবৃতিতে বলেন যে, ভুট্টো “পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতা কব্জা করার” জন্য কোনো কোনো আমলার সঙ্গে চক্রান্ত করছেন।
ভুট্টো এমনি করেই একদিকে যেমন ক্ষমতার ত্রয়ী কর্তৃপক্ষের তথা তখনকার ক্ষমতাসীনচক্রের কাছাকাছি দ্রুত আসতে থাকেন, আওয়ামী লীগ তেমনি তার চেয়েও সম্ভবত দ্রুত ঠিক তার বিপরীত দিক অর্থাৎ জনগণের দিকে তথা তাদের ভবিষ্যৎ (প্রতিশ্রুত) ক্ষমতা কাঠামোর বুনিয়াদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ভুট্টোর বিরুদ্ধে আরো বাদ-প্রতিবাদে না গিয়ে আওয়ামী লীগ (পূর্ব পাকিস্তানের) জনগণের সাথে তার সংহতি প্রকাশের এক অভিনব উপায় বেছে নেয়। তারা জাতীয় ও প্রাদেশিক উভয় পরিষদে নির্বাচিত সকল সদস্যের এক প্রকাশ্য শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আহূত এক জনসভায় এই শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে নির্বাচিত সদস্যরা সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে শপথ গ্রহণ করেন যে, ছয়-দফা ও এগারো-দফা সনদ অনুযায়ী একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নে তাঁরা চেষ্টার কোনো ত্রুটি করবেন না। এ ছাড়া তাঁদের বিরোধিতার কোনো চেষ্টা হলে তাঁরা সে রকম যে কোনো শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলারও অঙ্গীকার করেন। শেখ মুজিব শ্রোতাদের উদ্দেশে বলেন, তিনি নিজেসহ কোনো আওয়ামী লীগার যদি তাঁদের শপথের সাথে বেঈমানি করে তাহলে তাদের যেন জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়।
তিনি শ্রোতাসাধারণকে আশ্বাস দেন, ঘোষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলের কাজটি বিপজ্জনক হলেও প্রক্রিয়াটির সাফল্য সুনিশ্চিত। তিনি নির্বাচনের ফল নিয়ে আত্মতুষ্টির বিরুদ্ধে তাঁদেরকে হুঁশিয়ার করে দেন। কেননা, তাঁর মতে, “আন্দোলনে যাঁরা ‘শহীদ’ হয়েছেন তাঁদের কাছে দেনা হয়তো আবারও রক্তেই পরিশোধ করতে হবে ।
” নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে নাকচ করে দেওয়ার জন্য যে “চক্রান্ত” করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে “আসন্ন এক সংগ্রামের” জন্য প্রস্তুতি নিতে (তিনি আগেও এই সম্ভাবনাটির কথাই বলেছিলেন) আওয়ামী লীগ কর্মীদেরকে প্রদেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে সাংগঠনিক তৎপরতা শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তিনি আরো পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, “নীতি সম্পর্কিত মৌলিক বিষয়গুলি” বিকিয়ে শাসনতন্ত্র প্রণয়নে কোনো সহযোগিতার সম্ভাবনা নাকচ করা হয়েছে।
তাঁর এ ভাষণে বিষয়বস্তুর বিচারে সম্পূর্ণ নতুন বলতে কিছু ছিল না। তবে একজন ভাষ্যকার যেমন বলেছেন, “এখন জনসাধারণ তাঁর কথাবার্তা আরো ঘনিষ্ঠ অভিনিবেশ- সহকারে শুনতে থাকে, কেননা তখন আর এগুলি কেবল নির্বাচনী প্রচার মনে করে উড়িয়ে দেওয়া যেত না বরং এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও ইশারাগুলি পরিশ্রুত করে বোঝার দরকার ছিল। ৭ ডিসেম্বর থেকে বক্তৃতা-ভাষণ আর হাল্কাভাবে দেওয়াও হচ্ছে না এবং সেভাবে গ্রহণ করাও যাচ্ছে না।”
নির্বাচিত পরিষদ সদস্যদের জনসমক্ষে শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠান অনেক উদ্দেশ্যই সাধন করে। এতে সর্বাত্মক সংহতির প্রদর্শনী হয়। এতে প্রতিটি সদস্যকে জনগণের কাছে সরাসরি জবাবদিহির দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাছাড়া এতে এই জল্পনা-কল্পনারও অবসান ঘটে যে, মুজিব তাঁর মরহুম নেতার (সোহরাওয়ার্দীর) মতো মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পা দিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই সোহরাওয়ার্দী স্টাইলের আপোসরফাই করবেন। তাই বোধ করি এ সিদ্ধান্তে আসাটা খুব অযথার্থ হবে না যে, জনসমক্ষে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবিকপক্ষে নেতার পাঁয়তারা করার কৌশলের সীমাবদ্ধতাকেই তুলে ধরা হয় ।
