জুলিও কুরি এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –জুলিও কুরি এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

জুলিও কুরি এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী

 

জুলিও কুরি এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী

 

আমাদের কার্যকালে একটি স্মরণীয় ঘটনার দিন সেইদিন, যেদিন সমগ্র জাতি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নূতনভাবে মহাসম্মানের গৌরব অর্জন করে। আওয়ামী লীগ সভাপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শান্তির দূত হিসাবে বিশ্ব শান্তি পরিষদের পক্ষ হতে ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জুলিও কুরি শান্তি পদকে ভূষিত করা হয় এবং ঐদিন তিনি ২৩, ২৪, ২৫শে মে’র এশীয় শান্তি সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

এ অনুষ্ঠানে বিশ্বের ৩০টি দেশের প্রতিনিধিবৃন্দ যোগদান করেন। এর মধ্যে ২২টি এশীয় দেশের প্রতিনিধিবৃন্দও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন দেশের ১০টি আন্তর্জাতিক সংস্থা এই অনুষ্ঠানে যোগদান করে এর মর্যাদা বহু গুণে বৃদ্ধি করেছিলেন। দেশ- বিদেশের প্রতিনিধিদের সামনে বিশ্ব-শান্তির অগ্রনায়ক, বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের সোচ্চার কণ্ঠ বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ব-শাস্তি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শ্রী রমেশ চন্দ্র সেদিন “বিশ্ববন্ধু” হিসাবে ভূষিত করেন।

এই কারণে সেদিন ছিল আওয়ামী লীগ কর্মীদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আওয়ামী লীগের সুদীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসের এক চরম সার্থকতার দিন। কেননা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি বিশ্ব আসনের এক শ্রেষ্ঠ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হলেন। এ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু সেদিন বিশ্বের ধনী দেশগুলিকে সমরাস্ত্রের জন্য যে অর্থ ব্যয় হয় তা বন্ধ করে বিশ্বের অনুন্নত দেশের কোটি কোটি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসার ব্যবস্থা করে ক্ষুধা, জরামৃত্যু ও মহামারীর হাত থেকে মানুষকে উদ্ধার করে বৃহত্তর মানবতার কল্যাণে এগিয়ে আসার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান ।

বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী উদযাপন আমাদের আর একটি উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান। ১৭ই মার্চ জাতির পিতার শুভ জন্মবার্ষিকী। সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন সংগঠনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধুকে পুষ্পমাল্য প্রদান এবং আলোচনা সভা প্রভৃতি ছিল কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত। বিকেলে তাঁর সুদীর্ঘ সংগ্রামের দিক আলোচনা করে অতিথিবক্তা বিশ্বভারতীয় অধ্যাপক শ্রী শান্তিময় রায়সহ খাদ্যমন্ত্রী শ্রী ফণিভূষণ মজুমদার ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ আলোচনা সভায় অংশ গ্রহণ করেন।

এছাড়াও বিশেষ দিবসকে জাতীয় প্রেরণার উৎস হিসেবে জাতির সঠিক মূল্যায়ন করতে শিক্ষা দেয়। এমনি একটি দিবস “জালালাবাদ দিবস”। ইতিহাসের সেই অমর দিনটি আমাদের মনের মানচিত্র হতে প্রায় মুছে গিয়েছিল বিগত ২৪ বছরের দুঃস্বপ্নের দিনগুলিতে। বাংলা এবং বাংগালীর সংগ্রামী ইতিহাসের স্বর্ণ স্বাক্ষরে যাঁদের স্মৃতি বলিষ্ঠ প্রেরণা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল তার অন্যতম।

আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশে ২৪শে এপ্রিল ১৯৭২ সালে দলীয় কার্যালয়ে প্রথমবারের মত সংগ্রামী স্মৃতি বিজড়িত এ দিনটি পালন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে সংগ্রামীদের উপর আলোচনা করেন অতিথি বক্তাদের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী জনাব ইউসুফ আলী, খাদ্যমন্ত্রী শ্রী ফণিভূষণ মজুমদার, তৎকালীন সমবায় মন্ত্রী জনাব শামসুল হক, রবীন্দ্র ভারতীয় অধ্যাপক ও ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সংযোগ কমিটির সম্পাদক শ্রী শান্তিময় রায়, মহিলা আওয়ামী লীগের সম্পাদিকা বেগম সাজেদা চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ ।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রবীন্দ্র জয়ন্তী এবং নজরুল জয়ন্তী উপলক্ষে দুটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কার্যকালের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বাংলার সাংস্কৃতিক বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি করে বিদেশী শাসকরা আমাদের সাংস্কৃতিক বিকাশের সচল গতিধারা রুদ্ধ করেছে সুদীর্ঘ কাল। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্মের সাথে সমভাবে গুরুত্ব উপলব্ধি করেছি। সংস্কৃতির। ১৯৭২ সালের ১২ই মে মোতাবেক ২৯শে বৈশাখ ১৩৭৯ সালে গুলিস্তান প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত আমাদের রবীন্দ্র জয়ন্তী উপলক্ষে “কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলে যেন বাংলাদেশের তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তের চাপ” এ কথা ক’টি লেখা একটি মনোরম আমন্ত্রণলিপি ডেকে এনেছে অসংখ্য অতিথি।

