আজকের আলোচনার বিযয় পুরানো ইস্যু ও নয়া নেতৃত্ব পর্ব-১, যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত। শুরু থেকেই নানা রকম বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে। আন্দোলন সংগ্রামের বন্ধুর পথের পাশাপাশি ছিল আভ্যন্তরীণ ভাঙ্গন, ষড়যন্ত্র সহ নানা বিষয়। আবার উঠে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগ। নতুন নেতার হাত ধরে নতুন দিশা পেয়েছে আওয়ামী লীগ। আবার নতুন করে নেতৃত্ব দিয়েছে জাতির। এই পর্বে সেই ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
পুরানো ইস্যু ও নয়া নেতৃত্ব

পুরানো ইস্যু ও নয়া নেতৃত্ব পর্ব-১
নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ঢাকায় ওয়ার্কিং কমিটির সভায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এবং পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের বিষয়টি অনুমোদন করে। এ ছাড়া তিন দিনব্যাপী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর ও ডেলিগেট সম্মেলনের প্রাক্কালে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তার নিজ পুনরুজ্জীবনেরও সিদ্ধান্ত নেয়।
যে ধারা বিন্যাসে পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ও নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন ঘটে তাতে পাকিস্তানের অন্যতম জাতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় সংগঠনের নির্মিতি ও কাঠামোগত দুর্বলতারই আভাস পাওয়া যায়।

এতে খোদ পাকিস্তানী জনসমাজের অভ্যন্তরে মৌলিক ও অমীমাংসিত স্ববিরোধিতাই প্রকাশ পেয়েছে। এ ছাড়া পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান উভয় আওয়ামী লীগের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি ম্যানিফেস্টো প্রণয়নে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ব্যর্থতায় এ দুর্বলতা আরো বেশি করে প্রতিফলিত হয়েছে। এ জন্য কাগজপত্রে পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অন্যতম অঙ্গ থাকলেও সকল ব্যবহারিক পর্যায়েই পূর্ব পাকিস্তানে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বকীয় স্বাধীন সত্তা বজায় রাখে।
এ পুনরুজ্জীবন আসলে আনুষ্ঠানিকতা নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের মাত্র। কেননা, পুনরুজ্জীবনের বহু আগে থেকেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ আসলে কাজ করতে শুরু করেছিল। ফেব্রুয়ারির গোড়ার দিকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। ওয়ার্কিং কমিটি ভোটাধিকারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় মিলিত হয়। এ বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ জনসাধারণের ঘোষিত অভিপ্রায় ও ভোটাধিকার কমিশনের সুপারিশের বিরুদ্ধে তৎকালীন সরকারের চলতি নির্বাচন পদ্ধতি আঁকড়ে থাকার জেদের নিন্দা জানায়।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি জনগণের দাবি পূরণের লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে হাত মিলানোর জন্যে অন্যান্য দলের প্রতি আহ্বান জানায় ও সেই সাথে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ইউনিটগুলিকে তাদের নিজ নিজ এলাকায় সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে একত্রিত ও সংঘবদ্ধ করার নির্দেশ দেয়। এ সব নির্দেশনার অনুসরণে দল গড়ার কাজ অনতিবিলম্বে হাতে নেওয়া হয়।
এ কাজের সূচনা হয় জেলা ও মহকুমা পর্যায়ের কর্মী সম্মেলন দিয়ে যেখানে শীর্ষস্থানীয় দলীয় নেতারা জনগণের দাবি আদায়ের জন্য রাজনৈতিক দলসমূহের গুরুত্ব ও আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন। এই সব সম্মেলন অনুষ্ঠানের পরপরই অতি আবশ্যিকভাবেই বিভিন্ন জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সব জনসভায় স্থানীয় নেতাদের পাশাপাশি সফরে আসা দলীয় নেতারা পাকিস্তানের আর্থ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয় আলোচনা করেন ।
আলোচনায় পূর্ব পাকিস্তানের দুর্গতি সম্পর্কে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয় । তাঁরা তাঁদের এ সব ভাষণে স্থানীয় নানা সমস্যার কথাও আলোচনা করতেন যেগুলির আশু সমাধানের প্রয়োজন ছিল।` আসলে এ সব সভাসমিতির অনুষ্ঠান ছিল অচিরেই অনুষ্ঠেয় কাউন্সিলর ও ডেলিগেট সম্মেলনের প্রাকপ্রস্তুতি । পূর্ব পাকিস্তানের গণমানুষ স্তরে পৌঁছানো ও তাঁদের সাথে যোগাযোগ করার এই ধারা পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের একটা স্থায়ী রীতিতে পরিণত হয় ।
কাউন্সিলর ও ডেলিগেট সম্মেলনের অধিবেশনকালেও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যগুলি বেশ পরিষ্কার ও বোধগম্য হয়ে ওঠে। উদ্বোধনী ভাষণে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান গণবিরোধী নানা কার্যকলাপের জন্য গণতন্ত্রবিরোধী সরকারের সমালোচনা করেন ও জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় পূর্ব পাকিস্তানের সংগ্রামে পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সমর্থন দেওয়া উচিত বলে উল্লেখ করেন।
তবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সক্রিয়তার প্রধান বিষয় পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যাগুলি কী কী তার কোনো সুনির্দিষ্ট উল্লেখ তিনি করেননি। অবশ্য তিনি যে সভামঞ্চে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন সেখানকার আশপাশের দেওয়ালে পূর্ব পাকিস্তানের নানা দাবিদাওয়াভিত্তিক পোস্টার শোভা পাচ্ছিল । এ সব পোস্টারে লেখা ছিল: নৌবাহিনীর প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে চাই; জনসংখ্যারভিত্তিতে সৈন্যবাহিনীতে লোক নিয়োগ করতে হবে, পাটের ন্যায্যমূল্য দিতে হবে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিতে হবে ইত্যাদি।
দলীয় পুনরুজ্জীবনের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে এই সভায় সম্মিলিত প্রয়াসের প্রয়োজনের কথাও স্বীকার করা হয় এবং সাধারণ সম্পাদককে ওয়ার্কিং কমিটির সাথে পরামর্শক্রমে অন্যান্য পুনরুজ্জীবিত রাজনৈতিক দলের সাথে সহযোগিতার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি নেওয়ার ব্যাপারে ক্ষমতা প্রদান করা হয়।
সভায় ২৬টি প্রস্তাব গৃহীত হয়। এ সব প্রস্তাবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের যাত্রা শুরু থেকে এ সংগঠনের যে সব দাবিদাওয়ার কথা মাঝেমাঝেই উচ্চারিত হয়েছে। সেগুলি আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হয়।
পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র সম্পর্কিত প্রস্তাবে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের শাসনতান্ত্রিক নিশ্চয়তার বিষয়ও সন্নিবেশিত ছিল। অন্য এক প্রস্তাবে দেশের প্রতিটি অঞ্চলের পৃথক পৃথক অর্থনীতির জন্য শাসনতান্ত্রিক গ্যারান্টি ও পৃথক অর্থনীতির ভিত্তিতে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির দাবিও করা হয়। নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলির জন্য শাসনতান্ত্রিক গ্যারান্টি চাওয়া হয়: ক. সর্বজনীন ভোটাধিকারভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচন;
খ. মৌলিক অধিকারের ন্যায্যতা;
গ. বেআইনী গ্রেপ্তার ও বিচার ছাড়া আটকাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিবিধান;
ঘ. নির্বাহী বিভাগকে বিচার বিভাগ থেকে পৃথকীকরণ;
ঙ. আইন পরিষদসমূহের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব;
চ. রাজনৈতিক দল গঠন এবং সংবাদ মাধ্যম ও সংগঠনের মাধ্যমে জনমত প্রকাশের অবাধ অধিকার।
এ ছাড়া নিম্নবর্ণিত দাবিগুলিও উল্লিখিত গৃহীত প্রস্তাবাবলির অন্তর্ভুক্ত ছিল:
ক. বন্যা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ব্যবস্থাগুলির বাস্তবায়ন;
খ. উত্তরবঙ্গের দ্রুততর অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বাহাদুরাবাদের কাছে যমুনা
নদীর ওপর দিয়ে সেতু নির্মাণ;
গ. যমুনার পশ্চিম তীর বরাবর রংপুর থেকে সিরাজগঞ্জ অবধি বাঁধ নির্মাণ;
ঘ. সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাগুলির পান ও নারকেল চাষীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সুদমুক্ত ঋণ;
ঙ. প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতনস্কেল বৃদ্ধি এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের জন্য মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধি;
চ. মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্রদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ অবারিত করা;
