বখতিয়ার খলজী ও বাংলায় প্রাথমিক মুসলিম সাম্রাজ্য

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় বখতিয়ার খলজী ও বাংলায় প্রাথমিক মুসলিম সাম্রাজ্য  – যা বাংলায় মুসলিম শাসন এর অন্তর্ভুক্ত।

বখতিয়ার খলজী ও বাংলায় প্রাথমিক মুসলিম সাম্রাজ্য

 

বখতিয়ার খলজী ও বাংলায় প্রাথমিক মুসলিম সাম্রাজ্য

 

বখতিয়ার খলজী

ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বাংলার উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাংশের সেন শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলায় প্রাথমিক মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। হিন্দু বৌদ্ধ শাসনের অবসান ঘটেও সূচনা হয় বিদেশী মুসলিম শাসনের। ইসলামের আগমন এদেশের ঐতিহ্যবাহী সমাজ ও সংস্কৃতিতে আনে ব্যাপক পরিবর্তন ।

বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী। বখতিয়ার খলজী আফগানিস্তানের গরমশির বা আধুনিক দশত-ই-মার্গের অধিবাসী ছিলেন। তিনি তুর্কিদের খলজী সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। তাঁর বাল্যজীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানা যায় না। তবে, মনে হয় দারিদ্র্যের পীড়নে তিনি স্বদেশ ত্যাগ করেন এবং স্বীয় কর্মশক্তির উপর নির্ভর করে ভাগ্যান্বেষণে সচেষ্ট হন। সুলতান মুহাম্মদ ঘোরী তখন ভারত উপমহাদেশে অভিযানে লিপ্ত। বখতিয়ার খলজী গজনীতে সুলতান মুহাম্মদ ঘোরীর অধীনে সৈন্য বিভাগে চাকুরি প্রার্থী হয়ে ব্যর্থ হন।

তখনকার দিনে প্রত্যেক সৈন্যকে নিজ নিজ ঘোড়া এবং যুদ্ধাস্ত্র (ন্যূনপক্ষে ঢাল-তলোয়ার) সংগ্রহ করতে হতো। কিন্তু সামর্থের অভাবে বখতিয়ার খলজী ঘোড়া বা অস্ত্র যোগাড় করতে পারেননি। তাছাড়া বেঁটে, লম্বা হাত এবং কুৎসিত চেহারার বখতিয়ার হয়তো সেনাধ্যক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেননি। গজনীতে ব্যর্থ হয়ে বখতিয়ার খলজী দিল্লিতে আসেন এবং দিল্লির শাসনকর্তা কুতুবউদ্দিন আইবেকের দরবারে উপস্থিত হন। কিন্তু সেখানেও তিনি সেনাধ্যক্ষের সহানুভূতি পেতে ব্যর্থ হন। অতঃপর তিনি বাদাউনে যান এবং বাদাউনের শাসনকর্তা মালিক হিজবরউদ্দিন তাঁকে নগদ বেতনে চাকুরিতে নিয়োগ করেন।

কিন্তু বখতিয়ার এই ধরনের চাকুরিতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। কিছুদিন চাকুরি করার পর তিনি অযোধ্যায় যান। অযোধ্যার শাসনকর্তা মালিক হুসামউদ্দিন বখতিয়ার খলজীর প্রতিভা অনুধাবন করেন এবং তাঁকে ভিউলী ও ভাগওয়াত নামে দুইটি পরগণার জায়গীর প্রদান করেন এবং মুসলমান রাজ্যের পূর্ব সীমান্তে সীমান্তরক্ষীর কাজে নিযুক্ত করেন।ভিউলী ও ভাগওয়াত আধুনিক উত্তর প্রদেশের মীর্জাপুর জেলায় অবস্থিত। এখানে এসে বখতিয়ার খলজী তাঁর ভবিষ্যত উন্নতির সন্ধান পান।

