মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড

মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড

 

মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড

 

মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি সৃষ্টি এবং নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের অবদান ছিল অপরিসীম। পাকিস্তান সৃষ্টির কয়েক মাসের মধ্যেই মুসলিম লীগের পাকিস্তান জাতীয়তাবাদের বদলে বাঙালিরা ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়। আর এর পেছনে মূল প্রেরণা যোগান ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়।

তাঁরা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে ষাটের দশকে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্নভাবে ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় ভূমিকা ছিল। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্ররা ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মূল লক্ষবস্তু।

যদিও নয় মাস শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নয়, সমগ্র বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের আক্রোশ ছিল এবং এ কারণে পরিকল্পিতভাবে এ সম্প্রদায়কে নিধনের সিদ্ধান্ত নেয়। অনেকাংশে তারা সফলও হয়। যদিও ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় তাদের পরিকল্পনার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।

বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞা

যেকোন দেশে চিন্তা-চেতনার দিক দিয়ে অগ্রসর শ্রেণী বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। সাধারণ অর্থে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, আমলা, কূটনীতিবিদ, বিজ্ঞানী- যারা বিভিন্ন বুদ্ধিভিত্তিক পেশায় নিয়োজিত তাদের বুদ্ধিজীবী বলা হয়। কোন কোন মনীষী মনে করেন একটি মানুষের দেহের জন্য মস্তিষ্কের যেমন গুরুত্ব, সমাজের জন্য বুদ্ধিজীবীগণ তেমনি অত্যাবশ্যকীয় অংশ।

তাঁরাই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে তাদের লেখালেখি, বক্তব্য হয়ে ওঠে প্রতিবাদের দাবানল। এর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আপামর জনতা ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে, মুক্তির লক্ষে। বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা মুক্তিযুদ্ধে যথার্থ ভূমিকাই রেখেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা

বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, দীর্ঘকালীন স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যেসব বুদ্ধিজীবী জড়িত ছিলেন তারাও যেমন মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি মুক্তিযুদ্ধে যারা প্রাথমিক পর্যায়ে জড়িত ছিলেন না তারাও এক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন। অবশ্য বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা শুধু যুদ্ধের নয় মাসেই সীমিত ছিল না।

ব্রিটিশ আমলে পরাধীনতার বিরুদ্ধে, পরবর্তীকালে বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের প্রতিটি সংগ্রামে তাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন এবং ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে এরা ছিলেন অনুপ্রেরণাদানকারী, কেউ কেউ সামনের কাতারে । বাঙালি জাতির ওপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ, অত্যাচারের বিষয় সাধারণ মানুষকে অবগত করেছিলেন তাঁরা।

বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ যে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যাচ্ছে এটা সকলেরই জানা ছিল। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা সেই সত্যটা আরো স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। তাঁরাই প্রথম পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে দু’টি স্বতন্ত্র অর্থনীতি চালুর কথা বলেছেন। বাঙালি সাংবাদিকরা তুলে ধরেছেন আন্দোলনের প্রতিটি খবর, শিল্পী-সাহিত্যিকরা গল্প-উপন্যাস, নাটক, গান সহ লেখনীর মাধ্যমে জনগণের গণতান্ত্রিক, মৌলিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের প্রতি সচেতন করে তুলেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা কখনো স্বতন্ত্র, কখনো একই সাথে করেছেন আন্দোলন। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অবদান রেখেছেন বুদ্ধিজীবীরা।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় বাঙালি আইনজীবীরা কৌশলে সওয়াল-জবাবের মাধ্যমে আসামীদের জবানীতে বের করে এনেছেন পাকিস্তান রাষ্ট্র ব্যবস্থার বৈষম্য ও শোষণের চিত্র, পত্রিকাগুলো সেগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে গণসচেতনা সৃষ্টি করেছে। ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের বাঁচাতে গিয়ে নিজেই পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা।

তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কার্ফু ভঙ্গ করে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। কেউ তাদের বলেনি বের হয়ে আসতে, ড. জোহাকে তারা জানে না, বিশ্ববিদ্যালয় দূরে থাকুক, কোন বিদ্যালয়েই যায়নি তাদের অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু ড. জোহার আত্মত্যাগে প্রেরণা লাভকারী মানুষের স্রোতে সেদিন আইয়ুব-মোনায়েমের পতন ঘটেছিল। ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে একইভাবে স্বৈরশাসন কায়েম করলে একইভাবে বুদ্ধিজীবীরা প্রতিবাদ জানান ।

একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন কালীন সময়ে তারা রাজনীতিবিদ ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে থেকে কাজ করেন। ১৯৭১ সালে যখন গণহত্যা শুরু হয় তখন বাংলাদেশের মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি মর্মান্তিকভাবে বেজেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকান্ড। দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে ছিল এ ঘটনার পর নিশ্চিত জেনেছে যে পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া কোন বাঙালির বাঁচার উপায় নেই।

বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশ তাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ভারতে আশ্রয় নেয়া বুদ্ধিজীবীরা গড়ে তুলেন ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’ যার সভাপতি ছিলেন ড. আজিজুর রহমান মল্লিক (ভি.সি. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)। এছাড়া তাঁকে সভাপতি এবং জহির রায়হানকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয় ‘বুদ্ধিজীবী সংগ্রাম পরিষদ’। বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন মুজিবনগর সরকারের অধীনে পরিকল্পনা সেল গঠন করেন।

বিশ্বের বুদ্ধিজীবীদের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সরবরাহ ও বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, সংসদীয় পার্টির সঙ্গে সাক্ষাৎ, সাহায্যের আবেদন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বক্তব্য প্রদান, শরণার্থীদের উৎসাহ প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাঁরা ভূমিকা রাখেন। শরণার্থী শিবির শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে ৫৬টি স্কুল খুলে শরণার্থীদের ছেলে- মেয়েদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করে।

বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ যা বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামীদের প্রেরণার উৎস ছিল। এভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখেন।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের কারণ

মনীষী গোর্কি বলেছেন, মাছের যেমন পচন শুরু হয় মাথা থেকে, তেমনি কোনো জাতিরও অধঃপতনের সূত্রপাত হয় মস্তিষ্ক তথা বুদ্ধিজীবী শ্রেণী থেকে। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তি একটি জাতির সংস্কৃতি ও বুদ্ধিসত্তাকে উৎখাত করে নিজেদের শোষণ ও শাসন চিরস্থায়ী করার জন্য এই মনীষীর বাক্যকেই ঘৃণ্য হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে।

তারা একদিকে বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিকে ধ্বংস করার জন্য এবং অন্যদিকে এগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদ, শিল্পী, সাহিত্যিক, আইনজীবী, রাজনৈতিক প্রভৃতি শ্রেণীকে পঙ্গু ও নির্জীব করার জন্য কোথাও জেল-জুলুম ও হয়রানি চালায়।

লোভ-লালসাও দেখানো হয়। এই জালে বুদ্ধিজীবীদের ক্ষুদ্র একটি অংশ ধরা দিলেও বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশই ছিলেন জনগণের পাশে। কখনো পেছন থেকে কখনোবা প্রকাশ্যে তাঁরা স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রেরণা দিয়েছেন। বুদ্ধিজীবীদের এই ভূমিকার কারণে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুক্তিযুদ্ধের তৎপরতার ফলে পাকিস্তান সরকারের ধারণা হয় যে, মূলত বুদ্ধিজীবীদের উস্কানিতেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা চেয়েছে।

তাই ২৫ মার্চ গণহত্যার সূচনা হতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র-ছাত্রীরা এর প্রথম আক্রমণের শিকার হন। ঢাকার জগন্নাথ হল ও জহুরুল হক হলে প্রায় ৫০০ ছাত্র হত্যা করে এবং গণহত্যার শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষক নিহত হন। এই হত্যাযজ্ঞ এরপর বাংলাদেশের সর্বত্রই চালানো হয়।

প্রধান প্রধান শহরগুলোতে, বিশেষত যেসব জায়গায় পাকিস্তানি সেনানিবাস ও সৈন্য ঘাঁটি ছিলো সেখানে বিভিন্ন শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী নির্মূল অভিযান চালায়। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে অর্থাৎ ডিসেম্বরে বিভিন্ন রণাঙ্গনে পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনী পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাঙালি জাতিকে স্থায়ীভাবে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পঙ্গু করতে বেছে বেছে বুদ্ধিজীবী হত্যা করে।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাঙালিকে স্থায়ীভাবে পরাধীন রেখে শোষণ অব্যাহত রাখা।

 

