আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ রাজশাহী,রংপুর,হিলি এবং বগুড়া সেক্টর। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
রাজশাহী,রংপুর,হিলি এবং বগুড়া সেক্টর

রাজশাহী,রংপুর,হিলি এবং বগুড়া সেক্টর
আমাদের কাছে রাজশাহী, রংপুর, হিলি এবং বগুড়া সেকটর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই সেক্টরের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে ছিল ১৬তম ডিভিশন, যার সদর দপ্তর ছিল নাটোরে। ২৩তম, ১০৭তম ও ২০৫তম ব্রিগেড নিয়ে গঠিত এই ডিভিশনের কমান্ডার ছিলেন মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহ। ব্রিগেডিয়ার সাঈদ আখতার আনসারীর নেতৃত্বাধীন ২৩তম ব্রিগেড দিনাজপুর-রংপুরের প্রতিরক্ষার জন্য দায়ী ছিল। পরে অদক্ষতার জন্য আনসারীকে ২৩তম ব্রিগেডের কমান্ড থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ডিভিশনাল কমান্ডার তার সামরিক অপারেশন পরিচালনায় পুরোপুরি অসন্তুষ্ট ছিলেন। তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় ঢাকার লজিস্টিক এরিয়া কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার শফিকে। ব্রিগেডিয়ার তাজামুল হুসেইন ২০৫তম ব্রিগেড কমান্ড করতেন, যিনি হিলির প্রতিরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন।
শত্রুর ক্ষতিসাধন করার পর তাকে পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বগুড়ায় প্রত্যাহার করা হয়। থার্ড ব্রিগেড ১০৭তম এর নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার নাঈম। এই ব্রিগেড অভ্যন্তরে মোতায়েন ছিল এবং পানিটোলা, নবাবগঞ্জ ও ঈশ্বরদীতে এই ব্রিগেডের এক ব্যাটালিয়ন করে সৈন্য মোতায়েন ছিল।
মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহের বিপরীতে ছিলেন ভারতের ৩৩তম কোর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল থাপন। তার কমান্ডের অধীনে ছিল ২০ মাউন্টেন ডিভিশন, ৬ মাউন্টেন ডিভিশন, ৩৪০(১)তম ব্রিগেড গ্রুপ, ৪৭১তম ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেড, ৩৩তম আর্টিলারি ব্রিগেড, ৬৪তম ক্যাভালরি (পিটি-৭৬) ও ৭২ সাঁজোয়া রেজিমেন্ট (টি-৫৫)।
এ ছাড়া তার অধীনে মুক্তিবাহিনীর একটি ব্রিগেড এবং কয়েক ব্যাটালিয়ন বিএসএফ ছিল। ৬ষ্ঠ মাউন্টেন ডিভিশন আমাদের ২৩তম বিগেডের এলাকায় অগ্রসর হয় ১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর। ভারতীয়রা রংপুরের উত্তরে লালমনিরহাট দখলের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়।
তবে তাদের প্রতিটি প্রয়াস অত্যন্ত সফলভাবে প্রতিহত করা হয়। ২৫শে নভেম্বর তাদের হামলা নস্যাৎ করে দেওয়া হয়। ভারতীয় বিমান বাহিনী উত্তর-পশ্চিমে তিস্তা সেতু ধ্বংস করে দেয়। এই সেতুটি ছিল রংপুর অভিমুখি প্রধান সড়কের ওপর।
আমাদের সৈন্যরা ধীর-স্থিরভাবে লড়াই করে। এতে অগ্রগামী শত্রু বাহিনীর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। আমাদের সৈনারা পরিকল্পনা অনুযায়ী পেছনে হটে আসে এবং রংপুর দুর্গ দখল করে। শত্রুর অগ্রযাত্রা থেমে যায় এবং তাদের প্রথম পদক্ষেপ চূর্ণ হয়ে যায়। প্রাণান্ত চেষ্টা করেও শত্রুরা অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি এবং শেষ দিন পর্যন্ত তারা আমাদের অবস্থান ঘেরাও করতে পারে নি।
