আজকের আলোচনার বিযয় পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-৩, যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত ।
পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-৩
![পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-৩ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ] 2 পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-৩](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2007/01/আওয়ামী-লীগ02.jpeg)
১ ও ২ মার্চ কোনো কোনো স্থানে বিক্ষিপ্ত সহিংসতা ঘটে। তবে আরো বেশি সহিংসতা হবে বলেই আশঙ্কা করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর অ্যাডমিরাল আহসানকে ঐ দিনই তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক সাহেবজাদা ইয়াকুবকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা হয়। তিনি অনতিবিলম্বে সংবাদপত্রের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেন যদিও তা আদৌ তেমন প্রতিপালিত হয়নি। মনে করা হয়ে থাকে যে, অ্যাডমিরাল আহসান মুজিবের সাথে সংঘাতে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন ইয়াহিয়াকে, কেননা তা পাকিস্তানের জন্য বিপর্যয়কর হবে।
আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে পরোক্ষ প্রতিরোধের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলেও মাঝে মাঝেই সরকার সহিংস ব্যবস্থা গ্রহণ করায় তা থেকে আরো সহিংসতা ঘটে। তবে সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের জন্য অধিকতর তাৎপর্যময় ও উস্কানি হয়ে দেখা দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে এক অহিংস ঘটনায় । ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ আহূত এক বিরাট জনসভায় পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে ফেলে বাংলাদেশের নামে এক পতাকা উত্তোলন করা হয়।
সভার সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী স্বীকার করেছেন, এ ধরনের আদৌ কিছুর পরিকল্পনা ছিল না। যা হোক, পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা যখন পোড়ানো হচ্ছিল, সভার জনতা তখন ঐ পতাকার একটি বিকল্প দাবি করে। হাতের কাছে তখন ছাত্রলীগের ‘জঙ্গি-বাহিনী’র (এই বাহিনী ১৯৭০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হকের স্মরণে গঠন করা হয়েছিল) কাছে একটা পতাকা পাওয়া যায়, যে পতাকায় ছিল লালবৃত্তের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্রের সোনালি রঙের রূপরেখা যার পটভূমি হিসেবে সবুজের জমিনে দেখানো হয়েছে পূর্ণ উদিত সূর্য।
৫৫ এই পতাকা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতীক হয়ে ওঠে। ৫৬ এই সভায় শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রাম নিরবচ্ছিন্ন রাখার শপথ এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি কায়েমের অঙ্গীকার করা হয়। আওয়ামী লীগ অহিংস থাকার জন্য জনগণের কাছে আবেদন জানিয়ে যেতে থাকে । ২ মার্চে সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে শেখ মুজিব ৩ মার্চের পূর্ণ হরতালের পর ৭ মার্চ অবধি প্রতিদিন দেশব্যাপী আংশিক ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ অধিবেশন স্থগিত করার জন্য শোক হিসেবে এ ধর্মঘট পালিত হবে। সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ ঢাকায় ২ মার্চ থেকে সান্ধ্য আইন জারি করলেও তা সংবাদপত্রের ওপর আরোপিত কড়াকড়ির মতোই কার্যকর হয়নি।১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে এক বিরাট ও অভূতপূর্ব জনসমাবেশ ঘটে। এই জনসভায় লোকজন হাতে করে বাঁশের লাঠি উঁচিয়ে আসে ক্ষুব্ধ প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে। সে দিনের সভাটির আহ্বায়ক ছিল ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ।
ইতোমধ্যে পরিষদ ১নং ইশতেহার নামে তাদের পয়লা বুলেটিন তৈরি করেছিল স্বাধিকার আন্দোলনে পরিষদের প্রথম নির্দেশিকা দলিল হিসেবে। ৫৮ তিনটি মৌলিক উদ্দেশ্যে ইশতেহারে এক স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ঘোষণা দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য তিনটি হলো:
১. বিশ্বসভায় এক উন্নত বলিষ্ঠ বাঙালি জাতি সৃষ্টির মাধ্যমে বাঙালির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ;
২. আঞ্চলিক ও শ্রেণীগত পার্থক্যের পরিপূর্ণ উচ্ছেদ, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও কৃষক- শ্রমিকের শাসন প্রতিষ্ঠা; এবং
৩. বিশেষ করে, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং পূর্ণ ব্যক্তিগত স্বাধীন মতামতসহ নিখাদ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ।
ইশতেহারে দফাক্রমে আসন্ন সংগ্রামের কার্যপদ্ধতিগুলি নির্দেশ করা হয়। এগুলির অন্তর্ভুক্ত ছিল: গ্রাম, মহল্লা, থানা, মহকুমা, নগর ও জেলা পর্যায়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিষদ গঠন এবং শিল্প এলাকা ও পল্লী জনপদে যথাক্রমে শ্রমিক ও কৃষকদের নিয়ে ‘মুক্তিবাহিনী’ গঠন।