সুদৃশ্যভাবে মঞ্চ সাজানো- একদিকে বঙ্গবন্ধুর অন্য দিকে কবি গুরুর প্রতিকৃতি। মহাকালের অন্যতম বৃহৎ ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে আমরা পালন করেছি আমাদের প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী। বঙ্গবন্ধু এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কিন্তু বিশেষ কারণবশতঃ তিনি উপস্থিত হতে না পেরে তাঁর পক্ষ থেকে তৎকালীন তথ্য ও বেতারমন্ত্রী জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরীকে অনুষ্ঠানে প্রেরণ করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ডঃ মুহাম্মদ কুদ্রাত-এ-খুদা।

আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তথ্যমন্ত্রী জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল শ্রীমতি কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শ্রী গোরা সর্বাধিকারীর নেতৃত্বে বিশজন প্রখ্যাত রবীন্দ্র-সংগীত শিল্পীর সংগীতে অংশ গ্রহণ। কলীম শরাফী, ফাহমিদা খাতুন প্রমুখ শিল্পীবৃন্দ এ’দের সঙ্গে ছিলেন। এছাড়া “শ্যামা” নৃত্যনাট্যটি পরিবেশিত হয়। এর পর আরেকটি অনুষ্ঠান যা আমাদের স্মৃতিপটে উজ্জ্বল হয়ে রইবে চিরদিন তা হলো বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্বাধীন বাংলাদেশে শুভ পদার্পণ।

 

বঙ্গবন্ধুর আন্তরিক ইচ্ছানুসারে নিপীড়িত মানবাত্মার কবিকে ঢাকায় আনা হয়। এ যেন এক অপূর্ব ক্ষণ। নির্যাতিত মানবের বন্ধু শেখ মুজিব চিরকালের অন্যায় অত্যাচার, অসুন্দরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী কবিকে হাত বাড়িয়ে স্বাগত জানালেন বাংলার পবিত্র মাটিতে। এ ছিল দুই বিদ্রোহীর বহুকালের মিলনের পুঞ্জীভূত আশার একটি বাস্তব রূপ। ১৯৭২ সালের ২৪শে মে বুধবার বেলা ১১-৪০ মিনিট তিনি কোলকাতা থেকে আসেন ঢাকা বিমান বন্দরে।

শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিসেবী সহ সকল স্তরের জনতার ঢল নেমেছিল বিমানবন্দরে। সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রথম নজরুল জন্মবার্ষিকীতে এ আয়োজন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছানুসারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ হতে জনাব মুস্তফা সারওয়ার এবং সরকারের পক্ষ থেকে জনাব মতিয়ুর রহমান কোলকাতা থেকে কবিকে আনার যাবতীয় ব্যবস্থা করেন। কবির জন্য ধানমন্ডীর ২৮নং সড়কে একটা বাড়ী পূর্ব হতেই নির্ধারিত ছিল।

সেখানেই তিনি বর্তমানে বসবাস করছেন। কবি নজরুলের আগমনের সময় বঙ্গবন্ধুর সেই আনন্দোচ্ছ্বসিত এক পূত মূর্তি যাঁরা দেখেন নাই তাঁদের কাছে আমি এ মহামিলনের সার্থক চিত্র তুলে ধরতে পারবো না। আপনাদের উপলব্ধির মণিকোঠায় আমার সামান্য বর্ণনা অমলিন হয়ে থাক এ আশাই আমি করবো। কবির আগমনকে স্বাগত জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, “কবি নজরুল বাংলার বিদ্রোহী আত্মা ও বাংগালীর স্বাধীন ঐতিহাসিক সত্ত্বার রূপকার। কবির সৃষ্টির পূর্ণমূল্যায়নের দায়িত্ব নিতে হবে বাংলাদেশের বিদগ্ধ সমাজের।”

১১ই জৈষ্ঠ্য তাঁর জন্মদিন । রাষ্ট্রপতি বিচারপতি জনাব আবু সাঈদ চৌধুরী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ মন্ত্রী পরিষদের সদস্যবৃন্দ কবিকে শ্রদ্ধানিবেদন করেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ কবিগৃহে গমন করেন। এর সকল ব্যবস্থাপনা তদারক করেছি আমরা এবং সহ-কর্মীবৃন্দ। সার্বক্ষণিকভাবে আমরা আমাদের কর্মীদের নিয়োজিত রেখেছি। পরাধীনতার ২৫ বছরে যা আমরা করতে পারিনি সেই প্রিয় কবি আজ আমাদের সাথে ।

 

জুলিও কুরি এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী

 

১৯৭২ সালে ১লা জুন গণতন্ত্র ও ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রশ্নে আপোষহীন সংগ্রামী সৈনিক দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয়। এ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন। তিনি মরহুমের সুদীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস আলোচনা করেন।অন্যান্য যাঁরা আলোচনা করেন তাঁরা হলেন মরহুমের পুত্র ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, বিশিষ্ট সাংবাদিক শ্রী সত্যেন সেন প্রমুখ। এছাড়া আমি দেশের সারা ইউনিটকে এ দিবস পালনের নির্দেশ প্রদান করি। বিশেষ দিনগুলির মধ্যে পহেলা বৈশাখ, আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মে দিবস প্রভৃতি যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালন করি ।

Leave a Comment