ভারতে রেলপথ এর আদ্যপান্ত

ভারতে রেলপথ এর আদ্যপান্ত নিয়ে আজকের আলাপ করবো আমরা। ভারতে রেলওয়ে স্থাপনের কারণ, ইতিহাস, ফলাফল ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হবে। ভারতে “আধুনিক পরিকাঠামো” গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রেলপথের নির্মাণ কে অনেকেই ব্রিটিশ শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান বলে মনে করে থাকেন।

Table of Contents

ভারতে রেলপথ এর আদ্যপান্ত

একথা অস্বীকার করার উপায় নেই, ভারতে রেলপথ স্থাপনের কিছু সুফল ভারতীয়রা পেয়েছিলো। কিন্তু যেভাবে রেলপথ তৈরি করা হয়েছিলো এবং তাকে পরিচালিত করা হয়েছিলো, তা থেকে ২ টি বিষয় খুব পরিষ্কার –

১. ভারতবাসীর সুবিধে করে দেওয়া বা তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানোর জন্য ইংরেজরা এদেশে রেলপথ তৈরি করে নি।
২. তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের স্বার্থ পূরন করা।

আর এই কারনেই ঔপনিবেশিক প্রশাসকদের কাছে ভারতের মতো কৃষিপ্রধান একটি দেশে সেচ ব্যবস্থার বিকাশের থেকেও রেল ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছিলো এবং তা সরকারি কর্মসূচির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার লাভ করেছিলো।

প্রথমদিকে অবশ্য ইংরেজরা ভারতে রেলপথ স্থাপনে আগ্রহী ছিলো না। কিন্তু উনিশ শতকে ইংল্যান্ডের (১.) মিল মালিক, (২.) বনিক সভা ও (৩.) ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের ক্রমাগত চাপ সৃষ্টির ফলে ঔপনিবেশিক সরকার রেলপথ স্থাপনে উদ্যোগী হয়। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এইসব পুঁজিপতিদের প্রতিনিধিরা সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হন, ভারতে রেলপথের স্থাপন হলে ঔপনিবেশিক সরকারও নানা দিক থেকে লাভবান হতে পারে।

ইতিমধ্যে ভারতে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রয়োজনে উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার প্রয়োজন অনুভূত হয়। এর ফলে শেষপর্যন্ত লর্ড ডালহৌসীর ১৮৫৩ সালের “রেলওয়ে মিনিটের” নীল নকশার হাত ধরে ভারতে রেলপথ স্থাপনের সূচনা ঘটে।

ভারতে রেলপথ স্থাপনের উদ্দেশ্য:

ভারতে রেলপথ স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য গুলিকে আমরা নিন্মলিখিত ভাবে তুলে ধরতে পারি –

(১.) বিলিতি পন্যসামগ্রী বাজারে পৌঁছে দেওয়া:

শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডে অল্প সময়ে প্রচুর পন্য সামগ্রী উৎপন্ন হতে থাকে। কিন্তু দ্রুত গতির যানবাহনের অভাবে তা ভারতের দূর দূরান্তের বাজার গুলিতে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছিলো না। এই জন্য ১৮৩০ খ্রিঃ থেকেই ভারতে রেলের মতো সস্তা ও দ্রুত গতির যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ব্রিটিশ পুঁজিপতিরা চাপ দিতে থাকেন।

এদেশে রেলপথ নির্মানের প্রথম পর্বে এইজন্য পন্য চলাচলের সুবিধার্থে বোম্বাই, কলকাতা ও মাদ্রাজ বন্দর গুলির সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের রেল যোগাযোগ গড়ে তোলায় জোর দেওয়া হয়। ১৮৫৬ খ্রিঃ মধ্যেই অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই রেল যোগাযোগ গড়ে তোলা হয়।

(২.) কাঁচামাল সংগ্রহ করা:

ইংল্যান্ডের কারখানা গুলিতে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে দ্রুত কাঁচামাল যোগানের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু ভারতে উন্নত পরিবহনের অভাবে গ্রাম গঞ্জ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে বন্দরের মাধ্যমে ইংল্যান্ডে পাঠাতে অনেক সময় লেগে যেতো।

তাই এদেশে রেলপথ স্থাপনের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য ছিলো রেলের মাধ্যমে সহজে ও কম সময়ে ইংল্যান্ডে কাঁচামাল সরবরাহ করা। ১৮৫৪ খ্রিঃ হাওড়া পান্ডুয়া রেলপথ কে এই কারনেই ১৮৫৫ খ্রিঃ রানিগঞ্জ পর্যন্ত প্রসারিত করা হয়, যাতে খুব সহজেই রেলের মাধ্যমে ভারতের কয়লা ইংল্যান্ডে চালান করা যায়।

(৩.) তুলো পরিবহনের সমস্যা দূর করা:

ভারতে রেলপথ স্থাপনের একটি বড়ো কারন ছিলো তুলো পরিবহনের সমস্যা দূর করা। ভারতে ঠেলাগাড়ী করে দীর্ঘ সময় ধরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় তুলো পরিবহনের সময় ধুলোবালিতে ময়লা হয়ে তুলোর মান কমে যেতো।

ল্যাঙ্কাশায়ারের তুলো ও সুতো ব্যবসায়ীরা এজন্য ভারতে রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার জন্য বারংবার কোম্পানির কাছে দরবার করেছিলো। ১৮৫৩ খ্রিঃ লর্ড ডালহৌসী তার মিনিটে খোলাখুলিই লেখেন, ভারতের উন্নত তুলো ব্রিটেনে পাঠাবার জন্য রেল যোগাযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

“lnvestment in Indian Railway” প্রবন্ধে ডব্লিউ জে. ম্যাকফারসন দেখিয়েছেন, তুলো পাঠাবার সুবিধার দিকটিকে গুরুত্ব দিয়েই ভারতে রেলপথের নকশা আঁকা হয়।

ভারতে এমন ভাবে রেলপথের বিস্তার ঘটানো হয়, যাতে খুব সহজেই তুলো উৎপাদনকারী এলাকা গুলি বন্দর এলাকা গুলির সাথে জুড়ে যায়।

(৪.) ইস্পাত ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষা করা:

শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডে লৌহ ইস্পাত শিল্পের চরম উন্নতি ঘটেছিলো। তাই লৌহ ও ইস্পাত রপ্তানির জন্য ব্রিটিশ ইস্পাত ব্যবসায়ীরা চেয়েছিলো, ভারতে রেলপথের বিস্তার ঘটুক। কারন ভারতে রেলপথ স্থাপনের সঙ্গে তাদের স্বার্থ বিভিন্ন দিক থেকে জড়িত ছিলো।

