আজকে আমদের আলোচনার বিষয় বাংলাদেশকে ১১ সেক্টর বিভক্তিকরণ
বাংলাদেশকে ১১ সেক্টর বিভক্তিকরণ

বাংলাদেশকে ১১ সেক্টর বিভক্তিকরণ
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাত হতে বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করে। তাদের প্রধান লক্ষবস্তু হয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সেনানিবাস ও ইপিআর উইং, পুলিশসহ আধা সামরিক বাহিনীর অবস্থানগুলো। এসব স্থান থেকে পালিয়ে আসা অফিসার ও সৈনিকদের বড় অংশ হাতের কাছে যা ছিল তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করে।
যদিও সুসজ্জিত হানাদার বাহিনীর সঙ্গে পেরে না ওঠে এক পর্যায়ে তারা পিছু হটে যায়। এরি মধ্যে ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে যুদ্ধ আরো সংগঠিত ও পরিকল্পিত রূপ লাভ করে। গড়ে ওঠে মুক্তিফৌজ। ১৭ এপ্রিল সরকার যুদ্ধরত আঞ্চলিক কমান্ডারদের নিয়ে গঠন করে এই ফৌজ যা পরবর্তীকালে ১১টি সেক্টর বিভক্ত হয়। এছাড়া গঠিত হয় ৩টি বিগ্রেড ফোর্স। এভাবে একক কমান্ডের অধীনে যুদ্ধে বাঙালি ক্রমান্বয়ে সাফল্য লাভ করতে থাকে।
সেক্টর গঠনের কারণ
যেকোন দেশের মুক্তিযুদ্ধই দ্রুত সাফল্য লাভের পূর্বশর্ত এর সশস্ত্র চরিত্র এবং একক কমান্ড। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে যুব শিবির এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন ছিল। একক কমান্ড গড়ে তোলার পেছনে অন্যান্য আরো যেসব কারণ ছিল তা হলো- প্রথমত, যেসমস্ত বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ, মুজাহিদ, আনসার বাহিনীর সদস্য বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছিল তাদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে একক কমান্ডে নিয়ে আসা।
দ্বিতীয়ত, পাকবাহিনীর মনোবল, শক্তি ও প্রকৃতি নির্ণয় সাপেক্ষে যুদ্ধ কৌশল তৈরি করা। তৃতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারী বিভিন্ন সামরিক অফিসারদের দায়িত্বে নিয়োগ ও যুদ্ধ এলাকা নির্ধারণ করে যুদ্ধে শৃংখলা আনা। চতুর্থত, বিপুল সংখ্যক ছাত্র ও কৃষক-শ্রমিকের মধ্যে থেকে যারা যুদ্ধে অংশ নিতে ইচ্ছুক তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধে নিয়োগ করা।
পঞ্চমত, অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সজ্জিত করা। ষষ্ঠত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিষ্ঠা করা। এসব উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নিয়মিত ও অনিয়মিত (গণবাহিনী) বাহিনীকে একই কমান্ডের অধীনে আনা হয়।
সেক্টর গঠনের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুটিকয়েক অবিবেচক ছাড়া সকলেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। প্রতিরোধ যুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, ছাত্রসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশ নেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সকল মুক্তিযোদ্ধাকে পুনর্গঠিত করার প্রয়োজনীয়তা প্রথম থেকেই উর্ধ্বতন বাঙালি অফিসাররা অনুভব করেছিলেন।
৪ এপ্রিল সিলেটের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে কর্নেল এম.এ.জি. ওসমানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মেজর শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশারফ, মেজর এম. নূরুজ্জামান, মেজর নূরুল ইসলাম, কর্নেল রবসহ অনেক পদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এখানে পরিকল্পিত যুদ্ধ ছাড়াও রাজনৈতিক সমর্থন গঠন ও গোলাবারুদ সরবরাহ সম্পর্কে আলোচনা হয়।
