যুদ্ধ সংবাদদাতার নোটখাতা | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

যুদ্ধ সংবাদদাতার নোটখাতা – কয়েকজন সাংবাদিকের পূর্ব পাকিস্তান ঘুরে আসার একটা ব্যবস্থা করেছে সেনাবাহিনীর জনসংযোগ দপ্তর। এবড়োথেবড়ো রাস্তা দিয়ে যুদ্ধস্থল পর্যন্ত পৌঁছুতে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে। সীমান্ত থেকে তিন মাইল ভেতরে ধূলিময় ছোট্ট গ্রাম উথলিতে এসে আমরা পৌঁছুলাম। যুদ্ধের প্রথম রাতেই ভারত এটা দখল করে নেয়। পাকিস্তানিদের শূন্য বাঙ্কার ও গোলাগুলির পরিত্যক্ত বাক্স ছাড়া দেখার আর কিছু নেই। হঠাৎ প্রায় একশত গজ দূরে দাঁড়ানো ভারতীয় সৈনিক আমাদের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠলো, ‘হ্যান্ডস্ আপ!’

 

যুদ্ধ সংবাদদাতার নোটখাতা | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

 

যুদ্ধ সংবাদদাতার নোটখাতা

আমরা ভেবেছিলাম সে রসিকতা করছে, তবু যাই হোক দু’হাত ওপরে তুলি। সে স্টেনগান উচিয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো। আমি অস্বস্তি বোধ করছিলাম। লোকটাকে মনে হচ্ছিল মাতাল। ফটোগ্রাফারদের কেউ কেউ তার ছবি তুলতে শুরু করলে সে আরো ক্ষেপে যায়। দ্রুত সে আমাদের দিকে এগোতে থাকে।

২৫ গজের মধ্যে এসে স্টেনগানের কক টান দিলে আমাদের সফরপরিচালক মেজর চিৎকার করে ওঠেন, ‘থামো, থামো!’ সৈনিকটি হাঁটু মুড়ে বসে আমাদের দিকে স্টেনগান তাক করে। আমরা চারদিকে ছিটকে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। মেজর চিৎকার করে সৈনিকের দিকে এগিয়ে গিয়ে তার ব্যারেল চেপে নামিয়ে দেয়। সঙ্কট কেটে গেল এবং সৈনিকটিকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এই অ্যাকশনের জন্য তো আমরা আসি নি।

আমরা গেলাম কাছাকাছি আরেকটি মুক্ত শহর দর্শনায়। সেখানকার যুদ্ধ সম্পর্কে আমাদের বললেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ভূপাল সিং এবং দেখালেন যুদ্ধের চিহ্ন-তাঁর পৃষ্ঠদেশে একটি ক্ষত। টেলিভিশন ক্যামেরা চলতে শুরু করলে তিনি পেছন ফিরে শার্ট টেনে তুলে উবু হলেন ছোট প্ল্যাস্টারটুকু দেখাতে। উবু হয়েই রইলেন তিনি যতক্ষণ পর্যন্ত না টেলিভিশন ক্রুরা জানালো তাঁর পিঠের ছবি যথেষ্ট পরিমাণেই তোলা হয়ে গেছে।

জনপরিত্যক্ত রেলস্টেশনের দপ্তরে স্টেশন মাস্টারের খাতায় শেষ যে ট্রেনের এন্ট্রি রয়েছে, তা স্টেশন ছেড়ে গেছে ২৬ মার্চ সকালে, পাকিস্তানি সন্ত্রাস-রাজ শুরুর পরপর। এক পঙ্গু বৃদ্ধ, মোয়াজ্জেম হোসেন মিয়া, খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসে হাজির হলেন প্ল্যাটফর্মে। তিনি জানালেন যে, নয় মাস তিনি শহরের কাছে লুকিয়ে ছিলেন, কেননা পাকিস্তানি সৈন্যরা যখন আসে অন্যদের মতো তিনি দ্রুত ভারতে পালিয়ে যেতে পারেন নি। আরো ব্রিফিং-এর জন্য আমরা কর্নেল সিং-এর হেডকোয়ার্টারে আসি। সাংবাদিকদের প্রশ্নবাণ এবং তাঁদের ইতস্তত নিজেদের মতো ঘুরে বেড়ানোতে তিনি তিতি বিরক্ত।

