পাকিস্তানে আগমন

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ পাকিস্তানে আগমন। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।

পাকিস্তানে আগমন

 

পাকিস্তানে আগমন

 

পাকিস্তানে আগমন

অগ্রবর্তী দল হিসেবে আমাকে পাকিস্তানে যাবার নির্দেশ দেওয়া হয়। পালামপুর বিমানবন্দরে আমি বিমানে আরোহণ করি এবং অবতরণ করি লাহোরে। আমি রাওয়ালপিন্ডিতে জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে যাই। সেখানে আমি রিপোর্ট করি কর্নেল লাউদার (পরে মেজর জেনারেল)-এর কাছে যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট হিসেবে।

কর্নেল লাউদার আমাকে কোয়েটা যাবার নির্দেশ দেন যেখানে অন্য ইন্সট্রাক্টররাও যাচ্ছেন। আমাকে জানানো হয় যে, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইয়াহিয়া খান (পরে জেনারেল এবং সি-ইন-সি) সেখানে রয়েছেন। আমি কর্নেল ইয়াহিয়ার কাছে স্টাফ কলেজকে ‘কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ’ নামকরণ এবং এটাকে দুটি অংশে- স্টাফ ও ট্যাকটিক্যাল করার প্রস্তাব দিই। আমাকে ট্যাকটিক্যাল উইং-এর কাজ চালাবার জন্য শ্রেণিকক্ষগুলোর অর্ধেকটা নিতে বলা হয়।

স্টাফ কলেজের লাইব্রেরি ছিল অবিভক্ত ভারতের সেরা লাইব্রেরি। অনেকে অন্যায়ভাবে অভিযোগ করেছেন যে, দেশ বিভাগের পর তারা এর মালিকানা নিয়ে নেয় । এটা আমি কী করেছিলাম তার সত্যি গল্প । যখন আমি কোয়েটা পৌছালাম, সেখানে ইতোমধ্যে হিন্দু, শিখ ও ব্রিটিশ ছাত্র, স্টাফ ইনস্ট্রাক্টররা রয়েছে।

মেজর লতিফ (পরবর্তীতে ব্রিগেডিয়ার লতিফ, যিনি রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন) এ কলেজের একজন ছাত্র ছিলেন। তাকে লাইব্রেরির দায়িত্ব গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। লাইব্রেরিয়ান ছিলেন একজন ভারতীয় খ্রিস্টান যিনি লাইব্রেরির গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো লুকাতে শুরু করেছিলেন।

লাইব্রেরিয়ান এবং লতিফের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইয়াহিয়া খান আমাকে এ লাইব্রেরির দায়িত্ব গ্রহণের নির্দেশ দেন। আমি লাইব্রেরিয়ানের সাথে সমঝোতা করার চেষ্টা করি।

কিন্তু তার আচরণ ছিল নোংরা। শীঘ্রই আমি উপলব্ধি করি যে অন্য কৌশল অবলম্বন করে লাইব্রেরির দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। তাই আমি ক্যাপ্টেন ইসহাককে বালুচ রেজিমেন্টাল সেন্টারে, যেটা কোয়েটাতে অবস্থিত, সেখানে যেতে বলি এবং সেখান থেকে এক সেকশন পদাতিক সৈন্য নিয়ে আসতে বলি।

লাইব্রেরিয়ান লাইব্রেরি বন্ধ করতে গেলে আমি তাকে ঘুষি মারি এবং চাবি ছিনিয়ে নিই। ক্যাপ্টেন ইসহাককে আমি নির্দেশ দিই একজন সশস্ত্র প্রহরী মোতায়েনের, যাতে কেউ লাইব্রেরির তালা ভাঙতে না পারে। আমি অফিসারদের ফেরত দেওয়া বইগুলো সংরক্ষণে একটি রুমের ব্যবস্থা করি যে পর্যন্ত না নতুন লাইব্রেরিয়ান দায়িত্ব গ্রহণ করে।

যখন আমি লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইয়াহিয়া খানের কাছে রিপোর্ট পেশ করলাম, তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কিছুদিন অদৃশ্যে থাকুন।’ তাই করলাম আমি। ১৯৪৮ সালের শেষটা পর্যন্ত আমি কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে নিয়োজিত ছিলাম। স্টাফ কলেজের পর্ব আমি শেষ করি ১৯৪৯ সালে এবং আমাকে পিএসসি (পান্‌ড স্টাফ কলেজ) পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

কোয়েটা থেকে আমাকে কোহাটে অফিসার্স ট্রেনিং স্কুলে ‘জেনারেল স্টাফ অফিসার গ্রেড টু’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কর্নেল হালসে, যিনি ছিলেন স্টাফ কলেজের ট্যাকটিক্যাল উইং-এর কমান্ডিং অফিসার, তাকে অফিসার ট্রেনিং স্কুলের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

