যুদ্ধকালীন পরিদর্শন

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ যুদ্ধকালীন পরিদর্শন। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।

যুদ্ধকালীন পরিদর্শন

 

যুদ্ধকালীন পরিদর্শন

 

যুদ্ধকালীন পরিদর্শন

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমি সবচেয়ে নাজুক এলাকাগুলো সফর করি। সেগুলো হচ্ছেঃ

২৫শে নভেম্বর আমি যশোরে ডিভিশন ও ব্রিগেড কমান্ডারদের সাথে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করি এবং নির্দেশ দিই যে, যে কোনো মূল্যে সকল ঘাঁটি রক্ষা করতে হবে এবং অনুমতি ছাড়া অথবা ৭৫ শতাংশ হতাহত হওয়ার আগে সৈন্য প্রত্যাহার করা যাবে না।

সদর দপ্তরে ফেরার পর আমি আমার চিফ অব স্টাফকে এ ব্যাপারে একটি লিখিত সংকেত পাঠানোর নির্দেশ দিই। নভেম্বরের শেষদিকে দর্শনা থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দানের জন্য আমাকে অনুরোধ করা হয়। কয়েকটি ট্যাংক নিয়ে মুক্তিবাহিনীর একটি প্লাটুন এ অবস্থান পেছনে ফেলে এগিয়ে গেলে আমাকে এ অনুরোধ জানানো হয়।

আমি ৯ম ডিভিশনের জিওসি ও ৫৭ ব্রিগেডের কমান্ডারকে যতোক্ষণ সম্ভব ততক্ষণ দর্শনা ধরে রাখার এবং পরে পরবর্তী প্রতিরক্ষা দুর্গে পিছু হটার নির্দেশ দিই, কিন্তু ২ ডিসেম্বর দর্শনার পতন ঘটে।২৬ শে নভেম্বর আমি ১৬তম ডিভিশনের জিওসি’র সাথে যুদ্ধের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করার জন্য নাটোর পরিদর্শন করি।

পঞ্চগড়ে ২৩তম ব্রিগেড যেভাবে লড়াই করছিল আমি তাতে সন্তুষ্ট হতে পারি নি। এ জন্য জিওসি ব্রিগেড কমান্ডারকে কমান্ড থেকে অব্যাহতি দেন। আমি হিলিতে ২০৫তম ব্রিগেডের অপারেশনে পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিলাম।

হিলির দক্ষিণে ১০৭তম ব্রিগেড মোতায়েন সম্পূর্ণ করায় সন্তুষ্ট হই আমি। সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের আশেপাশে মোতায়েন ১৪তম ডিভিশনে আমার সফরের ফলে তাদের অবস্থানে কিছুটা সমন্বয় করা হয়। এসব অবস্থান যেভাবে লড়াই করছিল আমি তাতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হই।

সি-ইন-সি হিসেবে প্রেসিডেন্টকে আমাদের লড়াইয়ের প্রশংসা করতে হয়। ১৯৭১ সালের ২৯ শে নভেম্বর তিনি এক বার্তায় বলেন : সি-ইন-সি’র পক্ষ থেকে কমান্ডারের জন্য : পূর্ব পাকিস্তানে শত্রুর সর্বশেষ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আপনার কমান্ডের সকল সৈন্য ও আপনার বীরত্বপূর্ণ তৎপরতায় আমি অত্যন্ত মুগ্ধ।

 

সমগ্র জাতি আপনার জন্য গর্বিত এবং আপনার প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। শত্রুর অশুভ অভিপ্রায় নস্যাতে আমাদের সৈন্যদের সাহসী ভূমিকা সকল দেশবাসীর প্রশংসা অর্জন করেছে। শত্রুর মনোবল চূর্ণ এবং আমাদের পবিত্র ভূমি থেকে তাদের পুরোপুরি নির্মূল না করা পর্যন্ত আপনাদের মহৎ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখুন। আল্লাহ আপনাদের সাথে আছেন।