ছ. শ্রমিক/কর্মীদের ধর্মঘটের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ বাতিল;
জ. গরিবদের কষ্ট লাঘবে জমির মালিকানা নিরূপণ-সংক্রান্ত আইনকানুনের সংশোধন;
ঝ. বিশ্ববিদ্যালয়গুলির জন্য স্বায়ত্তশাসন এবং পশ্চিম পাকিস্তানী বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ওপর থেকে বিধিনিষেধমূলক অধ্যাদেশগুলি প্রত্যাহার; এবং
ঞ. রাজবন্দীদের মুক্তিদান ।
ভারতে পশ্চিমা শক্তিগুলির ব্যাপক অস্ত্র সাহায্যের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট কথিত জরুরি পরিস্থিতির আলোকে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এক পূর্ব পাকিস্তানী মিলিশিয়া বাহিনী বা আধা সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনের কথাও পুনরায় উল্লেখ করা হয়।
করাচি থেকে ইসলামাবাদে ফেডারেল রাজধানী স্থানান্তরের প্রতিবাদ করে বলা হয়, করাচি যদি ফেডারেল রাজধানীর অনুপযুক্ত হয়ে থাকে তাহলে ঢাকা তার বিকল্প হওয়া উচিত । সভায় গৃহীত অন্যান্য প্রস্তাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সমালোচনা করা হয়, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং কাশ্মীরীদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করা হয়।
বিশ্বশান্তি ও দেশে স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে মতপ্রকাশ করা হয়। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় এই যে, সভার অন্যতম প্রস্তাবে ঘোষণা করা হয় যে, কেবল সমাজতান্ত্রিক ধরনের অর্থনীতিই জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে আর সে কারণেই সমাজবাদী ধরনের অর্থনীতির ক্রম বাস্তবায়ন প্রয়োজন ।
স্পষ্টত এ সব গৃহীত প্রস্তাব ইতোমধ্যে নিয়োজিত ম্যানিফেস্টো উপকমিটির জন্য নির্দেশনামূলক রূপরেখা প্রদান করে। শাসনতন্ত্রের গণতন্ত্রায়ন দাবির বাইরে যে দুটি দাবি ১৯৪৯ থেকে প্রণীত ইতঃপূর্বেকার ম্যানিফেস্টোগুলিতে তেমন করে মনোযোগে আসেনি উল্লিখিত প্রস্তাবগুলিতে সে দুটির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। প্রস্তাবগুলি হলো: (১) চূড়ান্ত পর্যায়ে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির অপরিহার্যতা; (২) দ্বিঅর্থনীতির জন্য শাসনতান্ত্রিক গ্যারান্টি।
পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ১১-দফা খসড়া ম্যানিফেস্টো কয়েকমাস আগে প্রকাশিত হয়।” প্রস্তাবগুলি তাই মূলত ভাঙন পূর্ববর্তী মূল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টোর মতোই কমবেশি একই থাকে । এতে যা কিছু ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায় তা হলো দেশের অন্যতম মৌলিক আইন হিসেবে দ্বিঅর্থনীতি প্রবর্তন এবং চূড়ান্ত অনিবার্য লক্ষ্য হিসেবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দাবি।
আগের ম্যানিফেস্টোগুলিতে “দ্বিঅর্থনীতি” এই পরিভাষা ব্যবহৃত না হলেও আওয়ামী লীগাররা এ শব্দ ব্যবহার করেছেন। আর মওলানা ভাসানীও কাগমারীতে দল ভাঙার আগে অনুষ্ঠিত দলের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে তাঁর সভাপতির ভাষণে এর উল্লেখ করেন।
সমাজবাদী অর্থনীতির ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপের বিষয়টি এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। ১৯৪৯ সালের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টোতে বিধৃত ধারণা অনুযায়ী পাকিস্তান হবে “রাষ্ট্রসমূহের এক স্বাধীন সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ইউনিয়ন, এদেশের শিল্প হবে জাতীয়কৃত আর এ সব শিল্পের ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে ।” তবে “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” এই পারিভাষিক শব্দটি তাতে ব্যবহৃত হয়নি।
সমাজের অগ্রগতি বিধানের জন্য অতঃপর একমাত্র বাস্তব প্রয়োগযোগ্য উপায় হিসেবে “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” গ্রহণ করা সংক্রান্ত প্রস্তাব দলীয় নেতাদের আর্থ-রাজনৈতিক ধারণায় এক তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন সূচিত করেছিল ।
এতে আরো যে জিনিসটি বোঝা যায় তা হলো দলের সিদ্ধান্ত প্রণয়ন পরিমণ্ডলে কথিত প্রগতিবাদীদের আরো কার্যকর ও ফলদায়ক অংশগ্রহণ । ন্যাপের দিক থেকে কোনো সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে ভারসাম্যরক্ষাকারী কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, নাকি তা ছিল ঐ দলের সত্যিকারের রূপান্তর— বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকতে পারে। তবে বিতর্ক যে দিকেই হোক, এতে প্রধান রাজনৈতিক গতি প্রবণতায় পরিবর্তন প্রতিফলিত হয়।
আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের কথা ছেড়ে দিলেও ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কী হবে সে বিষয়ে গৃহীত অবস্থান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এবং নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের মধ্যে মতপার্থক্য আরো বাড়িয়ে তোলে এবং এর ফলে দলের জাতীয় বৈশিষ্ট্য দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি শাখা অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের স্বাতন্ত্র্যের বিষয়টি পরিষ্কার ফুটে ওঠে। এ বিষয়টি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতারা প্রায়ই উল্লেখ করেছেন। আর নয়া নেতৃত্বেও আদৌ এর কোনো পরিবর্তন ঘটায়নি ।
সভায় দলের সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, (পূর্ব পাকিস্তান) আওয়ামী লীগই প্রথমবারের মতো দেশের দুই অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বৈষম্যের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগই প্রথমবারের মতো তথ্য ফাঁস করেছে যে, পূর্ব পাকিস্তানী গরিব চাষীর কঠোর শ্রমলব্ধ বৈদেশিক বিনিময় মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানের মুষ্টিমেয় শিল্পপতি ও ধনবান ব্যক্তির স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে আর তাতে দেশের দুই অংশের মধ্যে ব্যবধান আরো বেড়ে যাচ্ছে।
সাধারণ সম্পাদক এ কথাও মনে করিয়ে দেন যে, এ ধরনের কথাবার্তা বলার জন্য এক সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের দণ্ডিত করা হয়েছে কিন্তু তাঁরা যে সব নিরেট সত্য প্রকাশ করেছিলেন তার যথার্থতা পরবর্তীকালে ব্যাপক পর্যায়ে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে এবং তা হয়ে উঠেছে ক্রমবর্ধমান গণঅসন্তোষের কারণ। আর তারই ফলে সামরিক আইন সরকার ও পরবর্তী সরকার এ সব অভিযোগের সারবত্তা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন।
সাধারণ সম্পাদক জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে, বলিষ্ঠভাবে সুসংগঠিত রাজনৈতিক দলগুলির সমর্থনবিহীন কোনো “ফ্রন্ট”-এর পক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করা অসম্ভব কাজ । কেননা শুধু বিবৃতি আর প্রচারণাই জনগণের দাবি মেনে নিতে এমন চরম প্রতিক্রিয়াশীল শাসকচক্রকে সম্মত করার জন্য পর্যাপ্ত নয়। এ জন্য একটা কার্যকর, ফলপ্রসূ ব্যবস্থা নিতে হবে। কেবল নেতাদের ঐক্য দিয়ে তা আদৌ সম্ভব ও বাস্তবোচিত নয় । জনগণের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি এ জন্য অত্যন্ত জরুরি ও মৌলিক পূর্বশর্ত। আর জনঐক্য কেবল সংগঠিত রাজনৈতিক দলগুলির দ্বারাই সম্ভব। এমনকি কোনো ন্যূনতম কর্মসূচিভিত্তিক আন্দোলন পরিচালনা করতে হলে এবং কোনো রকমের চাক্ষুষ ও বাস্তব ফল পেতে হলে সংগঠিত রাজনৈতিক দলসমূহের সমর্থনও আবশ্যক।’
কাউন্সিলর ও ডেলিগেট সম্মেলনে ৯৪৪ জন কাউন্সিলর ও ডেলিগেট পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলা থেকে যোগ দেন। তাঁরা প্রতিটি গ্রামে গণআন্দোলন গড়ে তোলার শপথ নিয়ে ঢাকা ত্যাগ করেন। এ ছাড়াও বলা যায় যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের এ সম্মেলন নানা দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। দলীয় কর্মীদের প্রকাশ্য ও রুদ্ধদ্বার — উভয় অধিবেশনেই খোলাখুলি আলোচনায় দেখা যায়, কর্মীরা উপলব্ধি করেন যে, সামরিক আইন পূর্ব ও পরবর্তী আমলের রাজনৈতিক আন্দোলনগুলির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
একজন একর ব্যক্তিকেন্দ্রিক কোটারি শাসনের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে কেবল অঙ্গীকারের ভিত্তিতে বিভিন্ন দল ও তাদের নেতাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকতামূলক ঐক্যই জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয় । যা দরকার ছিল তা হলো সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির ভিত্তিতে ঐকা এবং গ্রাম অবধি নিম্নতম স্তরে জনমত সংগঠিত করা যা কেবল একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দলের পক্ষেই সম্ভব।