ভারতের ৭১তম ব্রিগেড দিনাজপুরের দিকে এগোয়। তবে বীরগঞ্জে তাদের অথযাত্রা থামিয়ে দেওয়া হয়। কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধনে ব্যর্থ হয়ে শত্রু দিনাজপুর ও অন্যান্য অবস্থানের মাঝে সড়ক অবরোধের প্রচেষ্টা চালায়। আমাদের সরবরাহ লাইন উন্মুক্ত থাকায় এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর ভারতীয়রা আমাদের অবস্থান ঘেরাও করার লক্ষ্যে দিনাজপুরের দক্ষিণে ৯ম মাউন্টেন ব্রিগেডকে নিয়োজিত করে।
এ উদ্যোগ কোনো স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয় এবং আমাদের অবস্থানগুলো অক্ষত থেকে যায়। প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত সৈন্যদের মনোবল তখনো উঁচু ছিল। ব্রিগেডিয়ার শফি স্থানীয় সম্পদের উপযুক্ত ব্যবহার এবং রণক্ষেত্রের সুবিধা কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তার ব্রিগেডকে পরিচালনা করেন।
তিনি ভারতীয় সৈন্যদেরকে তার প্রতিরক্ষা ব্যূহের সামনে যুদ্ধে লিপ্ত রাখেন এবং লড়াই শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে সেখানেই আটকে রাখেন। ব্রিগেডিয়ার শফিকে আমিই ২৩তম ব্রিগেডের কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত করেছিলাম । এ ব্রিগেডের দায়িত্ব ছিল দিনাজপুর-রংপুর ধরে রাখা এবং ভারতীয় সৈন্যদেরকে সামনে অগ্রসর হতে না দেওয়া।
ব্রিগেডিয়ার আনসারী যেসময় ২৩তম ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন সে সময় প্রাথমিক সাফল্যে ভারতীয়রা দুঃসাহসী হয়ে ওঠে। ভারতীয় নেতৃত্ব ভেবেছিল যে, এই সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতায় বিএসএফ পাকিস্তানি সৈন্যদের মোকাবেলা করতে পারবে। তাই তারা ৬ষ্ঠ ডিভিশনকে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মোতায়েনের সিন্ধান্ত নেয়। ব্রিগেডিয়ার শফি কমান্ড গ্রহণ করার সাথে সাথে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। তাদের আক্রমণাত্মক অবস্থান আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে রূপ নেয়।
ব্রিগেডিয়ার শক্তি শত্রুর যোগাযোগ ব্যবস্থা, অস্ত্র মজুদ ও তাদের সদর দপ্তরে দুঃসাহসী হামলা চালান এবং শত্রুর অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেন। অগ্রগতি না হওয়ায় ভারতীয়রা ৬ষ্ঠ ডিভিশন স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত বাতিল করে। পাকিস্তানি সৈন্যদের অদম্য স্পৃহার সামনে মাথানত করতে বাধ্য হয় ভারতীয় সৈন্যরা। ভারতীয় সৈন্যরাই যেখানে পাকিস্তানি সৈনাদের মোকাবেলা করতে পারে নি সেখানে বিএসএফ ও মুক্তিবাহিনীর মোকাবেলা করার প্রশ্নই আসে না।
২৩তম ব্রিগেডকে অনেক কঠিন কাজ করতে হয়েছে। একদিকে তাদেরকে যুদ্ধ করতে হয়েছে এবং অন্যদিকে অনুগত পাকিস্তনিদেরও রক্ষা করতে হয়েছে। বিদ্রোহিরা সংখ্যালঘু বিহারিদের হত্যা করতে শুরু করে। তাই এসব নিরীহ লোকজনকে রক্ষার দায়িত্ব এ ব্রিগেডের ওপর ন্যস্ত হয়। এ ব্রিগেডকে হিলির দক্ষিণে ২০৫তম বিগ্রেডের উভয় পার্শ্ব রক্ষার এবং বগুড়া ও ঢাকা অভিমুখি সড়ক অবরোধে ব্যবহার করা হচ্ছিল। হিলিতে তখন চলছিল প্রচণ্ড লড়াই।
তাই আমি ২৩তম ব্রিগেডকে দিনাজপুর-রংপুর সেক্টর থেকে প্রত্যাহার করে হিলির দক্ষিণে মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সের সরাসরি নির্দেশে (৫ই ডিসেম্বর প্রেরিত সংকেত) আমাকে এ সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হয়।
ভারতের ৬ষ্ঠ মাউন্টেইন ডিভিশনকে এখানে ব্যস্ত রাখার জন্যই এ নির্দেশ দেওয়া হয়। নয়তো এ ডিভিশনকে পশ্চিম রণাঙ্গনে স্থানান্তর করা হতো। পশ্চিম রণাঙ্গনের অনুকূল পরিস্থিতিতে ব্যাঘাত সৃষ্টি না করার জন্য আমরা এই নির্দেশ মেনে নিই। পশ্চিমে পাকিস্তানি অভিযানের সাফল্যের স্বার্থে আমি আমার কৌশলগত পরিকল্পনা উৎসর্গ করি।
