আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় রাজনৈতিক আন্দোলনে নারীর ভূমিকা – যা রাজনৈতিক আন্দোলনে বাংলার নারী
রাজনৈতিক আন্দোলনে নারীর ভূমিকা
গবেষণাপত্রটি বিশ শতকের প্রথম থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসনের সমাপ্তি পর্যন্ত সময়ে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অবিভক্ত বাংলায় নারীর রাজনৈতিক উন্মেষ ও নারীমুক্তি আন্দোলনে বাঙালি নারীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার তাৎপর্য বিশ্লেষণমূলক।
বর্তমান সময়ে বাঙালি নারীসমাজ তাদের অর্থনৈতিক- সামাজিক-রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের যে কোন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে। বাঙালি নারীর এই সাম্প্রতিক অবস্থান বুঝবার জন্য তার যে দীর্ঘ সংগ্রামী ঐতিহ্য রয়েছে সে প্রসঙ্গে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান এবং পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
নির্বাচিত সময়ে বাংলার নারীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং নারীর সামাজিকায়নে এই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ভূমিকা নিয়ে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা এবং গবেষণা অপ্রতুল।
উপনিবেশিক বাংলায় নারীর শিক্ষা ও অন্যান্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে উনিশ শতকের নবজাগরণের সময় থেকে। লক্ষণীয় যে, বাংলায় নারীজাগরণের সূত্রপাত ঘটে পুরুষ কর্তৃক।
আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত পুরুষ সর্বপ্রথম উপলব্ধি করে যে, বাংলার সামাজিক জীবনের ক্ষয়িষ্ণুতা রোধে সামাজিক-অর্থনৈতিক- রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রয়োজন একটি পুনর্জাগরণ।
এই বহুমুখী পুনর্জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হচ্ছে নারীজাগরণ বা অধঃপতিত অবস্থা থেকে নারীকে উদ্ধার করার প্রচেষ্টা। এ লক্ষে রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথের মত সমাজ সংস্কারকরাই নারীর বিরুদ্ধে সামাজিক নিপীড়ন বন্ধে এবং নারীর অধিকার রক্ষায় প্রথম এগিয়ে আসেন।
ফলে ১৮৬৩ সালে ভাগলপুর মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রগতিশীল একদল পুরুষ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই সমিতি ছিল সামাজিক নিপীড়ন থেকে নারীর মুক্তির লক্ষে বাংলার নারীদের প্রথম সমিতি। পরবর্তী সময়ে ১৮৭৯ সালের ৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয় বঙ্গীয় মহিলা সমাজ। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাধারানী লাহিড়ী, কাদম্বিনী বসু, কৈলাস কামিনী দত্ত, কামিনী সেন প্রমুখ।
নবজাগরণের যুগে সমাজসংস্কারের পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য জগতেও নতুন যুগের সূত্রপাত ঘটে। এই প্রগতিশীল ধারার শিল্প- সাহিত্যেও নারীরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। বাংলার নারীসমাজে এভাবে শিক্ষার বিস্তার, শিল্প- সাহিত্য চেতনার বিস্তার ও স্বদেশ চেতনা বিস্তারের প্রয়াসের ফলে ধীরে ধীরে তাদের ভিতর বৃহত্তর জাতীয় চেতনার বিকাশ ঘটায়।
প্রত্যক্ষভাবে বাংলার নারীর রাজনীতিতে প্রথম অংশগ্রহণ ঘটে ১৮৮৯ সালে। ১৮৮৯-এ বোম্বেতে কংগ্রেসের পঞ্চম অধিবেশনে সর্বপ্রথম দুজন বাঙালি নারী যোগ দেন। এঁদের একজন কংগ্রেস নেতা জানকীনাথ ঘোষালের স্ত্রী স্বর্ণকুমারী দেবী এবং অপরজন দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সহধর্মিনী কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় ।
যদিও এর পূর্বে ১৮৮৩ সালে ইলবার্ট বিল আন্দোলনে ছাত্রীসমাজ যুক্ত ছিল, এবং কবি কামিনী রায়, লেডী অবলা বসু, সরলা দেবী প্রমুখ ছাত্রী এই আন্দোলনে যোগ দেন। তবে ইলবার্ট বিল আন্দোলনে বাঙালি নারীর এই অংশগ্রহণ প্রত্যক্ষ ছিল না বরং সমর্থনসূচক ছিল।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে স্বদেশী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটলে বাংলার নারীসমাজ এই আন্দোলনে সচেতনভাবে জড়িত হন। এক্ষেত্রেও লক্ষণীয় বিষয় হলো, বাংলার পুরুষসমাজে জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বিকাশ ঘটলে তারা উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয় এবং এই আন্দোলনকে সফল করবার লক্ষে তারা বাঙালি নারীসমাজকে স্বদেশবোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে।
