ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

 

ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

 

ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির কয়েক মাসের মধ্যেই বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে সংকট ঘণীভূত হতে শুরু করে। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বাংলা ভাষা সম্পর্কে একপেশে ও নেতিবাচক মনোভাবের ফলে বাঙালিরা তাদের মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রত্যক্ষ সংগ্রামে নামতে বাধ্য হয়। ১৯৪৮ সালে সূচিত প্রথম পর্বের ভাষা আন্দোলন দ্বিতীয় পর্বে ১৯৫২ সালে আরো প্রসার ঘটে।

দ্বিতীয় পর্বে ভাষা আন্দোলন শুধু শিক্ষিত শ্রেণী নয়, বরং সমগ্র বাঙালি জাতির মধ্যে প্রভাব ফেলে। শুধু ভাষা বৈষম্য নয়, আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাঙালির প্রতি শোষণ ও বৈষম্য এ পর্যায়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে বাঙালির সকল আন্দোলন বিশেষ করে ষাটের দশকে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা ছিল ভাষা আন্দোলন।

বায়ান্ন পরবর্তীকালে যাঁরা জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের বড় অংশই ভাষা সৈনিক ছিলেন। এ কারণে ভাষা আন্দোলনকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম সুসংহত স্ফূরণ বলা হয়।

ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই বাঙালিদের কাছে যে প্রশ্নটি সর্বাগ্রে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয় তা হলো রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে মর্যাদা দেবার পক্ষে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর অতিমাত্রায় আগ্রহ। রাষ্ট্র ক্ষমতায় সত্যিকার অর্থে বাঙালির প্রাধান্য না থাকলেও পূর্ববাংলার জনমত ছিল বাংলার পক্ষে। অথচ ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার উর্দুর পক্ষে অভিমত দেয়।

ইতোমধ্যে ভাষার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে তা নিয়ে ১৯৪৬-১৯৪৭ সালেই বিতর্ক উত্থাপিত হলে ‘৪৭ সালেই ভারত বিভাগের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলা ভাষার পক্ষে ছোট ছোট কয়েকটি সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে। সেপ্টেম্বরে গঠিত ‘তমদ্দুন মজলিশ’ বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে শুরু করে। ১৯৪৮ সালের শুরু থেকে এ দাবিতে আরো জনসমর্থন মেলে।

২৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একটি সংশোধনী প্রস্তাবে ইংরেজি ও উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও পরিষদের সরকারি ভাষা করার প্রস্তাব করেন কিন্তু ২৫ তারিখে তা নাকচ হলে পূর্ববাংলায় আনুষ্ঠানিকভাবে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষার প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়।

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে শুরু হয় আন্দোলন যা ১১ মার্চ পূর্ববাংলায় সাধারণ ধর্মঘট পালনের মাধ্যমে সাফল্য লাভ করে। অথচ সরকার এসব বিষয়ে গুরুত্বারোপন করেনি। বরং ১৯ মার্চ জিন্নাহ পূর্ববাংলা সফর করে তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতায় উর্দুর পক্ষে বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করেন। যদিও একই বছর তাঁর মৃত্যুর পর ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গটি স্থবির হয়ে পড়ে।

তবে ১৯৪৯ সালে নতুনভাবে চক্রান্ত শুরু হয়। এবার বাংলা বর্ণমালাকে আরবিকরণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। যদিও ১৯৫০ সালে পূর্ববাংলা ভাষা কমিটি এই উদ্ভট পরিকল্পনাটি নাকচ করে দেয়। ১৯৫০ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের সাংবিধানেক মূলনীতি কমিটির রিপোর্টে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করা হয়। পূর্ববাংলায় ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে তা প্রত্যাহার করা হয়।

১৯৫১ সাল থেকে আবারো ভাষা আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে ওঠে। আবদুল মতিনকে আহ্বায়ক করে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। তবে ১৯৫২ সালের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের উর্দুর পক্ষে ঘোষণা সকল মহলে প্রতিবাদের ঝড় তোলে।শুরু হয় আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্ব। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের সূচনা হয়।

২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ববাংলায় হরতাল, বিক্ষোভ ও সভার কর্মসূচি পালিত হয়। ঐদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভকারীরা মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রফিক, সালাম, বরকত, আহত হন আরো অনেকে। পুলিশের এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিছিল, বিক্ষোভ হয়।

