আজকের আলোচনার বিষয়- বঙ্গবন্ধু হত্যা : আগস্ট ট্র্যাজেডি। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড ছিল বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একদল সদস্য সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত করে এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমন্ডি ৩২-এর বাসভবনে সপরিবারে হত্যা করে। পরে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ পর্যন্ত খন্দকার মোশতাক আহমেদ অঘোষিতভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হন। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের বেসামরিক প্রশাসনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো সামরিক ক্ষমতার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ঘটে। হত্যাকাণ্ডটি বাংলাদেশের আদর্শিক পটপরিবর্তন বলে বিবেচিত। লরেন্স লিফশুলৎজ এই হত্যাকাণ্ডের সমাগ্রিক ঘটনাবলিকে মার্কিন-পাকিস্তানপন্থী ও ভারত-সোভিয়েতপন্থী দুই অক্ষশক্তির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্নায়ুযুদ্ধের সহিংস বহিঃপ্রকাশ বলে আখ্যায়িত করেন। বর্তমানে ১৫ ই আগস্ট বাংলাদেশের ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যা : আগস্ট ট্র্যাজেডি
বাঙালির ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি হচ্ছে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নিহত হওয়ার ঘটনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাত্রিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি সুসংগঠিত ক্ষুদ্র অংশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাসভবনে সপরিবারে হত্যা করে।
এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিব, তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল এবং দশ বছরের শিশু শেষ রাসেল। সদ্যপরিণীতা দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল এবং ছোট ভাই শেখ আবু নাসের। বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে এসে নিহত হন অকুতোভয় দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জামিলসহ কর্তব্যরত পুলিশ বাহিনীর আরও কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী।

একই সময়ে নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিহত হন বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি কৃষক নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত এবং বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ ফজলুল হক মণি ও তাজু মণি, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের ১০ বছরের কন্যা বেবী সেরনিয়াবাত, ১০ বছরের পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, ৪ বছরের নাতি সুকান্ত সেরনিয়াবাত, ভ্রাতুষ্পুত্র শহীদ সেরনিয়াবাত ও রিন্টুসহ আত্মীয়-স্বজন। এই দিন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা জার্মানিতে থাকায় ঘাতকদের হাত থেকে বেঁচে যান।
একই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী চার জাতীয় নেতা সৈয় নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকেও রাতের অন্ধকারে হত্যা করা হয়। এভাবেই বাংলাদেশের ইতিহাস কালো চাদরে ঢাকা পড়ে যায়। আবারও জাতির বুকে চেপে বসে সামরিক শাসন ও স্বৈরতন্ত্রের জগদ্দল পাথর। কায়েম হয় অন্ধকারের রাজত্ব শুরু হয় হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি।
বিচার:
১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বাংলাদেশের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের সদস্যগণকে হত্যার বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করা হয়। ১২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়। ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত সহকারী এএফএম মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে মুজিব হত্যাকাণ্ডের মামলা করেন। ১ মার্চ ১৯৯৭ সালে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারকার্য শুরু হয়।
৮ নভেম্বর ১৯৯৮ সালে জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ৭৬ পৃষ্ঠার রায় ঘোষণায় ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। ১৪ নভেম্বর ২০০০ সালে হাইকোর্টে মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলে দুই বিচারক বিচারপতি মােঃ রুহুল আমিন এবং বিচারপতি এ.বি.এম খায়রুল হক দ্বিমতে বিভক্ত রায় ঘোষণা করেন। এরপর তৃতীয় বিচারপতি মােঃ ফজলুল করিম ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন। এরপর পাঁচজন আসামি আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করে। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল তৃতীয় বিচারক মোহাম্মদ ফজলুল করিম ২৫ দিন শুনানির পর অভিযুক্ত ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিশ্চিত করেন৷
২০০২-২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। ২০০৭ সালে শুনানির জন্য বেঞ্চ গঠিত হয়। ২০০৯ সালে ২৯ দিন শুনানির পর ১৯ নভেম্বর প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচজন বিচারপতি রায় ঘােষণায় আপিল খারিজ করে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত বাদী-বিবাদীর আপিলের প্রেক্ষিতে চার দফায় রায় প্রকাশ হয়, সর্বশেষ আপিল বিভাগ ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর থেকে টানা ২৯ কর্মদিবস শুনানি করার পর ১৯ নভেম্বর চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।
২০১০ সালের ২ জানুয়ারি আপিল বিভাগে আসামিদের রিভিউ পিটিশন দাখিল এবং তিন দিন শুনানি শেষে ২৭ জানুয়ারি চার বিচারপতি রিভিউ পিটিশনও খারিজ করেন। এদিনই মধ্যরাতের পর ২৮ জানুয়ারি পাঁচ ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ঘাতকদের একজন বিদেশে পলাতক অবস্থায় মারা যায় এবং ছয়জন বিদেশে পলাতক রয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি ৩৪ বছর পর বাস্তবায়িত হয়।