এই সময় সরলা দেবী ভারতী পত্রিকার মাধ্যমে স্বদেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়াসী হন। কলকাতার কৃষ্ণকুমার মিত্রের কন্যা কুমুদিনী মিত্র বিভিন্ন সভা সমিতিতে যোগদান করে এবং গান রচনা করে জনসাধারণকে জাতীয়তা মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করতে সচেষ্ট হন।
তাঁর মা লীলাবতী মিত্র এবং তাঁর সহকর্মী সুবলা আচার্য, হেমাঙ্গিনী দাস প্রমুখ নিজ বাড়ি এবং গ্রামে চরকা ও তাঁত প্রবর্তনে সচেষ্ট হন। বরিশাল অঞ্চলে মহিলারা বিয়ের আচার অনুষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত অর্থ জাতীয় ভান্ডারে দান করতে আরম্ভ করেন।
১৯০৬ সালে বরিশালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সম্মেলনের শুরুতে বন্দেমাতরম ধ্বনিসহ রাস্তায় শোভাযাত্রা বের হতে পারবে না এই মর্মে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। এ সময় সরোজিনী বসু নামে এক মহিলা প্রতিজ্ঞা করেন যে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা না হলে তিনি হাতে সোনার চুড়ি পরবেন না ।
বরিশালের কলসকাঠি গ্রামের মহিলারা বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে গেরুয়া পোশাক পরার প্রতিজ্ঞা করেন। এ সময়ে বিক্রমপুরের আশালতা সেন ও কমল কামিনী গুপ্তা স্বদেশী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঘরের বাইরে বের হয়ে আসেন।
আশালতা সেনের উদ্যোগে ১৯২১ সনে ঢাকা শহরের গেন্ডারিয়ায় একটি বয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয় ‘শিল্পাশ্রম’ নামে। ১৯২৪ সালে তাঁর উদ্যোগে ঢাকায় গড়ে ওঠে ‘গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি’। এই সমিতির মেয়েরা খদ্দর কাপড়ের বোঝা কাঁধে নিয়ে ঘরে ঘরে খদ্দর বিক্রি করে স্বদেশী চেতনা প্রচার করতেন। এই সমিতির অন্যতম নেত্রী ছিলেন সরযু বালা গুপ্ত ও সরমা গুপ্ত। এভাবে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হবার মধ্যদিয়ে বাঙালি নারীসমাজের সামাজিকায়নের সূত্রপাত ঘটে।
মহিলাদের উদ্যোগে এ পর্যায়ে স্বদেশী মেলা বা প্রদর্শনীর আয়োজন হতে থাকে। চব্বিশ পরগনার মজিলপুর গ্রামে বসন্তবালা হোম এবং গিরীন্দ্র মোহিনী দাসীর উদ্যোগে এ ধরনের একটি স্বদেশী শিল্প প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
স্বদেশী আন্দোলনের সময় কংগ্রেসের নেতৃবর্গ ও রাজনৈতিক কর্মীদের ভিতরে মডারেট বা নরমপন্থী এবং এক্সট্রিমিস্ট বা চরমপন্থী এই দুই দলের উদ্ভব হয়। এই দুই দল ব্যতীত বিপ্লবপন্থী বা সন্ত্রাসবাদী এক দলও এসময় আত্মপ্রকাশ করে । বাংলায় যে পাঁচজন সদস্য নিয়ে Revolutionary National Council’ বা জাতীয় বিপ্লব সমিতি গঠিত হয় তার অন্যতম সদস্য ছিলেন একজন নারী, সিস্টার নিবেদিতা।
তিনি বাঙালি না হয়েও বাঙালির জাতীয় আন্দোলনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তবে তখনও বিপ্লবী দলে বাংলার নারীদের সরাসরি অংশগ্রহণ সম্ভব না হলেও বিপ্লবীদের কার্যকলাপে তাদের বিশেষ সহানুভূতি ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বিপ্লবীদের কার্যকলাপ ব্যাপকভাবে আরম্ভ হয়। ফেরারী বা পলাতক কর্মীদের অতি সংগোপনে আশ্রয় দেয়া, তাদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া ও চিঠি আদানপ্রদানের মাধ্যম হিসেবে মেয়েরা দায়িত্ব পালন করত।
১৯১৭ সালে বীরভূম জেলার সিউড়ীতে দুকড়ি বালা নামে এক মহিলার বাড়িতে পিস্তল পাওয়া যায়। বিচারে তার তিন বছরের কারাদণ্ড হয়। দুঃখময়ী নামে আরেকজন মহিলাও একই অভিযোগে অভিযুক্ত হন। ১৯১৮ সালে ননীবালা দেবী ছিলেন একমাত্র মহিলা রাজবন্দী।
১৯২০ এর দশক থেকে ধীরে ধীরে মেয়েরা বিপ্লবী বা সন্ত্রাসবাদী দলগুলোর কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে থাকেন। ১৯২৪-এ লীলা রায় ঢাকায় গড়ে তোলেন দীপালী সংঘ। এই সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য বাংলার নারীসমাজকে প্রস্তুত করা।
১৯৩১ সালের ডিসেম্বরে কুমিল্লার ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যার অপরাধে কুমিল্লা ফয়জুন্নেসা স্কুলের অষ্টম শ্রেণির দুজন ছাত্রী সুনীতি চৌধুরী ও শাস্তি ঘোষের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।
