মন্দির লুণ্ঠন ও ধ্বংস-সাধন, জায়গির হাত থেকে চলে যাওয়াতে তিনি মনে খুব আঘাত পেয়েছিলেন। ঠিক করলেন, এখন থেকে তিনি বাদশাহের চাকরি করার বদলে আল্লা তায়ালার চাকরি করবেন । আল্লা তো আশমান থেকে মান্না বর্ষণ করবেন না, আর ঢুকড়িয়া দোয়া-প্রার্থনা করার পীর-ফকিরও নন। তিনি এবার বিধর্মীদের হত্যা-লুণ্ঠন করে জেহাদের কর্তব্য পালন করে আল্লার সন্তোষ বিধান করবেন বলে মনস্থ করছেন।
মন্দির লুণ্ঠন ও ধ্বংস-সাধন | হুসেন খাঁ টুকড়িয়া | আকবর
তিনি শুনেছিলেন, কুমায়ূন- গাড়ওয়ালের পাহাড়-পর্বতে এমন সব মন্দির আছে যা সোনা-রূপোর ইট দিয়ে তৈরি। লুণ্ঠন-সামগ্রী লাভের জন্য বহু মুসলমানই প্রস্তুত ছিল। শত শত ধর্মবীর টুকড়িয়ার পতাকা তলে সমবেত হতে লাগল। তিনি ১৫৭১-৭২ খ্রিস্টাব্দে পার্বত্যাঞ্চলে প্রবেশ করলেন।
পার্বত্যাঞ্চলের অধিবাসীরা কম-বেশি প্রতিরোধ করল, কিন্তু তাঁর কাছে ছিল উন্নতমানের অস্ত্রশস্ত্র । পার্বত্যাঞ্চলের অধিবাসীরা জনবসতি ছেড়ে পালাল। হুসেন খা টুকড়িয়া জেহাদীদের নিয়ে অগ্রসর হলেন। এক জায়গায় এসে শুনলেন, সেখানে সুলতান মাহমুদের ভাগিনেয় শহিদ হয়েছিলেন (সম্ভবত জায়গাটা বারাবাঁকি জেলার সৈয়দসালার গাজীর থান)।
তিনি পূর্বতন জেহাদীদের কবরে ফাতিহা পড়লেন, সেগুলোর সংস্কার করালেন। যেতে যেতে তুষারাবৃত জায়গায় পৌঁছলেন। সম্ভবত সেটা গর্ব যাড়য়া জোহার হবে। তিনি শুনেছেন, সেখানে সোনা-রূপোর বহু ধন-ভাণ্ডার রয়েছে এবং তিব্বত থেকে সেখানে রেশম কস্তুরি আসে। লোকে বলে, সেখানে নাকাড়ার আওয়াজ, লোকজনের শোরগোল এবং অশ্বের হ্রেষাধ্বনিতে তুষারপাত শুরু হয়। কুমায়ূন-গাড়ওয়ালের বরফাচ্ছাদিত জায়গা সম্বন্ধে এরকম কথা শোনা যায় না, তবে হ্যাঁ, অমরনাথ (কাশ্মীর) সম্বন্ধে অবশ্যই শোনা যায়। যাই হোক, জেহাদীদের লোভ তাদের উপর অভিশাপ হয়ে দাঁড়াল।
তুষারপাত শুরু হলো; আহারের জন্য ঘাস পাতাও রইল না। ক্ষুধায় প্রাণ যেতে বসল। টুকড়িয়া লোকজনকে উৎসাহিত করার অনেক চেষ্টা করলেন, সোনা-রূপোর ইটের কথা শোনালেন, কিন্তু বরফের সম্মুখে জেহাদীদের হিম্মত রইল না। তারা টুকড়িয়ার ঘোড়ার লাগাম ধরে জোর-জবরদস্তি নিচে টেনে নিয়ে গেল।
তখন টুকড়িয়ার পল্টনের অবস্থা দাঁড়াল, মস্কো থেকে ফেরার সময় নেপোলিয়নের যে দশা হয়েছিল, সেই রকম। পার্বত্য-অধিবাসীরা তাদের পথ অবরোধ করল। তারা বিষাক্ত তীর নিক্ষেপ করে, পাথর বর্ষণ করে। বহু জেহাদী মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গলোকে পৌঁছে যায়। অনেকে বিষাক্ত ঘায়ে পাঁচ-ছয় মাস ভুগতে ভুগতে প্রাণ হারায়। হুসেন খাঁ নিরাপদে নিচে নেমে আসেন। আপাতত জেহাদের নেশা খানিকটা ঠাণ্ডা হলো, কিন্তু পুরোপুরি নয় ।
