শায়েস্তা খান

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় শায়েস্তা খান

শায়েস্তা খান

 

শায়েস্তা খান

 

শায়েস্তা খান

শায়েস্তা খানের সুবাদারী বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মীর জুমলার মৃত্যুর পর অস্থায়ীভাবে এ প্রদেশের শাসক ছিলেন বিহারের শাসনকর্তা দাউদ খান। পরে সম্রাট আওরঙ্গজেব শায়েস্তা খানকে বাংলার সুবাদার নিয়োগ করে পাঠান। সম্পর্কের দিক হতে তিনি ছিলেন আওরঙ্গজেবের মামা ও মমতাজ মহলের ভাই।বাংলায় আসার আগে মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত থেকে শায়েস্তা খান শাসনকার্যে যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দেন।

তিনি উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন এবং একজন ভালো যোদ্ধা ও কূটনীতিক হিসেবে তাঁর সুনাম ছিল। বিহার, গুজরাট ও মালবের শাসনকর্তার পদে নিযুক্ত হয়ে তিনি স্বীয় প্রতিভার যে স্বাক্ষর রাখেন সেজন্য মুঘল সিংহাসন লাভের পর সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁকে আগ্রার সুবাদার নিয়োগ করেন। ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে মারাঠা নেতা শিবাজীকে দমনের জন্য সম্রাট তাঁকে দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে পাঠান।

শায়েস্তা খান শিবাজীর রাজধানী পুনা অধিকার করেন এবং মারাঠাদের অনেকগুলো দুর্গ দখল করে নেন। তিন বছর পর সম্রাটের নির্দেশে তিনি আগ্রায় প্রত্যাবর্তন করেন। মীর জুমলার মৃত্যুর পর সুদূর বাংলা প্রদেশে একজন বিচক্ষণ ও দূরদর্শী শাসনকর্তার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে সম্রাট আওরঙ্গজেব শায়েস্তা খানকে বাংলার সুবাদার নিয়োগ করেন। তিনি যখন বাংলায় আসেন তখন তাঁর বয়স ছিল ৬৩ বছর।

এ বৃদ্ধ বয়সে তিনি এখানে নিজে কোন যুদ্ধে অংশ না নিলেও তাঁর পুত্ররা বিভিন্ন যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন এবং শাসন পরিচালনা করেন। একজন অভিজ্ঞ সেনাপতি ও দক্ষ শাসক হিসেবে শায়েস্তা খান সমর নীতি ও শাসন বিষয়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করে বাংলায় সুশাসনের ব্যবস্থা করেন। তাঁর সুবাদারী শাসনকাল দুপর্বে বিভক্ত ছিল। প্রথম দফায় ১৬৬৪ খ্রি: থেকে ১৬৭৮ খ্রি: পর্যন্ত এবং শেষে ১৬৭৯ খ্রি: থেকে ১৬৮৮ খ্রি: পর্যন্ত তিনি বাংলার সুবাদার ছিলেন।

মধ্যে প্রথমে আজম খান কোকা কয়েক মাস এবং তাঁর পরে শাহজাদা মুহাম্মদ আযম এক বছরের অধিক সময়ে এখানে সুবাদারীর দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য যে, শাহজাদা আযম ঢাকার লালবাগ দুর্গের নির্মাণ কাজে হাত দিয়েছিলেন, যদিও তিনি তা শেষ করতে পারেননি।

শায়েস্তা খানের চট্টগ্রাম বিজয়

বাংলায় শায়েস্তা খানের সুবাদারীর অনন্য সাধারণ ও বিশেষ কৃতিত্বপূর্ণ কাজ চট্টগ্রাম বিজয়। স্বাধীন সুলতানি আমলের পরে চট্টগ্রাম দীর্ঘ দিন আরাকানের অধীনে থাকে। সুবাদার ইসলাম খান চিশতী চট্টগ্রাম ছাড়া সারা বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। আরাকানের রাজা তাঁর রাজ্যের সীমান্তে মুঘল শক্তির বিস্তৃতি সুনজরে দেখেনি এবং এ কারণে বার বার সীমা অতিক্রম করে মুঘল এলাকায় হানা দেয় ও লুটতরাজ করে।