তারা ছিলেন যুগান্তর দলের সদস্য। ১৯৩২ সনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত চ্যান্সেলর জ্যাকসনকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়েন বীনা দাস নামের এক ছাত্রী। ময়মনসিংহের বিপ্লবী যুগান্তর দলে রাজিয়া খাতুন ও হালিমা খাতুন নামে দু’জন মুসলিম মেয়ে যোগ দেয়। বিপ্লবীকন্যা প্রীতিলতা আজও স্বাধীনতাকামী সকল জনসাধারণের অনুপ্রেরণার প্রতীক।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রধান ধারা ছিল অহিংস অসহযোগ আন্দোলন। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড এবং সামরিক আইনের প্রতিবাদে মহাত্মা গান্ধী ১৯২০ সালে অহিংস অসহযোগ প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
সরলা দেবী চৌধুরানী বাংলার নারীসমাজের মুখপাত্র হিসেবে এই প্রস্তাবকে অভিনন্দন জানান। ১৯২০ সনে কলকাতায় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে এবং নাগপুরে বার্ষিক অধিবেশনে এই অহিংস অসহযোগ আন্দোলন প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলনের এক নতুন পর্যায় আরম্ভ হয়। স্বাভাবিকভাবেই বাঙলার নারীরা এতে যোগ দেন। এ প্রসঙ্গে চিত্তরঞ্জন দাসের স্ত্রী বাসন্তী দেবীর অনুপ্রেরণায় বিভিন্ন স্থানে মহিলারা গয়না ও অর্থ দান করতে লাগলেন।
এ সময় বিভিন্ন শহরে ও গ্রামে অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে মহিলারা প্রকাশ্যে যোগ দেন। বাংলার নারীরা সাধারণভাবে ও প্রকাশ্যে পুরুষের সঙ্গে রাজনৈতিক কাজে অবতীর্ণ হন বলতে গেলে এই সময় থেকে।
সরোজিনী নাইডু ১৯২১ সালে ইংল্যান্ড থেকে ফিরে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন এবং ঐ বছর কংগ্রেস অধিবেশনে চিত্তরঞ্জন দাসের অনুপস্থিতিতে তাঁর সভাপতির অভিভাষণ পাঠ করেন। এ সময় ঢাকার মেয়েরা চরকা দিয়ে সূতা কাটা শুরু করেন। ১৯২১ সালে চট্টগ্রামের মেয়েরা অসহযোগ আন্দোলন পরিচালনার জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজে যুক্ত হন।
১৯২২ সিলেট জেলায় সর্বপ্রথম নারীদের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবার দুই বছর পর এর কার্যক্রম অনেকটা থেমে যায়। তবে অসহযোগ আন্দোলন বাংলার নারীদের রাজনৈতিক এবং একই সাথে সামাজিক ক্ষেত্রে অগ্রসর করার বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
এ সময় বাংলার নারীরা আত্মসংগঠন ও রাজনৈতিক কাজ পরিচালনার জন্য সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা শুরু করে। ১৯৩০ এর দশকে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে মহাত্মা গান্ধী লবণ আইন ভঙ্গ দ্বারা আইনঅমান্য বা সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৩০ সনের ১২ মার্চ ৭৯ জন সঙ্গীসহ সবরমতী আশ্রম থেকে পদব্রজে দণ্ডী যাত্রা করেন।
৫ এপ্রিল তিনি সরকার কর্তৃক বন্দী হন। এ সময়ে তিনি নারীসমাজের উদ্দেশ্যে একটি বাণী দেন যার মর্ম ছিল ভারতের এই স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীদের দানই অধিক হওয়া উচিত। নারীকে দুর্বল মনে করা অপমানজনক এবং নারীরা যেন বিদেশী বস্ত্র বর্জন ও মাদকদ্রব্য নিবারণের জন্য শান্তিপূর্ণভাবে এগুলোর বিক্রয় কেন্দ্রে পিকেটিং করেন।
মহাত্মা গান্ধীর নির্দেশে বাংলাদেশে সিলেটের সরলা বালা দেব, দিনাজপুরের প্রভা চ্যাটার্জী, ভোলার সরযুবালা সেন, বরিশালের ইন্দুমতি গুহ ঠাকুরতা, প্রফুল্ল কুমারী বসু, নোয়াখালির সুশীলা মিত্র, খুলনার স্নেহশীলা চৌধুরী, সিরাজগঞ্জের বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী, বিক্রমপুরের সরযু বালা সেন, ময়মনসিংহের ঊষা গুহ প্রমুখ নারীরা নিজ নিজ অঞ্চলে আন্দোলনে সক্রিয় থাকেন।
মহাত্মা গান্ধীর পরে সরোজিনী নাইডু লবণ আইন ভঙ্গ করতে গিয়ে কারারুদ্ধ হন। লবণ সত্যাগ্রহ বা ডান্ডি মার্চে সিলেটের নারীসমাজকে অন্তর্ভুক্ত করতে ১৯৩০ সালে গড়ে ওঠে “শ্রিহট্ট মহিলা সংঘ’। ১৯৩১ সালে সত্যাগ্রহ আন্দোলনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্যতম নেত্রী হেমপ্রভা মজুমদার ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অপরাধে গ্রেপ্তার হন।
তাঁকে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সত্যাগ্রহীদের উপর পুলিশী বর্বরতার প্রতিবাদে কুমিল্লার ফয়জুন্নেসা স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী লাবন্যলতা চন্দ পদত্যাগ করেন, পরবর্তীকালে তাঁকে তাঁর সহকর্মী যমুনা ঘোষসহ গ্রেফতার করা হয়। শামসুননেসা বেগম, রওশন আরা বেগম, রইসাবানু বেগম ও বদরুন্নেসা বেগম প্রমুখ মুসলিম নারীরাও লবণ আইন অমান্য রওশন আরা বেগম, রইসাবানু বেগম ও বদরুন্নেসা বেগম প্রমুখ মুসলিম নারীরাও লবণ আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দেন ।
নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করলে হেমপ্রভা মজুমদার, লীলা রায়সহ বাংলার নারীরা সেখানে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে নেতাজী জাপান অধিকৃত সিঙ্গাপুরে একটি অস্থায়ী জাতীয় ভারত গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন। এর অধীনে ভারতের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে
‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ নামে একটি জাতীয় সামরিক বাহিনীও গঠন করেন। নেতাজী জাতীয় আন্দোলনে নারীসমাজের সমান অংশগ্রহণ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং তিনি তাঁর সামরিক বাহিনীর অধীনে ‘রানী অব ঝান্সী ব্রিগেড’ নামে একটি নারী-বাহিনী গঠন করেন। এই নারী-বাহিনীর প্রধান ছিলেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন্ । যুদ্ধ পরিচালনার উপযোগী শিক্ষা এই বাহিনীকে দেওয়া হয়।
নারীজাতির এই সম্মান শুধু বাংলা কেন, ভারতের অন্যান্য প্রদেশের নারীগণের মধ্যেও স্বদেশপ্রেমের প্রেরণা এনে দেয়। ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে বোম্বেতে নিখিল ভারত কংগ্রেস অধিবেশনে গান্ধীজী প্রস্তাব আনেন যে, ইংরেজ কর্তৃপক্ষ এ দেশ থেকে চলে যাক, ভারতীয়রা কোনভাবেই তাদের সাহায্য করবে না, তারা আত্মশক্তির উপর দাঁড়িয়ে বিপক্ষ দলের সঙ্গে লড়বে।
সরোজিনী নাইডু প্রথমদিনই গ্রেফতার হন। এ সময়ে সমগ্র ভারতব্যাপী যে স্বতঃস্ফূর্ত স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা হয় তা আগস্ট বিপ্লব নামে পরিচিত। বাংলাদেশের সর্বত্র এই আন্দোলন শুরু হয়, বিশেষ করে মেদিনীপুরে নিবিড়ভাবে এই আন্দোলন শুরু হয় এবং মেদিনীপুরের নারীরা অদ্ভূত বীরত্ব প্রদর্শন করেন। মেদিনীপুরের ৭৩ বছর বয়স্ক বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা এই আন্দোলনে একটি শোভাযাত্রা পরিচালনার সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন। মেদিনীপুরের মত বীরভূমের
অন্তর্গত শান্তিনিকেতন অঞ্চলেও মহিলা কর্মীরা আগস্ট বিপ্লবকে সার্থক করবার উদ্দেশ্যে জনগণের মধ্যে প্রচার ও গঠনমূলক কাজে নিয়োজিত হন। এ অঞ্চলে নন্দিতা দেবী ও রানী চন্দ্র আগস্ট বিপ্লবে যোগদান করে কারাবরণ করে।
কলকাতাতেও এই বিপ্লব জোড়াল আকার ধারণ করে। এ সময় দক্ষিণ কলকাতা কংগ্রেসের সম্পাদক বীনা দাস আটক হন। সমাজতন্ত্রীদল এই সময় কংগ্রেসের অর্ন্তভুক্ত থেকে কাজ করতেন।
তারা পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে এড়িয়ে সংগোপনে বিপ্লবী কাজ চালাতেন। এদের অন্যতম ছিলেন অরুনা আসফ আলী। তিনি একজন বাঙালি নারী। তাঁর নামে গ্রেপ্তারী পরওয়ানা জারী হয়। তিনি পুলিশের হাতে ধরা দেন নি। তিনি সমাজতন্ত্রী নেতা ডক্টর রামমোহন লোহিয়ার সঙ্গে গোপনভাবে ‘ইনকিলাব’ নামে একটি পত্রিকাও বের করেন। ১৯৪৬ সালে অরুনা আসফ আলীর উপর থেকে পরওয়ানা তুলে নেওয়া হলে তিনি কলকাতার দেশবন্ধু পার্কের বিরাট জনসভায় প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯৪৩ সনে (বাংলা ১৩৫০) জাপানি আক্রমণের প্রতিরোধকল্পে বাংলার পূর্বাঞ্চল থেকে যানবাহন সরিয়ে নেয়া হয় এবং খাদ্যমজুদ বৃদ্ধি পাবার কারণে তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দেয়। যার ফলে দেখা দেয় ভীষণ দুর্ভিক্ষ যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। এই দুর্ভিক্ষের সময় কলকাতার মহিলা কর্মীরা গঠন করেন মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি। মূলত এই সমিতি ছিল তৎকালীন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির যুদ্ধকালীন জরুরী সমিতির একটি নারী শাখা।
বিভিন্ন অঞ্চলে এর শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। নারীর সমাজ-জীবনে এই সময় যে ভীষণ সংকট উপস্থিত হয় তা থেকে তাকে রক্ষা করার ভার নেয় এই সমিতি। এটি ছিল একটি ফ্যাসিবাদবিরোধী ও গণতান্ত্রিক নারী সংগঠন। এই সংগঠনটি যে সময় গঠিত হয় তখন কমিউনিষ্ট আন্দোলনে বিশেষ করে বিভিন্ন কৃষক শ্রমিক আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির প্রতিষ্ঠা এই প্রক্রিয়ার সাথেই সম্পৃক্ত ছিল। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির উদ্দেশ্য ছিল :
১. দেশরক্ষা
২. জাতীয় নেতাদের মুক্তি ও জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা
৩. দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ ও নারীদের মর্যাদার সাথে বাঁচতে সাহায্য করা।
৪. সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শামিল হওয়া।
