মার্ক্সীয় নারীবাদ

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় মার্ক্সীয় নারীবাদ – যা রাজনৈতিক আন্দোলনে বাংলার নারী |

মার্ক্সীয় নারীবাদ

 

নারীর দাসত্বের ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে কার্ল মার্কস ও ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস্ উনিশ শতকের মধ্যভাগে যে নারীবাদী তত্ত্বের উদ্ভাবন করেন তা মার্ক্সীয় নারীবাদ হিসেবে পরিচিত।

মার্কসবাদ অনুসারে শোষণভিত্তিক, শ্রেণিভিত্তিক সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তি প্রথার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে পরিবার আর নারীকে
পরিবারের মধ্যেই পুরুষের অধীন হয়ে থাকতে হয়। এভাবে মার্কস শ্রেনিশোষণের সঙ্গে নারী শোষণের যোগসূত্র স্থাপন করেছেন এবং শ্রেনিশোষণের অবসানের মধ্যদিয়ে নারীর মুক্তির পথনির্দেশ করেছেন।

মার্কসবাদী তত্ত্বের মূল সূত্র হচ্ছে দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। এই তত্ত্ব অনুসারে প্রাচীন যুগ থেকেই মানব সমাজে নারীজাতি পুরুষের অধীন এবং ভবিষ্যতেও থাকবে প্রচলিত এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। মার্কসবাদ ইতিহাস বিশ্লেষণ করে যুক্তি দেয় যে, প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন সমাজে মানুষের মধ্যে শোষক-শোষিত শ্রেণিবিভাগ হয় নি তখন নারী-পুরুষ সমানাধিকার ভোগ করতো।

এসময়ে মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা চালু ছিল এবং সমাজে নারীর কর্তৃত্বও বিরাজমান ছিল কেননা সামাজিক উৎপাদন (চাষাবাদ)-এর উপর নারীর নিয়ন্ত্রণ ছিল। পরবর্তী সময়ে যখন এক শ্রেণির মানুষ অন্য শ্রেণির মানুষের উপর অর্থনৈতিক শোষণ শুরু করে তখন থেকেই নারীকে ক্রমশ উৎপাদনশীল কাজ থেকে সরিয়ে গৃহকর্মের অনুৎপাদনশীল কাজে নিয়োগ দেয়া হয় এবং গৃহঅভ্যন্তরে নারীকে পুরুষের অধীনস্ত করা হলো। ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব এক্ষেত্রে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছে।

মানুষ যখন কৃষিভিত্তিক উৎপাদন শুরু করে তখন থেকে কিছু কিছু সম্পদ উদ্বৃত্ত থাকত এবং তা ধীরে ধীরে পুরুষদের মালিকানায় চলে যায়। মার্কস ও এঙ্গেলস বিষয়টি ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে, সামাজিক উৎপাদনের উপর সে দলের কর্তৃত্ব থাকে যে দল উৎপাদন কাজে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। যেহেতু চাষাবাদের প্রাথমিক স্তরে নারীর উৎপাদনের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করত, তখন মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও সমাজে নারীর কর্তৃত্ব বজায় ছিল।

পরবর্তী সময়ে পশুপালনের যুগে দেখা যায় উৎপাদনের প্রধান যন্ত্র ছিল বর্ণা দড়ির ফাঁস, তীর-ধনুক। * এসময়ে উৎপাদনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে পুরুষ এবং সমাজে পুরুষের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়; ফলে ক্রমশ গড়ে উঠতে থাকে পুরুষকেন্দ্রিক পরিবার। ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে যে প্রশ্নটি সামনে আসে তা হচ্ছে উত্তরাধিকারের প্রশ্ন।

মাতৃতান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তি মাতৃবংশের পরিচয়ে পরিচিত হতো। এবং কোন ব্যক্তির মৃত্যু হলে তার সম্পত্তি তার মাতৃগোষ্ঠীর লোকেরাই অধিগ্রহণ করতো, তার পুত্রকন্যাদের এক্ষেত্রে কোন অধিকার থাকত না। ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার পুরুষের হাতে যাবার পর শুরু হল উত্তরাধিকার আইন বদল করা এবং উচ্ছেদ হলো মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা।

ফ্রেডারিখক এঙ্গেলস্ জননীবিধি উচ্ছেদকে নারীজাতির চূড়ান্ত পরাজয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তনের ফলে স্ত্রীর বিশ্বস্ততা সম্বন্ধে নিশ্চিত হবার জন্য এবং সন্তানদের পিতৃত্ব সঠিকভাবে নির্ণয় করার জন্য প্রয়োজন হয় নারীকে সম্পূর্ণভাবে পুরুষের অধীনে রাখা, একবিবাহ প্রথার উদ্ভব হয় হয় এভাবেই।

