আজকে আমদের আলোচনার বিষয় মুক্তিযুদ্ধ ও জাতিসংঘ। বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের মধ্যে সম্পর্কের সূত্রপাত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়েই। একাত্তরের মার্চে বাংলাদেশের লাখো মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়। এপ্রিলে ভারত সরকার জাতিসংঘের কাছে শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা দিতে অনুরোধ জানায়। এই অনুরোধে তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব কুর্ট ওয়াল্ডহেইম উদ্যোগী হন। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার নেতৃত্বে ভারত সরকারের সঙ্গে অংশীদারীত্বের ভিত্তিতে এবং জাতিসংঘ শিশু তহবিল , বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি,জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং লিগ অব রেডক্রস সোসাইটির সহযোগিতায় ১ কোটি বাঙ্গালি শরণার্থীকে মানবিক সহায়তা প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়। স্বাধীনতার পর শরণার্থীরা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে এবং জাতিসংঘ সংস্থাগুলো পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা দেয়।
মুক্তিযুদ্ধ ও জাতিসংঘ

মুক্তিযুদ্ধ ও জাতিসংঘ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। কারণ একটি আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ সমস্যা ক্রমশ মুক্তিসংগ্রামে রূপান্তরিত হয় এবং এক পর্যায়ে আঞ্চলিকতা ছাড়িয়ে তা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাক শাসকদের শোষণ, বঞ্চনা, হত্যা, নিপীড়ন, নির্যাতন ইত্যাদির বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার (প্রায় ৫৬ ভাগ) স্বাধীনতার সংগ্রাম।
সুতরাং যে সংগ্রামের প্রতি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার সমর্থন সে সংগ্রামের প্রতি জাতিসংঘের ভূমিকা হবে গুরুত্বপূর্ণ এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জাতিসংঘ এমন একটি বিশ্ব সংস্থা যেখানে প্রধানত বৃহৎ শক্তিবর্গের সম্মতিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত ও বাস্তবায়িত হয়। অর্থাৎ কোন একটি বিশেষ ইস্যুতে বৃহৎ শক্তিবর্গের দৃষ্টিভঙ্গী কি বা ঐ ইস্যুকে তারা কিভাবে গ্রহণ করেছে মূলত তার ওপর ভিত্তি করেই জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
বৃহৎ শক্তিবর্গের ঐকমত্য ব্যতীত জাতিসংঘ কোন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে না। সুতরাং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বিশেষভাবে স্মরণ রাখা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের ভূমিকা
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের ভূমিকা বা কার্যক্রমকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা-
ক. বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানবিক কার্যক্রম সংক্রান্ত তৎপরতা;
খ. যুদ্ধ বন্ধ ও রাজনৈতিক সমাধান প্রশ্নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ;
গ. মুজিবনগর সরকার ও জাতিসংঘ;
ঘ. শেখ মুজিবের বিচার প্রশ্ন ও জাতিসংঘ;
ঙ. বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান প্রশ্ন ও জাতিসংঘ।
মানবিক কার্যক্রম সংক্রান্ত তৎপরতা
মানবিক কার্যক্রম সংক্রান্ত ভূমিকায় জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে শরণার্থীদের ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা পর্ব হতেই শরণার্থী সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে এবং দ্রুত এটি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সংকট হতে একটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান হতে দেখা যায় যে, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠী আর কখনো বাস্তুচ্যুত হয়নি। জাতিগত নিপীড়ন, হিন্দু বিদ্বেষ ও গণহত্যার কারণে বিশেষ করে ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ মধ্যরাতে যে বাঙালি নিধনযজ্ঞ শুরু হয় তারপর হতে প্রাণভয়ে ও নিরাপত্তার সন্ধানে লক্ষ লক্ষ মানুষ পার্শ্ববর্তী ভারতের সীমান্তবর্তী গ্রাম ও শহরগুলোতে আশ্রয় নেয়।
ডিসেম্বর নাগাদ শরণার্থীদের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি। এই বিপুল পরিমাণ শরণার্থীর খাদ্য, পানীয়, ঔষধপত্র, মাথাগোঁজার ঠাই ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যা এক জটিল অবস্থা সৃষ্টি করে। আর এই জটিল অবস্থা মোকাবেলায় অর্থাৎ শরণার্থী সমস্যা ও মানবিক বিষয়ে জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাতিসংঘের ভাষায়; The organization (UN) mounted largest humanitarian operation in its history during and after in conflict over Bangladesh.