৩০শে নভেম্বর ১৯৭১ আমি জবাব দিলাম “সি-ইন-সি’র প্রতি ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডারের পক্ষ থেকে : আমাদের জাতীয় জীবনের এ ক্রান্তিকালে আপনাকে পুনরায় আশ্বাস দিচ্ছি এবং নতুন করে শপথ দিচ্ছি- আমাদের ওপর ন্যস্ত অগাধ বিশ্বাসকে আমরা ইনশাআল্লাহ পুরোপুরি সম্মান করবো এবং আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষায় কোনো ত্যাগই আমাদের কাছে বড়ো বলে বিবেচিত হবে না।

সর্বশক্তিমান আল্লাহর রহমতে আমরা ভারতের প্রাথমিক হামলা নস্যাৎ করে দিয়েছি। আল্লাহ চান তো, আমরা ইসলামের সর্বোচ্চ ত্যাগের আদর্শে অবিশ্বাসীদের অসৎ উদ্দেশ্য চূড়ান্তভাবে নস্যাৎ করে দিতে যুদ্ধকে ভারতের মাটিতে নিয়ে যাবো। দোআ করুন এবং বিশ্বাস করুন যে, চূড়ান্ত পর্যায়ে আমরাই বিজয়ী হবো, ইনশা-আল্লাহ।”

২১শে নভেম্বর থেকে ২রা ডিসেম্বর পর্যন্ত আমরা ভারতীয়দের সীমান্তে ঠেকিয়ে রাখি এবং পূর্ব পাকিস্তান ও ভারতে কমান্ডো এবং গেরিলা তৎপরতা চালাই। কিন্তু ৩রা ডিসেম্বর এ পরিস্থিতি দ্রুত ভিন্ন দিকে মোড় দেয় নেয়। সেদিন আমাদের প্রেসিডেন্ট আমাদেরকে অবহিত না করে পশ্চিম রণাঙ্গনে বিলম্বিত, উদ্দেশ্যবিহীন এবং অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ শুরু করেন।

পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ শুরু করতে যথেষ্ট বিলম্ব করা হয়। বিলম্বে যুদ্ধ শুরু করায় সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রকাশ্যে ভারতের পক্ষে যুদ্ধে নামার সুযোগ পেয়ে যায়। এর ফলাফল হয়ে দাঁড়ায় মারাত্মক। আমি খুব সততার সাথে বিশ্বাস করি যে, ভারতীয়রা তাদের পাকিস্তানি অনুচরদের মাধ্যমে জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে এ ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিভ্রান্ত করেছিলেন।

আমরা ভারতীয়দেরকে সীমান্তে থামিয়ে দিতে সফল হই। আমাদের ঘাঁটি ও দুর্গে অবস্থানরত কোম্পানি, ব্যাটালিয়ন ও ব্রিগেডগুলোকে আমরা পুনর্গঠিত করি এবং ভারতীয় ভূখণ্ডে গোলাবর্ষণ করতে থাকি। এ ছাড়া আমরা ভূখণ্ডের ভেতরেও লড়াই চালাতে থাকি। আমাদের চলাচলের যথেষ্ট সুযোগ ছিল এবং আমরা আমাদের পছন্দসই টার্গেটে হামলা এবং আমাদের নিজেদের ভূখণ্ডে সড়ক অবরোধে সক্ষম ছিলাম।

 

যুদ্ধকালীন পরিদর্শন

 

আমরা ভারতীয়দের জন্য বিস্তর ঝামেলা সৃষ্টি করছিলাম। ইয়াহিয়া খান পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ শুরু না করলে ভারতীয়দের জন্য এ ঝামেলা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতো। আমাদেরকে সাহায্য করার প্রয়োজনে এ হামলা করা হয়ে থাকলে তা করা উচিত ছিল ২১, ২২ অথবা বড়ো জোর ২৩ নবেম্বর। তবে এ হামলা এমন এক সময় করা হয় যখন তা ভারতীয়দের জন্য সহায়ক বলে প্রমাণিত, হয়।

Leave a Comment