বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি কূটনীতিকদের ভূমিকা সূচিপত্র, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি জনযুদ্ধ। স্বাভাবিকভাবেই এই যুদ্ধে রাষ্ট্র-সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অবদান থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একটি ক্ষেত্র কূটনৈতিক জগত। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কূটনৈতিক জগতের আওতা এবং গভীরতা ব্যাপক। যুদ্ধ এবং শান্তিকালীন কূটনীতিক তৎপরতার মাধ্যমে নানান সমস্যা ও তার সমাধানের পথ সন্ধান করা সম্ভব।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার এ দিকটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার মুজিবনগর সরকার সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছিল এবং সে মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। মুজিবনগর সরকারের কূটনীতিক তৎপরতার একটি বিশেষ দিক ছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাকিস্তান দূতাবাসে সেসব বাঙালি কূটনীতিক ছিলেন তাদের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত করা। অর্থাৎ তারা যেন পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে এ মর্মে মুজিবনগর সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি কূটনীতিকদের ভূমিকা সূচিপত্র

অধ্যায় এক: ভূমিকা
- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি কূটনীতিকদের ভূমিকা
- গবেষণা অভিসন্দর্ভ রচনার উদ্দেশ্য
- গবেষণা অভিসন্দর্ভের অধ্যায় বিন্যাস
- গবেষণা অভিসন্দর্ভ রচনায় তথ্যের সীমাবদ্ধতা
- কূটনীতিক এর সংজ্ঞা, পরিচিতি ও ব্যাখ্যা
- প্রকাশনা পর্যালোচনা
অধ্যায় দুই: মুজিবনগর সরকার গঠন ও কূটনীতিক তৎপরতা
- মুজিবনগর সরকার গঠন ও কূটনীতিক তৎপরতার ভূমিকা
- মুজিবনগর সরকার গঠনের প্রেক্ষাপট
- মুজিনগর সরকার গঠন ও প্রধানমন্ত্রীত্ব নিয়ে বিতর্ক
- মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ ও সরকার কাঠামো
- মুজিবনগর সরকার নামকরণের ব্যাখ্যা
- মুজিবনগর সরকারের বৈদেশিক নীতি ও এর বৈশিষ্ট্য
- মুজিবনগর সরকারের কূটনীতিক তৎপরতা ও কর্মপরিকল্পনা
- মুজিবনগর সরকারের কূটনীতিক তৎপরতার সাফল্য
- মুজিবনগর সরকারের কূটনীতিক উদ্যোগের গুরুত্ব
অধ্যায় তিন: মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও পাকিস্তান দূতাবাসে নিযুক্ত বাঙালি কূটনীতিকদের অংশগ্রহণ
- মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও পাকিস্তান দূতাবাসে নিযুক্ত বাঙালি কূটনীতিকদের অংশগ্রহণের ভূমিকা
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য
- বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ সূচনা ও পাকিস্তান দূতাবাসে বাঙালি কূটনীতিকদের অবস্থান
- মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তান দূতাবাসগুলোর অভ্যন্তরীণ চিত্র
- মুজিবনগর সরকার কর্তৃক বাঙালি কূটনীতিকদের পাকিস্তানের আনুগত্য পরিবর্তনের আহ্বান
- বাঙালি কূটনীতিকদের পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগ ও তাদের প্রতিক্রিয়া
- পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগ পরবর্তী বাঙালি কূটনীতিকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা
- বাঙালি কূটনীতিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর পাকিস্তানিদের অত্যাচার-নির্যাতন
অধ্যায় চার: মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বাঙালি কূটনীতিকদের কর্মতৎপরতা
- মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বাঙালি কূটনীতিকদের কর্মতৎপরতার ভূমিকা
- মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বাঙালি কূটনীতিকদের কর্মতৎপরতা
- জনমত গঠনে ভূমিকা
- সভা-সমাবেশ, র্যালির আয়োজন ও সংগঠন প্রতিষ্ঠা
- সভা-সমাবেশে বক্তৃতা
- গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার প্রদান
- প্রতিবেদন তৈরি, প্রচারপত্র, পুস্তিকা প্রকাশ ও প্রচার
- আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মেলনে যোগদান
- জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব
- জ মিশন পরিচালনা কার্যক্রম
- মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তহবিল সংগ্রহ
- পাকিস্তান সরকারের মিথ্যা প্রচারণা ও জাতিসংঘের কার্যক্রমের প্রতিবাদ
- মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা
- মুজিবনগর সরকারের বিশেষ প্রতিনিধিদের সহচর হিসেবে ভূমিকা পালন
- মুজিবনগর সরকারের মুখপাত্র হিসেবে ভূমিকা পালন
- পাকিস্তান সরকারের গোপন তথ্য দূতাবাস থেকে ফাঁস বা গুপ্তচরবৃত্তি কর্মতৎপরতা
- বিভিন্ন দূতাবাসে নিযুক্ত বাঙালি কূটনীতিকদের বাংলাদেশের পক্ষে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা
- পাকিস্তান সরকারের অন্যান্য চাকরিতে নিযুক্ত ব্যক্তিদের পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগে উৎসাহ প্রদান
- যোগাযোগ বা গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম সরবরাহে সহায়তা
- কূটনীতিকদের বাসস্থানকে ব্যবহার
- কবি সাহিত্যিকদের সহযোগিতা
- বাংলাদেশের সমর্থনে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ
- বাংলাদেশের পতাকা সমুন্নত
অধ্যায় পাঁচঃ মুজিবনগর সরকার থেকে বহির্বিশ্বে প্রেরিত বাঙালি কূটনীতিক প্রতিনিধিদের কর্মতৎপরতা
- মুজিবনগর সরকার থেকে বহির্বিশ্বে প্রেরিত বাঙালি কূটনীতিক প্রতিনিধিদের কর্মতৎপরতা
- বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর কর্মতৎপরতা
- অন্যান্য কূটনীতিক প্রতিনিধিদের কর্মতৎপরতা

অধ্যায় ছয়: উপসংহার
১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়। নির্বাচনের ফলাফলের পর আপামর জনসাধারণ মনে করেছিল এই প্রথমবার বাঙালি প্রধানমন্ত্রী হবেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীক শেখ মুজিবুর রহমান। আমেরিকার ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, ১৯৭০ এর নির্বাচনের পুরো ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার আগেই ৮ ডিসেম্বর স্টেট ডিপার্টমেন্টের ইন্টিলিজেন্স ও রিসার্চের প্রধান রে ক্লাইন কিসিঞ্জারের কাছে একটি বার্তা পাঠান।
সেখানে তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিব ‘ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করতে যাচ্ছেন ও ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছেন। যা ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কাছেও অভাবিত। তাই ১৯৭১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ক্ষমতা হস্তান্তর না করার গোপন ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকে।
২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক নিরস্ত্র ও নিরীহ বাঙালি জাতির ওপর আক্রমণের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র প্রকাশ্য রূপ পায়। পাকিস্তানিদের অতর্কিত আক্রমণের ফলে অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন ঘটে এবং কিছুকালের জন্য সারা দেশে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়। সেই সময়ে এদেশে কে সুনিশ্চিতভাবে ক্ষমতায় রয়েছে তা বলা কঠিন হয়ে যায়।
এমনকি পাকিস্তান না বাংলাদেশ সেটাও বলা সহজ নয়। ঢাকার ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে কিন্তু ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। প্রত্যেক এলাকায় পাকিস্তান বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের নেতৃত্বে বিদ্রোহ শুরু হয়ে যায় যা ক্রমেই প্রতিরোধ যুদ্ধে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যতটা না পেশাদার সৈনিকদের তার অধিক জনতার। বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ এই যুদ্ধে কোনো না কোনো উপায়ে অংশগ্রহণ করেছে। ছাত্র, শিক্ষক, পুলিশ, সেনাসদস্য, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যসহ আপামর জনগণ যেমন মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল তেমনি পাকিস্তান সরকারের অধীনে চাকরিরত বাঙালি সদস্যরাও নানা উপায়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করে।