ভারতে রেললাইন পাতা হলে এদেশে প্রচুর লোহার সরঞ্জাম, রেলের ইঞ্জিন, বগি, ইত্যাদি সরঞ্জামের প্রয়োজন পড়বে। ইংল্যান্ড থেকে সেগুলি ভারতে এলে একদিকে যেমন ইংল্যান্ডের ইস্পাত শিল্পের উন্নতি ঘটবে,তেমনি ইস্পাত বিক্রির বাজারও পাওয়া যাবে।

(৫.) ব্রিটিশ পুঁজির বিনিয়োগ করা:

শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডের পুঁজিপতিদের হাতে প্রচুর উদ্বৃত্ত পুঁজি জমা হয়। তারা তাদের সঞ্চিত পুঁজি বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগ করে আরোও একটু বাড়িয়ে নিতে চাইছিলেন।

রেলের মতো বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছিলো উদ্বৃত্ত পুঁজি বিনিয়োগের সেরা উপায়। এই কারনে ইংল্যান্ডের বনিক সভা গুলি বারংবার ব্রিটিশ সরকারকে ভারতে রেলপথ নির্মানের জন্য চাপ দেয়।

মূলত এদের চাপেই এবং ব্রিটিশ পুঁজির লাভজনক লগ্নির উদ্দেশ্যেই ভারতে ঔপনিবেশিক সরকার রেলপথ স্থাপন করেছিলো।

(৬.) ইংরেজদের কর্মসংস্থান তৈরি করা:

ভারতে ব্রিটিশ নাগরিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া রেলপথ স্থাপনের আরেকটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো। ঐতিহাসিক বিপান চন্দ্র “বঙ্গবাসী” ও “নববিভাকর” পত্রিকায় এই উদ্দেশ্যের কথা লিখেছিলেন।

ভারতে রেলপথের বিস্তার ঘটলে ডিরেক্টর থেকে ইঞ্জিনিয়ার, হিসাব পরীক্ষক ইত্যাদি পদ গুলিতে ব্রিটেনের উচ্চশিক্ষিত লোকেদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। ভারতে রেলপথ স্থাপিত হবার পর এই উদ্দেশ্যটি আরোও ভালো ভাবে বোঝা যায়। কুলির কাজ ছাড়া, রেলের সমস্ত উচ্চ পদ গুলিই ইংরেজরা নিজেদের দখলে রেখেছিলো।

(৭.) সামরিক উদ্দেশ্য:

ভারতে রেলপথ স্থাপনে ঔপনিবেশিক সরকারের সামরিক প্রয়োজন ও উদ্দেশ্যও জড়িত ছিলো।

উনিশ শতকের প্রথম দিকের বিদ্রোহ গুলিতে দ্রুতগতির পরিবহনের অভাবে সৈন্য সামন্ত পাঠিয়ে সেগুলিকে তাড়াতাড়ি দমন করা যায় নি। এই অভিজ্ঞতা থেকে প্রশাসনিক মহল ভারতে রেলপথের দাবিতে সোচ্চার হয়। মহাবিদ্রোহের পর রেলের সামরিক উপযোগীতার দিকটির গুরুত্ব আরো ভালো ভাবে বোঝা যায়।

এই কারনে –

  • মহাবিদ্রোহের পর ভারতে খুব দ্রুত রেল যোগাযোগ গড়ে তোলায় জোর দেওয়া হয়।
  • ভারতের প্রত্যেক গভর্নর জেনারেল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার বিষয়টির সঙ্গে রেল যোগাযোগের বিষয়টিকে সংযুক্ত করেন।
  • সামরিক কারনে সরকার এমন অনেক জায়গায় রেলপথ স্থাপন করে, যার কোন বানিজ্যিক বা অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছিলো না। উদাহরন হিসাবে ১৮৬৮ খ্রিঃ পেশোয়ার দিল্লি রেলপথ স্থাপনের কথা বলা যায়। যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো উত্তর পশ্চিম সীমান্তের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা।
    (৮.) রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রন স্থাপন
    সময়ের সাথে সাথে ব্রিটিশ আধিপত্যের আয়োতন বৃদ্ধি পেলে, প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহরাঞ্চল, ভারতের সর্বত্র নিয়ন্ত্রনের প্রয়োজন দেখা যায়। এইজন্য উন্নত পরিবহনের প্রয়োজন পড়ে। কারন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারনে –
  • এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যোগাযোগ স্থাপন,
  • সংবাদ সংগ্রহ ও সংবাদ আদান প্রদান করা,
  • প্রশাসনিক নির্দেশ বা অর্ডার পাঠানো,
  • সেনাবাহিনী ও ভারতের ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য খাদ্য, রসদ ইত্যাদি পাঠানো ও মজুত করবার জন্য রেলের প্রয়োজন পড়ে।
    তাছাড়া, লর্ড ডালহৌসীর সম্প্রসারনশীল বিস্তার নীতির জন্য দ্রুত যোগাযোগ সম্পন্ন রেলপথের প্রয়োজন পড়েছিলো। ভারতের রেলপথ স্থাপনের পিছনে তাই অর্থনৈতিক ও সামরিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্দেশ্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো।

(৯.) দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করা:

ভারতে রেলপথ স্থাপনের আরেকটি অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করা।

ব্রিটিশ সরকারের উচ্চহারে ভূমি রাজস্ব নীতি ও সাম্রাজ্যবাদী শোষনের কারনে সমগ্র ব্রিটিশ শাসনকালে ভারত বেশ কয়টি বড়ো বড়ো দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয়েছিলো। “দুর্ভিক্ষ নিরোধ কমিশন” এইজন্য দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় ভারতে রেলপথ নির্মানের সুপারিশ করে।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, দুর্ভিক্ষ গুলিতে ব্রিটিশ সরকার রেলকে পীড়িত এলাকার মানুষদের সাহায্য করার বদলে ব্রিটিশ নাগরিক ও সেনাদের খাদ্য মজুত করতেই অধিক পরিমানে ব্যবহার করেছিলো।

উপসংহার:

সুতরাং এই পর্যন্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, ভারতের কল্যাণ বা ভারতবাসীর সুবিধা করে দেবার উদ্দেশ্যে ইংরেজরা কখনই এদেশে রেলপথের বিস্তার করে নি।

ভারতে রেলপথ স্থাপনে ঔপনিবেশিক উদ্দেশ্য গুলি আরোও স্পষ্ট হয়ে ওঠে রেল সংক্রান্ত ঔপনিবেশিক সরকারের আচার আচরণ গুলিতে –