আওয়ামী লীগের সংগঠন অসংহত হয়ে পড়েছে বলে যে জল্পনা-কল্পনা ছিল তাও এ সম্মেলনে বিপুল উপস্থিতি, খোলাখুলি আলোচনা, উত্থাপিত প্রস্তাবগুলি সম্পর্কে ঐকমত্য এবং ব্যাপক গণপর্যায়ে জনমত সংগঠনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয়ের কারণে ঠিক নয় বলেই প্রমাণিত হয়। এ ছাড়া, দল হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান।
আওয়ামী লীগের সবচেয়ে কার্যকর অবস্থানের বিষয়টির আর একটি প্রমাণ: একদা কট্টর মুসলিম লীগার ও প্রাকসামরিক আইন আমলে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহ আজিজুর রহমান পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। কারণ তাঁর এই মর্মে উপলব্ধি ঘটে যে, আওয়ামী লীগ কেবল বিরোধীদলকে নেতৃত্ব দিতেই সক্ষম নয় বরং ভবিষ্যতে দায়িত্ব নেওয়ার সামর্থ্যও রাখে।
বাস্তবিকপক্ষে, পল্লী জনগণের দলীয় কর্মীদের চাপেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দলীয় পুনরুজ্জীবন দ্রুততর হয়। কর্মসূচিভিত্তিক সাংগঠনিক কাজের অভাবে এই দলীয় কর্মীরা অস্থির হয়ে উঠছিল। তাদের মনে হতে থাকে তারা জনসাধারণের আস্থা দ্রুত হারাচ্ছে।
এই “জনসাধারণ” আসলে কারা? ওরা ছিল বিপুল সংখ্যক দারিদ্র্যপীড়িত গ্রামবাংলার চাষীকুল ও প্রদেশের কিছু শিল্প শ্রমিক। জীবনের অপরিহার্য প্রয়োজনগুলি হাতের নাগালে পাওয়াই ছিল তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্থাৎ মুসলমানরা ১৯৪৫-৪৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগকে ভোট দিয়েছিল এই আশায় যে, পাকিস্তানে তাদের এ সব জিনিসের অভাবে ভুগতে হবে না। তবে এ সংগঠনটি সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় তারা ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগকে প্রত্যাখ্যান করে।
৬০- দশকের মধ্যভাগ নাগাদ তারা টের পেয়ে যায় যে, বুনিয়াদি গণতন্ত্র ব্যবস্থা ও সেই সঙ্গে পল্লী পূর্ত কার্যক্রম যা আইয়ুব খান প্রবর্তন করেছিলেন সেগুলি আসলে পল্লী জনপদের অধঃপতিত গরিবদের কপাল ফেরানোর চেয়ে বরং অর্থনৈতিক দিক থেকে আধিপত্যশীল যে শ্রেণী ইতোমধ্যে বিরাজমান ছিল সেই “উদ্বৃত্ত” জোতদারদেরই পৃষ্ঠপোষকতা ও তাদের ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ারই হাতিয়ার মাত্র।
প্রশাসনিক অনিয়ম ও গলদের কারণে পিএল-৪৮০ তহবিলের অর্থে পরিচালিত পল্লী পূর্ত কার্যক্রম গরিব ও ঋণজর্জরিতদের স্বস্তি আনার বদলে “উদ্বৃত্ত” জোতমালিক তথা সুদের মহাজনদের সমন্বয়ে গঠিত গ্রামের বিশিষ্ট প্রভাবশালীদের হাতে আরো বিত্ত পুঞ্জীভূত হতে দেওয়ার মাধ্যমে নিগ্রহমূলক শক্তিকে আরো কেন্দ্রীভূত করায় সাহায্য করে। উল্লেখ্য, এই জোতদার-মহাজনরাই প্রধানত ছিলেন মৌলিক গণতন্ত্রী । ১৯৬৩ সালের উপনির্বাচনে এরাই সরকারকে বিপুলভাবে যে সমর্থন জানায় তা আসলে ছিল ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর “মহানুভবতায়” তাঁদের কপাল খুলে যাওয়ার জন্য তাঁদের কৃতজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। কিন্তু নিঃস্ব, গরিব চাষীর হতাশার চশমার কাঁচে এ মৌলিক গণতন্ত্রীরা অলস ও দুর্নীতিপরায়ণ লোক হিসেবে ফুটে ওঠে যারা তাদের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে অত্যন্ত নির্লজ্জের মতো এ তহবিলের টাকা ব্যবহার করে।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পল্লী পূর্ত কার্যক্রমকে এক প্রতারণা বলে অভিহিত করতে থাকে। এদিকে, এমনকি ইউনিয়ন স্তরে সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে এ রকম একমাত্র বিরোধীদল হওয়ায়, আওয়ামী লীগ গরিব পল্লীবাসীর জন্য একমাত্র চাক্ষুষ ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হয়ে ওঠে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কর্মীরাও ছিল ওদেরই লোক । একই কথা ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাদের সম্পর্কেও । তখন নগরায়নের হার অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে থাকায়` মহকুমা ও জেলা পর্যায়ের নেতারা যদি বা তথাকথিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কেউ হয়েও থাকেন তাহলে তাঁরা একই ‘গণ’-এর অন্তর্ভুক্ত। দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও খুব একটা ভিন্ন কিছু ছিলেন না।
তবে তাঁদের বেলায় পার্থক্য শুধু এটুকুই যে, শহরের গণ্যমান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে তাঁদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল । এ প্রদেশের রাজনীতির ব্যবস্থাপনায় এই শেষোক্ত নাগরিকদের একটা কায়েমি স্বার্থ থাকারই কথা। তাদের আকাঙ্ক্ষা-অভিলাষ সরকারের সিদ্ধান্ত প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া—উভয় ক্ষেত্রেই পশ্চিম পাকিস্তানীদের প্রবল আধিপত্যের কারণে ক্ষুণ্ণ হচ্ছিল । এ ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রায়নের ব্যবস্থাসহ পাকিস্তানে একটি ফেডারেল কাঠামোর আওতায় পরিপূর্ণ অংশীদারিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম থাকলে অবশ্য এ অবস্থার প্রতিকার হতে পারতো।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এ সবকিছুর জন্য সব সময় লড়েছে। এ জন্য সাধারণ মানুষের স্পর্শ অর্থাৎ গ্রামের মানুষের ও অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থার শহরের লোকদের স্বার্থের একত্র সমাবেশ ঘটার ফলে সেটি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের জন্য সমর্থনের এক ব্যাপকতর বুনিয়াদ ও যুগপৎ অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হাতিয়ারও হয়ে ওঠে।
১৯৬৪ সালের মাঝামাঝি প্রকাশিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টো বাস্তবিকপক্ষে একাধারে দ্বিঅর্থনীতির দাবি অন্তর্ভুক্ত করে শহরবাসী জনগোষ্ঠীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে এবং এক সমাজবাদী অর্থনীতির সপক্ষে বিঘোষিত অগ্রাধিকারের মাধ্যমে গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন করে দ্বৈত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে।
‘সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি’—এই পারিভাষিক শব্দ নিয়ে কী কী কল্পনা করা হয়েছে তা স্পষ্ট করা হয়নি তবে শিল্প কারখানাগুলির জাতীয়করণ ও বড় ধরনের ভূমি সংস্কার পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কর্মসূচির অঙ্গ বলে তখন জানা ছিল। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ-গণতন্ত্রী দল (জিডি)-কংগ্রেস কোয়ালিশন এক ভূমি সংস্কার সম্মেলনের আয়োজন করে ।
সম্মেলন আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল, পূর্ব পাকিস্তানে জমিদারি উচ্ছেদ পরবর্তীকালে কৃষি জমির রাজস্ব বা খাজনা সম্পর্কিত সমস্যাবলি দূর করার সুনির্দিষ্ট উপায় ও পন্থাসুপারিশ করা। এ সম্মেলনে এ বিষয়ে যে সব সুপারিশ করা হয় সেগুলি বিরাজমান পরিস্থিতির বিচারে বেশ “প্রগতিধর্মী” বলে বিবেচিত হয়।
এ কারণে কৌশলগতভাবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খানের মতো সামন্ত জমিদারের নেতৃত্বাধীন নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অঙ্গ হলেও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ বিভিন্ন স্তরের পূর্ব পাকিস্তানী জনসাধারণের হৃদয়ের অত্যন্ত নিবিড় চাহিদা ও সমস্যাগুলির পক্ষে কাজ করেছে। আর এই একই কারণে পশ্চিম পাকিস্তানী মনমানসে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ব্যাপারে নানা রকমের সংশয় ছিল। আর সরকার সেটির সুযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দুই তরফের মধ্যে বিভেদ আরো বাড়িয়ে তোলার প্রয়াস পায়।
