আজকে আমদের আলোচনার বিষয় বাংলার সশস্ত্র আন্দোলন ১৯১১-১৯৩৪
বাংলার সশস্ত্র আন্দোলন ১৯১১-১৯৩৪

বাংলার সশস্ত্র আন্দোলন ১৯১১-১৯৩৪
উনিশ শতকের শেষ দিকে ভারতে যে জাতীয়তাবাদের সূত্রপাত হয়, তা বিকাশ লাভ করে সশস্ত্র তথা বৈপ্লবিক কর্মতৎপরতার মাধ্যমে। বাংলায় এ সশস্ত্র আন্দোলন বিপ্লবী আন্দোলন নামে পরিচিত হলেও শাসক ইংরেজদের দৃষ্টিতে তা ছিল সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন। মূলত জাতীয়তাবাদের শুরু হয় নিস্ক্রিয় আন্দোলনের মাধ্যমে। এর ফলে দ্রুত তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে সশস্ত্র আন্দোলন বা বিপ্লববাদ ।
কিন্তু প্রচলিত অর্থে সন্ত্রাসবাদ বলতে যা বুঝায়, বাংলার এই আন্দোলনের জন্য তা পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়। কারণ বিপ্লবীদের উদ্দেশ্য শুধু বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টির জন্যে সন্ত্রাস নয়, বরং তা ছিল বাংলা তথা উপমহাদেশ হতে ব্রিটিশ শক্তিকে চিরতরে উৎখাত করে স্বাধীনতা অর্জন করা, দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করা। সেই বিবেচনা থেকে একে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করাই যুক্তিযুক্ত। যদিও এ বিপ্লব শেষপর্যন্ত সফল হয়নি।
বাংলায় সশস্ত্র আন্দোলনের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য
বঙ্গভঙ্গকে উপলক্ষ করে বাংলায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা হলেও তা প্রকৃতিগত কারণে ছিল কংগ্রেস সমর্থিত দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু আন্দোলনের পদ্ধতির প্রশ্নে ১৯০৬ সালে কংগ্রেস দল নরমপন্থী ও চরমপন্থী এই দু’টি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রথমোক্ত শাখাটি বয়কট ও স্বদেশী আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনকে বিঘ্নিত করার পক্ষে থাকলেও অপর শাখাটির লক্ষ ছিল সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা।
নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলনের ব্যর্থতাই সশস্ত্র আন্দোলনকে উৎসাহিত করেছিল। বাংলায় বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে এ আন্দোলন শুরু হলেও ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের পরও তা থেমে যায়নি। ১৯০৮ সালে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করার উদ্দেশে তরুণ বিপ্লবী ক্ষুদিরামের বোমা নিক্ষেপের ঘটনা প্রকৃতপক্ষে বাংলায় সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা করে।
এই বিপ্লবের কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। জি.অধিকারী মনে করেন, ১৯১৬ সাল পর্যন্ত জাতীয় বিপ্লবীদের ধারণা ছিল ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ। তবে এর পেছনে প্রথমত, ধর্মীয় কারণ বেশি ক্রিয়াশীল ছিল। উনিশ শতকের শেষার্ধে উজ্জীবিত হিন্দু জাতীয়তাবাদের বুদ্ধিবাদী প্রবক্তরা বেশি অনুপ্রাণিত করেছিলেন যুবকদের।
এদের মধ্যে প্রধান ছিলেন বঙ্কিম, তিলক, অরবিন্দ-এর মতো ব্যক্তিত্বরা যাঁরা যুবকদের কাছে এর চরিত্র হিসেবে ধর্মযুদ্ধকে চিহ্নিত করেছেন। দ্বিতীয়, কারণটি ছিল কংগ্রেসের শাসনতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি মোহভঙ্গ। বঙ্গভঙ্গ তাদের এতো দিনের ব্রিটিশ সরকারকে সহযোগিতার নীতিতে চিড় ধরায়। তৃতীয়ত, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি। বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলমানরা চাকরি ক্ষেত্রে সুবিধা পাবে- এ ভয়ও হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকের মধ্যে ছিল।
