শেখ মুবারকের জীবনের শুরু – নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “আকবর” বিষয়ের “শেখ মুবারক” বিভাগের একটি পাঠ। অষ্টম শতাব্দীর সূচনাতেই আরবেরা সিন্ধু ও মুলতান অধিকার করে। তার তিনশত বছর পরে (একাদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে) মাহমুদ গজনবী পাঞ্জাব পর্যন্ত রাজ্যসীমা বিস্তৃত করে লাহৌরে তাঁর রাজ্যপালের রাজধানী স্থাপন করেন। সিন্ধু ও পাঞ্জাব মুসলমানদের দখলে থাকে। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষে কনৌজ, দিল্লী, কালিঞ্জর ইত্যাদি জয় করে প্রায় সারা উত্তর ভারতে তুর্কিরা নিজেদের শাসনব্যবস্থা কায়েম করে। সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগে ইরান আরবদের হাতে চলে যায়। ইরানের সিংহাসন ও উন্নত সংস্কৃতি মরুবাসী আরবদের ও তাদের ধর্মের সামনে মাথা নত করে।
শেখ মুবারকের জীবনের শুরু
আরবরা কেবল বেহেস্তের জন্য নিজেদের ও শত্রুদের রক্ত ঝরায়নি। বেহেস্তের হূর১ ও অপার্থিব ভোগ্যবস্তু অপেক্ষা এ জগতের হূর ও সম্পদ তাদের কাছে অধিক আকর্ষণীয় ছিল। সেই সমস্ত হস্তগত করার জন্য আরব যুবকেরা প্রাণ বাজি রেখে তাদের ঊষর মরুদেশ থেকে বেরিয়ে পড়েছিল।
তারা ইসলাম ধর্ম নিয়ে এসেছিল বলে মনে করার কোনো কারণ নেই যে আরবদেশীয় মুসলমান ও অ-আরব মুসলমান সকলেই বরাবর সমান হয়ে গিয়েছিল। আমাদের দেশে ইংরেজ আমলে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের যে অবস্থানের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, সেই একই অবস্থান ছিল আরবদের সামনে অ-আরব মুসলমানদের।
এটা জাতির অপমান, কিন্তু ইরানে ও ভারতে যে জাতিগুলি সর্বাগ্রে ইসলামের পতাকা-তলে সমবেত হয়েছিল, শতাব্দীর পর শতাব্দী তারা উৎপীড়িত ও নীচ বলেই বিবেচিত হয়েছে। আরবরা চলে যাওয়ার পর বড় জাতিভুক্ত লোকেরাও ধীরে ধীরে তাদেরই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে। এদের প্রতিই বিশেষ নজর ছিল আরব মুসলমানদের, কারণ এরা সংখ্যায় কম হলেও বেশি সাহসী ও বৈদেশিক শাসন- ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক ছিল।
দেশী, বিদেশী কিংবা আরব, অ-আরব মুসলমানদের মধ্যে ভেদাভেদ ইরান ও তুরানেই (মধ্য-এশিয়া) চরম রূপ পরিগ্রহ করেছিল। আরব মুসলমানদের শাসনক্ষমতা সিন্ধু মুলতান পর্যন্তই সীমিত ছিল । মাহমুদ গজনবী তুর্কি ছিলেন । চার দিনের চাঁদনিতে ফরসা সুন্দরীর মতো দশ-পনেরো বছরের জন্য অ-তুর্কি অ-আরবেরা বিজয়ী হিসাবে এসেছিল।
তবু তাদের রাজ্যে আসল শাসক ছিল তুর্কিরাই। দাস, খিলজী, তুগলক—এই তিন তুর্কি রাজবংশই দিল্লীতে মুসলমানদের রাজধানী প্রতিষ্ঠা করে সমগ্র ভারতে সুদৃঢ় মুসলিম শাসন বলবৎ করে। ইরানীরা আসে তার পরে এবং সেজন্য তারা তুর্কিদের ভাষা ও সংস্কৃতিতে অত্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে। তুর্কিরা প্রথমে তুর্কি ও আরবি উভয় ভাষাই ব্যবহার করত।
