আজকে আমরা আলোচনা করবো- পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি ও আওয়ামী লীগের শাসনামল প্রসঙ্গে
প্রদেশে যুক্তফ্রন্টের জোড়াতালি দেওয়া সরকার থাকাকালেই ১৯৫৫ সালে কারো সাথে পরামর্শ না করেই ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী করা হবে, গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের এই আশ্বাসে বিশ্বাস করে সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় আইনমন্ত্রী হিসেবে যোগদান করেন। বগুড়ার মোহাম্মদ আলী ছিলেন অবিভক্ত বাংলায় সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার সদস্য। তার ‘অধীনে আইনমন্ত্রীর’ পদ গ্রহণ করা এবং গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দেওয়ায় পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ কেবল লজ্জিতই (দ্র. আবুল মনসুর আহমদ, রাজনীতির ৫০ বছর) বোধ করেননি, ভীষণভাবে ক্ষুব্ধও হয়েছিলেন।

পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি ও আওয়ামী লীগের শাসনামল
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এই সিদ্ধান্তে শেখ মুজিবুর রহমানও বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হন। এ প্রসঙ্গে শেখ মুজিব লিখেছেন-
আমরা জেলের ভিতরে বসে খুবই কষ্ট পেলাম এবং আমাদের মধ্যে একটা হতাশার ভাব দেখা দিল। আমি নিজে কিছুতেই তাঁর আইনমন্ত্রী হওয়া সমর্থন করতে পারলাম না। এমনকি মনে মনে ক্ষেপে গিয়েছিলাম। অনেকে আমাকে অনুরোধ করেছিল শহীদ সাহেব রোগমুক্ত হয়ে ফিরে এসেছেন দেশে তাঁকে টেলিগ্রা করতে। আমি বলে দিলাম, না, কোন টেলিগ্রাম করব না, আমার প্রয়োজন নাই।
গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ‘গণপরিষদ’ ভেঙ্গে দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সোহরাওয়ার্দীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করেছিল। সামরিক শাসনের ভীতি, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, গণপরিষদ পুনর্গঠন এবং একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নের লক্ষ্য থেকেই সোহরাওয়ার্দী গোলাম মোহাম্মদের মেধাবীদের মন্ত্রিসভায় (Cabinet of Talents) যোগদান করেছেন বলে দলীয় নেতাদের কাছে ব্যাখ্যা দেন।
সোহরাওয়ার্দী “১৯৫৫ সালের ১৫ এপ্রিলের কনস্টিটিউশন অর্ডার ও পরের সংশোধনীসমূহ মেনে নেন, কনভেনশনে পাকিস্তানের দুই অংশের সমপ্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা এই সংশোধনীতে রাখা হয়। অবশ্য যুক্ত পার্লামেন্টারি পার্টি এক জরুরি বৈঠকের পর তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করে।
বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে আওয়ামী লীগ। পরে শাসনতন্ত্রে যুক্ত নির্বাচনসহ যুক্তফ্রন্টের ২১-দফা দাবি প্রতি ঘটানোর অঙ্গীকার পত্রে স্বাক্ষর করলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি সোহরাওয়ার্দীর অবস্থান অনুমোদন করে। পরবর্তীকালে ফেডারেল কোর্টের রুলিং-এ ইতোপূর্বে কনভেনশন বাতিল হলেও দুই প্রদেশের ‘সমতাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে। আওয়ামী লীগ ও যুক্তফ্রন্টের শরিকরা আগে এর বিরোধিতা করলেও দ্বিতীয় গণপরিষদ নির্বাচনে কোনো উচ্চবাচ্য না করে তাদের প্রার্থী মনোনয়ন দেয়। গণপরিষদে পূর্ব বাংলার ৩১টি মুসলিম আসনের ১৩টি লাভ করে আওয়ামী লীগ।

১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ গণপরিষদে পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র পাস হয়। সোহরাওয়ার্দী এ ব্যাপারে উদ্যোগ ভূমিকা পালন করেন। নতুন শাসনতন্ত্রে পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করায় গণপরিষদে প্রতিবাদ জানান শেখ মুজিব। তিনি পূর্ব বাংলার জনগণের মতামত নেওয়ার দাবি জানান। গণপরিষদ তার প্রস্তাব অগ্রাহ্য হয়। সংবিধান প্রণীত হলেও পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রের রাজনীতির পরিণামে অচিরেই বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া হয়। সোহরাওয়ার্দী আইনমন্ত্রীর পদ হারান।