  • রেলকে কেন্দ্র করে ভারতীয়দের ওপর বর্নবৈষম্যবাদের প্রকাশ ঘটিয়ে ইংরেজরা বুঝিয়ে দিয়েছিলো ইংরেজদের স্বার্থেই এ দেশে রেলপথ তৈরি করা হয়েছে।
  • রেলের পরিষেবা গ্রহনের ক্ষেত্রে তাই ভারতীয়রা সর্বদাই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বলে গন্য হতেন।
  • রেলের উচ্চ পদ গুলিতে বা ট্রেনের প্রথম শ্রেণীর কামরায় ভারতীয়দের এইকারনে প্রবেশের কোন অধিকারই ছিলো না।
  • রেলের পন্য পরিবহনের ক্ষেত্রে পক্ষপাত মূলক ভাড়ার ব্যবস্থা করে ঔপনিবেশিক স্বার্থকে সংরক্ষিত করা হয়েছিলো।
  • ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে বন্দরে কাঁচামাল পাঠাতে অথবা ইংল্যান্ড থেকে বন্দরে আসা শিল্প পন্য গুলি ভারতের অভ্যন্তরে পরিবহনে, রেলের ভাড়া খুবই কম করে বসানো হয়েছিলো।
  • উল্টো দিকে বন্দর থেকে ভারতের অভ্যন্তরগামী ট্রেনে ঐ একই কাঁচামালের ভাড়া ছিলো অত্যন্ত বেশি। এমনকি ভারতের বাজার থেকে যে সমস্ত শিল্প পন্য গুলি বিদেশে বিক্রির জন্য বন্দরে যেতো, তার রেল পরিবহন ভাড়াও ছিলো বৈষম্যমূলক ও অত্যন্ত চড়া।

ঔপনিবেশিক সরকারের এইসব আচার আচরনই বুঝিয়ে দিয়েছিলো, ইংরেজদের সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য ও স্বার্থ রক্ষার তাগিদেই এদেশে রেলপথের স্থাপনা ও পরিচালনা করা হয়েছিলো।

ভারতে কিভাবে রেলপথের বিস্তার ঘটে?

ঔপনিবেশিক আমলে ভারতে আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিলো এদেশে রেলপথের প্রবর্তন।

কোম্পানি সরকার অবশ্য প্রথমদিকে এদেশে রেলপথ নির্মানে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করে নি। কিন্তু ১৮২৫ খ্রিঃ ইংল্যান্ডে রেলপথ স্থাপনের পর ব্রিটিশ বনিকসভা, পুঁজিপতি শ্রেনী এবং ল্যাঙ্কাশায়ারের মিল মালিকরা ভারতে রেলপথ স্থাপনের জন্য কোম্পানি সরকারের ওপর একটি চাপ সৃষ্টি করেন।

এর ফলেই মূলত ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ভারতে রেলপথ স্থাপনের সূত্রপাত ঘটে।

লর্ড ডালহৌসীর ভূমিকা

১৮৫৩ খ্রিঃ লর্ড ডালহৌসীই প্রথম ভারতে রেলপথ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। তার পরিকল্পিত “নীল নকশার” ভিত্তিতেই ভারতে রেল পথ স্থাপনের সূচনা হয়েছিল বলে তাকে “ভারতে রেলপথ স্থাপনের জনক” বলে অভিহিত করা হয়।
যদিও এদেশে রেলপথ নির্মানের চিন্তা ভাবনা ১৮৩২ খ্রিঃ থেকেই শুরু হয় এবং রেলের জন্য জমি জরিপের কাজ শুরু হয় ১৮৪৯ খ্রিঃ।

ডালহৌসীর “রেলওয়ে মিনিট”

১৮৫৩ খ্রিঃ লর্ড ডালহৌসী তার বিখ্যাত “রেলওয়ে মিনিট” এ ভারতে রেলপথ স্থাপনের নীল নকশা প্রস্তুত করেন। এখানে ভারতীয় রেল ব্যবস্থার নির্মান কাজ, ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থান বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
রেলওয়ে মিনিটের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ গুলিতে বলা হয় –

১. কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিকে পরস্পর রেলের মাধ্যমে জুড়ে দেওয়া হবে,
২. ওখানকার বন্দর গুলিকেও রেলের মাধ্যমে যুক্ত করে দেওয়া হবে,
৩. রেলপথ নির্মানের যাবতীয় কাজটাই করবে বেসরকারি সংস্থা বা কোম্পানি,
৪. কোম্পানি গুলো যে অনেক টাকা খরচ করে ঝুঁকি নিয়ে রেলের কাজ করবে, সেইজন্য তাদের বিনিয়োগ করা টাকার ওপর ৫% সুদ “গ্যারান্টি” হিসাবে দেওয়া হবে।
৫. ৯৯ বছরের জন্য কোম্পানি গুলিকে রেলপথ বসানোর জন্য বিনামূল্যে জমি দেওয়া হবে।
৬. ৯৯ বছর পর বিনা ক্ষতিপূরনে রেলপথ সরকারের হাতে চলে আসবে।
৭. তবে ৯৯ বছরের আগে ৬ মাসের নোটিস দিয়ে সরকার রেলপথে লগ্নি করা অর্থ ফেরত দিয়ে বেসরকারি কোম্পানির কাছ থেকে রেলপথ অধিগ্রহণ করে নিতে পারবে।

লর্ড ডালহৌসীর রেলওয়ে মিনিটের প্রস্তাব বিলাতের কোম্পানির পরিচালক সভা পুরোপুরি ভাবেই মেনে নেন।এর পর খুব দ্রুত ভারতে রেলপথ স্থাপনের কাজ শুরু হয়ে যায়।

ভারতে রেলপথ নির্মানের পর্যায়

১৮৫৩ থেকে ১৯৪৭ খ্রিঃ পর্যন্ত, নিরবচ্ছিন্ন ভাবে ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় রেলপথের সম্প্রসারন ঘটে। এই গোটা পর্বে চারটি পৃথক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে রেলপথের বিস্তার ঘটেছিলো। এই ৪ টি পর্যায় ছিলো –

১. প্রথম পর্যায় – গ্যারান্টি প্রথার মাধ্যমে বেসরকারি উদ্যোগে রেলপথ স্থাপন,
২. দ্বিতীয় পর্যায় – সরকারি উদ্যোগে রেলপথ স্থাপন,
৩. তৃতীয় পর্যায় – সংশোধিত গ্যারান্টি প্রথায় বেসরকারি উদ্যোগ পুনরায় রেলপথের নির্মাণ,
৪. চতুর্থ পর্যায় – রেলের রাষ্ট্রীয়করন ও সরকারি উদ্যোগ।

প্রথম পর্যায় – গ্যারান্টি প্রথা

১৮৫৩ থেকে ১৮৬৯ খ্রিঃ পর্যন্ত, গ্যারান্টি প্রথায় বেসরকারি কোম্পানি দ্বারা ভারতে রেলপথ নির্মানের কাজ শুরু হয়। এই পর্বে যেসব বিদেশী কোম্পানি গুলো এদেশে রেলপথ স্থাপনে অর্থ বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছিলো, তাদের বিনিয়োগ করা অর্থের ওপর ৫% নিশ্চিত সুদের গ্যারান্টি দেওয়া হয়।