১০ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার গঠনের পর সরকার সামরিক প্রশাসন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয় এবং এ পর্যায়ে বাংলাদেশ বাহিনী গঠিত হয় যার হেড কোয়ার্টার স্থাপিত হয় কোলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে। ১৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণের পর আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় মুক্তিফৌজ বা মুক্তিবাহিনী যার প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হন ওসমানী।
ইতোমধ্যে ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশকে মোট চারটি সেক্টরে ভাগ করে। চট্টগ্রাম সেক্টরের অধিনায়ক নিযুক্ত হন মেজর জিয়া, কুমিল্লা সেক্টরের মেজর খালেদ মোশাররফ, সিলেট সেক্টরের মেজর শফিউল্লাহ এবং কুষ্টিয়া সেক্টরের মেজর আবু ওসমান। পরের দিন নাজমুল হককে দিনাজপুর-রাজশাহী- পাবনা এলাকা, মেজর জলিলকে বরিশাল-পটুয়াখালী এলাকা, ক্যাপ্টেন নওয়াজেশকে রংপুর এলাকার দায়িত্ব দেয়া হয়।
সারা দেশের মুক্তিযুদ্ধকে আরো বেগবান করার লক্ষে বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারী সকল সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিবর্গকে যথোপযুক্ত দায়িত্ব নিয়োগ করা এবং যুদ্ধ এলাকা নির্ধারণের জন্য সেক্টরগুলোকে নতুনভাবে সংগঠিত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
এ উদ্দেশে ১১-১৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের সভাপতিত্বে সেক্টর কমান্ডারদের অধিবেশনের সীমানা চিহ্নিতকরণ, বাংলাদেশের অভ্যস্ত্বরে গেরিলা ঘাঁটি স্থাপন ইত্যাদি রণনীতি প্রণয়ন করা হয়। কর্নেল রবকে বাংলাদেশ বাহিনীর চিফ অব স্টাফ এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে. খন্দকারকে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ নিযুক্ত করা হয়। এই বৈঠকে বাংলাদেশকে ১১ টি সেক্টরে বিভক্ত করে সীমানা চিহ্নিত করা হয়। প্রতিটি সেক্টরে একজন কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়।
১১ সেক্টরের পরিচয়
এক নম্বর সেক্টর: চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ফেনী নদী পর্যন্ত নিয়ে গঠিত।
দুই নম্বর সেক্টর: নোয়াখালী, আখাউড়া, ভৈরব রেললাইন পর্যন্ত কুমিল্লা জেলা, সিলেট জেলার হবিগঞ্জ, ঢাকা ও ফরিদপুর জেলার কিছু অংশ।
তিন নম্বর সেক্টর: আখাউড়া, ভৈরব রেললাইন থেকে পূর্ব দিকে কুমিল্লা জেলা, সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমা, ঢাকা জেলার অংশবিশেষ ও কিশোরগঞ্জ জেলা নিয়ে গঠিত।
চার নম্বর সেক্টর: সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চল খোয়াই-শায়েস্তাগঞ্জ রেললাইন ছাড়াও পূর্ব ও উত্তর দিকে ডাউবি সড়ক নিয়ে গঠিত।
পাঁচ নম্বর সেক্টর : সিলেট জেলার পশ্চিমাঞ্চল সিলেট-ডাউকি সড়ক হতে সুনামগঞ্জ-ময়মনসিংহ সড়ক পর্যন্ত এলাকা নিয়ে গঠিত।
ছয় নম্বর সেক্টর: রংপুর ও দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁও মহকুমা নিয়ে গঠিত।
সাত নম্বর সেক্টর: দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাঞ্চল, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া জেলা নিয়ে গঠিত।
আট নম্বর সেক্টর: কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুরের অধিকাংশ এবং খুলনা জেলার দৌলতপুর-সাতক্ষীরা সড়ক পর্যন্ত এলাকা নিয়ে গঠিত।
নয় নম্বর সেক্টর: দৌলতপুর-সাতক্ষীরা সড়ক থেকে খুলনা জেলার দক্ষিণাঞ্চল, ফরিদপুর জেলা অংশবিশেষ এবং বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা নিয়ে গঠিত।