বখতিয়ার খলজী কর্তৃক বাংলা জয় এবং বাংলায় প্রাথমিক মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা বাংলার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। বখতিয়ার খলজীর জায়গীর সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায় তিনি পার্শ্ববর্তী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিন্দু রাজ্যের সংস্পর্শে আসেন এবং স্বীয় রাজ্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে এসব পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলো আক্রমণ ও লুণ্ঠন করতে থাকেন।

এ সময়ে তাঁর বীরত্বের কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে, চারিদিক থেকে অনেক ভাগ্যান্বেষণকারী মুসলমান বিশেষ করে খলজী সম্প্রদায়ের লোক তাঁর সাথে মিলিত হয় এবং এভাবে বখতিয়ার খলজীর সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এভাবে অগ্রসরমান বখতিয়ার খলজী তরবারি পরিচালনার মাধ্যমে ওদন্তপুরী বিহার জয় করেন। বিহার বিজয়ের পর বখতিয়ার অনেক ধনরত্নসহ কুতুবউদ্দিন আইবকের সঙ্গে দিল্লিতে সাক্ষাত করতে যান। এখানে আরো সৈন্য সংগ্রহ করেন এবং এরপরই নদীয়া আক্রমণ করেন। এ সময় বাংলার রাজা লক্ষণসেন নদীয়ায় অবস্থান করছিলেন।

বখতিয়ার খলজী এতই ক্ষিপ্রতার সাথে ঝাড়খন্ড অরণ্য অঞ্চলের ভিতর দিয়ে এসে নদীয়া আক্রমণ করেন যে, তাঁর সঙ্গে মাত্র আঠারজন অশ্বারোহী ছিল এবং তাঁর মূল বাহিনী পেছনে ছিল। তিনি সোজা রাজা লক্ষণসেনের প্রাসাদদ্বারে উপস্থিত হন এবং প্রাসাদরক্ষীদের হত্যা করেন। ইতোমধ্যে শহরের অভ্যন্তরে শোরগোল শোনা যায়। রাজা লক্ষণসেন তখন মধ্যাহ্নভোজে লিপ্ত ছিলেন। খবর শুনে তিনি পশ্চাদ্বার দিয়ে পলায়ন করেন এবং পূর্ববঙ্গের রাজধানী বিক্রমপুরে গিয়ে আশ্রয় নেন। প্রায় বিনা যুদ্ধেই নদীয়া মুসলমানদের হস্তগত হয়।

পরে সম্পূর্ণ বাহিনী বখতিয়ার খলজীর সাথে মিলিত হয়। তিনি তিন দিনব্যাপী নদীয়া লুণ্ঠন করেন এবং রাজা লক্ষণসেনের বিপুল ধনসম্পদ এবং অনেক হস্তি বখতিয়ার খলজীর হস্তগত হয়। অত:পর বখতিয়ার খলজী নদীয়া ত্যাগ করেন এবং লখনৌতি বা লক্ষণাবতী (গৌড়) অধিকার করেন এবং সেখানে রাজধানী স্থাপন করেন। লখনৌতি বা লক্ষণাবতী বা গৌড়েই মুসলমান আমলে বাংলার রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। অতঃপর বখতিয়ার খলজী তাঁর নবপ্রতিষ্ঠিত রাজ্যে সুশাসনের ব্যবস্থা করেন এবং মুসলমান সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে মসজিদ, মাদ্রাসা এবং খানকাহ্ তৈরি করেন।

 

বখতিয়ারের সহজ সাফল্যের কারণ

বখতিয়ার খলজীর জায়গীর সীমাড় এলাকায় অবস্থিত থাকায় তিনি রাজ্যবিড়ারের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং এই অভিলাষে পার্শ্ববর্তী হিন্দুরাজ্যগুলোতে অভিযান পরিচালনা করেন। পার্শ্ববর্তী হিন্দুরাজ্যগুলোতে পূর্বেই তুর্কি বিজয়ের আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল। তদুপরি তাদের মধ্যে অন্তর্বিরোধি থাকাতে তাদের পক্ষে সংঘবদ্ধ হওয়া সম্ভব ছিল না। বখতিয়ার খলজীর ন্যায় একজন বীরের জন্য এটি ছিল উপযুক্ত সুযোগ এবং তিনি কিছু সংখ্যক সৈন্য সহকারে এক একটি করে হিন্দু রাজ্য আক্রমণ এবং লুণ্ঠন করতে থাকেন।

