পূর্ব পাকিস্তানের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং সৈন্য মোতায়েন

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ পূর্ব পাকিস্তানের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং সৈন্য মোতায়েন। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।

পূর্ব পাকিস্তানের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং সৈন্য মোতায়েন

 

পূর্ব পাকিস্তানের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং সৈন্য মোতায়েন

 

পূর্ব পাকিস্তানে প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং সৈন্য মোতায়েন

পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ)-এর ভৌগোলিক দিক দিয়ে তাকালে দেখা যায় যে, সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের তিন দিক ভারত দ্বারা বেষ্টিত। দক্ষিণ-পূর্বে একটি ক্ষুদ্র অংশের সাথে রয়েছে বার্মা (মায়ানমার) সীমান্ত। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এটা হচ্ছে একটি ভাটি এলাকা। এখানে অসংখ্য নদ-নদী ও খাল রয়েছে। তিনটি বড়ো নদী- মেঘনা, পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্র বর্ষাকালে পানিতে ভরে গিয়ে সমুদ্রের রূপ ধারণ করে। তখন এ নদীগুলো অনেক ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।

ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করা এসব নদী পূর্ব পাকিস্তানে চলাচলের পথে একটি বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভৈরব ও পাকশি এ দুটি হচ্ছে গোটা অঞ্চলের দুটি বড়ো সেতু। সড়ক ও সেতুর স্বল্পতার কারণে চলাচলের জন্য নৌকা ও ফেরি ব্যবহার করতে হয়।

নৌকা ও ফেরিতে চলাচলের জন্য সময় লাগে বেশি এবং এগুলোতে হামলা করাও সহজ। নদী পথের এ বাধা অতিক্রম করার একমাত্র উপায় হচ্ছে বিমানে পাড়ি দেওয়া অথবা ছত্রী সেনা নামানো। ১৯৭১ সালে ভারতীয়রা তাই করেছিল। তাই তাদের সহজ জয় হয় ।

পূর্ব পাকিস্তান অঞ্চলের আবহাওয়া হচ্ছে আর্দ্র ও উষ্ণ। বর্ষাকাল হচ্ছে দীর্ঘ এবং সে সময় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। বর্ষাকালে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায় এবং এ অঞ্চলের আবহাওয়ায় যারা অভ্যস্ত নয় তাদের কাছে তা অসহ্য। এটা তাদের শক্তি ক্ষয় করে।

শুষ্ক অঞ্চলের লোকের কাছে আর্দ্র জলবায়ু বিপজ্জনক। অনেক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো ম্যালেরিয়া। এ ছাড়া, আর্দ্র আবহাওয়ায় রয়েছে জোঁক ও অন্যান্য নোংরা পোকা-মাকড়ের উপদ্রব। এগুলো ঠিকমতো রোধ করতে না পারলে যুদ্ধের চেয়েও বেশি সৈন্য মারা যেতে পারে।

 

পূর্ব পাকিস্তানে প্রধান নদীগুলো সমগ্র দেশকে চারটি পৃথক ভূখণ্ডে বিভক্ত করে রেখেছে।

রংপুর-রাজশাহী সেক্টর

পাকশির কাছে একটি মাত্র রেল সেতু রয়েছে যা কুষ্টিয়া-খুলনা অঞ্চলকে দক্ষিণের সাথে সংযুক্ত করেছে। উত্তর থেকে দক্ষিণে মাত্র একটি বড়ো রাস্তা। ঢাকা সেক্টরের সাথে সংযোগ সাধনে যমুনা নদীতে কোনো সেতু নেই । ঠাকুরগাঁয়ে হালকা বিমান অবতরণ উপযোগী একটি ছোট্ট বিমান ক্ষেত্র রয়েছে।

কুষ্টিয়া খুলনা সেক্টর

এ অঞ্চলে দুটি বড়ো রাস্তা রয়েছে। একটি রাস্তা কুষ্টিয়া থেকে চলে গেছে খুলনা এবং আরেকটি গেছে বেনাপোল থেকে ভারত সীমান্তবর্তী যশোর-ঝিনাইদহ- ফরিদপুর পর্যন্ত। এ অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রচুর নদ-নদী প্রবাহিত হয়েছে। এ জন্য এখানে সোজাসুজি চলাচল করা কঠিন। যশোরে একটি ভালো বিমান ক্ষেত্র এবং চালনায় একটি সমুদ্র বন্দরও রয়েছে। এখান থেকে যুদ্ধ পরিকল্পনা সহজ।।

সিলেট-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম সেক্টর

চট্টগ্রাম হচ্ছে একটি সামুদ্রিক বন্দর। মেঘনা নদী এ অঞ্চলকে ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। তবে ঢাকার সাথে চট্টগ্রামের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। ভৈরব বাজারে রেলওয়ের একমাত্র সেতু ঢাকার সাথে প্রদেশের পূর্বাঞ্চলের সংযোগ রক্ষা করছে। কোথাও কোথাও এ রেল লাইন আগরতলা সীমান্ত স্পর্শ করেছে। চট্টগ্রাম ও সিলেটের মধ্যেও সরাসরি সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। পথে প্রচুর নদী থাকায় চলাচল মন্থর ও দুষ্কর। চট্টগ্রামে একটি বিমান ক্ষেত্র রয়েছে। তবে শুধু হালকা বিমান ওঠা-নামা করতে পারে ।

ঢাকা সেক্টর

এক কথায় ঢাকা বিষয়ে বলা যায়, এটা হচ্ছে রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু। এ অঞ্চলের পশ্চিমে রয়েছে যমুনা নদী এবং পূর্ব দিকে মেঘনা ময়মনসিংহ থেকে একটি রাস্তা সোজা ঢাকা এসেছে। এটা হচ্ছে ভারত সীমান্ত থেকে ঢাকা পর্যন্ত সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ বিপজ্জনক রুট।

 

পূর্ব পাকিস্তানের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং সৈন্য মোতায়েন

 

ব্রহ্মপুত্র নদ হচ্ছে এ অঞ্চলের প্রধান প্রতিবন্ধকতা। মাঝে মধ্যে ছোটো ছোটো নদীও রয়েছে। ঢাকায় একটি বৃহত্তম বিমান ক্ষেত্র রয়েছে। এফ-৮৬ জঙ্গীবিমান ওড়ার জন্য এ বিমান ক্ষেত্র উপযোগী। গোটা প্রদেশের অভ্যন্তরে সড়ক যোগাযোগ মোটামুটি ভালো। কিন্তু নদ-নদীর প্রতিবন্ধকতার জন্য এক সেক্টর থেকে আরেক সেক্টরে সৈন্য চলাচল প্রকৃতপক্ষে দুঃসাধ্য ।

Leave a Comment