বুদ্ধিজীবী হত্যার বিভিন্ন পর্যায়

সারা দেশে বুদ্ধিজীবী নির্মূল অভিযানের নীলনক্সা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অনুযায়ী একযোগে গণহত্যা পরিকল্পনা নেয়া হয়। বুদ্ধিজীবী নির্মূল অভিযানকে ৩ পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্ব ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত চলে। প্রথম পর্বে হত্যার শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছাড়াও দেশের কয়েকজন খ্যাতিমান আইনজীবী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনীতিবিদ।

তাঁরা শহীদ হন প্রধানত পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার অংশ হিসেবে। দ্বিতীয় পর্ব চলে মে-নভেম্বর মাস পর্যন্ত। এ পর্বে প্রকাশ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড কম হলেও গোপনে পাকবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের সহযোগিতায় বুদ্ধিজীবী নিধন চলে। বুদ্ধিজীবীদের গতিবিধি ও কার্যকলাপের ওপর গোপন কঠোর দৃষ্টি রাখা হয়। বাঙালি সংস্কৃতিমনা বুদ্ধিজীবীদের তালিকা গণআন্দোলনের সময়ই প্রস্তুত করা হয়েছিল।

এ পর্বে তাঁদের হত্যার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। রাজাকারদের উদ্ধারকৃত ডায়েরি থেকে বুদ্ধিজীবীদের যে তালিকা পাওয়া যায় তাতে স্পষ্ট হয় বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বাঙালিকে পঙ্গু করাই ছিল হত্যার প্রধান উদ্দেশ্য। তবে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের চূড়ান্ত পর্ব ছিল ১০ ডিসেম্বর থেকে চূড়ান্ত বিজয়ের আগে পর্যন্ত। হানাদাররা পরাভূত হবে কিংবা মাত্র ৯ মাসের মধ্যে তাদের ভরাডুবি হবে একথা কল্পনাও করেনি।

সেজন্য পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হলেও বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়। ৩ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী যৌথ আক্রমণের মুখেও তাদের টনক নড়েনি। কারণ তখনও মার্কিন সপ্তম নৌবহরের আগমন তাদের শেষ ভরসা ছিল।

কিন্তু জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক ফোরামে যুদ্ধবিরতির পক্ষে ব্যাপক সাড়া পড়ে গেলে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে পরাজয় নিশ্চিত জেনে আলবদর ও রাজাকার বাহিনীর সহযোগিতায় ১০ ডিসেম্বর থেকে বুদ্ধিজীবী অপহরণ ও হত্যাকান্ড দ্রুত ঘটানো হয়।

১৪ ডিসেম্বর ঢাকার গভর্নর হাউসে বোমাবর্ষণের পর ডা. মল্লিক মন্ত্রিসভার পদত্যাগের পর পাকবাহিনীর সকল আশা ধূলিসাৎ হলে ইতোমধ্যে আটককৃত কিংবা নতুন আটককৃত বুদ্ধিজীবীদের সরাসরি হত্যা করা হয়। ঢাকার বুদ্ধিজীবীদের মিরপুর শিয়ালবাড়ি ও মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়।

স্থানীয় পর্যায়ে আরো অনেক বধ্যভূমিতে তাঁদের লাশ পাওয়া যায়। আবার কারো কারো লাশও পাওয়া যায়নি। স্বাধীনতার পর লাশের স্তূপে যাঁদের পাওয়া গিয়েছে তাঁদের সকলের হাত-পা-চোখ বাঁধা ছিল। কারো হাত নেই, কারো চোখ বা হৃৎপিন্ড নেই। এগুলো নরপিশাচদের নির্যাতনের স্বাক্ষর বহন করে।

উল্লেখযোগ্য শহীদ বুদ্ধিজীবী

১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ বাংলাদেশের সর্বত্র সংঘটিত হয়। এ যজ্ঞে শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিল্পী, আইনজীবী, রাজনৈতিক, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কেউ বাদ পড়েনি। যদিও স্বাধীনতার পর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে করা হয়নি। তাই তাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায় না।

তবে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ প্রকাশ করে। এতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের একটি অসম্পূর্ণ তালিকা রয়েছে। এতে মোট ৯৮৯ জন শিক্ষাবিদ সহ মোট ১,১০৯ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে। এই তালিকা অনুযায়ী মোট ৬৩৯ জন প্রাথমিক, ২৭০ জন মাধ্যমিক, ৫৯ জন কলেজ, ২১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সহ ৯৮৯ জন শিক্ষাবিদ শহীদ হন।