১৯৭১ সালে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (UNHCR) প্রধান প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান শরণার্থী সমস্যাকে জাতিসংঘের জন্য এক মানবিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেন। যাহোক, মানবিক সমস্যা মোকাবেলায় উপমহাদেশে জাতিসংঘের দুটো মিশন কাজ করে। এর একটি পরিচালিত হয় ভারতে, অপরটি দখলীকৃত বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তানে)। শরণার্থী সমস্যায় মানবিক সাহায্য প্রদানে সহায়তার জন্য জাতিসংঘ সরাসরি প্রস্তাব প্রদান করে ১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল।
কিন্তু জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আগাশাহী সরাসরি এর বিরোধিতা করেন। তবে পাকিস্তানের বিরোধিতা সত্ত্বেও জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্ট ২২ এপ্রিল দ্বিতীয়বারের মত মানবিক সাহায্য প্রদানের জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে পত্র দেন। এ পত্রে মহাসচিব পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ইয়াহিয়াকে তিনি জানান যে, ২৫ মার্চের ‘ক্র্যাকডাউন’এর পর ঢাকা থেকে জাতিসংঘের যে সকল কর্মকর্তা ফেরৎ এসেছেন তাদের মাধ্যমে এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে তিনি পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রবণতা সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন। এছাড়াও জাতিসংঘের কাঠামোতে মানবাধিকারের যে নীতিমালা রয়েছে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টির ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ইয়াহিয়াকে তিনি জানান যে, পাকিস্তানের সম্মতি পেলে জাতিসংঘ এবং তার বিশেষায়িত সংস্থাগুলো একটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে । তিনি আরও জানান যে, সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ যে দূর্গতি ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে তার সহায়তায় জাতিসংঘ ভূমিকা রাখতে পারে ।
সরেজমিনে শরণার্থী পর্যবেক্ষণ:
সরেজমিনে শরণার্থী পর্যবেক্ষণের জন্য জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (UNHCR) প্রধান সদরুদ্দিন আগা খান জুন মাসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে ভারত ও পাকিস্তান সফর করেন। ১২ জুন তিনি চুয়াডাঙ্গা ও বেনাপোলে পাকিস্তান সরকার স্থাপিত দুটো ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং কিছু ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। অবশ্য এসব ক্যাম্প ছিল মূলত সাজানো ও প্রতারণামূলক কৌশলের অংশ।
পাকিস্তান সফর শেষে ১৫ জুন তিনি কলকাতা পৌঁছেন এবং ভারত সফর শেষে ২৩ জুন জেনেভায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন যে, রাজনৈতিক সমাধানই শরণার্থীদের মনে প্রকৃত আস্থা ও বিশ্বাস জন্মাতে পারে। সদরুদ্দিন আগা খানই জাতিসংঘের প্রথম উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যিনি সরেজমিনে ঘটনাবলী পর্যালোচনা করে এই স্বীকারোক্তি করেন।
তথাপি জাতিসংঘ পরবর্তী মাসগুলোতে গ্রহণযোগ্য কোন সমাধানের উদ্যোগ নেয়নি। তবে ভারত ও পাকিস্তানে জাতিসংঘের এজেন্সীসমূহের ত্রাণ তৎপরতা সমন্বয় করার জন্য সংস্থাটি ইতিহাসে প্রথমবারের মত জেনেভায় একটি নির্বাহী সংস্থা (Standing Committee) গঠন করে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের তৎপরতা:
জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ’-এর সদর দফতর জেনেভায় পরিষদের ৫১তম অধিবেশন শুরু হয় ১৯৭১ সালের ৫ জুলাই। উদ্বোধনী ভাষণে জাতিসংঘ মহাসচিব ভারত ও পাকিস্তানে ত্রাণ তৎপরতায় অংশ নিতে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থাকে আহবান জানান। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার প্রধান সদরুদ্দিন আগা খান রিপোর্ট করেন যে, ভারতে শরণার্থীদের জন্য আরও ব্যাপক সাহায্য প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন যে, সংকট মোকাবেলায় সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী ৪০ কোটি ডলার প্রয়োজন এবং এ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের মঞ্জুরী, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার অনুদান ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ৯ কোটি ৯৪ ডলার পাওয়া গেছে। তিনি শরণার্থী শিবিরগুলোতে কলেরার টিকা ভারত সরকারের কাছে হস্তান্তরের বিবরণ দেন।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের ১১ দিনব্যাপী বিতর্ক ও আলোচনার পর ১৬ জুলাই উপমহাদেশে জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রমকে অনুমোদন করা হয়। এ অনুমোদনের মাধ্যমে দুটো স্বতন্ত্র ত্রাণ কার্যক্রমকে স্বীকৃতি দেয়া হয়-
১. ভারত আশ্রিত বাঙালি শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ কার্যক্রম- যা ছিল জাতিসংঘের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ত্রাণ
কার্যক্রম। এর তত্ত্বাবধানে ছিল জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা।
২. পূর্ব পাকিস্তানে ত্রাণ কার্যক্রম। এটি পরিচালিত হয় জাতিসংঘের একজন আবাসিক প্রতিনিধির নেতৃত্বে। এটি ছিল তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র কার্যক্রম।