কমিউনিস্ট পার্টির মহিলা ফ্রন্টের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হলেও মহিলা আত্মরক্ষা সমিতিতে শ্রমিক ও কৃষক পরিবারের নির্যাতিত মেয়েদের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তসহ সকল শ্রেণির মেয়েদেরই সমাবেশ ঘটেছিল।
মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি ছিল সমাজের সকল শ্রেণির দেশপ্রেমিক নারীদের প্লাটফর্ম। মনিকুন্তলা সেন, গীতা মুখার্জি, রেনু চক্রবর্তীসহ বেশ কয়েকজন কমিউনিষ্ট আন্দোলন এবং ছাত্রআন্দোলন থেকে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকার গণতান্ত্রিক সংগঠনে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন।
এ সময়ের বিশিষ্ট শ্রমিকনেত্রী ছিলেন সন্তোষ কুমারী দেবী, ডঃ প্রভাবতী দাসগুপ্ত, সুলতানা মোয়জ্জেদা, সুধা রায় প্রমুখ। অবিভক্ত বাংলার ২৮টি জেলাতেই মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গড়ে ওঠে। দিনাজপুরের ফুলবাড়ি থানার লালপুর ডাঙ্গায় হারুনা বিবির নেতৃত্বে কৃষক মেয়েদের একটি সভা হয়।
সভায় একটি কৃষক মেয়েবাহিনী গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়। খুলনায় সাতক্ষীরা মহকুমার রসুলপুরে তসলিমা খাতুনকে সম্পাদিকা করে একটি আত্মরক্ষা সমিতি গঠন করা হয়। এই সমিতিতে মুসলিম নারীদের উৎসাহ বেশী ছিল।
বরিশালে স্নেহলতা দাসকে সভানেত্রী ও শান্তিসুধা ঘোষ এবং যুঁইফুল বসুকে যুগ্ম সম্পাদিকা করে ১৭ জন মহিলা নিয়ে একটি আত্মরক্ষা কমিটি গঠিত হয়। পরবর্তীতে ১২০ জন স্বেচ্ছাসেবিকা এতে যোগ দেয়। বরিশালে আত্মরক্ষা সমিতির মহিলারা পাঁচ হাজার দুঃস্থ মহিলার সমাবেশ করে, সমবায় ভাঙার খুলে চাল বিতরণের কাজ করে।
চট্টগ্রামের ১৫টি স্কোয়াড জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যআন্দোলন গড়ে তোলে। দিনাজপুর, রংপুর ও পাবনায় এই সমিতির মহিলারাই প্রথমত ভুখা মিছিল বের করে। ফরিদপুর জেলার মাদারীপুরে প্রায় দুই হাজার মহিলার ভুখা মিছিলের কারণে জেলা ম্যজিস্ট্রেট শেষ পর্যন্ত আদেশ দিতে বাধ্য হন যে, বাজারে যত ধান চাল আছে তা ১৫ টাকা সের দরে বিক্রি করে দেওয়া হোক।
চল্লিশ দশকের দ্বিতীয়ার্ধ ছিল কৃষক আন্দোলনের সময়। অবিভক্ত বাংলার উনিশটি জেলায় সে সময় যে সব কৃষক আন্দোলন হয়েছিল তারমধ্যে নারীর অংশগ্রহণ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
১৯৪৩ সালে নালিতাবাড়িতে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলনে বহু হাজং নারী কর্মীও যোগ দেন। এ সময়ে রংপুর, যশোর, খুলনা ও দিনাজপুরে ‘তোলা ও লিখাই’ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। গ্রামীণ নারীরা এর বিরুদ্ধে সংগঠিত কৃষকআন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। দিনাজপুর ও রংপুরে কৃষকরা ‘সমিতির হাট’ চালু করলে কৃষক জোতদার লড়াই শুরু হয়। এ সংগ্রামে কৃষকদের রক্ষাকারী ও আশ্রয়দাত্রী হিসেবে কৃষাণীরা সাহস ও বীরত্বের পরিচয় দেন।
তেভাগা আন্দোলন, টংক আন্দোলন, নানকার আন্দোলন, নাচোলের কৃষক আন্দোলনের সাথে নারীসমাজের এক বিরাট অংশের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। দিনাজপুরের রানী শংকাইলে রাজবংশী কৃষাণী জয়মনি প্রায় তিনশ’ নারী নিয়ে তার বাহিনী গঠন করে। এই বাহিনী পুলিশকে কয়েকবার পরাস্ত করে। ঠাকুরগাঁও মহকুমার আটোয়ারী থানার রামপুর গ্রামে বর্গাদারের ধানকাটা উপলক্ষে শুরু হয় কৃষক নির্যাতন।
এ নির্যাতন বন্ধ করার জন্য এগিয়ে আসেন রাজবংশী মহিলা দীপেশ্বরী। ১৯৪৬ সালে ময়মনসিংহের সুসং দূর্গাপুরের বাহরতলী গ্রামে পুলিশী তল্লাসীর বিরুদ্ধে হাজং নারীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ সময় ২৫ জন সশস্ত্র পুলিশের সাথে লড়ে রাশমনি হাজং শহীদ হন। টংক আন্দোলনে এ অঞ্চলে তিনি প্রথম শহীদ। এ অঞ্চলে পরবর্তীতে শহীদ হন শঙ্খ মনি ও রেবতি। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন অশমনি, রাহেলা ও ভদ্র।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার পূর্ব থেকেই বন্দী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মুক্তিলাভ করতে থাকেন। জেলমুক্ত নেতারা নবচেতনায় সঞ্জীবিত হয়ে দেশমাতৃকার মুক্তির লক্ষে নিয়োজিত হন। বাংলার অঞ্চলে অঞ্চলে হিন্দু- মুসলমানরা একত্রে সভাসমিতি, শোভাযাত্রা- হরতাল আয়োজন করতে লাগল। বাংলার নারীরাও এতে সমানভাবে যোগ দেন।
এভাবে বাংলার জাতীয় আন্দোলনে নারী যখন পুরুষের পাশে সমভাবে দাঁড়ান তখনই তা শক্তিমান হয়ে ওঠে এই শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে নি পরাক্রমশালী বৃটিশ শক্তিও, ফলে ১৯৪৭ এর আগস্ট মাসে বৃটিশ রাজকে ভারত ত্যাগ করতে হয়।
