বাঙালিদের ‘ভীতুর ডিম’ আখ্যায়িত করেছে এক পাকিস্তানি | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

বাঙালিদের ‘ভীতুর ডিম’ আখ্যায়িত করেছে এক পাকিস্তানি – সংবাদটি প্রেরণ করেছেন ৩০ জুন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহিষ্কৃত নিউইয়র্ক টাইমস-এর সংবাদদাতা।

বাঙালিদের ‘ভীতুর ডিম’ আখ্যায়িত করেছে এক পাকিস্তানি

 

বাঙালিদের 'ভীতুর ডিম' আখ্যায়িত করেছে এক পাকিস্তানি | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

 

ঢাকার পশ্চিমে অবস্থিত ফরিদপুর জেলার সামরিক কম্যান্ডার মেজর নাজির বেগ হচ্ছেন পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচ উপজাতির লোক, দেখতে গাট্টাগোট্টা এই ব্যক্তি তাঁর বিশ বছরের সামরিক জীবনের প্রায় ছয় বছর কাটিয়েছেন পূর্ব পাকিস্তানে। দেশের এই পূর্বাংশের বাঙালিদের প্রতি তাঁর অবজ্ঞার ভাব পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে শুধু যে বহুল প্রচলিত ধারণা, তা নয়, খুব গর্বের সাথেই সেটা প্রকাশ করা হয়। সাক্ষাৎকারে তিনি বলছিলেন, ‘বাঙালিরা হচ্ছে ভীতুর ডিম, পেছন থেকে ছুরি মারার কোনো সুযোগ তারা হারাবে না।’

বাক্যবাগীশ মেজর

মেজরের মতে, এদের ভেতর সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে হিন্দুরা, কেননা তারা দেশের রক্ত শুষে নিয়ে অর্থকড়ি পাঠাচ্ছে পাকিস্তানের শত্রু দেশ হিন্দু ভারতে।

পূর্ব পাকিস্তানে সপ্তাহকাল ঘুরে বেড়াবার সময় এটা বেশ লক্ষ্য করা গেছে যে অনেক আর্মি অফিসার মেজর বেগের মতো স্পষ্টভাষী না হলেও বিশ্বাসে তাঁর কাছাকাছি। দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আমাদের এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল যে ভবনে, সেটি ছিল আওয়ামী লীগের জেলা সদর কার্যালয়, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনকামী এই দলটি এখন নিষিদ্ধ। মেজর কথা বলতে খুব আগ্রহী।

একজন বিদেশীকে তাঁর মতের যথার্থতা প্রমাণে ছিলেন বিশেষ উৎসাহী। মাঝে মাঝেই হয়ে উঠছিলেন উত্তেজিত। তিনি বললেন যে, তাঁর বাহিনী ফরিদপুরে ঢোকার সময় কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় নি। ‘একটি বুলেটও ছোঁড়া হয় নি’। শহরের ধ্বংসযজ্ঞ এবং শহরবাসীদের হত্যা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য হলো এসব ‘দুষ্কৃতকারীদের কাজ’-বাঙালি বিদ্রোহীদের বোঝাতে পাকিস্তান সরকার এই শব্দটিই ব্যবহার করে। শহরের সন্ত্রস্ত অধিবাসীদের কেউ কেউ ফিসফিসিয়ে এই দর্শনার্থীকে বলেছিল হত্যা ও ধ্বংসলীলার সবটাই পাক আর্মির কাজ। সেটা অস্বীকার করলেন মেজর বেগ।

 

‘সামান্য এক চুলকানি মাত্র’

মেজর আরো বললেন, ‘আমাদের লোকদের সবকিছু ঠিকভাবে বোঝানো হয়েছে। তাঁদের বলা হয়েছে বিপদাপন্ন অপর মুসলমান ভাইদের সাহায্য করার জন্য তাঁদের এখানে আনা হয়েছে। ধর্ষণ, লুটতরাজ অথবা সমাজ-বিরোধী কাজ এরকম কোনো কিছু ঘটে নি। ইসলাম ধর্মে এসব কাজ নিষিদ্ধ। ওরা এসেছে একটি মুসলিম দেশে, কোনো বিদেশবিভুঁইয়ে নয়।’

এলাকায় এখন কোনো প্রতিরোধ রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘সামান্য চুলকানির চাইতে বেশি কিছু নয়।’ তিনি জানালেন যে, একজন পেশাদার সৈনিক হিসেবে তিনি এতে খুবই হতাশ বোধ করছেন। তিনি বলে চললেন, ‘বাঙালিরা নরম প্রকৃতির মানুষ, ভীতুর ডিম। একটা বুলেটের শব্দ শুনতে পেলেই শত শত মানুষ মুরগির ছানার মতো ছুটোছুটি শুরু করে। তাদের সাহস বলতে কিছু নেই।’

 

বাঙালিদের 'ভীতুর ডিম' আখ্যায়িত করেছে এক পাকিস্তানি | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

 

তিনি আরো বললেন, ‘সামনাসামনি তারা ভেড়া হয়ে থাকে। আর পেছনে গেলে বাঘ হয়ে ওঠে। এই মানুষেরা আপনার পিঠে ছুরি বসাবার সুযোগ পেলে তা কখনোই ছাড়বে না।’ সামান্য বিরতি দিয়ে আবার বললেন যে, এটা অবশ্য তাঁর নিজের মূল্যায়ন এবং একশত ভাগ সঠিক নাও হতে পারে। তিনি জানালেন, ‘এখানকার সাধারণ মানুষেরা খুব সরল, তাদের চাহিদা সামান্যই এবং তারা বিশেষ গোলযোগসৃষ্টিকারী নয়।’ এত অধিকসংখ্যক হিন্দু নিহত হওয়ার কারণ কি জানার জন্য চাপাচাপি করতে মেজর আবারো অস্বীকার করলেন যে এজন্য তার সৈনিকেরা দায়ী।

এরপর পুনরায় মন্তব্য যোগ করলেন, ‘এমন একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এতো বিরাট জনসংখ্যার ভেতর থেকে কিছু সাধারণ লোক যদি দুর্গতি পোহায় সেটা খুব স্বাভাবিক নয় কি?’ মেজর বেগ জানালেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষা ক্ষেত্রে আধিপত্য করেছে হিন্দুরা এবং অনৈসলামী ভাবধারা প্রচার করে তারা অন্তর্ঘাতী কাজ করেছে। তাঁর মতে, ‘তা না হলে পূর্ব পাকিস্তানের এমন পচন ধরতো না। এইসব শিক্ষক এবং সমস্ত হিন্দু কোনোদিনই পাকিস্তানের বাস্তবতা মেনে নিতে পারে নি। তারা একটা স্বপ্নের জগতে বাস করছে। তারা বিশ্বাস করে যে ভারতমাতার খণ্ডাংশ আবার জোড়া লাগবে।’ তবে মেজর সাহেব স্থিরবিশ্বাসী যে ভারত কখনো পাকিস্তানকে হজম করতে পারবে না।

Leave a Comment