২০৫তম ব্রিগেড গ্রুপের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার তাজাম্মুল হুসেইন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে হিলির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তিনি নোয়াপাড়া রেললাইন, বাসুনপুরা চেকপোস্ট ও রেলওয়ে স্টেশনে পর্যবেক্ষণ চৌকি প্রতিষ্ঠা করেন। পূর্ব পাকিস্তান অভিমুখি সকল পথ রক্ষায় অভ্যন্তরেও কয়েকটি সুরক্ষিত অবস্থান গড়ে তোলা হয়।
৪র্থ এফএফ ও ১৩তম এফএফ ব্যাটেলিয়নের জওয়ানরা এসব অবস্থান। অত্যন্ত কার্যকরভাবে রক্ষা করছিল। একটি ফিল্ড রেজিমেন্ট, একটি মর্টার ব্যাটারি, এক স্কোয়াড্রন ট্যাংক এবং পর্যবেক্ষণ গ্রুপের সদস্য ও একটি সাপোর্ট ব্যাটালিয়নও সহায়তা দিচ্ছিল। এ আত্মরক্ষামূলক অবস্থানের গভীরতা ছিল ২ হাজার ৫০০ গজ।
হিলির যুদ্ধ ছিল ১৯৭১ এর সর্বোত্তম যুদ্ধ। সাহসী পাকিস্তানি সৈন্যরা ভারতের ৩৩তম কোরের অধিকাংশ সৈন্যকে এখানে আটকে রাখে, ভারতের এ কোরকে ট্যাংক এবং জঙ্গি বিমান সহায়তা দিচ্ছিল। হিলি এলাকাটি হচ্ছে সমস্তল, অনেকটা পাঞ্জাবের মতো।
মাটি শক্ত। এতে সৈন্য এবং ভারি সামরিক যানবাহন চলাচল সহজতর। ব্রিগেডিয়ার তাজাম্বুল হুসাইনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভারতের অনবরত ও উপর্যুপরি হামলার বিরুদ্ধে অজেয় বলে প্রমাণিত হয়। তার অবস্থান পাশ কাটিয়ে যাবার ভারতীয় প্রচেষ্টা নিষ্ফল হয়। ভারতীয়রা আমাদের অবস্থান দখল করার জন্য একেকবার একেকটি কৌশল অবলম্বন করতে থাকে, কিন্তু তাদের প্রতিটি কৌশলই বার্থ হয় ।
ভারতের ২০তম মাউন্টেন ডিভিশনকে মোতায়েন করা হয় বালুরঘাটে। এটি আমাদের অবস্থানে হামলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। মুক্তিবাহিনী আমাদের প্রতিটি অবস্থানের বিস্তারিত বিবরণ ভারতীয়দের সরবরাহ করে। অস্ত্রের অবস্থানগুলোও চিহ্নিত করা হয়।
হিলি হচ্ছে হিলি-গাইবান্ধা মেরুর প্রবেশদ্বার- এখান থেকেই বগুড়া ও ঢাকা অভিমুখী সড়ক এগিয়ে গেছে। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় মুক্তিবাহিনী হিলিতে উপর্যুপরি হামলা চালাতে থাকে। তবে তাদের প্রতিটি হামলাই ব্যর্থ হয়েছে।
হিলি একটি দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা দুর্গে পরিণত হয়। আশপাশের গ্রামগুলোকেও এ দুর্গের আওতায় নিয়ে আসা হয়। খাল, পুকুর ও জলাভূমিগুলোর পূর্ণ ব্যবহার করা হয়। শত্রু পক্ষের ওপর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ ও তাদের গোলাবর্ষণ প্রতিহত করার জন্য সুরক্ষিত টেঞ্চ খনন করা হয়। একটির সাথে আরেকটি ট্রেনের আন্তঃযোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ট্রেঞ্চগুলোয় মাঝারি মেশিন গান ও ব্রিকয়েললেস রাইফেল বসানো হয়।
এলাকা থেকে মুক্তিবাহিনীর বেশ কয়েকটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ২৪ নভেম্বর ভারতীয়রা এক ব্যাটালিয়ন সৈন্য নিয়ে দক্ষিণ দিক থেকে মোরাপাড়া এ হামলা করে। শত্রুরা আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে আসা মাত্র আমাদের সুরক্ষিত অবস্থানগুলো থেকে একযোগে সবগুলো মেশিনগান গর্জে ওঠে। আমাদের মেশিনগান, আর্টিলারি ও মর্টারের গোলাবর্ষণ এবং জলাভূমি ও কাঁটাতারের বাধার মুখে তাদের এগিয়ে আসার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়।