ইশতেহার অনুযায়ী “বর্তমান সরকারকে” বিদেশী, ঔপনিবেশিক, শোষক শাসকগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে ও এই সরকার কর্তৃক জারিকৃত সকল আইনকে সে কারণে অবৈধ গণ্য করতে হবে । তথাকথিত পাকিস্তানী বাহিনীর অবাঙালি সামরিক লোকজনকে ‘অবৈধ ক্ষমতাদখলকারী’ বলে বিবেচনা করতে হবে আর তাদের মধ্যে হামলাকারীদের ‘খতম’ করতে হবে।
ইশতেহারে সশস্ত্র প্রতিরক্ষার জন্য প্রস্তুতির আহ্বান জানানো হয় যাতে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের’ ওপর যে কোনো আঘাত হানার প্রয়াস কার্যকরভাবে প্রতিহত করা যায়। এ ছাড়া, ‘ঔপনিবেশিক সরকারকে কর ও খাজনা প্রদান বন্ধ রাখার, পশ্চিম পাকিস্তানী
পণ্য বর্জন করার, পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে ফেলার ও পরিবর্তে বাংলাদেশের পতাকা ব্যবহারের ডাক দেওয়া হয়। কবি রবীন্দ্রনাথের একটি সঙ্গীতকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ইশতেহারে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সম্ভব সব রকম সহযোগিতা দেওয়ার জন্য জনসাধারণের প্রতি আবেদন জানানো হয়।
পরিশেষে ইশতেহারে “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে” স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের ‘সর্বাধিনায়ক’ ঘোষণা করা হয়। ইশতেহারে মুক্তিসংগ্রামকালে ব্যবহার্য শ্লোগানের একটি তালিকাও দেওয়া হয়। ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে উল্লিখিত সভায় শেখ মুজিবুর রহমান ও আরো অনেকে ভাষণ দেন।
ছাত্র নেতারা ইশতেহার পাঠ করা ছাড়াও উল্লেখ করেন যে, শুধুমাত্র ভৌগোলিক সীমারেখা বা অঞ্চলের স্বাধীনতাই তাঁদের সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয় । জনগণের সত্যিকারের মুক্তির বাস্তবায়নও চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। তাঁরা মতপ্রকাশ করেন যে, একটি গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য আদর্শাভিসারী সংগ্রামের প্রয়োজন। তাঁরা শপথ নেন যে, তাঁরা তাঁদের রক্তের মূল্যে উল্লিখিত উদ্দেশ্য অর্জনে প্রস্তুত ।
ইশতেহারে জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে দীর্ঘায়িত, বৈপ্লবিক সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য পরিষ্কার আহ্বান জানিয়ে বলা হয় যে জাতীয় মুক্তি অর্জনের পর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সমাজবাদী ধারায় জাতীয় পুনর্গঠন বাস্তবায়িত করা হবে। এ সবের আলোকে দেখা যায়, মুজিব প্রদেশের দুটি পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছিলেন।
এর একটি শক্তি ছিল আওয়ামী লীগের নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারবাদের প্রতিনিধি, অন্যটি সশস্ত্র সংগ্রামের প্রবক্তা। কিন্তু তিনি কার্যপরিচালনার দিক থেকে অহিংস পন্থার পক্ষপাতী ছিলেন, আর তাই তিনি শর্তযুক্ত হলেও “অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীদেরকে” সময় দিয়েছিলেন। তিনি বারংবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, পরিস্থিতি না বদলালে পরিণতির জন্য তিনি দায়ী হবেন না ।
তদবধি তিনি প্রতিদিন সকাল ছয়টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন হরতালের ডাক দেন । সরকারি, আধাসরকারি ও বেসরকারি সকল সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানে এ হরতাল পালিত হবে। হাইকোর্ট ও অন্যান্য আদালত এর আওতায় থাকবে। এ সময় তিনি এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “পশ্চিম পাকিস্তান যদি এক শাসনতন্ত্র না চায় তাহলে দুটি শাসনতন্ত্রই হোক আর তারপর দেখা যাক আমরা পরস্পরের ভাই হিসেবে একত্রে বাস করতে পারি কি না।”
স্পষ্টত এ উক্তির একাধিক ব্যাখ্যা হতে পারে।একদিক থেকে এই সভাটি পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত ৭ মার্চের সভা ও অন্যান্য সভার মতো স্মরণীয় না হলেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল । এই সভাস্থলেই শেখ মুজিব তাঁর হেঁয়ালিময় ভূমিকাসমূহের রহস্যের পর্দা সরিয়ে দেন। তাঁর দেওয়া বিকল্প প্রস্তাবগুলির ভাবার্থ ছিল এ রকম:
১. জাতীয় পরিষদের সভা ডাকুন—শাসনতন্ত্র রচনা নিয়ে সেখানে আলোচনা হোক। আর তার ফলাফল যা-ই হোক শোভনভাবে মেনে নিন। সবচেয়ে খারাপ কিছু হলে পাকিস্তান কনফেডারেশন হতে পারে—একটা উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আর সেই সাথে একটু ঝোঁক থাকবে সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার প্রতি (আর সেটা ছয়-দফার সঙ্গে সঙ্গে এগারো-দফার বাস্তবায়নে অর্জিত হতে পারে যা পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অঞ্চলের ফলপ্রসূ নেতৃত্বের মাধ্যমে সম্ভব);
২. শান্তিপূর্ণভাবে দেশের পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান শাসনতন্ত্রসহ আলাদা হয়ে যাক আর তারপর বহু আর্থ-সামাজিক পারস্পরিক সম্পূরকতাসহ দুটি ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ হিসেবে বসবাসের চেষ্টা করুক;
৩. উল্লিখিত দুটি প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করে সহিংস পন্থায় প্রয়োজনে এক দীর্ঘায়িত সংগ্রামের মাধ্যমে সমাজ পুনর্নির্মাণের ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ প্রত্যয়ী নেতৃত্বে পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘায়িত বৈরিতার পরিণতির মোকাবেলা করুন ৷