সরকারি চাকুরেদের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের বড় প্রমাণ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে অসহযোগ আন্দোলনের সফলতায়। সরকারি চাকুরেদের একটি বিশেষ শাখা হচ্ছে যারা বিভিন্ন দেশে কূটনীতিক হিসেবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন।
বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানের দূতাবাস বা মিশন প্রতিষ্ঠার রীতি চালু হয় ১৯৪৯ সাল থেকে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান পররাষ্ট্র দপ্তরের অধীনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাকিস্তান দূতাবাস বা মিশনগুলোতে অনেক বাঙালি সদস্য কর্মরত ছিলেন।
এসব বাঙালি সদস্যদের মধ্যে ২৫ মার্চের গণহত্যার পরপরই ৬ এপ্রিল ভারতের দিল্লিতে পাকিস্তান মিশনে কর্তব্যরত দুইজন বাঙালি কূটনীতিক কে এম শিহাবুদ্দিন ও আমজাদুল হক পাকিস্তানের আনুগত্য অস্বীকার করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ মধ্যরাতে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে গ্রেফতারের পূর্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
পাকিস্তানের দিল্লি মিশনের এই দু’জন বাঙালি সদস্য পাকিস্তানের আনুগত্য ত্যাগ করে ভারত সরকারের কাছে নিরাপত্তা আশ্রয় প্রার্থনা করেন। ভারত প্রতিবেশি রাষ্ট্র হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে পাকিস্তানি জান্তার আক্রমণের বিষয়ে সম্পূর্ণ অবহিত ছিল। ফলে ভারত এই দু’জন বাঙালি কূটনীতিককে নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করে। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশের কূটনীতিক দূতাবাস বা মিশনের বাঙালি সদস্যরা তখনও ছিলেন অনেকটাই দ্বিধান্বিত।
কেননা বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল ঠিকই কিন্তু বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে বন্দি এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য কোনো সরকার গঠিত হয়নি। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার ঘোষিত হয় এবং ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। পরবর্তীকালে বৈদ্যনাথতলার নামকরণ করা হয় মুজিবনগর। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার পরিচালিত হয় ভারতের কলকাতা থেকে যা মুজিবনগর সরকার হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পায়। মুজিবনগর সরকার তার নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে একটি যুদ্ধকালীন সরকারের সমগ্র কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে।
যুদ্ধকালীন সরকার হিসেবে মুজিবনগর সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্ভাব্য সকল যুদ্ধক্ষেত্রসমূহে জোর কর্মতৎপরতা শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্র সমূহের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল কূটনীতিক ফ্রন্টে যুদ্ধ। আর এই কূটনীতির ফ্রন্টের যুদ্ধক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাকিস্তানি দূতাবাসসমূহে কর্মরত বাঙালি সদস্যদের যুক্ততা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করার পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত বাঙালি কূটনীতিকদের পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগের আহ্বান জানায়। মুজিবনগর সরকারের এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাঙালি কূটনীতিকরা তাদের আনুগত্য পরিবর্তন করেন। আবার কেউ কেউ মুজিবনগর সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এদের মধ্যে ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত, মহিউদ্দিন আহমদ, ওয়ালিউর রহমান ও কমর রহীম।
তারা সকলেই মুজিবনগর সরকারেরর শপথ গ্রহণের পর আনুগত্য পরিবর্তন করতে ইচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়ায় আবার ক্ষেত্রবিশেষে পাকিস্তান সরকারের গোপন তথ্যাদি জানার জন্য তাদেরকে দূতাবাসের দায়িত্বে থাকতে বলা হয়। কিন্তু এর বাইরে পক্ষ ত্যাগে কেন বিলম্ব হয়েছে তা আলোচ্য ব্যক্তিবর্গ তাদের সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেননি।