প্রথম পর্যায়ে গ্যারান্টি প্রথার ফলে –

  • ১৮৫৩ খ্রিঃ বোম্বে থেকে থানে পর্যন্ত ভারতের প্রথম রেলপথ তৈরি হয়। এটি তৈরি করে “The great Indian peninsular company”।
  • ১৮৫৪ খ্রিঃ হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত রেলপথ তৈরি হয়। এটি তৈরি করে “East India Rail Company”।
  • ১৮৫৬ খ্রিঃ মধ্যেই বোম্বাই, মাদ্রাজ ও কলকাতা বন্দরের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ রেল যোগাযোগ গড়ে ওঠে। এবং
  • ১৮৬৮ খ্রিঃ পর্যন্ত গ্যারান্টি প্রথার ফলে মোট ৪,২৫৫ মাইল রেলপথের নির্মাণ হয়।

গ্যারান্টি ব্যবস্থার ক্রুটি ও সমালোচনা

গ্যারান্টি ব্যবস্থায় লাভের গ্যারান্টি থাকায় কোম্পানি গুলো ইচ্ছে করে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি টাকা খরচ করে প্রচুর বার্ষিক ঘাটতি দেখাতে থাকে।

এই ঘাটতির টাকা ভারতের রাজস্ব থেকে মেটানো হতে থাকে। এর ফলে এই প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় উঠলে গ্যারান্টি প্রথা বাতিল করে দেওয়া হয় এবং সরকার নিজ উদ্যোগে রেলপথ নির্মানের সিদ্ধান্ত নেয়।

দ্বিতীয় পর্যায় – সরকারি উদ্যোগ

১৮৬৯ থেকে ১৮৮২ পর্যন্ত সময়ে সরকারি উদ্যোগে রেলপথ নির্মানের কাজ চলে। এই পর্বে সরকারি মালিকানায় খুবই ধীর গতিতে রেল লাইন বসানোর কাজ চলেছিলো।

তৃতীয় পর্যায় – সংশোধিত গ্যারান্টি প্রথা

১৮৮২ খ্রিঃ পর সরকার আবার রেলপথ নির্মানের ক্ষেত্রে গ্যারান্টি প্রথায় ফিরে যায়।

গ্যারান্টি প্রথায় ফিরে যাওয়ার কারন

১৮৮২ খ্রিঃ পর সরকারের “গ্যারান্টি প্রথায়” ফিরে যাওয়ার পিছনে অনেক গুলি কারন ছিলো –

১. ১৭৭৮ খ্রিঃ আফগান যুদ্ধে সরকারের অর্থ ব্যয়ের ফলে রাজকোষ শূন্য হয়ে যায়।
২. এই সময় ভারতে দুর্ভিক্ষ ঘটায় সরকার আর্থিক দিক থেকে যথেষ্ট চাপের মধ্যে ছিলো।
৩. গ্যারান্টি প্রথা বাতিল হয়ে যাওয়াতে ইংল্যান্ডের বেসরকারি কোম্পানি গুলির মুনাফা লাভের সম্ভাবনা কমে যায়। তাই রেলপথ স্থাপনে সরকারি উদ্যোগ বন্ধ করার জন্য তারা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে চাপ সৃষ্টি করেন।
৪. ইতিমধ্যে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা ও অন্যান্য প্রয়োজনে দ্রুত গতিতে রেলপথ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা যায়।
এমতাবস্থায়, সরকার বাধ্য হয়েই গ্যারান্টি প্রথায় ফিরে যায়। ১৮৮২ খ্রিঃ নতুন গ্যারান্টি প্রথায় কয়েকটি বিষয় সংশোধন করে সরকার ঘোষনা করে –

  •  রেলপথে নিযুক্ত বেসরকারি কোম্পানি গুলিকে লগ্নি করা অর্থের ওপর সাড়ে তিন টাকা সুদের গ্যারান্টি দেওয়া হবে।
  • ২৫ বছর পর সরকার ইচ্ছে করলে টাকা দিয়ে বেসরকারি কোম্পানির কাছ থেকে রেলপথ কিনে নিতে পারবে।
    নতুন গ্যারান্টি প্রথার ফলে –
  • ১৯০০ খ্রিঃ মধ্যে ২৫ হাজার মাইল রেলপথ তৈরি হয়।
  • ১৯০৫ খ্রিঃ তা বেড়ে হয় ২৮ হাজার মাইল।
  • ১৯১০ খ্রিঃ মধ্যে ভারতীয় রেলপথ পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম রেলপথের গৌরব অর্জন করে।

 

চতুর্থ পর্যায় – রেলের রাষ্ট্রীয়করন ও সরকারি উদ্যোগ

বিংশ শতাব্দীর সূচনায় ভারতীয় রেল ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। এই পর্বে বেশ কতকগুলি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। যেমন –

১. বিংশ শতাব্দীর মধ্যে ভারতের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল রেলপথের মাধ্যমে জুড়ে গিয়েছিলো।
২. রেলে পন্য সরবরাহ, যাত্রী চলাচল ও মুনাফা লাভ অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিলো।
৩. ইতিমধ্যে অনেক বেসরকারি রেললাইনের চুক্তির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ন হয়ে যায়।

এইসব কারনে সরকার নিজের হাতে সম্পূর্ন ভাবে রেলকে অধিগ্রহণ করে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। মোটামুটি ১৯০০ খ্রিঃ পর থেকেই ধীরে ধীরে ভারতীয় রেলের রাষ্ট্রীয়করনের কাজ আরম্ভ হয়।

  • এই সময় ২৫ বছর পূর্ন হওয়া রেলপথ গুলি সরকার কিনে নেয়।
  • রেলকে পরিচালিত করবার জন্য ১৯০৫ খ্রিঃ একটি আলাদা রেল বোর্ড গঠিত হয়।
  • রেলের সংস্কারের সুপারিশের জন্য ১৯১৯ খ্রিঃ “অ্যাকওয়ার্থ কমিশন” গঠিত হয়। এই কমিশন গ্যারান্টি প্রথা বাতিল, প্রতি ৫ বছরে ১৫০ কোটি টাকা রেলে বিনিয়োগ, পৃথক রেলবাজেটের প্রস্তাব করে।