এভাবে অগ্রসর হওয়ার সময় একদিন তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে একটি প্রাচীরবেষ্টিত দুর্গের সম্মুখীন হন এবং সঙ্গে সঙ্গে তরবারি পরিচালনা করেন। কিন্তু প্রতিপক্ষ হতে তিনি কোন বাধাই পেলেন না। বিনা প্রতিরোধে ওদন্তপুরী বিহার জয় করে নেন। এভাবে প্রতিরোধহীনতা এবং কুতুবউদ্দিন আইবক কর্তৃক পুরস্কার লাভ উচ্চাভিলাষী বখতিয়ার খলজীর রাজ্য বিস্তারের স্পৃহা ক্রমশঃ বাড়িয়ে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে তিনি নদীয়া আক্রমণ করেন এবং বিনা যুদ্ধেই নদীয়া জয় করে লখনৌতিতে রাজধানী স্থাপনের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

তাছাড়া বখতিয়ার খলজীর কৌশলগত নীতি বাংলা জয়কে অনেক সহজ করে দেয়। পশ্চিম দিক হতে বাংলায় প্রবেশের স্বাভাবিক পথ ছিল রাজমহলের নিকটবর্তী তেলিয়াগড়ি গিরিপথ। তেলিয়াগড়ির দক্ষিণে বাংলার পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। এই জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চল ‘ঝাড়খন্ড’ নামে অভিহিত। তেলিয়াগড়ির উত্তর-পশ্চিমে ছিল খরস্রোতা নদী। সুতরাং তেলিয়াগড়ি জয় করতে না পারলে পশ্চিম দিক হতে কোন আক্রমণকারীর পক্ষে বাংলায় প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না। খুব সম্ভব রাজা লক্ষণসেন তেলিয়াগড়ি গিরিপথ রক্ষা করার ব্যবস্থা করেন।

কিন্তু বখতিয়ার খলজী শুধু দুর্ধর্ষ বীরই ছিলেন না, তিনি একজন কৌশলী সমরবিদও ছিলেন। তিনি তেলিয়াগড়ির ধার দিয়েও গেলেন না, বরং গোপনে প্রস্তুতি নিয়ে ‘ঝাড়খন্ড’ বা দুর্গম জঙ্গলের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হলেন। যেহেতু দুর্গম অঞ্চলের ভিতর দিয়ে বিরাট সৈন্যবাহিনীসহ একসঙ্গে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়, সেহেতু তিনি নিজ সৈন্যবাহিনীকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত করেন এবং তিনি নিজে এরূপ একটি ক্ষুদ্র দলের প্রথমটির নেতৃত্ব দেন।

ফলে তিনি যখন নদীয়া পৌঁছেন, তখন কেউ ভাবতেও পারেননি যে, তুর্কি বীর বখতিয়ার খলজী নদীয়া জয় করতে এসেছেন। এবং সকলেই মনে করে যে, তাঁরা ঘোড়া ব্যবসায়ী এবং রাজা লক্ষণসেনের দরবারে ঘোড়া বিক্রি করতে এসেছেন। কিন্তু যখন রাজা লক্ষণসেন বুঝতে পারেন যে, বখতিয়ার খলজী আক্রমণকারী মুসলিম সৈন্যবাহিনীর নায়ক তখন লক্ষণসেন রাজধানী বিক্রমপুরে পলায়ন করেন। প্রায় বিনা প্রতিরোধে খুব সহজেই বখতিয়ার খলজী নদীয়া জয় করে বাংলায় মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