বরং তারা সকলে বলেছেন মুজিবনগর সরকারের নির্দেশেই তারা পক্ষ ত্যাগে বিলম্ব করেছেন। এ সংক্রান্ত প্রকাশিত মুজিবনগর সরকারের কোনো নির্দেশ বা দলিল, এমনকি মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর কোনো বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় ধরে নেওয়া যায় যে, তারা মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্যশীল ছিলেন।
অনুগত সরকারের নির্দেশেই আনুষ্ঠানিকভাবে আনুগত্য পরিবর্তনের পূর্ব পর্যন্ত তারা সরকারের গোপন দূত হিসেবে দূতাবাসগুলোতে কাজ করেছেন। যা মুক্তিযুদ্ধকালীন ইতিহাসে বাঙালি কূটনীতিকদের একটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি কূটনীতিকদের অবদানের ইতিহাস অন্যান্য ক্ষেত্র এর তুলনায় নানাদিক থেকে ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। প্রথমত মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলেও বাংলাদেশের কোনো সরকার গঠিত হওয়ার পূর্বে স্বাধীন সত্তা হিসেবে আন্তর্জাতিক সরকারের অধীনতা স্বীকার করাটা সহজতর।
অপরদিকে যেসব দেশে পাকিস্তানের দূতাবাস বা মিশন ছিল স্বাভাবিকভাবেই সেসব দেশ পাকিস্তানের মিত্র রাষ্ট্র। এসব বিবেচনায় সাধারণভাবে মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার পর কূটনীতিকদের পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগ করার সুযোগ তৈরি হয়। এক্ষেত্রে মুজিবনগর সরকার পত্রযোগাযোগ ও অন্যান্য উপায়ে পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত এসব বাঙালিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থানের জন্য নির্দেশ দেয়।
তবে এক্ষেত্রে মুজিবনগর সরকারের কিছু কূটনীতিক কৌশল অবলম্বনের কথা সে সময়ের কর্তব্যরত কূটনীতিকদের বক্তব্য থেকে জানা যায়। বিভিন্ন দূতাবাসে কর্মরত কূটনীতিকদের মুজিবনগর সরকার পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগের জন্য বিভিন্ন তারিখ নির্ধারণ করে দেয়। তবে এসব নিয়মতান্ত্রিক অবস্থানের বাইরে অনেক কূটনীতিক অনেকটাই ব্যক্তি উদ্যোগে প্রকাশ্যে কর্মরত দেশে বা অন্য কোনো দেশে দিয়ে প্রকাশ্যে পাকিস্তানের বিরোধিতা করে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেয়।
যেমন ইরাকের রাষ্ট্রদূত আবুল ফতেহ, আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত আবদুল মোমিন, নাইজেরিয়ার বাঙালি কূটনীতিক মহিউদ্দিন আহমদ। জায়গীরদার উল্লেখযোগ্য। তারা শুরু থেকেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন। অবস্থানরত দেশের পরিবেশ অনুকূল না হওয়ায় এবং ওই দেশে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে এই বিবেচনায় লন্ডনের মতো স্থানে গিয়ে তারা তাদের আনুগত্য পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করেছেন।
তবে গবেষণায় এর বিপরীত কিছু চিত্রও ওঠে আসে। কোনো কোনো কূটনীতিক জাতিগতভাবে বাঙালি অর্থাৎ পূর্ব বাংলার অধিবাসী হয়েও শেষ অবধি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সহমর্মী ছিলেন না। আবার এমনও কূটনীতিক ছিলেন যারা বিজয়ের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত পাকিস্তান দূতাবাসে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে চাকরি করতে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হলে বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য স্বীকার করেন।
বর্তমান অভিসন্দর্ভে পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত এসব বাঙালি কূটনীতিকদের কর্মকাণ্ড অনুসন্ধানে এমন কিছু তথ্য পাওয়া যায় যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