১৯৫৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকার সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে দেশে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সম্মেলনে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ এবং অবিলম্বে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের ওপরে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এই কাউন্সিলে আওয়ামী লীগকে একটি অসাম্প্রদায়িক দলে পরিণত করার লক্ষ্যে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ রাখা হয়। মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ কাউন্সিলে নিম্নলিখিত সদস্যদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠিত হয়-
সভাপতি
১. মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী
সহ-সভাপতি
২. আতাউর রহমান খান
৩. আবুল মনসুর আহমদ
8. খয়রাত হোসেন
সাধারণ সম্পাদক
৫. শেখ মুজিবুর রহমান
সম্পাদকমণ্ডলী
৬. অলি আহাদ – সাংগঠনিক সম্পাদক
৭. আবদুল হাই – প্রচার সম্পাদক
৮. আবদুস সামাদ – শ্রম সম্পাদক
৯. তাজউদ্দিন আহমদ – সংস্কৃতি ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক
১০. মিসেস সেলিনা বানু – মহিলা সম্পাদিকা
১১. মোহাম্মদ উল্লাহ – দফতর সম্পাদক
১২. ইয়ার মোহাম্মদ – কোষাধ্যক্ষ
সদস্য
১৩. জহুরুদ্দিন আহমদ ১৪. আবদুল আজিজ ১৫. অধ্যাপক আসহাবুদ্দিন আহমদ ১৬. আবদুল জব্বার খদ্দর ১৭. আবদুল বারী ১৮. রকিবুদ্দিন ভূঁইয়া ১৯. হাতেম আলী খান ২০. আবদুল হামিদ চৌধুরী ২১. সৈয়দ আকবর আলী ২২. শেখ আবদুল আজিজ ২৩. মোমিনুদ্দিন আহমদ ২৪. মশিউর রহমান ২৫. সা’দ আহমেদ ২৬. জহুর আহমদ চৌধুরী ২৭. কাজী গোলাম মাহবুব ২৮. ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ২৯. আমজাদ হোসেন ৩০. ডা. মাজহারুদ্দিন ৩১. মাওলানা আলতাফ হোসেন ৩২. রহিমুদ্দিন আহমদ ৩৩. আমিনুল হক চৌধুরী ৩৪. আকবর হোসেন আখ ৩৫. দবিরুদ্দিন আহম ৩৬. পীর হাবিবুর রহমান ৩৭. কামরুদ্দিন আহমেদ।

ইতোমধ্যে যুক্তফ্রন্টে অন্তর্দলীয় কোন্দল চরমে ওঠে। একপর্যায়ে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে ১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ
মন্ত্রিসভা গঠিত হয়।। মন্ত্রিসভার সদস্যগণ হলেন –
প্রদেশে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা
| নাম | পদবি |
| আতাউর রহমান খান | মুখ্যমন্ত্রী (স্বরাষ্ট্র ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বসহ) |
| আবুল মনসুর আহমেদ | শিক্ষামন্ত্রী |
| কফিল উদ্দিন চৌধুরী | যোগাযোগ, পূর্ত ও স্টেট মন্ত্রী |
| শেখ মুজিবুর রহমান | শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম ও দুর্নীতি দমন মন্ত্রী |
| মাহমুদ আলী | রাজস্ব ও কারামন্ত্রী |
| মশিউর রহমান | জনসংযোগ ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী |
| ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত | স্বাস্থ্যমন্ত্রী |
| মনোরঞ্জন ধর | অর্থ ও সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী |
| খয়রাত হোসেন | কৃষি ও পশুপালন মন্ত্রী |
| আ। রহমান খান | সমবায়, ঋণ, কৃষি ও বাজার মন্ত্রী |
| ক্যাপ্টেন মনসুর আলী | বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী |
| শরৎচন্দ্র মজুমদার | আবগারি, মৎস্য ও লবণবিষয়ক মন্ত্রী |
| গৌরচন্দ্র বালা | বনবিষয়ক মন্ত্রী |
নানা চাপ সত্ত্বেও এই মন্ত্রিসভা পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ২ বছর অর্থাৎ ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত বহাল থাকে। প্রায় একই সময়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রের ১৯৫৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। আওয়ামী লীগের সোহরাওয়ার্দীর সাথে রিপাবলিকান পার্টির ডা. খান সাহেবের ৫ দফা চুক্তির ভিত্তিতে এই দুই দলের কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। মন্ত্রিসভায় ছিলেন-
কেন্দ্রে সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভা (ষষ্ঠ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা)
| নাম | পদবী |
| হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী | প্রধানমন্ত্রী (প্রতিরক্ষা, কাশ্মীর, দেশীয়রাজ্য, সীমান্ত রিফিউজি পূর্ণবাসন মন্ত্রীর দায়িত্বসহ) |