তাই আমাদের ভয় দেখিয়ে স্থান ত্যাগে প্ররোচিত করার জন্য কাছাকাছি ঘাঁটি গেড়ে বসা সৈন্যদের কয়েক রাউন্ড গোলাগুলি ছুঁড়তে বলেছিলেন। ফায়ারিং শুরু হলে ছবি তোলার জন্য টেলিভিশন ক্রুরা ছুটে গেল অবস্থানের কাছে। আমাদের সফরসঙ্গী অফিসারের উদ্দেশে কর্নেল চেচিয়ে উঠলেন, ‘এইসব লোককে আটকাও। তোমাকে যা বলেছি, ওঁদের ওখানে যেতে দেবে না।’ অফিসারও একইরকম পরিশ্রান্ত। তিনি বললেন, ‘আপনিই ওঁদের যেতে দিলেন এবং এখন আপনিই বলছেন আটকাতে!’ আমাদের চলে আসার সময় সঙ্গী অফিসারটি আপন মনেই বলছিলো, ‘শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চেয়ে কষ্টকর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে লড়াই।’

আমরা চলছি ১৫ মাইল দূরের এক গ্রাম সুয়াদিতে, যেখানে সদ্য সমাপ্ত হয়েছে লড়াই। আমরা যখন গিয়ে পৌঁছুই তখনো ইতস্তত আগুন জ্বলছিলো। পশ্চাদপসরণরত পাকিস্তানিদের তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ভারতীয় গোলাবর্ষণের ফলে মাটির ঘরগুলো সব মুখ থুবড়ে পড়েছে এবং খড়ের চালায় আগুন জ্বলছে। বিষণ্ণ গ্রামবাসীরা পুকুর থেকে জল তুলে নিয়ে আগুনের ওপর ঢালছে। আকুল হয়ে কাঁদছে এক বৃদ্ধ।

কয়েক শ’ গজ দূরে এক মাঠের মধ্যে তাদের বাংকারে মরে পড়ে আছে ২২ জন পাকিস্তানি সৈনিক-তাদের কেউ যেন বিশ্রামরত, অন্যদের দেহ ভয়ঙ্করভাবে দুমড়েমুচড়ে গেছে গোলা বিস্ফোরণে। ঝুরঝুরে মাটিতে ভরে গিয়ে গুহাকৃতি হয়ে উঠেছে একটি বাঙ্কার, কবরসদৃশ বাঙ্কারের ভেতর মাটিচাপা-পড়া দেহের বুটপরা দু’জোড়া পা শুধু বেরিয়ে আছে। রাতে আমরা যখন কলকাতায় ফিরলাম ফিরপো রেস্তোরাঁয় পার্টি হচ্ছে- ‘মিস ক্যালকাটা ১৯৭১-এর সঙ্গে এক সন্ধ্যা’, আগের রাতে এই সুন্দরী নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।

যুদ্ধ কলকাতাকে বিপর্যস্ত করেছে ওপর-ভাসাভাবে। নিষ্প্রদীপ ব্যবস্থা কারো কারো বিরক্তি উদ্রেক করেছে এবং বাসে সাঁটা আছে বিভিন্ন স্লোগান, যেমন গুজবে কান দেবেন না, অহেতুক ভয় পাবেন না, শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হউন। এছাড়া রবিবারের সান্ধ্যভ্রমণকারীর সংখ্যা একই রয়েছে, ঠিক যেমন রয়েছে ভিক্ষুকবাহিনীর সংখ্যা।

 

যুদ্ধ সংবাদদাতার নোটখাতা | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

 

ডিসেম্বর ৮

যাওয়া হলো যশোরে, যেখানে জনগণ স্বাধীনতার গোটা একটা দিন প্রথমবারের মতো উপভোগ করছেন। কলকাতা থেকে জিপে করে ৮০ মাইল পথ অতিক্রমকালে গ্রামবাসীরা উল্লসিত হয়ে এগিয়ে এসেছে আমাদের সঙ্গে হাত মেলাতে। কোথাও কোনো তরুণী চোখে পড়ে না। কেননা তাঁরা হয়েছিল পাকিস্তানিদের যৌন-নৃশংসতার শিকার এবং ভারতের শরণার্থী শিবির অথবা লুকনো আশ্রয় থেকে বের হয়ে তাঁরা ফিরছে সবার শেষে।

