যুদ্ধের প্রস্তুতি

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ যুদ্ধের প্রস্তুতি। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।

যুদ্ধের প্রস্তুতি

 

যুদ্ধের প্রস্তুতি

 

যুদ্ধের প্রস্তুতি

সৈন্যদের লড়াই, শত্রুদের অগ্রাভিযান বিলম্বিতকরণ, শত্রুদের সর্বোচ্চ ক্ষতিসাধন এবং পূর্ব নির্ধারিত ঘাঁটি ও দুর্গে পিছু হটে আসার লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ পরিকল্পনা কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাংকারগুলো না ছিল কংক্রিটের তৈরি, না ছিল এদের চারদিকে মাইন পোঁতা। শুধু তাই নয়, এগুলো রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত আর্টিলারি ফায়ারের ব্যবস্থাও ছিল না।

কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে এ ধরনের সমস্যা ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানে এ নাজুক পরিস্থিতির জন্য যেসব কারণ দায়ী সেগুলো হচ্ছে :

১. গভর্নরের কার্য নির্বাহ ছাড়া প্রতিরক্ষা খাতে কোনো টাকা বরাদ্দ করা হয়। নি। গভর্নরের জন্য যে ফান্ড দেওয়া হতো তাও ছিল খুব সামান্য। 4 তহবিল সরবরাহও পরবর্তীতে মার্কিন আপত্তিতে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

২. মুক্তিবাহিনীর অনুপ্রবেশ রোধে ইতোমধ্যেই জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে অধিকাংশ মাইন ফুরিয়ে যায়। যা অবশিষ্ট ছিল তার পরিমাণও ছিল খুবই সামান্য। এসব মাইন শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে খুব একটা কাজে আসে নি। পশ্চিম পাকিস্তানের শত্রুর অগ্রাভিযান রোধে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা রয়েছে । কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের সে রকম প্রতিবন্ধকতা না থাকায় শত্রু ধেয়ে আসতে থাকে।

৩. শত্রুর হামলা ধ্বংস করতে আর্টিলারি অপরিহার্য। পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিটি প্রতিরক্ষা অবস্থানে যেখানে কয়েক ডজন আর্টিলারি ছিল সেখানে আমাদের ছিল গড়ে মাত্র কয়েকটি।

৪. অস্ত্রশস্ত্রের অবস্থাও ছিল একই রকম। আমাদেরকে পুরান এম-২৪ মডেলের হালকা ট্যাংক দেওয়া হয়। এগুলো চালানো ছিল খুবই কঠিন। ফ্যান বেল্টের পরিবর্তে দড়ি ব্যবহার করতে হতো। একটি ট্যাংক দিয়ে টেনে আরেকটি ট্যাংক স্টার্ট করতে হতো। আমরা জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সকে এ সমস্যার কথা অবহিত করেছিলাম।

৫. হাত দিয়ে কেউ শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে পারে না। আমাদের ট্যাংক- বিধ্বংসী কামানের ঘাটতি ছিল ৫০ শতাংশ। শত্রু বহরকে ঠেকিয়ে রাখার (অথবা ধ্বংস করার জন্য আমাদের মাঝারি অথবা ভারি কামান ছিল না। আবার কয়েকটি মর্টার ও ট্যাংক-বিধ্বংসী কামানে নিশানা ঠিক করার যন্ত্রও ছিল না।

৬. কোনো পর্যাপ্ত বিমান সহায়তা ছিল না।

৭. সর্বোপরি, জনগণ ছিল বিরোধী।

৮. একটি যুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধের ফলাফল নির্ভর করে পর্যাপ্ত গোয়েন্দাগিরির ওপর। ভারতীয় সেনাবাহিনী স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে আমাদের সব অবস্থান এমনটি শেষ ব্যাংকারটি পর্যন্ত চিনে ফেলতো। তাদের জুনিয়র অফিসারদেরকে আমাদের প্রতিরক্ষা অবস্থান চিনিয়ে দেওয়া হতো।

গোয়েন্দা তথ্যের জন্য ভারতীয়দের বেগ পেতে হয় নি। স্থানীয়রা সহায়তা না দিলে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে ভারতীয়দের প্রচুর সময় ও রক্ত দিতে হতো। কিন্তু তাদের কোনো মূল্য দিতে হয় নি। তাদেরকে আমাদের অবস্থান পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হতো।