কেননা, “এ ছিল ঐ সব শক্তি সম্পর্কে তাঁর নিজ সচেতনতারই জবানবন্দি যে সব শক্তি তাঁর নেতৃত্বকে কিংবদন্তীতুল্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। ছয়-দফাকে এখন আলোচনা বহির্ভূত ইস্যু বলে ঘোষণা করা হয় ।”২১. অন্য উদ্দেশ্যটি ছিল এই যে, শাসকচক্র এবং সেই সাথে বৈরী ভুট্টো ও অন্যদেরকে এই মর্মে বুঝিয়ে দেওয়া যে কৌশল তৈরি ও তা কাজে লাগাতে গিয়ে ঐ পরিস্থিতিকে হিসেবে নেওয়া দরকার। তাঁদেরকে এই মর্মে আগে থেকে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয় যে, পূর্ব পাকিস্তানীরা এখন স্বায়ত্তশাসনের জন্য রক্ত ঢালতে তৈরি ।
যথার্থই অভিমত ব্যক্ত করা হয় যে, “টিভি ক্যামেরার সামনে যে লাখো লোক এ প্রত্যয় ঘোষণা করছে তারা হয়তো প্রতিরোধ সংগ্রামের নায়ক নয় তবু তারা এখন জানে, এ সংগ্রাম কিসের জন্য ।” আর তাই তারা এখন সজাগ ও সঙ্কল্পে অটুট হয়েই আন্দোলনের রাজনীতির দিকে এগিয়ে যাবে আর “এটি এক গভীর চিন্তার বিষয় হতে পারে সেই সব সম্ভাব্য প্রতিবিপ্লবীদের জন্য যারা বরাবরই এ সমস্যাকে দেখে এসেছে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে পূর্ব পাকিস্তানের কিছু শহর-নগরে আগলে রাখার ব্যাপার হিসেবে যে, যারা রেসকোর্স ময়দানে শপথ নিয়েছে ওদের অনেকেই এসেছে দেহাতি কোনো গ্রাম বা জনপদ থেকে যা শহর থেকে বহুদূর।”
নির্বাচনী রায়ের ভিত্তিতে অনুমিত হুমকি থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ছয়-দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের সঙ্কল্প নেয়। ছাত্রলীগের উদ্দেশে এক ভাষণে শেখ মুজিব বলেন, এমএনএদেরও ফর্মুলা বদলানোর কোনো অধিকার নেই। তিনি যেহেতু পূর্ব পাকিস্তানী এমএনএদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন, অনিবার্যভাবেই তাঁর ঐ মন্তব্যের উদ্দিষ্ট ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের এমএনএরা। এটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে তাঁর এ কথায় যে, পশ্চিম পাকিস্তানের কেউ ফর্মুলার বিরোধিতা করলে তার ফলাফলের জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে দায়ী হবেন।
একই উপলক্ষে তিনি বাঙালি সংস্কৃতির সংরক্ষণ সম্পর্কেও উল্লেখ করেন। তিনি প্রত্যয়ের সাথে বলেন, বাঙালিরা বরাবর বাঙালি হয়েই বাঁচবে। তিনি প্রসঙ্গত বিদেশী আধিপত্যের বিরুদ্ধে মুক্তি আন্দোলনের সঠিক ইতিহাসের প্রয়োজন সম্পর্কে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর মতে, মুক্তি আন্দোলনের সঠিক ইতিহাসে ব্যারাকপুরের সেনানিবাসে সৈনিকরা যে আত্মত্যাগ করেছে, তিতুমীর যে সব বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন, আর চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন সে সব অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।
সহিংস রাজনৈতিক কার্যকলাপের ঘটনাগুলির এ ধরনের শ্রদ্ধামিশ্রিত উল্লেখ নিয়মতান্ত্রিক অহিংস আন্দোলনের ঘোষিত বিশ্বাসীর কাছ থেকে আসার বিষয়টির মাঝে তাঁর ঐ সব অনুসারীর জন্য কিছু তাৎপর্যময় সঙ্কেত ছিল যাদের অহিংসায় খুব একটা ভক্তি না থাকলেও তারা ঠিকই অনুগত ছিল তাঁর প্রতি ।