তৎকালীন প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে জেলা, মহকুমা, থানা, ইউনিয়ন এমন কি গ্রামে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এ পর্যায়ে আন্দোলন শুধু ভাষার দাবিতে সীমাবদ্ধ না থেকে অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে পরিণত হয়। পাকিস্তানি শাসকচক্রের প্রতি প্রবল ঘৃণার সঞ্চার হয়।

আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে এটি ছিল বাঙালি জাতির প্রথম বিদ্রোহ। ভাষা আন্দোলন তৎকালীন রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ:

ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার মর্যাদার জন্যই গড়ে ওঠেনি। পাকিস্তানের মাত্র ৭.২% জনগণ ছিল উর্দু ভাষাভাষী। পক্ষান্তরে ৫৪.৬% জনগণের ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা বাঙালি স্বভাবতই মেনে নিতে চায় নি।এর সাথে তাদের জীবিকার্জনের প্রশ্নও জড়িত ছিল। এমনিতে পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম থেকেই জনসংখ্যার সংখ্যাধিক্য বিষয়টি অমান্য করে পশ্চিম পাকিস্তানে রাজধানী, প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু স্থাপিত হয়।

শাসকদের ভাষা উর্দুকেই তাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বেছে নেয়ায় বাঙালিদের চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরো পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল রাজনীতিসহ সর্বত্র বাঙালিকে বঞ্চিত করার পশ্চিমা মানসিকতা। তাই ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে মুসলিম লীগের মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও দ্বিজাতি তত্ত্বভিত্তিক জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে সন্দিহান করে তোলে।

অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্যায় হিসেবে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠাকে তারা বেছে নেয়। এই বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাই ষাটের দশকে স্বৈরশাসন বিরোধী ও স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে আন্দোলনে প্রেরণা জোগায়।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ:

ভাষা আন্দোলনের ফলে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিকাশ ঘটে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ধর্মীয় চেতনার মূলে সংশয় দেখা দেয়। পাকিস্তান সৃষ্টির সাম্প্রদায়িক ভিত্তি ভেঙ্গে বাঙালিরা অসাম্প্রদায়িক চেতনার আন্দোলন শুরু করে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাংলা ভাষার পক্ষে বক্তব্যের সমর্থনে ১৯৪৮ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।

গণপরিষদে হিন্দু সদস্যদের ভাষার পক্ষে যে কোন প্রস্তাব-বক্তব্যের বিরোধিতা করেন মুসলিম সদস্যরা। মুসলিম লীগ ও শাসকচক্র চিরাচরিত ঐতিহ্যানুযায়ী ধর্মকে ব্যবহার করে ভাষা আন্দোলনকারী ও সমর্থকদের ‘ভারতের দালাল’, ‘অমুসলিম’, ‘কাফের’ বলে চিহ্নিত করেও আন্দোলন থামাতে পারেনি। ফলে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই দীর্ঘদিন পর হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়।

আওয়ামী মুসলিম লীগ নামক বৃহৎ রাজনৈতিক দল তাদের দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নামকরণ করে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত পূর্ববাংলায় সাম্প্রদায়িক সংকট আগের তুলনায় কম ছিল। মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে ভাষা সৈনিকরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি নেন।

এতে দেখা যায় যেসব জেলা, মহকুমা ও থানায় ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা ছিল সেখানে চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকে ।

 

রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ:

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির সময় ৪টি পৃথক ভাবাদর্শ ভিত্তিক রাজনৈতিক ধারা লক্ষণীয় ছিল-

১. মুসলিম জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শের প্রতিনিধিত্বকারী মুসলিম লীগ । মুসলিম লীগ আবার চারটি উপদলে বিভক্ত ছিল ক. নাজিমুদ্দিন-আকরাম খাঁ গ্রুপ; খ. সোহরাওয়ার্দী- হাশিম গ্রুপ; গ. এ.কে. ফজলুল হক গ্রুপ; ঘ. মাওলানা ভাসানী গ্রুপ। প্রথম উপদলটি ছিল কট্টর ও উর্দুর পক্ষে। বাকি উপদলগুলো ছিল বাংলার পক্ষে।  ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এই বাকি তিনটি উপদলই মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করে।

২. আংশিক ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক ধারার প্রতিনিধিত্বকারী জাতীয় কংগ্রেস, এদের তেমন প্রভাব না থাকলেও এরা ছিল বাংলার পক্ষে।