ভারতে আশ্রিত শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ কার্যক্রম:
ভারতে আশ্রিত বিপুল পরিমাণ শরণার্থীদের সাহায্যে প্রথম ভারত সরকারই এগিয়ে আসে এবং পরবর্তীকালে দ্রুত বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপন করে। ১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল জাতিসংঘে নিযুক্ত ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন নির্লিপ্ত জাতিসংঘের সমালোচনা করে জাতিসংঘ মহাসচিবের নিকট প্রেরিত এক বার্তায় উল্লেখ করেন যে, মানবিক দূর্গতির এ মুহূর্তে জাতিসংঘের নিষ্ক্রিয়তা ও নীরবতাকে দূর্গত জনগণ উদাসীনতা মনে করে।
১৮ মে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বৃহৎ শক্তির প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, শরণার্থীদের দায়দায়িত্ব বহন করতে বৃহৎ শক্তিবর্গের এগিয়ে আসা উচিত। ভারত যুক্তি দেখায় যে, পাকিস্তান তার বেসামরিক নাগরিকদের ভারতে ঠেলে দিয়ে ভারতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। ভারতের এ ধরনের প্রচারণায় জাতিসংঘ সহ বৃহৎ শক্তির অনেকেই শরণার্থী সমস্যায় আর্থিক সাহায্য প্রদান করে ।
শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য বিভিন্ন দেশের কাছে জাতিসংঘের আহ্বান:
ভারতে আশ্রিত শরণার্থীদের সাহায্য দানের জন্য ১৯ মে জাতিসংঘ মহাসচিব বিভিন্ন দেশের সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও জনগণের নিকট আবেদন জানান। অবশ্য এর পূর্বে ২৩ এপ্রিল জাতিসংঘে নিযুক্ত ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন মহাসচিবের সাথে সাক্ষাৎ করে সর্বপ্রথম ভারত সরকারের পক্ষ থেকে শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সহায়তা কামনা করেন এবং ১২ মে তিনি ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী বাঙালি শরণার্থীদের একটি তালিকা জাতিসংঘে প্রদান করেন।
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিভিন্ন বিশেষায়িত সংস্থাগুলোকে সাহায্য প্রদানের আবেদন জানান। উল্লেখ্য, জাতিসংঘ মহাসচিবের আবেদনের পর পূর্ব পাকিস্তান সংকট দ্রুত আন্তর্জাতিক রূপ নেয়।
১৯৭১ সালের জুন পর্যন্ত জাতিসংঘ ভারতকে শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য ৯,৮০,০০,০০০ মার্কিন ডলার (৯৮ মিলিয়ন ডলার) অর্থ প্রদান করে। পরবর্তী মাসগুলোতে জাতিসংঘ আরও বেশ কিছু সাহায্য ও সাহায্যের আশ্বাস প্রদান করে। তবে সর্বসাকূল্যে সাহায্যের পরিমাণ ছিল ২১৫ মিলিয়ন ডলার। প্রয়োজনের তুলনায় এটা ছিল খুবই নগন্য ।
পূর্ব পাকিস্তানে ত্রাণকার্য পরিচালনা:
পূর্ব পাকিস্তানে জাতিসংঘের সাহায্য প্রস্তাবকে পাকিস্তান প্রথম দিকে প্রত্যাখ্যান করে এবং এ ধরনের উদ্যোগকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে আখ্যায়িত করে। কিন্তু ১৭ মে ইয়াহিয়া খানের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা মোজাফ্ফর আহমেদ জাতিসংঘ মহাসচিবের সাথে সাক্ষাৎ করে পূর্ব পাকিস্তানে জাতিসংঘের সাহায্য প্রার্থনা করেন।
বহির্বিশ্বের কূটনৈতিক চাপ এবং ১৯৭০-এর প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাস, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সৈন্যদের অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ, ক্ষেতের ফসল রেখে ভারতে পালিয়ে যাওয়া, ভয়হীন চিত্তে ফসল উৎপাদন করতে না পারা ইত্যাদি কারণে দুর্ভিক্ষের পদধ্বনির মুখে ইয়াহিয়ার নীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। ফলে সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধে জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক সাহায্য ছাড়া কোন বিকল্প ছিল না।
এ অবস্থায় জাতিসংঘ মহাসচিব পাকিস্তানের অনুরোধে ১৬ জুন দ্বিতীয়বার বিশ্ববাসীর নিকট আবেদন জানিয়ে বলেন- পাকিস্তান সরকার ও জাতিসংঘের সংস্থাসমূহ মনে করে যে, পূর্ব পাকিস্তানে খাদ্য সামগ্রীর জরুরি প্রয়োজন এবং ত্রাণকার্য পরিচালনার জন্য পরিবহন দরকার। ফলে জাতিসংঘের উদ্যোগে পূর্ব পকিস্তানে পরিচালিত হয় UNEPRO (United Nations East Pakistan Relief Operation) কার্যক্রম।
UNEPRO-তে কাজ করার জন্য একটি রিলিফ টিম গঠনের বিষয়টি জাতিসংঘ সদর দফতর থেকে ঘোষণা করা হয় ২ আগস্ট। এ দলটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয় যে, এদের কাজ হবে সম্পূর্ণ ত্রাণ তৎপরতা বিষয়ক। তবে পূর্ব পাকিস্তানে জাতিসংঘ ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার প্রতিনিধি জন আর. কেলি ইতোপূর্বেই অর্থাৎ ২৮ জুলাই ঢাকায় আগমন করেছিলেন।
আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত মহাসচিব স্বয়ং এবং এরপর সহকারী মহাসচিবের মর্যাদাপ্রাপ্ত ফরাসি কূটনৈতিক পল মার্ক হেনরি পূর্ব পাকিস্তানে জাতিসংঘ ত্রাণ কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করেন।
জাতিসংঘ ত্রাণ বিতরণে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা :
সদর দপ্তরের পরিকল্পনা ও সহায়তা সত্ত্বেও জাতিসংঘ ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সাহায্য ক্ষুধার্ত মানুষ ও ভূক্তভোগীদের হাতে খুব কমই পৌঁছে। কারণ জাতিসংঘ কর্মকর্তারা ত্রাণ বিতরণে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হন, যথা-
১. জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার যানবাহন পাকিস্তানিরা বিভিন্ন সময় নিজেদের সামরিক কাজে ব্যবহার করে। এমনকি জাতিসংঘের ত্রাণ সামগ্রীও বিভিন্ন সময় ছিনিয়ে নেয়। পাক সেনাবাহিনী ছাড়াও তাদের বাঙালি সহযোগী যেমন, ‘শান্তি কমিটি ও ‘রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা জাতিসংঘ ত্রাণ সামগ্রী আত্মসাৎ এমনকি কোন কোন স্থানে তারা জাতিসংঘের ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে ব্যবসা করে বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়।
২. জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও ত্রাণ কর্মীগণ স্থানীয় ভাষা জানতেন না। ফলে তাদেরকে ত্রাণ বিতরণে পাক সরকারের ওপর নির্ভর করতে হয়।
৩. প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে তাদের পূর্ব কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। ফলে একটা ভীতি সর্বদাই তাদের মধ্যে কাজ করত এবং মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা ছিল অনেক।
৪. জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জাতিসংঘ ত্রাণ তৎপরতাকে নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করে, ইত্যাদি।
জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে এ ধরনের প্রহসন ও দূর্গতি সত্ত্বেও জাতিসংঘ কর্মকর্তারা কয়েকটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র পরিদর্শন ছাড়া তেমন কিছু করেন নি। অবশ্য এর সাথে তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নটিও বিশেষভাবে জড়িত ছিল। তবে জাতিসংঘের ত্রাণ তৎপরতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে নভেম্বর মাসে জাতিসংঘ তৎপর হয়ে ওঠে এবং একটি শক্তিশালী অবস্থান নেয়।
নভেম্বর মাসে জাতিসংঘ পাকিস্তান সরকারের সাথে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে এবং সেখানে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। চুক্তি অনুযায়ী ত্রাণকর্মীরা অবাধে পূর্ববাংলায় প্রবেশ ও চলাচলের অধিকার অর্জন করে। এমনকি ত্ৰাণ তৎপরতাকে সম্পূর্ণ মানবিক বলেও চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সাথে বেসরকারিভাবে যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করেছিল তাদের অন্যতম একটি কর্মসূচি হচ্ছে ‘ইউনিসেফ-কেয়ার শিশু খাদ্য কর্মসূচি’। এ কর্মসূচির উদ্যোক্তাগণ পাক শাসকদের সাথে লিখিতভাবে চুক্তি করেন যে, স্কুলে উপস্থিতির পাশাপাশি অনুপস্থিত ছাত্র/ছাত্রীদেরকেও সাহায্য দেয়া হবে। এর ফলে যেসব ছাত্র/ছাত্রীরা ভয়ে বা অন্য কারণে স্কুলে যেত না তারাও সাহায্য পায় এবং কর্মসূচিটি সফল হয়।
কিন্তু ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর জাতিসংঘ মহাসচিব উথান্ট ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর এক বিবৃতিতে ঝুঁকিপূর্ণ কারণে সাহায্য সামগ্রী পরিবহন অসম্ভব হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানে ত্রাণ তৎপরতা স্থগিত ঘোষণা করেন। অবশ্য ভারতে ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত থাকে।
যুদ্ধ বন্ধ ও রাজনৈতিক সমাধান প্রশ্নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ
শরণার্থী সমস্যা ক্রমশ একটি আন্তর্জাতিক সংকটের পটভূমি সৃষ্টি করে। ফলে ভরণ-পোষণের মতো মানবিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমাধানের বিষয় নিয়ে বিভিন্ন মহলে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়। তবে বাংলাদেশ সংকটকে বৃহৎ শক্তিগুলো স্বীয় জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে ব্যবহার করার জন্য প্রকাশ্য এবং গোপন কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে।
একই সমান্তরালে জাতিসংঘ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ ও কিছু প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জাতিসংঘ মহাসচিবের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে সদস্য দেশসমূহের প্রতিক্রিয়া।
জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক মোতায়েনের প্রস্তাব:
জাতিসংঘ মহাসচিব ১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই জাতিসংঘে ভারত ও পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধিদ্বয়ের কাছে প্রস্তাব করেন যে, সীমান্তের দুই প্রান্তে শরণার্থী প্রত্যাবর্তন তদারকি করার জন্য UNHCR-এর প্রতিনিধি বা পর্যবেক্ষক মোতায়েন করা প্রয়োজন। পাকিস্তান সরকার আনন্দের সাথে এ প্রস্তাব গ্রহণ করে। কিন্তু ভারত ও মুজিবনগর সরকার প্রস্তাবটি দৃঢ়ভাবে বাতিল করে দেয়।
উল্লেখ্য প্রথমদিকে ভারত চেয়েছিল যে, পূর্ববাংলায় গণহত্যা বন্ধ ও সেখান থেকে আসা শরণার্থীদের সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করুক। অন্যদিকে প্রথমে পাকিস্তান শরণার্থী প্রশ্নে জাতিসংঘের জড়িত হওয়ার বিষয়টিকে মেনে নিতে চায়নি এবং এ ধরনের যে কোন উদ্যোগকে পাকিস্তান তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সামিল বলে বিবেচনা করে।