তাদের কাছে ঐ সঙ্কেতের অর্থ ছিল পরিস্থিতি যদি তেমন দাবিই করে তাহলে লক্ষ্যে পৌঁছানোর শেষ উপায় হিসেবে শেখ মুজিব সহিংসতাকেও বেছে নেবেন। বাস্তবিকপক্ষেও যেহেতু শেখ মুজিবের রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের সমসাময়িক সেহেতু তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়তো অহিংসতাকে পদ্ধতি হিসেবে বেছে নিয়েছে, বিশ্বাস হিসেবে নয় ।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মতো ওয়ালী ন্যাপ ও ভাসানী ন্যাপ উভয়ে একই আশঙ্কা করতো। মওলানা ভাসানীর কোনো রাখ-ঢাক ছিল না— অনভিপ্রেত আশঙ্কা নিয়ে। তিনি বলতেন, তিনি (লাহোর প্রস্তাব অনুসারে) তাঁর রক্তের বিনিময়ে হলেও স্বায়ত্তশাসন ছিনিয়ে আনবেন। তিনি অবশ্য ব্যাখ্যায় বলেন, সশস্ত্র বিপ্লব অপরিহার্য কিছু নয় এবং বৈপ্লবিক পরিবর্তন বলিষ্ঠ জনমতের মাধ্যমেও অর্জন করা সম্ভব। আতাউর রহমানও স্বাধীনতার ডাক দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ।
একটা ধারণার সৃষ্টিই হয়েছিল এই বলে যে, ভাসানী দায়িত্বহীন লাগামছাড়া কথাবার্তা বলে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরকে কেবল বিলম্বিতই করছেন না বরং তা বিপন্নও করছেন । তবে এর চেয়েও কিছুটা নরমপন্থী মত পরের দিকে এই বলে প্রচারিত হয় যে, তিনি আওয়ামী লীগের কৃতিত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এ বাস্তবতাকে যদি বিবেচনায় নেওয়া হয় যে, ছয়-দফা বাস্তবায়িত হলে পূর্ব পাকিস্তান নিখিল পাকিস্তান ফেডারেশনের কার্যত একটি স্বাধীন ইউনিটে পরিণত হবে আর স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে ভাসানীর ইতঃপূর্বেকার (১৯৫৭ সালের আগের দলীয় বিভক্তির সময়) অবস্থান জানা থাকলে তিনি এখন যে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের ডাক দিচ্ছেন তার মধ্যে কোনো হীন মতলব আছে এমনটি ধরে নেওয়া কঠিন। আসলেও তাঁর এই আহ্বান খারাপ কোনো কিছু তো নয়ই বরং এর সুবাদে বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হওয়ার পরিবর্তে আওয়ামী লীগারদের “স্বায়ত্তশাসনপন্থী” হওয়ার দাবিই তো জোরদার হওয়ার কথা।
সশস্ত্র বিপ্লবের ধারণা বিসর্জন দিয়ে ও এক গণআন্দোলনে সর্বান্তঃকরণে শরিক হওয়ার প্রস্তাব দিয়ে নিঃসন্দেহেই তিনি আওয়ামী লীগের এই ঘোষণার প্রতি নিজ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন যে, যদি রক্তপাতও ঘটে তবুও এক গণআন্দোলন শুরু করা হবে। এতে ইশারা ছিল তাঁর অনুসারীদের জন্যেও যাদের মাঝে কেবল সনিষ্ঠ-বামপন্থী ছাড়াও পল্লীজনপদের অরাজনৈতিক কৃষক সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ ছিল তারা যাতে আগামী দিনগুলিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সহযোগিতা করে। রাজনৈতিক আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে মওলানা ভাসানীর যতো কিছু ব্যর্থতা বা ত্রুটিই থাক না কেন, পাকিস্তানী রাজনীতির তপ্ত কড়াইয়ের তেলে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ যোগ করতে তিনি কখনো ব্যর্থ হননি।
এ রকম সর্বশেষ ভূমিকাটি তিনি পালন করেছিলেন, ১৯৬৮-৬৯ সালের আন্দোলনের প্রাথমিক পর্বে। এই পর্যায়ে তাঁর ভূমিকায় পাকিস্তানী সামরিক জান্তা ও ভুট্টোর মনোভাব যদি আরো কঠোর হয়ে থাকে তাতে সম্ভবত করার কিছু ছিল না। অবশ্য এ কথা অনস্বীকার্য যে, আওয়ামী লীগ যখন গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহের প্রতি জোর দিচ্ছিল সেই সময় মওলানা ভাসানী বাঙালি আঞ্চলিকতা/জাতীয়তাবাদের কথাই বেশি করে উল্লেখ করেছিলেন। আর এটা করে সম্ভবত তিনি সোজাসুজি স্পষ্ট কথাই বলছিলেন ।
