আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও সাধারণ নির্বাচন। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও সাধারণ নির্বাচন

ত্রাণ, পুনর্বাসন এবং পুনর্নির্মাণের কাজে দ্রুত অগ্রগতি বাংলার মানুষের মধ্যে এক গভীর আশ্বাস সৃষ্টি করলো এবং দেশ-বিদেশ থেকে পেল জাতি শ্রদ্ধা তাদের কর্মশক্তির জন্য। জাতির ত্রাণ এবং পুনর্বাসন কাজে এক বিশেষ পর্যায়ে উত্তরণের পর সরকার স্বাধীন বাংলার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। তা হলো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান। কিন্তু সরকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বাহ্নে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২৭-৯-৭২ তারিখের সভায় শাসনতন্ত্র প্রণয়নের পর অবিলম্বে গণ-পরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
এবং একই সভায় সংগঠনকে কলুষমুক্ত করার জন্যে এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, তা হলো যাঁরা দলীয় আচ্ছাদনে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দলীয় আদর্শের পরিপন্থী কাজে লিপ্ত রয়েছেন তাঁদের তালিকা প্রণয়ন করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। দেশের অভ্যন্তরে পুনর্বাসন কর্মসূচীর কাজ চলতে থাকার সাথে সাথে স্বাধীনতার অগ্রসৈনিক আমাদের দলীয় মাননীয় গণ-পরিষদ সদস্যবৃন্দ সংসদের অভ্যন্তরে জাতির জন্য একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নের কাজে দিবারাত্র পরিশ্রম শুরু করেন।
২৫ বছরকাল বাংগালী জাতি একটি শাসনতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে। জাতির জীবন-দলিল পাবার জন্য লাখো মানুষ সহ্য করেছেন অসহনীয় অত্যাচার, নিপীড়ন আর অবর্ণনীয় নির্যাতন। জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সাফল্যের পর বঙ্গবন্ধুর সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে সে সমস্ত মুখ যাঁরা জাতির সঠিক লক্ষ্যপথ নির্ধারণের জন্য চেয়েছিলেন একটি গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র। চেয়েছিলেন শাসনতন্ত্রে স্বীকৃত কতকগুলি অধিকার, জাতীয় প্রগতি, অগ্রগতি এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শের নিশ্চয়তা।
কিন্তু ব্যথাহত ও নিপীড়িত বাংগালী জাতি কোনদিন তা পায়নি। পেয়েছেন অত্যাচার, উপেক্ষা আর নির্যাতন। তাই লক্ষ মানুষের রক্তের পারাবার পেরিয়ে যে জাতির স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল তার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ণয় করা আমাদের গণ-পরিষদ সদস্যদের পবিত্র জাতীয় কর্তব্য হয়ে পড়েছিল। তাই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্বাধীনতার অতি অল্পকালের মধ্যেই শাসনতন্ত্র সম্বন্ধে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহ সংসদের সভায় ১১-১০-৭২ তারিখে বিস্তারিত আলোচনা করা হয় এবং কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী পেশ করা হয়।
দিনরাত পরিশ্রম করে সংবিধান কমিটি একটি খসড়া শাসনতন্ত্র গণ-পরিষদে পেশ করেন। ১২ই অক্টোবর তারিখে তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং নিষ্ঠা জাতীয় ইতিহাসে স্বর্ণোজ্জ্বল হয়ে থাকবে। তাঁরা খসড়া শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে মোট ৭২ দিন বৈঠকে মিলিত হন। গণ-পরিষদে খসড়া শাসনতন্ত্র পেশের দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পার্লামেন্টারী দলের নেতা হিসেবে ঐতিহাসিক বক্তব্য রাখেন।

গণপরিষদে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ জাতীয় ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়। জাতির সুদীর্ঘকালের সংগ্রামের বিশ্লেষণ করে জাতির আশা-আকাংখার নিরিখে আগামী দিনের জাতির কর্তব্য এবং দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান জাতির পিতা। শাসনতন্ত্রের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করেন দেশবাসীর উপর। এগার মাসের রেকর্ড সময়ে শাসনতন্ত্র প্রণীত হয়। গণপরিষদে আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টোতে বিঘোষিত আদর্শ মুজিববাদের ভিত্তিতে রচিত হয় এ শাসনতন্ত্র। দলীয় আদর্শ। শাসনতান্ত্রিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করলো বাংলার মহান গণ-পরিষদে। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি নির্ধারিত হলো জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা।