কোনো কোনো খেতে ফসল বোনা হয় নি। কোথাও-বা অতিবৃদ্ধি ঘটেছে অকর্তিত আখের। ঝিকরগাছায় কপোতাক্ষ নদের ওপরকার সেতু ভেঙে পড়ে আছে-যশোর থেকে পশ্চাদপসরণ করার আগে পাকিস্তানিদের শেষ কীর্তি। ছোট নৌকোয় করে আমরা নদী পার হই। এদিকে সাহায্যদানে আগ্রহী শত শত গ্রামবাসীর সহায়তায় আর্মির লোকজন পনটুন সেতু বসাবার কাজ করে চলেছে।

অপর পারে নতুন সেলাই করা বাংলাদেশের পতাকা বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি ভারতীয় পঁচাত্তর পয়সায় বা প্রায় ১০ সেন্টে। আমাদের নামবার সাথে সাথে দাম চড়ে গেল এক রুপি বা ১৩ সেন্টে। যেখানটায় লড়াই হয়েছে সেই জায়গাটি ছাড়া গ্রামাঞ্চলের আর কোথাও যুদ্ধের ক্ষত তেমন দৃষ্টিগোচর হয় না। যুদ্ধস্থলেও ধ্বংসস্তূপ বেশি সময় জুড়ে পড়ে থাকে নি।

নির্মাণ কাজে ব্যবহারের জন্য পাকিস্তানি বাঙ্কার খাবলে খুবলে যা পাচ্ছে গ্রামবাসীরা নিয়ে নিচ্ছে- কড়িকাঠ ও করোগেট ঢেউটিন-সবকিছুই তাঁদের কাজে লাগবে। মাঝেমধ্যে পড়ে থাকা ভস্মীভূত পাকিস্তানি গাড়িগুলোরও একই দশা হয়েছে। যুদ্ধের বাদবাকি চিহ্নও ধুয়েমুছে দেবে পরবর্তী বৃষ্টির পশলা। রাস্তায় মার্চ করে অথবা সাইকেলে চেপে যাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের দল। তাঁদের চোখেমুখে গম্ভীর ভাব। ফ্রন্ট লাইনে তাঁদের খুব কাজে লাগানো হয় নি, কিন্তু তাঁরাই পাকিস্তানি সৈন্যদের উত্যক্ত করে মনোবলহীন করে তুলেছিল এবং এখন নিজেদের মর্যাদাবোধ কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ হতে দেবে না তাঁরা।

আমরা যশোরে প্রবেশ করি এবং সোজা চলে যাই মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টে। এখানে যুদ্ধের কোনো চিহ্ন নেই। জোর লড়াই হয়েছে শহরের উত্তরে। নবম ডিভিশনের কম্যান্ডার, গোলগাল তাগড়াদেহী, মেজর জেনারেল দলবীর সিং আমাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করলেন। তিনি জানালেন যে, যশোরের পাকিস্তানি সৈন্যরা খুলনার পথ ধরে পশ্চাদপসরণ করছে। ‘তাদের আত্মসমর্পণ করতে হবে। নতুবা আমরা তাদের শেষ করে দেব। জন্মগতভাবে আমি যদিও শান্ত প্রকৃতির।’

নেওয়া হয়েছে সেক্ষেত্রে ঐ বক্তব্যের সঙ্গে যশোর দখলের ব্যাপারটা তিনি মেলান কি করে-এমনি প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘স্বদেশের জন্য মিথ্যাচার করাটা কারো কারো নিয়তি।’ ভারতীয়রা যেখানটায় পশ্চাদগামী পাকিস্তানিদের আক্রমণ করছে, জেনারেলের অনুমতি নিয়ে আমরা সেই রাস্তা ধরে এগোই। পথের ধারে ছড়িয়েছিটিয়ে আছে পাকিস্তানিদের বিছানা ও অন্যান্য জিনিসপত্র, বিশৃঙ্খলভাবে পিছিয়ে যাওয়ার সময় ফেলে যাওয়া হয়েছে সব।