সশস্ত্র আন্দোলনের জন্য গড়ে ওঠা সংগঠন ও নেতৃবৃন্দের কর্মকান্ড
দু’পর্যায়ে বিভক্ত এ আন্দোলনের প্রথম পর্যায় বঙ্গভঙ্গের পর থেকে প্রথম মহাযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত (১৯০৬-১৪) এবং দ্বিতীয় পর্যায় প্রথম মহাযুদ্ধ (১৯১৪) থেকে শুরু করে ১৯৩৪ পর্যন্ত অভিহিত করা যায়। প্রথম পর্যায়ের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অসংগঠিত ও বিক্ষিপ্ত আন্দোলন, গুপ্ত হত্যা, সন্ত্রাস, বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ। যদিও দ্বিতীয় পর্যায়ে আন্দোলন সংগঠিত ও পরিকল্পিত হয়।
বিভিন্ন গুপ্ত সমিতির মাধ্যমে আন্দোলনকারীরা তাদের কর্মকান্ড চালায়। এই আন্দোলনের দু’টি ধারা ছিল। প্রথমত, ইংরেজ কর্মচারী ও তার সহযোগীদের হত্যার মাধ্যমে ত্রাস সৃষ্টি করা যাতে প্রশাসন পঙ্গু হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, অস্ত্র যোগাড় করে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে লড়াই করে দেশ স্বাধীন করা। এ উদ্দেশে গড়ে ওঠা সমিতির মধ্যে ঢাকার ‘অনুশীলন সমিতি’ এবং কলকাতার ‘যুগান্তর’ ছিল উল্লেখযোগ্য।
অনুশীলনের ৫০০-এর বেশি শাখা ছিল। বাংলার বিভিন্ন জেলায় সশস্ত্র বিপ্লবীরা বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। বরিশালে ‘স্বদেশ বান্ধব সমিতি’, ফরিদপুরে ব্রতী সমিতি’ ও ময়মনসিংহে ‘সুহৃদ সমিতি’ ও ‘সাধনা সমিতি’ ছিল অনুশীলন সমিতির শাখা সমিতি। এসব সভা বা সমিতিতে তরুণ সদস্যদের বল্লম, লাঠি চালনা শিক্ষা দেয়া হতো। যদিও মূল উদ্দেশ্য ছিল তরুণদের বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করা।
অনুশীলন সমিতির প্রধান সংগঠক ছিলেন পুলিন বিহারী দাস। গুপ্ত হত্যা, সন্ত্রাস ও ডাকাতির মাধ্যমে ইংরেজ প্রশাসনকে ব্যতিব্যস্ত রাখার জন্য এসব সংগঠনের নেতা ও কর্মীরা বোমা তৈরি, অস্ত্র সংগ্রহসহ নানাবিধ কাজে জড়িয়ে পড়েন। ঢাকার ‘ন্যাশনাল স্কুল’ ও ‘সোনার ন্যাশনাল স্কুল’ বিপ্লবী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পূর্ববাংলা ও আসামের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলারকে তারা দুবার হত্যার চেষ্টা করে । ১৯০৮ সালে অনুশীলন সমিতি অবৈধ ঘোষণার পর এটি গুপ্ত সমিতিতে পরিণত হয়। এই সমিতির দীক্ষা গ্রহণের পর সদস্যরা চার রকমের প্রতিজ্ঞা করা হতো- আদ্য প্রতিজ্ঞা, আস্ত প্রতিজ্ঞা, প্রথম বিশেষ প্রতিজ্ঞা, দ্বিতীয় বিশেষ প্রতিজ্ঞা। প্রতিজ্ঞার সময় তা করানো হতো কালীবাড়ি বা দেবী মূর্তির সামনে ।
ত্রৈলোক্যনাথের মতে, সমিতির সদস্যদের প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম শ্রেণীর মধ্যে ছিলেন যারা বিপ্লবের জন্য ঘরবাড়ি ত্যাগ করেছেন। এদের অনেকেই ছিলেন পলাতক আসামী। সাধারণ সভ্যরা ছিলেন পরবর্তী শ্রেণীর। এদের সম্পর্কে আশা করা হতো প্রয়োজনে এরাও বাড়িঘর ত্যাগ করবেন। শেষ শ্রেণীতে ছিলেন সংসারী এবং বাড়িঘরে থেকেই সাহায্য করা।