ভারতীয়রা বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং তাদের ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। শত্রুদের মাত্র কয়েক প্লাটুন সৈন্য গ্রামের দক্ষিণপ্রান্তে পৌঁছতে সক্ষম হয়। সে গ্রামে হাতাহাতি লড়াই হয়। আরো কয়েক ব্যাটালিয়ন ভারতীয় সৈন্য এ গ্রামের উত্তর-পূর্ব দিক থেকে এগিয়ে আসে। সৈন্যদের দৃঢ়তা ও সাহসিকতার মুখে শত্রুরা এ গ্রাম থেকে সাতে যেতে বাধ্য হয় এবং এভাবে এখানে ভারতীয় হামলা ব্যর্থ হয়।
ভারতীয়রা এক ব্রিগেড সৈন্য নিয়ে হিলিতে হামলা করেছে বলে যে দাবি করেছে তা অযৌক্তিক। এটা হচ্ছে তাদের অভিযানের ব্যর্থতা আড়াল করার একটি ঘৃণা প্রচেষ্টা। তারা যদি শুধু এক ব্রিগেড সৈন্য ব্যবহার করে থাকে, তাহলে তাদের ২০তম ডিভিশনের অন্যান্য ব্রিগেডগুলো হিলির আশপাশে ১০ দিন কী করে কাটিয়েছে? একটি পাকিস্তানি ব্রিগেড ভারতের একটি ডিভিশনকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। ভারতের এই ডিভিশন গোলন্দাজ বাহিনী এবং অঙ্গিবিমানের ছত্রছায়া নিয়েও মার খেয়েছে।
২০তম মাউন্টেন ডিভিশনে ছিল ৫টি পদাতিক ব্রিগেড, একটি ট্যাংক ব্রিগেড, প্রায় অর্ধ ডজন বিএসএফ ব্যাটালিয়ন ও মুক্তিবাহিনী। এ ছাড়া এই ডিভিশনকে ডিভিশনাল ও কোর আর্টিলারিও সমর্থন দিয়েছে। আকাশে ছিল। ভারতীয়দের পূর্ণ কর্তৃত্ব।
কোনো পাকিস্তানি বিমান ভারতীয়দের চ্যালেঞ্জ করতে পারে নি। অন্যদিকে, প্রতিদিন অন্তত কয়েকবার আমাদের অবস্থানে ভারতের বিমান হামলা হয়েছে। ভারতীয় জেনারেল সুখবন্ত সিং স্বীকার করেছেন যে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল থাপনের নেতৃত্বাধীন ৫টি ব্রিগেড হিলি দুর্গ অবরোধে অংশগ্রহণ করেছিল।
ভারতীয়রা তাদের প্রথম হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়।৪ জন অফিসার মারা যায় এবং ৩ জন আহত হয়। এ ছাড়া দুই জন নন-কমিশন্ড অফিসার ও ৬১ জন অন্য ব্যাংকের সৈন্য মারা যায় এবং ৮৫ জন আহত হয় ।
বালুরঘাটের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয়রা কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারে নি। মুক্তিবাহিনী ও স্থানীয় জনগণ শত্রু কমান্ডারকে হিলিতে পাকিস্তানি সৈন্য, তাদের অস্ত্রশস্ত্র, অবস্থান ও চলাচল সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করেছিল।
সমগ্র বাংলাদেশে হিলিই হচ্ছে একমাত্র দুর্গ যেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানি সৈন্যদের অবস্থান চূর্ণ করে দেওয়ার জন্য মরণপণ লড়াই করেছে। এখানে পাকিস্তানি দুর্গে ভারতীয় হামলা নিষ্ফল বলে প্রমাণিত হয়। ভারতীয়দের পূর্বেকার কৌশল ছিল পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া। কিন্তু হিলি অপারেশনে ব্যর্থতার পর তারা তাদের এ কৌশল পরিবর্তন করেন। এরপর ভারতীয়রা পাকিস্তানি অবস্থানে হামলা করার পরিবর্তে পাকিস্তানি অবস্থান এড়িয়ে যেতে থাকে।
আল-আমিনীয় ধারণা যা এতোদিন পুরনো প্রজন্মের জেনারেলদের মগজে বদ্ধমূল ছিল, তার পরিসমাপ্তি ঘটে। মেজর জেনারেল লক্ষণ সিং, ভারতের ২০তম ডিভিশনের কমান্ডার,করতোয়া থেকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি ৬৬তম ও ২০২তম) মাউন্টেন ব্রিগেড নিয়ে হামলা করেন উত্তর এবং দক্ষিণ দিক থেকে। তিনি সংযোগ সাধন অথবা চরকাই-হিলি দখল কোনোটাই করতে পারেন নি।
আমাদের সৈন্যরা তার নেতৃত্বাধীন ৩৪০তম ও ১৬৫তম মাউন্টেন ব্রিগেডকে এতো ব্যতিব্যস্ত করে তোলে যে, এই দুটি ব্রিগেড না পারছিল পুনরায় সংগঠিত। হতে অথবা না পারছিল পিছু হটতে। এ ভারতীয় ভ্রাম্যমাণ বহর আমাদের পার্শ্বদেশ অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা বগুড়া থেকে বের হতে পারে নি ২০২তম মাউন্টেন ব্রিগেডকে পাঠানো হয় হামলা জোরদার করার জন্য।