কিন্তু মে মাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শে ইয়াহিয়া খান জাতিসংঘের যাবতীয় উদ্যোগ মেনে নিতে সম্মত হয় ও কূটনৈতিক তৎপরতায় সক্রিয় হয়ে ওঠে যাতে জাতিসংঘের চাপে ভারত বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় এবং জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় তাদের প্রত্যাবর্তন সম্ভব হয়। কিন্তু ভারত বিষয়টি অনুধাবন করে জাতিসংঘের মানবিক উদ্যোগের ছদ্মাবরণে রাজনৈতিক ভূমিকা গ্রহণের তীব্র বিরোধিতা করতে থাকে।
কারণ জাতিসংঘ মহাসচিব গণহত্যা বন্ধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে একেবারেই নীরব ছিল। স্পষ্টতই পর্যবেক্ষক মোতায়েনের উদ্দেশ্য ছিল প্রথমত, বাংলাদেশের চার পাশ ঘিরে রেখে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধাভিযান প্রতিরোধ করা এবং দ্বিতীয়ত, মুক্তিবাহিনীর পক্ষে ভারতীয় সহায়তার পথ বন্ধ করা। যাহোক, মুজিবনগর সরকার ও ভারতের প্রত্যাখ্যানের পর জাতিসংঘ কর্মকর্তারা শরণার্থী সংস্থার পর্যবেক্ষক মোতায়েনের প্রস্তাবটি বাতিল করে দেয়।
নিরাপত্তা পরিষদ বরাবর জাতিসংঘ মহাসচিবের স্মারকপত্র প্রদান:
পাক-ভারত সীমান্তে পর্যবেক্ষক মোতায়েনের প্রস্তাবের একদিন পর ২০ জুলাই ১৯৭১ জাতিসংঘ মহাসচিব ৯৯ ধারা অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি ও সদস্য রাষ্ট্রসমূহের বরাবরে একটি স্মারকপত্র প্রদান করেন। মহাসচিবের এই স্মারকপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তিনি মূল ইস্যুগুলো এড়িয়ে গেছেন এবং তাঁর এ উদ্যোগের লক্ষ ছিল পাকিস্তানকে কিছুটা সহায়তা করা।
কারণ বাংলাদেশ সংকটকে তিনি ভারত ও পাকিস্তানের পূর্ববর্তী শত্রুতার জের হিসেবে উল্লেখ করেছেন- যা প্রকৃতপক্ষে সত্য নয় এবং ভারত ও পাকিস্তানকে তিনি বিবদমান পক্ষ হিসেবে দেখিয়েছেন, কিন্তু বাংলাদেশ যে একটি পক্ষ তা তিনি উল্লেখ করেননি।
তাছাড়া ১৯৭১ সালের পূর্ববর্তী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বনাম রাষ্ট্রীয় অখন্ডতার মধ্যে যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত হয়েছিল তার উল্লেখ করে বাংলাদেশ সংকটকেও তিনি আবেগপূর্ণ প্রতিক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করেছেন এমনকি পাকবাহিনী কর্তৃক বাঙালির গণহত্যার বিষয়টি তিনি উল্লেখই করেন নি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ:
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৬তম বার্ষিক অধিবেশন। জাতিসংঘের এ অধিবেশনে এজেন্ডাভুক্ত বিষয় হিসেবে ‘বাংলাদেশ সংকট সরাসরি স্থান পায়নি। তবে মহাসচিবের বার্ষিক প্রতিবেদন ও বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের বক্তব্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছে।
মহাসচিব কর্তৃক বাংলাদেশ শব্দটির উল্লেখ না করা এবং স্বয়ং সাধারণ পরিষদের সভাপতির বাংলাদেশ সংকটকে উপেক্ষা করা সত্ত্বেও ৫৭টি দেশ তাদের বক্তব্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে। এর মধ্যে ২৪টি দেশ সমস্যার মানবিক দিক এবং ৩৩টি দেশ মানবিক বিষয়ের সাথে সমস্যার রাজনৈতিক দিকটি চিহ্নিত করে। অধিবেশনের সভাপতি ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী আদম মালিক বাংলাদেশ প্রশ্নে সাধারণ পরিষদে বিতর্কের পক্ষে ছিলেন না।
তিনি সমস্যাটিকে মূলত ভারত-পাকিস্তানের মধ্যেকার দ্বি-পাক্ষিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌছাতে উভয় দেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের কথা উল্লেখ করেন।
অবশ্য অধিবেশন শুরুর দু’দিন আগে জাতিসংঘ মহাসচিব উ-থান্ট তাঁর বার্ষিক রিপোর্টে মন্তব্য করেন যে, যদিও ‘গৃহযুদ্ধের’ বিষয়টি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় তবে এ বিষয় থেকে যে সকল সমস্যার জন্ম হয়েছে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য অবশ্যই উদ্বেগের কারণ এবং রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের অগ্রগতি খুবই কম।
যাহোক, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশ সংকট আলোচিত হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের যে শতাধিক সদস্য রাষ্ট্র অধিবেশনে যোগদান করে তারা বাংলাদেশের সমস্যা সম্পর্কে অবগত হয়।
জাতিসংঘ মহাসচিবের Good Office প্রস্তাব:
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যখন একটি চূড়ান্ত পরিণতির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল ঠিক সে সময় জাতিসংঘ মহাসচিব সংকট নিরসনে আরেকটি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ২০ অক্টোবর ভারত ও পাকিস্তান সরকারের কাছে এক পত্রে তিনি তাঁর Good Office ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। মহাসচিবের এই পত্রটির অন্তর্নিহিত অর্থ হলো সমগ্র বিষয়টিকে তিনি ভারত- পাকিস্তান সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করেন।
পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানও সমস্যাটিকে পাক-ভারত সংঘর্ষে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। সুতরাং দেখা যায় যে, ইয়াহিয়া ও জাতিসংঘ মহাসচিব দু’জনই সমস্যাটিকে দেখেছেন পাক- ভারত সমস্যা হিসেবে। কারণ তাহলে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম অমীমাংসিত থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই মহাসচিবের প্রস্তাবের একদিন পরই পাকিস্তান প্রস্তাবটিতে সম্মতি জানায়।