আরাকানিদের শক্তিশালী নৌবহর থাকায় মেঘনা অববাহিকার ভিতর দিয়ে ঢাকা পর্যন্ত আসতে তাদের কোন অসুবিধা ছিল না। সে কারণে চট্টগ্রাম জয় করে সুবা বাংলার দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত সুরক্ষিত করা তাঁর কর্তব্য বলে শায়েস্তা খান মনে করেন। দ্বিতীয়ত, আরাকানী মগ ও ফিরিঙ্গী নামে অভিহিত পর্তুগিজ জলদস্যুরা মিলিত হয়ে প্রায়ই মুঘল এলাকায় বিশেষ করে বাংলার দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলে হানা দিত এবং প্রচুর ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করে নিয়ে যেত।

তাছাড়া এরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বহু লোককে বন্দি করে নিয়ে গিয়ে দাসরূপে বিক্রি করতো। মগরা অনেককে আরাকানে নিয়ে পুরুষদেরকে কৃষি কাজে নিয়োজিত ও মেয়েদের দাসী করে তাদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালাতো। এদের নির্যাতন থেকে স্থানীয় জনসাধারণকে রক্ষাও মুঘলদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। উপরোক্ত বিষয় ছাড়াও সুবাদার শায়েস্তা খানের চট্টগ্রাম আক্রমণের অন্য একটি কারণ ছিল।

শায়েস্তা খান বাংলায় পৌঁছার আগে আরাকানের রাজা মুঘল ভূখন্ডের অভ্যন্তরে সামরিক তৎপরতার মহড়া দেন এবং মেঘনা অববাহিকায় মুঘল নৌবাহিনীকে আক্রমণ করে পরাজিত করেন। শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম বিজয়ের জন্য একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। তিনি মুঘল নৌবাহিনীকে পুনর্গঠন এবং নৌশক্তি বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

মগ এবং পর্তুগিজ জলদস্যুদের মোকাবেলার উদ্দেশ্য বহু রণতরী নির্মিত হয় এবং বিভিন্ন স্থান হতে আরো রণতরী সংগ্রহ করা হয়। শায়েস্তা খান দক্ষ নৌ- সেনাপতি নিযুক্ত করে নৌবাহিনীর দায়িত্ব দেন এবং এক বছরের মধ্যে ৩০০ রণতরী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। আরাকান রাজের হাত থেকে সন্দ্বীপ ও চট্টগ্রাম জয় করা এ সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ছিল।

ইতোমধ্যে দিলাওয়ার নামে মুঘল নৌ-বহরের একজন পলাতক নৌ-সেনাপতি আরাকানীদের কাছ থেকে সন্দ্বীপ অধিকার করে সেখানে স্বীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। শায়েস্তা খানের নির্দেশে মুঘল নৌ-সেনাপতি ইবন হোসেন তার নৌ-বহর নিয়ে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে সন্দ্বীপ আক্রমণ করেন। দিলাওয়ার বীরত্বের সঙ্গে বাধা দিলেও শেষে পরাজিত ও বন্দি হন। মুঘল সৈন্যরা সন্দ্বীপ দখল করে নেয়।

এ সময় শায়েস্তা খান কূটকৌশলের সাহায্যে আরাকান অঞ্চলের পর্তুগিজদের তাঁর পক্ষে আনার উদ্যোগ নেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে পর্তুগিজদের সাহায্য ছাড়া আরাকানের মগ নৌ-সেনারা মুঘলদের জন্য তেমন ভয়ের কারণ ছিল না। বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের পর্তুগিজ বণিকদের মাধ্যমে আরাকানের পর্তুগিজদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেন এবং তাদেরকে মুঘল নৌবাহিনীতে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন।

সে কারণে আরাকানের সব পর্তুগিজ এক সঙ্গে ৫০টি জাহাজে করে তাদের সব ধন-রত্ন ও অস্ত্রশস্ত্র সহ মুঘল এলাকায় এসে পড়ে। ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দের ১৯ ডিসেম্বর তারিখে তারা ভুলুয়ায় পৌঁছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বহু ফিরিঙ্গীদের মুঘল নৌবাহিনীতে নিয়োগ করা হয়। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে শায়েস্তা খান ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দের ২৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জয়ের জন্য অভিযান প্রেরণ করেন।