৯. সৈন্যদেরকে স্বস্তি ও বিশ্রাম ছাড়া অবিরাম ৮ মাস লড়াই করতে হয়েছে। সব কিছুতেই তাদের ঘাটতি ছিল। এ জন্য তাদেরকে কৃচ্ছ সাধন করতে হয়েছে।

১৯৭১ সালের আগস্টে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে একদল সিনিয়র আর্মি চিকিৎসক আসেন। তারা সব কিছু ঘুরে দেখেন এবং অফিসার ও জওয়ানদের সাথেও সাক্ষাৎ করেন। সফর শেষে তারা একটি রিপোর্ট পেশ করেন। এ রিপোর্টে বলা হয় যে, সৈন্যরা যুদ্ধের চূড়ান্ত ক্লান্তিকর অবস্থায় পৌঁছেছে এবং তারা যুদ্ধের জন্য এখন আর উপযুক্ত নয়। এসব সৈন্য প্রত্যাহার এবং তাদেরকে ছুটিতে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়।

সৈন্যদেরকে প্রত্যাহার অথবা ছুটিতে যেতে না দেওয়ায় তাদেরকে রণাঙ্গনে। থেকে যেতে হয় এবং যুদ্ধ করতে হয়। আমি তাদের মনোবল ও দক্ষতা বৃদ্ধি করার জন্য তাদেরকে জিহাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে একটি অভিযান শুরু করি।

ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আমরা আমাদের মিশনে সফল হই এবং ১৯৭১ সালের নভেম্বর নাগাদ সৈন্যরা জেহাদের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে এবং আমরণ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়। তখন একমাত্র মন্ত্র ছিল- “হয় বাঁচো না হয় মরো।

গোলাগুলির মাঝে যারা সময় ব্যয় করেছেন অন্তত কয়েক মাস কাটিয়েছেন কেবল তারাই বুঝতে পারবেন যুদ্ধে অবসন্নতা বলতে কী বুঝায়। এতে মনোবল ভেঙে যায়। জন কেরি তার “দ্য ফেস অব ব্যাটল’ নামক বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ইতিহাসে বহু খ্যাতনামা জেনারেল যুদ্ধের দখল ও চাপ সইতে না পেরে রণাঙ্গন ত্যাগ করেছেন।

ওয়াটার লু’তে যুদ্ধের পর ওয়েলিংটন। প্রচুর কান্নাকাটি করেছিলেন। ফ্রেডারিক দ্য গ্রেট যুদ্ধকালে উদ্বেগ থেকে মুক্তি পেতে শৈল্য চিকিৎসককে তার শরীর কেটে রক্ত বের করতে দিতেন; রোমেল। পেটের পীড়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এ জন্য সংকটকাল দু বার তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে ফেরত আসতে হয়েছিল।

 

গুদেরিয়ান রাশিয়ার বাইরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বিদায় নেন। মারাত্মকভাবে স্মরণশক্তি লোপ পাওয়ায় ১৯৪৫ সালে রিজওয়েকে পদত্যাগ করার পরামর্শ দেওয়া হয় । আমার ঘাটতি, প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও হাই কমান্ড আমার প্রতি বিমাতাসূলভ আচরণ করে। এতে তখন এটাই মনে হচ্ছিল যে, আমাকে ‘কুরবানির খাসি’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং আমার সৈন্যদেরকে দেখা হচ্ছে ব্যয়যোগ্য পণ্য হিসেব।

একটি বিরাট শক্তিশালী শত্রুর প্রচণ্ড চাপ সত্ত্বেও আমি শেষদিন পর্যন্ত লড়াইয়ের জন্য উপযুক্ত ছিলাম এবং যুদ্ধ ক্ষেত্রে এগিয়ে। যেতে সক্ষম ছিলাম। একইভাবে আমার কোনো অফিসার ও জওয়ানও যুদ্ধের প্রচণ্ড চাপ ও ধাক্কায় ভেঙে পড়ে নি। উপরন্তু, তারা বাঘের মতো লড়াই করেছে যা খুবই প্রশংসাযোগ্য।

পূর্ব রণাঙ্গনে আমরা যেসব সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছি পশ্চিম রণাঙ্গনে অনুরূপ সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা ছিল না। আমাদের মতো পরিস্থিতিতে কখনো কোনো বাহিনীকে পড়তে হয় নি। এটা মাথায় রেখে পূর্ব পাকিস্তানে আমার সৈন্যদের দক্ষতার সাথে পশ্চিম পাকিস্তানে আমাদের সৈন্যদের দক্ষতা তুলনা করতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় একটি বৈরি জনগণের মধ্যেও পূর্ব পাকিস্তানে মোতায়েন সৈন্যরা অত্যন্ত সাহস ও দক্ষতার সাথে লড়াই করেছে।