তারপর হুসেন খাঁ আকবরের দরবারে গেলেন। তাঁর জেহাদ-উপাখ্যান কিভাবে বলবেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না। পাহাড়ী লোকগুলোর উপর তিনি তিক্ত-বিরক্ত হয়ে ছিলেন, বোধ হয় আকবরেরও নজর ছিল কুমায়ূন-গাড়ওয়ালের উপর । টুকড়িয়া কাঁটগোলা অঞ্চল (মুরাদাবাদ জেলা) জায়গির প্রার্থনা করলেন।
দরবার বিবাদ-বিসংবাদ লেগে থাকা অঞ্চলগুলো সৰ্ব্বদাই দিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি থাকে। টুকড়িয়া সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তিনি পার্বত্যাঞ্চলে প্রবেশ করে তাঁর জেহাদ বজায় রাখলেন। জেহাদে অগাধ ধন-সম্পদ লুণ্ঠনের সুযোগ পেলে জেহাদী লোকের কি অভাব হয়! তৈমূর বংশীয় শাহজাদা ইব্রাহিম হুসেন আকবরকে উত্যক্ত করছিলেন। তিনি হিন্দুস্তানে (উত্তরপ্রদেশে) এসে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে যাচ্ছিলেন। টুকড়িয়া সংবাদ পেয়ে যুদ্ধযাত্রা করলেন। তাঁর উরুদেশে গুলি লাগে। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক মোল্লা আব্দুল কাদির বদায়ূনী তাঁর কাছে কয়েক বছর ছিলেন।
বদায়ূনীও ইসলামী জেহাদের উৎসাহ-দাতা। নিজের মুরুব্বির প্রশংসায় তিনি কখনও ক্লান্তি বোধ করতেন না। তিনি গুলি লাগার সময়ের কথা লিখেছেন – “আমি জল ছিটিয়ে দিলাম। আশপাশের লোকেরা ভেবেছিল, রোজা রাখার জন্য দুর্বল হয়ে পড়েছেন। আমি ঘোড়ার লাগাম ধরে মনে করলাম যে গাছের আড়ালে নিয়ে যাব। তিনি চোখ খুললেন। নিজের স্বভাব-বিরুদ্ধ ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন, বিরক্ত কণ্ঠে বললেন— লাগাম ধরার কি আছে, চলো, (যুদ্ধে) ঝাপিয়ে পড়ো।
ভীষণ সঙ্ঘর্ষ হলো। উভয়পক্ষের এত লোক নিহত হলো যে হাতে গোনা সম্ভব নয়। সন্ধ্যার সময় এই ক্ষুদ্র জীবের উপর আল্লার করুণা হলো, বিজয়ের হাওয়া বইতে লাগল। শত্রুরা সম্মুখ থেকে এমন ভাবে পালাচ্ছে যেন ছাগলের পাল যাচ্ছে। অথচ সৈন্যদের হাত চালানোর উপায় নেই। জঙ্গলে শত্রু-মিত্র একাকার হয়ে গেছে। একজন অন্যজনকে চিনতে পারছে না। দুর্বলতার কারণে একজন আর- একজনের উপর হাত তুলতে পারছে না। কিছু আল্লাহর বান্দা জেহাদের পুণ্য অর্জন করল। অনেকে রোজাও রেখেছিল। হতভাগ্য কিছু লোক জলাভাবে প্রাণ হারাল।”