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে লেখা এক বালকের পত্রে তার সৈনিক পিতাকে বলা হয়েছে ইন্ডিয়াকে ক্র্যাশ করতে। কাছের মাঠে পড়ে আছে দুই বাঙালির লাশ- শরীরের মাংস বেশ কিছুটা কুকুরের ভোগে লেগেছে। গ্রামবাসীরা জানালো পশ্চাদপসরণরত পাকিস্তানিরা তাঁদের হত্যা করেছে। অনতিদূরে আরেক বাঙালির শব, বাঁ হাত কেটে বিচ্ছিন্ন করা এবং বুকের মাংস খুবলে নেওয়া।

ফেরার পথে আমরা দেখি আগুয়ান ভারতীয় সৈন্য বহরকে অভিনন্দিত করছে বাঙালি জনতা। উল্লাস জানিয়ে মুক্তিদাতাদের আলিঙ্গন করছে, বুকে টেনে নিচ্ছে। পাশ দিয়ে চলে গেল উচ্ছ্বাসউদ্বেল মুক্তিযোদ্ধা-ভর্তি একটি বাস। তাঁদের কেউ কেউ ছাদের ওপরে নাচছে। প্রতিটি জানালা দিয়ে বের হয়ে আছে বন্দুকের নল। তাই বাসটিকে দেখাচ্ছে যেন চলন্ত পিনকুশন।

 

যুদ্ধ সংবাদদাতার নোটখাতা | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

 

ডিসেম্বর ৯

ক্রমশই আরো বেশি করে প্রমাণ মিলছে যে পিছিয়ে আসার সময় পাকিস্তানিরা বাঙালিদের জবাই করছে এবং মুক্তিবাহিনী ও অন্যান্য বাঙালিও পাকিস্তানি ও তাদের বেসামরিক সহযোগীদের ওপর বদলা নিচ্ছে। পাইকারি হত্যাযজ্ঞ পরিহারের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী বাঙালিদের প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড বন্ধে কঠোর নির্দেশ জারি করেছে। একজন আর্মি ক্যাপ্টেন জানালেন যে, তিনি পথের পাশে পাকিস্তানি সৈনিকদের বেশ কিছু ক্ষতবিক্ষত শবদেহ দেখতে পেয়েছেন। তাদের আঙুল কোপ দিয়ে বিচ্ছিন্ন করা, বুকে ক্ষত ও গলা আড়াআড়িভাবে চেরা।

ডিসেম্বর ১৩

আরেকজন রিপোর্টার সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ-পরিস্থিতি দেখার জন্য আমি গাড়িতে খুলনার দিকে রওয়ানা হই। গুড়ুম গুড়ুম গোলাবর্ষণের শব্দ যত ঘনিয়ে এলো আমার চালক মিস্টার সিং ততই নার্ভাস হচ্ছিলেন। আমরা তখনো কয়েক মাইল দূরে, কিন্তু তার গাড়ির গতিবেগ প্রায় শূন্যে নেমে এলো।

আমি তাকে বললাম, ‘মিস্টার সিং, আপনি যদি চালাতে না চান, তাহলে দিন, আমি চালাব।’ ‘তবে আপনিই চালান, সাহিব,’ আশ্বস্ত হয়ে হাসিমুখে নেমে যেতে যেতে সে বললো। রাস্তার ধারে লেখা রয়েছে: ওয়েলকাম টু খুলনা। পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে পদাতিক বাহিনীর দীর্ঘ কলাম, বহন করে চলছে রান্নার পাতিল থেকে বাজুকা সবকিছু।

আমরা মাঝে মাঝে কথাবার্তা বলছিলাম। গর্ত খুঁড়ে অবস্থান নেয়া এক সৈনিকের কাছে আমার সঙ্গী জানতে চাইলো পথে মাইন পোঁতা থাকার আশঙ্কা রয়েছে কিনা। হাসিমুখে সে জবাব দিলো, ‘নো ব্লাডি মাইন্স, স্যার।’ মাঝারি আকারের একটি ট্যাঙ্ক ঘর্ঘর করে এগিয়ে চলছে ফ্রন্টের দিকে। কম্যান্ডার আমাদের দেখে হাত নাড়লেন। এটা এক প্রীতি-যুদ্ধ।