কিন্তু ভারত কিছুটা সময় নিয়ে ১৬ নভেম্বর কৌশলে মহাসচিবকে জানায় যে, ভারত-পাকিস্তানের পরিবর্তে তাঁর উচিত ইয়াহিয়া খান ও আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠান করা। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এ বার্তায় মহাসচিবের বিরুদ্ধে মূল সমস্যা পাশ কাটিয়ে কৌশলে পাকিস্তান সামরিক জান্তাকে রক্ষা করতে চাওয়ায় একটি প্রচ্ছন্ন অভিযোগ উচ্চারিত হয়।
জাতিসংঘ মহাসচিব এতে বিব্রতবোধ করেন এবং ২২ নভেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রেরিত বার্তায় অভিযোগ অস্বীকার করেন। উপমহাদেশে ভূমিকা পালনের জন্য জাতিসংঘের আরও একটি উদ্যোগের এভাবেই সমাপ্তি ঘটে। সুতরাং দেখা যায় যে, ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি হতে জাতিসংঘ মহাসচিব দু’সীমান্তে পর্যবেক্ষক নিয়োগ,
Good Office ব্যবহারের প্রস্তাব ইত্যাদি যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেন তা আপাতদৃষ্টিতে সাধু উদ্যোগ মনে হলেও এসব ছিল যুক্তরাষ্ট্র বিশেষত নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটির চিন্তাধারার পরিপূরক। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মুসলিম দেশগুলো সে সময় এ ধরনের উদ্যোগ আশা করত।
মুজিবনগর সরকার ও জাতিসংঘ
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মুজিবনগর সরকার ও জাতিসংঘের মধ্যেসরাসরি কোন সম্পর্ক ছিল না। তবে পরোক্ষ সম্পর্ক ছিল প্রথম থেকেই এবং মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে তা আরও বিস্তৃত হয়। ১৯৭১ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রমের মূল লক্ষ ছিল মুজিবনগরের অসহায় মানুষ। অর্থাৎ মুজিবনগরের অসহায় মানুষের সাথে এ বিশ্ব প্রতিষ্ঠানটির একটি গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়।
তবে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি দলের সাথে জাতিসংঘের সরাসরি পত্র যোগাযোগ হয় আগস্ট মাসে। পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে শেখ মুজিবের বিচারে উদ্যোগী হলে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবের অফিসের ডিরেক্টর ব্রায়ান ই. উরকুহার্ট বরাবর ১৮ আগস্ট প্রেরিত এক পত্রে মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে জনাব মওদুদ আহমেদ ঐ মামলায় শেখ মুজিবের আইনজীবী হবার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।
জবাবে ২৭ আগস্ট ব্রায়ান জানান যে, আইনগত জটিলতার কারণে মওদুদকে মুজিবের আইনজীবী হিসেবে নিযুক্ত করতে মহাসচিব তার Good Office ব্যবহার করতে পারছেন না। সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে মুজিবের বিচার শুরু হলে মওদুদ আহমেদ ব্রায়ানের বরাবর একটি চিঠি লিখে জানান যে, জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী মহাসচিবের পাকিস্তানের বিচার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে সীমাবদ্ধতা আছে।
কিন্তু মহাসচিব যদি তাঁর Good Office ব্যবহার করে শেখ মুজিবের সাথে যোগাযোগ করেন, তাহলে মুজিব নিশ্চয়ই তাঁর আইনজীবী হিসেবে মওদুদকেই পেতে চাইবেন। তবে এ যোগাযোগ বেশীদূর অগ্রসর হয়নি। সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রতিনিধি দল জাতিসংঘ ভবনে বাংলাদেশের মানুষের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামের পক্ষে জোরালো প্রচারণায় অবতীর্ণ হয়।
৪ ডিসেম্বর যুদ্ধ বন্ধ ও বিশ্বশান্তি প্রশ্নে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক শুরু হলে প্রতিনিধি দলের নেতা বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির নিকট একটি পত্রে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বাস্তবতা তুলে ধরেন এবং মুজিবনগর সরকারের পক্ষে বক্তব্য রাখার আবেদন জানান।
তবে বাংলাদেশ যেহেতু তখন স্বাধীন দেশ কিংবা জাতিসংঘের সদস্য ছিল না তাই বাংলাদেশ প্রেরিত প্রতিনিধি দল কোন সরকারি প্রতিনিধি দল ছিল না। এজন্য জাতিসংঘ ভবনে তাদের প্রবেশ করা ছিল বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এক্ষেত্রে তারা জাতিসংঘ সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ড. যোগেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর সহায়তায় জাতিসংঘ ভবনে প্রবেশ করতেন।
প্রবেশ পত্রে শুধু তারিখ থাকত। কোন জায়গা বা সময়ের উল্লেখ না থাকায় ইচ্ছামত যে কোন স্থানে ঢুকে তারা তদ্বির করতে পারতেন। শুধু তাই নয়, ড. ব্যানার্জীর সহায়তায় জাতিসংঘ প্রেস উইং-এ অবস্থিত টেলিগ্রাফ অফিস হতে সহজ ও সুলভ মূল্যে জনাব চৌধুরী মুজিবনগর সরকারের নিকট ঘন ঘন তারবার্তা পাঠিয়ে সাবলিল সংযোগ স্থাপন করেছিলেন।
৪ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি দলের নেতা আবু সাঈদ চৌধুরীকে বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দান প্রশ্নে ব্যাপক বিতর্কের পর তাঁকে বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দেয়া না হলেও তাঁর বক্তব্য সম্বলিত পত্রটি নিরাপত্তা পরিষদের অফিসিয়াল ডকুমেন্ট হিসেবে গ্রহণ ও বিলি করা হয়।
