প্রকাশ্য যুদ্ধ

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ প্রকাশ্য যুদ্ধ। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।

প্রকাশ্য যুদ্ধ

 

প্রকাশ্য যুদ্ধ

 

প্রকাশ্য যুদ্ধ

ভারতের সামরিক পরিকল্পনায় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীকে সমন্বিত করা হয়। আমাদের কোনো নৌবাহিনী না থাকায় এবং বিমান বাহিনীর এক স্কোয়াড্রন পুরনো এফ-৮৬ অকেজো হয়ে যাওয়ায় ভারতীয় নৌ ও বিমান বাহিনীর কোনো করণীয় ছিল না।

তবে ভারতীয় নৌ ও বিমান বাহিনী স্থল যুদ্ধে সহায়তা দিয়েছে প্রচুর। এ ছাড়া তাদের বিমান বাহিনী ফেরি, ক্ষুদ্র সেতু ও নৌকা ধ্বংসে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। মূলত এ লড়াই ছিল স্থলযুদ্ধ। এ যুদ্ধে ভারতের ১২টি পদাতিক ডিভিশন অংশগ্রহণ করে।

নভেম্বরের শুরুতে সৈন্য মোতায়েনে ভারতের প্রকাশ্যে যুদ্ধের অভিপ্রায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে সৈন্য মোতায়েন যুদ্ধে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। তাদের পরিকল্পনা ছিল সকল অনুপ্রবেশ পথে বহিঃস্থ লাইনে চারদিক থেকে এগিয়ে আসা। এতে তারা যুদ্ধের একটি নীতি লঙ্ঘন করে। তারা একমাত্র প্রধান সড়ক এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ ও পূর্ব থেকে পশ্চিমে একমাত্র রেলপথের সীমাবদ্ধতা আমলে আনে নি।

এ ছাড়া তাদের পার্শ্বভাগ রক্ষার এবং এক সেক্টর থেকে আরেক সেক্টর অথবা এক সাব-সেক্টর থেকে আরেক সাব-সেক্টরে চলাচলের কোনো সামর্থ্যও ছিল না। তারা দৃশ্যত এলাকায় ভৌগোলিক অবস্থাও অগ্রাহ্য করেছিল। দুটি ক্ষেত্রে এলাকার ভৌগোলিক অবস্থা আক্রমণকারীদের পক্ষে ছিল।

এক, নদী এবং আরেক হচ্ছে ঢাকা অভিমুখী ময়মনসিংহ সড়ক। পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সব নদ-নদীর উৎসই হচ্ছে ভারত। সুতরাং হেলিকপ্টারে করে ভারতীয়দের নদী পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। তারা নিজেদের ভূখণ্ড থেকে রওনা দিয়ে সোজা পূর্ব পাকিস্তানের গভীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারতো। এ ছাড়া তারা উত্তর দিকের বিপদমুক্ত মহাসড়ক ধরেও এগিয়ে আসতে পারতো। কিন্তু এ দুটি সুযোগ তারা কাজে লাগায় নি।

লক্ষ্য বজায় রাখা হচ্ছে যুদ্ধের একটি অন্যতম মূল নীতি এবং ভৌগোলিক অবস্থা হচ্ছে একটি মুখ্য উপাদান। ভারতীয়দের প্রতি স্থানীয় সমর্থন ছিল পর্যাপ্ত। মুক্তিবাহিনী তাদেরকে রাস্তাঘাট চিনিয়ে দিয়েছে এবং আমাদের ব্যাংকারসহ যাবতীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করেছে। ভারতীয় অফিসারদের বেসামরিক লোকের ছদ্মবেশে এলাকা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হতো এবং আমাদের অবস্থান চিনিয়ে দেওয়া হতো।

এটা খুবই বিস্ময়কর যে, সকল গোয়েন্দা তথ্য অবগত হওয়ার পরও তারা একটি প্রচলিত লড়াইয়ে ভুল করেছে। ভৌগলিক অবস্থা, প্রাকৃতিক বাধা-বিপত্তি, সীমিত চলাচল এবং পশ্চাদপসরণের সম্ভাব্য এলাকা অথবা আমাদের অবস্থান এড়িয়ে যাওয়ার প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে।

আমাদের লড়াই করার সামর্থ্য সম্পর্কে তাদের চিন্তা করা উচিত ছিল। তারা প্রথমে আঘাত হেনেও ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে জিততে পারে নি। তখন বেশ কয়েকটি জায়গায় তারা তাদের পছন্দসই অবস্থানে থেকে লড়াই করেও সুবিধা করতে পারে নি।

আমরা তাদেরকে বিআরবি ও চৌবিন্দায় থামিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলাম এবং লাহোর ও শিয়ালকোটে তাদেরকে বিজয়ী হতে দেই নি। পূর্ব পাকিস্তানে বিদ্রোহকালে তারা আমাদের সাথে লড়াই করছিল এবং আমাদের সামর্থ্য সম্পর্কে জানতো। পূর্ব পাকিস্তানে আমরা তাদের সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহীদের বিজয়ী হতে দিই নি এবং সীমান্তে আমরা তাদের হামলা ব্যর্থ করে দিয়েছি। তারা ধারণা করেছিল যে, আমার সৈন্যরা ক্লান্ত ।