| মালিক ফিরোজ খান নুন | পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক মন্ত্রী |
| আবুল মনসুর আহমেদ | শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী |
| সৈয়দ আমজাদ আলী | অর্থমন্ত্রী |
| এম এ খালেক | শ্রম ও পূর্তমন্ত্রী |
| মীর গোলাম আলী তালপুর | স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী |
| সর্দার আমীর আজম খান | আইন, তথ্য ও বেতার মন্ত্রী |
| এএইচ দেলদার আহমেদ | খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী |
| মিয়া জাফর শাহ | যোগাযোগ মন্ত্রী |
| জহির উদ্দিন | শিক্ষা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী |
| প্রতিমন্ত্রী | মন্ত্রণালয় |
| রসরাজ মণ্ডল | অর্থ |
| হাজী মওলা বকস্ সুমরো | পূর্ণবাসন |
| আবদুল আলীম | পল্লী উন্নয়ন |
| নূরুর রহমান | বাণিজ্য |
এই মন্ত্রিসভা ১৮ অক্টোবর ১৯৫৭ পর্যন্ত অর্থাৎ এক বছর ক্ষমতায় ছিল। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ফলে এই মন্ত্রিসভারও অকাল পরিসমাপ্তি ঘটে। কেন্দ্রে ও পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ শাসনামলটি ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসের এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এই সময়কালে পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক বিকাশের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল।

যুক্ত নির্বাচন প্রথা সংবলিত পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান অনুযায়ী পাকিস্তানের পার্লামেন্টের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল সোহরাওয়ার্দীর কোয়ালিশন সরকার। অন্যদিকে পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি, সিয়াটো, সেন্টো যুদ্ধ জোট, পররাষ্ট্রনীতি এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে সৃষ্টি হয় তীব্র মতবিরোধ। কাগমারী সম্মেলনের ভেতর দিয়ে এই মতবিরোধ দ্রুত দলটিকে ভাঙনের দিকে ঠেলে দেয়।
১৯৫৭ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারীতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সোহরাওয়ার্দী অনুসারী এবং ভাসানী অনুসারীদের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্য বিরোধে পরিণত হয়। কাগমারী সম্মেলনের পর ১৯৫৭ সালের মার্চ মাসে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট পদত্যাগ পত্র পাঠান।
অন্যদিকে ১৯৫৭ সালের ১৩৩ ১৪ জুন ঢাকার শাবিস্তান হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল আহ্বান করা হয়। এই কাউন্সিলে ভাসানীর পদত্যাগপত্র নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু গৃহীত হয় না। দল থেকে পদত্যাগ করলেও কাউন্সিল ভাসানীকেই সভাপতি করা হয়। সেই সাথে সহ-সভাপতির ৩টি পদ শূন্য নির্বাচিত করে নতুন কমিটি নির্বাচন করে। এই কমিটির সদস্যরা হলেন-
সভাপতি
১. মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।
সহ-সভাপতি
সহ-সভাপতির পদ তিনটি খালি রাখা হয়।
২.
৩.
৪.
সাধারণ সম্পাদক
৫. শেখ মুজিবুর রহমান
সম্পাদকমণ্ডলী
৬. আবদুল হামিদ চৌধুরী – সাংগঠনিক সম্পাদক
৭. অধ্যাপক হাফেজ হাবিবুর রহমান – প্রচার সম্পাদক
৮ জহুর আহমদ চৌধুরী – শ্রম সম্পাদক
৯. তাজউদ্দিন আহমদ – সাংস্কৃতিক ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক
১০. মিসেস মেহেরুন্নেসা – মহিলা সম্পাদক
১১. মোহাম্মদ উল্লাহ – দফতর সম্পাদক
১২. কোষাধ্যক্ষ (এই পদটিও খালি রাখা হয়।)
সদস্য
১৩. আবদুল আজিজ ১৪. আবদুল জব্বার খদ্দর ১৫ আবদুল বারী ১৬. রফিকুদ্দিন ভূঁইয়া ১৭. সৈয়দ আকবর আলী ১৮ শেখ আবদুল আজিজ ১৯. মোমিনুদ্দিন আহমদ ২০. মশিউর রহমান ২১ সা’দ আহমদ ২২. জহুর আহমদ চৌধুরী ২৩, কাজী গোলাম মাহবুব ২৪. ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ২৫ আমজাদ হোসেন ২৬. ডা. মাযহার আহমেদ ২৭. মাওলানা আলতাফ হোসেন ২৮ রহিমুদ্দিন আহমদ ২৯. আমিনুল হক চৌধুরী ৩০. পীর হাবিবুর রহমান ৩১ কামরুদ্দিন আহমদ ৩২. জসিমুদ্দিন আহমদ ৩৩. মজিবুর রহমান ৩৪. দেওয়ান মহিউদ্দিন আহমদ ৩৫ রওশন আল ৩৬. শামসুল হক ৩৭. আজিজ আহমদ ৩৮ মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ।