ভারতে এসে দু’-চার পুরুষেই তারা তুর্কি ভাষা ভুলে ফারসি ভাষাভাষী হয়ে যায়। শেষে মোগল বাদশাহরাও অহঙ্কার করত যে তাদের মাতৃভাষা ফারসি। সেজন্য ভারতের মুসলিম-দরবারে ফারসি-ভাষী ইরানীদের কদর ছিল। আরবরা তখন তো তিনে নেই, তেরোতেও নেই। বড় জোর তাদের কাউকে কাউকে মসজিদের মুয়াজ্জিন কিংবা কারী (কুরান পাঠকারী) হিসাবে কাজে লাগিয়ে দেওয়া হতো। বিদ্যা ও যুদ্ধ উভয়ক্ষেত্রেই আরবরা পিছিয়ে পড়া সত্ত্বেও বিশুদ্ধ তুর্কিরা বাদে বাকি সমস্ত মুসলমানই আরবের কোনো ব্যক্তি বা বংশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কথা বলত। আরব-ব্যক্তি নয়, আরব-রক্তের গুরুত্ব অবশ্যই স্বীকার করা হতো ।
আকবরের সময় পর্যন্ত বিদেশী মুসলমানদের মধ্যে শেখ, সৈয়দ, মোগল, পাঠান ভেদাভেদ স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল। আজকাল শেখদের গুরুত্ব আমরা জানি, কারণ তারা টাকার কুমীর, খান অনেকটা সেইরকমই। তুর্কি ও মোগলদের মধ্যে খান বলা হতো রাজাকে। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বোখারায় বাদশাহ (আমির) ব্যতীত অন্য কেউ নিজের নামের সঙ্গে খান পদবি জুড়তে পারত না। সিংহাসনে বসার আগে যুবরাজও নিজের নামের সঙ্গে খান ব্যবহার করতে পারত না। শেখ সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হতো। শেখের অর্থ ছিল গুরু বা সন্ত পুরুষ।
দেখাদেখি মুসলমানদের মধ্যে যদিও অবিবাহিত সাধু-ফকিরেরও চল হয়, বিশেষভাবে মধ্য এশিয়া ও মধ্য ইরানের বৌদ্ধ প্রদেশগুলি অধিকার করার পর, তবুও, বস্তুত, ইসলাম ধর্মে মঠ-মন্দির সাধু-সন্ন্যাসীর কোনো স্থান নেই । শেখের চল হলো। আমাদের দেশে ব্রাহ্মণ গৃহস্থ-গুরুকে খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখা হতো। বল্লভ বংশের মহাগুরু গৃহস্থ-জীবন যাপনই করতেন। সেই স্থান ইসলামে শেখদের । তাদের পরে স্থান হলো সৈয়দের। পয়গম্বরের নিজের বংশ ও রক্ত- সম্পর্ক রয়েছে সৈয়দদের। মধ্য-এশিয়ায় তাদের খোজা বলা হতো।
মোগলদের আগে বলা হতো তুর্কি। বাবরের বংশ ভারতে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার পর তাদের মোগল নামে ডাকা হতে থাকে । এদের এক প্রাচীন নাম ছিল তুরানী। পূর্বে চীন ও সোভিয়েত মধ্য-এশিয়াকে তুরান বলা হতো, তাই সেখানকার মঙ্গোলিয়ার অধিবাসীরা তুরানী নামে পরিচিত ছিল। দশম শতাব্দীর অন্ত পর্যন্ত পাঠানেরা ছিল খাঁটি হিন্দু। হিন্দু দর্শন ও শিল্পকলায় তাদের অবদান কখনও বিস্মৃত হবার নয়। বৌদ্ধ যোগাচার ও শঙ্কর বেদান্ত উভয়ের আদিগুরু অসঙ্গ পেশোয়ারের পাঠান ছিলেন।
