আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –বিভাগীয় কার্যক্রম। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
বিভাগীয় কার্যক্রম

রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্ম পরিচালনার একটি বিশেষ দিক হলো সুশৃঙ্খল দলীয় নেতৃত্ব সৃষ্টি করা এবং সকলকে দায়িত্বশীল করে গড়ে তোলা। পরিবর্তন বিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য সাধন করে যৌথ নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠা করা। এদিকে আমরা সকল সময় লক্ষ্য রেখেছি। তাই বিভাগীয় সম্পাদকমণ্ডলীর কার্যক্রম সম্বন্ধে কিছু আলোকপাত করা প্রয়োজন বোধ করছি। সামগ্রিক দলীয় কার্যক্রমে প্রত্যেক বিভাগীয় সম্পাদক যে অবদান রেখেছেন তা আপনাদের কাছে তুলে ধরছি।
দলের সামগ্রিক পত্র যোগাযোগ রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন অফিস সম্পাদক। বিভিন্ন জেলার সাথে সাংগঠনিক বিষয়ে পত্র যোগাযোগ স্থাপন, সাংগঠনিক নির্দেশাবলী প্রেরণ, দেশের বাইরে সংগঠনের যোগাযোগ রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন আমাদের অভিজ্ঞ অফিস সম্পাদক জনাব আনোয়ার চৌধুরী। এছাড়া বিভিন্ন জেলা থেকে প্রাপ্ত সংগঠনের কর্মীদের অভাব-অভিযোগ পরীক্ষা করেছেন। সাংগঠনিক বিষয়াদি সম্বন্ধীয় চিঠিপত্র সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় পেশ করেছেন।
তিনি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে সংগঠনের পক্ষ থেকে পত্র যোগাযোগ রেখেছেন। বিভিন্ন জেলা থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলি দলীয় মতামতসহ যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠিয়েছেন। এ প্রসংগে উল্লেখ্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ৫-৪-৭৩ তারিখে একটি তথ্যকেন্দ্র খোলা হয়। সকল স্তরের মানুষের বক্তব্য শোনার জন্য এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রদানের মহৎ ইচ্ছায় কেন্দ্রটি খোলা হয়।
জনগণের মতামত ব্যক্ত করার সহজ পরিকল্পনা দল থেকে গ্রহণ করা হয়। বিভিন্ন সরকারী, আধা-সরকারী এবং বাংলাদেশের সকল জেলায় যে কোন অনিয়ম অরাজকতা, স্বজনপ্রীতি বা যে কোন ক্ষেত্রে যদি কেউ কোন অবস্থার শিকারে পরিণত হয় তা হলে গোপনীয়তা রক্ষা করে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি নিয়ে কেন্দ্রটি খোলা হয়। তথ্যকেন্দ্র খোলার মাধ্যমে জনগণ, দল এবং সরকারের সাথে ওতপ্রোত যোগাযোগ স্থাপন সহজ হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি।
এ কেন্দ্রটির বরাবরের কার্য পরিচালনার গুরুদায়িত্ব বহন করতে হয় দপ্তর সম্পাদককে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক কমিটি গঠনের পর ৮-৫-৭২ থেকে ৪-৩-৭৩ তারিখ পর্যন্ত দপ্তর সম্পাদক মোট ১৫৫৮ (এক হাজার পাঁচশ আটান্নটি) বিভিন্ন ধরনের পত্র দলের পক্ষে গ্রহণ করেন। এ সময় পর্যন্ত তথ্যকেন্দ্র খোলা হয়নি। তথ্যকেন্দ্র খোলা হয় ৫-৪-৭৩ তারিখে। এর পর থেকে ডিসেম্বরের ২৬ তারিখ পর্যন্ত ৯৩৬২, (নয় হাজার তিন শত বাষট্টি)-টি বিভিন্ন অভিযোগ ও সাংগঠনিক বিষয় সম্পর্কিত পত্র দপ্তর সম্পাদক গ্রহণ করেছেন।
এর প্রত্যেকটি চিঠি পরীক্ষা করে মোট ১৫৯২টি (এক হাজার পাঁচশত বিরানব্বইটি) মন্ত্রণালয়ে যে সমস্ত অভিযোগ পত্র পাঠানো হয়েছে তার মধ্যে একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে সম্পর্কে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং ৭৭৭০টি (সাত হাজার সাতশ সত্তুরটি) বিবেচনাধীন আছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কি ব্যবস্থা পত্র দিয়ে কোন উত্তর পর্যন্ত পাইনি।