১৯০৮ সালে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার চেষ্টায় নিয়োজিত প্রফুল্ল চাকি আত্মহত্যা করেন। একই অপরাধে ধৃত ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়। এসময় অনেকের ফাঁসি ও দীপান্তর হয়। ১৯১০ সালে পুলিন বিহারী ৫৫ জন সহ গ্রেফতার হন। সরকারি দমননীতির ফলে এবং বিপ্লবী নেতাদের গ্রেফতার ও রাজনীতি থেকে সরে পড়ার কারণে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের আগেই বাংলার প্রথম পর্যায়ে সশস্ত্র আন্দোলনের তীব্রতা কমে আসে।
যদিও কলকাতায় অমৃতবাজারের অমৃত হাজরার পরিচালনায় একটি বোমা কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে বিপ্লবীরা আবার সংগঠিত হতে থাকে। দ্বিতীয় পর্যায়ের আন্দোলন ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক। এ পর্যায়ে আন্দোলনকারীরা সশস্ত্র আন্দোলনকে সাফল্যমন্ডিত করার জন্য কলকাতার রাজাবাজারে একটি বোমা কারখানা প্রতিষ্ঠা করে।
দিল্লিতে বিপ্লবীরা লর্ড হার্ডিঞ্জকে উদ্দেশ্য করে বোমা ছোঁড়ে, যদিও তিনি দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যান। এ পর্যায়ে আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহের জন্য বিপ্লবীদের বিদেশ থেকে অস্ত্র আমদানির প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। এসময় আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘা যতীন), ডা. যদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য (এম.এন.রায়)।
জার্মানি থেকে অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টাকালে পুলিশের সংগে গুলি বিনিময়ে ধৃত বাঘা যতীন নিহত হন এবং তাঁর দুই সহকর্মীর ফাঁসি হয়। ১৯১৬-১৭ সালে ভারতের প্রতিরক্ষা আইনে বহু বিপ্লবী গ্রেপ্তার হওয়ার পরও আন্দোলন থেমে যায়নি। দেশী-বিদেশী উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী হত্যা অব্যাহত ছিল। ১৯১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি পুলিশের ডেপুটি সুপার বসন্ত চট্টোপাধ্যায়কে ভবানীপুরে হত্যা করা হয়।
১৯২১-২২ সালে খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলন কিছুটা থেমে যায়। এছাড়া ১৯২২ সালে গান্ধিজী আইন অমান্য আন্দোলন স্থগিত করেন। এসব ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে পুনরায় সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন বেড়ে যায়। ১৯২৩ সালে ‘লালবাংলা’ নামে এক লিফলেটে অত্যাচারী পুলিশ কর্মচারীদের হত্যার আহবান জানানো হয়।
আলিপুর জেলের সুপার বন্দি বিপ্লবীদের পরিদর্শনে গেলে ১৯২৪ সালে প্রমোদ চৌধুরী তাঁকে রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেন। এসব কারণে ১৯২৪ সালে বহু বিপ্লবীকে কারারুদ্ধ করা হয়। ১৯৩০ সালে ‘মাস্টার দা সূর্যসেন চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুন্ঠন করেন। ১৯৩৩ সালে বিচারে তাঁর ফাঁসি হয়। ১৯৩০ সালে বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত কারা ইন্সপেক্টর জেনারেল সিম্পসনকে হত্যা করেন।
বিনয় ও বাদল আত্মঘাতী হন এবং দীনেশের ফাঁসি হয়। বাঙালি নারীরাও আন্দোলনে পিছিয়ে ছিলেন না। প্রীতিলতা চট্টগ্রামে ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ করেন ও নিজ জীবন উৎসর্গ করেন। বীনা দাস বাংলার গভর্নর জ্যাকসনকে হত্যা করতে ব্যর্থ হয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হন। ১৯৩০-৩৩ সালের মধ্যে বহু ইউরোপীয় অফিসার হত্যাকান্ডের শিকার হলে ব্রিটিশ সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে ।