এ বিকল্পের প্রস্তাব স্বভাবতই শুধু পশ্চিম পাকিস্তানের “কট্টর” ও কপটাচারী মহলকে দেওয়া হয়নি, প্রস্তাবটি দেওয়া হয় একই শ্রেণীর পূর্ব পাকিস্তানী মহলের কাছেও যাতে এদের কারও কারও পক্ষে তাদের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ এ বিকল্পগুলি কীভাবে প্রভাবিত করবে তার ভালমন্দ খতিয়ে দেখার সুবিধা হয়। এদের কারও না কারও নিশ্চয়ই উল্লিখিত প্রথম দুই প্রস্তাবের কোনো না কোনো বিকল্পে কায়েমি স্বার্থ থেকে থাকবে এবং নিশ্চয় পশ্চিমে তাদের অনুরূপ পক্ষদের (অবশ্য মাত্রাগত তারতম্যসহ) সাথে কিছু যোগাযোগ থাকবে যারা সিদ্ধান্ত প্রণেতাদেরকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে যতটা দেখা যায়, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত ছিল ।
এ যাবৎ শেখ মুজিব কেবল কোনো রকম শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তিতে উপনীত হতে না পারার “ফলাফল” বা পরিণতির কথা বলে এসেছেন। কিন্তু পরিণতির সম্ভাবনা কী কী তা বিস্তারিত বলেননি। ছাত্রসভায় তাঁর উপস্থিতি তীক্ষ্ণ সুনির্দিষ্টতায় না হলেও তির্যক অস্পষ্টতায় তিনি ও তাঁর সহযোগীরা একে কীভাবে দেখছেন তার আলোকে ভবিষ্যৎ প্রবণতার আভাস দিয়েছে। এতে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে যদি অধিক শক্তিশালী সামাজিক শক্তি নাও হয় সমান শক্তির আবির্ভাবের পাশাপাশি তাঁর নিজের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা প্রতিভাত হয়েছে।
ছাত্রসভায় তাঁর এই বক্তৃতা এবং সেই সাথে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আহূত নেতাদের সম্মেলনে যোগ দিতে তাঁর অস্বীকৃতি বাস্তবিকপক্ষেই পরিস্থিতিকে একেবারে “মুখোমুখি সংঘাত” অবস্থায় নিয়ে যায় । তিনি এই প্রস্তাবকে এক ‘নিষ্ঠুর তামাশা’ বলে অভিহিত করেন। কেননা, এ প্রস্তাব আসছে সরকারের সহিংস দমনমূলক কার্যব্যবস্থা গ্রহণের পর।
তিনি উল্লেখ করেন, “বিষয়টি বেশি করেই তা-ই, কেননা, আমাদেরকে এমন সব লোকের সাথে বসতে বলা হচ্ছে যাদের সন্দেহজনক কলকাঠি নাড়াই নিরপরাধ ও নিরস্ত্র কৃষক, মজুর, ছাত্রের প্রাণহানির জন্য দায়ী।” তিনি বলেন, এ দাওয়াত হলো “বন্দুকের নলেরমুখে” দাওয়াত, যা কবুল করার প্রশ্নই ওঠে না। ইতোমধ্যে ওয়ালী ন্যাপ ১৯৭১ সালের ২ মার্চে জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশন বাতিলের প্রতিবাদ জানাতে পল্টন ময়দানে এক সভার আয়োজন করে।
এই সভায় দলটি পরিষ্কার দাবি করে যে, “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদও” এ চক্রান্তের শামিল। ৬০ ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ মতিয়াপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন শহীদ মিনারে এক জনসভা করে এবং ব্যারাকে ফেরার জন্য সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানায় । সভায় বিশেষ গুরুত্বসহকারে বলা হয়, এটি কোনো অনুরোধ নয় বরং ছাত্র সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে নির্দেশ।
এভাবে সূচনার পর মতিয়া ছাত্র ইউনিয়ন কার্যত প্রতিদিনই শহীদ মিনারে সভা করতে থাকে যার অর্থ ছিল এই যে, তারা তখনো স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখছিল। ফলে এসবিসিএসপির পুরোটাই ছাত্রলীগের করায়ত্ত থেকে যায়। এটি একদিক থেকে রীতিমতো লক্ষ্য করার মতো বিষয়, কেননা, এই প্রথমবারের মতো এক সঙ্কট সন্ধিক্ষণে ছাত্র সংগঠনগুলি তাদের মতপার্থক্য তাকে তুলে রেখে একটি অভিন্ন কর্মসূচিতে কাজ করার জন্য মিলেমিশে গেল না ।
মতিয়া ছাত্র ইউনিয়ন হয়তোবা সিদ্ধান্তহীনতার শিকার, কেননা, এসবিসিএসপি প্রকাশ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের ডাক দিয়েছিল যার নিহিত তাৎপর্য ছিল পাকিস্তানের অনিবার্য ভাঙন অথচ নিখিল পাকিস্তান ওয়ালী ন্যাপপ্রধান ওয়ালী খান পাকিস্তান ভাঙার যে কোনো আভাসের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সুস্পষ্ট মতপ্রকাশ করেছিলেন। কাজেই ওয়ালী ন্যাপের সাথে সংসর্গ ছেদ না করে মতিয়াপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষে প্রকাশ্যে এসবিসিএসপিতে যোগ দেওয়া সম্ভব ছিল না ।
আওয়ামী লীগ তখনো তার পরোক্ষ প্রতিরোধের নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে আঁকড়ে থাকলেও সক্রিয় প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুতির বিষয়টি কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলের ছাত্রদের মধ্যে সীমিত থাকেনি আর সেটি নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে অজানা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষকরাও তাদের সাথে যোগ দেয়।
৬২ এ ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানে কর্মস্থলে নিয়োজিত ও ছুটিতে পূর্ব পাকিস্তানে আগত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও তাঁদের নিজস্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন। এঁরা সকলেই সর্বাত্মক এক সশস্ত্র সংগ্রামের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁরা আশা করছিলেন, তিনি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন।