দশ নম্বর সেক্টর: দশ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল নৌ কমান্ডের, সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল ও অভ্যন্তরীণ নৌপথ ৷ এগার নম্বর সেক্টর: কিশোরগঞ্জ ছাড়া ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলা নিয়ে গঠিত।
১১ সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ও সাফল্য
এক নম্বর সেক্টর:
এই সেক্টরভুক্ত ছিল চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর একাংশ। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান (জুন পর্যন্ত), পরে সেক্টর কমান্ডার হন মেজর রফিকুল ইসলাম। এই সেক্টর ৫টি সাব সেক্টরে বিভক্ত ছিল- ঋষিমুখ সাব-সেক্টর, শ্রীনগর সাব-সেক্টর, মনুঘাট সাব-সেক্টর, তবলছড়ি সাব- সেক্টর ও ডিমাগিরী সাব-সেক্টর। ১ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার ছিল হরিণা।
জুলাই মাসে জেড ফোর্স গঠিত হলে মেজর জিয়ার স্থলাভিষিক্ত হন মেজর রফিক। এছাড়া প্রতি সাব সেক্টরে ছিলেন একজন করে সাব- সেক্টর কমান্ডার। এই সেক্টরের অধীনে নিয়মিত সৈন্য ছিল ২,০০০। এর মধ্যে ১,৪০০ ইপিআর, ২০০ পুলিশ, ৩০০ সেনাবাহিনী এবং ১০০ নৌ বাহিনী ও বিমান সেনা। এছাড়া বেসামরিক গণবাহিনী ছিল প্রায় ৮,০০০। এই সেক্টরের প্রথম পরিকল্পিত যুদ্ধ ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কুমিরার যুদ্ধ।
৩ দিন স্থায়ী এই যুদ্ধের পর ২৮ মার্চ কুমিরা পাকবাহিনীর দখলে চলে যায়। ২০ এপ্রিল মিরশ্বরাই থানায় পাকবাহিনী প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন সৈন্য হতাহত হয়। এই সেক্টরে মে-জুন মাসে উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ চাঁদগাজী যুদ্ধ, চিকনছাড়া যুদ্ধ। এসব যুদ্ধে বেশ কযেকজন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। জুলাই থেকে আরো অধিক সংখ্যক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোদ্ধা যোগ দিলে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস বেড়ে যায়।
জুলাই মাসে দেবীপুর বিওপি, করুইয়া বাজার, হিয়াকুতে পাকসেনাদের হেড কোয়ার্টারে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালিয়ে শত্রু বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি করে। এ মাসেই আমলিকা তাদের অধিকার আসে। ১ নম্বর সেক্টরে তৎপরতা আরো বৃদ্ধি পায় সেপ্টেম্বর মাসে। এ মাসেই ছাগলনাইয়া বিওপি এবং পরের মাসে সলিয়াদীঘি যুদ্ধে বাঙালিরা সাফল্য লাভ করে। নভেম্বর মাসে চাঁদগাজীর যুদ্ধেও মুক্তিবাহিনীর সাফল্য অর্জিত হয়।
ডিসেম্বরের শুরুতে ২ নম্বর সেক্টরের সঙ্গে যৌথ অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে যায়। ১ ডিসেম্বর ছাগলনাইয়া শত্রুমুক্ত হয়। ১২ ডিসেম্বর সীতাকুন্ড, ১৬ ডিসেম্বর কুমিরা ও চট্টগ্রাম হানাদার বাহিনী মুক্ত হয়। ১ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন যুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার ছাড়াও নেতৃত্ব দেন ক্যাপ্টন মাহফুজ, লে. শওকত, ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম, ক্যাপ্টেন অলি, ক্যাপ্টেন শামসুল হুদা প্রমুখ।
দুই নম্বর সেক্টর:
এই সেক্টরভুক্ত ছিল নোয়াখালী, আখাউড়া-ভৈরব, রেললাইন পর্যন্ত কুমিল্লা জেলা, সিলেটের হবিগঞ্জ মহকুমা, ঢাকা ও ফরিদপুরের কিছু এলাকা। প্রথম এই সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন খালেদ মোশাররফ। পরে এই দায়িত্ব পান মেজর এ.টি.এম. হায়দার। এই সেক্টরের অধীনে ছিল ৩০ হাজারের মতো গেরিলা সৈনিক। নিয়মিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল ৪ হাজার।