তাছাড়া এই সময় রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের প্রতি জনগণের আকর্ষণও বেড়ে যায়। ফলে ১৯৩৪ সালের পর সশস্ত্র আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়।
সশস্ত্র আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা
সুদীর্ঘ তিন দশক স্থায়ী হলেও এ আন্দোলন শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল-
প্রথমত, বিপ্লবীদের কর্মকান্ড গোপন হওয়ায় এর লক্ষ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনমনে অজ্ঞতার কারণে জনগণের সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। ফলে ভারতবাসী স্বাধীনতা চাইলেও এই আন্দোলনের সঙ্গে ব্যাপক জনগনকে যুক্ত করা যায়নি।
দ্বিতীয়ত, ইউরোপে এসময় গড়ে ওঠা জাতীয়দাবাদী আন্দোলনে সংকীর্ণতা ছিলনা। কিন্তু সশস্ত্র আন্দোলনে সংকীর্ণতা প্রবলভাবে ছিল। বিশেষ করে হিন্দু সভ্যতা ও ধর্মের আধিক্য থাকায় মুসলমানরা আন্দোলন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। তাছাড়া তখনো পর্যন্ত মুসলমান সমাজের মধ্যে অগ্রসর শিক্ষিত যুব সমাজ তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি যেমনিভাবে হিন্দু সমাজের মধ্যে গড়ে উঠেছিল।
তাই বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজন মুসলমান তরুণ সশস্ত্র ধারার আন্দোলনে যুক্ত হলেও উল্লেখযোগ্য অংশই সম্পৃক্ত হয়নি। তাছাড়া বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত থাকায় এটি গুটি কয়েক হিন্দু যুবকদের সমিতিতে পরিণত হয়। কালী মন্দির বা মূর্তির কাছে দীক্ষার পদ্ধতিও মুসলমানদের আকৃষ্ট করেনি।
তৃতীয়ত, বিক্ষিপ্ত ও স্থানীয় পর্যায়ের এ আন্দোলনগুলো কখনোই কেন্দ্রীয়ভাবে শক্তিশালী হয়নি। ফলে ধ্যানধারণার ক্ষেত্রে বৈপরীত্য সংগঠনকে দুর্বল করে দেয়।
চতুর্থত, অপ্রতুল আধুনিক অস্ত্র ও ট্রেনিং-এর অভাব ব্যর্থতার প্রধান কারণ। অস্ত্র বলতে ছিল বন্দুক ও বোমা। এগুলো দিয়ে মাঝে মাঝে তারা সফল হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। ইংরেজদের মধ্যে যাদেরকে তারা টার্গেট করেছিল, তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যককেই তারা মারতে পেরেছিল। বরং সন্ত্রাসীদের মৃত্যুর সংখ্যাই বেশি ছিল।
পঞ্চমত, ব্রিটিশ সরকারের কঠোর দমননীতি বিপ্লবীদের স্তিমিত করে দেয়। কোন কোন ক্ষেত্রে ভারতীয়রাও ইংরেজদের সাহায্য করে।
ষষ্ঠত, রাজনৈতিক দল বহির্ভূত এ সংগঠনগুলো তরুণ ছাড়া অন্যান্য শ্রেণীর মধ্যে প্রসার ঘটাতে পারেনি। সরকারি হিসেবে ১৯০৭-১৭ সাল পর্যন্ত অভিযুক্তদের ১৮৬ জনের মধ্যে ৬৮ জনই ছিলেন ছাত্র। বাকীরা সবাই তরুণ ।
সপ্তমত, গুপ্ত সমিতিগুলোর সাংগঠনিক ব্যর্থতা ছিল প্রবল। একমাত্র অনুশীলন সমিতি ছাড়া বেশির ভাগ সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব না থাকায় বিচ্ছিন্নভাবে পরিকল্পনা নেয়া হতো। শুধু পরিকল্পনার অভাবে বেশির ভাগ অভিযান পরিচালিত হয়েছে অপরিকল্পিত ও তাৎক্ষণিক ভিত্তিতে।
অষ্টমত, গুপ্ত সমিতি পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল বিপুল পরিমান অর্থের। অর্থ সংগ্রহে তাদের প্রধান উপায় ছিল টাকা লুট বা ডাকাতি করা। ডাকাতির দিকেই সমিতিগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়ে। ফলে জনগণ সাধারণ ডাকাতদের মতোই মনে করে অনেক সময় তাদের ধাওয়া করতো, ধরে পুলিশে দিয়ে দিত ।