৩. বিপ্লবী সাম্যবাদী ভাবধারার প্রতিনিধিত্বকারী কমিউনিস্ট পার্টি।

৪. মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে আসা প্রগতিশীল গণআজাদী লীগ। এরূপ রাজনৈতিক বিভাজন রাজনীতিতে ভাষা আন্দোলনভিত্তিক মেরুকরণ ঘটায়। রক্ষণশীল মুসলিম ভূস্বামী শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী এবং পাকিস্তানের প্রতি অন্ধ অনুগত নাজিমুদ্দিনের উপদলটি ছিল উর্দু প্রতিষ্ঠায় প্রয়াসী।

এর কারণ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ভিতর সর্বাধিক প্রভাবশালী সকলের মাতৃভাষা উর্দু। তাদের পেছনে শক্তি যুগিয়েছে এদেশে আগত উর্দুভাষী ভারতীয়রা (মোহাজের)। এদেশে উর্দুভাষী মোহাজেরদের মাধ্যমে উর্দু ভাষা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা প্রথম থেকেই প্রত্যাখ্যাত হয়। বাংলা ভাষাভাষী মাত্রেই বিদেশী ভাষা উর্দুকে মেনে নেয় নি।

জনগণের এই মানসিকতা উপলব্ধি করেই কংগ্রেস, আওয়ামী মুসলিম লীগ, গণআজাদী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি তাদের নির্বাচনী কর্মসূচি ও দলীয় কর্মসূচিতে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। অন্যদিকে মুসলিম লীগ জনগণের এই মানসিকতা উপেক্ষা করে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের জোয়ারে অনেক উদারপন্থী মুসলিম লীগের নেতা ও কর্মীরা ভাষা আন্দোলন ও আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেয়।

নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সারির নেতারা আত্মগোপনে থাকায় দ্বিতীয় সারির নেতারা আওয়ামী মুসলিম লীগের সাথে বা স্বতন্ত্রভাবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নামে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। এ পর্যায়ে অনেক শিক্ষার্থী আওয়ামী মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগে সংশ্লিষ্ট থেকে আন্দোলনে অংশ নেন ।

রাজনীতি থেকে মুসলিম লীগের চির বিদায়:

ভাষা আন্দোলনে বিরোধিতা, স্বৈরশাসন, বাঙালির অধিকারের প্রতি উপেক্ষা সর্বোপরি দলের নেতাদের শ্রেণী চরিত্রের কারণে এ দলটি জনবিচ্ছিন্ন হতে সময় লাগে নি। ভাষা আন্দোলনে দলের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক নেতাদের ভূমিকা তাদের চরিত্র আরো উন্মোচিত করে। ১৯৫২ সালেই আওয়ামী লীগ, গণতান্ত্রিক দল, ছাত্র ইউনিয়ন, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মুসলিম লীগ বিরোধী জোট গঠনের সূচনা করে।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী মুসলিম গীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, নেজামী ইসলামী মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। কমিউনিস্ট পার্টি ফ্রন্টে যোগ না দিলেও কেউ কেউ আওয়ামী মুসলিম লীগের টিকেটে প্রার্থী হন। সমাজবিজ্ঞানী রঙ্গলাল সেন লিখেছেন যে, ১০ জন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য আওয়ামী মুসলিম লীগের পরিচয়ে সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

নির্বাচনে ভাষা আন্দোলনের সমর্থক যুক্তফ্রন্ট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়যুক্ত হয়। ৩০৯টি আসনের মধ্যে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ মাত্র ১০টি আসন লাভ করে । মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন আইন পরিষদ নির্বাচনে তাঁর এলাকার সম্পূর্ণ অপরিচিত তরুণ ছাত্রনেতা খালেক নেওয়াজ খানের কাছে পরাজিত হন। তাঁর মন্ত্রিপরিষদের অন্যান্য সদস্যদের পরিণতি তাঁর মতই হয়।

কারো কারো জামানতও বাজেয়াপ্ত হয়। এরপর আর কোন নির্বাচনে মুসলিম লীগ জয়ী হতে পারেনি। বরং এ দল পাকিস্তান আমলেই বহুধাবিভক্ত হয়ে একটি দুর্বল সংগঠনে পরিণত হয়। মুসলিম লীগের মুখপত্র দৈনিক আজাদ ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবির জন্য যে ১০টি কারণ চিহ্নিত করে তার প্রথমটি ছিল “বাংলা ভাষার দাবির প্রতি অবিচার, ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে নুরুল আমীন সরকারের দমননীতি।”

জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা:

১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন শুধু শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী মহলে সীমাবদ্ধ থাকলেও ১৯৫২ সালের আন্দোলন ব্যাপক জনগণের মধ্যে প্রভাব ফেলে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিস্থিতি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনায় তা অকার্যকর হয়ে পড়ে। স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে পরের দিনের গায়েবানা জানাজার পর ঢাকা শহরের পরিস্থিতির ওপর কারো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