ঢাকায় যখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেই সময়ে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান নীলফামারীতে বিশেষ কিছু রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে জনগণকে হুঁশিয়ার করে দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল যে, যদি এই দলগুলি সিঁড়ি বেয়ে ক্ষমতায় উঠে আসতে সক্ষম হয় তাহলে তা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেশের অস্তিত্ব লুপ্ত হওয়ার শামিল হবে। তিনি এ সব দলের রাজনীতিকদেরকে “কেরায়া কা টাট্টু” বা “ভাড়ার খচ্চর” বলে অভিহিত করেন। তিনি এই একই সুর ও ভাষায় পাকিস্তান মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলনেও বক্তৃতা দেন।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ অবশ্য প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলে যে, পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নের দাবির অর্থ পশ্চিম পাকিস্তানের অগ্রগতি রোধ করা নয়। আর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ যে সংগ্রাম পরিচালনা করছে তা পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে নয় বরং এ রাজনৈতিক দল দেশের উভয় অঞ্চলের সুসমঞ্জস বিকাশ ও উন্নতির পক্ষে।
এতে বাহাত আশ্বস্ত হয়ে, নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি ১৯৬৪ সালের ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে দেশের দুই অঞ্চলের মধ্যে সকল প্রকার বৈষম্য দূর করতে সম্ভাব্য সকল প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়।
বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়, দেশের সংহতি ও ঐক্যের স্বার্থে পাকিস্তানের উভয় অংশেরই উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এক সতর্ক বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ যদিও অভিমত প্রকাশ করে যে, তাদের দাবিদাওয়া পশ্চিম পাকিস্তানীদের তরফ থেকে মেনে নেওয়ার ব্যাপারে এক তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ তবু পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয় যে, নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সমস্যার সত্যতা স্বীকার করে নিলেও সে কারণে পূর্ব পাকিস্তানের দাবিদাওয়া মেনে নেওয়ার অনুকূলে পশ্চিম পাকিস্তানী সমর্থনের পরিসর কোনো রকম সম্প্রসারিত হয়নি। কেননা, যদি তাই হয়ে থাকবে তাহলে প্রথমে যে কাজটি হওয়া উচিত ছিল তা হলো, দলের জন্য একটি অভিন্ন ম্যানিফেস্টো প্রণীত হওয়া। তা হয়নি।
১৯৬৪ সালের যে সময় নাগাদ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হয় সেই সময়কালে পাকিস্তানী রাজনীতির স্ববিরোধিতাগুলি এই দলের নেতৃত্বের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় বলেই মনে হয়। দেশবিভাগপূর্ব ভারতে মুসলিম লীগের রাজনীতির সক্রিয় অংশীদার। হিসেবে তাদের এ বিষয়টির প্রতি নজর ও মনোযোগ এড়ায়নি যে, দুই অঞ্চলের মধ্যকার বৈষম্যের কারণ মূলত খোদ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের রাজনীতিতেই নিহিত ছিল |
অবিভক্ত বাংলা সবচেয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ হলেও তৎকালে এই প্রদেশ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সিদ্ধান্ত প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় কখনো সমানুপাতিক ভিত্তিতে অংশীদার হতে পারেনি। বাংলার মুসলিম লীগার বাদ দিলে বাংলার মুসলমানরা বলতে গেলে কার্যত পুরোপুরিই নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত-সংক্রান্ত সংস্থার প্রতিনিধিত্ব পায়নি। এ অবস্থার প্রতিকার কেবল মূল পর্যায়েই হওয়া সম্ভব ছিল। এ কারণে পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তার স্বল্পমেয়াদী অগ্রাধিকারগুলি বদলায়।
জাতীয় স্তরে এক বিরোধীদলের একটি প্রধান শাখা হওয়ার পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ বরং একনিষ্ঠভাবে একটি প্রাদেশিক রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেকে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেয়—যার প্রাথমিক উদ্দেশ্য: পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামোর খোলনলচে বদলে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ন্যায্য অধিকার ও অবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ন্যায়বিচার প্রত্যাশী পূর্ব পাকিস্তানীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ। অবশ্য এই পরিবর্তন যতো না তার অগ্রাধিকারগুলির বিষয়বস্তু ও গুরুত্ব আরোপের ক্ষেত্রে ছিল, তার কাঠামোর ক্ষেত্রে দৃশ্যত ততোখানি ছিল না ।
বস্তুতপক্ষে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে এ দল নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার আগে অবধি একটি জাতীয় পার্টির শাখা হিসেবেই নিজের অবস্থান বজায় রাখে, কিন্তু এর আগে পর্যন্ত একটা নিখিল পাকিস্তানভিত্তিক দলের ধ্বজা ধরে রাখলেও দলটি বিভিন্ন কার্যক্রম ও পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানীদের ‘অভিপ্রায়’কে ‘দাবি’তে পরিণত করে।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের গঠন পর্যায়ে যে দলীয় উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয় সেগুলি বদলায়নি । তবে তখনো পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়নি দলের উদ্দেশ্যগুলি অর্জন বা বাস্তবায়নে কী কী পন্থা বা পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে দু’টি বিকল্প ছিল এক, নির্বাচনগুলির মাধ্যমে সুবিধাজনক অবস্থানে যাওয়া। দুই, ব্যাপকভিত্তিতে গণচেতনা, জাগরণ ও আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করা। যে উপায়ই অবলম্বন করা হোক না কেন ব্যাপক পর্যায়ে জনমত সংগঠনের আবশ্যকতা ছিল।
আর তাই এর আশু পরবর্তী পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে সচেষ্ট হয়। ১৯৬৪ সালের ১১ মার্চ বয়স্ক ভোটাধিকার ও প্রত্যক্ষ নির্বাচন দেওয়ার জন্য সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। সেই আন্দোলনে শরিক হওয়া হোক কিংবা প্রেসিডেন্ট বা পরিষদীয় নির্বাচন লড়াইয়ের জন্য ১৯৬৪ সালের জুলাইয়ে গঠিত সম্মিলিত বিরোধীদল কপ (COP)-এ অংশীদার হওয়া হোক—লক্ষ্য ছিল এ সব কার্যক্রমের সীমিত লক্ষ্যগুলি ছাড়িয়েও পরিণতিগুলির জন্য জনসাধারণকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতির মেজাজ থেকে এ বিষয়টি একান্তই স্পষ্ট। বয়স্ক ভোটাধিকার ও প্রত্যক্ষ নির্বাচনকে ইস্যু করে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি আহূত দু’দিনব্যাপী দাবি দিবসের প্রথম দিনেই এ সংগঠনের বিদ্রোহাত্মক মনোভাবের বিষয় পরিলক্ষিত হয়। দাবি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিলে ছাত্র জনতার ওপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। মিছিলে লাঠি চার্জ করা হয়। তাজউদ্দিন আহমদ ও কোরবান আলীর মতো নেতারা গ্রেপ্তার হন।
পরের দিন হরতাল চলাকালে পল্টন ময়দানে আয়োজিত এক বিশাল জনসভা মওলানা ভাসানী ও নেতৃত্বে এক সুবিশাল মিছিলের রূপ নেয়। এ জনসভায়, সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক মুজিব ঘোষণা করেন যে, এমন একদিন নিশ্চয়ই আসবে যে দিন মানুষ এক অপ্রতিরোধ্য গণজোয়ারের মাধ্যমে তার মৌলিক মানবাধিকারগুলি ছিনিয়ে নেবে। এ সময় যে সব ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান—যাঁরা সীমিত ও পরোক্ষ ভোটাধিকার সমর্থন করে খবরের কাগজে তারবার্তা পাঠাতেন—তাঁদেরকে কড়া হুঁশিয়ারি জ্ঞাপন করে তিনি বলেন, তাঁর দল ক্রীড়নক সার্কেল অফিসার, এমনকি উচ্চতর পর্যায়ের আমলাদের একটি তালিকা তৈরি করছে ।
তিনি বলেন, ‘আমরা এ সব টাউটদের উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি ইউনিয়নে যাবো।’ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের আদি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও পরবর্তীকালে নিখিল পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা মওলানা ভাসানীও এ বিষয়ে অনুরূপ বক্তব্য প্রদান করেন। মুজিবের একটি চরমপত্রের আভাসের কারণেই উল্লিখিত বক্তৃতা পূর্ববর্তী বক্তব্যের চেয়ে ভিন্ন হলেও গত এক বছর বা অনুরূপ সময়ে ছাত্রসমাজ যে আক্রমণাত্মক ভূমিকা নেয় তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
আর এতে রাজনৈতিক দলগুলির সিদ্ধান্ত প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ছাত্রসমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি আবারও একবার উজ্জ্বলরূপে প্রতিভাত হয়। ঘটনাটি অধিকতর তাৎপর্যবহ এ কারণে যে, এ সব বক্তৃতায় দুই নেতার চিন্তাধারার মধ্যে একটা মাত্রায় ঐক্য ফুটে ওঠে যদিও এই দুই নেতার একজন স্বীকৃত দলীয় নীতি থেকে দলের বিচ্যুত হওয়ার কথিত কারণে দল ছেড়েছিলেন।