তবে সে জিনিসটি তাঁদের বাঞ্ছিত আকারে আসেনি। আঙ্গিকের দিক থেকে শেখ মুজিবের ভাষণ কোনো স্বাধীনতার ঘোষণা না হলেও বিষয়বস্তু বিবেচনায় এটি পরিপূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে সংগ্রামের ডাক ছিল সুনিশ্চয়। সেই সময়ে স্বাধীনতা ঘোষণা না করার ব্যাপারে মুজিবের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ছিল কিনা তা নিয়ে ঢের বিতর্ক হয়েছে, এখনো সম্ভবত চলছে, কেউ এ বিষয়টিকে “তাঁর ব্যর্থতা”
হিসেবে অভিহিতও করেছে, তবু কম রক্তপাত, কিংবা রেসকোর্স ময়দানে গোটা নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হওয়া কিংবা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর গদি পাওয়ার সম্ভাবনা ইত্যাদির আলোকে পূর্ববর্তী ঘটনাবলির নিরাসক্ত, বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণে তাঁর উল্লিখিত সিদ্ধান্তের যুক্তি ছিল বলেই দেখা যাবে। এ কথা সত্যি যে, তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রক্তপাত এড়াতে চেয়েছিলেন।
তিনি এও চাননি যে, সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালিরা আন্দোলনে জড়িত হোক (কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে, রাজনৈতিক সংগ্রামে অংশ নিতে সামরিক বাহিনীর পদস্থ ব্যক্তিদের আহ্বান জানানোর ফলে সামরিক অভিজাতগোষ্ঠীর সংহতির কারণে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির সামরিকীকরণ দ্রুততর হয়েছে)। তাই আগেভাগে তিনি রক্তপাতের দায়দায়িত্ব নেওয়া থেকেও সরে থাকবেন সেটিই তাঁর জন্যে স্বাভাবিক।
এমনকি যদি তিনি বুঝতেও পারতেন যে, রক্তপাত অনিবার্য তাহলেও কি তিনি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে (যাঁরা তাঁকে তাঁদের পক্ষে কথা বলার বৈধতা দিয়েছেন সঙ্গতভাবেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারতেন যেহেতু তিনি নিজে এই মর্মে জনসমক্ষে অঙ্গীকার করেছিলেন যে তিনি পরিস্থিতি বদলানোর জন্য ৭ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন? পরিস্থিতি বদলেছিল যদিও তা তাত্ত্বিক অর্থে।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ১৯৭১ সালের ৬ মার্চ তাঁর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকা হবে। অবশ্য তিনি ঘোষণাটি দিয়েছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর অধিনায়ক ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এই হুমকিসহকারে যে তিনি “পাকিস্তানের পরিপূর্ণ ও সর্বাত্মক সংহতির” নিশ্চয়তা বিধান করবেন।
অবশ্য, শেখ মুজিব এত বিলম্বিতভাবে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকার নিষ্ফলতার বিষয়টি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, শাণিত ভাষায় উল্লেখ করে এই অধিবেশনে আওয়ামী লীগের যোগাদানের পক্ষে কতকগুলি পূর্বশর্ত দেন। সেগুলি হলো:
১. অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার;
২. জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর;
৩. সামরিক বাহিনীর সকল সদস্যকে অবিলম্বে ব্যারাকে প্রত্যাহার;
৪. পূর্ববর্তী সপ্তাহে যে সব ঘটনায় লোক নিহত হয়েছে সে সব ঘটনা সম্পর্কে তদন্তানুষ্ঠান ।
এ সবের অতিরিক্ত তাঁর অন্যান্য দাবি ছিল:
১. সামরিক প্রস্তুতি ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে বিপুল সেনার আগমন রহিতকরণ;
২. বেসামরিক ব্যক্তিদের ওপর গুলিবর্ষণের আশু অবসান যাতে আর একটি বুলেটও না নিক্ষিপ্ত হয়;
৩. বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি শাখার কাজে সামরিক কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং সরকারি অফিসার ও কর্মচারীদের অযথা বিপন্ন করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দান;
৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব শুধুমাত্র পুলিশ ও পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের বাঙালি সদস্যদের হাতে ছেড়ে দিয়ে যেখানে প্রয়োজন আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তা গ্রহণ ।
ইয়াহিয়া খান যদি ভেবে থাকেন যে, এলএফও প্রয়োগ করে তিনি আওয়ামী লীগ প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্রে ভিটো প্রয়োগ করে আওয়ামী লীগকে চিরকালের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সামরিক আইন বহাল রাখবেন তাহলে তিনি ভুল করেছিলেন। কেননা এটি রুখতেই সামরিক আইন প্রত্যাহারের বিষয়টিকে অন্যতম পূর্বশর্ত করা হয় ।
সাধারণ আইনগত মানদণ্ড অনুযায়ী নির্বাচন বাতিল না করে এটি করা অসম্ভব ছিল। তবে সুনিশ্চিতভাবেই বলতে হয়, প্রেসিডেন্ট মনে করলে কিছুই তাঁকে রুখতে পারে না (তিনি নিজেও ক্ষমতায় এসেছিলেন একেবারেই অনিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ও অবৈধভাবে, কেননা তখনো ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্রটি নাকচ হয়নি)।
একটি প্রস্তাবে বলা হয়, শেখ মুজিবের উচিত ছিল নিঃশর্তভাবে পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়া । যোগ দিয়ে আওয়ামী লীগ দলীয় একজন স্পিকারের নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং তারপর পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা ও এভাবে সামরিক আইন থেকে অব্যাহতি পাওয়ার ব্যবস্থা করা। ১৯৭১ সালের মার্চের পরিস্থিতির আলোকে সম্ভবত এ ধারণাটি অতি আশাবাদী ও অতি সরল ।