পরিশেষে, এই সমিতিগুলোর জনবিচ্ছিন্নতা এর ব্যর্থতার প্রধান কারণ। বেশিরভাগ বিপ্লবীরা ছিলেন ব্রাহ্মণ বা উচ্চবর্ণের হিন্দু। সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্নবর্ণের হিন্দু ও মুসলমানদের সঙ্গে তাদের তেমন সম্পর্ক ছিল না । বিপ্লবীরা তাদের কর্মকান্ডের আওতায় কৃষকদের আনতে পারেনি যারা ঐ সংকটে তাদের সহায়তা করতে পারত ।
আন্দোলনের গুরুত্ব
এই আন্দোলন ব্যর্থ হলেও এর পরোক্ষ ফল ছিল সুদূরপ্রসারী। বিপ্লবীদের স্বদেশ প্রেম, আত্মত্যাগ সাধারণ দেশবাসীর মধ্যে উদ্দীপনা সঞ্চার করে, অন্যদিকে ব্রিটিশ শাসকবর্গের মনে ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টি করে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশাপাশি এই সশস্ত্র আন্দোলনই ব্রিটিশ সরকারকে ভারতবাসীর জন্য স্বায়ত্তশাসন প্রদানে বাধ্য করে।
ফলে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন প্রণয়ন করে যার ভিত্তিতে ১৯৩৭ সালে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সশস্ত্র আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গেলে অনেক বিপ্লবী কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলন, বিপ্লবী মার্কসবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। সন্ত্রাসবাদের প্রতি জনগণের প্রতিক্রিয়ার কথা চিন্তা করে তারা গণবিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হন।
অনেকে কারাগারে বসে মার্কসবাদী আদর্শে দীক্ষা গ্রহণ করেন যা পরবর্তী সময়ে বাংলায় ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ক্ষেত্র তৈরি করে।
সারসংক্ষেপ
বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলনের পরিণতিতে বাংলায় যে সশস্ত্র আন্দোলনের সূত্রপাত হয় অনুশীলন ও যুগান্তর সমিতির মাধ্যমে তা এগিয়ে যায়। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশীয় শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষে অসংখ্য তরুণকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা হয়। বহু সরকারি কর্মকর্তা ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে হত্যা করে বিপ্লবীরা ব্রিটিশদের মনে এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি করেন।
যদিও প্রধানত সমন্বয়ের অভাব, জনবিচ্ছিনতা, অস্ত্রের অপ্রতুলতা এবং বিপ্লববাদী আন্দোলনের ধ্যান-ধারনা ও অভিজ্ঞতার অভাবের কারণে তাদের আন্দোলন ব্যর্থ হয়। স্বীকার করতে হবে এই আন্দোলন স্বাধীনতাকে তরান্বিত করেছিল।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। মুনতাসীর মামুন ‘সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন (১৯০০-১৯১৮), সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ও মুনতাসীর মামুন (সম্পাদিত), বাংলাদেশে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন, ঢাকা, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ১৯৮৬।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নঃ
১। বাংলার সশস্ত্র আন্দোলনের (১৯১১-৩৪) কারণ সংক্ষেপে আলোচনা করুন।
২। বাংলার সশস্ত্র আন্দোলনের (১৯১১-৩৪) গুরুত্ব আলোচনা করুন ।
৩। সশস্ত্র আন্দোলনের জন্য প্রতিষ্ঠিত অনুশীলন সমিতির কর্মকান্ড সংক্ষেপে লিখুন।
রচনামূলক প্রশ্ন:
১। বাংলার সশস্ত্র আন্দোলন (১৯১১-১৯৩৪) সংক্ষেপে আলোচনা করুন ।