যদিও সেই সময়কার পরিস্থিতির মেজাজ স্পষ্টতই বিদ্রোহাত্মক, মুজিব বা ভাসানীর কেউই এ পর্যায়ে কোনো সক্রিয় মোকাবেলামূলক কার্যক্রম দেননি। মুজিব তাঁর “বাঙালি ভাইদেরকে” কারাবরণ করে জেলখানা ভর্তি করে ফেলার আহ্বান জানান, কিন্তু জেল ভাঙতে নিষেধ করেন। ভাসানীও সম্মিলিত এক নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক দেন এবং জনগণের প্রতি সহিংসতার আশ্রয় না নেওয়ার আবেদন জানান। তবু অচিরেই সহিংসতা শুরু হয় ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গভর্নরের সভাপতিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জ্ঞাপন করে। তারা যুক্তি প্রদর্শন করে, মোনায়েম খান কোনো একাডেমিক ব্যক্তিত্ব নন, একজন রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি মাত্র । এমনকি চ্যান্সেলর পদেরও যোগ্য নন। সে কারণে তারা তাদের ডিগ্রি ঐ গভর্নরের কাছ থেকে নিতে ইচ্ছুক নন । এ নিয়ে হাঙ্গামা ঘটে । প্যান্ডেল ভেঙে তছনছ করা হয়। এ ঘটনায় অনেকে জখম হয় । ছাত্রদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গৃহীত হয় ।
দু’জন ছাত্রের এমএ ডিগ্রি ফিরিয়ে নেওয়া হয় । এদের অপরাধ এই বলে নির্দেশ করা হয় যে, ১৯৬৪ সালের ২২ মার্চ কনভোকেশন দিবসে তারা হাঙ্গামা সৃষ্টির কাজে যোগ দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। তাই তাদেরকে গুরুতর অসদাচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এদের অন্যতম ছিলেন ছাত্রলীগার শেখ ফজলুল হক মণি । চারজন ছাত্রকে ৫ বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়। এদের মধ্যে ছিলেন: বিশিষ্ট ছাত্র ইউনিয়ন নেতা এএসএম রাশেদ খান মেনন ও বিশিষ্ট ছাত্রলীগ নেতা কেএম ওবায়দুর রহমান।

ছয়জন ছাত্রকে তিন বছরের জন্য ও ১৪ জনকে দু’বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়। এদের মধ্যে ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক (ছাত্রলীগ) ও সিরাজুল আলম খান (ছাত্রলীগ)। অন্য ২০ জন ছাত্রের কাছে নির্ধারিত ফরমে সদাচরণের জন্য ব্যক্তিগত গ্যারান্টি চাওয়া হয় যে গ্যারান্টিতে তাদের নিজ নিজ অভিভাবকের সই থাকতে হবে। ১৮ শেখ মুজিব সংবাদপত্রে তথ্য চেপে দেওয়ার বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে এক বিবৃতি দেন। ঐ বিবৃতিতে প্রতীয়মান হয় তিনি ছাত্রদের মারমুখী মেজাজের কারণটি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তিনি বলেন:
এ ব্যাপারে আমি ক্ষমতাসীনচক্রকে এই মর্মে হুঁশিয়ার করে দিতে চাই যে, যে সব দেশে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে সে সব দেশের ইতিহাস যেন তাঁরা মনে রাখেন। যাঁরা গণতান্ত্রিক আদর্শ ও ব্যবস্থায় বিশ্বাসী কেবল সাময়িকভাবেই তাদের কণ্ঠরোধ করা যায় । অত্যাচার-নিপীড়ন যদি বন্ধ না হয়, গণতন্ত্র যদি পুনরুজ্জীবিত না করা হয়, যদি কর্তৃপক্ষ গণতান্ত্রিক আন্দোলন চলতে না দেন তাহলে তাঁদের জেনে রাখা উচিত তেমন পরিস্থিতিতে জনসাধারণ অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই বেছে নিতে পারে। আর যদি তেমনটিই ঘটে তাহলে সেটা হবে এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায়।

পুরানো ইস্যু ও নয়া নেতৃত্ব পর্ব-২
কাগজপত্রে ভাসানী একটি পাকিস্তানভিত্তিক দলের (ন্যাপ) প্রতিনিধি হলেও স্পষ্টতই পশ্চিম পাকিস্তানের বিস্তৃততর অংশের প্রতিনিধি তিনি ছিলেন না। এ জন্য আন্দোলন জোরদার করার জন্য বিরোধীদলগুলির নিখিল পাকিস্তানভিত্তিক একটি সংগঠনের চিন্তাভাবনা করতে হয়।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু নেতার সঙ্গে আলোচনার পর এ ধরনের একটি সংগঠন গড়ার সম্ভাবনার কথা ঘোষণা করেন।২° আর এ পরিকল্পনার একটা মহড়া দেওয়া হয় ১৯৬৪-৬৫ সালের নির্বাচনের সময় সম্মিলিত বিরোধীদল (COP) গঠনের মাধ্যমে । কিন্তু এর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তার নিজ কর্মসূচি স্থির করে ফেলে আর সে সব কর্মসূচির পক্ষে মতপ্রকাশও করে।

জাতীয় পরিষদে ভোটাধিকার বিল আনয়নের প্রতিবাদে ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভার আয়োজন হয়। ঐ জনসভায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন যে, জনগণকে ভোটাধিকার না দেওয়া হলে, এক নাগরিক অসহযোগ আন্দোলন শুরু করতে ও জনসাধারণকে কর ইত্যাদি প্রদানে অস্বীকৃতি জানাতে হতে পারে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ জনসাধারণের প্রতি লাগাতার আন্দোলন পরিচালনার আহ্বান জানান।
১৯৬৪ সালের ৫ এপ্রিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় সাংগঠনিক কার্যকলাপ দ্রুততর করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা হয় । কমিটি দলের সকল ইউনিটের প্রতি অবিলম্বে সদস্যভুক্তির কাজ শুরুর এবং যথাক্রমে ৩০ জুন, ৩১ জুলাই ও ৩১ আগস্টের মধ্যে ইউনিয়ন, মহকুমা ও জেলা কমিটিসমূহ গঠনের নির্দেশ দেয়—যাতে করে নতুন প্রাদেশিক কাউন্সিল ৩০ সেপ্টেম্বর সম্মেলনে মিলিত হতে পারে। ২১ মনে হতে থাকে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নতুন করে কিছুটা এগিয়েছে, কেননা খবর পাওয়া যায়, জনজীবনের বিভিন্ন স্তরের লোকজন দলে তাদের নাম লেখাচ্ছে।
প্রদেশজুড়ে সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক আরো জোরদার করার জন্য পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতারা জেলাগুলিতে ব্যাপক সফর করেন। তাঁরা প্রতিটি জায়গাতেই জনসভায় ভাষণ দেন এবং দলের স্থানীয় কর্মীদের সঙ্গে বেঠকে মিলিত হন। এই সব বৈঠকে শ্রোতাসাধারণের মৌলিক আনুগত্যের প্রতি আবেদন জানানোর প্রয়াস চলে । যেমন, চট্টগ্রামে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, “এ দেশ আমাদের, এ মাটি আমাদের, এই সব নদনদী আমাদের।
আওয়ামী লীগ এই দেশের সত্যিকারের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করে যাবে।” বরিশালে তিনি বলেন, সামরিক আইনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সম্ভব সকল উপায়ে পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত করা । পূর্ব পাকিস্তান যখন প্রাকৃতিক দুর্বিপাকে বিধ্বস্ত তখন ইসলামাবাদের বিলাসবহুল রাজধানীর জন্য অকাতরে ব্যয় হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। তিনি ঘোষণা করেন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সত্যিকার সংগ্রামে অঙ্গীকৃত যে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তৈরি রয়েছে।
তবে তাঁর দল কোনো দল বা গোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো আঁতাত করবে না। তাঁর এই সব বক্তৃতায় এবং পরবর্তীকালেও প্রায়ই শেখ মুজিব ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির ব্যবহার করেছেন যা অবশ্য সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই শব্দ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বাধীনতাকেই সুনিশ্চিতভাবে বুঝিয়েছে ।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ যখন পুর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় চাপ সৃষ্টির জন্য জনমতকে সংগঠিত করার অভিযানে নিয়োজিত সেই সময়ে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান অনেকটা সীমিত রেয়াত বা ছাড় দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানাচ্ছিলেন। এক বিবৃতিতে তিনি—
সরকারের প্রতি দেশে এমন পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানান যে পরিবেশে জনগণ অবাধে তাদের মতপ্রকাশ করতে ও অধিকার অনুশীলন করতে পারে তাতে যতই সীমিত ও অসন্তোষজনকভাবেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক না কেন। তিনি অবশ্য আশা ব্যক্ত করেন। যে, জাতি তার জনগণের মৌলিক অধিকার অর্জনের জন্য সংগ্রাম বজায় রাখবে এবং সরকারের অদ্ভুত নির্বাচন পদ্ধতি সত্ত্বেও তারা একটি রায় দেবে।
এতে পাকিস্তানের দুটি অংশের মধ্যে রাজনৈতিকীকরণের স্তরগত ব্যবধানটি সুস্পষ্টরূপে পরিস্ফুট হয়। সরকারের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানী বিরোধীদলের এই রফার মনোভাব কেবল চলতেই থাকেনি বরং শেষের দিকে পূর্ব পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় চাপকে লঘুতর করার একটা একটানা প্রয়াসও চলতে থাকে ।
তবে সে যাই হোক, কেন ও কেমন করে অত্যন্ত অল্প সময়ে পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ব্যাপক জনমত সংগঠিত করার আন্দোলনে গোটা প্রদেশে বিপুল জনসমর্থন পেতে সক্ষম হয় তার কিছু ব্যাখ্যা নিচের বিবরণ থেকে পাওয়া যাবে।
স্থানীয় পূর্ব নির্ধারিত তফসিল অনুযায়ী দলীয় নেতারা গোটা প্রদেশ সফর করেন। পর্যায়ের দল কর্মীদের সাথে বৈঠকের পরে বা আগে তখন একটি করে জনসভার আয়োজন করা হয় এবং সাধারণত প্রাদেশিক পর্যায়ের কমপক্ষে তিনজন ও অন্যান্য স্থানীয় নেতা এ সব জনসভায় ভাষণ দেন। সাধারণত একজন নেতা তাঁর গোটা বক্তৃতায় একটি বিশেষ ইস্যু বা বিষয়েই বলতেন ।