তিব্বত অভিযান

বখতিয়ার খলজীর জীবনের শেষ কাজ তিব্বত অভিযান। হয়তোবা বখতিয়ার খলজী তুর্কিস্থানের সঙ্গে সোজা যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই তিব্বত আক্রমণ করেছিলেন। কিন্তু বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠাতা দুর্দম্য সাহসী তুর্কি বীরের তিব্বত অভিযান বিফল হয়। প্রকৃতপক্ষে, তিব্বত পর্যন্ত তিনি যেতে পারেননি বলে মনে হয়। তবে তিনি খুব সতর্কতার সাথে তিব্বত অভিযানের পরিকল্পনা করেন এবং লখনৌতি হতে তিব্বত পর্যন্ত রাস্তার সংবাদ সংগ্রহ করেন। সকল প্রস্তুতির পর বখতিয়ার খলজী দশ হাজার সৈন্যসহ লখনৌতি হতে তিব্বতের দিকে রওয়ানা হন। উত্তর-পূর্ব দিকে কয়েকদিন চলার পর বর্ধনকোট শহরের পূর্বদিকে ‘বেগমতী’ নামক নদী অতিক্রম না করে বখতিয়ার খলজী উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।

এভাবে ১৫ দিন চলার পর একটি শস্যশ্যামলা স্থানে একটি দুর্গ দেখতে পান। বখতিয়ার খলজী তাঁর সৈন্যদের নিয়ে সেখানে পৌঁছালে দুর্গের সৈন্যরা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার জনসাধারণ মুসলমানদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। সমস্ত দিন ধরে যুদ্ধ হয় এবং যুদ্ধে বখতিয়ার খলজী জয়লাভ করলেও প্রকৃতপক্ষে তাঁর পক্ষের অনেক সৈন্য যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করে। রাতে বন্দি শত্রুসৈন্যরা তাঁকে জানায় যে মাত্র কয়েক মাইল দূরে করমবত্তন নামে একটি শহর আছে, সেখানে কয়েক লক্ষ সৈন্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।

বখতিয়ার খলজী তখন লখনৌতি প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে পুনরায় যাত্রা শুরু করেন, কিন্তু ১৫ দিনের রাস্তায় তাঁর সৈন্যবাহিনী বা ঘোড়া কোনরূপ খাবার সংগ্রহ করতে পারেনি, কারণ পার্বত্য এলাকার লোকেরা পথের সকল শস্য বা ঘোড়ার খাদ্য পূর্বেই নষ্ট করে ফেলে। ফলে, অনেকে খাদ্যের অভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ইতোমধ্যে লখনৌতি ফেরার পথে উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশের পার্বত্য লোকেরা চারিদিক হতে তাঁদেরকে আক্রমণ করে।

এমতাবস্থায় তাঁরা নিকটস্থ একটি মন্দিরে আশ্রয় নিলে সেখানেও তাঁরা শত্রুদের হাত হতে নিস্তার পেলেন না এবং শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে দেবকোটে ফিরে আসেন। বখতিয়ার খলজী দেবকোটে অবস্থানকালে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। বিপুল সৈন্যবাহিনী ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় শোকে এবং ব্যর্থতার গ্লানিতে বখতিয়ার খলজী ভেঙ্গে পড়েন। এভাবে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন এবং ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে পরলোক গমন করেন।

বখতিয়ার খলজীর ব্যর্থ তিব্বত অভিযানে বিশাল বাহিনী ধ্বংস হওয়ায় বাংলায় মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি সাময়িকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়। পার্শ্ববর্তী হিন্দু রাজ্যগুলো এ সুযোগে শক্তি বৃদ্ধির সময় পায় । অপরপক্ষে লখনৌতির মুসলমান সেনানায়কদের মধ্যেও অন্তর্বিরোধ দেখা দেয়। পরবর্তীকালে দিল্লির সাথে বিরোধে লখনৌতির মুসলমানেরা সংঘবদ্ধভাবে বাধা দিতে পারেনি। ফলে দিল্লির মুসলিম সুলতান বাংলায় ক্ষমতা বিস্তারের সুযোগ পায় ।