এছাড়া ৪১ জন আইনজীবী, ৫০ জন চিকিৎসক, ১৩ জন সাংবাদিক, ৮ জন গণপরিষদ সদস্য, ১৬ জন কবি-সাহিত্যিক, প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা শহীদ হন। যদিও পরবর্তীকালে মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানের ফলে আরো অনেক শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নাম পাওয়া গিয়েছে। ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আইনজীবী’ গ্রন্থে ৬৪ জন শহীদ আইনজীবীর তালিকা রয়েছে। তাই বলা চলে তৃণমূল পর্যায়ে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ হলে শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা ২/৩ গুণে দাঁড়াবে ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ শিক্ষকদের ২১ জনের মধ্যে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ জন শহীদ হন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, গোবিন্দ্র চন্দ্র দেব, সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য, ড. জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, ফজলুর রহমান খান, শরাফত আলী অন্যতম শহীদ বুদ্ধিজীবী।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাইয়ুম, হাবীবুর রহমান, সুখরঞ্জন সমাদ্দার- এই তিনজন শহীদ হন। মানব দরদী চিকিৎসক ফজলে রাব্বী, আলিম চৌধুরী, শামসুদ্দীন, গোলাম মোর্তজা, জিয়াউর রহমানকেও ঘাতকরা রেহাই দেয়নি। জনগণের পক্ষে লেখার কারণে হত্যা করে সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, নিজামুদ্দিন আহমদ, গোলাম মোস্তফা, নাজমুল হক, শহীদ সাবেরকে।

হত্যা করে আইনজীবী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, নাজমুল হক সরকার, আবদুল জব্বার, আমিন উদ্দিনকে। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার অপরাধে প্রাণ দেন প্রকৌশলী সামসুদ্দিন, নজরুল ইসলাম, সেকান্দার হায়াত চৌধুরী, চলচ্চিত্র ও গানের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা পালনকারী জহির রায়হান, আলতাফ মাহমুদ, কিংবা সাহিত্যিক ইন্দু সাহা, সেলিনা পারভীন, মেহেরুন্নেসা বাদ পড়েনি হায়েনাদের বুলেট থেকে।

সারসংক্ষেপ

স্বাধীনতা সংগ্রামে গুটি কয়েক সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী ছাড়া বড় অংশই সমাজ-জনতার অগ্রবর্তী অংশ হিসাবে কাজ করেছে। পাকিস্তানের ব্যর্থতার লক্ষণ প্রথমে তাঁদের কাছে ধরা পড়েছে। তাঁরাই বুঝিয়েছেন ভাষার ওপর আক্রমণের অর্থ কি? অর্থনীতির গতি কোন দিকে? সেই জ্ঞানকে তাঁরা সাধারণ মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছেন, বাকি কাজটি জনগণ করেছে।

তাঁরা পাকিস্তানিদের পরাভূত করে দেশকে স্বাধীন করেছেন। অবশ্য এর বিনিময়ে লক্ষ লক্ষ বাঙালি আত্মত্যাগ স্বীকার করেছেন। শহীদ হয়েছেন বহু বুদ্ধিজীবী। বাংলাদেশকে বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে একটি দুর্বল দেশে পরিণত করার জন্যই বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড চালানো হয়। শহীদ বুদ্ধিজীবীরা বেঁচে থাকলে দেশ ও জাতির জন্য আরো অবদান রাখতে পারতেন।

জাতিকে সমৃদ্ধ করতে পারতেন তাঁদের প্রতিভার পরশে। অবশ্য তাদের শিক্ষা ও দেশপ্রেমের আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে বাঙালি জাতি ভবিষ্যতে অগ্রগতির সোপানে আরোহণ করতে পারবে।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১। তথ্য বেতার মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৭২।

২। আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন, ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী’, দৈনিক ইত্তেফাক, বিজয় দিবস সংখ্যা, ১৯৯১।

 

মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :

১। সাধারণত কাদের বুদ্ধিজীবী বলা হয় লিখুন।

২। মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা সংক্ষেপে বর্ণনা করুন।

৩। বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের পেছনে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের কি উদ্দেশ্য তা চিহ্নিত করুন।

রচনামূলক প্রশ্ন:

১। বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের কারণ, পর্যায় এবং কয়েকজন উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিজীবীর নাম উল্লেখ করুন। বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের ফলে দেশে প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করুন।

Leave a Comment