যেমন, খন্দকার মোশতাক আহমদ সব সময়ই তাঁর ভাষণে উল্লেখ করতেন যে, বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর আমলে যে অবস্থা চলছে সে জন্য পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়নি (“আমরা কি এই অবস্থার জন্য পাকিস্তান হাসিল করেছিলাম?”)। তিনি আরো বলতেন যে, জনমত অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী। শেখ মুজিবুর রহমান সব সময় বলতেন, পাকিস্তান সাধারণ মানুষের দেওয়া ভোটে সৃষ্টি হয়েছে, আর সে কারণেই জনগণের ভোটাধিকারের অস্বীকৃতি অযৌক্তিক ও উদ্ভট ব্যাপার ।
আর যে তথাকথিত ‘বিপ্লব’ (১৯৫৮ সালের)-এর কথা বলা হয় সেটি প্রকৃত প্রস্তাবে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে খাটো করার জন্য সামরিক ও কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠীর আঁতাত কর্তৃক একটা লোক দেখানো ব্যাপার মাত্র। আসলে ঐ সরকার ছিল জনবিরোধী। ফেডারেল রাজধানী স্থানান্তরিত করার বিষয়টি কেবল অযৌক্তিকই নয় নিছক পাগলামি। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশিত পথেই চলছে।
জহিরুদ্দিন সব সময়েই বলতেন যে, বর্তমান সরকার দেশকে শুধু অর্থনৈতিক ও নৈতিক দেউলিয়াত্বের দিকেই ঠেলে দেননি বরং মৌলিক জাতীয় ঐক্য ক্ষুণ্ণ করেছেন। বরং সে দিক থেকে আওয়ামী লীগই হচ্ছে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির রক্ষক। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের যে দু’জন নেতা ঘন ঘন বক্তৃতা করতেন তাঁরা হলেন শেখ মুজিবুর রহমান ও খন্দকার মোশতাক আহমদ। এঁদের মধ্যে শেষোক্ত ব্যক্তি প্রায় সর্বত্র সাধারণত গুটিকয়েক নির্দিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করতেন। তাঁর বক্তৃতার ধরনই এভাবে সীমিত প্রকৃতির ছিল ।
তাঁর বক্তৃতার বিবরণ থেকে মনে হয় অনেকটাই আগে থেকে তৈরি ভাষণের মতো। শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণত পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষমতা খর্ব করার ব্যাপারে সামরিক কায়েমি স্বার্থ আঁতাতের ভূমিকা দিয়ে শুরু করতেন এবং তারপর ঢালাওভাবে নানা বিষয়ের উল্লেখ করতেন। ১৯৬৪ সালের মে-জুন এই দুই মাসে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতারা গোটা প্রদেশ সফর করেন। তাতে তাঁদের আবার সচলতা ও উদ্যমেরই পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁরা এ সময় প্রায় ৫০টি সভায় (জনসভা ও কর্মিসভা) ভাষণ দেন। এ সব সভায় প্রায় ৬০টি বিষয় তাঁরা আলোচনা করেন। এ বিষয়গুলিকে মোটামুটি চার শ্রেণীতে ফেলা যায়। যেমন,
১. পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ: দলীয় পুনরুজ্জীবনের আবশ্যকতা, লক্ষ্য, আদর্শ ও উদ্দেশ্যসমূহ এবং অতীত কার্যকলাপ;
২. সরকার: এর প্রকৃতি, এর সন্দেহজনক সৃষ্টি, পরিচালনায় ত্রুটি ও এর অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ:
৩. গণতন্ত্র: জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জরুরি আবশ্যকতা;
৪. পূর্ব পাকিস্তানের অভাব-অভিযোগ: অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অধীনতা, সাংস্কৃতিক দলন ও দমন।
অধিকার ও সে অধিকারের জন্য সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করে তোলায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রয়াস বাহ্যত পদ্ধতিসম্মত ও সংগঠিত বলেই মনে হয় । সভা-সমিতিতে জনসমাগম এবং ছাত্রসমাজের সাথে সমঝোতা স্থাপনের দিক থেকে যে সাড়া পাওয়া যায় তা ইতিবাচক ছিল। তবে এ দল কতখানি পরিসরে ফলদায়ক সমর্থনের কাঠামো গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিল তার যাচাই তখনো হয়নি । বাস্তবিকপক্ষে, তখনকার প্রচলিত ব্যবস্থায় এ রকম কিছু করার সুযোগ একেবারে ছিলই না বলা চলে।
স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন মেয়াদে নির্বাচনে লড়লে সেটাই হতো যথেষ্ট। কিন্তু এ ধরনের শক্তি যাচাইয়ের মহড়ার জন্য ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্রের আওতায় পাকিস্তান পদ্ধতিতে যা কিছু বিধিব্যবস্থা ছিল তা পর্যাপ্ত ছিল না। যদিও বিভিন্ন নির্বাচন তখন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং একটি বিরোধীদলীয় ফ্রন্ট এ সব নির্বাচনে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিল, কিন্তু এ সব সত্ত্বেও জনমনোভাবের মেজাজটি প্রচ্ছন্নই থেকে যায়।
জুলাইয়ে জুলুম প্রতিরোধ দিবস, কলকারখানা, রেলওয়ে, ডাকবিভাগ ইত্যাদিতে ধর্মঘটের মতো বিভিন্ন সরকারবিরোধী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশমূলক ঘটনাবলির পর্যালোচনা করলে সেই মনমেজাজ ও মনোভাব নির্ণয় করতে অসুবিধা হয় না । তবে এ সব কার্যকলাপের মূলে জড়িত মানুষেরা কিন্তু নির্বাচনগুলির সরাসরি অংশীদার ছিল না। নির্বাচিত ব্যক্তিদের প্রায় সকলেই ছিল মৌলিক গণতন্ত্রী, তারা ছিল একটি সুবিধাভোগী শ্রেণী।
তাদের নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্য স্বভাবতই তারা চলতি ব্যবস্থাকেই কায়েম রাখতে চেয়েছিল । পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব সীমিত ভোটাধিকার ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান অবান্তর—এ বিষয়ে সজাগ ছিলেন না তা হতে পারে না। কেননা, তাঁরাই গোড়াতে মতপ্রকাশ করেছিলেন আসন্ন নির্বাচনে দলীয় কর্মীদের অংশগ্রহণ হবে সময় ও শক্তির অপচয়।
কিন্তু এর পরেও বরাবরের রীতি অনুযায়ী পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সুনিশ্চিতভাবেই ভিন্ন পথে চলছিল। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কয়েকদিন পরে লাহোরে ঘোষণা করেন যে, তাঁর দল শাসনতন্ত্রের গণতন্ত্রায়নের জন্য একটি অভিন্ন ফ্রন্ট গঠন করতে পারে।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের হুমকির সাথে তাঁর এ বক্তব্যের সুরের ঠিক মিল ছিল না। কেননা, আওয়ামী লীগের হুমকির ব্যাপ্তি ছিল শাসনতান্ত্রিক গণতন্ত্রায়ন ছাড়িয়েও অনেকদূরব্যাপী বিস্তৃত। আসলেও শাসনতন্ত্রের গণতন্ত্রায়নের বিষয়টির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য খুবই সীমিত। বিশেষ করে, পূর্ব পাকিস্তান এ বিষয়ে যদ্দুর সংশ্লিষ্ট তার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা বলতেই হয়। পরের ঘটনাবলিও সে কথাই বলে।
কেননা, খোদ জহিরুদ্দিন এই সীমিত উদ্দেশ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁর সাথে পূর্ব পাকিস্তান থেকে হাতে গোনা আরো কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের লাইনই বেছে নেন। আর এ কারণে জহিরুদ্দিন বলেছিলেন যে, এ ধরনের একটি অভিন্ন ফ্রন্ট গঠন বিলম্বিত হলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতপার্থক্য নিরসনের কাজটিই শুধু জটিলতর হবে—কথাটি তাৎপর্যবিহীন ছিল না।
নিখিল পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিও বিরোধীদলগুলির মধ্যে ঐক্যের পক্ষে বক্তব্য দেন। “গণবিরোধী শাসকচক্রের” বিরুদ্ধে “চূড়ান্ত আঘাত” হানার লক্ষ্যে এক কর্মসূচির ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের মধ্যে কিছুটা সমঝোতা হয় বলেই তখন মনে করা হয়। জানা যায়, আওয়ামী লীগের অনুভূতি ছিল এই যে, প্রয়োজনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি এ ধরনের কর্মসূচিও চলতে পারে। বলা হয়ে থাকে, মওলানা ভাসানী দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যের জন্য বিরোধীদলগুলির কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন।
খাজা নাজিমউদ্দিন, চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর মতো অন্যান্য বিরোধীদলীয় নেতাও সম্মিলিত বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষে বক্তব্য দেন যদিও তাঁরা এ ঐক্য কেবল গণতন্ত্রায়নের দাবিতে সীমিত রাখতে চেয়েছিলেন।
এই ধারা প্রবণতা ও পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের স্পষ্ট অগ্রাধিকারের সাথে সঙ্গতি রেখে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ও একই দলের আবদুস সালাম খানকে সকল বিরোধীদলের তরফ থেকে একজন একক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী দাঁড় করানোর সিদ্ধান্তকল্পে আলাপ-আলোচনায় বসার কর্তৃত্ব প্রদান করে এই শর্তে যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত ন্যূনতম উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য যেন বজায় থাকে। সেগুলি হচ্ছে:
ক. পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনসহ ফেডারেল পদ্ধতির সরকার;
খ. সর্বজনীন বয়স্ক ভোটাধিকার ও প্রত্যক্ষ নির্বাচন;