বাঙালি কূটনীতিকদের পাকিস্তান সরকারের চাকরি ত্যাগ ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। প্রথম শ্রেণিতে ছিলেন একদল বাঙালি কূটনীতিক যাৱা মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই রাজনীতি সচেতন অর্থাৎ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিষয়ে সজাগ ছিলেন এবং বাঙালি হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক মহলের অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।
এদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল অবস্থা যা-ই হোক পাকিস্তান সরকারের অধীন চাকরি করবে না। এদের মধ্যে ছিলেন- কে এম শিহাবুদ্দিন, আমজাদুল হক, এ এইচ মাহমুদ আলী, মহিউদ্দিন আহমদ, এস এ করিম, এনায়েত করিম, আবুল মাল আবদুল মুহিত, শাহ এ এম শামসুল কিবরিয়া প্রমুখ প্রভাবশালী কূটনীতিকগণ।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে ছিলেন একদল বাঙালি কূটনীতিক যারা মুজিবনগর সরকারের নির্দেশ পাওয়ার পর আনুগত্য পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এদের সংখ্যাই বেশি। তৃতীয় শ্রেণিতে ছিলেন সে সকল কূটনীতিক যারা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দরকষাকষির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই দলভুক্ত কূটনীতিকরা তাদের মর্যাদাশীল চাকরির বিপরীতে মুজিবনগর সরকারের কাছ থেকেও সমমর্যাদার সুযোগ সুবিধা পাওয়ার জন্য দরকষাকষি করেছেন।
তাদের এই দরকষাকষিকে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু’দিক থেকে বিবেচনা করা যায়। ইতিবাচক দিক থেকে দেখলে বলা যায় যে, দরকষাকষি করাটা ন্যায়সঙ্গত। কেননা কূটনীতিক পেশার মতো একটি মর্যাদাশীল চাকরি পরিত্যাগ করে অনিশ্চিত জীবনের পথে পা বাড়াবেন তারা। তাদের পরিবারের আর্থিক নিশ্চয়তা কী হবে তা তাদের সবার আগে জানা প্রয়োজন ছিল। এ প্রয়োজন বোধ থেকে তারা দরকষাকষি করেছেন।
নেতিবাচক দিক থেকে বলা যায় যে, যেখানে ভারত, ইংল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তিনটি বৃহৎ পরাশক্তি সম্পন্ন দেশে কর্মরত কূটনীতিকরা কোনোরূপ চিন্তা না করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। সেখানে তারা কেন পরকষাকষি করছেন? অন্যান্য কূটনীতিকদের মনে এমন প্রশ্ন উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। এদের মধ্যে ছিলেন কলকাতার বাঙালি কূটনীতিক এম হোসেন আলী, দিল্লির বাঙালি কূটনীতিক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, ইংল্যান্ডের এম এম রেজাউল করিম।
আরেক শ্রেণিভূক্ত বাঙালি কূটনীতিক ছিলেন যারা মুজিবনগর সরকারের গোপন নির্দেশ অনুযায়ী, দূতাবাসে অবস্থান করে গোপনে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কাজ করেছেন। তারা প্রতি মুহূর্তে পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন। এমনকি ধরা পড়ে গেলে পাকিস্তানে ফেরত কিংবা চরম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে জেনেও তারা একাজ করেছেন। আবার এক শ্রেণির কূটনীতিক মুক্তিযুদ্ধকালীন চতুরতার আশ্রয় নিয়েছেন।
তারা মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে সকল বাঙালি কূটনীতিক বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেননি। বরং তারা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল যদি বাংলাদেশ স্বাধীন হয় তখন তারা তাদের আনুগত্য পরিবর্তন করবেন। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাস থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গতি প্রকৃতি পরিবর্তন হতে থাকলে এই শ্রেণির কূটনীতিকরা বুঝতে পারেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসা। তখন তারা তাদের পক্ষ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। অবশ্য না নিয়েও তাদের কোনো উপায় ছিল না।
কেননা অধিকাংশের পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ফেরত যাওয়ার নির্দেশ জারি হয়েছিল। এই শ্রেণির কূটনীতিকদের সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার মন্ত্রী মফিজ চৌধুরী মন্তব্য করেছেন- ‘তাঁরা সময় গণছিলেন – ইংরেজিতে যাকে বলে, ‘সিটিং ওভার দি ফেলা অর্থাৎ প্রাচীরের উপরে বসে পা দোলাচ্ছিলেন, সুযোগ মত এ পারে, কি এপারে নেমে পড়বেন, অর্থাৎ শ্যাম ও কুল দুটোই রক্ষায় রাখছিলেন।’