সুবাদারের বড় পুত্র বুজুর্গ উমেদ খান অভিযানের প্রধান সেনাপতি ছিলেন। তিনি স্থলপথে সাড়ে ছয় হাজার সৈন্য নিয়ে চট্টগ্রাম অভিমুখে অগ্রসর হন। নৌবাহিনী পরিচালনা করেন সেনাপতি ইবন হোসেন। পর্তুগিজ ক্যাপ্টেনরা তাদের ৪০টি রণতরী সহ মুঘল নৌ-বহরের সঙ্গে যোগ দেয়। মগ নৌবাহিনী কর্ণফুলি নদীতে মুঘলদেরকে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

কিন্তু ইবন হোসেনের নৌ-সেনাদের প্রবল আক্রমণে আরাকানিরা সম্পূর্ণ পরাজিত হয়ে পলায়ন করে এবং তাদের ১৩৫টি রণতরী মুঘল বাহিনীর হস্তগত হয়। এরপর মুঘলরা নদীপথে চট্টগ্রাম বন্দর অবরোধ করে। একই সময়ে বুজুর্গ উমেদের স্থলবাহিনী চট্টগ্রামের নিকটবর্তী হয়। মাত্র এক দিন যুদ্ধের পর মগ সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করে।

সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খান ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি বিজয়ীর বেশে চট্টগ্রাম দুর্গে প্রবেশ করেন। এখানে অনেক বাঙালি বন্দি ছিল, তাদের মুক্তি দেয়া হয়। চট্টগ্রামের শাসনভার ন্যস্ত করা হয় একজন মুঘল ফৌজদারের ওপর এবং সম্রাটের নির্দেশে এই স্থানের নামকরণ হয় ইসলামাবাদ।

 

কোচবিহার ও সীমান্ত সম্পর্কিত ব্যবস্থা

মীর জুমলা কোচবিহার মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত করলেও তা পরে মুঘল শক্তির হাতছাড়া হয়ে যায়। কোচবিহারের আদিবাসী প্রজারা মুঘলদের প্রবর্তিত রাজস্ব ব্যবস্থার প্রতি বিদ্রোহী হয়ে উঠলে পার্বত্যাঞ্চলে স্বেচ্ছায় নির্বাসিত ও রাজ্যচ্যুত রাজা প্রাণনারায়ণ সে সুযোগে কোচবিহার পুনর্দখল করেন। শায়েস্তা খান রাজমহলে এসেই ঘোষণা দেন যে, তিনি নিজে কোচবিহার পুনরুদ্ধার করে দুর্বিনীত রাজাকে শাস্তি দেবেন।

এতে প্রাণনারায়ণ ভীত হয়ে শায়েস্তা খানের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ স্বরূপ প্রদান করতে রাজী হন। প্রাণনারায়ণের উত্তরাধিকারী মধুনারায়ণ মুঘল সম্রাটকে বার্ষিক দশ লক্ষ টাকা কর দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে তা ভঙ্গ করলে ১৬৮৫ খ্রিস্টাব্দে শায়েস্তা খান তাঁর পুত্র ইবাদত খানকে কোচবিহার অভিযানে পাঠান। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মধুনারায়ণ পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নেন।

কোচবিহার পুনরায় মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত হয় এবং ইবাদত খান এর ফৌজদার নিযুক্ত হন। শায়েস্তা খান পার্শ্ববর্তী পার্বত্য রাজ্যগুলোর হামলা থেকে বাংলা সুবাকে রক্ষার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি কোচবিহারের পশ্চিমে বিহারের পূর্ণিয়া জেলা সংলগ্ন পার্বত্য দেশ মোরং রাজ্যে অভিযান প্রেরণ করেন। মুঘলরা কোচবিহার আক্রমণ করলে সেখানকার পলাতক সেনাপতি ও সৈন্যরা মোরং রাজ্যে আশ্রয় নিতো।