অন্তত ভারতীয়রা আনন্দময়, বন্ধুপরায়ণ ও আস্থায় টগবগে। আহত ভারতীয়দের নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এলো একটি জিপ। পেছন দিকে শূন্যে ভাসছে মানুষের পা, যেন উল্টো করে ঢোকানো হয়েছে তাঁদের। কঠিন হয়ে উঠেছে ভারতীয়দের অগ্রগতি। পাকিস্তানিরা ঘাঁটি গেড়ে বসে জোর লড়াই চালাচ্ছে। ব্রিগেড কম্যান্ডার সাধু সিং যখন কথা বলছিলেন, প্রায় ২০০ গজ দূরে বেশ কটি গোলা এসে বিস্ফোরিত হলো।

পাকিস্তানি ভারি মেশিনগানের গুলিবর্ষণ পটভূমিকায় তারযন্ত্রের মতো ঝঙ্কার দিয়ে উঠলো। ফেরার পথে দেখি গোলাগুলির এলাকা থেকে যেসব লোক পালিয়ে গিয়েছিল তাঁরা আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে। বাঙালিরা কখনোই এক-দু মাইলের বেশি দূরে থাকে না। আর্মি চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শূন্যস্থান পূরণ করে ফেলে। ফিরে আসা লোকজনদের ভেতরে ভারতীয় শরণার্থী শিবির প্রত্যাগতরাও রয়েছে, কাঁধে বহন করছে যৎসামান্য সম্বলের দীনহীন বস্তা, তাঁদের দেখাচ্ছে অনিশ্চিত ও বিমূঢ়।

 

ডিসেম্বর ১৪

ভারতীয় আর্মি আমাকে-সহ ১১ জন সাংবাদিককে নির্বাচন করেছে ঢাকায় তাদের চূড়ান্ত আক্রমণে সেনাবাহিনীর সঙ্গী হতে। ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি দরজাবিহীন ডিসি-৩ বিমানে আমরা আগরতলার উদ্দেশে কলকাতা ত্যাগ করি। আমরা উড়ে যাচ্ছি পূর্ব পাকিস্তানের বুকের ওপর দিয়ে। ১৯৪৭ সালে পারস্পরিক ঘৃণার মধ্যে পাকিস্তান ও ভারতের জন্মের পর, এই প্রথমবারের মতো কোনো ভারতীয় সামরিক বিমান এমনিভাবে উড়ছে।

ভয়ের কিছু নেই বলে মনে হয়। কেননা পূর্বাঞ্চলে সকল পাকিস্তানি বিমান ভূপাতিত হয়েছে এবং কেবল ঢাকাতেই শুধু রয়ে গেছে কিছু বিমানবিধ্বংসী কামান, আর আমরা চলছি রাজধানীর অনেকটা উত্তর দিয়ে। আগরতলায় অবতরণের সময় দেখি যুদ্ধের শুরুতে রানওয়েতে পাকিস্তানিদের সৃষ্ট ক্ষত ভরাট করার কাজ করছে কর্মীবাহিনী।

তিনটি জিপ ও একটি ট্রাকে করে আমরা তখুনি রওয়ানা হয়ে কসবা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করি। এখানকার ভবনে বড় বড় গর্ত তীব্র লড়াইয়ের সাক্ষ্য দিচ্ছে। হঠাৎ একটি জিপ গর্জন করে থেমে যায়। আরেকটির চাকা ফুটো হয়ে যায়। আমরা কোনোক্রমে যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৫৭তম ডিভিশনের হেডকোয়ার্টারে পৌঁছই তখন সন্ধে হয়ে গেছে। মেঘনা নদী দিয়ে যে স্টিমারে আমাদের নরসিংদী যাবার কথা, আধঘণ্টা আগে তা ছেড়ে গেছে।

ডিসেম্বর ১৫

আমাদের নৌযান ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়লো। ঠেলে নিয়ে চলেছে দু’টি ৫.৫ ইঞ্চি কামানবাহী পনটুন ভেলাকে। নদীতীরে ভারতীয় সৈন্যরা মজাদার অঙ্গভঙ্গি করে ছবির জন্য পোজ দিচ্ছে। সড়কপথে এক অতি বিলম্বিত যাত্রা শেষে আমরা পৌঁছুলাম ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে, ঢাকা থেকে নয় মাইল দূরের ভুলতায়। রাতটা কাটালাম ভইলা নামের এক সমৃদ্ধ গ্রামে। এখানে ৩০০ লোকের বাস। মশককুলের আকার অতিকায়।