পক্ষান্তরে ১৯৫৭ সালের ২৫-২৬ জুলাই ভাসানীর উদ্যোগে ঢাকায় একটি গণতান্ত্রিক কনভেনশন অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে নতুন একটি বামপন্থি রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করে। আওয়ামী লীগের বিভক্তি চূড়ান্ত হয়।
আওয়ামী লীগ সোহরাওয়ার্দীর মার্কিন ঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি সমর্থন করায় এবং জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির বিরোধিতা করায় নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির যেসব নেতা ও কর্মী আওয়ামী লী কর্মরত ছিল, তারাও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে নতুন দল- ন্যাপে যোগদানের পক্ষে মত দেয়। শেষ পর্যন্ত তাদের এই অবস্থানের কারণে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ন্যাপে যোগদানের বিষয়ে সম্মতি জানাতে বাধ্য হয়।
ভাসানীকে সভাপতি করে গঠিত ন্যাপ প্রাদেশিক পরিষদে ৩০ জন সদস্যের সমর্থন লাভ করে। এই ৩০ জনের মধ্যে ২১-২২ জনই ছিলেন নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। মণি সিংহ তার জীবন সংগ্রাম গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, পররাষ্ট্রনীতি ও পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীর অবস্থানের বিরোধিতা করলেও কমিউনিস পার্টি তাড়াহুড়া করে আওয়ামী লীগ ভাঙা বা ন্যাপ গঠনের পক্ষে ছিল না।
তাদের মত ছিল আরও ধৈর্য ধরে পার্টির অবস্থান জনগণের কাছে পরিষ্কার করা। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির এই নীতি আওয়ামী লীগে কর্মরত সদস্যগণ না মেনে তাড়াহুড়া করে ন্যাপ গঠনে উদ্যোগী হন। বলাবাহুল্য কাগমারী সম্মেলন, আওয়ামী লীগের ভাঙন এবং ন্যাপ গঠনের পেছনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মদদ ছিল বলেও অনেকেই মনে করেন। এসবের পেছনে অর্থের যোগানদাতা ছিলেন ইস্পাহানি গ্রুপ।
মওলানা ভাসানী ন্যাপ গঠন করার পর মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশকে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়।

আওয়ামী লীগের শাসনামল
পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ সরকার নিশ্চিত করেছিল এক মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ। আওয়ামী লীগের উদ্যোগেই মাতৃভাষা বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষার আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভ করে। ২১শে ফেব্রুয়ারি ঘোষিত হয় জাতীয় লি দিন- ‘শহীদ দিবস’।
আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলা একাডেমির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই এফডিসি, জুট মার্কেটিং কর্পোরেশন, ওয়াপদা গঠন, ফেঞ্চুগঞ্জে প্রথম সার কারখানা নির্মাণ, সাজার ডেয়ারি ফার্মের সূচনা, স্থায়ী শিল্প ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং সরকারি, আধা-সরকারি বেশ কিছু স্বায়ত্তশাসিত/আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার দেশের প্রথম প্ল্যানিং কমিশন গঠন, শিক্ষা সংস্কার কমিটি গঠন, প্রথম লেবার রেজিস্ট্রেশন আইন পাস, ঢাকা-আরিচা জাতীয় সড়ক নির্মাণ, কক্সবাজারে প্রথম পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ, কৃষি ঋণের সার্টিফিকেট প্রথা বাতিল, রমনা পার্ক স্থাপন, উচ্চফলনশীল ধান উদ্ভাবন, পাওয়ার পাম্পে সেচ ব্যবস্থা চালু এবং ময়মনসিংহে দেশের প্রথম পশু চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো সাংগঠনিক কাজে সার্বক্ষণিকভাবে আত্মনিয়োগ করার জন্য দলীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিত্ব ত্যাগ। মন্ত্রী হলে দলীয় কর্মকর্তা থাকা যাবে না, দলীয় গঠনতন্ত্রের এই বরাত দিয়ে অলি আহাদ প্রমুখ যখন বলেন, যারা মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করবেন, তাদের হয় মন্ত্রিত্ব অথবা দলীয় কর্মকর্তার পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। তখন দলীয় কর্মকর্তা মন্ত্রীরা সবাই দলীয় পদ থেকে ইস্তফা দেন, একমাত্র শেখ মুজিবই মন্ত্রিত্ব ইস্তফা দিয়ে দলীয় পদের দায়িত্বে বহাল থাকেন। পরবর্তীকালে মওলানা ভাসানী।
আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর দলকে তৃণমূল পর্যায়ে নতুন করে সুসংগঠিত করা ছিল জরুরি। শেখ মুজিব তার অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা, অমানুষিক পরিশ্রম ও অতুলনীয় আত্মত্যাগের বিনিময়ে নতুন করে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করে গড়ে তোলেন। আর এর ফলেই নতুন প্রজনের নেতা-কর্মীদের নিয়ে শেকড় পর্যায় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের স্থায়ী ভিত্তি গড়ে তোলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
১৯৫৮ সালের ৩১ মার্চ আকস্মিকভাবে গভর্নর একে ফজলুল হক আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা বাতিল করে দেন। গভীর রাতে সরকার গঠন করেন কেএসপির আবু হোসেন সরকার। তুঘলকি কায়দায় আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা বাতি করায় ১২ ঘণ্টার মধ্যে শেরে বাংলা ফজলুল হককে সোহরাওয়ার্দীর পরামর্শে প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুন গভর্নরের পন থেকে বরখাস্ত করেন। ১ এপ্রিল আবার আতাউর রহমান খান মুখ্যমন্ত্রী হন। এরপর ১৯৫৮ সালের ১৯ জু কেএসপির পক্ষ থেকে আবু হোসেন পূর্ব বাংলা ব্যবস্থাপক সভার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন।
তীব্র আওয়ামী লীগ বিরোধিতার দৃষ্টিভঙ্গি এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদ ঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মওলানা ভাসানী ও তার সদ্য গঠিত ন্যাপের সদস্যরা (যার মধ্যে ২১-২২ জন ছিল কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ও সমর্থক) অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। আবার আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভার পতন হয়। মুখ্যমন্ত্রী হন আৰু হোসেন সরকার।
আবু হোসেন সরকারের নবগঠিত সরকারের আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র দুই দিন। এই দুই দিনেই এ কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে আৰু হোসেন সরকার ছিল প্রেসিডেন্ট ইভান্দার মির্জার ষড়যন্ত্রের সহযোগী এবং চরম সুবিধাবাদী। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৩(ক) ধারা জারি করে রাষ্ট্রপতির শাসন কায়েম করে।
এ প্রসঙ্গে মণি হ লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কতগুলো প্রতিক্রিয়াশীল কাজকর্ম এবং আওয়ামী লীগ ন্যাপের বিরুদ্ধে কুৎসা প্রচার ও তথামি করলেও আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রসারে এবং সারা পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিল ….. তাই বৃহত্তর জনস্বার্থেই পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা কায়েম রাখা কতা বলে আমরা সিদ্ধান্ত নেই।
আওয়ামী লীগকে সমর্থন জানানোর পূর্বশর্ত হিসেবে যুক্ত নির্বাচন, সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ, যুদ্ধজোট বর্জন, সার্টিফিকেট প্রথা রদ করার বিষয়ে অঙ্গীকার ঘোষণার প্রস্তাব দিয়ে সোহরাওয়ার্দী কাছে খন্দকার ইলিয়াসকে পাঠানো হয়। ইতোমধ্যে আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিবুর রহমান এ ব্যাপারে কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দকে তাদের ঐকমত্যের বিষয়ে নিশ্চিত করেছিলেন। সোহরাওয়ার্দী এসব প্রস্তাব গ্রহণ করেন।
প্রাদেশিক আইন পরিষদে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আবু হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। ১৯৫৮ সালের ২১ জুন প্রাদেশিক আইন সভায় উত্থাপিত অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে ন্যাপ তথা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যগণ ভোট দেন। এর দুই মাস পর প্রাদেশিক আইন সভায় আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণিত হওয়ায় রাষ্ট্রপতির শাসন প্রত্যাহার এবং ১৯৩(ক) ধারা তুলে নেওয়া হয়। যাদের ভোটে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছিল, এবার সেই কমিউনিস্টদের ভোটেই আবু হোসেন সরকারের পতন এবং পুনরায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়। কমিউনিস্ট পার্টি তার ভুল সংশোধন করলেও শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানে সীমিত গণতন্ত্র রক্ষা করতে পারেনি।