কয়েকটি ব্যবস্থা আগে না নেওয়ার আলোকে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদানে অস্বীকৃতি ছিল বাস্তবিকপক্ষে ইয়াহিয়া খানের এই প্রত্যয়ের প্রতি চ্যালেঞ্জ যে, প্রেসিডেন্ট তথা সামরিক আইন প্রশাসকের নির্দেশ প্রতিপালিত হতেই হবে। ৬৯ প্রেসিডেন্টের কর্তৃত্বকে আরো চ্যালেঞ্জ করা হয় অহিংস অসহযোগ কর্মসূচির মাধ্যমে।
শেখ মুজিব ৭ মার্চ দশ-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করলে ৮ মার্চ থেকে শুরু হয় এই অহিংস অসহযোগ আন্দোলন। আওয়ামী লীগ १० সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তানে কার্যত একটি সমান্তরাল সরকার চালু করে । তাজউদ্দিন আহমদ পরে বলেন, এই পরিস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত সরকার না হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে অর্থব্যবস্থা ও প্রশাসন অব্যাহত রাখার দায়িত্ব গ্রহণে বাধ্য হয়।
এই দায়িত্ব পালনকালে তারা কেবল জনগণেরই নয় প্রশাসন ও ব্যবসায় সম্প্রদায়েরও অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করে । … পুলিশের সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবকরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটা উপযুক্ত অবস্থা বজায় রাখে । … . আওয়ামী লীগ এবং এই ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ জনসমর্থনের মোকাবেলায় জেনারেল ইয়াহিয়া তাঁর কৌশল সংশোধন করেছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়।”
টিক্কা খানের নিয়োগে আগামীতে কী ঘটতে যাচ্ছে তা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কেননা, পরিচিতি অন্যতম ‘কট্টর’ হিসেবে যার নিষ্ঠুরতার রীতিমতো লক্ষণীয় রেকর্ড রয়েছে। এ কারণে ২৫-২৬ মার্চ মাঝরাতে ও তারপর যা ঘটে তা অপ্রত্যাশিত ছিল না। কার্যত এটি এর পূর্ববর্তী ২৫ দিনে বিক্ষিপ্তভাবে যা ঘটেছে তারই ব্যাপক ব্যাপ্তির ধারাবাহিকতা ও নিরবচ্ছিন্নতা।
তবে পার্থক্য ছিল শুধু এই যে, ঐ ২৫ দিনে পূর্ব পাকিস্তান কার্যত এক বেসরকারি সরকারের আওতায় ‘বাংলাদেশে’ রূপান্তরিত হয় আর যুগপৎ মুখোমুখি হয় ঐ সরকারের বিবেচনায় এক দখলদার সেনাবাহিনীর। ফলত, ১৯৭১ সালের ১৫ থেকে ২৫ মার্চের মধ্যবর্তী সময়ে ইয়াহিয়া, ভুট্টো ও মুজিব এবং তাঁর সহযোগীদের আলোচনায় কী ঘটেছিল সে বিষয় অবান্তর।
উভয় তরফের জানা উচিত ছিল, যে মোকাবেলা তারা এড়াতে চাচ্ছিল কিংবা যার মুখোমুখি হতে তারা ভয় পাচ্ছিল তাদের নিজ নিজ কারণে সেই মোকাবেলাই অবধারিত, অনিবার্য হয়ে পড়েছে। এই অনিবার্যতা যদি বেশি কিছু নাও হয়ে থাকে, তা ছিল ১৯৪৭ সালে এ উপমহাদেশ বিভক্ত হওয়ার অনুরূপ অনিবার্যতা ।
তবু “আলাপ-আলোচনার” একটা লোক দেখানো নামাবলি গায়ে চড়ানো হয়। তবে তাৎপর্যের বিষয় এই যে, এ সব আলোচনা শাসনতন্ত্র প্রণয়ন, এমনকি, ইয়াহিয়ার ইচ্ছানুসারে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত ছিল না। বরং এই আলোচনা ছিল ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ আওয়ামী লীগের দেওয়া শর্তের কারণে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সৃষ্ট ‘সঙ্কট’ নিরসনের জন্য।
অবশ্য, আওয়ামী লীগের এই যে সব শর্তের কথা বলা হচ্ছে সেগুলি পূরণ করা হলেও আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের প্রস্তাবিত অধিবেশনে যোগ দেবে এমন নিশ্চয়তা ছিল না । শেখ মুজিব শুধু এ কথাই বলেছিলেন যে, আশু দাবিগুলি মেটানো হলে আওয়ামী লীগ এ অধিবেশনে যোগ দেবে কিনা সে বিষয়টি বিবেচনা করে দেখবে। যদি কেউ এমন কল্পনাবিলাসী থেকেও থাকেন অন্তত শেখ মুজিব ও তাঁর সহযোগীরা অবশ্যই সেই সব কল্পনাবিলাসীদের কেউ ছিলেন না ।
ঢাকায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. নুরুল্লাহর কথা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের পরেই কিছু ছাত্রলীগার তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে লভ্য যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি বেতারকেন্দ্র তৈরি করে দেওয়ার অনুরোধ জানায় ও পরে তাঁকে শেখ মুজিবের বাসভবনে নিয়ে যায়। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানও তাঁকে একই অনুরোধ জানান। শেখ মুজিব তাঁকে বলেন, তিনি দেশবাসীর কাছে তাঁর ভাষণ পৌঁছে দেওয়ার জন্যই ওটা কাজে লাগাবেন । ড. নুরুল্লাহ জানান, শেখ মুজিব বলেন, “আমি আমার শেষ ভাষণ দিতে চাই।”
আলোচনা চলাকালে শেখ মুজিবের শান্ত ও সংযত মেজাজ বহিরাগতদের কাছে অসাধারণ স্থিতিশীল মনে হলেও তাঁর সহযোগীরা জানতেন, তিনি তখন লড়ে চলেছেন এক হেরে যাওয়া খেলায়। হেরে যাওয়ার কারণ এই আলোচনায় আর কোনো ফল হবে না, বহু চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত আর রক্তপাত এড়ানো যাবে না। উভয়পক্ষ কেবল সময় কাটাচ্ছিল ।
ইয়াহিয়ার জন্য সময় দরকার ছিল আঘাত হানা চূড়ান্ত করার জন্য। মুজিবের সময়ের দরকার ছিল যাঁরা আওয়ামী লীগের পতাকাতলে লড়াইয়ের নিরবচ্ছিন্নতা বজায় রাখবেন তাঁদের আশ্রয়ের ব্যবস্থাসহ আরো কিছু কাজ সারার। কেননা এ ছিল আওয়ামী লীগের জন্মলগ্ন থেকেই সূচিত সংগ্রামের নিরবচ্ছিন্নতা—যার ধারাবাহিকতা চলে এসেছে পাকিস্তানী রাজনীতির সংসদীয় ও সামরিক শাসনের পর্যায়গুলিতে পরিষদে ভাষণ থেকে শুরু করে বিবৃতি দান, আলোচনা ও পরিশেষে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনে যা শেষাবধি পাকিস্তানী রাজনীতির গতিধর্মের প্রবণতায় রূপান্তরিত হয়েছে স্বশাসনের আন্দোলনে।
