আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ যুদ্ধের তারিখ। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
যুদ্ধের তারিখ

যুদ্ধের তারিখ
পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের খোলাখুলি যুদ্ধ নিয়ে আমার আলোচনা করার আগে কখন সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল সে ব্যাপারে একটি ভুল ধারণা সংশোধন করা প্রয়োজন।
১৯৭১ সালের মার্চ থেকেই আমাদের ভূখণ্ডে ভারতের চোরাগুপ্তা হামলা এবং গেরিলা তৎপরতা শুরু হয়। এতে উভয়পক্ষে জানমালের প্রচুর ক্ষতি সাধিত হয়। উভয়পক্ষ বরাবরই আর্টিলারি ব্যবহার করছিল এবং ১৯৭১ সালের নভেম্বরের গোড়ার দিকে ট্যাংক ও জঙ্গীবিমান অংশগ্রহণ করে।
এখানে একমাত্র পার্থক্য হচ্ছে যে, আমরা তখন এসব অস্ত্র ব্যবহার করছিলাম আমাদের ভূখণ্ডে আমাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা কৌশল অনুযায়ী এবং ভারতীয় হামলাকারীদের উচ্ছেদ অথবা আমাদের এলাকায় তাদের অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে।
অন্যদিকে, ভারতীয়রা এসব অস্ত্র ব্যবহার করছিল তাদের নিজেদের এবং আমাদের উভয় ভূখণ্ড থেকে। আগস্টের শেষ থেকে নভেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত ভারতীয়রা পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি সেক্টরে প্রায়ই কয়েক ব্যাটেলিয়ন অথবা ব্রিগেড আকারের শক্তি নিয়ে হামলা করতো।
১৯৭১ সালের ২০/২১ নভেম্বরের রাতে ভারতীয় সেনাবাহিনী সব দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তানে হামলা করে। এ হামলায় ভারতীয় ট্যাংক ও আর্টিলারি অংশগ্রহণ করে। তবে ভারতের অধিকাংশ হামলাই প্রতিহত করা হয়। ভারতীয়রা তাদের হামলাকে একটি লাইটনিং ক্যাম্পেইন, হিসেবে প্রমাণ করার স্বার্থে তাকে ‘সীমিত যুদ্ধ’ অথবা ‘সীমান্ত ‘সংঘর্ষ’ হিসেবে প্রচার করতে থাকে।
পূর্ব পাকিস্তানে আমাদের ভূখণ্ডে ভারতীয় হামলা অথবা বিদ্রোহ সম্পর্কে পশ্চিম পাকিস্তানে খুব একটা লেখালেখি হয় নি। একইভাবে জনগণকে এ কথা জানানো হয় নি যে, ১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর থেকে পূর্ব পাকিস্তানে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়েছে।
কিছু লেখক ৩রা ডিসেম্বরের সাথে যুদ্ধের তারিখ গুলিয়ে ফেলছেন। পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে সত্যিকারভাবে কী ঘটেছিল সে ব্যাপারে জনগণকে জানানোর তাগিদ বোধ করে নি ১৯৭১ সালে ৩রা ডিসেম্বর পশ্চিম রণাঙ্গনে ভারতের বিরুদ্ধে আমাদের সর্বাত্মক ও ঘোষিত যুদ্ধ শুরু হলে পূর্ব রণাঙ্গনে আমাদের ৪ হাজার সৈন্য নিহত এবং প্রায় সমপরিমাণ সৈন্য আহত হয়।
মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আমরা পশ্চিম পাকিস্তানে ১ হাজার ৯০০ আহত সৈনাকে পাঠিয়েছিলাম। ৩রা ডিসেম্বরের আগে আমরা ভারতীয় সৈন্যদের সাথে লড়াইয়ে ১২টি ট্যাংক ও তিনটি জঙ্গী বিমান হারাই। দুটি ‘হিলাল-ই-জুরাত’, ১০টি ‘সিতারা-ই-জুরাত’, ১২টি ‘তামগা-ই-জুরাত’ এবং আরো কিছু পদক প্রদানের জন্য সুপারিশ করা হয় এবং পদকগুলো দেওয়াও হয়।