সর্বাত্মক যুদ্ধে মাত্র ১৪ দিনের লড়াইয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে যে পরিমাণ ভূখণ্ড খোয়া গেছে, সেই তুলনায় ৯ মাসের একটানা বিদ্রোহ এবং ভারতের সাথে ২৬ দিনের লড়াইয়ের পূর্ব রণাঙ্গনে আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ভূখণ্ড খুবই সামান্য।

লড়াইয়ে আমাদের এ সাফল্য সত্ত্বেও আমাদরেকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়। আমরা ভারতে দুই বছর যুদ্ধবন্দি হিসেবে ছিলাম। এ জন্য আমাদেরকে হাজারো প্রশ্ন করা হয়। অন্যদিকে, পশ্চিম রণাঙ্গনে অনুকূল পরিবেশে যুদ্ধ করে যারা সাড়ে ৫ হাজার বর্গমাইলের বেশি ভূখণ্ড হারিয়েছে তাদেরকে পদোন্নতি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দিয়ে পুরষ্কৃত করা হয়।

‘ভৌগোলিক কারণে ডিভিশনাল অপারেশনের ওপর জেনারেল নিয়াজির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাধাগ্রস্ত হয়। একই কারণে ডিভিশনগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহায়তাদানও বাধাগ্রস্ত হয়। এমনকি ব্যাটালিয়নগুলো তাদের কোম্পানিগুলোর কর্মকাণ্ডে সমন্বয় সাধন করতে পারে নি।

প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বিদ্রোহের ফলে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানও ধরে রাখা দৃশ্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে। প্রতিটি জায়গায় শত্রুর সাথে যুদ্ধরত সৈনারা নিজেদেরকে অরক্ষিত দেখতে পায়। তাদের পশ্চাৎভাগ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। সৈনারা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরের সময় বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে।

১৯৭১ সালের নভেম্বর নাগাদ আমাদের অধিকাংশ সৈন্য জীবিত ছিল এবং চরম বৈরি পরিবেশে তারা ৯ মাস যুদ্ধ করেছে। এ ৯ মাস তারা দিন ও রাতে রাস্তা দিয়ে চলাচল করেছে। এ সময় তারা মাইন বিস্ফোরণে মুখোমুখি হয়েছে এবং যখন-তখন আক্রান্ত হয়েছে।

তাদের একমাত্র রক্ষাকবচ ছিল তাদের ত্বরিত পাল্টা হামলা। নভেম্বর পর্যন্ত অধিকাংশ সৈন্য পানিবদ্ধ বাংকারে কাটিয়েছে, তাদের পায়ে পচন ধরছে, তাদের গায়ের চামড়ায় ফোসকা পড়েছে, অজানা আশঙ্কায় তাদের মন ছিল ভারাক্রান্ত ।

(জেনারেল শওকত বিজা, দা পাকিস্তান আর্মি ১৯৬৬-৭১) আমাকে ভারতীয় আগ্রাসন মোকাবেলা করতে হয়েছে এমন একদল সৈনা নিয়ে যারা শুধু ক্লান্ত ও অবসন্নই ছিল না, তাদের পা ফুলে গিয়েছিল, পায়ে বুট ছিল না, বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটও ছিল না।

আমার সৈন্যদেরকে প্রয়োজনীয় বুট ও কাপড় সরবরাহ করা হয় নি। আমরা ছিলাম প্রতিপক্ষের তুলনায় সংখ্যায় খুবই নগণ্য। ট্যাংক ও কামান ছিল আমাদের সামান্য। অন্যদিকে, ভারতীয় সৈন্যরা ছিল তরতাজা, তারা তাদের সুবিধাজনক ঘাঁটি থেকে হামলা চালাতো।

 

যুদ্ধের প্রস্তুতি

 

কখন এবং কোথায় হামলা চালানো হবে সে সিদ্ধান্ত ছিল তাদের হাতে আমাদের করণীয় ছিল শুধু শত্রুর আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করা। ভারতীয়দের শক্তি বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায় বাঙালিদের সহায়তায় যারা যুদ্ধ করছিল তাদের। “স্বাধীনতার যুদ্ধ’। বাঙালিরা সব সময় দৃঢ় মনোবলের অধিকারী ছিল।

Leave a Comment