খলজী মালিকদের অধীনে বাংলা

মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজীর মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই লখনৌতির মুসলমান রাজ্যে বিশৃক্মখলা দেখা দেয়। বখতিয়ার খলজীর মৃত্যু সংবাদ শুনে তাঁর অন্যতম প্রধান অমাত্য মুহাম্মদ শীরাণ খলজী লখনৌতির হতে তাড়াতাড়ি দেবকোটে ফিরে আসেন। অতঃপর দেবকোটে উপস্থিত খলজী আমীর এবং সৈনিকবৃন্দ তাঁকে নেতা নির্বাচিত করেন এবং তিনি লখনৌতির শাসনভার গ্রহণ করেন। তিনি সম্ভবত এক বৎসরকাল (১২০৭-১২০৮ খ্রিঃ) শাসন করেন। দিল্লির সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবককে বখতিয়ার খলজীর অপর প্রধান অমাত্য আলী মর্দান খলজী প্ররোচিত করেন লখনৌতি আক্রমণ করার জন্য।

কুতুবউদ্দিনও হয়তো সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি অযোধ্যার শাসনকর্তা কায়েমাজ রুমীকে লখনৌতি অভিযানে পাঠান এবং লখনৌতির খলজী মালিকদের বিরোধ মীমাংসা করতে আদেশ দেন। কায়েমাজ রুমী ১২০৭ খ্রিস্টাব্দে লখনৌতির দিকে সসৈন্যে অগ্রসর হন এবং বিনা যুদ্ধেই দেবকোট অধিকার করেন এবং হুসামউদ্দিন ইওয়াজ খলজীকে দেবকোটের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে অযোধ্যার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। যুদ্ধে শীরাণ খলজী পরাজিত হয়ে মাযেদা ও সন্তোষের (বগুড়া ও দিনাজপুর) দিকে পলায়ন করেন। এভাবেই মুহাম্মদ শীরাণ খলজীর শাসনকাল শেষ হয়।

হুসামউদ্দিন ইওয়াজ খলজী দিল্লির অধীনস্থ শাসনকর্তা হিসেবে লখনৌতির মুসলিম রাজ্য শাসন করতে থাকেন অর্থাৎ লখনৌতি দিল্লির অধীনস্থ একটি প্রদেশে পরিণত হয়। ইওয়াজ খলজী এই পদে প্রায় ২ বছর (১২০৮-১০ খ্রি:) পর্যন্ত বহাল ছিলেন। কিন্তু এরপর আলী মর্দান খলজী আবার লখনৌতিতে ফিরে আসেন। ইতোমধ্যে আলী মর্দান খলজী দিল্লির সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবকের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবক আলী মর্দানকে লাহোরে সাদরে গ্রহণ করেন এবং বন্ধুত্বের পুরস্কারস্বরূপ তাঁকে লখনৌতির শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। আলী মর্দান খলজী বিরাট সৈন্যবাহিনীসহ লখনৌতির দিকে যাত্রা করেন।

আলী মর্দান খলজী কুতুবউদ্দিন আইবক কর্তৃক নিযুক্ত হওয়ায় আইবকের বিরুদ্ধাচরণ করা উচিত হবে না বুঝতে পেরে ইওয়াজ খলজী কুশী নদী পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে আলী মর্দান খলজীকে অভ্যর্থনা জানালেন। তিনি স্বেচ্ছায় আলী মর্দানের হাতে শাসনভার ছেড়ে সরে দাঁড়ালেন। আলী মর্দানের শাসনভার গ্রহণ করার অল্পদিন পর লাহোরে সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবকের মৃত্যু হয়। এই সুযোগে আলী মর্দান খলজী সুলতান আলাউদ্দিন উপাধি ধারণ করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেই হিসেবে সুলতান আলাউদ্দিন আলী মর্দান বাংলার প্রথম মুসলমান স্বাধীন সুলতান। কিন্তু স্বাধীনতা ঘোষণার পর তিনি যথেচ্ছ ব্যবহার করতে থাকেন।