এমন কি তাদের মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি অবহিত করার জন্য ২৭-৯-৭৩ নয় শুধু মাত্র সাংগঠনিক দায়িত্বের খাতিরে উল্লেখ করতে চাই যে, কোন কোন মন্ত্রণালয় থেকে সংগঠনের পক্ষ থেকে পত্র দিয়ে কোন উত্তর পর্যন্ত পাইনি। এমন কি তাদের মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি অবহিত করার জন্য ২৭-৯-৭৩ তারিখে পত্র দেওয়া হয় তার উত্তরও পাইনি। এছাড়া দপ্তর সম্পাদক কার্যালয়ের যাবতীয় কাজ তদারক করেছেন এবং লেনদেনের পরিপূর্ণ হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন।
সংগঠনের কর্মব্যস্ত একটি বিভাগ আমাদের সমাজ কল্যাণ এবং সাংস্কৃতিক বিভাগ। বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এ বিভাগ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। সংগঠনের প্রতিটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োত্তর করেছে সুযোগ্য বিভাগীয় সম্পাদক জনাব মুস্তফা সারওয়ার। এ বিভাগ থেকে সংগঠনের জন্য একটি সাংস্কৃতিক কর্মসূচী প্রণয়ন করা হয় ।
রাজনৈতিক এবং জাতি গঠনমূলক কাজে কর্মীরা ব্যাপৃত হয়ে পড়ায় এবং অপর্যাপ্ত সময়ের কারণে আমরা গৃহীত কর্মসূচী বাস্তবায়িত করতে পারিনি। সাংস্কৃতিক বিভাগের কতকগুলি উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান হলো “মুক্তিযুদ্ধের উপর ভিত্তি করে” জনাব মুস্তফা সারওয়ার রচিত নৃত্য-নাট্য ‘ব্যাটেল অফ বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠান ৭ই জুন তারিখে অনুষ্ঠিত ‘বিক্ষুব্ধ সাতই জুন, নৃত্যনাট্য, নজরুল-রবীন্দ্র জয়ন্তীতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সমূহ। এছাড়াও সারা বছর নানা ছোট বড় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংগঠনের কর্মীদের প্রাণবস্তু রেখেছে এ বিভাগ। এ বিভাগের কাছে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন দলের নিবেদিত প্রাণ কর্মী জনাব ফজলুল হক ভূঁইয়া।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলা বিভাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর। সংগঠনের মহিলা সম্পাদিকা বেগম সাজেনা চৌধুরী প্রতিক্ষণেই সংগঠনের মহিলা ফ্রন্টে বিশেষ যোগ্যতার সাথে তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। গত কাউন্সিল সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক মহিলা সম্পাদিকার নেতৃত্বে ১১-৭-৭২ তারিখে একটি মহিলা আওয়ামী লীগ উপ-কমিটি গঠিত হয়। সংগঠনের প্রতিটি কাজেই মহিলা সম্পাদিকার নেতৃত্বে বোনেরা ব্যাপক সংখ্যায় এগিয়ে এসেছেন।
ঐতিহাসিক ৭ই জুন, জাতীয় দিবস ১৬ই ডিসেম্বর প্রভৃতি বিশেষ দিনে তাঁরা মিছিল করে এগিয়ে এসেছেন কর্মসূচীর বাস্তবায়নে। এছাড়াও মহিলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দুটি প্রকাশনী বের করা হয়। এর মধ্যে একটি ছিলো ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে প্রকাশিত বিশেষ স্মরণিকা এবং অন্যটি ১৯৭২-এর বিজয় দিবস উপলক্ষে ১৪ই ডিসেম্বরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে প্রকাশিত ‘ক্রন্দসী’ নামে একটি স্মরণিকা।