শায়েস্তা খান তা উপলব্ধি করে সে রাজ্য আক্রমণের নির্দেশ দেন। মোরং-এর রাজা পরাজিত হয়ে বশ্যতা স্বীকার করেন এবং নিয়মিত কর দিতে অঙ্গীকার করেন। মীর জুমলার আসাম অভিযানের সময় জয়ন্তিয়ার রাজা মুঘলদের বিরুদ্ধাচরণ করেন এবং শ্রীহট্টে উৎপাত শুরু করেন।

কিন্তু শায়েস্তা খান বাংলায় আসার পর তিনি মুঘলদের বশ্যতা স্বীকার করেন এবং সুবাদারকে হাতি উপহার দেন। ১৬৮২ খ্রিস্টাব্দে জয়ন্তিয়ার রাজা পুনরায় সিলেটে গোলযোগ সৃষ্টি করলে শায়েস্তা খান তাঁর বিরুদ্ধে সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে তাঁকে উপযুক্ত শিক্ষা দেন।

ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে সম্পর্ক

ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সপ্তদশ শতকের প্রথম দিক থেকে ভারতবর্ষে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করলেও বাংলায় বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিলম্ব ঘটে। তারা ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে উড়িষ্যার বালেশ্বর ও হরিহরপুরে প্রথম বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। কিন্তু তখনো বাংলায় তাদের ব্যবসা ছিল খুবই সামান্য এবং এক্ষেত্রে অগ্রগতির তেমন সম্ভাবনা লক্ষ্য করা যায়নি।

বাংলায় ইংরেজ কোম্পানির বাণিজ্যের আকর্ষণীয় পরিবর্তন ঘটে ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দের পরে যখন সুবাদার শাহ সুজা তাদেরকে বার্ষিক মাত্র তিন হাজার টাকার বিনিময়ে বিনা শুল্কে বাংলায় বাণিজ্য করার অধিকার দেন। অবাধ বাণিজ্যের সুযোগ লাভ করে কোম্পানি তাদের ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারণ করতে থাকে।

১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে হুগলীতে, ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে কাসিম বাজার ও পাটনায়, ১৬৬৮ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় এবং আরো পরে রাজমহল ও মালদহ সহ বাংলার বিভিন্ন স্থানে কোম্পানির বাণিজ্য কুঠি স্থাপিত হয়। কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রম এত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায় যে, ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে যেখানে তাদের ব্যবসার মূলধন ছিল মাত্র দশ হাজার পাউন্ড, ১৬৮১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ তা দু’লক্ষ ত্রিশ হাজার পাউন্ডে উন্নীত হয়।

কিন্তু এতদ্‌সত্ত্বেও ইংরেজ কোম্পানি সুজার কাছ থেকে পাওয়া বিশেষ সুবিধার কারণে বাণিজ্য কর হিসেবে বার্ষিক তিন হাজার টাকাই দিতো। এতে মুঘল সরকার ন্যায্য শুল্ক হতে বঞ্চিত হয় এবং রাজকোষের প্রচুর ক্ষতি হয়। তাছাড়া শুল্কের বিভিন্নতা হেতু বাণিজ্যের অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অন্যান্য দেশী ও বিদেশী বণিকেরা। উল্লেখ্য যে, সুজা একজন সুবাদাররূপে ইংরেজদের বিশেষ সুবিধা প্রদান করেছিলেন।

সম্রাট শাহজাহান তাদেরকে এ সুবিধা দেননি। সম্রাট আওরঙ্গজেব সকল ব্যবসায়ীদের ওপর একই হারে শুল্ক নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তিনি ইংরেজ বণিকদের বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা রহিত করেন এবং সকল ব্যবসায়ীর জন্য পণ্য-দ্রব্যের শতকরা ৩.২৫ টাকা হারে শুল্ক ধার্য করেন। এতে ইংরেজ বণিকরা অসন্তুষ্ট হয় এবং তারা শুল্ক ফাঁকি দিতে চেষ্টা করে।

কোন কোন সময় উৎকোচের বিনিময়ে কোম্পানি এবং কোম্পানির কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা চলতে থাকে। ইংরেজ বণিকদেরও মুঘল সরকারের শুল্ক বিভাগীয় কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। শুল্ক আদায়ের জন্য তারা অনেক সময় ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতো, তাদের বাণিজ্য পণ্য ও নৌকা আটক করে রাখতো বা অবৈধ সুবিধা নিত।