লখনৌতির খলজী আমীরদের প্রতিও তিনি অত্যাচার ও উৎপীড়ন আরম্ভ করেন। খলজী আমীরেরা তাঁর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে হুসামউদ্দিন ইওয়াজ খলজীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং গোপনে সুলতান আলাউদ্দিন আলী মর্দানকে সম্ভবত ১২১২ খ্রিস্টাব্দে হত্যা করেন। অতঃপর হুসামউদ্দিন ইওয়াজ খলজী সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজী উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন।

গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজী

সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজী নি:সন্দেহে খলজী মালিকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। তিনি আফগানিস্তানের গরমশিরের অধিবাসী ছিলেন। কালক্রমে তিনি মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজীর সৈন্যদলে যোগ দেন এবং নিজ বুদ্ধি, সাহস ও চরিত্রের বলে লখনৌতির মুসলিম রাজ্যের শাসকে পরিণত হন। লখনৌতির মুসলিম রাজ্যকে তিনি শক্তিশালী এবং সংঘবদ্ধ করেন।

এই উদ্দেশ্যে তিনি দেবকোট থেকে রাজধানী আবার লখনৌতিতে স্থানান্তর করেন এবং রাজধানীর প্রতি রক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার জন্য বসনকোর্ট নামে একটি দুর্গ তৈরি করেন। লখনৌতি নদী তীরে অবস্থিত হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য উপযুক্ত ছিল।

তাছাড়া ইওয়াজ খলজী বুঝতে পারেন যে, নদীমাতৃক পূর্ব বাংলাকে জয় করতে হলে এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাকে শাসনাধীনে রাখতে হলে নৌবহরের প্রয়োজন; ফলে রাজধানী নদীর সন্নিকটে হলে নৌবাহিনী গড়ে তুলতে সুবিধা হবে। এতদিন তুর্কিরা অশ্বারোহী সৈন্যদের উপর নির্ভরশীল ছিল এবং এই কারণে তারা নদীমাতৃক পূর্ব বাংলা দখল করতে সমর্থ হয়নি। এসব দিক বিবেচনা করে বাংলার মুসলিম শাসকদের মধ্যে ইওয়াজ খলজিই প্রথম নৌবাহিনীর গোড়াপত্তন করেন এবং বাঙালি নাবিকদের সাহায্যে যুদ্ধ জাহাজ চালাবার ব্যবস্থা করেন। এই নৌবাহিনীর দ্বারা তিনি একদিকে যেমন রাজধানী লখনৌতির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করেন, অন্যদিকে পূর্ব বাংলা জয়েরও পরিকল্পনা করেন।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজী নিঃসন্দেহে একজন সুশাসক ছিলেন। তিনি ন্যায় বিচারক ও প্রজাহিতৈষী ছিলেন। সুলতান আলাউদ্দিন আলী মর্দানের সময় খলজী আমীর ও অন্যান্য প্রজাসাধারণ যে দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করেছিল তিনি তা দূর করেন এবং লখনৌতির সকল অধিবাসীকে একতাবদ্ধ করেন। এভাবে লখনৌতিতে শান্তি স্থাপন করার পর তিনি রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন।

তিনি উড়িষ্যা, কামরূপ, ত্রিহুত এবং পূর্ব-বাংলায় অভিযান পরিচালনা করেন এবং এসব রাজ্যের রাজারা তাঁর নিকট কর পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলেন। বখতিয়ার খলজীর মৃত্যুর পর লখনৌতির খলজী আমীরদের মধ্যে অর্ন্তবিরোধের সুযোগ নিয়ে উড়িষ্যার সেনাপতি বিষ্ণু লখনৌতির অধিকার করেন। ইওয়াজ খলজী লখনৌতির পুরদখল করে, উড়িষ্যার রাজাদের কর প্রদানের মাধ্যমে তাঁর বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন।