এ দুটি স্মরণিকার মধ্যে একটি সম্পাদকমণ্ডলীর বোর্ড গঠন করে উক্ত বোর্ডের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় এবং অন্যটি সম্পাদনা করেন মিসেস মোমতাজ বেগম। সাংগঠনিক সফরে আমাদের মহিলা নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় যান। এছাড়া আমাদের মহিলারা বাংলাদেশের প্রতিটি সমাজকল্যাণমূলক কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। মহিলা আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ মহিলা সমিতি ও অন্যান্য মহিলা সংগঠনের সাথে সমন্বয় সাধন করে সমাজ সেবামূলক কাজ করেছে।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর ডাকে যে, “জাতীয় নারী পুনর্বাসন বোর্ড” গঠিত হয়, তাতে মহিলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ বিশেষভাবে কাজ করেছেন। মহিলা সমিতি, বাংলাদেশ অন্ধ সমিতি, গার্লস গাইড ইত্যাদি সমাজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলা ফ্রন্ট। মহিলাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে গঠনতন্ত্রের বিধান প্রয়োগের সময় কিছু অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছেন বলে মহিলা সম্পাদিকা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তবে সকল অসুবিধায় ঊর্ধ্বে মহিলা আওয়ামী লীগ নিষ্ঠার সাথে আমাদের পাশে পাশে কাজ করেছেন। আগামীতে আমরা আরও অধিক মহিলাদের জাতি গঠনমূলক কাজে এবং জাতীয় পুনর্নির্মাণের কাজে সক্রিয় সহযোগিতা পাব এ আশা করছি।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক কমিটির কৃষি সম্পাদক জনাব আবদুর রউফের নেতৃত্বে বাংলাদেশব্যাপী একটি কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালানো হয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭ই জুনের, ১৬ই ডিসেম্বরের কর্মসূচীতে অংশ নিয়ে কৃষি সম্পাদক কৃষকদের সমাবেশ অনুষ্ঠান করেন। তিনি বিভিন্ন জেলায় ঘুরে কৃষি নির্ভর অর্থনীতিতে কৃষকদের বলিষ্ঠ ভূমিকার কথা প্রচার করেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কৃষি সম্পাদকের প্রচেষ্টায় সারা দেশে গড়ে উঠে একটি শ্রেণী-সংগঠন বাংলাদেশ কৃষক লীগ ।
জনমত গঠনে দলের বক্তব্য তুলে ধরা এক দুরূহ দায়িত্ব। সংগঠনের প্রচার বিভাগের দায়িত্ব ছিল জনাব সরদার আমজাদ হোসেনের উপর। দলের পক্ষে সকল প্রকাশনী, পুস্তিকা প্রচারপত্র, পোস্টার তাঁরই দায়িত্বে প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের কার্যকালে একটি জাতীয় সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং কতকগুলি স্মরণীয় অনুষ্ঠান পালিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ই ডিসেম্বর, ৭ই জুন প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রচার সম্পাদক নিষ্ঠার সাথে এ সময়গুলোতে দলের সার্বিক কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন।

আমাদের কার্যকালে প্রকাশিত ‘মুজিববাদ কি ও কেন’, ‘এক নজরে মুজিববাদ’, ‘নির্বাচনী ইশতেহার’, ‘গণপরিষদে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ’ এবং নানা প্রকারের দলীয় প্রচারপত্র তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমেই আমরা দলীয় কর্মীদের হাতে পৌঁছে দিতে সমর্থ হয়েছি। দলের বর্তমান ঘোষণাপত্র এবং গঠনতন্ত্র গত কাউন্সিল সভায় গৃহীত হবার পর সম্পূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ আকারে প্রকাশ করে দলীয় ইউনিটগুলির কাছে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব ছিল তাঁর উপর।
তাঁর এ সমস্ত কার্য সম্পাদন করতে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে প্রয়োজন বিশেষে প্রচার উপ-কমিটি গঠিত হয়েছে। এবং যারা প্রচার বিভাগকে সার্বক্ষণিক সহায়তা করেছেন তাঁদের মধ্যে জনাব নূরুল ইসলাম, জনাব শেখ ফজলুল হক মনি এবং জনাব আশফাক-উল-আলমের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাধারণ নির্বাচনে জনাব শেখ ফজলুল হক মনিকে আহ্বায়ক করে ‘নির্বাচনী ইশতেহার সাব-কমিটি’ গঠিত হয় । নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রকাশিত বক্তব্যে তিনি বিশেষ অবদান রেখেছেন ।