১৯৫১ সালে ডিএসও জেনারেল মোহাম্মদ আকবর খানের যোগসাজসে রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র সংঘটিত হয়। এ সময় তালে অবস্থানরত ২/১ পাঞ্জাবের নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল এনএম আবরার। ব্যাটালিয়নের অ্যাডজুট্যান্ট ছিলেন ক্যাপ্টেন খিজির।

এ রকম অভিযোগ ছিল যে, আবরারের নেতৃত্বাধীন ২/১ পাঞ্জাব পিন্ডিতে পৌঁছে জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে এবং সিনিয়র অফিসারদের গ্রেফতার করবে। কিন্তু তার বদলে আবরার ও খিজির গ্রেফতার হয়ে যান।

কমান্ডিং অফিসার গ্রেফতার হওয়ায় ২/১ পাঞ্জাব নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। জেনারেল মোহাম্মদ আয়ুব খান, দ্য সি-ইন-সি, ২/১ পাঞ্জাবের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য একজন সৎ ও দক্ষ অফিসারকে নিয়োগের নির্দেশ দেন। তার প্রথম কাজ হবে ২/১ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্রে সংশ্লিষ্টদের সম্পর্কে তদন্ত করা ও রিপোর্ট প্রদান করা।

আমাকে ২/১ পাঞ্জাবের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে নির্বাচিত করা হয় ও নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও আমি ১ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের কেউ ছিলাম না। আমি ছিলাম ৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এবং অনেকের চেয়ে জুনিয়র হওয়া সত্ত্বেও লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদোন্নতি দিয়ে আমাকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৫১ সালের এপ্রিলে যথা সময়ে আমি কমান্ড গ্রহণ করি।

পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের পর আমি ব্যাটালিয়নের কোনো দোষ দেখতে পেলাম না এবং আমি এ সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট দাখিল করলাম। ব্যাটালিয়নকে লাহোরে স্থানান্তর করা হয় এবং প্রশিক্ষণ মৌসুমের পর এটিকে ১০ ডিভিশনের শ্রেষ্ঠ ব্যাটালিয়ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

 

ফিল্ড মার্শাল অচিন লেক আমাদেরকে পরিদর্শন করেন ১ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের কর্নেল কমান্ড্যান্ট হিসেবে। পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ‘৬৬ (২/১ পাঞ্জাবের পুরান নাম)-এর অবস্থা খুব ভালো এবং যে-কোনো বিচারে এটি শ্রেষ্ঠ ব্যাটালিয়ন হওয়ায় দাবি রাখে। আছি সত্যি এ ব্যাটালিয়নের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। আমার কমান্ড ছিল ২৪ অক্টোবর ১৯৫৩ পর্যন্ত।

২/১ পাঞ্জাব থেকে আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয় কোয়েটার স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিকস-এ । আমি ক্লাস ‘এ’ ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে জুনিয়র লিডারস উইং-এর দায়িত্ব গ্রহণ করি। এ স্কুলে আমি দায়িত্বে থাকি ২৬শে আগস্ট ১৯৫৬ পর্যন্ত, এরপর আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয় ৮ ডিভিশনে জেনারেল স্টাফ অফিসার গ্রেড হিসেবে।

এটাও কোয়েটায় অবস্থিত। আমি ৮ ডিভিশনে থাকি ২০শে জুন ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত। এরপর আবার রেজিমেন্টের কাজে ফিরে যাই আমাকে ১/১৪ পাঞ্জার (৫ পাঞ্জাব শেরডিলস) রেজিমেন্টে নিয়োগ দেওয়া হয়, এটি পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় অবস্থিত ।

আমি ৮ ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং জেনারেল বখতিয়ার রানা, এনসি-কে আমার ডিউটির দুই বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই আমার বদলির কারণ প্রসঙ্গে জানতে চাই। তিনি উত্তর দেন, আমি আমার ডিভিশনে তোমাকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সামরিক সচিবকে অনুরোধ করেছিলাম।

আমি খুব খুশি তোমার কাজ ও শৃঙ্খলায়। কিন্তু তোমার বর্তমান নিয়োগ হয়েছে কমান্ডার ইন চিফ জেনারেল আইয়ুব খানের নির্দেশে। যেহেতু ১/১৪- (শেরডিস) হলো চিফের নিজের ব্যাটালিয়ন, তাই তিনি সব সময় নিজে ১৪ পাঞ্জাবের কমান্ডিং অফিসার নির্বাচন করেন।

সুতরাং আমাকে আবার রেজিমেন্টাল কাজ পরিবর্তন করতে হয়। পাঞ্জাব থেকে ১ পাঞ্জাবে পরিবর্তিত হই এবং এরপর আমি ১৪ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের হয়ে যাই ।

