আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান ভারত যুদ্ধ। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
১৯৬৫ সালের পাকিস্তান ভারত যুদ্ধ

১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ
এটা সত্য যে, আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্তির মূলে রয়েছে চরম ঘৃণা ও শত্রুতা। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের কারণ ছিল পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর করার ব্যর্থতা। তখন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় এবং সব বিচ্ছেদ দূরীকরণের সিন্ধান্ত নেওয়া হয় যুদ্ধক্ষেত্রে।
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তেমন কিছু করার উপায় ছিল না। স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিকস, যেখানে আমি কমান্ড্যান্ট ছিলাম, সেটা বন্ধ হয়ে আসে। স্টুডেন্ট অফিসার এবং ইনট্রাক্টরদের তাদের নিজ নিজ ইউনিট ও রাহে ফিরে যাবার নির্দেশ দেওয়া হয় ন্যূনতম কিছু কর্মচারী রয়ে যায় অস্ত্রশস্ত্র, যন্ত্রপাতি, স্টোর ও বাসস্থান দেখাশোনা করার জন্য। আমাকে ১৪ প্যারা ব্রিগেডের কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়, যেটা ভাই ফাইরুতে অবস্থিত এবং লাহোর থেকে প্রায় ৩০ মাইল দূরে।
আমি সিগনাল কোরের ব্রিগেডিয়ার সুলেমানের কাছ থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করি। মেজর জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৭ম পদাতিক বাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল আলতাফ কাদিরের কাছ থেকে। অভিজ্ঞতা ও যুদ্ধ পরবর্তী কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে অফিসারদের বিভিন্ন ব্যূহ ও ইউনিটে নিয়োগ দেওয়া হয়। যুদ্ধ শুরু হবার সাথে যে সব অফিসারকে যুদ্ধকালে সামরিক অভিযানে অক্ষম বলে বিবেচনা করা হয়, তাদেরকে বিভিন্ন ইউনিট ও ব্যুহের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
১৪তম প্যারা ব্রিগেডের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর আমি সত্যিকারের যত্নের সাথে আমার ব্রিগেডকে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করি। আমার ব্রিগেড ছিল মেজর জেনারেল ইয়াহিয়ার নেতৃত্বাধীন ৭ম ডিভিশনের অংশ। এ সময়ে কাশ্মিরে ‘অপারেশন জিব্রান্টার’ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
‘অপারেশন জিব্রাল্টার’ পরিচালনার নেতৃত্ব দেবার কথা বলা হয় ১২তম ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল আখতার মালিককে। জেনারেল আখতারের অনুরোধে আমাকে রাওয়ালপিন্ডিতে জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে তলব করা হয়। সেখানে আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয় মারিতে অবস্থিত ১২তম ডিভিশনের হেডকোয়ার্টাসে রিপোর্ট করার জন্য।
জেনারেল আখতারকে আমি ভালোভাবে চিনতাম, যখন আমি মেজর হিসেবে কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের ট্যাকটিক্যাল উইং-এর ইন্সট্রাক্টর ছিলাম। ইয়াহিয়া খান ও আখতার মালিক দুই জনেই লেফটেন্যান্ট কর্নেল থাকাকালে স্টাফ উইং-এর ইন্ট্রাক্টর ছিলেন। ১০ ব্রেইথওয়েট রোডে এক বাড়িতে আমরা ৩ মাস একত্রে বসবাস করেছি।
আমাদের পরিবার আমাদের সাথে না থাকায় আমাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ৭ম ডিভিশন থেকে আমি আমার ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার্স ও এক ব্যাটালিয়নসহ ১২তম ডিভিশনে স্থানান্তরিত হই। এটা ছিল জিওসি ১২তম ডিভিশনের বিশেষ অনুরোধ ।