ইওয়াজ খলজী করতোয়া নদীর পূর্বদিকে কামরূপ রাজ্যে অভিযান চালান এবং সেখানকার সামন্ত শাসকদের অন্তর্বিরোধের অবসান ঘটিয়ে তাদের কাউকে কাউকে করদানে বাধ্য করেন। লখনৌতির পূর্বদিকে অবস্থিত, বিহুতের অর্ন্তবিরোধের সুযোগ নিয়ে ইওয়াজ খলজী ত্রিহুত আক্রমণ করেন এবং মুসলিম শাসনের অধীনে আনেন। ১২২৬-২৭ খ্রিস্টাব্দ পূর্বে ইওয়াজ খলজী পূর্ববঙ্গ আক্রমণ করেন। লক্ষণসেনের পুত্র বিশ্বরূপ সেন ঐ সময়ে বিক্রমপুরে রাজত্ব করতেন এবং ইওয়াজ খলজী পূর্ববাংলা আক্রমণ করে কিছু কিছু এলাকায় স্বীয় আধিপত্য বিস্তার করেন ।

বখতিয়ার খলজীর পরে সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজীই সর্বপ্রথম রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন এবং তিনি উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব এবং পশ্চিম সবদিকেই স্বীয় রাজ্যের সীমা বর্ধিত করেন। তিনিই সর্বপ্রথম লখনৌতির মুসলিম রাজ্যকে বাংলার মুসলিম রাজ্যে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেন। দিল্লির সুলতান শামসউদ্দিন ইলতুৎমিশ তাঁকে বাধা না দিলে হয়তো স্বপ্ন সফল হতো।

দিল্লির সুলতানেরা বাংলাকে সর্বদা সন্দেহের চোখে দেখতো। ইওয়াজ বাংলায় নিজ নামে মুদ্রা প্রচলন করে স্বাধীনভাবে শাসন করছিলেন। ইওয়াজ খলজীর স্বাধীনতাকে দিল্লির সুলতান ইলতুৎমিশ সুনজরে দেখেননি । আনুমানিক ১২২৫ খ্রিস্টাব্দ সুলতান ইলতুৎমিশ ইওয়াজ খলজীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করেন। যুদ্ধে পরাজিত ইওয়াজ খলজী ইলতুৎমিশের অধীনতা স্বীকার করেন।

কিন্তু ইলতুৎমিশের দিল্লি প্রত্যাবর্তনের পর বিহারে তাঁর নিযুক্ত মালিক আলাউদ্দিন জানীকে ইওয়াজ খলজী বিহার হতে তাড়িয়ে দেন, ফলে ইলতুৎমিশ তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র নাসিরউদ্দিন মাহমুদকে বিশাল সৈন্যবাহিনীসহ লখনৌতিতে প্রেরণ করেন এবং যুদ্ধে ইওয়াজ খলজী পরাজিত হন। অতঃপর তিনি বন্দি হন এবং পরে তাঁকে হত্যা করা হয়। এভাবে ইওয়াজ খলজীর পরিসমাপ্তি ঘটে এবং বাংলার মুসলিম রাজ্য আবার দিল্লির অধীনে চলে যায়।

বাংলার মুসলমান শাসকদের মধ্যে সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজীই সর্বপ্রথম মুসলিম সুলতান যার মুদ্রা অধিক পরিমাণে আবিষ্কৃত হয়েছে। ইওয়াজ খলজী সামরিক কারণে এবং প্রজাসাধারণের মঙ্গলের জন্য রাজধানী লখনৌতির সাথে উত্তরে দেবকোট এবং দক্ষিণে লখনৌতির অর্থাৎ দুই সীমান্ত শহরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে একটি দীর্ঘ রাজপথ নির্মাণ করেন।