এই শ্রেণির কূটনীতিকদের সংখ্যাই বেশি। তারা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফিরে এসেছেন এবং যথারীতি সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পদে আসীন হয়েছেন। তারা কম-বেশি সকলেই প্রচার করেছেন যে, পরিবেশ অনুকূল না হওয়ায় তারা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে পারেননি।
তারপরও মুক্তিযুদ্ধকালীন যে ৩৮ জন কূটনীতিক বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন তাদের অবদান কিন্তু কম নয়। বিশেষ করে কলকাতার বাঙালি কূটনীতিক এম হোসেন আলীর ৬৫ জন সহকর্মী সহ দূতাবাস দখল করে নেওয়া, মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করার পূর্বেই দিল্লির দু’জন কূটনীতিক কে এম শিহাবুদ্দিন ও আমজাদুল হকের পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গতিকে তরান্বিত করেছে।
আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে এ এইচ মাহমুদ আলী কিংবা ইংল্যান্ডের মহিউদ্দিন আহমদের মতো বাঙালি কূটনীতিকের বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের ঘটনা মার্কিন মুল্লুক ও ইউরোপের অন্যান্য বাঙালি কূটনীতিকদের যেমন অনুপ্রাণিত করেছে তেমনি প্রবাসী বাজালিদেরও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন দাসক হিসেবে কাজ করেছে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন বিশ্বের বিভিন্ন গানে বাঙালি পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগের সংবাদ চরমপার কণিকায় প্রচারি হতো। যা অচিরেই বাংলার আপামর মানুষ জানতে পারতো। এর ফলে মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন রণক্ষেত্রে উৎসাহিত হয়ে ওঠেন, রাজনৈতিক কর্মীরা প্রথম সাফল্যের আস্বাদ ভোগ করে আরো উদ্দীপ্ত হন। বাঙালি এসকল অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের বাংলাদেশের পক্ষে যোগদান মুক্তিযুদ্ধের একটি গৌরবজনক ঘটনা, একটি বিশিষ্ট স্তর।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি কূটনীতিকের ভূমিকাকে সরলীকরণের উপায় সামান্য। তাদের অবদান বিচার করতে গেলে উল্লিখিত প্রতিটি দলের অবদান ইতিহাসে পৃথকভাবে স্থান পাবে সন্দেহ নেই।
তবে এটি স্বীকার্য যে, বিশ্বের সকল বাঙালি কূটনীতিক মুজিবনগর সরকারের নির্দেশে সময়মতো পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগ করলে তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অন্যভাবে প্রভাবিত করতে পারতো। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের কূটনীতিক ইতিহাস ভিন্নভাবে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হতো।
বাঙালি কূটনীতিকদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন নিঃসন্দেহে একটি বড় ঘটনা। কিন্তু কূটনীতিকদের অবদান এর মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তারা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরিতে বৈচিত্র্যপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
বলে গবেষণায় জানা যায়। যা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নানাভাবে তরান্বিত করেছে। কূটনীতিকদের পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগের সংবাদ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশ করা হতো যা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে সহায়ক ছিল। যদিও এটি তাদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য যেমন হুমকি বয়ে এনেছিল তেমনি অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে তাদের জীবনমানেরও অবনতি ঘটে।
এ অবস্থায়ও তারা বাংলাদেশের পক্ষে নানা কূটনীতিক তৎপরতা চালায়। অভিসন্দর্ভের গবেষণায় দেখা যায় যে, বাঙালি কূটনীতিকরা জনমত গঠনে শুধু কাজ করেননি। তারা মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে, আলোচনা সভায় বক্তৃতা করেছেন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
