আমাদের আজকের আলোচনা বিষয়-রাজনৈতিক পরিস্থিতি। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি

প্রিয় কাউন্সিলর ভাই ও বোনেরা,
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর দেশে সামরিক শাসন জারী করা হয়। যদিও ইতিমধ্যে তিনবার ক্ষমতার রদবদল হয়েছে, কিন্তু সেই সামরিক শাসন এখনো বলবৎ রয়েছে। সেই জঙ্গী শাসনের আওতায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। নিয়ন্ত্রিতভাবে।
আর রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল কিছুই আজ পদানত হয়েছে সামরিক জান্তা ও স্বাধীনতা যুদ্ধকালে চিহ্নিত শত্রুদের। এরা দেশ ও রাষ্ট্রের সব কিছুতে নিজেদের সফল অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সশস্ত্র জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত জনগণের সকল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য সমূহ নস্যাৎ করার তৎপরতায় লিপ্ত।
বর্তমান ক্ষমতাসীন সর সরকার ক্ষমতা দখল করেই সামরিক আইনের বিভিন্ন ধারাবলে দেশের মানুষের বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা, শোভাযাত্রা, মিছিল, শ্রমিকদের ধর্মঘটের অধিকারসহ সকল মৌলিক অধিকার হরণ করেছেন।
সংবিধানের বিভিন্ন ধারা সাসপেন্ড করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অধিকার কায়েম করে আবার ধর্ম রাজনীতিকে স্বার্থসিদ্ধির জন্য কলুষিত করার সুযোগ দিয়েছেন। সংবিধানে ধর্মীয় শ্লোগান জুড়ে দিয়ে এবং অন্যদিকে মদ, জুয়াসহ বিভিন্ন সামাজিক অনাচারের মাত্রা বাড়িয়ে এক ভাওতার রাজনীতি কায়েম করেছেন।
সংবিধান থেকে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বীকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে এবং সমাজতন্ত্রের এক বিকৃত ব্যাখ্যা দান করে। গণপ্রতিনিধিদের দ্বারা প্রণীত ও সার্বভৌম গণ-পরিষদে গৃহীত জাতীয় সংবিধানের অবমাননা করেছেন।
কেবল করে নয়, বর্তমান রাষ্ট্রপতি গত ৩রা জুনের এক প্রহসনমূলক নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি পদে জয়ী হয়েও এখনো প্রধান সামরি আইন প্রশাসক এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানের পদ আঁকড়ে রেখেছেন। আবার নিজে একটি রাজনৈতিক দলও গঠন করেছেন। এসকল কার্যাবলীর মাধ্যমে তিনি সর্বকালের সকল প্রকারের রীতিনীতি ভঙ্গ করে দেশ ও জাতির পরিব আমানত সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে টেনে আনছেন।
অন্যদিকে সামরিক আইনের নিয়ন্ত্রণাধীন রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনকে কলুষিত করার সুযোগ দিয়ে রাজনৈতিক শক্তিকে মেরুদণ্ডহীন বলে প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে এবং তার মাধ্যমে দেশে এক রাজনৈতিক শূন্যতা ও নৈরাজ্যের রাজনীতি আজ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। সরকারী ইন্ধনে আজ সব ক’টি রাজনৈতিক দলই দ্বিধা-ত্রিধা বিভক্ত হয়ে পড়ছে।
বর্তমান রাষ্ট্রপতি তাঁর নিজের গড়া রাজনৈতিক দলে কতিপয় মুখচেনা পুরোনো ও জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তি ও স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধী শক্তির সমাবেশ ঘটিয়ে নিজের অপরিণত মানসিকতাসম্পন্ন রাজনৈতিক চিন্তা ও বুদ্ধি, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নামে, দেশবাসীর উপর চাপিয়ে দেওয়ার মতলব আটছেন।
অপর দিকে ‘ধাপে ধাপে। গণতন্ত্রে উত্তরণে প্রক্রিয়া’র এবং সামরিক শাসনের পরিবর্তে জন প্রতিনিধিদের শাসন কায়েম করার নামে জাতীয় সংসদের একটি নির্বাচন প্রহসন অনুষ্ঠানের কথাও বলছেন। শোনা যায়, ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারীতে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
অথচ নভেম্বর মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে, এখনও নির্বাচনের নির্ধারিত তারিখ, প্রস্তাবিত জাতীয় সংসদের রূপরেখা, কাঠামো ও এখতিয়ার সম্পর্কে কোন ঘোষণা দান করা হয়নি। কিন্তু মজার ব্যাপার এই যে, রাষ্ট্রপতি নিয়ে এবং তাঁর মন্ত্রীদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে আবার বলতেও শুরু করেছেন যে নির্বাচন বানচালের পায়তারা নাকি চালানো হচ্ছে।