অর্থাৎ এটি ছিল এক ধরনের পরোক্ষ স্বীকৃতি।এই প্রথম জাতিসংঘে বাংলাদেশের মানুষের বক্তব্য বাংলাদেশের প্রতিনিধির মাধ্যমে সরাসরি উচ্চারিত হয়। এ বিবেচনায় মুজিবনগর সরকারের জন্য জাতিসংঘ ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট।
শেখ মুজিবের বিচার প্রশ্ন ও জাতিসংঘ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিচার প্রশ্নে জাতিসংঘের ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ অবস্থায় ১০ আগস্ট জাতিসংঘ মহাসচিব শেখ মুজিবের বিচার প্রশ্নে পাক সামরিক সরকারের উদ্যোগে হস্তক্ষেপ করেন। তিনি স্পষ্টভাবে উদ্বেগের সাথে উল্লেখ করেন যে, শেখ মুজিবের বিচারের বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর বিষয়।
তিনি বিষয়টিকে শুধু পাকিস্তানের বিচার ব্যবস্থার এখতিয়ারাধীন বিষয় হিসেবে না ভেবে বরং এর রাজনৈতিক গুরুত্ব সহ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে একে একটি ব্যতিক্রমী বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। International Commission of Jurist আগস্ট মাসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নিকট প্রেরিত এক টেলিগ্রামে গোপন বিচারের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
২৭ আগস্ট মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি মওদুদ আহমদের নিকট এক পত্রে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবের অফিস-এর ডিরেক্টর ব্রায়ান জানান যে, জাতিসংঘ মহাসচিব তাঁর এখতিয়ারের মধ্যে শেখ মুজিবের নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করছেন এবং পরিস্থিতির যাতে অবনতি না ঘটে সে চেষ্টা করছেন। শেখ মুজিবের ‘প্রহসনমূলক’ বিচার বন্ধে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার মুখে শেখ মুজিবের প্রাণ রক্ষা পায়।
তবে উল্লেখ্য যে, এতদিন যাবৎ জাতিসংঘ মহাসচিবের ভূমিকায় পাকিস্তান সন্তুষ্ট থাকলেও সমকালীন বিশ্বের যশস্বী নেতা শেখ মুজিবের বিচার প্রশ্নে উ-থান্টের সাবধানবাণী তাদেরকে ‘ক্ষিপ্ত করে তোলে। তাই ১৫ আগস্ট পাকিস্তান সরকার জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতকে মহাসচিবের এই বিবৃতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানানোর নির্দেশ দেন।
তদুপরি একথা বলা যায় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাণপুরুষ শেখ মুজিবের বিচার প্রশ্নে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্বেগপূর্ণ বিবৃতি অত্যন্ত সময়োপযোগী হয়েছিল।
বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদান প্রশ্ন ও জাতিসংঘ
মুক্তিযুদ্ধকালীন নয় মাস মুজিবনগর সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত ও রাষ্ট্রসমূহের স্বীকৃতি আদায়। এ জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাজধানী হতে শুরু করে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ ভবনে পর্যন্ত মুজিবনগর সরকার তৎপর থাকে। আন্তর্জাতিক সমাজে যখন একটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে তখনই প্রশ্ন ওঠে স্বীকৃতির।
তবে স্বীকৃতি কেবল একটি আইনগত বিষয় নয় বরং এর সাথে রাজনৈতিক প্রশ্ন প্রবলভাবে জড়িয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক আইনের অধিকাংশ সমকালীন লেখক মনে করেন যে, চূড়ান্ত স্বীকৃতি তখনই দেয়া যায় যখন কোন রাষ্ট্র, রাষ্ট্র গঠনের সকল শর্ত পূরণ করে অর্থাৎ ভূ-খন্ড, জনবল, সরকার ও সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি থাকলে একটি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়া যায় ।
মুজিবনগর সরকার সব সময়ই হিলি, রৌমারী সহ কিছু কিছু এলাকা শাসন করে এবং বড় শহর ও ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া যুদ্ধরত বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ ভূমি মুজিবনগর সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এ সরকারের ছিল একটি নিজস্ব সেনাবাহিনী, ছিল বিদেশে কূটনৈতিক মিশন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নামে একটি প্রচার যন্ত্র এবং একটি রাষ্ট্রীয় কোষাগার যেখান থেকে কর্মচারীদের বেতন দেয়া হতো।
এছাড়াও মুজিবনগর সরকার ছিল একটি সর্বদলীয় সরকার। সুতরাং এ সরকার ছিল একটি কার্যকরী সরকার। কিন্তু তা সত্ত্বেও জাতিসংঘ মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকার ও রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চার বছর পর ১৯৭৪ সালে আরব লীগ সর্বপ্রথম ফিলিস্তিন জনগণের ন্যায়সঙ্গত প্রতিনিধি হিসেবে পিএলও (Palestine Liberation Organisation)-কে স্বীকৃতি দেয় এবং পরবর্তীকালে জাতিসংঘও পিএলও-কে স্বীকৃতি দেয়।
১৯৭৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ SWAPO-কে (South West African Peoples Organisation) নামিবিয়ার জনগণের একমাত্র ও বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।এ ধরনের স্বীকৃতি প্রাপ্ত দেশগুলো জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে পর্যবেক্ষক বা অংশগ্রহণকারীর মর্যাদা লাভ করে।
