বাঙালিদের জন্য অস্ত্রের চালান আসছে কলকাতায় | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

বাঙালিদের জন্য অস্ত্রের চালান আসছে কলকাতায় – কড়া নিরাপত্তা প্রহরায় সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী বেশ কটি বিশেষ ট্রেন এখন প্রতিদিন এখানে এসে পৌঁছুচ্ছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রকাশ, এইসব অস্ত্র আসছে বাঙালি গেরিলাদের জন্য, যাঁরা পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছে এবং প্রতীয়মান হচ্ছে পাক আর্মির বিরুদ্ধে তৎপরতা বৃদ্ধির জন্য তাঁরা এখন প্রস্তুতি নিচ্ছে।

 

বাঙালিদের জন্য অস্ত্রের চালান আসছে কলকাতায় | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

 

বাঙালিদের জন্য অস্ত্রের চালান আসছে কলকাতায়

গেরিলাদের দিক দিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে তাঁদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থনে ভারত কতদূর পর্যন্ত এগোবে। এযাবৎ ভারতীয়রা নিরাপদ আশ্রয়, প্রশিক্ষণ ও কিছু পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র যুগিয়ে চলেছে। ছয় মাস বয়েসী স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, কলকাতায় যাঁদের ঘাঁটি, অভিযোগ করছেন যে, প্রশিক্ষণ-প্রাপ্ত সবাইকে হাতিয়ার যোগানোর মতো যথেষ্ট অস্ত্র ভারত তাঁদের দিচ্ছে না। অধিকন্তু ভারত, মূলত তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পরামর্শে, বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় নি। এই সংযত থাকার পেছনে মূল ভাবনা যেটা কাজ করেছে তা হলো স্বীকৃতি দিলে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।

কঠোর প্রহরায় মালবাহী ট্রেনের কলকাতা আগমন-প্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভারত গেরিলাদের আরো অস্ত্র যোগাতে সম্মত হয়েছে। তবে তার অর্থ এই নয় যে ভারত দিতে প্রস্তুত হয়েছে গেরিলারা আসলে যা চাচ্ছে-সম্মুখ-যুদ্ধ করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভূমি দখলের চেষ্টায় ভারতের গোলা, অস্ত্র ও বিমান সমর্থন। ভারতীয় সৈন্যরা এমনি অভিযানে সংশ্লিষ্ট না হলেও পাকিস্তানিরা একে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলেই বিবেচনা করবে।

বিভক্ত পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম উভয় সীমান্তেই ভারত ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মধ্যে সন্দেহের মাত্রা বেড়ে চলেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের সংবাদে জানা যায় বরাবরকার উত্তেজনাপ্রবণ সীমান্ত এলাকায় উভয় পক্ষই শক্তি জোরদার করছে। বর্তমান সংবাদদাতা পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় সৈন্য চলাচল দেখতে পেয়েছে। পেট্রাপোলের একটি সীমান্ত কেন্দ্রে ভারতীয় সৈন্যরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল ট্যাঙ্কের বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য রিকয়েললেস রাইফেল নিয়ে।

আরেকটি ভারত-পাক যুদ্ধের সম্ভাব্যতা নিয়ে নানা গুজব রয়েছে। তবে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে তা অত্যাসন্ন। সৈন্য চলাচলের ব্যাপারটা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশও হতে পারে।

 

বাঙালিদের জন্য অস্ত্রের চালান আসছে কলকাতায় | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

 

সাম্প্রতিককালে ভারতের সংবাদ-মাধ্যম জুড়ে রয়েছে পাকিস্তানের সামরিক প্রস্তুতি, কতক সীমান্ত থেকে বেসামরিক নাগরিকদের স্থানান্তর এবং যুদ্ধোন্মাদনা ও ভারত-বিদ্বেষী প্রচারণা সংক্রান্ত রিপোর্ট। একইরকমভাবে পাকিস্তানি পত্র-পত্রিকা ভরে আছে ভারতের যুদ্ধসাজ ও সীমান্তে গোলাবর্ষণের মতো উস্কানিমূলক তৎপরতার সংবাদ। উপরন্তু বাঙালি শরণার্থীদের শিবিরগুলোর চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছে পাকিস্তানি এজেন্টরা এইসব শিবিরে অনুপ্রবেশ করেছে। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে যে, পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত রাজ্য আসামের তেল শোধনাগার ও ভাণ্ডার এলাকায় নিষ্প্রদীপ ব্যবস্থা ও অন্যান্য বিমান হামলা প্রতিরোধক পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। এই সমস্ত টুকরো টুকরো সংবাদ মিলে কোনো পূর্ণাঙ্গ ছবি ফুটে না উঠলেও এটা বেশ বোঝা যায় মৌসুমি বৃষ্টি ও বন্যা সবে সমাপ্ত হওয়ার পর পাক আর্মি ও বাঙালি গেরিলা উভয় পক্ষই তাদের তৎপরতা জোরদার করতে যাচ্ছে।