 

যুদ্ধ সংবাদদাতার নোটখাতা | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

 

ডিসেম্বর ১৬

সকাল সোয়া পাঁচটার দিকে কামানের গোলাবর্ষণ ক্রমেই বাড়তে থাকে। গুলির আওয়াজকে পটভূমিকার সুরধ্বনি করে গ্রামবাসীরা আমাদের খেদমত শুরু করে। নাতা দেয়া হলো চীনামাটি ও কাচের বাসনপত্রে, নিশ্চয় মাটিতে পুঁতে রাখা কারো তোরঙ্গ থেকে এগুলো বের করা হয়েছে। উন্নতমানের এই নাস্তায় ছিল ময়দার চ্যাপ্টা রুটি, গরুর মাংস, মুরগির ঝোল, সেদ্ধ ডিম আর চা।

আমাদের খাওয়া দেখতে জড়ো হলো গ্রামের তাবৎ লোক। চতুর্থ ব্যাটেলিয়ানের হেডকোয়ার্টারে আমাদের অভ্যর্থনা জানান কম্যান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিম্মত সিং। খড়ের গাদার ওপর বসে কোলে ম্যাপ বিছিয়ে তিনি প্রথমে আমাদের জন্য চায়ের হুকুম করলেন। তারপর যুদ্ধ-পরিকল্পনা সবিস্তারে জানালেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তিনি দাঁড়ি কামান নি এবং একে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ধরে নিয়ে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কামাবেনও না। ৯-১২ মিনিটে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপারে পাকিস্তানি অবস্থান তাক করে কর্নেলের মাউন্টেন গানগুলো গর্জে উঠলো। আমরা হেঁটে এগিয়ে গেলাম পরিস্থিতি দেখার জন্য।

গ্রামবাসীরাও দেখতে এগিয়ে এসেছে। গ্রামবাসীদের উল্লাসধ্বনির মধ্যে ছয়টি কামানোর ব্যাটারি প্রায় এক ঘণ্টা ধরে গোলাবর্ষণ করলো। চা আর সেদ্ধ ডিম খাওয়ার জন্য আমরা গাছের ছায়ায় এসে বসি। আমাদের জন্য এ হচ্ছে নাস্তাপানির সময়-সমেত যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণের আহ্বানে সাড়া দেয় এবং ব্রিগেড এখন অবস্থান গুটিয়ে ঢাকার দিকে আনন্দমুখর বিজয়যাত্রা শুরু করেছে।

উল্লসিত বাঙালিরাও মিছিল করে চলেছে তাঁদের নায়কদের পাশাপাশি। পথের কিছুটা আমি একটা ট্যাঙ্কের সওয়ারি হই। ঢাকায় বিশৃঙ্খল আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের পর রাত্রিকে বিদীর্ণ করে তুললো পিস্তল- বন্দুকের গুলির শব্দ। দালালদের বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিশোধ নিচ্ছে এবং দালালরাও পাল্টা গুলি করছে।

আমরা আমাদের চূড়ান্ত যাত্রা শুরু করলাম-প্রথমে হেলিকপ্টারে আগরতলায় এবং সেখান থেকে বিমান যোগে ফেরা। আমাদের পেছনে রাত্রির আঁধারে অন্য হেলিকপ্টারগুলোর পাখার বোঁ-বোঁ শব্দে সেগুলোকে দেখাচ্ছিল যেন অতিকায় জোনাকি-পোকা। কলকাতায় ফিরে এসে দেখি ভারতীয় বাঙালিরা বাংলাদেশের অভ্যুদয়-উৎসব পালন করছে ব্যান্ডসঙ্গীত বাদন ও বাজি পোড়ানোর মধ্য দিয়ে। নিষ্প্রদীপ বিধান তুলে নেওয়া হয়েছে। মিস্টার সিং এখন গাড়ি চালাতে পারবেন নিষ্কম্প হাতে।

Leave a Comment