জয়লাভ করে টুকড়িয়া কাঁটগোলা প্রত্যাবর্তন করলেন। জায়গিরের সুবন্দোবস্তে হাত দিয়েছেন, এমন সময়ে শুনলেন যে বাদশাহের বিদ্রোহী শাহজাদা হুসেন মির্জা সম্ভল থেকে পনেরো ক্রোশ দূরে। পালকি করে রওনা দিলেন। মির্জা বাঁশবরেলী থেকে চলে গেছেন, তিনি টুকড়িয়ার শৌর্য-বীর্যের কথা ভালোভাবেই জানতেন। হুসেন খাঁ মধ্যরাত্রে সম্ভল পৌঁছলেন।
নাকাড়ার শব্দ শুনে আকবরের সর্দারেরা মনে করলেন, মির্জা এসে গেছেন। সকলেই দুর্গের দ্বার রুদ্ধ করে ভিতরে বসে রইলেন। দুর্গের নিচে থেকে চিৎকার করে জানানো হলো যে হুসেন খাঁ তাদের সাহায্য করতে এসেছেন, তবেই তাঁদের দেহে প্রাণ এলো। তাঁরা শাহজাদা মির্জার পিছন-পিছন গঙ্গাপারে আহারের (বুলন্দশহর) দিকে ধাবিত হলেন, ওদিকে মির্জা তখন অমরোহ্ লুণ্ঠন করে চৌমালা উপত্যকায় গঙ্গা পেরিয়ে লাহৌরের দিকে অগ্রসর হয়েছেন।
টুকড়িয়া যদি গাড়ওয়াল-কুমায়ূনে হত্যা-লুণ্ঠন রক্তারক্তি করে পুণ্যার্জন করে থাকেন, তাহলে শাহজাদাও আকবরের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত শহরগুলিতে হত্যা-লুণ্ঠন করে ধনসম্পদ সংগ্রহ করেছেন এবং সহায়কের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছেন। হুসেন খাঁ তাঁকে সমানে অনুসরণ করছিলেন ।
লুধিয়ানায় গিয়ে শুনলেন, লাহৌরের লোকেরা মির্জার ভয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। মির্জা শেরগড় ও দীপালপুরে (মন্টগোমারী জেলা) চলে গেলেন। মির্জা এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছিলেন। টুকড়িয়া এবং আকবরের অন্যান্য দলপতিরাও তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করছিলেন। অবশেষে মির্জাকে বন্দী করে মুলতানে নিয়ে যাওয়া হলো। হুসেন খাঁ খবর পেয়ে মুলতানে পৌঁছলেন।
প্রথমে তিনি মির্জার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অস্বীকার করেন, কারণ বাদশাহের বিদ্রোহীকে সালাম করতে হবে। মির্জা সে কথা শুনে বলে পাঠালেন যে সালাম জানানোর আবশ্যকতা নেই। কিন্তু টুকড়িয়া তৈমূর- বংশীয় শাহজাদার সম্মুখে গিয়ে সালাম না জানিয়ে পারলেন না। টুকড়িয়া পুনরায় তাঁর কাঁটগোলা জায়গিরে ফিরে এলেন চাচী ১৮২ হিজরীতে (১৫৭৪-৭৫ খ্রিঃ) ভোজপুরী এলাকায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। সেজন্য আকবর খুব চিন্তিত ছিলেন এবং সেখানে বিশৃঙ্খলা দমনের চেষ্টা করছিলেন। টুকড়িয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন যে তিনি অওধে৺ হত্যা-লুণ্ঠন করে বেড়াচ্ছেন । আকবর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন।