পাণিনি পাঠান পাঠানদের অবদান গান্ধার-শিল্প, এ কথা বলাই বাহুল্য । মাহমুদ গজনবী সর্বাগ্রে কাবুল অধিকার করেন। পাঠানেরা প্রথমে প্রবল সংগ্রাম করে, কিন্তু শেষে ইসলামের পতাকাতলেই তাদের আশ্রয় নিতে হয়। এই বীর জাতি তুর্কি হওয়ার গর্ব অনুভব করতে পারত না, ইসলামী সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানাধিকারী ইরানী জাতিভুক্ত হওয়ার দাবি করতেও অসমর্থ ছিল, তারা আরবও ছিল না। কিন্তু পাঠানদের ছিল তরোয়ালে হাতযশ, সেই ক্ষমতাতেই তারা ভারতে নিজেদের স্থান করে নিয়েছিল । এই চার শ্রেণীর পরে, স্থান হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত মুসলমানদের। তাদের মধ্যে
যারা প্রসিদ্ধ, তারা ইচ্ছা করলেও নিজেদের গোপন রাখতে পারত না। হ্যাঁ, অনেক রাজপুত ও যোদ্ধা জাতি মুসলমান হওয়ার পর নিজেদের নামের সঙ্গে খান যুক্ত করে পাঠানদের মধ্যে নাম লিখিয়েছে, তবু, সেটা অনেক পরের কথা। অন্য মুসলমানদের সামনে দেশীয় মুসলমানদের অবস্থান ছিল অনেকটা ইংরেজ আমলে অ্যাংলো- ইন্ডিয়ানদের মতো, সেকথা আমি আগেই বলেছি। দেশী মুসলমানদের মধ্যে উচ্চ ও নীচ (আশরফ ও আর্জল), দুই শ্রেণীর লোক ছিল।
ইসলাম জাতপাতের ভেদাভেদ নির্মূল করার গর্ব পোষণ করে, তবে ভারতে সেই ভেদাভেদ কখনও নির্মূল হয়নি। সমস্ত মুসলমানদের মধ্যে ভারতে সর্বাধিক সংখ্যক মুসলমান ছিল আর্জল (নীচ), কিন্তু তারা নিজেদের সহধর্মীদের মধ্যে অচ্ছুতের চেয়ে সামান্যই উন্নত বলে গণ্য হতো।
যতদিন না ইংরেজরা দাসপ্রথা তুলে দিয়েছে, ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত, ততদিন মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও কোনো দাস মুক্তিলাভ করেনি। তবে হ্যাঁ, মুসলমানদের মধ্যে, তা বিদেশী হোক অথবা দেশী, আশরফ হোক অথবা আর্জল, এই আত্মাভিমান অবশ্যই ছিল যে তারা ভারতের শাসক। আর্জলরা নিজেদেরকে তাদের হিন্দু স্বজাতিদের থেকে নিশ্চয়ই ভালো অবস্থাতে দেখতে পেত, তার কারণ পেশোয়ার থেকে ঢাকা পর্যন্ত ভূ-ভাগের সমস্ত শিল্পী, বিশেষত তন্তুবায়রা মুসলমান হয়ে গিয়েছিল ।
অবশ্যই কুরান সকল মুসলমানদের মধ্যে সৌভ্রাতৃত্ব ও সমতার কথা ঘোষণা করেছে, কিন্তু পয়গম্বর প্রয়াত হওয়ার পর খুব বেশি দিন তা বজায় থাকেনি। তাঁর জামাতা এবং ইসলামের জন্য সর্বস্ব ত্যাগকারী আলী ভ্রাতৃত্ব ও সমতার কট্টর পক্ষপাতী হওয়ার কারণে তাঁকে সব সময় দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, এবং যদিও চতুর্থ খলিফা হলেন, তা-ও অন্তিম জীবনোৎসর্গের জন্যই। তাঁর দুই পুত্র তথা পয়গম্বরের দৌহিত্র হাসান-হুসেন তাঁদের পিতার আদর্শ অনুসরণ করতে গিয়ে জীবনদান করেন।