১৬৮২ খ্রিস্টাব্দে হুগলীর ইংরেজ কুঠির এজেন্ট উইলিয়াম হেজেস সুবাদার শায়েস্তা খানের নিকট এ জাতীয় অভিযোগ করলে তিনি তা প্রতিকারের আশ্বাস দেন। তথাপি শুল্ক আদায়ের ব্যাপারে মুঘল কর্মচারীদের সাথে ইংরেজদের বিরোধ ও মনোমালিন্য ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ফলে অবস্থা এমন হয় যে, ইংরেজগণ নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য সামরিক প্রস্তুতিও গ্রহণ করতে থাকে।

১৬৮৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ড থেকে সৈন্য ভর্তি কয়েকটি জাহাজ ভারতে পৌঁছে এবং এর তিনটি প্রেরিত হয় হুগলীতে। শায়েস্তা খান এ সংবাদ পেয়ে স্থানীয় ফৌজদারকে হুগলীতে সৈন্য সমাবেশ করার নির্দেশ দেন। মুঘল কর্তৃপক্ষ ও ইংরেজ বণিকদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে ১৬৮৬ খ্রিস্টাব্দে উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায়। হুগলী শহরে তিনজন ইংরেজ সৈন্য আক্রান্ত হবার ঘটনা থেকে এ যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে।

মুঘল ফৌজদার আবদুল গনি হুগলী শহর রক্ষায় সক্ষম হলেও ইংরেজরা এ শহরের অধিকাংশ স্থান পুড়িয়ে দেয়। ইংরেজ সৈন্যবাহিনী আত্মরক্ষার্থে হুগলী ত্যাগ করে সুতানটিতে আশ্রয় নেয়। এখানকার ইংরেজ এজেন্ট জব চার্নক সুবাদার শায়েস্তা খানের সঙ্গে আপোষের চেষ্টা করেন। কোনরূপ সমঝোতা না হওয়ায় ইংরেজরা সুতানটি ত্যাগ করে হিজলীর দিকে চলে যায় এবং হিজলী দুর্গ দখল করে।

শায়েস্তা খান সেনাপতি আবদুস সামাদের অধীনে বার হাজার সৈন্য পাঠান। মুঘল বাহিনীর আক্রমণে টিকতে না পেরে ইংরেজরা হিজলী দ্বীপ ত্যাগ করে মাদ্রাজের পথে চলে যায়। এভাবে শায়েস্তা খান ইংরেজদের ঔদ্ধত্যের শাস্তি দেন। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাণিজ্য তথা বৈদেশিক মুদ্রার গুরুত্ব উপলব্ধি করে তিনি পুনরায় (আগস্ট, ১৬৮৭ খ্রি:) ইংরেজ বণিকদের বাংলায় আসার অনুমতি দেন।

কিন্তু এ সময় ভারতের পশ্চিম উপকূলে মুঘলদের সঙ্গে ইংরেজদের যুদ্ধ বেধে যায়। ফলে শায়েস্তা-খান তাঁর অনুমতি প্রত্যাহার করেন এবং জন চার্নক পুনরায় সুতানটি ত্যাগ করেন। ইংরেজ নৌ-বহরের ক্যাপ্টেন হীথ উড়িষ্যার বালেশ্বর আক্রমণ করে তা দখল করে। তিনি কয়েকটি জাহাজ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর অধিকারের পরিকল্পনা করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান। ইতোমধ্যে ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে শায়েস্তা খান বদলী হয়ে আগ্রায় প্রত্যাবর্তন করেন।

শায়েস্তা খানের কৃতিত্ব মূল্যায়ন

শায়েস্তা-খানের সুবাদারী বাংলার ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। সমসাময়িক ঐতিহাসিকগণ তাঁর যোগ্যতা ও কৃতিত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি ছিলেন একজন সদাশয়, ন্যায়পরায়ণ ও প্রজাহিতৈষী শাসক। প্রজাদের সুখ-শান্তির দিকে তাঁর লক্ষ্য ছিল। তিনি আরাকানী মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচার ও লুটতরাজ থেকে বাংলার অধিবাসীদের রক্ষা করেন। চট্টগ্রাম বিজিত হওয়ার পর ১০ হাজার বাঙালি বন্দি মুক্তি লাভ করে।