কিন্তু আমাদের সৈনারা এই ব্রিগেডের ওপর এতো তীব্র হামলা চালায় যে, এতে শুধু তাদের অগ্রযাত্রাই ব্যাহত হয় নি, বরং তাদের পিছু হটার পথও বন্ধ হয়ে যায়। ২০তম মাউন্টেন ডিভিশনের সকল ব্রিগেড তাদের অপারেশনকে আরো। এগিয়ে নিয়ে যাবার লক্ষ্যে পায়ের নিচে এক টুকরো নিরাপদ জায়গা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালায়।
আমাদের মাত্র একটি কোম্পানি ভাদুরিতে ভারতীয় এই ডিভিশনের হামলা প্রতিহত করে। এ কোম্পানির হামলায় শত্রুদের প্রচুর ক্ষয়-ক্ষতি হয় এবং তাদের অগ্রযাত্রা ব্যর্থ হয়ে যায়। ভাদুরিতে ভয়াবহতম যুদ্ধ হয়। পাকিস্তানিদের। দৃঢ়তা কঠিন সংকল্পের জন্যই এ প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
জনশক্তি ও অস্ত্রশস্ত্রে শ্রেষ্ঠত্ব এবং স্থানীয় জনগণের নিরংকুশ সমর্থন থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় সেনা ও অফিসাররা পাকিস্তানি সৈন্য ও অফিসারদের সমকক্ষ ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে ১১ ডিসেম্বর আমাদের সৈন্যদের প্রত্যাহার এবং আমাদের অবস্থান ছেড়ে দিতে হয়।
জেনারেল সুখবন্ত সিং তার ‘লিবারেশন অব বাংলাদেশ’ বইয়ে মজার বিশ্লেষণ দিয়েছেন : ‘থাপন (ভারতীয় কোর কমান্ডার) কি কোনো ভূখণ্ড দখল করতে পেরেছেন। যুদ্ধ বিরতিকালে তিনি আত্রাই নদীর পূর্ব দিকের সকল ভূখণ্ড, বালুঘাটের উত্তরাংশ এবং কটিদেশের এক উল্লেখযোগ্য ভূমি দখল করেছেন।
কিন্তু দিনাজপুর, সৈয়দপুর, রংপুর, রাজশাহী ও নাটোরের মতো সকল গুরুত্বপূর্ণ শহর। ছিল তার নাগালের বাইরে এবং এসব শহরে তখনো পাকিস্তানিদের অব্যাহত প্রতিরোধ গড়ে তোলার সামর্থ্য ছিল। এই অভিযান কি প্রতিপক্ষ বাহিনীর মনোবল এবং সামর্থ্য বিকল করে দেওয়ার মতো সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে। দৃশ্যত না।
২০ হাজার সৈন্যের মধ্যে মাত্র ৫ শতাধিক সৈন্য যুদ্ধবিরতির পর স্থাপনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। লড়াইয়ে যেসব অস্ত্রশস্ত্র ধ্বংস অথবা দখল করা হয়েছে তার পরিমাণও ছিল নগণ্য। এতে পাকিস্তানি সৈন্যের কমান্ডারের সামরিক সামর্থ্য কোনো। ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, উত্তর-পশ্চিম সেক্টরে লড়াই নিয়াজির পতনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে নি।
কেন এমন হলো? জেনারেল থাপনের কমান্ডার (লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা) তার ওপর যে অনির্ধারিত দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন, সেখানেই এ ব্যর্থতার কারণ নিহিত রয়েছে। এসব দায়িত্বের মধ্যে ছিল ৮ দিনের মধ্যে ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও হিলি দখল এবং হিলি-গাইবান্ধা কটিদেশ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া এবং এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী রংপুর অথবা বগুড়ায় মিলিত হওয়া।
পাকিস্তানের ১৬তম ডিভিশনের পুরোটা অথবা এর বড়ো অংশকে ঢাকা প্রত্যাহারে বাধা দেওয়া কি সেনা কমান্ডারের ইচ্ছে ছিল? তখন প্রথমেই ফুলছড়ি, সিরাজগঞ্জ ও বেড়াঘাটের ফেরি দখল করার পরিকল্পনা করা হয় শুধুমাত্র যে অংশটা ওয়েস্ট লাইনের উত্তরে পড়েছে সেটুকু বাদ দিয়ে।
সেনা কমান্ডার কি চেয়েছিলেন যে, থাপন যমুনা অতিক্রম করে ঢাকা অভিমুখে এগিয়ে যাক? অবশ্যই প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রণয়নকালে এসব চিন্তা করা হয় নি, কিন্তু মনে হচ্ছে এ ক্ষেত্রে তার অন্য কোনো চিন্তা ছিল।