শত্রুরা এই বংশের প্রায় সকলের প্রাণ বিনষ্ট করেছিল, কিন্তু একটি বীজ থেকে হাজার হাজার বৃক্ষ জন্মায়, লক্ষ লক্ষ ফল হয়, আর তাই, ফাতেমার বংশানুক্রম সৈয়দদের উন্মুলিত করা সম্ভব হয়নি। তুগলকদের পরে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাওয়া ইসলামী সাম্রাজ্যকে যখন শেরশাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলেন, তখন ইসলামী একতা, সমতা ও সৌভ্রাতৃত্বের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। শেরশাহ ভারতে আগামীকালের পথ-প্রদর্শক ছিলেন। বহু বিষয়, পরে আকবরের সময়ে যা প্রচলিত হয়েছিল, তার সূচনা করেছিলেন শেরশাহ।
তিনিই ধর্মের জায়গায় দেশের মাটির গুরুত্ব মেনে নিয়েছিলেন এবং হিন্দু-মুসলমানকে এক করে তাদের ঐক্য-সূত্রে বেঁধেছিলেন, পরবর্তীকালে আকবর সেই বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে তোলেন। শেরশাহের আমলেই হিন্দু হেমু (হেমুচন্দ্র) শাসনব্যবস্থা ও সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন এবং নিজের প্রভুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার মানসে নয়, বরং পাঠানদের গৃহযুদ্ধ এবং মোগলদের দুর্দমনীয় পরাক্রম দেখেই তিনি দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করে বিক্রমাদিত্য সম্মত হয়েছিলেন ।
হতে শেখ মুবারক— শেখ নাম থেকেই বোঝা যায়— গুরু বংশে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পূর্বপুরুষ অতি প্রাচীনকালে ইয়েমেনের (আরব) অধিবাসী ছিলেন। শেখ মুসার ছয় পুত্রের মধ্যে শেখ খিজির স্বদেশ ত্যাগ করে বিশ্ব-ভ্রমণ এবং মহাপুরুষদের দর্শন সান্নিধ্য লাভের জন্য বেরিয়ে পড়েন, তারপর পঞ্চদশ শতাব্দীতে সিন্ধু কসবা রেলে থাকতে শুরু করেন। সেখানে পীর-মুরিদের ব্যাপার চলতে থাকে। পয়গম্বর মহম্মদ পত্নীর সংখ্যা চার জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে বলেছেন। পরবর্তীকালে ইসলাম ধর্মাবলম্বী বিশ্বাসী পুরুষেরা এই সংখ্যা মেনে চলতেন, অথচ ক্রীতদাসীর সংখ্যা নির্দিষ্ট ছিল না।
এর ফলে বংশবৃদ্ধির মস্ত সুবিধা, মুসলমানের সংখ্যাবৃদ্ধিতে এ বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। শেখ খিজির মুসলিম সাধু-সন্ত ও তাঁদের পবিত্র স্থানসমূহ দর্শনের জন্য রেলের ডেরা গুটিয়ে ভারতে ঘুরতে ঘুরতে নাগৌর পৌঁছলেন এবং সেখানে সশিষ্য পরিবার-সহ বসবাস করতে লাগলেন। তাঁর কয়েকটি সন্তান জন্মের পরই মারা যায় । ১৫০৫ অথবা ১৫০৬ খ্রিস্টাব্দে (হিজরী ৯১১) একটি পুত্রের জন্ম হয়।
পিতা মুবারকও অর্থে তাঁর নাম রাখেন আল্লা, শেষে শেখ মুবারক নামেই প্রসিদ্ধ হন তিনি। যদিও তাঁর যশস্বী পুত্রদ্বয় কবি-সম্রাট ফৈজী ও আকবরের মহামন্ত্রী আবুল ফজলের জ্যোতিতে তিনি দ্যুতিহীন হয়ে পড়েছেন, তবুও যে বীজগুলিকে আমরা বৃক্ষের রূপ ধারণ করতে দেখেছি তাঁর দুই পুত্রের মধ্যে, তাঁদের সমস্ত গুণাগুণই নিহিত ছিল শেখ মুবারকের মধ্যে। চার বছর বয়সেরই তাঁর প্রতিভা চোখে পড়ে। নয় বছর বয়সেই আরবি ও ফারসি ভাষা এবং সুসমৃদ্ধ আরবি-ফারসি সাহিত্যে তিনি যথেষ্ট জ্ঞানলাভ করেন।