১/১৪ পাঞ্জাব (শেডিলস) ছিল মেজর জেনারেল ওমরাও খান, একজন দক্ষ জেনারেলের নেতৃত্বাধীন ১৪ ডিভিশনের হেডকোয়ার্টার্স ব্যাটালিয়ন। ঢাকায় অবস্থানকালে শেরভিলস অফিসারদের ভারসাম্য রক্ষা, সম্মান এবং সৈন্য বহনে সুনাম অর্জন করে।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের একটি রাস্তা আমার নামে টাইগার, রোড’ নামকরণ করা হয়। এই নাম পরিবর্তন করা হয় নি। ক্যাপ্টেন গওহর আইয়ুব, জাতীয় পরিষদের সাবেক স্পিকার, লেফটেন্যান্ট আসিফ নেওয়াজ, পরে সিওএএস এবং লেফটেন্যান্ট আলম জান মাসুদ, পরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল সবাই ১/১৪ পাঞ্জাবে আমার নেতৃত্বে কাজ করেছেন।

পূর্ব পাকিস্তানে আমার কর্তব্য সফলভাবে শেষ হবার পর আমরা পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামে জাহাজে উঠি ১৯৫৭ সালের ১০ই নভেম্বর। করাচি থেকে ১/১৪ পাঞ্জাবকে ট্রেনযোগে লাহোরে নেওয়া হয়। সেখানে আমরা ১০৬তম ব্রিগেডের অন্তর্ভুক্ত হই, যার নেতৃত্বে ছিলেন ১০ই ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার ওয়াহিদ হায়দার এবং জেনারেল অফিসার কমান্ডিং হিসেবে মেজর জেনারেল আজম খান।

লাহোরে আসার পর থেকে আমরা সেনাবাহিনীর একটা নতুন ট্যাকটিক্যাল প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করি যেটা ‘নিউ কনসেপ্ট’ নামে পরিচিত। এটা ছিল কমান্ডার-ইন-চিহ্ন জেনারেল আইয়ুব খানের আইডিয়া। এ কনসেপ্টের মূল বিষয়বস্তু যাতে প্রত্যেক অফিসার বুঝতে পারে সে জন্য পেপারগুলো লিখতে হতো, আলোচনা করা হতো। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায় নি। এ কারণে প্রতিরক্ষা কৌশলের সব দিক তুলে ধরার জন্য ডেমোন্সট্রেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

১০৩ ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার গুল মওয়াজকে দেওয়া হয় ডেমোন্সট্রেশনের দায়িত্ব । ১০৩ ব্রিগেডের অবস্থান লাহোর ক্যান্টনমেন্টে। মেজর জেনারেল (পরে জেনারেল) হামিদ ও তার স্টাফ অফিসার কর্নেল উমর (পরে মেজর জেনারেল) পেপারওয়ার্ক করছিলেন।

এ সময়ে একজন পরামর্শ দিলো যে, যেহেতু লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিয়াজির যুদ্ধে অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তিনি একজন ইনস্ট্রাক্টরও ছিলেন। তাই ডেমোন্সট্রেশনের দায়িত্ব তার ওপর ছেড়ে দেওয়া হোক। সুতরাং আমার ব্যাটালিয়ন ১০৬ ব্রিগেড থেকে ১০৩ ব্রিগেডে স্থানান্তরিত হয়। আমার ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রতিরক্ষা কৌশলের ডেমোন্সট্রেশন প্রদানের- আমাদের নতুন কনসেপ্ট।

আমি টিলা ফিল্ড ফায়ারিং এলাকায় ট্যাকটিক্যাল কনসেপ্ট অনুযায়ী ব্যাটালিয়নকে বিভিন্ন পর্যায়ে মোতায়েন করি। কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান এবং আমন্ত্রিত বিদেশি মিলিটারি অ্যাটাশে গণ- ডেমোন্সট্রেশন প্রত্যক্ষ করেন। ডেমোন্সট্রেশনে শেরডিলসের উঁচু মানের কর্মকাণ্ড দেখে মুগ্ধ হন জেনারেল আইয়ুব খান।

আমি ৫ পাঞ্জাব (শেরডিল)-এর নেতৃত্ব দিই ১০ই জুন ১৯৬১ পর্যন্ত। এরপর আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয় ৫১ ব্রিগেড়ে, তার কমান্ডার হিসেবে। ব্রিগেডকে সিয়াটোর অধীনে লাওসে পাঠানোর জন্য মনোনীত করা হয়।

তখন আমি ছিলাম একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল, ব্রিগেডিয়ার ব্যাংকে পদোন্নতি লাভ করার মতো যথেষ্ট সিনিয়র নই। তবু ৫১ ব্রিগেড কমান্ড করার জন্য নির্বাচন করা হয় আমাকে। আমাকে রাতারাতি পদোন্নতি দেওয়া হয়। লাওসে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আমাকে ব্যাপক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা যাই নি। এর কারণ জানানো হয় নি আমাদের।

 

পাকিস্তানে আগমন

 

করাচিতে ৫১ ব্রিগেড কমান্ডিং ছাড়াও আমাকে করাচি ও সিন্ধুর সামরিক প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। বিভিন্ন মহলের চাপ ও প্রলোভনের মুখে কাজ করতে হয়েছে আমাকে। আল্লাহর রহমতে আমি করাচি ও সিন্ধুকে ভালোভাবে এবং সুনামের সাথে শাসন করি। আমাকে ‘সিতারা-ইন-খিদমত’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

Leave a Comment