অ্যাকওয়ার্থ কমিশনের সুপারিশ কার্যকর

১৯২৫ খ্রিঃ ব্রিটিশ সরকার অ্যাকওয়ার্থ কমিশনের সুপারিশ গুলি কার্যকর করে। এর ফলে –

  • ১৯২৫ খ্রিঃ পর কয়েকটি রেল কোম্পানির দায়িত্ব সরকার নিজের হাতে গ্রহন করে।
  • রেলের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রন স্থাপিত হয়।
  • সরকারি উদ্যোগে রেলপথের নির্মাণ শুরু হয়।
  • ১৯২৫ খ্রিঃ সরকারি উদ্যোগে রেলপথ সম্প্রসারিত করবার জন্য পৃথক রেল বাজেট পেশ করা শুরু হয়।
  • ১৯২৫ থেকে ১৯৪৭ খ্রিঃ স্বাধীনতা লাভের আগে পর্যন্ত এই ব্যবস্থাই বজায় থাকে এবং সরকারি উদ্যোগে রেলপথের বিস্তার ঘটতে থাকে।

শেষ কথা

১৯৪৭ খ্রিঃ ইংরেজরা ভারত ত্যাগের সময়ে এদেশে ৬৫,২১৭ হাজার কিলোমিটার রেলপথ তৈরি হয়ে যায়। এর ফলে দেশের ৭৮ ভাগ এলাকাই রেল ব্যবস্থার আওতায় চলে আসে।

ক্রমে রেল স্টেশন গুলিতে পৌঁছাবার প্রয়োজনে নতুন নতুন সড়কপথ তৈরি হতে থাকে। ফলে রেল যোগাযোগকে সূত্র করে ভারতের রাস্তাঘাট নির্মান ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটে যায়। রেল ভারতের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা ও স্থানীয় অচলায়তনকে ভেঙ্গে চূড়মার করে দেয়।

ভারতে রেলপথ স্থাপনের প্রভাব ও ফলাফল

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা ছিলো – রেলপথ স্থাপন ও রেলপথের বিস্তার। ভারতীয় জনজীবনে এর একাধিক ইতিবাচক ও নেতিবাচক ফলাফল লক্ষ্য করা যায়।
ভারতে রেলপথ বিস্তারের প্রভাব ও ফলাফলকে ৩ টি দিক থেকে তুলে ধরা যায় –

১. ভারতে রেলপথ স্থাপনের ফলে ইংরেজরা কিভাবে, এবং কতখানি লাভবান হয়েছিলো?
২. রেল ব্যবস্থা ভারতীয়দের জনজীবনকে কতখানি প্রভাবিত করেছিলো? এবং
৩. ভারতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে রেলপথ স্থাপনের কি কুফল লক্ষ্য করা যায়?
৪.ভারতে রেলপথ স্থাপনের প্রভাব ও ফলাফল

ভারতে রেলপথ স্থাপনে ইংরেজদের সুবিধা

ভারতে রেলপথ স্থাপনে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিলো ইংরেজ শক্তি। কারন ভারতে রেলপথ স্থাপনের ফলে –

১. ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট উদ্বৃত্ত পুঁজি বা মহাজনী পুঁজির লাভজনক ভাবে লগ্নি করা হয়। ভারতীয় রেলে পুঁজি বিনিয়োগ করে ব্রিটিশ কোম্পানি গুলি প্রভূত মুনাফা লাভ করে।

২. ভারতীয় রেলকে হাতিয়ার করে ব্রিটিশ পন্য ভারতের গ্রাম গঞ্জের কোনায় পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

৩. একই ভাবে ইংল্যান্ডের বস্ত্র শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বিশেষত, তুলো ও নীল রেলের মাধ্যমে খুব দ্রুত বন্দর গুলিতে পৌঁছে যায়।

৪. ভারতে রেল পথ স্থাপনার মাল জোগান দিতে গিয়ে ইংল্যান্ডের লৌহ ও ইস্পাত শিল্প ফুলে ফেঁপে ওঠে।

৫. রেলের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ প্রেসিডেন্সি অঞ্চল গুলোর মধ্যে যোগাযোগ খুবই সহজ হয়ে যায়। এর ফলে দেশের বিভিন্ন অংশে ব্রিটিশ প্রশাসনের মধ্যে ঐক্য স্থাপিত হয়। ফলে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত আরোও শক্ত হয়।

৬. রেল ব্যবস্থার সাহায্যে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সৈন্য প্রেরন, বিদ্রোহ মোকাবিলা করা, সংবাদ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। ফলে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ফাঁস আরোও শক্ত হয়ে ওঠে।

 

ভারতীয়দের ওপর রেলপথ স্থাপনের সুফল

ইংরেজদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ পূরনের তাগিদে এদেশে রেলপথের বিস্তার ঘটলেও, তাদের অলক্ষে এবং অজান্তেই রেল ব্যবস্থার একাধিক সুফল ভারতীয়রা পেতে শুরু করেছিলেন।

সংক্ষেপে এই সমস্ত দিক গুলোকে আমরা নিন্মলিখিত ভাবে তুলে ধরতে পারি –

(১.) যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি

রেল প্রবর্তিত হওয়ার আগে ভারতের যোগাযোগ বলতে ছিলো পায়ে হাঁটা, গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি বা পালকি। রেল প্রবর্তিত হওয়ার ফলে রেলের মাধ্যমে খুব দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যোগাযোগ সম্ভব হয়।

তাছাড়া, নতুন নতুন রেল স্টেশন গড়ে উঠবার পর সেগুলিতে পৌঁছাবার জন্য নতুন শাখাপথ ও সড়কপথও তৈরি হয়। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিধি ও আয়োতন অনেক বৃদ্ধি পায়।

(২.) সামাজিক প্রভাব

রেলপথ যোগাযোগ সামাজিক ক্ষেত্রে ভারতীয়দের মধ্যে এক বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসে। জাতি, ধর্ম, ভাষা খাদ্যাভ্যাস, ছুঁৎমার্গ, অস্পৃশ্যতা ইত্যাদি সম্পর্কে ভারতীয়দের দীর্ঘ দিনের অভ্যাস ও কুসংস্কার গুলি রেল যাত্রার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙ্গে পড়তে থাকে। রেল যাত্রার সুবিধা নেবার জন্য সকলেই সব কিছুকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে।

এর ফলে ভারতীয়দের মধ্যে সামাজিক ও প্রাদেশিক বিভেদ এবং বৈষম্য দূর হয়ে যায়।

(৩.) আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবোধের অবসান

রেল ভারতীয়দের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা ও স্থানীয় অচলায়তনকে ভেঙ্গে চূড়মার করে দেয়।

রেল যোগাযোগের ফলে গ্রামীন স্বয়ং সম্পূর্ন বিচ্ছিন্ন জীবনযাত্রার অবসান ঘটে। এর ফলে গ্রামাঞ্চলেও আধুনিক জীবন যাত্রার উপকরন গুলি পৌঁছে যেতে থাকে। গ্রাম থেকে শহরাঞ্চলে যাতায়াতের ফলে শহর গুলির চরিত্র ও জনসংখ্যায় তারতম্য ঘটতে থাকে।