গ. দেশের দুই অঞ্চলের মধ্যে বিভিন্ন বৈষম্য দূরীকরণ এবং পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের জন্য দুই পৃথক অর্থনীতির ভিত্তিতে ভবিষ্যতে নানা উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ;
ঘ. ‘সীমান্ত অপরাধ’সহ সকল প্রকার নিপীড়নমূলক আইন বাতিলকরণ;
ঙ. বিনা বিচারে বন্দী সকল রাজবন্দীর মুক্তিদান; এবং
চ. কর কাঠামোর সংস্কার—যাতে করে মুষ্টিমেয় কয়েক ব্যক্তির হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত না হতে পারে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীসহ সমাজের গরিব লোকজনের ওপর করভার ক্রমবর্ধিত হারে হ্রাস পায়।
এভাবে লক্ষ্য করা যাবে যে, দলের আঞ্চলিক দাবিদাওয়াগুলিকে জাতীয় স্তর ও মর্যাদায় নিয়ে এসে আঞ্চলিক আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রয়াস (কিংবা জাতীয় স্তরে পূর্ব পাকিস্তানের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বৈধতাদানের প্রয়াস)। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এ ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য লাভ করেছিল বলেও মনে হয়।
সম্মিলিত বিরোধীদল ‘কপ-এর ৯-দফা কর্মসূচিতে শাব্দিক মিল না থাকলেও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির উল্লিখিত দফাগুলির সারবস্তু অন্তর্ভুক্ত ছিল । বস্তুতপক্ষে যা ছিল না তা হলো “দুই অর্থনীতি” – এই শব্দযুগল । এ শব্দগুলি ‘কপ’ ৯-দফা কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হয়নি। এ ছাড়াও, এই আঁতাত বা জোটে ন্যাপকে ছাড়িয়ে আওয়ামী লীগের আধিপত্যের বিষয়টি এক ইউনিট বাতিল ও সামরিক জোট থেকে পাকিস্তানের অবিলম্বে প্রত্যাহার-সংক্রান্ত দাবি অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার মাধ্যমে সুনিশ্চিত হয়।
তবে খুব স্পষ্টতই কপ-এর নিজ প্রয়াসে তার শেষাবধি সাফল্য আসবে এ বিষয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের তেমন বিশ্বাস ছিল না। আর তাই “সর্বাত্মক ও চূড়ান্ত সংগ্রাম”, “করো অথবা মরো” মিশন আর এই প্রক্রিয়ায় অনেককে প্রাণ দিতে হতে পারে, ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হতে পারে বলে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়। ২ তবু কপ-এর কার্যকারিতায় আস্থার অভাব সত্ত্বেও এ আন্দোলনে আওয়ামী লীগের অংশীদারি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়নি।
আওয়ামী লীগের, বিশেষ করে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতারা এ আন্দোলনের বাড়তি সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ নির্বাচনী প্রচার অভিযানের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আরো কাছাকাছি পৌঁছানোর প্রয়াস পেয়েছেন। এ ছাড়াও মিস জিন্নাহ্ প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, আইয়ুব খান দেশের দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য জিইয়ে রাখার প্রধান হোতা। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আইয়ুবের উদ্বেগকে “ডাহা মিথ্যা” বলে অভিহিত করায় বিষয়টি পূর্ব পাকিস্তানের দাবিদাওয়াগুলি আরো জোরদার করে তোলায় সহায়ক হয়।
কেননা, এখন এ সমস্যাগুলির ব্যাপারে পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক নেতাদের প্রকাশ্য স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব হয়। মিস ফাতেমা জিন্নাহ্ ‘কপ’-এর প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন আর পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এই সম্মিলিত বিরোধীদলের শরিক ছিল । এ বিষয়টিও পশ্চিম পাকিস্তানের বিস্তৃত জনশ্রেণীর মাঝে পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নিজ ভাবমূর্তি তুলে ধরতে এক সুযোগ হিসেবে কাজ করে ।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতারা পূর্ব পাকিস্তানে মিস জিন্নাহ্ নির্বাচনী সফরের সঙ্গী ছিলেন। তাঁরা এ সফরে বিভিন্ন জনসভায় আগের মতো একইভাবে তাঁদের বক্তব্য প্রকাশ করেন। এ সব বক্তৃতা-ভাষণে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যেকার বৈষম্যের বিষয় তুলে ধরা হয় । আর সরকার এ বৈষম্য লাঘবে কিছুটা সফলতার যে দাবি করেছেন সেই দাবির তাঁরা চ্যালেঞ্জ করেন।
সরকারের এই দাবির বুনিয়াদ হলো এই যে, তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কিছু নীতি গ্রহণ করে পূর্ব পাকিস্তানের উল্লিখিত অভাব-অভিযোগে আনুষ্ঠানিক সাড়া দিয়েছিলেন। আর সরকার সেই ভিত্তিতেই উল্লিখিত দাবি করে।
আন্তঃআঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার বিষয়টিকে শাসনতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা ও একে ২০ বছরমেয়াদী ভাবী পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য বলে ঘোষণা করা হয়। তৃতীয় পাঁচসালা পরিকল্পনায় পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানকে বেশি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করার জন্যেও পূর্বাঞ্চলে পল্লীপূর্ত কার্যক্রম চালু করা হয় বলে দাবি করা হয়। ১৯৬৪ সালে জাতীয় অর্থ কমিশন তাদের রিপোর্টে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছে বলে জানায় ।
এর পাঁচসালা পরিকল্পনার রূপরেখায় আরো বলা হয় যে, আন্তঃআঞ্চলিক বৈষম্য কমে যাচ্ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচকে উল্টো ছবি লক্ষ্য করা যায়। তাতে আন্তঃআঞ্চলিক বৈষম্য কেবল থেকে যায়নি তার মাত্রাও বেড়ে যায়।৩৪ সে কারণে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সরকারের কড়া সমালোচনা করে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ একনাগাড়ে বৈষম্যের ব্যাপকতা সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করতে চেষ্টা করে আর কিসের জন্য এ সব ঘটছে সে সম্পর্কেও তথ্য প্রদান করে ।
আইয়ুব খানের নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতারা এ রকম কিছু বিষয় জনগণের গোচরে আনেন। তাঁরা রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, বন উন্নয়ন কর্পোরেশনের কাঠ আহরণ প্রকল্প, সিলেটে কাগজ কল প্রকল্প, পূর্ব পাকিস্তানের গ্যাস সম্পদের পূর্ণ সদ্ব্যবহার, ঘোড়াশাল সার কারখানা—ইত্যাদি প্রকল্পের বিষয় নজির হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্যই এ সব নিছক কাগজী প্রকল্প নিয়ে প্রচারণার বাড়াবাড়ি করা হয়।
এ অভিযোগও করা হয় যে, সরকার কার্যত পূর্ব পাকিস্তানকে বন্ধক রেখে বিদেশী ঋণ গ্রহণ করছে। এ ধরনের ঋণের শতকরা ৮০ ভাগ পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হলেও এ ঋণের দায়ভার প্রধানত পূর্ব পাকিস্তানকে বহন করতে হচ্ছে কেননা মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের শতকরা ৭০ ভাগের বেশি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের উপার্জন।
দাবি করা হয় যে, এভাবে পূর্ব পাকিস্তানের উন্নতি বা বিকাশকে সংশ্লিষ্ট স্বার্থান্বেষী পক্ষগুলির স্বার্থে ব্যবহৃত করার ত্রিমুখী পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এই ত্রিমুখী চক্রীদের একটি পক্ষ হলো, আইয়ুব খানের সরকার, দ্বিতীয়টি পশ্চিম পাকিস্তানী শিল্পপতিদের একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী এবং তৃতীয়টি বিদেশী ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানসমূহ ও তাদের বিশেষজ্ঞগণ ।
নিঃসন্দেহে উল্লিখিত তথ্যাদি ফাঁসের কারণে পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে আইয়ুব খানের অঙ্গীকারের ব্যর্থতা ধরা পড়ে। এতে তাঁর জনপ্রিয়তা কেবল শহর-নগরবাসীদের মধ্যেই শুধু কমেছে এমন নয়, বরং প্রকৃত পরিস্থিতির কারণে যে অসন্তোষ দেখা দেয় তা কেবল নগরের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যেই সীমিত ছিল না। সাধারণ পল্লীবাসী পরিসংখ্যানগত বিস্তারিত তথ্য সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে অবগত না থাকলেও তাদের মনেও এতে বঞ্চনাবোধ গড়ে ওঠে । এ ধরনের একটা বৈশিষ্ট্যময় ভাবানুভূতির প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায় ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে কিছু পল্লী কবির কবিতায়।
এ ধরনের কোনো কোনো কবিতায় শুধু পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অভাব-অভিযোগই তুলে ধরা হয়নি বরং সাধারণ মানুষ যেভাবে বোঝে সেভাবে পাকিস্তানী অর্থনীতির আঞ্চলিক নানা বৈষম্যের এক সজীব চিত্রময় আখ্যানও তুলে ধরা হয়। এই সব সহজ, সরল, স্থুল দেহাতি ভাষায় অবস্থার বর্ণনা আসলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতাই প্রতিফলিত করে ।