আমার ব্রিগেড মেজর ইমতিয়াজ (পরে মেজর জেনারেল) কে সাথে নিয়ে আমি মারিতে ১২তম ডিভিশনের হেডকোয়ার্টার্সের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। জেনারেল আখতার আন্তরিকতার সাথে আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানান। তিনি আমাকে মুজাফফরাবাদে ১নং সেক্টরের দায়িত্ব গ্রহণের কথা বলেন।
তার চাম্ব- জুরিয়ান অপারেশনের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় গভীরভাবে জড়িত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকায় তার অবর্তমানে আজাদ কাশ্মিরের রাজধানী মুজাফফরাবাদের দায়িত্ব গ্রহণ করার মতো একজন বিশ্বস্ত অফিসারের প্রয়োজন ছিল। অবস্থান আশানুরূপ পরিবর্তন হওয়াতে ১২তম ডিভিশন কমান্ডারের পক্ষে যে-কোনো সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া হয়।
ভারতীয় সৈন্য কর্তৃক দখলকৃত এলাকা সম্পর্কে তিনি মানচিত্রে ব্যাখ্যা করেন। এখানে ভারতীয়রা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। এখান থেকে মুজাফফরাবাদ দখলের জন্য অপারেশন পরিচালনা করা তাদের পক্ষে সহজ হয়ে ওঠে। তিনি আমাকে পরদিন অপারেশন অঞ্চলে রওনা হবার নির্দেশ দেন। তিনি আমাকে আরো নির্দেশ দেন যে, কোনো অবস্থায় শত্রুরা যেন মুজাফফরাবাদের দিকে এগিয়ে আসতে না পারে।
জেনারেল আখতার একই দিনে চাষ-এর উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কর্নেল স্টাফ কর্নেল ইজাজ (পরে মেজর জেনারেল)-কে রেখে আসা হয় ১২তম ডিভিশন অপরেশন রুম নিয়ন্ত্রণ করার জন্ যখন ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান, জেনারেল মুসা এবং তাদের স্টাফ অফিসাররা এসে পৌঁছেন, আমি তখনো ১২তম ডিভিশন হেডকোয়ার্টার্সের অপারেশন রুমে ছিলাম।
আখনুর দখলের পরিকল্পনায় সামান্য পরিবর্তন করা হয়। এটা ছিল খুবই চমৎকার পরিকল্পনা, কিন্তু আলোচনার সময় ধরা পড়েছে এতে একটি ত্রুটি রয়েছে। অন্যান্য সেক্টরের নিরাপত্তার চিন্তা না করে এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়। শত্রুর আনুষঙ্গিক বিষয়, পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, সংশ্লিষ্টতা এবং সার্বিক পরিকল্পনা, বিশেষ করে শত্রুর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনা করা হয় নি।
‘আমি বললাম, ‘যেহেতু আখনুর দখল করে নিলে জম্বু-কাশ্মিরের গুরুত্বপূর্ণ পথ বিচ্ছিন্ন হবে, কিন্তু ভারত আমাদের মনোযোগ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে কিংবা ধরুন লাহোরের বিরুদ্ধে, অথবা পাঞ্জাবের জন্য হুমকি হতে পারে এমন কাজের জন্য আমাদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ বৃদ্ধি করতে প্ররোচিত করবে না তো?” যা হোক, ‘অপারেশন জিব্রান্টার’-এর সম্ভাব্য সাফল্যে সবাই এতো বেশি উদ্বেলিত ছিল যে, আমার কথা কেউ শোনে নি। সব বিবেচনা স্রেফ বাতিল হয়ে যায়।

পরদিন আমি মুজাফফরাবাদে পৌঁছলাম এবং যথা সময়ে ১ম আজাদ কাশ্মির ব্রিগেডের দায়িত্বভার গ্রহণ করলাম। কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার খিলজি তখন উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু তার বিএম এবং ডিকিউ উপস্থিত ছিলেন। ১৪তম প্যারা ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার্স এবং তার একটি ব্যাটালিয়ন ১/১ পাঞ্জাব যার নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল নসরুল্লাহ আমাদের সাথে মুজাফফরাবাদে যোগ দেয়।