এভাবে কামানের বারুদে আগুন দেওয়ার কাঠিতে যখন আগুন ধরানো হয়েছে ঠিক সে সময়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তান সফর করেন। শেখ মুজিবের সাথে তাঁর দীর্ঘ আলোচনা হয়। তিনি তাঁকে দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী বলে উল্লেখ করেন। তিনি এ কথাও বলেছিলেন বলে জানা যায়: “আমি ওয়ারিশ সূত্রে এক মন্দ অর্থনীতি পেয়েছি আর এখন সেটি আমি শেখ সাহেবের হাতে তুলে দিতে যাচ্ছি।” ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনাকে উভয় তরফই ‘সন্তোষজনক’ বলে উল্লেখ করেন। তবে সেটা ঐ পর্যন্তই।
তার বেশি কিছু জানা যায়নি। শাসনতন্ত্র খসড়া দশ দিনের মধ্যেই তৈরি করা যেতে পারে বলে তাঁর মন্তব্যের পাশাপাশি এই সতর্কীকরণ এবং আওয়ামী লীগ প্রণীত শাসনতন্ত্রের খসড়া যদি পশ্চিম পাকিস্তান প্রত্যাখ্যান করে তাহলে তিনি কী করবেন—এ রকম জল্পনা- কল্পনামূলক প্রশ্নের জবাব দানে অস্বীকৃতি ইয়াহিয়ার উদ্দেশ্য-অভিসন্ধি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা ও সন্দেহের কুয়াশা কাটাতে প্রকৃতপক্ষেই সহায়ক হয়নি। আর কেউ এ কথা বিশ্বাস করেনি, ভুট্টোর সাথে তাঁর যে দেখা করার কথা তাতে তাঁর কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই, তিনি প্রস্তাবিত লারকানা সফরে চলেছেন শুধু পাখি শিকারে।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মন্তব্যের দ্ব্যর্থকতা হয়তোবা তাঁর দ্বিধাজড়িত ধারণা কিংবা সিদ্ধান্তহীনতার প্রতিফলন তবে তা নির্মম বাস্তবতা সম্পর্কে পরিকল্পিত রাখঢাকও হতে পারে। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ইয়াহিয়া হয়তোবা শেখ মুজিবকে এমন এক শাসনতন্ত্রে তাঁর সম্মতি দিতে প্রলুব্ধ করেছিলেন যাতে প্রতিরক্ষা বাহিনীর কট্টরপন্থীদের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থরক্ষা না হলেও ইয়াহিয়ার নিজের অবস্থানটি আপাতত সুরক্ষিত হয়। এর নেপথ্যে আরো কিছু থাকলেও থাকতে পারে। তবে সেগুলির মধ্যে হয়তো অন্যতম মতলব ছিল ভুট্টোর প্রভাব যাতে আরো বেড়ে না যায় তা ঠেকানো।
পশ্চিম পাকিস্তানে এ ধরনের একটি প্রয়াসের সম্ভাবনাকে নাকচ করা যায় না। ২৬ ভুট্টো কি ব্যাপারটা ইতোমধ্যেই কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন? ১৯৭১ সালের ১৩ জানুয়ারি রাওয়ালপিণ্ডিতে তাঁর বিবৃতির উদ্দিষ্ট আর কেউ নয় বরং ইয়াহিয়াই ছিলেন বলেই মনে হয়। তিনি গূঢ় তাৎপর্যে যা বলতে চেয়েছিলেন তা হলো দেশ সুনিশ্চিতভাবেই ভাঙতে চলেছে। তবে তিনি যেহেতু একজন “কড়া জাতীয়তাবাদী”, তিনি এতে কোনো পক্ষ হতে পারেন না। কথাটা এভাবেও বলা যায় যে, ইয়াহিয়া খান মুজিবকে প্রধানমন্ত্রী করুন, ছয়-দফাভিত্তিক শাসনতন্ত্রের পথ করে দিন তাতে বাধা নেই ।
কিন্তু তাঁর কথা রাখতে হবে, তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হবে—এমন বাধ্যবাধকতা ভুট্টোর তো নেই। ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবকে প্রধানমন্ত্রী সম্বোধন করায় নিজ বিরক্তিকর কথা ভুট্টো নিজেই স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন: “পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ঢাকায় গিয়ে ঘোষণা করেছেন যে, শেখ মুজিব হবেন দেশের প্রধানমন্ত্রী।
তাঁরা উভয়ে জানিয়েছেন, তাঁদের আলোচনা সন্তোষজনক হয়েছে আর এও ধরে নেওয়া হয়েছে যে, শাসনতন্ত্র কার্যত তৈরি হয়ে গেছে। তবে লাখো যে জনসমষ্টি আমাদের নির্বাচিত করেছে তাদের প্রতি আমাদেরও কর্তব্য রয়েছে।” এই ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যালঘিষ্ঠ ভোট পান। তাহলে সেই অবস্থায় দেশের সিদ্ধান্ত প্রণেতাদের মধ্যে তাঁর কোনো অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী সমর্থনের বুনিয়াদ না থাকলে তিনি এ রকম একটা দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন কী করে?