এসব বীরত্বসূচক পদক প্রাপ্তির জন্য অবশ্যই কোথাও না কোথাও যুদ্ধ করতে হয়েছে। এসব পদক ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বরের আগে দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত বীরত্বপূর্ণ পদকের জন্য আরেকটি তালিকা জমা দেওয়া হয়।
কিন্তু জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স এসব বীরত্বপূর্ণ পদক প্রদান করে নি। আমরা যুদ্ধ ক্যাম্পের ভারতীয় জেল থেকে ফেরার পর এসে দেখতে পাই যে, এ তালিকাটি উধাও হয়ে গেছে। আর তাই ধন্যবাদ গুল হাসানকে।
প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন যে, পাকিস্তানের যে-কোনো অংশের ওপর হামলার প্রতিশোধ নেওয়া হবে। কিন্তু ভারতীয়দের স্বার্থে এবং ভুট্টোর পরামর্শে ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে হামলা চালানো সত্ত্বেও তিনি তৎক্ষণাৎ প্রতিশোধ নেন নি। তার বদলে তিনি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের জন্য আমি কী করতে পারি? আমি শুধু পারি প্রার্থনা করতে।
এবং এ পর্যন্ত তিনি করেছিলেন। আমাদের সার্বিক পরিকল্পনা অনুযায়ী জেনারেল ইয়াহিয়া খান তৎক্ষণাৎ প্রতিশোধ নিলে অথবা তৎক্ষণাৎ নিরাপত্তা পরিষদকে ভারতীয় আগ্রাসন সম্পর্কে অবহিত করলে ভারতীয়রা ২১শে নভেম্বর সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার তারিখকে ৩রা ডিসেম্বর হিসেবে উল্লেখ করে বিভ্রান্ত করার অবস্থানে থাকতে পারতো না। এবং এটাকে দুই সপ্তাহের একটি ক্যাম্পেইন হিসেবেও আখ্যায়িত করার সুযোগ পেতো না।
“১৯৭১ সালের নভেম্বরের প্রথম তিন সপ্তাহে ভারতীয় সামরিক তৎপরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভারতীয় ইউনিটগুলো পূর্ব পাকিস্তানে তাদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে তৎক্ষণাৎ ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরে যেত।
২১শে নভেম্বর রাতের পর এ কৌশলে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। তাহলো, ভারতীয় সৈনারা আর ফিরে যায় নি। ২১শে নভেম্বর থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কয়েকটি ডিভিশন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হয়ে সাঁজোয়া ও বিমান।
বাহিনীর সমর্থন নিয়ে সকল দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তানের সকল গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চলে একযোগে সামরিক হামলা শুরু করে।(আর সিমন এবং এল ই রোজ : ওয়ার অ্যান্ড সিলেশন : পাকিস্তান, ইন্ডিয়া অ্যান্ড দা ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচি, ১৯৯২, পৃষ্ঠা- ২১৩)
ভারতের কৌশল সম্পর্কে ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তাগণ তাদের বই-পুস্তকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এসব সামরিক কর্মকর্তা ১৯৭১ সালে বিভিন্ন কমান্ডিং পদে ছিলেন। তারা স্বীকার করেছেন যে, ২১শে নভেম্বর তাদের ইউনিটগুলো মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে।