তবু অন্তর্বর্তীকালীন বিভিন্ন আলাপ-আলোচনায় যা উদ্ঘাটিত হয়েছে তা-ও তাৎপর্যবিহীন নয়। এ সব থেকে অনিবার্যতা এড়ানোর এ ধরনের শেষ মুহূর্তের আধা-খেঁচড়া প্রয়াসের নিষ্ফলতাই প্রমাণিত হয়েছে। বস্তুত, অস্তিত্বশীল বাস্তবতাসমূহের নিয়মের ফসল হিসেবে অনিবার্য পরিণতি রুখে দেওয়া সম্ভব নয় যদি না পরিস্থিতির সহজাত কতিপয় বিষয়ে ক্রমবিকাশের গোটা প্রক্রিয়াকেই উল্টে না দেওয়া যায়। ইতিহাসের বিচারে, এ রকম কিছু একটা অত্যন্ত কল্পনাসুলভ ও অবাস্তব প্রাকধারণা ।
এ কারণেই ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো কোনো নেতার বাহ্যত সহানুভূতির অভিব্যক্তিতে আওয়ামী লীগের অভিভূত না হওয়ায় আশ্চর্যের কিছু নেই । ১৯৭১ সালের ৯ মার্চ ভুট্টোর সুদীর্ঘ তারবার্তাতেও আওয়ামী লীগের সামান্য ভাবান্তরও ঘটেনি । আরো তাৎপর্যের বিষয়, ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তান সফরের প্রস্তাব দিলে আওয়ামী লীগ তাঁকে “বাংলাদেশের মেহমান” হিসেবে স্বাগত জানাবার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
এ ছিল পূর্ব পাকিস্তানে ইয়াহিয়া ও সেই সুবাদে ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার আরো আভাস। আর এ কর্তৃত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা যদি বা হয়ও তাহলেও জনগণের চোখে উপমহাদেশ পুনর্দখলের জন্য ব্রিটিশ প্রয়াসের মতো অনুরূপ কিছুর বেশি বলে প্রতিভাত হবে না বললে সেই সময়ের বিচারে তা আদৌ কোনো অত্যুক্তি হবে না ।
সাবেক পূর্ব পাকিস্তানীদের মনে এমন ধারণা জন্মেছিল যে, “ইসলামাবাদের শাসকগোষ্ঠীর একমাত্র ক্ষমতা ছিল এই যে, তারা শুধু পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণকে হত্যা করতে আর তাদের অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলারই ঘনঘটা বাড়িয়ে দিতে পারে। এরই পরিষ্কার দৃষ্টান্ত রয়েছে খাদ্যবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে করাচির দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার ঘটনায়।”
আলোচনার জন্য ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এলে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের চিন্তাশীল মানুষের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল, “শেখ মুজিবের দাবির প্রশ্নে রফায় আসার জন্য ইসলামাবাদের কাছে একটা পথই খোলা আর তা হলো গণহত্যা চালানো।” তাঁরা এ কথাও জানতেন যে, ইতঃপূর্বে পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের মানুষ যদি এখন অনুভব করে যে, একটি জাতি হিসেবে থাকার মূল্য বড় বেশি হয়ে যাচ্ছে তবে পশ্চিমে তাদের ভাইদেরকে বিদায়ী সালাম জানানোর সার্বভৌমত্ব তাদের রয়েছে যে সার্বভৌমত্বের অধিকার বলে তারা একদিন মূল ভারত ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল।’ ”
আওয়ামী লীগের দেওয়া যে চারটি শর্ত সন্তোষজনকভাবে পূরণ হলে সৃষ্ট পরিবেশে দলটি জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবে কিনা বিবেচনা করতে পারতো সেই শর্তগুলি দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত: মুখ্য ও গৌণ কিংবা প্রধান ও পরিপ্রান্তিক (অতীব গুরুত্বপূর্ণ বা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়) । এ রকম বিভক্তি এই অর্থে যে দুটি শর্ত যেমন, ব্যারাকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি এবং যারা নিহত হয়েছে তাদের ব্যাপারে তদন্ত অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা হলেই তথাকথিত কোনো আইনগত জটিলতা ছাড়াই সমস্যাটির নিষ্পত্তি হতে পারতো।
বাস্তবিকপক্ষে, কর্তৃপক্ষের জবানি অনুযায়ী, এ দুটি বিষয়েই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেনাদের ব্যারাকে ফেরত পাঠানো হয়েছে যদিও আওয়ামী লীগ দাবি করে যে, আসলে তা করা হয়নি। সামরিক আইন আদেশে এক তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের সদস্য চারজন। এদের একজন করে সিএসপি, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও ইপিআর-এর প্রতিনিধি ।
কমিশনের সভাপতি পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের একজন বিচারক। আওয়ামী লীগ অবশ্য এ কমিশন মেনে নেয়নি এর গঠন বিন্যাসের ও সামরিক আইন আদেশের আওতায় গঠিত হওয়ার কারণে । অন্য দুটি দাবি যেমন, সামরিক আইন প্রত্যাহার এবং শাসনতন্ত্র চূড়ান্ত না হওয়া অবধি অন্তর্বর্তীকালীন মেয়াদের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ছিল আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় ।
আওয়ামী লীগের ভাষ্য অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ও আওয়ামী লীগের মধ্যে অন্তর্বর্তী মেয়াদের জন্য কয়েকটি “মৌলিক বিষয়ে” ঐকমত্য হয়েছে। এগুলি হলো:
১. সামরিক আইন প্রত্যাহার করে প্রেসিডেন্টের এক ইশতেহার জারি এবং একটি বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর;