যা-ই হোক, পরিস্থিতি দাঁড়ায় এই যে, মুজিব বা ইয়াহিয়া কেউই তাঁদের নিজ নিজ সমর্থনের বুনিয়াদ বা কাঠামোর প্রকাশ্য এবং/অথবা প্রচ্ছন্ন অভিমতের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো রফায় পৌঁছুতে পারলেন না। এ সুযোগ নিলেন ভুট্টো। নানা রকম কলকাঠি নাড়ার পর্যাপ্ত উপকরণ হাতে মিলে গেল তাঁর। অবশ্য শাসকচক্রের পরিবর্তনবিরোধী কট্টরদের সাথে ভুট্টোর স্বার্থের সঙ্গমের বিষয়টি নেহাত কোনো কাকতালীয় আকস্মিকতা নয় । হাজার হোক, তিনি ছিলেন তাঁদেরই একজন যাঁদের বিরোধিতায় তিনি সাম্প্রতিককালে অবতীর্ণ হয়ে থাকলেও তাঁদের সাথে তার চেয়েও অনেক বেশিকাল কাটিয়েছেন।
![পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-১ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ] 3 পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-১](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2007/01/আওয়ামী-লীগ01.jpg)
আর তিনি ছিলেন ঐ ব্যবস্থার সহস্থপতি যে ব্যবস্থার সেবা করেছেন অনুগত সেবক হিসেবে দীর্ঘকাল। যেমন ধরা যাক, এই ভুট্টো ছিলেন আইয়ুব খানের বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনিই প্রবর্তন করেছিলেন রপ্তানির ক্ষেত্রে বোনাস ভাউচার পদ্ধতি যাতে উপকৃত হয়েছে এক শ্রেণীর পশ্চিম পাকিস্তানী । ইনি হলেন সেই ভুট্টো যাঁর ভারত-আতঙ্ক পাকিস্তানে সশস্ত্র বাহিনীগুলির চির বর্ধমান প্রভাবকে যৌক্তিকতা দিয়েছে।
তিনি বস্তুত পাকিস্তানের এই ব্যবস্থাটির এতখানি অঙ্গ ছিলেন যে, এমনকি এই ব্যবস্থাটির বিরোধিতাকালেও, তাঁর সকল সমাজবাদী জোশ ও শ্রেণীহীন সমাজের একরারের বাড়ম্বর সত্ত্বেও ক্ষীণ গলায় এ রকম ওয়াদা করা এড়াতে পারেননি, “যে সব শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতামূলকভাবে চলছে ও যে সব শিল্প প্রতিষ্ঠানের বেসরকারি হাতে নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর নয় আমরা সেগুলির জাতীয়করণ করার কথা বলি না।
এহেন ভুট্টোই ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময়ে ক্ষমতাসীনদের একজন ও তাদের মুখপাত্র হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত সরকারের নীতির পক্ষে প্রকাশ্য ওকালতি করেন ও যুক্তি দেখান। আর তার ফলেই পাকিস্তানের দুটি শাখার মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক বিভেদ পাকাপোক্ত হয়ে যায়।
![পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-১ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ] 1 পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-১](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2023/04/পরোক্ষ-প্রতিরোধ-পর্ব-১.png)