১২ থেকে ১৫ই ডিসেম্বর পর্যন্ত তখন ঢাকার অবস্থা খুব নাজুক ছিল, তখন সেনা কমান্ডার কয়েকটি ভারী ট্যাংক ও মাকারি ট্যাংকসহ একটি ব্রিগেডকে নদীর অপর পাড়ে পাঠানোর জন্য প্রাণান্ত অথচ ব্যর্থ চেষ্টা করেন। জেনারেল থাপনের সৈন্যরা ফুলছড়ি ফেরিঘাট দখল করে নিয়েছিল।
কিন্তু স্থল ও বিমান হামলার এ ফেরিঘাট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। সিরাজগঞ্জ ও বেড়াঘাট ব্যবহার নিরাপদ ছিল না। এই দুটি ঘাট ছিল। বগুড়া থেকে অনেক দূরে। এগুলো দখল করা কোরের দায়িত্বের মধ্যে ছিল না ।
এটা দেখা যাচ্ছে যে, সার্বিক পরিকল্পনা প্রণয়নকালে ধারণা সঠিক খাতে পরিচালিত হয় নি। উদাহরণস্বরূপ, থাপনের সেক্টর থেকে ঢাকার প্রতি একটি সমন্বিত হুমকি সৃষ্টির লক্ষ্যে হার্ডিঞ্জ ব্রিজে ২য় কোরের সাথে প্রাথমিক যোগাযোগ নিশ্চিত করার কোনো প্রচেষ্টা এ পরিকল্পনায় নেই।
সে সময় থাপনের সেক্টর থেকে ঢাকার প্রতি হুমকি সৃষ্টি করার প্রচুর সুযোগ ছিল। বাইরের সামরিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আগে যুদ্ধ শেষ এবং পাকিস্তানি সৈন্যদের শিগগির “আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য একটি আঁটসাঁট সময় নির্ধারণের গুরুত্বের ওপরও সেনা কমান্ডার কখনো জোর দেন নি।
মনে হচ্ছে, তিনি দুটি বিষয়ে দোদুল্যমানতায় ভুগছিলেন। একটি হচ্ছে, তার সৈন্যদের সাফল্য সম্পর্কে তিনি কী প্রত্যাশা করছিলেন এবং আরেকটি হচ্ছে, সাফল্য অর্জনে তাদের সামর্থ্য সম্পর্কে তার মূল্যায়ন। ফলে তিনি তার যুদ্ধের লক্ষমাত্রা নির্ধারণে ব্যর্থ হন। তার অধঃস্তন কমান্ডার ও তাদের অধীনস্থ সৈন্যরা সার্বিক লক্ষমাত্রায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা ছাড়াই এক লক্ষ্য থেকে আরেক লক্ষ্যে ছোটাছুটি করেছেন।
৭ই ডিসেম্বরের পরে থাপন তার সেক্টরে মোতায়েনকৃত প্রায় ৬ বিশেষ সৈন্যের পুরো ক্ষমতাকে লড়াইয়ে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। এর মধ্যে মাত্র একটি ব্রিগেড আক্রমণাত্মক অবস্থানে ছিল এবং বাদবাকি ৫টি ব্রিগেড পাকিস্তানি দুর্গ অবরোধে সময় কাটিয়েছে।
হিলি দুর্গ দখলে ভারতীয় সৈন্যদের অক্ষমতা হচ্ছে এ প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে পাকিস্তানি সৈন্যদের মৌলিক শক্তির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জনবল, অস্ত্রশস্ত্র, সাজ-সরঞ্জামে একচেটিয়া শ্রেষ্ঠত্ব এবং বিমান বাহিনীর কার্যকর সহায়তা সত্ত্বেও এ দুর্গের শক্তি এবং দুর্গ রক্ষায় নিয়োজিত সৈন্যদের কাছে ভারতীয়রা হেরে গেছে।
১৬তম ডিভিশনের কমান্ডারের নির্দেশে ১১ই ডিসেম্বর অগ্রগামী শত্রুদের হামলা থেকে বগুড়া রক্ষার প্রয়োজনে হিলি দুর্গে মোতায়েন সৈন্যরা শত্রুর অবরোধ ভেঙে বগুড়া পৌঁছে। ৩৩তম ভারতীয় কোর দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়ায় আমাদের দুর্গ দখলে ব্যর্থ হয়। যুদ্ধবিরতি নাগাদ সবগুলো দুর্গ তখনো শত্রুর হামলা মোকাবিলা করছিল। যারাই আমাদের সীমানায় প্রবেশ। করেছে তাদেরকেই বেয়নেট দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাল্টা হামলা চালিয়ে হারানো অবস্থানগুলো পুনর্দখল করা হয়।
মেজর জেনারেল (অব) ফজল মুকিম বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন- ৯ই ডিসেম্বর দিনের চতুর্থ দফা হামলায় হিলির পতন ঘটে। অফিসার ও সৈনারা এতো ক্লান্ত ছিল যে, তারা হাঁটতেও পারছিল না। হিলির পতন ৯ই ডিসেম্বর ঘটে নি।