চোদ্দ বছরে পৌছতে পৌঁছতেই তিনি তাঁর যোগ্যতার পরিচয় দান করেন। নাগৌরেই শেখ অত্তন নামক এক পণ্ডিত থাকতেন। তিনি ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে কোনো এক সময় তুরান থেকে এসেছিলেন। জাতিতে তুর্কি, কিন্তু তরোয়ালে নয়, বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। সিকান্দার লোদীর আমলে তিনি নাগৌরে এসে বসবাস করতে থাকেন এবং সেখানেই ১২০ বছর বয়সে প্রয়াত হন। মুবারক সেই জ্ঞান-বয়োবৃদ্ধের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পূর্ণ সহায়তা লাভ করেছিলেন ।
সিন্ধুর পতনের কথা শেখ খিজিরের স্মরণ-পথে উদয় হয়। নাগৌরে বেশ ভালোভাবেই দিন কাটছিল তাঁর। ভাবলেন, রেল থেকে নিজের আপনজন ও বন্ধু- বান্ধবদের নিয়ে আসবেন। কিন্তু সেই যাত্রাই মহাপ্রয়াণ হয়ে দাঁড়াল। তিনি আর নাগৌরে ফিরতে পারলেন না। এই সময় মহা দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।
অনাহারে প্রাণ হারাতে থাকে মানুষ। বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালায়। দুর্ভিক্ষে খিজিরের গোটা পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল। অল্প-বয়সী মুবারক ও তাঁর মা সংসারে জীবন-সংগ্রামের জন্যই রয়ে গেলেন। দুর্ভিক্ষ শেষ হলো, মাথার উপর থেকে কালরাত্রি কেটে গেল । মুবারক নাগৌরে যা-কিছু জ্ঞানার্জন সম্ভব, অর্জন করেছিলেন। জ্ঞানের পিপাসা তাঁকে বাইরে পা বাড়ানোর জন্য ব্যাকুল করে তুলত, কিন্তু মাকে একা রেখে যেতে পারেন নি তিনি ৷
শেখ মুবারক তাঁর পুত্র ফৈজী ও আবুল ফজলকে এক পত্রে লিখেছিলেন— “বাছারা, এ যুগের বিদ্বান গম দেখিয়ে যব বিক্রী করে, দুনিয়ার জন্য ধর্ম বিক্রী করে আমাদের উপরই মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করে, তাদের ওই সব কথায় দুঃখ পাওয়া ঠিক নয় এবং আমাদের কৌলীন্যের বিরুদ্ধে যেসব প্রশ্ন তোলে, তার জন্য মনের মধ্যে গ্লানি বোধ করাও উচিত নয়। যখন আমার পিতা ইহলোক ত্যাগ করেন, তখন আমি অবোধ শিশু। আমার মা একজন সম্মানার্হ সৈয়দের ছায়ায় থেকে আমার পড়াশোনা ও শিক্ষার জন্য চেষ্টা করছিলেন। একদিন সৈয়দের প্রতি ঈর্ষা-কাতর এবং প্রতিবেশী নিন্দামন্দ কথায় আমার মায়ের মনে কষ্ট দিয়ে আমার কৌলীন্য নিয়ে আক্ষেপ করেছিল। তাতে মা কাঁদতে-কাঁদতে সৈয়দের কাছে নালিশ জানিয়েছিল ।”
ফৈজী ও আবুল ফজল আকবরের সাম্রাজ্যে যে-মর্যাদা লাভ করেছিলেন, সেজন্য তাঁদের প্রতি ঈর্ষান্বিত ব্যক্তির সংখ্যা কম ছিল না। তারা রটনা করত যে তাঁদের পিতা মুবারক ক্রীতদাসীর সন্তান, তাই তো তার নাম হয়েছে মুবারক । সে সময় ক্রীতদাসদের মধ্যে ওই নামের অধিক প্রচলন ছিল। এই থেকে আরও বোঝা যায় যে শেখ মুবারককে কেবল আর্থিক দুরবস্থার মধ্যেই কালাতিপাত করতে হয়নি, এমনকি তাঁর কঠোর সিদ্ধান্ত-সমূহের জন্য তাঁকে কুৎসিতভাবে লাঞ্ছনা করা হয়েছে। তিনি জ্ঞানের পূজারী ছিলেন।