২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার খালেদ মোশাররফ এই সেক্টরকে ৬টি সাব সেক্টরে ভাগ করেন। এগুলো ছিল- ১. গঙ্গাসাগর, আখাউড়া এবং কসবা সাব-সেক্টর; ২. মন্দভাগ সাব-সেক্টর; ৩. শালদা নদী সাব-সেক্টর; ৪. মতিনগর সাব-সেক্টর; ৫. গোমতীর দক্ষিণে নির্ভরপুর সাব-সেক্টর ও ৬. রাজনগর সাব-সেক্টরের। সেপ্টেম্বরের পর এই সেক্টরে কমান্ডার হন মেজর হায়দার।
তিন নম্বর সেক্টর:
এই সেক্টরের আওতাধীন এলাকা ছিল উত্তরের সিলেট শ্রীমঙ্গলের কাছাকাছি থেকে দক্ষিণে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া পর্যন্ত। যার অন্তর্ভুক্ত ছিল হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারের অংশ এবং নারায়ণগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের অংশবিশেষ। এই সেক্টরে গেরিলা সংখ্যা ছিল ১০ হাজার। এই সেক্টরে সাব-সেক্টর ছিল ১০টি। তিন নম্বর সেক্টরের প্রতিটি সাব সেক্টরে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত ছিল।
জুন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হয় তেলিয়াপাড়া, আখাউড়া ও মাধবপুরে। জুলাই মাসে নরসিংদী, কাপাসিয়া, মনোহরদী ও কিশোরগঞ্জের কয়েকটি থানায় মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা চালানো হয়। তবে অক্টোবর থেকে গেরিলাদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। এ মাসে ‘এস’ ফোর্স গঠিত হয়। মেজর শফিউল্লাহর বদলে সেক্টর কমান্ডার হন মেজর নূরুজ্জামান।
সেপ্টেম্বর মাস থেকে উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হয় আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, মনতলা, তেলিয়াপাড়ায়। এসব যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী সাফল্য লাভ করে। ডিসেম্বরের ১৩ তারিখের মধ্যে আশুগঞ্জ, ভৈরব, নরসিংদী মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে এবং পরের দিন তারা ঢাকা অভিমুখে রওনা হন।
এভাবে ৩ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর বিজয় সূচিত হয়। সেক্টর কমান্ডার ছাড়াও এ সেক্টরে নেতৃত্ব দেন মেজর মঈন, মেজর মতিউর, ক্যাপ্টেন সুবেদ আলী ভূঁইয়া, ক্যাপ্টেন মতিন, মেজর নাসিম প্রমুখ।
চার নম্বর সেক্টর:
৪ নম্বর সেক্টর সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চল খোয়াই-শায়েস্তাগঞ্জ রেললাইন ছাড়াও পূর্ব ও উত্তর দিকে সিলেট ডাউকি সড়ক পর্যন্ত প্রায় ১০০ মাইল সীমান্ত এলাকা নিয়ে গঠিত ছিল। মোট ৬টি সাব সেক্টরে বিভক্ত ছিল এই সেক্টর। এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর সি.আর.দত্ত। সেক্টরে গেরিলা সংখ্যা ছিলো ৮,০০০ এবং নিয়মিত বাহিনী ছিল ৪,০০০। প্রথমে সেক্টর হেডকোয়ার্টার ছিল করিমগঞ্জ পরে নাসিমপুর।
পাঁচ নম্বর সেক্টর:
পাঁচ নম্বর সেক্টর সিলেট জেলার পশ্চিমাঞ্চল সিলেট-ডাউকি সড়ক থেকে সুনামগঞ্জ- ময়মনসিংহ সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী। সেক্টরের সংকেতিক নাম ছিল “টাইগার লিডার’। ৬টি সাব সেক্টরে সেক্টরটি বিভক্ত ছিল। রাস্তাঘাটের অভাব, দুর্গম এলাকা, প্রতিকূলশ প্রাকৃতিক পরিবেশ সত্ত্বেও সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে ছাতক, রাধানগরও টেংরাটিলা ছাড়া প্রায় ২০০ বর্গমাইল এলাকা মুক্ত করা হয়।
অক্টোবর মাসে জেড ফোর্সের অধীন মেজর শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে ইস্টবেঙ্গল এ সেক্টরে যোগ দিলে সেক্টরের শক্তি বৃদ্ধি পায়। অক্টোবর থেকে বড় রকমের যুদ্ধ হয় নিকলি, ছাতক, সাচনা-জামালগঞ্জ, টেকেরঘাট, গৌরীনগর, রাধানগর, তাহিরপুর, আজমিরীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, টেংরাটিলা। ছাতকে বড় রকমের যুদ্ধ হয় ১৩-১৯ অক্টোবর। মোট চার শতাধিক পাক সৈন্য এতে নিহত হয়।