যে নির্বাচনের এখনও কোন তারিখ নেই, যে সংসদের কোন রূপরেখা ও কাঠামো এবং এখতিয়ার সম্পর্কে একমাত্র স্বয়ং রাষ্ট্রপতি ও তাঁর মন্ত্রীরা ছাড়া আর কেউ কিছু জানেন না, সে নির্বাচন কে বা কারা বানচালের পাঁয়তারা কষতে পারেন, সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
আসলে সরকার নিজেই এ নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টায় লিঙ রয়েছেন। আবার শোনা যায়, সরকার নাকি জনপ্রতিনিধিদের হিসেবের নামে বেশ কিছু সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীকে এবডো করার চিন্তা করছেন।
এ প্রসঙ্গে আমরা বলতে চাই যে, দীর্ঘ তিন বছর ধরে বহু তদন্ত হিসাব- নিকাশ করার পরেও আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে যখন কোন অভিযোগ খুঁজে পাওয়া গেলো না, তখন সংসদ নির্বাচনের আগে এহেন এবডোর প্রহসন গোটা নির্বাচনকেই একটি প্রহসনে পরিণত করবে এবং এতে করে সরকার নিজেই নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা চালাবেন।
বর্তমান সরকার বিদেশী পুঁজিপতিদের স্বার্থে দেশের রাজনীতিকে পুনর্গঠিত করেছেন। ইদানীংকালে দেশে মার্কিন শান্তিবাহিনী আনয়নের যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, তা থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এই চুক্তির ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব বিদেশের কাছে বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেই আজ দেশবাসী মনে করেন।
এটা কেবল বাংলাদেশেই নয়, সাম্রাজ্যবাদের ছত্রছায়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল বেশ কয়েকটি দেশেই আজ সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে সে সকল দেশের জাতীয় প্রগতিশীল অগ্রযাত্রা ব্যাহত করে প্রতিক্রিয়ার দাপট চালাচ্ছে।
কিন্তু তাই বলে সে সকল দেশের গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো তা মেনে নেয়নি, তারা আপোষহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায়, আজ আর আপনাদের মতো সচেতন নেতা ও কর্মীকে বুঝিয়ে বলার দরকার নাই যে, জনা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক স্বার্থ কাদের সাথে একসূত্রে গাঁথা।
সরকারী শিখিয়ে যখন এই অবস্থা, তখন বিরোধী অন্যান্য শিবিরে একটা পোলারাইজেশন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু এদের মধ্যে দু’চারটি দলের কথা বাদ দিলে অন্যান্য সবগুলো দলই হয় চরম দক্ষিণ বা উচ্চবামপন্থী। চরম দক্ষিণরা একটি শিবিরে জোট বাঁধার চেষ্টা করেছে- উগ্র বামরাও তাই।
বলা বাহুল্য, এই উভয় শিবিরেই স্বাধীনতার বিরোধী লোকদের আধিক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে যাঁরা আমাদের সাথে যোগদান করেছিলেন, সে সব মলগুলোও বর্তমানে সাময়িক বিভ্রান্তির বেড়াজাল ছিন্ন করে একটি পোলারাইজেশনের পথে পা বাড়াতে আগ্রহী ।
এমতাবস্থায়, প্রিয় কাউন্সিলর ভাই ও বোনেরা, আজ আপনাদের এখান থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে যেতে হবে যে, প্রস্তাবিত জাতীয় সংসদের নির্বাচনে আপনারা তথা আমাদের এই সংগঠন অংশ গ্রহণ করবে কি, করবে না। আপনাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে জাতীয় রাজনীতির এই সংকটময় মুহূর্তে জাতির স্বাধীনতা আনয়নকারী সংগ্রামী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কোন পথে এগিয়ে যাবে।
মনে রাখবেন, আপনাদের সঠিক সিদ্ধান্তের উপরই নির্ভর করে জাতির এই ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যে ১১ দফা কর্মসূচী পেশ করেছে, তার সাফল্য এবং ব্যর্থতা।
প্রিয় কাউন্সিলর ভাই ও বোনেরা,