ফলে, যুদ্ধের সময় সৈন্য চলাচলের যেমন সুবিধা হয়, তেমনি যোগাযোগ ব্যবস্থাও উন্নত হয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা হয়। স্থানে স্থানে বাধ দিয়ে তিনি কৃষকদেরকেও বন্যার কবল হতে রক্ষা করেন। তিনি মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ্ তৈরি করেন। সুতরাং বলা যায় যে, ইওয়াজ খলজী বাংলার খলজী শাসকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং সর্বাপেক্ষা সুশাসক ছিলেন।

তাঁর প্রচেষ্টায় বাংলার মুসলমান রাজ্য দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। বখতিয়ার বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রবর্তন করেছিলেন বটে, কিন্তু ইওয়াজ খলজীই মুসলিম শাসনের সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন। বাংলায় মুসলিম রাজ্যের স্থায়ীত্বে তাঁর অবদান অবশ্য স্বীকার করতে হবে। নৌবহর গড়ে তুলে তিনিই দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় মুসলিম সম্প্রসারণের পথ সুগম করেন ।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের বাংলা অভিযান

১২২৭ খ্রিস্টাব্দ সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজীর পরাজয় ও মৃত্যুর পর বাংলার মুসলিম রাজ্য দিল্লির মুসলিম সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পর দিল্লির দুর্বল শাসনের সুযোগে বাংলায় মুসলমান শাসনকর্তারা একাধিকবার বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করেন। ১২৬৬ খ্রিস্টাব্দ সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন দিল্লির সিংহাসন আরোহণ করে লখনৌতির বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করেন। বলবন জানতেন যে, বাংলা সর্বদা বিদ্রোহ করে। সুতরাং তিনি আমীন খানকে লখনৌতির শাসনকর্তা এবং তুঘ্রিল খান সহকারি গভর্নর নিযুক্ত করেন- যাতে একে অপরের বিদ্রোহাত্মক কাজে বাধা দিতে পারে এবং দৈনন্দিন ঘটনা সুলতানের গোচরে আনতে পারে।

কিন্তু তুঘ্রিল খান অল্পদিনের মধ্যে শক্তি সঞ্চয় করে তাঁর উপরিস্থ গভর্নর আমীন খানকে বহিষ্কার করেন এবং লখনৌতির রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি করার দিকে মনোযোগ দেন। তিনি উড়িষ্যা আক্রমণ করেন এবং বিপুল ধনরত্ন ও হাতি হস্তগত করার পর তুঘ্রিল খানের মনে স্বাধীন হবার সাধ জাগে।

 

 

বখতিয়ার খলজী ও বাংলায় প্রাথমিক মুসলিম সাম্রাজ্য

 

সার সংক্ষেপ

হিন্দু-বৌদ্ধ শাসনের অবসানের পর মুসলিম শাসকদের আগমন বাংলার সমাজ সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন বয়ে আনে। বাংলায় প্রাথমিক মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার কালে বখতিয়ার খলজী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নিজের দৃঢ়তা, অভিযানে ঝাড়খন্ড অঞ্চল ব্যবহার এবং ঝটিকা আক্রমণ বখতিয়ারের সহজ সাফল্যের কারণ।

খলজী মালিকদের অধীনে (আলী মর্দান খলজী, শীরান খলজী) বাংলায় মুসলমান শাসন অব্যাহত থাকে। এরপর ইওয়াজ খলজী লখনৌতির মুসলিম রাজ্যকে বাংলার মুসলিম রাজ্যে পরিণত করতে শুন্ডু করেন। মুসলমান শাসকদের মধ্যে তিনিই প্রথম বাংলায় নৌবাহিনীর পত্তন করেন। তাঁর আমলের অনেক মুদ্রা পাওয়া গেছে। ইওয়াজ দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় মুসলিম সম্প্রসারণের পথ সুগম করেন। ইওয়াজের মৃত্যুর পর দিল্লির সুলতান বলবন বাংলা অভিযান পরিচালনা করেন। এসময় বুঘরা খান লখনৌতির শাসনকর্তা নিযুক্ত হন এবং বাংলা দিল্লির শাসনাধীনে আসে।

Leave a Comment