তাদের একজন বলেন, ‘ভারত ২২শে নভেম্বরকে হামলার ‘ডি-ডো হিসাবে নির্ধারণ করেছিল। ঈদের জন্য তারা তারিখ একদিন এগিয়ে ২১শে নভেম্বর নিয়ে আসে। ভেবেছিল যে, পাকিস্তানি সেনারা ঈদের আনন্দে ব্যস্ত থাকবে এবং এভাবে অসতর্ক হয়ে পড়বে।(মেজর জেনারেল লক্ষণ সিং, ইন্ডিয়ান সোর্ড স্ট্রাইকস ইন ইস্ট পাকিস্তান, বিকাশ, নিউ দিল্লি)।
তাছাড়া আমার চিফ অব স্টাফ জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে সিজিএস তাকে জানান যে, ঈদের দিনে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে হামলা চালাবে। এ কথা জানিয়ে তিনি তাকে ঢাকা ছুটে যেতে বলেন।
একটি প্রতিবেশী দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং সীমান্তের প্রতি কোনো রূপ শ্রদ্ধা প্রদর্শন ছাড়া ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর সীমান্ত অতিক্রম করে এবং সব দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তানে হামলা চালায়। পদাতিক বাহিনী এবং ট্যাংক প্রবেশ করার আগ মুহূর্তে পেছনে মোতায়েন গোলন্দাজ বাহিনী সীমান্ত বরাবর মূল টার্গেটগুলোতে প্রায় ৪ ঘণ্টা একটানা গোলাবর্ষণ করে।
ভারতীয়রা বিরাট আড়ম্বর শক্তি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করে। এ সময় ট্যাংক, মর্টার ও ভারী কামান থেকে মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ করা। হচ্ছিল। মেশিন গান থেকে ঠা-ঠা করে অফুরন্ত গুলি ফুটছিল, ঝাকে ঝাকে জঙ্গীবিমান চক্কর দিচ্ছিল এবং ছোটো-বড়ো সব ধরনের অস্ত্র একসাথে গর্জন করছিল ।
পক্ষান্তরে, পদাতিক সৈন্য ছাড়া আমাদের আর কোনো সহায় ছিল না। আমাদের পদাতিক বাহিনীর অস্ত্রগুলোর ওপর কয়েক ঘণ্টা ধরে বোমাবর্ষণ করা হয়। যে কয়েকটি ফিল্ড আর্টিলারি ছিল সেগুলোও নিস্তার পাচ্ছিল না। তবে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল সুরক্ষিত এবং দুর্ভেদ্য।
আমাদের সৈন্য ও অফিসাররা ছিলেন যুদ্ধে অভিজ্ঞ। ট্যাংকের ঘড়-গড় শব্দ, হাজার হাজার যান-বাহনের চিৎকার, জঙ্গীবিমানের কানফাটা আওয়াজ এবং অগণিত অস্ত্র থেকে গোলাগুলিতে রণাঙ্গন কেঁপে ওঠে। ভারতীয় পদাতিক বাহিনী প্রবেশ করার আগে আমাদের সৈন্যদের ভীত-সন্ত্রস্ত এবং তাক লাগিয়ে দেওয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য।
তবে ভারতীয়দের এ শক্তি প্রদর্শন আমাদের প্রতিরক্ষা দুর্গ ভাঙতে অথবা আমাদের সৈন্যদের মনোবলে চিড় ধরাতে বার্থ হয়। দক্ষ নেতৃত্ব না থাকায় এ তথাকথিত ‘ব্লিৎসক্রিগ’ ও ‘পরিকল্পিত ছত্রছায়া’ দারুণভাবে ব্যর্থ হয়। ভারতীয় বাহিনীতে আমাদের মতো দক্ষ জেনারেল ছিল না। তাই তাদের ‘রিসক্রিপ’ আমাদের স্ক্রিন পজিশনের কাছাকাছি আসা মাত্রই সীমান্তে মুখ থুবড়ে পড়ে।

তাদের অসংখ্য বহরের গতিরোধ করা হয় এবং একটি বহর থেকে আরেকটি বহরকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয় এবং ঢাকা থেকে বহু দূরে এদের আটকে ফেলা হয়। ভারত পূর্ব পাকিস্তানের যুদ্ধের স্থায়িত্ব এবং প্রকাশ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার তারিখ সম্পর্কে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। যুদ্ধের মোট স্থায়িত্বকাল হচ্ছে ৯ মাস। এর মধ্যে ৮ মাস হচ্ছে বিদ্রোহ ও সীমান্ত সংঘর্ষ এবং বাকি ২৬ দিন হচ্ছে সর্বাত্মক যুদ্ধ, দুই সপ্তাহ নয়, প্রায় চার সপ্তাহ।