১৯০৫, ১৯২১, ১৯৩০ এবং ১৯৪২ সাল আমাদের জাতীয় আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য ও স্মরণীয় সময়। প্রথমে পরোক্ষ এবং পরে প্রত্যক্ষভাবে যোগ দিয়ে এর প্রত্যেকটিকেই বাঙালি নারী সার্থক করে তুলেছে, একই সাথে পর্যায়ক্রমে নারীর রাজনীতি এবং সমাজে অবস্থান ও ভূমিকার পরিবর্তন ঘটেছে।
গবেষণার বিবেচ্য বিষয়সমূহ :
১. বর্তমান গবেষণাপত্রের মূল যুক্তি হচ্ছে উনিশ শতকের সংস্কার আন্দোলন নয় বরং উপনিবেশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত হবার মধ্য দিয়ে বিশ শতকে বাঙালি নারীমুক্তি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।
উনিশ শতকে যে সংস্কার আন্দোলন আরম্ভ হয় শতকের শেষ পর্যায়ে এসে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষের ফলে তা স্তিমিত হলে নারীজাগরণের পথটি বন্ধ হয়ে যায়। বিশ শতকে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন শুরু হলে আন্দোলনের প্রয়োজনে বাঙালি নারীকে জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করা হয়।
১৯৪৭-এ স্বাধীনতা অর্জনের সময় পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বাঙালি নারীরা উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয় এবং বিভিন্ন পর্যায়ে এই রাজনৈতিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত হবার এবং পর্যায়ক্রমে ব্যাপকহারে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে নারীমুক্তির সূত্রপাত হয়। অর্থাৎ নারীর রাজনৈতিকায়ন এবং নারীমুক্তি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। এই যুক্তির পাশাপাশি নিম্নোক্ত বিষয়গুলো গবেষণাপত্রে আলোচিত হবে।
২. মহিলাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মূল লক্ষ্য কী ছিল? তাদের লক্ষ্য কি শুধু নারীসমাজের উন্নতি ও মঙ্গলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, না দেশের সার্বিক মঙ্গল তাদের লক্ষ্য ছিল?
৩. লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মপন্থার যে ভিন্নতা ছিল তা এই গবেষণায় বিবেচ্য বিষয়। বামপন্থী রাজনীতিবিদ ও ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের দর্শনে যেমন ভিন্নতা ছিল তাদের কর্মপদ্ধতিও ছিল তেমন ভিন্ন। এই ভিন্ন ভিন্ন কর্মপদ্ধতি বাঙালি নারীকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রভাবিত করেছে। ৪. রাজনৈতিক দর্শনে ভিন্নতার পাশাপাশি ধর্মীয় আদর্শের ভিন্নতাও নারীদের রাজনৈতিক সম্পৃক্তিকে প্রভাবিত করেছিল যা বর্তমান গবেষণার একটি বিবেচ্য বিষয়।
যৌক্তিকতা :
অবিভক্ত ভারতবর্ষে উপনিবেশিক সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন অধিকার আদায়, সামাজিক অবরোধমুক্তি ও বৃটিশ শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে পুরুষের পাশাপাশি সমানভাবে অংশ নিয়েছেন নারী। এই বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে অবিভক্ত বাংলার বিশেষ ভূমিকা ছিল এবং বাংলার নারীসমাজ এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
পশ্চাদপদ সামাজিক অবস্থান এবং অবরুদ্ধ জীবনে আবদ্ধ বাঙালি নারীর জন্য স্বাধীনতা আন্দোলন প্রথম অবরোধ মুক্ত হবার পথ সৃষ্টি করে। অবিভক্ত ভারতবর্ষে রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বাংলার নারীসমাজের পরিবর্তনশীল ভূমিকার গবেষণাভিত্তিক ইতিহাস এখন পর্যন্ত অনুপস্থিত। পাশাপাশি বর্তমান গবেষণার মাধ্যমে নারীর অস্বীকৃত ও অবমূল্যায়নকৃত অবদানের প্রতি আলোকপাত করা হবে।
প্রকাশিত গবেষণার মূল্যায়ন : (দ্বৈতীয়িক উৎস)
বর্তমানে নারী বিষয়ক গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নারী বিষয়ক গবেষণার অধিকাংশই হয়ে থাকে নারীশিক্ষার প্রসার, নারীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার বিবর্তন বিষয়ে। তবে রাজনীতিতে নারীর সংগ্রামী মনোভাব, ঐতিহ্য এবং নেতৃত্ব পর্যায়ে উত্তরণের পটভূমি নিয়ে কিছুসংখ্যক গবেষণা হয়েছে।
এই সকল গবেষণাকর্মে সাধারণত উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকে অবধি বাংলার রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণের একটা ধারাবিবরণী পাওয়া যায়। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ দু’স্থানেই এধরনের গবেষণাকর্মের উপস্থিতি দেখা যায়। তবে গবেষকরা রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণকে এমনভাবে বিশ্লেষণ করেছেন যেন তা ইতিহাসের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন একটি ধারা। এছাড়া কিছু গ্রন্থ পাওয়া যায় যেখানে কৃতি নারীদের সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি বর্ণনা করা হয়।