৩০ নভেম্বর রাধানগর কমপ্লেক্স মুক্তিবাহিনী দখল করে। অবশ্য ডিসেম্বরের প্রথম দিক থেকেই মুক্তিবাহিনী আরো সাফল্য লাভ করতে থাকে। ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ৫ নম্বর সেক্টরের সমস্ত এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। এ সেক্টরে সেক্টর কমান্ডার ছাড়া যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন সুবেদার মেজর বি আর চৌধুরি, লে. তাহের আখঞ্জী, ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন, ক্যাপ্টেন মুসলিম প্রমুখ। এই সেক্টরে এক হাজার নিয়মিত বাহিনী ও ৯ হাজার গণবাহিনী সহ মোট ১০,০০০ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
ব্রিগেড ফোর্স
১১টি সেক্টর ও অনেকগুলো সাব-সেক্টর ছাড়াও রণাঙ্গনকে তিনটি ব্রিগেড ফোর্সে বিভক্ত করা হয়। ফোর্সের নামকরণ করা হয় অধিনায়কদের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে। মেজর জিয়াউর রহমান ছিলেন ‘জেড ফোর্স’, মেজর কে.এম. শফিউল্লাহ ছিলেন ‘এস ফোর্স, এবং মেজর খালেদ মোশাররফ ছিলেন ‘কে ফোর্স’-এর অধিনায়ক।
জুন মাসে ১ম, ৩য় এবং ৮ম ইস্ট বেঙ্গল নিয়ে জেড ফোর্স গঠিত হয়। মে মাসে ২য় ইস্ট বেঙ্গল ও ৩ নং সেক্টর নিয়ে এস ফোর্স গঠিত হয়। মে মাসে ৪র্থ, ৯ম, ১০ম ইস্ট বেঙ্গল নিয়ে কে ফোর্স গঠিত হয় ।
সারসংক্ষেপ
মুজিবনগর সরকার কর্তৃক বাংলাদেশকে রণকৌশলের দিক দিয়ে ১১টি সেক্টর ও ৩টি ব্রিগেডে বিভক্তিকরণের ফলে যুদ্ধ পরিকল্পিত রূপ লাভ করে। সেক্টরের নিয়মিত বাহিনী এবং বিপুল সংখ্যক গণবাহিনীর সদস্য এবং স্থানীয়ভিত্তিক গড়ে ওঠা মুক্তিযোদ্ধা দলগুলো সম্মিলিতভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালের জুন-জুলাই এরপর সাফল্যের দিকে এগিয়ে যায়।
সামান্য অস্ত্র নিয়ে শুধুমাত্র মনোবল ও দেশপ্রেমকে সম্বল করে একটি শক্তিশালী বাহিনীকে পরাভূত করা সম্ভব হয়। বহু যোদ্ধার আত্মত্যাগের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর ঈন্সিত স্বাধীনতা অর্জিত হয়।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র, দশম খন্ড, ঢাকা, তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়, ১৯৮৪
২। কে. এম. মোহসীন, মেজর রফিকুল ইসলাম, “মুক্তিযুদ্ধ সামরিক ও বেসামরিক প্রতিরোধ”, সিরাজুল ইসলাম (সম্পাদিত), বাংলাদেশের ইতিহাস ১৭০৪-১৯৭১, প্রথম খন্ড, ঢাকা, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০০।
৩। মোঃ খলিলুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ ও নৌ-কমান্ডো অভিযান, ঢাকা, শিরীন রহমান, ১৯৯৭।
৪। মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এগারটি সেক্টর বিজয় কাহিনী, ঢাকা, ইউপিএল, ১৯৯১।
৫। এ.এস.এম. সামছুল আরেফিন, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান, ঢাকা, ইউপিএল, ১৯৯৫।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন:
১। মুক্তিযুদ্ধকালে সেক্টর গঠনের কারণ নির্ণয় করুন ।
২। কি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয় লিখুন।
৩। বাংলাদেশকে যে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয় সেই এলাকাগুলোর নাম সংক্ষেপে লিখুন।
রচনামূলক প্রশ্ন:
১। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর গঠনের কারণ ও প্রেক্ষাপট আলোচনা করুন। ১১টি সেক্ট আওতাভুক্ত এলাকা চিহ্নিত করুন
২। মুক্তিযুদ্ধে গঠিত ১১টি সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ও এর সাফল্য পর্যালোচনা করুন।