১৬তম ডিভিশনের জিওসির স্পষ্ট নির্দেশে ১১ই ডিসেম্বর সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করা হয়। শত্রুর হাতে কোনো এলাকার পতন ঘটা এবং একটি সার্বিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কোনো একটি অংশের প্রতিরক্ষায় অন্য কোনো অংশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের মাঝে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। আমরা সৈন্য প্রত্যাহার করার পর ১১ই ডিসেম্বর ভারতীয়রা হিলি দুর্গ দখল করে, ৯২ ডিসেম্বর নয়।
*৩২তম বালুচ রেজিমেন্টের সাথে সংযুক্ত মেজর শহীদের নেতৃত্বাধীন ২৩তম পাঞ্জাবের একটি কোম্পানি এসব অপারেশনকালে বস্তুতপক্ষে নির্মূল হয়ে যায়। যে কয়জন জীবিত ছিল তারাও বন্দি হয়। এ সময় হাবিলদার হুকাম পাদ এক বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। এ দিকে ২৩ পাঞ্জাবের কোম্পানি কমান্ডার মেজর সাজিদ ছিলেন মূল সড়কের পূর্বাংশে।
দক্ষিণ দিক থেকে এগিয়ে আসা শত্রুদের হাতে বন্দি হন তিনি। সাজিদের নেতৃত্বাধীন কোম্পানির হাবিলদার হুকাম দাদ উত্তর ও দক্ষিণে সংযোগ সাধনে শত্রুর তিনটি হামলা ব্যর্থ করে দেন। ভারতীয় মেজর তার হাতে বন্দি মেজর সাজিদকে হাবিলদার হুকামকে হামলা বন্ধের নির্দেশ দিতে বলেন।
সাজিদ এ নির্দেশ পালনে অস্বীকৃতি জানালে একটি ভারতীয় সৈন্যদল হুকাম দাদের অবস্থানে হামলা চালায়। তার অবস্থানে নিঃসঙ্গ অবস্থায় হুকাম হামলাকারী সৈন্যদের ওপর গুলিবর্ষণ করেন। এতে ৩ জন শত্রু সেনা নিহত হয়।
অন্যান্যরা পিছু হটে যায় হামাগুড়ি দিয়ে। আরো উত্তেজিত হয়ে ভারতীয় সেই মেজর পাকিস্তানি মেজর সাজিদের বুকে রিভলভার ঠেকিয়ে হুকাম দাদকে হামলা বন্ধের নির্দেশ দিতে চাপ দিতে থাকে। মেজর সাজিদ চিৎকার করে হুকাম দাদকে নির্দেশ দেন হামলা বন্ধ করতে। জবাবে সে বললো, সাহেব, মনে হচ্ছে আপনার গুলি ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো আমার কাছে দুটি ম্যাগাজিন আছে। চিন্তা করবেন না, আমার যথেষ্ট বুলেট আছে।
এটা হলো সেই সেক্টর সেখানে মাপারা এলাকায় সাহসিকতার জন্য ৪ এফএফ-এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর আকরামকে মরণোত্তর ‘নিশান-ই- হায়দার’ উপাধি দেওয়া হয়। ২০৫ ব্রিগেড় অত্যন্ত চমৎকারভাবে লড়াই করেছে। ৪ এফএফ-এর লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্বাসী আহত হন এবং তাকে সরিয়ে নেওয়া হয়। হিলির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে লড়াইয়ে লিপ্ত থাকায় আমি ৪ এফ এফ-এ একজন ভালো কমান্ডিং অফিসার নিয়োগ না করে স্বস্তি পাচ্ছিলাম না।
তাই আমি ১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্বর এ এলাকা সফরকালে আমার জেনারেল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মমতাজকে সাথে নিয়ে যাই। সেখানে তিনি চমৎকার নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন। তাজাম্মালের অনুপস্থিতিতে ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্বও পালন করেন। তার অসাধারণ বীরত্বের জন্য তাকে ‘সিতারা-ই-জুরাত’ পদকে ভূষিত করা হয়।
কর্নেল মমতাজ শত্রুর ৪টি ব্রিগেড, হিলিতে লড়াই করেছেন এবং ১৯ দিন একটানা বিমান হামলার মাঝেও তিনি মুক্তিবাহিনীর একটি ব্রিগেড এবং শত্রুর আরো একটি সাঁজোয়া ব্রিগেডের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হন।
জেনারেল লক্ষ্মণ সিংয়ের পর্যাপ্তের চেয়ে বেশি সংখ্যক সৈন্য, গোলা-বারুদ ও অনুকূল পরিস্থিতি ছিল এবং এতে তার ভালো করার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধে তিনি হাল ছেড়ে দেন এবং একজন নীরব দর্শকে পরিণত হন। তিনি যুদ্ধের নাড়ি না বুঝে একের পর এক হামলা চালিয়ে গেছেন।