এই গ্রন্থসমূহও বর্ণনামূলক, বিশ্লেষণমূলক নয়। তবে রাজনীতিতে বাংলার নারীর অংশগ্রহণ কখন থেকে শুরু হয় এবং এই অংশগ্রহণ কীভাবে ব্যাপক আকার লাভ করে তা জানবার জন্য এই গবেষণাকর্মগুলি গুরুত্বপূর্ণ।
এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে যোগেশচন্দ্র বাগল রচিত জাতীয় আন্দোলনে বঙ্গ নারী।
এটি একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্ম। এখানে ১৮৮৯ সালে কংগ্রেস অধিবেশনে দুজন নারী প্রতিনিধির অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনের অবসান পর্যন্ত সময়ে বাঙালি নারীর বহুমাত্রিক সংগ্রামের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষভাবে স্বদেশী আন্দোলন ও এর ফলাফল, অসহযোগ আন্দোলন, আইনঅমান্য আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে নারীসমাজের অংশগ্রহণ সম্পর্কে জানা যায়। তবে বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে যে কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়, যে আন্দোলনে নারীসমাজের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল সে সম্পর্কিত তথ্য এখানে অনুপস্থিত। এ ছাড়াও বামপন্থী আন্দোলন সম্পর্কেও তেমন আলোকপাত এখানে হয় নি।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্ম অদিতী ফাল্গুনী রচিত বাংলার নারী :
সংগ্রামী ঐতিহ্যের অনুসন্ধান । গ্রন্থটিতে বিশেষভাবে নারীসংগঠনগুলির বিকাশ এবং কার্যক্রম সম্পর্কিত আলোচনা রয়েছে। এই আলোচনার মাধ্যমে নারীর রাজনৈতিক উন্মেষের ক্ষেত্রে সংগঠনগুলির ভূমিকা জানা যায়। পাশাপাশি নারীর রাজনৈতিক কার্যকলাপের একটি বিবরণী পাওয়া যায়। তবে গবেষণাকর্মটি বিশ্লেষণমূলক নয়, ঘটনা সমূহের বর্ণনামূলক । বাংলাদেশে নারী বিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে মালেকা বেগমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ।
মালেকা বেগম রচিত বাংলার নারী আন্দোলন শীর্ষক গবেষণাকর্মটি উল্লেখযোগ্য। গ্রন্থটিতে নারীআন্দোলনের ইতিহাসকে ১১টি অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। গ্রন্থটির সূচনা হয়েছে প্রাচীন দ্রাবিড় ও আর্য সমাজে নারীর অবস্থান ও সেই অবস্থান থেকে কীভাবে নারী গৃহবন্দী হয়, কীভাবে নারী সামাজিক-অর্থনৈতিক অধিকার তথা সমঅধিকার থেকে বঞ্চিত হয় সেই ইতিহাসের মাধ্যমে।
পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে নারীআন্দোলনের সূচনা, বিশ শতকের বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে নারীর সম্পৃক্ততা, কৃষক আন্দোলনে নারীসমাজের ভূমিকা, নারী সংগঠন সমূহের প্রতিষ্ঠা, বিভাগোত্তর পাকিস্তানে ও পাকিস্তানে সামরিক শাসনকালে নারীআন্দোলন আলোচিত হয়েছে। গ্রন্থটির আলোচনা সমাপ্তি হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্ব তথা ‘৬৯ এর গণআন্দোলনে নারীসমাজের ভূমিকা ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে নারীসমাজের অবস্থান আলোচনার মধ্যদিয়ে। তবে স্বল্প পরিসরে বৃহত্তর সময়ের ইতিহাস আলোচনা করায় তা পূর্ণাঙ্গ বা বিস্তৃত হয় নি।
১৮ থেকে ২০ শতক এই তিনশ বছরের বাঙালি নারীর জীবন সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে মালেকা বেগম ও সৈয়দ আজিজুল হক রচনা করেছেন আমি নারী শীর্ষক গ্রন্থ। এ গ্রন্থটি থেকে বিগত তিন শতকে এ অঞ্চলে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও ভাঙ্গাগড়ার মধ্যে বাঙালি নারীর জীবন কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে সেই ইতিহাসের একটি ধারাবিবরণী পাওয়া যায়।
বিশ শতকের চল্লিশের দশকে বামপন্থি আন্দোলনে নারী নেত্রীদের পুরোধা ছিলেন কনক মুখোপাধ্যায়। নারী আন্দোলন ও সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘকাল জড়িত থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি লিখেছেন নারীমুক্তি আন্দোলন ও আমরা গ্রন্থটি।
বিশেষ করে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি যা পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ মহিলা সমিতি