SWAPO, PLO ও মুজিবনগর সরকারের প্রকৃতি এক হলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ‘জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের নিয়ম প্রবর্তিত না হওয়ায় জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে ৪ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক শুরু হলে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি আবু সাঈদ চৌধুরীর বক্তব্য সম্বলিত একটি পত্র নিরাপত্তা পরিষদ অফিসিয়াল ডকুমেন্ট হিসেবে গ্রহণ ও বিলি করে যা ছিল বাংলাদেশকে পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দান।
এছাড়া ২১ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে যে প্রস্তাব পাশ হয় সেখানে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে জেনেভা কনভেনশন মেনে চলার আহবান জানানো হয়। অর্থাৎ নিরাপত্তা পরিষদ প্রথমবারের মত বাংলাদেশকে একটি পক্ষ হিসেব স্বীকৃতি দেয়।
সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সত্যিকার অর্থে একটি জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার দাবিতে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিদ্যমান পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে পৃথক হওয়ার বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও আইনসঙ্গত। সমগ্র পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৫৬ ভাগ নাগরিক এই স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিল।
কিন্তু তা সত্ত্বেও এ সংগ্রাম ও স্বাধীনতার দাবিকে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি গণহত্যা ও মানবাধিকার প্রশ্নে জাতিসংঘ ছিল দৃশ্যত নীরব। তবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রশ্নে অত্যন্ত সজাগ হয়ে ওঠে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী সমর্থিত প্রবাসী সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ার রেওয়াজ চালু করে।
SWAPO ও PLO-কে যথাক্রমে নামিবিয়া ও ফিলিস্তিন জনগণের ন্যায়সঙ্গত প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান পরবর্তীকালে জাতিসংঘের সজাগ দৃষ্টিভঙ্গীরই প্রমাণ।
তবে গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকে জাতিসংঘ মহাসচিব তাঁর মার্কিন নির্ভরতার জন্য নিন্দা করতে না পারলেও ভারতে আশ্রয় নেয়া বাঙালি শরণার্থীদের তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের ইতিবাচক ভূমিকা সব সময়ই পরিলক্ষিত হয়। শরণার্থী প্রশ্নে জাতিসংঘ তার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল।
তবে শরণার্থীদের স্থায়ী সমাধানের জন্য যে রাজনৈতিক প্রশ্ন জড়িত ছিল তা সমাধানে জাতিসংঘ কখনোই তৎপর হয়নি। তবে ডিসেম্বরে যখন যুদ্ধ বন্ধ ও বিশ্বশান্তি প্রশ্নে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক শুরু হয়। তখন বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতাকে বৈঠকে যোগদান করতে না দিলেও তাঁর বক্তব্য সম্বলিত পত্রকে অফিসিয়াল ডকুমেন্ট হিসেবে নিরাপত্তা পরিষদ গ্রহণ ও বিলি করে।
এটা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে এক ধরনের পরোক্ষ স্বীকৃতি। তবে এক্ষেত্রে একটি বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, জাতিসংঘ হচ্ছে এমন একটি বিশ্ব সংস্থা যেখানে প্রধানত বৃহৎ শক্তিবর্গের সম্মতিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত ও বাস্তবায়িত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বৃহৎ শক্তিবর্গের মধ্যে মতবিরোধ থাকায় জাতিসংঘ ত্রাণকার্য পরিচালনা ব্যতীত অন্য কোন দায়িত্ব পালনে পুরোপুরিই ব্যর্থ হয়েছিল।
এমনকি জাতিসংঘ সনদের ৯৯ ধারা অনুযায়ী জাতিসংঘ মহাসচিব তাঁর নিজ ক্ষমতাবলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যা কিছু করতে পারতেন, একমাত্র শেখ মুজিবের বিচার প্রশ্নে ভূমিকা রাখা ব্যতীত অন্য কোন উদ্যোগই তিনি নিতে পারেন নি তিনি নিজের দুর্বলতা ও নিস্ক্রিয়তার জন্য।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। আশফাক হোসেন, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও জাতিসংঘ।
২। মঈদুল হাসান, মূলধারা ‘৭১ ।
৩। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, ত্রয়োদশ খন্ড।
৪। আবু সাঈদ চৌধুরী, প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :
১। ভারতে আশ্রিত শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রমের বিবরণ দিন।
২। পূর্ব পাকিস্তানে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে জাতিসংঘ কি কি সমস্যার সম্মুখীন হয়?
৩। জাতিসংঘ মহাসচিবের Good Office ব্যবহারের প্রস্তাব আলোচনা করুন ।
৪। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকৃতির প্রশ্নে জাতিসংঘের ভূমিকা কি ছিল?
৫। মুজিবনগর সরকার ও জাতিসংঘের মধ্যে যোগাযোগের বিবরণ দিন।
রচনামূলক প্রশ্ন :
১। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের ভূমিকা সংক্ষেপে আলোচনা করুন ।
২। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাক-ভারতে জাতিসংঘ পরিচালিত ত্রাণ কার্যক্রমের বিবরণ দিন।
৩। যুদ্ধ বন্ধ ও রাজনৈতিক সমাধান প্রশ্নে জাতিসংঘের ভূমিকা মূল্যায়ন করুন ।