আর ভারতের দিকে শরণার্থী সমস্যাজনিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বেড়েই চলেছে। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে ৯ মিলিয়নের বেশি শরণার্থী সীমান্ত অতিক্রম করেছে এবং অব্যাহতভাবে প্রতিদিন আসছে প্রায় ৩০,০০০ উদ্বাস্তু। পাকিস্তানিদের হিসেবে অবশ্য এই সংখ্যা অনেক কম।

বিদেশী কূটনীতিকদের প্রশ্ন হলো এর শেষ কোথায়, কোন পর্যায়ে গিয়ে ভারত সিদ্ধান্ত নেবে যে এর চাপ এতো বেশি যে শরণার্থী আগমন ঠেকাতে তাকে প্রত্যক্ষ সামরিক ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে। এ-দুই দেশের সরকার যাই করুক না কেন, এখানে প্রাপ্ত খবরে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে গেরিলারা শিগগিরই তাঁদের আক্রমণ জোরদার করতে চলেছে।

ইতিমধ্যেই তাঁরা কতক শক্ত আঘাত হেনেছে। প্রধান রেল যোগাযোগ ও মূল মূল সড়ক তাঁরা বিচ্ছিন্ন করেছে এবং এখনও চালু হতে দিচ্ছে না। উড়িয়ে দিয়েছে অসংখ্য সেতু এবং লাগাতার আঘাত করে চলেছে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রগুলোতে। আগস্টের পর থেকে গেরিলা ফ্রগম্যানরা পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরে নোঙর- করা জাহাজ আক্রমণ করতে শুরু করেছে। এর ফলে বৃটিশ জাহাজগুলো পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরে মাল খালাস করা বন্ধ করে দিয়েছে।

 

গেরিলারা বড় রকম সাফল্য দাবি করছে

গেরিলারা দাবি করছে তাঁরা এ-যাবৎ ২০ থেতে ৩০ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য হত্যা করেছে। এই দাবি অতিরঞ্জিত মনে হলেও পাকিস্তানিদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য বলেই মনে হয়। গেরিলাদের হতাহতের কোনো হিসেব পাওয়া যায় নি।

পূর্ব পাকিস্তানে আনুমানিক প্রায় ৮০,০০০ পাকিস্তানি সৈন্য রয়েছে। এছাড়া আছে আরো ১০,০০০ দ্রুত প্রশিক্ষণ দেওয়া অবাঙালি আধা-সামরিক বাহিনী। গেরিলাদের সংখ্যা হবে ৫০,০০০ থেকে ১,০০,০০০-এর মধ্যে। মার্চ মাসে স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ শুরুর পর এঁদের বেশির ভাগ প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

পেশাদার সৈনিকদের ভরকেন্দ্রটি গঠিত হয়েছে ১৫,০০০ সদস্য সমবায়ে, যাঁরা আধা- সামরিক সীমান্তরক্ষী দল ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল্স এবং নিয়মিত সেনা ইউনিট ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট পরিত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। গেরিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ঘাঁটি এলাকাগুলোর বেশির ভাগই সীমান্তের ভারতীয় দিকে অবস্থিত। তবে ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় বাঙালিরা সীমান্ত সংলগ্ন পূর্ব পাকিস্তান ভূখণ্ড থেকে তৎপরতা পরিচালনা করছে।

নতুন রিক্রুটদের ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে গেরিলা ও নিয়মিত সৈনিক হিসেবে। একজন পদস্থ কর্মকর্তা আমাকে জানালেন, ‘আমাদের উভয় ধরনের যোদ্ধাই দরকার। কেননা গেরিলারা পারে কেবল আঘাত করে শত্রুকে দুর্বল ও নরম করে ফেলতে। আমাদের এমন এক বাহিনী প্রয়োজন যারা ভূখণ্ড অধিকার করে রাখতে পারে।’

Leave a Comment