জাতীয় রাজনীতির অবস্থা যখন এই, তখন দেশের আইন ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ও ক্রমাবনতি ঘটেছে। সংবাদপত্র সমূহে প্রকাশ না হলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কি উদ্বেগজনক অবনতি ঘটেছে, তা আপনারা সবাই জানেন কারফিউর মাধ্যমে সাড়ে তিন বছর ধরে ঢাকা শহরকে শাসন করা হচ্ছে।
তথাপি খোদ প্রশাসন ঢাকার আইন- শৃঙ্খলার অবনতির কথা স্বীকার করেছেন। পুলিশের উপর সামরিক প্রশাসনের খবরদারী বেসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থার প্রতি আস্থার যে অভাব সাধন করা হয়েছে, আমরা তার প্রতিবাদ করি।
আইন কোন ব্যক্তির খেয়াল খুশীতে নিয়ন্ত্রিত হ’লে আর যাই হোক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না। বিচার বিভাগ স্বাধীন ও প্রশাসনের প্রভাব মুক্ত না হলে মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে। আমরা মনে করি, প্রশাসন সামরিক শাসনের প্রভাব মুক্ত হতে হবে, প্রশাসনের উপর অনিবার্যভাবে গণপ্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে।
বন্ধুগণ,
আজ জাতীয় সংকটপত্র অবস্থার মধ্যে যখন বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে তখন দেশের কারাগারে হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী নির্যাতন ভোগ করছেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগের শত শত কর্মী ও নেতাসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা আজো জেলের অভ্যন্তরে ধুকে ধুকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলছেন।
আমরা আজকের এই দিনে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি তাঁদের সবাইকে ।আমাদের মাননীয় নেতৃবৃন্দের যাঁরা এখনো কারারুদ্ধ তাঁরা সকলেই মুক্তিযুদ্ধের এক একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ।
এঁদের মধ্যে রয়েছেন শেখ আবদুল আজিজ, জনাব আবদুস সামাদ আজাদ, জনাব জিল্লুর রহমান, গাজী গোলাম মোস্তফা, জনাব নুরুল হক, জনাব রহমত আলী, জনাব আবদুল মান্নান (চট্টগ্রাম), জনাব আবদুল জলিল, জনাব মোজাম্মেল হক সমাজী, জনাব আমজাদ হোসেন, জনাব আবদুর রাজ্জাক মুকুল, জনাব আবদুর রহমান, জনাব আশরাফুল ইসলাম, জনাব আবদুল হক সবুজ, জনাব আবদুল মান্নান (শ্রমিক নেতা), জনাব জয়নাল হাজারী, শ্রী রণ বিক্রম ত্রিপুরা, জনাব গোলাম রাব্বান, জনাব এস. এম. ফারুক, জনাব আবদুল কুদ্দুস, জনাব ফজলুর রহমান জিন্নাহ, জনাব হারুন মোল্লা, আবদুল আউয়াল, জনাব হাবিবুর রহমান খান, জনাব শওকত মোমেন শাহজাহান ও শ্রী মুকুল বোসসহ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ ও যুবলীগের অসংখ্য কর্মী ও নেতা।
তিলে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। কল-কারাখানায় শ্রমিক শ্রেণীর মাঝে অসন্তোষ দিন দিন ধূমায়িত হয়ে উঠছে, অথচ এ ছাড়াও দেশের মানুষের জীবনে আজ আর সংকটের অন্ত নেই। অন্তহীন সমস্যায় বিপর্যন্ত হয়ে মানুষ তিলে তাদের কথা বলার অধিকার নেই এই আইনে।
ধর্মঘটের সার্বজনীন অধিকার এখন তাদের নেই। সরকারী নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং এক অসম বেতন কাঠামো আজ চাকুরীজীবী মানুষদের তিলে তিলে দগ্ধ করছে। তাই আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মচারীরা ধর্মঘট করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এরপর সকল বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কের ক সকল সেক্টর কর্পোরেশনের কর্মচারী ধর্মঘট করেন। সরকারী ও বেসরকারী মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকরা তো এখ তাঁদের ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছেন।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও এক নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধুর সরকারের আমলে পেশকৃত ও গৃহীত ড. কুদরত-ই-খুদা কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন না করে তথাকথিত ওয়ার্কশপের মাধ্যমে আসলে এর গণবিরোধী শিক্ষা ব্যবস্থা কায়েম করতে চান। এদিকে ছাত্র বেতন ও বই পুস্তকের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে – হারে।