আবার সংবাদ বুলেটিন প্রকাশ, মিশন বা দূতাবাস পরিচালনা, মুজিবনগর সরকারের বিশেষ প্রতিনিধিদের সহায়ক হিসেবেও কাজ করেছেন। নেতৃস্থানীয় অনেক বাঙালি কূটনীতিক আন্তর্জাতিক অনেক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, মুজিবনগর সরকারের মুখপাত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ, কবি-সাহিত্যিকদের সহযোগিতাও করেছেন।
বাঙালি এসকল কূটনীতিকরা তাদের মর্যাদাশীল চাকরি ত্যাগ করে বাংলাদেশের সমর্থনে রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন, সাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পক্ষে তহবিল সংগ্রহ থেকে শুরু করে নানাবিধ কাজ করেছেন। এসব বিভিন্নমুখী কাজের সম্মিলনে তারা মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিকীকরণ করে তুলেছেন। বাঙালি কূটনীতিকরা তাদের বক্তব্য, কর্মতৎপরতায় বাংলাদেশের গণহত্যা, বঙ্গবন্ধুর মুক্তি, শরণার্থী সমস্যা সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের সঠিক চিত্র উপস্থাপন করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছেন।
বিদেশি দূতাবাস বা মিশনে কর্মরত অধিকাংশ কূটনীতিক তাদের পরিবারসহ সে দেশে বসবাস করতেন। ফলে বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করার সময়ও তারা সপরিবারে অংশ নেন। অনেক ক্ষেত্রেই এসব পরিবারের নারীরা পৃথকভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা, তহবিল সংগ্রহসহ নানা কাজে নিয়োজিত হন। এছাড়া পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগ করার পর এসব কুটনীতিক পরিবার আর্থিকভাবে হঠাৎ অনিশ্চয়তায় পতিত হয়।
মুজিবনগর সরকার একটি যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকার, যার পক্ষে বিদেশে বসবাসরত কূটনীতিকদের পূর্বোক্ত মর্যাদার আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব ছিল না। তারপরও মুজিবনগর সরকার এসব কূটনীতিকদের আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল। এমন আর্থিক সংকটে কূটনীতিক পরিবারের নারীরা নানা ধরনের ছোট-খাট কাজ করে এমনকি শ্রমিকের কাজ করে তাদের পরিবারের ভরণ-পোষণের কাজে নিয়োজিত হন।
একই সঙ্গে তারা দেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্যও নানা কাজ করেন। যদিও তাদের জানা ছিল না আদৌ দেশ স্বাধীন হবে কিনা। কেবল দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়া ছাড়া এমনটি করা সম্ভব নয়। একই কথা প্রযোজ্য দূতাবাস বা মিশনে নিযুক্ত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে। তাদের ব্যাপারে মুজিবনগর সরকার থেকে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না। কিন্তু বলা হয়েছিল যদি কেউ পাকিস্তানের চাকরি ত্যাগ করে তাহলে তাদের স্বাগত জানানো হবে। এমনকি তাদের কর্মসংস্থান ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও প্রদান করা হবে। মুক্তিযুদ্ধকালীন এদের সংখ্যা ছিল বেশি।
তারা সরাসরি কূটনীতিক নন কিন্তু অকূটনীতিক পদে থেকেও তারা দেশের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করেছেন। তারা নিজেরাই সংগঠিত হয়েছেন। তাদের কেউ দূতাবাস বা মিশন কর্তৃপক্ষের আক্রমণের শিকার হলে পাল্টা প্রতিবাদ করেছেন। সহকর্মীদের সঙ্গে সহমর্মিতা ও সহানুভূতি জানিয়ে অনেকে নিজে থেকেই চাকরি ত্যাগ করেছেন। পরবর্তী অনিশ্চিত জীবনে কী হবে এটি তাদের চিন্তার বাইরে ছিল।
তাদের সকলের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের জন্য কাজ করা। মুজিবনগর সরকারের প্রয়োজনে কিংবা মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজনে যে কাজ অনেক সময় সরাসরি কূটনীতিকরা করতে পারতেন না তা অনায়াসেই এসব অকূটনীতিক পদে কর্মরত ব্যক্তিরা করতেন। কেননা তারা শুরু থেকেই ছিলেন সন্দেহের বাইরে। পাকিস্তান সরকারের মূল বিবেচনা ছিল বাঙালি কূটনীতিকদের নিয়ে। তাই এসব অকূটনীতিক ব্যক্তিরা মুজিবনগর সরকার ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এমন সকল কাজ করেছেন যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি অনন্য ঘটনা।