এই সময় মধ্য-এশিয়ার খোজা আহ্র্রার পরিভ্রমণ করতে করতে ভারতে এসে পৌছান। তাঁর বিদ্যাবত্তা থেকেও লাভবান হওয়ার সুযোগ হয়েছিল শেখ মুবারকের । এই খোজা আর্রার সমরকন্দের মহান সন্ত খোজা উবায়দুল্লা আরার হতে পারেন না, কেননা তিনি দেহত্যাগ করেছিলেন মুবারকের জন্মের পনেরো বছর পূর্বেই, ১৪৯০ খ্রিস্টাব্দের ২০শে ফেব্রুয়ারি সমরকন্দে।
সমরকন্দের খোজা আহ্বার অত্যন্ত পরোপকারী সন্ত এবং মধ্য-এশিয়ার সবচেয়ে বড় ভূস্বামী ছিলেন। কথিত আছে— জনৈক ব্যক্তি গাধার পিঠে চড়ে তুরানী প্রান্তরে উত্তর থেকে দক্ষিণে যাত্র করছিল। শতাধিক মাইল অতিক্রম করল। যখনই সে কোনো শস্যপূর্ণ ক্ষেত্র দেখে ক্ষেতের মালিকের সম্বন্ধে জানতে চায়, অমনি লোকে জবাব দেয়— “এই ক্ষেত খো আারের।”
শেষে বিরক্ত হয়ে সে-ব্যক্তি নিজের গাধাটিকেও ক্ষেতের দিকে তাড়ি দিয়ে বলে— “যা, তুই-ও খোজা আারের হয়ে যা।” অস্তু; কোন খোজা আহ্ (স্বতন্ত্রানন্দ স্বামী), যাঁর কাছ থেকে শেখ মুবারকের জ্ঞান লাভের সুযোগ হয়েছি সমরকন্দী খোজা আর্রারের বাণীর মধ্যে কোথাও কোথাও “দরবেশ পুর্নোদ দর গু” (এক দরবেশ প্রশ্ন করলেন এবং এক দরবেশ জবাব দিলেন) কথাটি যায়। তাতে দরবেশ হিসাবে শেখ মুবারককে গ্রহণ করা যায়। অথচ এটা নিশ্চিত সমরকন্দী আারের সম্মুখে শেখ মুবারক প্রশ্ন করা এবং জবাব দেওয়ার জন্য ত পৃথিবীতে আসেননি ।
মা পরলোক গমন করলেন। শেখ মুবারকের অবদমিত বাসনা আবার তীব্র হয়ে উঠল। সাদী, নাসির খোসরুর মতো বিশ্ব-পর্যটনের ঝোঁক চেপে বসল মাথায়। তৎকালে উত্তরে জৌনপুর বিদ্যা ও সংস্কৃতিতে প্রসিদ্ধ ছিল, সেই রকমই প্রসিদ্ধ ছিল গুজরাতের আহমদাবাদ। নাগৌরেরই বহু লোক সেখানে চলে গিয়েছিল।
মুবারকও সেখানে গিয়ে বিদ্যাচর্চায় মগ্ন হন। ইসলামী ধর্ম ছাড়াও দর্শন এবং সুফীদের (মুসলিম বেদান্তীদের) সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য শাস্ত্রও তিনি গভীর মনোযোগের সঙ্গে অধ্যয়ন করেন। খতীব আবুল ফজল গাজরুনী সিরাজ থেকে গুজরাত এসেছিলেন।
সে-সময়কার তিনি একজন খুব বড় পণ্ডিত ছিলেন। মুবারকের মতো মেধাবী শিষ্য পেয়ে তিনি তাঁকে পুত্রবৎ স্নেহ করেন এবং শিষ্যের কাছে নিজের জ্ঞান-ভাণ্ডার উজাড় করে দেন। আহমদাবাদে পাগল শেখ ইউসুফ নামে এক সন্ত থাকতেন। মুবারক কেবল পাণ্ডিত্যে সন্তুষ্ট ছিলেন না, সেই সন্তের কাছেও যাতায়াত করতেন। শেখ ইউসুফকে সাগর পারে ভ্রমণের কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন— “আগরায় গিয়ে বসে পড়ো। সেখানে যদি তোমার মনস্কামনা পূর্ণ না হয়, তাহলে ইরান-তুরান যাত্রা কোরো।”