কারো নির্দেশ ছাড়াই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মহল্লা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল রাজপথে নেমে পড়ে। পুলিশের সাথে জনতার বহু স্থানে সংঘর্ষ হয়। সারা ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহর ছিল প্রতিবাদ, মিছিল আর হরতালের শহর। ঢাকায় পুলিশের গুলিবর্ষণের খবর মফস্বলে ছড়িয়ে পড়লে সেখানেও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ, সমাবেশ হয়।

প্রতিটি সভায় গণপরিষদ সদস্যদের পদত্যাগ, হতাহত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ, বিচার দাবি করা হয়। যেসব এলাকায় আন্দোলন তীব্র ছিল সেগুলো হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ময়মনিসংহ, সিলেট, কুমিল্লা, রাজশাহী, পাবনা, যশোর প্রভৃতি শহরে। আন্দোলন শুধু শহরে নয় গ্রামে-গঞ্জেও ছড়িয়ে পড়ে। গঠিত হয় সংগ্রাম কমিটি। এই আন্দোলনে ঢাকার মতোই এই প্রথম কৃষক, শ্রমিক মেহনতি মানুষ যুক্ত হয়।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক বদরুদ্দীন উমর জোর দিয়ে বলেছেন, “পূর্ববাংলা কৃষক, শ্রমিক ও বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত মেহনতি জনগণের সকল অংশ এ আন্দোলনে যতখানি ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছিলেন, ততখানি অন্য কোথাও নয়।” বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রকল্পের “ভাষা আন্দোলন ঃ অংশগ্রহণকারীদের শ্রেণী অবস্থান” গবেষণা গ্রন্থেও একই মত পোষণ করা হয়েছে।

শহীদ স্মৃতির প্রতীক ও আন্দোলনের উৎস শহীদ মিনার তৈরি:

১৯৫২ সালেই বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় শহীদ মিনার। শুধু ঢাকায় নয় ঢাকার বাইরে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, গোপালগঞ্জ, দিনাজপুর, পাবনার শহীদ মিনার গড়ে ওঠে। এই শ‍হীদ মিনার শুধু শহীদদের স্মৃতিকেই অমরত্ব দেয়নি, প্রতিষ্ঠিত করেছে এদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য এক উদ্দীপনা।

শহীদ মিনারই পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদ, বাঙালি সংস্কৃতি চর্চা ও আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এ কারণেই মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরেই পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সহ দেশের প্রায় সকল শহীদ মিনার ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা:

ভাষা আন্দোলন ভাষার দাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও ক্রমে এর সাথে বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন জড়িত হয়ে পড়ে। ভাষা আন্দোলনকালে ও পরে বিভিন্ন লেখনি ও দাবিদাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু বাংলাভাষা নয় বরং বাঙালিদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন দাবি উত্থাপিত হয়।

গণপরিষদে পূর্ববাংলার জনসংখ্যানুপাতিক আসন, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাঙালি নিয়োগ, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের অবসান ঘটানোর দাবি করা হয়। যুক্তফ্রন্ট এসব দাবিকে প্রথম জনসমক্ষে নিয়ে আসে।

যা ষাটের দশকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ৬ দফা দাবিতে পরিস্ফুটিত হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনে রূপ নেয়। স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমে যা চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করে। তাই বলা যায় যে, ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি স্তরে প্রেরণা যুগিয়েছে ভাষা আন্দোলন।

সারসংক্ষেপ

ভাষা আন্দোলনের প্রশ্নে বাঙালি জাতি প্রথম পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অংশ নেয়। এ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়েই তারা পাকিস্তানি শাসকচক্রের প্রতিটি ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়। এ আন্দোলনের শিক্ষাই তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটায়। পরবর্তী দশকে এই চেতনার ক্রমবিকাশ ঘটে যার ফলে একটি ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রের সম্ভব হয়েছে।

 

ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নঃ

১। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশে ভাষা আন্দোলনের ভূমিকা লিখুন।

২। ভাষা আন্দোলন কিভাবে রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটায় লিখুন।

৩। ভাষা আন্দোলনে জনগণ কিভাবে স্বত:স্ফূর্তভাবে অংশ নেয় তা লিখুন ।

৪। বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি ও বাংলা ভাষার বিকাশে ভাষা আন্দোলনের ভূমিকা কি ছিল লিখুন।

রচনামূলক প্রশ্ন:

১। ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করুন ।

Leave a Comment