তাই তারা দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে না। এ হিসাব থেকে ভারতীয়রা ভেবেছিল যে, সংখ্যা ও অস্ত্রশস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে তারা বিনা যুদ্ধে জয়লাভ করবে। কিন্তু তাদের হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়। আমার সৈন্যরা বীরোচিত প্রতিরোধের মাধ্যমে ব্যর্থ করে দেয় তাদের হামলা । এ ব্যর্থতার জন্য আমি তাদের পকিল্পনায় ত্রুটি, অদক্ষ যুদ্ধ পরিচালনা এবং উদ্যোগের অভাব ও অনমনীয়তাকে দায়ী করবো।

সমন্বিত ও কেন্দ্রীভূত প্রচেষ্টার ঘাটতি এবং বেপরোয়াভাবে গোলাবর্ষণ না করায় ভ্রাম্যমাণ হামলায় তাদের দুর্বলতা প্রকট হয়ে ওঠে। আমি তাদের অদক্ষ নেতৃত্ব, দুর্বল পরিকল্পনা, অতি সতর্ক পদক্ষেপ ও দোদুল্যমানতার সুযোগ দিয়েছি। তাদের এ দুর্বলতার জন্য আমার কমান্ডারগণ তাদের অবস্থান পুনর্বিন্যাস করতে পেরেছেন এবং সর্বত্র তাদের হামলা ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়েছেন।

তাদের অতি সতর্কতা এবং দ্রুতগতিতে এগিয়ে এসে আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন অথবা এড়িয়ে যেতে ব্যর্থতা দেখে মনে হচ্ছিল যে, তারা যুদ্ধের বই-পুস্তকে বর্ণিত দিকনির্দেশনা অনুযায়ী যুদ্ধ করছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল আমাদের কাছে স্পষ্ট। জগজিৎ সিং অরোরার ঝুঁকি নেওয়ার কোনো মানসিকতা ছিল না।

তিনি তার সৈন্যদেরকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দিতেও কুণ্ঠিত হন। এ জন্য তার বিশৃঙ্খলা ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রচেষ্টাকে গুঁড়িয়ে দিতে আমাদের বেগ পেতে হয় নি। তিনি দক্ষতার সাথে তার সৈন্য চলাচলের সুবিধা ও গোলাবর্ষণকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। এ জন্য আমাদের সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা তাদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করে দিতে সক্ষম হই।

প্রথম অভিজ্ঞতার পরই সাধারণত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনার অথবা পর্যালোচনা করার প্রয়োজন দেখা দেয়। মূল পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে প্রতিটি কমান্ডার বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করে। আমরা প্রতিরোধমূলক ভূমিকা পালন করেছি এবং সীমান্ত থেকে পেছনের পরবর্তী প্রতিরোধমূলক অথবা আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে আমাদের সৈন্য প্রত্যাহারে কোনো ঝামেলা হয় নি। আমরা এ ক্ষেত্রে কোনো বিপর্যয়ের মুখোমুখি হই নি। আমরা প্রতিটি মধ্যবর্তী অবস্থানে ভারতীয়দের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করে দিতে সক্ষম হই।

 

প্রথম অভিজ্ঞতার পরই সাধারণত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনার অথবা পর্যালোচনা করার প্রয়োজন দেখা দেয়। মূল পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে প্রতিটি কমান্ডার বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করেন। আমরা প্রতিরোধমূলক ভূমিকা পালন করেছি এবং সীমান্ত থেকে পেছনের পরবর্তী প্রতিরোধমূলক অথবা আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে আমাদের সৈন্য প্রত্যাহারের কোনো ঝামেলা হয় নি। আমরা এ ক্ষেত্রে কোনো বিপর্যয়ের মুখোমুখি হই নি। আমরা প্রতিটি মধ্যবর্তী অবস্থানে ভারতীয়দের অগ্রযাত্রায় বাধা দিতে এবং তাদের থামিয়ে দিতে সফল হয়েছি।

উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় ভারতীয়দের কোনো বিকল্প পরিকল্পনা ছিল না। তারা একটি নির্দিষ্ট পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছিল এবং আমাদের অবস্থান এড়িয়ে যাবার পরিবর্তে বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থানের মুখোমুখি হয়ে পড়ে। যুদ্ধে তাদের যেসব সুযোগ ছিল সেগুলো তারা কাজে না লাগিয়ে বরং তারা আমাদের তৎপরতার প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিল।