আর সম্ভবত এ সবের কারণেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতারা কিছুটা আশায় থেকেছেন যে, শেষ পর্যন্ত দীর্ঘায়িত এক জনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাদের আন্দোলনে সাফল্য আসবে। এক অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন পদ্ধতির আওতায় নির্বাচনগুলিতে অংশগ্রহণের বিষয়টি ছিল সামগ্রিক সংগ্রামের অংশ। তাঁরা তা করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
আর এ সবের মাঝে এ ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়, কেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘কপ’ প্রার্থীর পরাজয় ও তাতে মৌলিক গণতন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন চক্রের সম্পর্কের সমীকরণটি উন্মোচিত হওয়ার পরও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনগুলিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারাভিযান চালায়। শুধু পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগই এ কৌশল গ্রহণ করেনি, পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের (পুনরুজ্জীবনের পর) প্রথম কাউন্সিল অধিবেশনে হাজী মোহাম্মদ দানেশ প্রায় একই সুরে কথা বলেন।
তিনি বলেন, “আমাদের দলের বক্তব্য হলো নির্বাচনও একটি আন্দোলন । আর কেবল আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই সংগঠন গড়ে তোলা যায়, সংগঠনকে শক্তিশালী করা যায়।” প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘কপ’ পরাজিত হওয়ার পর তিনি স্বীকার করেন যে, ন্যাপ কর্মীরা হতাশ, নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যই ভুলে গেছে। তবে ন্যাপ কর্মীরা এভাবে হতাশ ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে।
পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনগুলিতে পাকিস্তান মুসলিম লীগের স্থান কিছুটা নেমে যাওয়ার নেপথ্যে তাই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভূমিকা রয়েছে বলা যেতে পারে। কেননা হাজী দানেশের কথা অনুযায়ী, গণপর্যায়ে যোগাযোগের অভাবে ন্যাপ পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে তেমন লক্ষ্যগোচর ছিল না।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে৮ পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান মুসলিম লীগের ভোট প্রাপ্তির যে ধারা পরিলক্ষিত হয় তা থেকে এ ব্যাখ্যা অনুমান করা চলে যে, কোনো কোনো মৌলিক গণতন্ত্রীকে (সম্ভবত প্রান্তিক সংখ্যায় হলেও) বিরোধীদল সপক্ষে নিতে সক্ষম হচ্ছিল।
আর তা না হলে এর অর্থ এও হতে পারে যে, যে ব্যবস্থাটি মৌলিক গণতন্ত্রীদের স্বার্থবাদী সেই ব্যবস্থার রক্ষাব্যূহ মজবুত করে নেওয়ার পর হয়তো তারা মনে করে থাকবে যে, কিছু স্থানীয় বিদ্রোহীকে একটা ক্লীব আইনসভার অংশ হতে সাহায্য করে বরং তাদের মেজাজ ঠাণ্ডা রাখার একটা ব্যবস্থা হতে পারে।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগাররা এই পরিস্থিতির বেশ বস্তুনিষ্ঠ বিচার-বিশ্লেষণে সক্ষম হয় । এ বিষয়টি খুবই পরিষ্কার হয়ে ওঠে ১৯৬৫ সালের ৩ এপ্রিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে। বৈঠকে ঘোষণা করা হয় যে, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের কাঠামোর মধ্যে গণতন্ত্রায়নের সংগ্রাম চলতে থাকবে।
জনসাধারণের বিরুদ্ধে সরকার ক্রমাগত নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ১৯৬৫ সালের ৭ জুন তার ওয়ার্কিং কমিটির বর্ধিত সভায় গৃহীত পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করে। ঐ প্রস্তাবে দলের সাধারণ সম্পাদক ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে এক গণআন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনার কিছু প্রয়াস লক্ষ্য করা গেলেও তাতে স্পষ্টতই কোনো ফল হয়নি এবং এমনকি, কোনো অভিন্ন দলীয় ম্যানিফেস্টো প্রণয়নও সম্ভব হয়নি। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সভাপতিত্বে করাচিতে অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতাদের
এক বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের উল্লিখিত সিদ্ধান্তের পুনরুক্তি করেন। এ ছাড়াও, জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের এমএনএ কামারুজ্জামান, মিজানুর রহমান চৌধুরী, অধ্যাপক ইউসুফ আলী প্রমুখ ইতোমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের বিষয়ে সরকারের ভূমিকায় অত্যন্ত আক্রমণাত্মকভাবে সোচ্চার হয়ে ওঠেন।৪১ আর এমনি করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ক্রমেই নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ থেকে দূরে সরে যায়।
প্রতিশোধমূলক নিপীড়ক ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগার ও ছাত্রনেতাদের বারংবার গ্রেপ্তার চলতে থাকায় সম্ভবত সেই বিষয়টিই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সংকল্পকে আরো সুদৃঢ় করে তোলে। তবে সে যাই হোক, কচ্ছের রান এলাকা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে পাক-ভারত বৈরিতা শুরু হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক নাটকীয় মোড় নেয়। আর তার পরিণতি গড়ায় কাশ্মীরে পাকিস্তানী অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত পাক-ভারত যুদ্ধে ।
এই যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে পাকিস্তানের শাসকচক্রের মনোভাব খুবই স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ঐ সময় পূর্ব পাকিস্তানীরা উপলব্ধি করে যে, তাদের অঞ্চলটিকে সামরিক দিক থেকে অরক্ষিত রেখে ভারতের করুণার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানীরা এটি বিশ্বাসঘাতকতার শামিল ধরে নেয় আর তা উটের কুঁজে সেই কিংবদন্তীর নলখাগড়া ফুটিয়ে দেওয়ার মতো কাজ করে। এতে এক পাকিস্তানী জাতীয়তার অতিকথার বেলুন আর দেশের দুই অংশের মধ্যেকার নিকৃষ্ট ঔপনিবেশিক সম্পর্কের চেহারা নগ্নরূপে ধরা পড়ে।
যদি অনুমান করা হয় যে অবস্থা এ রকম ছিল না তাহলে বলতে হয়, ভারতের সাথে যে কোনো সশস্ত্র সংঘাতে গোটা দেশকে রক্ষা করতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী অসামর্থ্য ছিল যদিও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সামর্থ্য নিয়ে বিস্তর বাগাড়ম্বর হতো। তাই নিরেট বাস্তবতাটি হলো, ইচ্ছাকৃত হোক বা পাকিস্তান সরকারের নিদারুণ অসামর্থ্যের কারণেই হোক পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠের বসবাস হলেও অঞ্চলটি ছিল প্রতিরক্ষাহীন ।
আর সরকারের খয়ের খাঁ ব্যক্তিরা যদি দাবি করে থাকেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া রয়েছে বিদেশী শক্তির হাতে তাহলে তার পছন্দ অপছন্দের ভার খোদ পূর্ব পাকিস্তানের হাতে কেন তুলে দেওয়া হয় না যদি না দেশের দুই অংশের মধ্যে বিরাজমান ঔপনিবেশিক সম্পর্ক কায়েমি না করার উদ্দেশ্য থেকে থাকে? যদি পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি প্রচলিত থাকতো এবং এ ধরনের ইস্যুগুলি নিয়ে কার্যকর আলোচনার জন্য মুক্ত ফোরামের ব্যবস্থা শাসনতান্ত্রিক পন্থায় নিশ্চিত থাকতো তাহলে রাজনীতি সচেতন পূর্ব পাকিস্তানীরা সুনিশ্চিত ও ন্যায়সঙ্গতভাবে এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারতো ও করতোও, কিন্তু পাকিস্তানে এ সবের কোনোটাই ছিল না ।

কাজেই এর একমাত্র বিকল্প ছিল কার্যকর গণআন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে প্রবল জনমত গড়ে তোলা। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এ কাজটিই করতে প্রয়াসী হয়। কাজটা করা হয় ঠিক লোহা গনগনে থাকতে থাকতে আঘাত হেনে ৬-দফা ফর্মুলার মাধ্যমে আবেগের বারুদযুক্ত “স্বায়ত্তশাসন”-এর প্রতীকী লড়াইয়ের অস্ত্র পূর্ব পাকিস্তানের হাতে তুলে দিয়ে ।
৬-দফার কথা ঘোষণা করা হয় এমন সময় যখন পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যেকার সম্পর্ক, ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের রূঢ় বাস্তবতার অভিজ্ঞতায় পোড় খেয়ে নবতম নিম্নতম স্তর ছুঁয়েছে। ৬-দফা ফর্মুলা বাস্তবিকপক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের লালিত অধিকতর ন্যায্য আচরণ প্রাপ্তির “অভিলাষকে” আর্থ-রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের সুনির্দিষ্ট “দাবিতে” রূপান্তরের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এই রূপান্তরই পুরাতন ইস্যু নিয়ে নয়া নেতৃত্বের অবদান।