আকবর দিল্লী ফিরলেন। সে সময় টুকড়িয়া পাটিয়ালি ও ভোগাওঁয়ে (মৈনপুরী জেলা) এসেছিলেন, সেখান থেকে দরবারে গেলেন। শুনলেন, মুজরার (দর্শন) হুকুম নেই। আধিকারিকদের কাছে আদেশ ছিল যে তাঁকে যেন শাহী দৌলতখানার সীমা থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়।
এমন অত্যাচারীর জন্য এরূপ দণ্ড যথেষ্ট কম, সন্দেহ নেই। সেটা জানতে পেরে টুকড়িয়া নিজের হাতি-ঘোড়া, সমস্ত আসবাবপত্র বিলিয়ে দিলেন— হুমায়ূনের স্মৃতিসৌধের খাদেমদের কিছু দিলেন, কিছু দিলেন মাদ্রাসাগুলোকে এবং দরিদ্রদের। বৃদ্ধ বয়সে গলায় কাফন জড়িয়ে ফকির হয়ে গিয়ে বললেন — “যিনি (হুমায়ূন) আমাকে ভৃত্য রেখেছিলেন, এখন থেকে আমি তাঁরই কবরে ঝাঁড়ু দেবো।”
সেকথা শুনে আকবরের মনে দয়া হলো এবং তিনি টুকড়িয়াকে কাঁটগোলা ও পাটিয়ালির এক কোটি কুড়ি লক্ষ টাকা মূল্যের জায়গির দিলেন। ৯৮২ হিজরীতে (১৫৭৪-৭৫ খ্রিঃ) টুকড়িয়া পুনরায় সোনা-রূপোর ধন-ভাণ্ডার ও সোনা-রূপোর মন্দির লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে কুমায়ূন-গাড়ওয়ালের পাহাড়-পর্বতে অভিযান চালালেন।
তরাইয়ের বসন্তপুরে পৌছতেই জমিদারগণ ও করোড়িগণ দৌড়াতে দৌড়াতে দরবারে গিয়ে অভিযোগ করলেন— হুসেন খাঁ বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন। বসন্তপুরের লড়াইয়ে টুকড়িয়ার কাঁধে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল, তিনি তখন আর জেহাদে সমর্থ নন, তাই পাটিয়ালিতে তাঁর পরিবারবের্গর কাছে যাওয়ার জন্য গড়মুক্তেশ্বর পৌছলেন।
পুরনো বন্ধু সাদিক মহম্মদ মুনায়ম খাঁর নিকটে গিয়ে তাঁকে দিয়ে বাদশাহের কাছে সুপারিশ করাতে চান। আবুল ফজল ‘আকবরনামা’য় লিখেছেন, হুসেন খাঁ দেশে লুঠতরাজ করে বেড়াচ্ছিলেন । বাদশাহ শুনে দ্বিতীয়বার অসন্তুষ্ট হলেন, তাঁর বিরুদ্ধে বহু সৈন্য-সহ এক দলপতিকে প্রেরণ করলেন, তখন হুসেন খাঁর কিছুটা টনক নড়ে। কাঁধে ক্ষত থাকার জন্যও তিনি মনে মনে খানিকটা দমে গিয়েছিলেন। পথে এলেন তিনি। সঙ্গে যেসব গুণ্ডা ছিল, বাদশাহী ফৌজের খবর পেয়েই তারা পালিয়ে গেল।
হুসেন খাঁ ভাবলেন, বাংলায় গিয়ে তাঁর পুরনো বন্ধু মুনায়ম খাঁর সঙ্গে দেখা করবেন এবং তাঁকে দিয়ে দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। গড়মুক্তেশ্বর উপত্যকা থেকে নৌকা চড়ে যাচ্ছিলেন, এমন সময় বারা নামক স্থানে ধরা পড়ে গেলেন।