এছাড়া, এক প্রদেশের সঙ্গে অন্য প্রদেশের মানুষদের মধ্যে ব্যপক যোগাযোগ ও যাতায়াতের ফলে প্রাদেশিকতা বোধ ও আঞ্চলিকতা বোধের অবসান ঘটতে থাকে।

(৪.) জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় আন্দোলনে সাহায্য

রেল ব্যবস্থার ফলে আঞ্চলিকতাবোধের অবসান ঘটায় তা ভারতীয়দের ঐক্যবদ্ধ ও সংঘবদ্ধ হতে সাহায্য করে। রেল যোগাযোগের ফলে খুব সহজেই –

  • ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের শিক্ষিত মানুষেরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও মতামতের আদান প্রদান করতে পারেন।
  • এর ফলে জাতীয়তাবাদী পত্রপত্রিকা গুলি সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে দেশব্যাপী জাতীয়তাবাদী চিন্তা চেতনার প্রসার ঘটতে থাকে।
  • রেলে চড়ে খুব সহজেই অন্য প্রদেশে গিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলন বা কর্মসূচি গুলিকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। ফলে রেলকে ব্যবহার করে ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী সর্বভারতীয় আন্দোলনের প্রসার ঘটতে থাকে।
  • এছাড়া, সহজ রেল যোগাযোগের ফলেই সুদূর পাঞ্জাবের বিপ্লবীদের সঙ্গে বাংলার বিপ্লবীদের সংযোগ স্থাপন ও বিভিন্ন বিপ্লবী আন্দোলন সংগঠিত করা সম্ভব হয়।

এককথায়, রেল এদেশে ব্রিটিশ শাসনকে যতটা সংহত করেছিলো, ভারতীয়দের ঠিক ততটাই সংঘবদ্ধ করে তুলতে সাহায্য করেছিলো।

(৫.) ব্যবসা বাণিজ্য ও বৃহৎ বাজারের পত্তন:

রেলপথের বিস্তারের ফলে দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। রেলে করে একস্থানের দ্রব্য খুব সহজেই অন্য স্থানে পৌঁছে যায়। ফলে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বড়ো বড়ো বাজার গড়ে ওঠে। ক্রমে এই সব বৃহৎ বাজার গুলি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

রেল যোগাযোগের ফলে ভারতে পাট, কয়লা, চা, এবং কিছু পরিমানে লৌহ ইস্পাত শিল্পের উন্নতি ঘটে।

(৬.) কৃষির বানিজ্যিকিকরন:

রেলপথ স্থাপন ভারতের কৃষিক্ষেত্রকে ব্যপক ভাবে প্রভাবিত করে। রেল যোগাযোগের ফলে কৃষিপন্যের চলাচল ও আমদানি রপ্তানি বেড়ে যায়।

ফলে কৃষকরা তাদের উদ্বৃত্ত ফসল দূরবর্তী বাজারে বিক্রি করার সুযোগ লাভ করে। এর ফলে উৎপাদনের চরিত্রে বদল ঘটে। আগে কৃষক যেখানে স্থানীয় প্রয়োজন মেটানোর জন্য চাষ করতো এখন স্থানীয় প্রয়োজন ব্যতিরেকে বিক্রির উদ্দেশ্যে সে কৃষিকাজ করতে থাকে। এর ফলে কৃষির বানিজ্যিকিকরন ঘটতে থাকে।

এছাড়া রেলপথ স্থাপনের ফলে তুলো, পাট, গম ইত্যাদি নানা নগদ ফসলের উৎপাদনও অনেক বেড়ে যায়।

(৭.) কৃষিক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আসে:

রেলপথ পরোক্ষভাবে কৃষিক্ষেত্রে বৈচিত্র্য এনেছিল। বানিজ্যিক চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে এরপর যে এলাকায় যে যে ফসল ভালো হয়, সেখানে তাই বেশি বেশি করে চাষ করা হতে থাকে।

যেমন পূর্ববঙ্গে পাটচাষ ভালো হতো বলে, এখন থেকে কেবল তাই স্থানীয় ভাবে, একচেটিয়া আকারে উৎপন্ন হতে শুরু করে। আবার পশ্চিম উপকূলে তুলো ভালো হতো বলে, বানিজ্যিক লাভের দিকটি খেয়াল রেখে সেখানে শুধু তুলো উৎপাদনেই গুরুত্ব দেওয়া হতে থাকে।

(৮.) দামের ক্ষেত্রে সমতা:

রেলপথ স্থাপনের আগে ভারতের আঞ্চলিক বাজার গুলির ক্ষেত্রে জিনিস পত্রের দামে কোন সমতা ছিলো না। কিন্তু রেলপথ গড়ে উঠবার পরে আঞ্চলিক বাজারের দামের তারতম্য ও পার্থক্য অনেকটাই কমে আসে।

(৯.) ভারতের সীমিত শিল্পায়নে সাহায্য:

ভারতে যথেষ্ট কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও, ইংরেজরা কখনই চাই নি ভারতে শিল্পের বিকাশ ঘটুক। তা সত্ত্বেও ভারতে যে ধীরগতিসম্পন্ন শিল্পায়ন শুরু হয়েছিলো, তাতে রেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো।

রেলের সহজ ও সস্তা যোগাযোগ এবং ইস্পাত ও কয়লার চাহিদা নানা ভাবে ভারতীয় শিল্পক্ষেত্রকে প্রভাবিত করেছিলো।

(১০.) ভারতীয়দের কর্মসংস্থান:

রেলের উচ্চপদ গুলি ইংরেজরা নিজেদের জন্য সংরক্ষণ করে রাখলেও, নীচু পদ গুলিতে তারা ভারতীয়দের নিয়োগ করতো। এছাড়া, রেললাইন বসানোর যাবতীয় কাজটাই ভারতীয় কুলিদের দিয়ে করানো হতো।

ফলে রেলকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে বহু সংখ্যক ভারতীয়দের কর্মসংস্থান হয়েছিলো। স্বাধীনতার আগে ভারতীয় রেলে কর্মী হিসাবে কাজ করতো প্রায় দশ লক্ষ লোক।

 

ভারতের ওপর রেলপথ স্থাপনের কুপ্রভাব:

রেলপথের বিস্তারে একদিক থেকে ভারতীয়রা যেমন নানা ভাবে লাভবান হয়েছিলেন, তেমন ভারতের অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর রেলপথ স্থাপনের একাধিক কুফলও পড়েছিলো।

সংক্ষেপে এইসব কুফলকে আমরা নিন্মলিখিত ভাবে তুলে ধরতে পারি –

(১.) সম্পদের বহির্গমন:

ভারতে রেলপথের বেশিরভাগটাই ঘটেছিলো গ্যারান্টি প্রথায়। রেলে অর্থ বিনিয়োগের জন্য ইংল্যান্ডের কোম্পানি গুলোকে শতকরা ৫ টাকা ও পরে সাড়ে ৩ টাকা সুদের গ্যারান্টি দেওয়া হয়। সুদের গ্যারান্টি থাকায় কোম্পানি গুলো ইচ্ছে করেই খরচের পরিমান বাড়ায় এবং ঘাটতি দেখায়। এই ঘাটতি ও সুদের টাকা ভারতীয় রাজস্ব থেকেই মেটানো হতো।

ফলে ঘাটতি, সুদ ও মুনাফা বাবদ প্রচুর টাকা দেশ থেকে বেরিয়ে গিয়ে ইংল্যান্ডে জমা হতে থাকে। এছাড়া, রেলের মাধ্যমে দেশের অন্যতম প্রধান সম্পদ বিভিন্ন কাঁচামালও নামমাত্র মূল্যে দেশ থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে। এইভাবে রেলপথের বিস্তার ভারতীয় সম্পদের “বহির্গমন” এর পথ প্রশস্ত করেছিলো।

(২.) কুটির শিল্পের ধ্বংস:

রেলপথ স্থাপনের ফলে ম্যাঞ্চেস্টারের সস্তা কাপড় ও অন্যান্য বিলিতি শিল্প পন্য খুব সহজেই গ্রামাঞ্চলে পৌঁছে যায়। ক্রমে বিলিতি পন্যে সারা দেশ ছেয়ে যায়। উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারত ব্রিটেনের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়তে শুরু করে। ভারতের কুটির শিল্প, যা তখনও গ্রামাঞ্চলে টিকে ছিলো, তাও এর ফলে ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে পড়তে থাকে।

এর ফলে খুব শীঘ্রই ভারত ব্রিটেনের কাছে কাঁচামালের জোগানদার ও ব্রিটিশ পন্যের একটি লাভজনক বাজারে রূপলাভ করে।

(৩.) দেশীয় শিল্প বানিজ্যের সর্বনাশ:

রেলের মাধ্যমে বিলিতি পন্য ভারতের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে, দেশীয় পন্য গুলি অসম প্রতিযোগীতার মুখে পড়ে। ফলে দেশীয় শিল্প বানিজ্য মার খেতে থাকে।

(৪.) প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পরনির্ভর করে রাখা:

রেলপথ নির্মানের ক্ষেত্রে ইংল্যান্ড কখনোই “উচ্চ প্রযুক্তিগত” দক্ষতা ভারতীয়দের শেখায় নি। শুধুমাত্র রেললাইন পাতা, সেতু নির্মাণ বা সুড়ঙ্গ কাটার মতো নিন্মমানের প্রযুক্তি ভারতীয়দের শিখিয়ে ছিলো।

রেলপথ নির্মানে উচ্চ প্রযুক্তিগত দক্ষতা ইংল্যান্ড থেকে আমদানি করা হতো এবং সুকৌশলে তার “ভারতীয়করন” করা হতো না যাতে প্রকৃতপক্ষে কোন “ভারতীয় প্রযুক্তি” গড়ে না উঠে। এই ভাবে অর্থনৈতিক দিকের মতো প্রযুক্তিগত দিক থেকেও ইংরেজরা ভারতকে পরাধীন করে রাখতে চেয়েছিলো।

ভারতে “ইংল্যান্ডের প্রযুক্তি” রপ্তানি করেও প্রতি বছর প্রচুর টাকা ইংরেজরা ইংল্যান্ডে চালান করতো।

(৫.) জলসেচের ক্ষতি:

রেলপথ স্থাপনের ফলে ভারতে নানা ভাবে জলসেচের ক্ষতি হয়। যেমন –

  • রেললাইন বসানোর ফলে দু প্রান্তের মধ্যে কৃষিজমি ভাগ হয়ে যায়। ফলে রেললাইন অতিক্রম করে অপর প্রান্তের জমিতে জলসেচ করা যায় নি।
  • তাছাড়া, রেললাইন বসানোর ফলে একপাশের বিস্তৃর্ন জমিতে কোন নদী বা পুকুর থেকে যাওয়াতে অপর প্রান্তের জমিগুলিতে সেচের জল খাল কেটে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নি।
  • রেললাইন বসাতে গিয়ে অনেক নদীনালা, খাল বিলের ওপর সেতু তৈরি করতে হয়। সেতু তৈরির ফলে নদীনালায় পলি সঞ্চিত হয়, জলস্রোত কমে যায়। নদী নালার জলধারন ক্ষমতাও এর ফলে হ্রাস পায়। ফলে কৃষি জমিতে সেচের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

(৬.) দুর্ভিক্ষের প্রাদুর্ভাব:

রেলপথ স্থাপনের ফলে এদেশে দুর্ভিক্ষের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পায়। দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির পিছনে রেল নিন্মলিখিত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলো –

  • রেলপথ স্থাপনের ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অর্থকরী ফসলের চাষ বেড়ে যায়। ফলে খাদ্য শস্যের উৎপাদন কমে যেতে থাকে।
  • রেলকে ব্যবহার করে ভারতের সস্তা খাদ্যশস্য ব্রিটেনে রপ্তানি করা হতে থাকে। এর ফলে ভারতে খাদ্যের ভান্ডারে টান পড়ে। এইজন্য সমকালীন জাতীয়তাবাদী লেখকরা খাদ্য শস্য রপ্তানির কঠোর সমালোচনা করেন।
  • রেলপথ নির্মান করতে গিয়ে রেল পথের দু প্রান্তের জমির জলসেচ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষির ওপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়ে।
  • এছাড়া, দুর্ভিক্ষের সময় রেলকে ব্যবহার করে ব্রিটিশ সরকার ভারতে বসবাসকারী ব্রিটিশ নাগরিক ও সেনাবাহিনীর জন্য খাদ্য শস্য মজুত করতে থাকলে, দুর্ভিক্ষ প্রবল আকার ধারন করতে থাকে।
  • এই সমস্ত কারনে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে ঘন ঘন দুর্ভিক্ষ দেখা যেতে থাকে।

(৭.) মহামারীর প্রাদুর্ভাব:

রেলপথ স্থাপনের আরেকটি কুফল হল ভারতে মহামারীর উৎপত্তি।

রেলপথ স্থাপনের আগে ভারতে কোন মহামারী ছিলো না। অর্থাৎ কোন ছোঁয়াচে রোগ সহজে ছড়িয়ে পড়তো না। দুর্বল যানবাহন ও যোগাযোগের কারনে তা নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো।

কিন্তু রেলপথ প্রবর্তিত হওয়ায় ভারতে যোগাযোগ ও যাতায়াত বেড়ে যায়। ফলে মানুষের চলাচলের সূত্রে খুব সহজেই কিছু রোগ মহামারীর আকারে সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। প্লেগের কথা উদাহরন হিসাবে উল্লেখ করা যায়।

