ষষ্ঠ অধ্যায় : লোকগাঁথা প্রবাদ-প্রবচন, গান, লেখনীতে তাঁতশিল্প,
ষষ্ঠ অধ্যায় : লোকগাঁথা প্রবাদ-প্রবচন, গান, লেখনীতে তাঁতশিল্প সূচিপত্র

- লোকগাঁথা প্রবাদ-প্রবচন, গান, লেখনীতে তাঁতশিল্প
- সাহিত্য, সংগীত, লোকগাথা, প্রবাদ-প্রবচন ইত্যাদিতে তাঁতশিল্প কিছু খন্ডচিত্র
- জামদানি বয়নের শ্লোক ও দোয়া
- মানাহর বসাকের উপন্যাস
উপসংহার
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পোশাক, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে তাঁতশিল্প। কিন্তু শিল্পের গুরুত্ব, জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী গবেষণা সম্ভব হয়নি। কারণ সাধারণের পরিধেয় কাপড় এর সিংহভাগই এই উৎস থেকে আসে। গবেষক তাঁত সমৃদ্ধ বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের বাসিন্দা। তিনি নিজে এবং সচেতন পাঠক, সরকারি নীতি নির্ধারক, তাঁত সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর বসবাসকারীদের বাংলাদেশের তাঁত শিল্পের বিকাশ ও বিবর্তন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার উদ্দেশ্যে এই গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেছেন। তার গবেষণার যৌক্তিকতা হলো বাংলার বস্ত্র উৎপাদনের যে খ্যাতি তা প্রধানত ঢাকা কেন্দ্রিক।
তাই তিনি বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলকে কেন্দ্র করে এই বিষয়ে কাজ করেছেন। এই গবেষণা সম্পাদন করতে গিয়ে তিনি এই বিষয়ে প্রাপ্ত বই পুস্তক, জার্নাল, লেখনী, শ্লোক, প্রবাদ, গল্প ইত্যাদির সহযোগিতা নিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি তাঁতী, উদ্যোক্তা, মহাজন, সুতা ব্যবসায়ী, কারিগর, ক্ষুদ্র কাপড় ব্যবসায়ী, পাইকারী ব্যবসায়ী ও ভোক্তা অনেকের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে এই গবেষণাকে সমৃদ্ধ করার প্রয়াস পেয়েছে। অভিসন্দর্ভের প্রথম অধ্যায়ে তাঁত শিল্পের বিকাশ ১৯৭১ পর্যন্ত আলোচনা করা হয়েছে। যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁত শিল্প সম্পর্কে জানতে হলে এই অধ্যায় পাঠ করা অত্যন্ত জরুরী। যেমন: তাঁত, তাঁতী, তাঁতশিল্পের উত্তর নিয়ে শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। তাঁত শিল্প বিষয়ক কিংবদন্তী ঐতিহ্য আলোচনা করা হয়েছে। তাঁতশিল্পের সূত্রপাত ও প্রসার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রাচীন যুগ, সুলতানী যুগ, মুগল যুগ, বৃটিশ যুগে তাঁত শিল্পের সংস্কৃতির ইতিহাস, গুরুত্ব, চাহিদা, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্যের দিকগুলো প্রথম অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দেশের মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার একটি বস্ত্র শিল্পে কিভাবে আত্মনির্ভরশীল হওয়া যায় সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে তৎকালীন সরকার অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী হস্তচালিত তাঁত শিল্পের উন্নয়নের গুরুত্ব দেয়। প্রথমে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা বিসিকের মাধ্যমে সরকার তাঁতীদের উন্নয়নে কাজ শুরু করে পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম বোর্ড গঠিত হয় এবং এর মাধ্যমে তাঁতীদের কমদামে তাঁতশিল্পের উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এই অধ্যায়ের শুরুতে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হয়েছে।
তাঁতশিল্প নিয়ে বর্তমান সরকারসহ স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার সমূহের দৃষ্টিভঙ্গী তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত সরকারি-বেসরকারি জরিপ শুমারীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে তাঁত শিল্প সংক্রান্ত আলোচনা বাজেটে গুরুত্ব ও বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড গঠনের বিল উপস্থাপন তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের কার্যাবলী, তাঁত বোর্ডের অধীনস্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ট্রেনিং, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, এসব বিষয়গুলো এই অধ্যায়ে গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করা হয়েছে।
পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এলিট শ্রেণীর নিকট তাঁতে তৈরী বস্ত্র প্রচলন করা ও পৌঁছে দেয়ার জন্য যে সকল প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে যেমন: আড়ং, গ্রামীণ চেক বিবি রাসেল প্রডাকশন, দেশী দশ ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তাছাড়া তাঁতপণ্যকে জনপ্রিয় করা ও নগরে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর মাঝে পৌঁছে দেয়ার জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে মেলা উৎসবের আয়োজন নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁতপণ্যের ডিজিটাল মার্কেটিং সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
মুগল যুগ, কোম্পানী আমলে বৃটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, ইউরোপীয় বিভিন্ন বণিক গোষ্ঠীর ব্যবসা, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বস্ত্র ব্যবসা তৎকালীন ব্যবসা ও পণ্য পরিবহনের মাধ্যম ইত্যাদি তুলে ধরা হয়েছে এই অধ্যায়ে। বর্তমান বাংলাদেশে বৃহত্তর ঢাকার ঐতিহ্য অধুনা মসলিনের রূপ জামদানী কাপড় নিয়ে বিশেষ করে জামদানী I পণ্য হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, বিদেশে রপ্তানি, পশ্চিমবঙ্গে ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে টাংগাইল শাড়িসহ নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জের লুঙ্গি রপ্তানি আলোচিত হয়েছে এই অধ্যায়ে ।
মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপে লুঙ্গি ও গামছাসহ বিভিন্ন তাঁতপণ্যের বিস্তৃত বাহার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এই অধ্যায়ে। সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে তাঁতপণ্য এগিয়ে যাবার একটি চিত্রও উঠে এসেছে এই অধ্যায়ে।
হয়েছে। বাংলাদেশের তাঁতশিল্প সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভের জন্য তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকগুলো সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের শুরুতে আলোচনায় দেখা গেছে তাঁতীরা একই পেশার জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে রয়েছে ভিন্নতা, জাতিভেদ, বিভাজন, অবজ্ঞা, অবহেলা ইত্যাদি।
যেমন হিন্দু তাঁতীদের মধ্যে সম্প্রদায়গত পার্থক্য রয়েছে। এদের শ্রেণী বিভাজনে এসেছে বঙ্গতাঁতী, বসাক তাঁতী, ধামরাইয়া তাঁতী, চৌহাটিয়া তাঁতী, আবার যোগী সম্প্রদায়ের তাঁতীদের মধ্যে রয়েছে দুই ভাগ। সাম্য যোগী ও একাদশী যোগী তাঁতী।
তাদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচরণে রয়েছে বিভক্তি। বিলুপ্ত হিন্দু কাপালি ও কারান সম্প্রদায় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এই অধ্যায়ে। মুসলমানদের মধ্যে যারা জামদানী বোনে তাদের বলা হয়: কারিগর, আবার যারা মোটা কাপড় বোনে তাদের বলা হয় জোলা। জোলা শব্দটি অনেকাংশে তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আবার যারা সাধারণ শাড়ি লুঙ্গি বোনে তাদের বলা হয় তাঁতী বা তাঁত কারিগর।
এই বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে যা থেকে তাঁতীদের সামাজিক দিকগুলো সম্পর্কে অনেক কিছু জানা সম্ভব হবে। একই অধ্যায়ে আদিবাসী তাঁতী, বেনারশী, তাঁতীদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তাঁতীদের দক্ষতা ও যোগ্যতা সম্পর্কে আলোচনার পাশাপাশি অতীতে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক আন্দোলনে তাদের ভূমিকা আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁতীদের সাংস্কৃতিক জীবন বর্তমানে সাধারণ শিক্ষা ও উপশিক্ষার প্রতি ব্যাপকহারে আগ্রহ এবং শিশু শিক্ষার বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছ।
তাঁতশিল্পে পুঁজির প্রভাব, অতীতে কেমন ছিলো, বর্তমানে কিভাবে তা বিদ্যমান তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তাঁত শিল্প ও তাঁতীদের বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ সুবিধাসমূহ এবং আর্থিক সঙ্কটে পেশা পরিবর্তন, দেশান্তর ইত্যাদিও উঠে এসেছে এই অধ্যায়ে ।
ষষ্ঠ অধ্যায়ে তাঁত, তাঁতী এবং তাঁতী সমাজকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন লোকগাথা গান, ছড়া, লেখনী ইত্যাদি। তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো পাঠ করলে তাঁত ও তাঁতীদের জীবন সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাবে।

এই অধ্যায়ে মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, সিরাজগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চলের তাঁত সমৃদ্ধ জনপদের তাঁতীদের মধ্যে প্রচলিত ছড়া, গান কবিতা, শ্লোক, বাউল গান, লোকগান ইত্যাদি উঠে এসেছে। এতে এই গবেষণায় রসবোধ এর একটি চিত্র ফুটে উঠেছে। তাঁতীদের সমাজ জীবন, আর্থিক জীবন, চ্যালেঞ্জ, শিক্ষা, সংস্কৃতি অন্যান্য অধ্যায়ে আলোচিত হলেও এই অধ্যায়ের লেখনী ও উপস্থাপন উক্ত গবেষণাকে সমৃদ্ধ করেছে।