তিনি ছিলেন গতানুগতিক ধাঁচের এক জেনারেল যারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে সশরীরে না গিয়ে, যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি না বুঝে শোনা কথার ওপর হেডকোয়ার্টার্সে বসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও যুদ্ধ পরিচালনা করেন। হিলি থেকে ৪০ মাইল দূরে বগুড়ায় আমাদের সৈন্য প্রত্যাহার এবং বিমানের ছত্রছায়া ও দূরপাল্লার কামানের সহায়তা ছাড়া ভারতীয় বেষ্টনি ভেঙে ফেলা ছিল জেনারেল লক্ষ্মণ সিংয়ের নেতৃত্বের ওপর একটি কলঙ্ক চিহ্ন।
ব্রিগেডিয়ার তাজাম্বুল হুসাইন মালিক পূর্ব পাকিস্তানে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে। লড়াই করেছেন। আমি তাকে ঢাকার প্রতিরক্ষার জন্য রেখে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি অগ্রবর্তী অবস্থানে গিয়ে লড়াই করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাকে মেজর জেনারেল নজরের আওতায় ২০৫তম ব্রিগেডে পাঠানো হয়। একজন ভালো কমান্ডার ও একজন সাহসী সৈনিক হিসেবে তার প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা ছিল।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধে তিনি তার যোগ্যতার প্রমাণ করেছেন। তিনি ইসলামের একজন সত্যিকার সৈনিক হিসেবে তার গুণাবলির পরিচয় দিয়েছেন এবং ভারতীয়দের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অসম সাহসের স্বাক্ষর রেখেছেন। আমি তাকে ‘নিশান-ই-হায়দার’ পদকে ভূষিত করার জন্য সুপারিশ করেছিলাম। কিন্তু জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স তাকে এ পদক দেয় নি।
আমি তাকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্যও সুপারিশ করেছিলাম। ইসলামের প্রতি অবিচলিত। বিশ্বাস থাকায় অনেকেই তাকে ভয় পেতো। তার পদোন্নতি হয় এবং পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত তিনিই একমাত্র ব্রিগেডিয়ার যাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
আমাদের সৈন্যরা ভারতীয় সেনাবাহিনীকে দিনাজপুর, রংপুর, সৈয়দপুর, বগুড়া ও রাজশাহীতে পেরেকের মতো আটকে রাখে, যাতে শত্রু পশ্চিম রণাঙ্গনে সৈন্য স্থানান্তর করতে না পারে। বস্তুত, ৯ম ডিভিশন থেকে ব্রিগেডিয়ার মঞ্জুরের ব্রিগেড ১৬তম ডিভিশনের এলাকায় পৌঁছলে উত্তর ও দক্ষিণে শত্রুরা কাবার হয়ে যায়। এটা ঠিক যে, যুদ্ধবিরতি না হলে শত্রুদেরকে আরো কঠোর পরিস্থিতিতে পড়তে হতো।
এ সেক্টরে ভারতীয় কোর কমান্ডারের তৎপরতা ছিল নিম্নমানের। তিনি শুধু ঢাকা দখলেই ব্যর্থ হন নি, প্রাথমিক লক্ষবস্তুগুলো দখলেও তিনি চরম ব্যর্থভার পরিচয় দেন। বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও একটি ক্লাভ, নিস্তেজ ও অর্থ-সজ্জিত গ্যারিসন দখলে ব্যর্থতার জন্য যুদ্ধের পর পরই তাকে বরখাস্ত করা হয়।

এ সেক্টরে যুদ্ধের ফলাফলে প্রমাণিত হয়েছে যে, জেনারেল গুল হাসান ও টিক্কার অপপ্রচার ছিল সম্পূর্ণ ভুল। এ দুই জন সৈন্যদের মাঝে অর্থ-কড়ি বিতরণের জন্য আমাদেরকে অভিযুক্ত করেছিলেন। এটা মনে রাখা উচিত যে, গুল হাসান কখনো কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নি।
টিক্কা পাকিস্তানে কোনো যুদ্ধে জয়ী হতে পারেন নি। জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সের অনুমোদিত কৌশলগত তত্ত্বের আওতায় সৈন্য মোতায়েন করা হয়। অন্যথায়, ১৬তম ডিভিশন এমনকি আমার সমগ্র বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হতে হতো।