এঙ্গেলস একে বলেছেন নারীর ওপর পুরুষ প্রাধান্যের রূপ। একবিবাহ প্রথায় নারী বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার হারায়। পুরুষ বৈধ স্ত্রী ব্যতীত অন্য নারীর সাথে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। অর্থাৎ একবিবাহ প্রথা শুধুমাত্র নারীর ক্ষেত্রেই কার্যকর হয়। পুরুষের কাছে নারীর বশ্যতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ এই একবিবাহ প্রথা।

২ ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের ফলে আধুনিক কলকারখানা প্রতিষ্ঠিত হলে, দরিদ্র নারীদের একটি বড় অংশ কলকারখানায় কাজ করতে শুরু করে। এর মাধ্যমে নারীরা সামাজিক উৎপাদনমূলক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। এঙ্গেলস্ -এর মতে যদিও নারীদের কর্মসংস্থানের ফলে নারীমুক্তির পথ প্রশস্ত হবে তথাপি এটি বর্তমান পরিবারপ্রথার উপর প্রভাব ফেলবে এবং পরিবারপ্রথা ভেঙ্গে পরবে।

তিনি বলেন, আধুনিক ব্যক্তিগত পরিবারগুলি প্রকাশ্যেই হোক আর প্রচ্ছন্নভাবেই হোক, নারীর দাসত্বের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে …আর বর্তমান সমাজটাই হলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুকেন্দ্র স্বরূপ ব্যক্তিগত পরিবারের সমষ্টি নারীর মুক্তিলাভের প্রথম শর্তই হলো এই যে, সমগ্র নারীসমাজকে আবার সামাজিক উৎপাদনের কাজের মধ্যে পুনঃপ্রবেশ করতে হবে।

আর তারই ফলে বর্তমানে যে ধরনের ব্যক্তিগত পরিবারগুলি সমাজের অর্থনৈতিক অনুকেন্দ্র হিসেবে রয়েছে সেগুলি তার পূর্বেকার বৈশিষ্ট্য হারাবে।”মার্ক্সীয় নারীবাদ অনুসারে, ধনতান্ত্রিক বুর্জোয়া আইনে নারীর সমান অধিকার, শিক্ষার অধিকার, কাজের অধিকার স্বীকৃত হবার ফলে কিছুসংখ্যক নারী ঘরের বাইরে বের হয়ে আসতে শুরু করে।

শুধুমাত্র নিম্নস্তরের নারীরাই নয় বরং সমাজের সবস্তরের নারীরাই উৎপাদনমূলক কাজে অংশগ্রহণ করে। তবে এই চিত্র সমাজের ক্ষুদ্র অংশের জন্য প্রযোজ্য। নারীসমাজের বৃহৎ অংশ তখনও পুরাতন সামন্ত্রতান্ত্রিক কাঠামোর পরিবারের সনাতন নারীর ভূমিকাতেই রয়ে যায়। এঙ্গেলস্-এর মতে পরিবারের মধ্যে পুরুষ হচ্ছে বুর্জোয়া আর নারী সর্বহারা।

মার্কস্- এঙ্গেলস্-এর মতবাদ অনুসারে পুঁজিবাদের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান পরিবারব্যবস্থা তার বৈশিষ্ট্য হরাবে, নারী-পুরুষ সমান অধিকার পাবে, সমানভাবে উৎপাদনমূলক কাজে অংশগ্রহণ করবে। তাদের দাম্পত্য জীবন হবে সমানাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং অর্থনৈতিক দাসত্বমুক্ত। এভাবেই নারী মুক্ত হবে পুরুষের দাসত্ব থেকে।” এই মতবাদ অনুসারে, সর্বহারা শ্রেণির মুক্তির সঙ্গে নারীসমাজের মুক্তির বিষয়টি জড়িত।

 

মার্কস-এঙ্গেলস দেখিয়েছেন যে, পুঁজির উপর ব্যক্তিগত মালিকানা বিলুপ্তির মাধ্যমে অবসান ঘটবে শ্রেণি শোষণের, শ্রেণিশোষণের অবসানের মাধ্যম্যে অবসান হবে নারীশোষণ এবং পীড়নের। মার্ক্সীয় নারীবাদ পুঁজিতন্ত্রের অবসান ও সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাকে নারীমুক্তির উপায় হিসেবে নির্ণয় করেছে।

Leave a Comment