নামে পরিচিত হয় তার ক্রমবিকাশের একটি রূপরেখা এই গ্রন্থে পাওয়া যায়। গ্রন্থটি বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থী নারীদের ভূমিকা সম্পর্কে জানবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কনক মুখোপাধ্যায়ের সমসাময়িক এবং তাঁর সহকর্মী রেনু চক্রবর্তী রচনা করেছেন Communists in Indian Women’s Movement (1940 1950). এই গ্রন্থটি থেকেও চল্লিশের দশকের বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে বামপন্থী নারী সংগঠন-এর ভূমিকার কথা জানা যায়। গ্রন্থটিতে বাংলার পাশাপাশি সময় ভারতবর্ষের বামপন্থী আন্দোলন সম্পর্কে জানা যায়।
মনিকুন্তলা সেনের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ সেদিনের কথা থেকেও বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে বামপন্থি দলের ভূমিকার কথা জানা যায়। মনিকুন্তলা সেন বিস্তারিতভাবে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীদের সচেতন করার ক্ষেত্রে বামপন্থী সংগঠন-এর ভূমিকা লিপিবদ্ধ করেছেন। তবে এই তিনটি গ্রন্থই একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা। কাজেই এই গ্রন্থ থেকে নারীআন্দোলনের একটি খণ্ডিত চিত্র পাওয়া যায়।
সংগ্রামী বাংলার নারীদের জীবনী নিয়ে নারী প্রগতি সংঘ প্রকাশ করেছে সংগ্রামী নারী যুগে যুগে নামক দুই খণ্ডের গ্রন্থ। বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারী নারীদের জীবনী এই গ্রন্থে সংক্ষিপ্ত আকারে পাওয়া যাবে। এই জীবনী থেকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণকারী নারীদের সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট ও তাদের রাজনীতি সম্পৃক্ততার পটভূমি জানা যায় ।
গবেষণা পদ্ধতি :
গবেষণাপত্রটি প্রধানত বিশ্লেষণধর্মী। প্রকাশিত এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রে প্রাথমিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে গবেষণাকর্মটি পরিচালিত হয়েছে। আলোচনা ও বিশ্লেষণের শুরুতে যে প্রত্যয়টি ও ধারণা কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে তা রাজনৈতিক নারী সংক্রান্ত। এ বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনার লক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য সংযোজিত আছে।
উত্স :
বর্তমান গবেষণায় প্রাথমিক সূত্রের অপর্যাপ্ততার কারণে প্রাপ্ত দ্বৈতীয়িক সূত্রসমূহকে গবেষণার ক্ষেত্রে উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হবে, যেমন : নির্বাচিত দ্বৈতীয়িক গবেষণা কর্ম (ইংরেজি), নির্বাচিত দ্বৈতীয়িক গবেষণাকর্ম (বাংলা) ও নির্বাচিত প্রবন্ধ। প্রাথমিক সূত্র হিসেবে সমকালীন রাজনীতিসংশ্লিষ্ট নারীদের আত্মজীবনী ও সম্ভাব্যক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ডায়েরি ও চিঠি গবেষণার উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এছাড়া সম্ভাব্যক্ষেত্রে প্রাপ্য সরকারী নথি পর্যালোচনা হবে।

গবেষণার সময়কাল :
এই গবেষণার সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯০৫ খৃঃ থেকে ১৯৪৭ খৃঃ পর্যন্ত। বিষয়টি ব্যাখ্যার দাবিদার। গবেষণার শুরুর কাল হিসেবে ১৮৮৯ সনকে নির্ধারণ করা যেতো, এ বছর প্রথম কংগ্রেসের বোম্বে অধিবেশনে দুজন নারী প্রতিনিধি যোগ দেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ১৯০৫ সালটিকে বেছে নেয়া হয়েছে।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন শুরু হয় এবং এই সময় বৃটিশবিরোধী স্বদেশী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রথম জেগে উঠে বাঙালি নারীর ভেতর ব্যাপকভাবে দেশাত্ববোধের চেতনা ও বৃটিশবিরোধী রাজনৈতিক সচেতনতা যা শহরের শিক্ষিত শ্রেণীকে অতিক্রম করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ নারীসমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
অপরপক্ষে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে। জন্ম নেয় দুটি ভিন্ন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান । অবিভক্ত বাংলার এক অংশ নিয়ে তৈরি হয় পূর্ব পাকিস্তান ও অন্য অংশ সংযুক্ত হয় ভারতবর্ষে পশ্চিমবঙ্গ হিসেবে।
নারী কর্মীরা কেউ পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে যান আবার কেউ ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। তাদের কর্মক্ষেত্র পরিবর্তিত হয়। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন আদর্শ নিয়ে তাঁরা নতুন কর্মক্ষেত্রে জড়িত হন। ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত সময়ে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে বাংলার নারীসমাজের যে বহুমুখী ভূমিকা তা বর্তমান গবেষণার আলোচ্য বিষয়।