২. প্রতিটি প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর;
৩. জেনারেল ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবেন;
৪. শাসনতন্ত্র চূড়ান্ত করার জন্য জাতীয় পরিষদ অধিবেশনের প্রাকপ্রস্তুতি হিসেবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানী সদস্যদের জন্য জাতীয় পরিষদের স্বতন্ত্র অধিবেশন ।
আওয়ামী লীগ যেহেতু ইতোমধ্যে যে সব বিষয় আলোচনার জন্য প্রস্তাব করেছে তাতে আর কিছু যোগ করার বা সেগুলি থেকে কিছু বাদ দেওয়ার কোনো আবশ্যকতা ছিল না, সে কারণে অতিরিক্ত আর কোনো বৈঠকে তার বসার দরকারও ছিল না। কেবল প্রেসিডেন্ট বা তাঁর উপদেষ্টা এমএম আহমদের কাছ থেকে কোনো বার্তা যখন এলো না তখনই তাঁরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা এমএম আহমদ ২৫ মার্চ সকালে করাচি রওনা হয়ে গেছেন।
আর ঠিক ঐ দিন সন্ধ্যাতেই ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগ নেতাদের না জানিয়ে চলে গেছেন বলে গুজব রটে। অথচ ইয়াহিয়া খানের সাথে তাঁদের দরকষাকষিমূলক আলোচনা চলছিল। ভুট্টোকে ঢাকায় ডেকেছিলেন ইয়াহিয়া খান । তিনি আশ্চর্যজনকভাবে শেখ মুজিবের সাথে দেখা করেননি । শুধু শেখ মুজিবের সাথে প্রেসিডেন্টের যে আলোচনা হয়েছে সে ভাষ্য ইয়াহিয়ার কাছ থেকে পেয়েই শেষ মুহূর্ত অবধি তুষ্ট থাকার পর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঢাকায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ও পিপিপির মধ্যে সরাসরি দরকষাকষির আলোচনা হওয়া অত্যাবশ্যক ।
পাকিস্তান সরকারের তৈরি শ্বেতপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী সংশোধন করার পর আওয়ামী লীগ যে খসড়া ইশতেহারটি (দুটি প্রধান দাবি পূরণের জন্য) পেশ করেছে তা “ফেডারেশনের পরিবর্তে কনফেডারেশনের জন্ম দেবে, তাতে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব বিলুপ্ত হবে, ১ মার্চ থেকে তিনি (শেখ মুজিব) পূর্ব পাকিস্তানে যে সমান্তরাল সরকার কার্যত চালাচ্ছেন তাকে আইনানুগ কর্তৃপক্ষের মর্যাদা দেবে এবং আইনের বৈধতাবিহীন এক ইশতেহার জারির মাধ্যমে শাসনতান্ত্রিক শূন্যতার সৃষ্টি করবে।” ”
এভাবে ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষ জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে সরকারিভাবে স্বীকার করে নেন যে, কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডের একটি অংশের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে যে অংশটি তার শাসনে থাকার কথা। ইয়াহিয়া খান ও তাঁর উপদেষ্টারা এখনো শান্তিপূর্ণভাবে আলাপ-আলোচনা চালাতে পারেন বলে কর্তৃপক্ষ স্বীকার করে নেওয়ায় প্রমাণিত হয় যে, “সমান্তরাল সরকার বা প্রশাসন” ঐ অংশে কমবেশি দক্ষতার সাথে নিজ নিয়ন্ত্রণ পরিচালনা করছে।
ঘটনা বাস্তবিকপক্ষে যদি তা-ই হয়ে থাকে তাহলে “আওয়ামী লীগ ২৬ মার্চের সকালে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরুর পরিকল্পনা করছিল” বলে শ্বেতপত্রে যে দাবি করা হয়েছে তা শূন্যগর্ভ মনে হয়, বোধগম্যও নয় ।
শ্বেতপত্রে গৃহীত সামরিক কার্যব্যবস্থার সপক্ষে যুক্তি দিয়ে বলা হয়, “ভারতের যোগসাজশে” আওয়ামী লীগের জঙ্গি মনোভাবের বিরুদ্ধে অনিবার্য ব্যবস্থা ছিল এটি। দেশের সংহতি রক্ষায় প্রেসিডেন্টের পক্ষে এ বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না । ৭৯ “ভারতের সাথে যোগসাজশ” প্রশ্নে বলা যায়, বাংলাদেশ ও ভারতের ওয়াকেফহাল মহলের তথ্যানুযায়ী ঐ সময়ে আওয়ামী লীগকে শুধু এই প্রতিশ্রুতিই দেওয়া হয় যে, আশ্রয় চাওয়া হলে দলীয় নেতাদের আশ্রয় দেওয়া হবে।
ঐ একই সূত্রে জানা যায়, পরবর্তীকালে ভারতের সাহায্যের প্রকৃতি ও উপকরণ নির্ভরশীল ছিল পরিস্থিতির গুরুত্বের ওপর, ঘটনার পরিক্রমায় অন্যান্য ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে।অবশ্য, আওয়ামী লীগের ক্রমবর্ধমান লড়াকুভাবও ছিল এক নিরেট বাস্তবতা। তবে তাদের এ জঙ্গি মেজাজটি ছিল প্রকৃতপক্ষেই মনমানসিকতার, উপকরণগত প্রস্তুতির নয় ।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঘোষণা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ অসহযোগ আন্দোলনের আকারে সঙ্কট উত্তরণের যে কৌশল গ্রহণ করে তা ছিল বিশেষভাবে গান্ধীর পরোক্ষ প্রতিরোধের অনুকরণ । আদর্শিকভাবে আওয়ামী লীগ সংগ্রামপ্রবণ বা সহিংস অভিমুখী ছিল না। যদি তা হতো তাহলে ১৯৬৮-৬৯ সালের সম্ভাবনার দিক থেকে সহিংস আন্দোলনটি ঐ সময়েই তাকে উঠতো না যখন ইয়াহিয়া খান তখনো তাঁর অবস্থান মজবুত করে উঠতে পারেননি, যখন বিদায়ী প্রেসিডেন্ট যে জখমি আঘাত হেনেছিলেন, সে জখমের ক্ষত তখনো কাঁচা রয়ে গিয়েছিল।
তখনকার মোকাবেলার মনোভাবটি রুখে যায় প্রধানত এ কারণে যে, আওয়ামী লীগ তখনো পূর্ব পাকিস্তানের দাবিগুলি আদায়ের অহিংস নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন পরিচালনায় অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল। অথচ ইয়াহিয়া খান নিজে হয় তাঁর সহজাত প্রেরণায় নয় তাঁর উপদেষ্টাদের তাগিদে একটা সর্বাত্মক মোকাবেলা পরিস্থিতিতে নিহিত বৈরিতার আগুনে ঘৃতাহুতি দেওয়ার পথ বেছে নেন।