আমাদের বাহিনীকে ধ্বংস করার পরিবর্তে তারা ভূখণ্ড দখলের ওপর জোর দিচ্ছিল। তবে তারা ভূখণ্ড দখল চরমভাবে ব্যর্থ হয়। আমরা স্বেচ্ছায় কৌশলগত কারণে যশোর ও ময়মনসিংহ থেকে পিছু হটে এসেছি। এ জন্য এ দুটি শহরে ভারতীয়রা প্রবেশ করতে পেরেছে। এ ছাড়া আর কোনো শহর তারা দখল করতে পারে নি। প্রতিটি সেক্টরে আমরা তাদেরকে থামিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি।

বস্তুতপক্ষে, ঢাকা আক্রমণের যখন সুযোগ ছিল তখন তাদের হাতে ছিল মাত্র ৪টি দুর্বল ব্রিগেড। বাদবাকি ভারতীয় সৈন্যরা আমাদের সুরক্ষিত ও সুসজ্জিত অবস্থানের বিরুদ্ধে বিক্ষিপ্ত লড়াইয়ে জড়িত ছিল। জগজিৎ সিং অরোরার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল ঢাকা দখল। কিন্তু তিনি সময়মতো তার সৈন্যদের ঢাকা দখলে নিয়ে আসতে পারেন নি।

প্রকৃতপক্ষে, এ পর্যায়ে ঢাকা ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত যা ছিল দুর্ভেদ্য। এ পরিস্থিতিতে ঢাকা দখল করতে হলে ভারতীয়দেরকে তাদের সকল সৈন্য একত্রিত করতে হতো। তবে ঢাকা দখল করতে হলে ভৈরব বাজার ও নারায়ণগঞ্জে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যূহকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।

ঢাকা ছিল যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু। সুতরাং ঢাকা দখল করতে হলে তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা কেন্দ্রীভূত করতে হতো। কিন্তু তাদের লক্ষ্য ছিল অন্যান্য শহর দখল করা। এ জন্য এসব শহর দখলে তারা তাদের সৈন্যদের নিয়োজিত করে।

ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল শ্যাম মানেকশ যথার্থই বলেছিলেন যে, জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা জার্মান সেনাধ্যক্ষ মার্শাল রোমেল নন। কারণ, রোমেল অথবা অন্য যে কোনো দক্ষ জেনারেল শেয়ার পাংকট’ (মূল প্রচেষ্টার কেন্দ্র বিন্দু) চিহ্নিত করতেন। ভারতীয়রা দুই ডিভিশনের বেশি সৈন্য নিয়ে তাদের দ্বিতীয় কোর গঠন করে। এই কোর জেনারেল রায়নার নেতৃত্বে যশোরের বিপরীতে অবস্থান করছিল এবং তাদেরকে ঢাকা দখলের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

জেনারেল থাপনের নেতৃত্বাধীন ৩৩তম কোরকে রংপুর-বগুড়া ও রাজশাহী, জেনারেল সগৎ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন চতুর্থ কোরকে সিলেট, কুমিল্লা, ময়নামতি ও চাঁদপুর, ‘কে’ (কিলো) ফোর্সকে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রামের প্রতি হুমকি সৃষ্টি, দুটি ব্রিগেড এবং মুক্তিবাহিনীর আরো একটি ব্রিগেড নিয়ে গঠিত ১০১তম কমিউনিকেশন জোনকে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও ঢাকা দখলের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা তার বিশাল বাহিনীকে ৪টি অংশে বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক অংশের ওপর পূর্ব পাকিস্তানের ৪টি বেসামরিক বিভাগের দায়িত্ব অর্পণ করেন । এটুকু করেই তিনি তার দায়িত্ব শেষ করেন। তিনি ছিলেন যুদ্ধে নীরব দর্শক। তিনি কোথাও কোনো লড়াইয়ের তীব্রতা বৃদ্ধি অথবা ঢাকায় তার সৈন্যদের অগ্রাভিযান ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে কোনো রিজার্ভ ইউনিট অথবা ফরমেশন পাঠানোর জন্য খুঁজে পান নি।

২০তম ভারতীয় ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল লক্ষ্মণ সিং বলেছেন, ঈদের দিন হওয়ায় ২১শে নভেম্বর ডি-ডে’র তারিখ এগিয়ে আনা হয় । ভারতীয়রা সেদিন সকল দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে। আমরা তাদের মোকাবেলা করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও তৈরি ছিলাম।

প্রকাশ্য যুদ্ধ

 

২২ নভেম্বর যশোর সেক্টরে তিনটি বিমান হারানো ছাড়া ৩রা ডিসেম্বর পর্যন্ত আমরা কোনো উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ড হারাই নি। আমাদের সৈন্যরা অত্যন্ত নৈপুণ্যের সাথে লড়াই করে এবং সীমান্ত বরাবর ভারতীয় হামলাগুলো প্রতিহত করে। সীমান্ত এলাকায়। তাদের লড়াই সীমিত হয়ে পড়ে এবং তাদেরকে পিছু হটতে হয়।

Leave a Comment