(৮.) পরিবেশ দূষণের প্রসার:

রেলপথ স্থাপন করতে গিয়ে এদেশে পরিবেশ দূষণ বৃদ্ধি পায়। বড়ো বড়ো গাছের গুড়ি দিয়ে রেললাইন পাততে গিয়ে প্রচুর গাছকে কেটে ফেলা হতে থাকে। এর ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে থাকে।

এছাড়া, বাংলায় রেললাইন স্থাপন করতে গিয়ে রেলের জমির পাশে বড়ো বড়ো গর্ত কেটে দেওয়া হয়, যাতে লাইনের জমির জল ঐ খালে এসে জমা হয়ে যায়, এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিতে লাইন বসে না যায়।

এর ফলে ঐ খাল ও নালা গুলিতে জল জমে ম্যালেরিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। উনিশ শতকে ম্যালেরিয়া গ্রাম বাংলায় মহামারীর আকারে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিলো।

(৯.) সামাজিক শোষন ও বৈষম্য:

রেলপথ স্থাপনের ফলে ভারতীয়দের ওপর ইংরেজদের সামাজিক বৈষম্যমূলক শোষন দ্বিগুন ভাবে বৃদ্ধি পায়। উদাহরন হিসাবে বলা যায় –

  • রেলে সবসময়ই ভারতীয়দের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরন করা হতো।
  • উপযুক্ত ভাড়া দিয়েও রেলের প্রথম শ্রেণীতে চড়বার কোন অধিকার ভারতীয়দের ছিলো না।
  • রেলে শ্বেতাঙ্গ কর্মচারী ও যাত্রীরা প্রায়ই ভারতীয়দের প্রতি দুর্ব্যবহার করতেন।
  • মালপত্র পরিবহনে শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে ভারতীয়দের অনেক বেশি ভাড়া দিতে হতো।
  • বৈষম্যমূলক মনোভাবের কারনে রেলের উচ্চপদে কখনো কোন ভারতীয়দের নিয়োগ করা হতো না।
  • রেলে কর্মরত কুলীদের নামমাত্র মজুরিতে প্রচুর কাজ করিয়ে নেওয়া হতো। এছাড়া নানারকম অত্যাচার ও শোষনও তাদের ওপর চালানো হতো।

(১০.) ব্রিটিশ শাসনের শক্ত ফাঁস:

রেলপথ স্থাপনের ফলে ভারতীয়দের ওপর ব্রিটিশ শাসনের ফাঁস আরোও শক্ত হয়ে বসে যায়। রেলপথ স্থাপনের সূত্রে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে মফঃস্বল, সর্বত্র ব্রিটিশ সরকারের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ কঠোর হয়ে পড়ে। রেলকে ব্যবহার করে খুব সহজেই যেকোন বিদ্রোহ বা জাতীয় আন্দোলনকে দমন করে দেওয়া সম্ভব হয়।

এছাড়া, নির্বিঘ্নে রেললাইন বসানোর জন্য ব্রিটিশ সরকার অরন্য ও কাঠ সংরক্ষণে জোর দেয়। এর ফলে ১৮৬৫ খ্রিঃ “অরন্য আইন” তৈরি হয়। এই অরন্য আইনের ফলে দুর্গম অরন্য অঞ্চলে আদিবাসী ও উপজাতিদের ওপরেও ব্রিটিশ সরকারের শাসন ও নিয়ন্ত্রণ প্রসারিত হয়। আদিবাসীরা তাদের চিরাচরিত অরন্যের অধিকার গুলি থেকে বঞ্চিত হতে থাকে।

কালক্রমে, তাদের ওপর ব্রিটিশ সরকারের শোষন ও নিয়ন্ত্রণ মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেলে, তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এর ফলে ইংরেজ শাসনকালে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক আদিবাসী ও উপজাতি বিদ্রোহ ঘটতে শুরু করে।

 

উপসংহার:

সুতরাং ভারতে রেলপথ স্থাপন কিছু সুফলের পাশাপাশি একাধিক কুফলও ভারতবাসীকে ভোগ করতে হয়েছিলো। এই কারনে দাদাভাই নৌরজী, রমেশচন্দ্র দত্ত, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে প্রমুখ অর্থনৈতিক প্রবক্তারা ভারতে রেলপথের প্রসারকে “আর্শীবাদ” হিসাবে দেখেন নি, দেখেছিলেন “অভিশাপ” হিসাবে।

এমনকি রামগোপাল ঘোষ, দ্বারকানাথ ঠাকুর, যারা এদেশে রেলপথ স্থাপনের পক্ষে মতামত প্রকাশ করেছিলেন, পরে তাদেরও মোহ ভঙ্গ হয়। তারা উপলব্ধি করেন, রেলপথ অন্যান্য দেশের উন্নতিতে যেভাবে সাহায্য করেছে, তার এতটুকুও ভারতবাসী পায় নি। এর প্রধান কারন অবশ্য ছিলো এদেশে আধুনিক শিল্প গড়ে না তোলা।

এদেশে যথেষ্ট কাঁচামাল ও খনিজ দ্রব্য থাকা সত্ত্বেও ইংরেজরা কোন শিল্পই এদেশে গড়ে তোলে নি। অথচ ভারতে লোহার অফুরন্ত ভান্ডার ছিলো। অনায়াসে এদেশে লৌহ ইস্পাত শিল্পের বিকাশ ঘটানো যেতো। কিন্তু এটি ঘটালে ব্রিটেনের ইস্পাত শিল্প মার খেতো। তাই ভারী শিল্পের বিকাশে ব্রিটেন কোন আগ্রহ এদেশে দেখায় নি।

শিল্পায়ন না ঘটায় ভারতে রেল আদপেই ভারতীয়দের কোন অর্থনৈতিক কল্যান সাধন করতে পারে নি। ইংরেজরা ভারতে আধুনিক কোন শিল্প গড়ে না তোলায় দ্রুতগতির রেল পরিবহন আসলেই ভারতীয়দের কোন কাজে আসে নি।

উল্টে রেল ব্যবস্থার পৃষ্ঠপোষকতা করতে গিয়ে ভারতের কৃষি ও সেচব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯০২ – ৩ খ্রিঃ পর্যন্ত ভারতে জলসেচের উন্নতির জন্য মাত্র ৪৩ কোটি টাকা খরচ করা হয়। অথচ রেলপথ বসাতে সরকার ৩৫৯ কোটি টাকা খরচ করে।

তাই সবশেষে বলা যায়, ভারতীয় রাজস্বের টাকায় ভারতে রেল ব্যবস্থার পত্তন হলেও, তার মূল আর্থিক সুফল ইংরেজরাই লাভ করে এবং ভারতীয়রা “উচ্ছিষ্ট” হিসাবে তার ছিটেফোটারই অংশীদার হয়।

Leave a Comment