তিনি বুঝতে পারেননি যে মোকাবেলার বিষয়টি কোনো ব্যক্তি বা দলের সাথে নয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী মোকাবেলা করছিল সংস্কৃতিগতভাবে সুসমঞ্জস, অর্থনৈতিক দিক থেকে অবদলিত এবং রাজনৈতিক দিক থেকে অধিকারবঞ্চিত ঐক্যবদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানী গণমানুষের সাথে, যে গণমানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে চরিত্রগতভাবে এক মঞ্চপ্রতিম দল–আওয়ামী লীগের পতাকাতলে এক অভিন্ন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে।
১৯৬৯ সালের ব্যাপক মারমুখী আন্দোলনকালে যে বৈরিতার প্রকাশ ঘটে তাতে পাকিস্তানের চলতি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য কী কঠিন ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে তার আভাস পাওয়া যায়। ইয়াহিয়া খান তখন জনতার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতির ‘সন্ধি’ সাপেক্ষে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের চেহারাটি বজায় রাখার একটা ব্যবস্থা করেন।
কিন্তু ১৯৭১ সালে তাঁর জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতকরণ সিদ্ধান্তের ফলে সেই ‘সন্ধি’ স্থগিত হয়ে যায়। ফলে পরিস্থিতি আবার সেই অবস্থায় ফিরে যায় যখন ব্যাপক মারমুখী তৎপরতার অবসানের জন্য ওই অঙ্গীকার করা হয়েছিল । ‘সন্ধি’ ভেঙে যাওয়ার পর নিপীড়ক ও নিপীড়িতদের মধ্যে সর্বাত্মক সংঘাতের কোনো বিকল্প রইল না।
শেষোক্তবর্গ এখন তাদের বৈধ প্রতিনিধি অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অসহযোগিতামূলক পরোক্ষ প্রতিরোধ কর্মসূচিই ব্যাপকভাবে অব্যাহত রাখে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এই কর্মসূচিকে “দেশদ্রোহিতামূলক কর্মকাণ্ড” মনে করেন, শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর দলকে “পাকিস্তানের শত্রু” হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে “সম্পূর্ণরূপে” নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫-২৬ মার্চের রাতে বর্বর সামরিক নিষ্ঠুরতা শুরু হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার এই ঘোষণা অর্থহীন হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব নিশ্চিতরূপে উপলব্ধি করে যে এ যাবৎ যে পাকিস্তান বিদ্যমান ছিল তা এখন “মৃত এবং শবের পাহাড়ের নিচে তার দাফন হয়ে গেছে।’ ”
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সদস্যগণ জাতীয় পরিষদ গঠন করেন এবং স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশকে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করেন।
স্বাধীনতা ঘোষণার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে শাসন করার জন্য গঠিত অস্থায়ী সরকার নয় মাস স্থায়ী মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ প্রসঙ্গে মওদুদ আহমদ বলেন, “নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় এবং স্বাধীনতার সংগ্রামে তাদের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশ এত শিগগির স্বাধীন রাষ্ট্রের রূপ পরিগ্রহ করতে পারতো না।”
ইতোমধ্যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নামধারণ করে । আগেই বলা হয়েছে যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কৌশলগতভাবে কিংবা নামমাত্রভাবে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক শাখা ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ।
এই সময় এএইচএম কামারুজ্জামান ছিলেন নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি এবং তাজউদ্দিন আহমদ ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি । ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে এক বৈঠকে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
![পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-৩ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ] 3 পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-৩](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2015/01/বাংলাদেশ-কৃষক-শ্রমিক-আওয়ামী-লীগের-কেন্দ্রীয়-কমিটি.png)
৮৪ এখানে উল্লেখনীয় যে, ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের জন্য প্রতীক বরাদ্দের সময় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাখার বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট এই মর্মে রায় প্রদান করেন যে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রকৃতপক্ষে এমন একটি দল যা পূর্বে ছিল এবং নামেমাত্র ভিন্ন নামে ১৯৭০ সালের পাকিস্তান সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।৮৫ এইভাবে, পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাদেশ হিসেবে অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগও বৈধভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে পরিণত হয় ।
![পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-৩ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ] 1 পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-৩](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2024/09/পরোক্ষ-প্রতিরোধ-পর্ব-৩.jpg)