শায়েস্তা খান আলেম, সুফি ও উচ্চ বংশীয় অনেককে লাখেরাজ জমি দান করেন এবং বিধবা ও দুঃস্থদের জন্য আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করেন। তাঁর সময়ে বাংলা কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে যথেষ্ট উন্নতি লাভ করে। ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ের শায়েস্তা খানের আমলে বাংলার প্রাচুর্য ও ঐশ্বর্যের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। এ সময়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে শৃক্মখলা ফিরে আসায় বাজারে পণ্য মূল্য হ্রাস পায়।

তাঁর সময়ে খাদ্য-শস্যের মূল্য এত সস্তা হয় যে, টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। চট্টগ্রাম বিজয় ছাড়াও শায়েস্তা খান কোচবিহার পুনর্দখল করে মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত করেন এবং সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তাঁর ভয়ে আসামের রাজা মুঘলদের বিরোধিতা করার সাহস দেখাননি ।

তিনি ইংরেজ বণিকদের ঔদ্ধত্যেরও সমুচিত জবাব দেন। শায়েস্তা খান ঢাকায় অনেক ইমারত নির্মাণ করে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তন্মধ্যে ছোট কাটরা, হোসেনী দালান, চকবাজার মসজিদ, লালবাগ দুর্গের পরী বিবির মাজার, রায়ের বাজারের সন্নিকটে সাত গম্বুজ মসজিদ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

সারসংক্ষেপ

শায়েস্তা খানের সুবাদারী বাংলার ইতিহাসের একটি স্মরণীয় যুগ। মীর জুমলার মৃত্যুর পর বাংলা প্রদেশে একজন দূরদর্শী ও অভিজ্ঞ শাসনকর্তার প্রয়োজন ছিল। এ কথা উপলব্ধি করে সম্রাট আওরঙ্গজেব শায়েস্তা-খানকে বাংলার সুবাদার নিয়োগ করেন। শায়েস্তা খানের আমলে চট্টগ্রাম বিজিত হয় এবং তিনি বাংলার সীমান্ত রক্ষার জন্য পার্শ্ববর্তী রাজ্যের সামন্ত শাসকদের বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণ করেন।

দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সুবাদার শায়েস্তা-খান শিল্প, বাণিজ্য ও কৃষির উন্নতি সাধন করেন। বাংলায় ইউরোপীয় বণিকদের বাণিজ্যিক তৎপরতাকে উৎসাহিত করলেও ইংরেজদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের তিনি সমুচিত জবাব দেন। শায়েস্তা-খান তাঁর সুবাদারী শাসনকালে রাজধানী ঢাকায় অনেকগুলো ইমারত নির্মাণ করে খ্যাতি লাভ করেন। সমসাময়িক ইতিহাস লেখকরা তাঁর যোগ্যতা ও কৃতিত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

সহায়ক গ্ৰন্থপঞ্জী :

১। আবদুল করিম, বাংলার ইতিহাস (১২০০-১৮৫৭ খ্রি.)

২। ড. মুহম্মদ আবদুর রহিম ও অন্যান্য, বাংলাদেশের ইতিহাস।

৩। Muhammed Mohar Ali, History of the Muslims of Bengal, Vol. 1 A.

8 । J.N. Sarkar, History of Bengal, Vol. II.

 

শায়েস্তা খান

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :

১। ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে শায়েস্তা খানের সম্পর্ক বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করুন।

২। শায়েস্তা খানের কোচবিহার ও সীমান্ত সম্পর্কিত ব্যবস্থা বর্ণনা দিন ।

রচনামূলক প্রশ্ন :

১। বাংলার সুবাদার হিসেবে শায়েস্তা খানের কৃতিত্ব আলোচনা করুন ।

২। ইংরেজ ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সুবাদার শায়েস্তা-খানের বিরোধের কারণ ও ফলাফল পর্যালোচনা করুন।

৩। শায়েস্তা খানের চট্টগ্রাম বিজয়ের বর্ণনা দিন।

Leave a Comment