উদ্বোধনী অধিবেশনে সভানেত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –উদ্বোধনী অধিবেশনে সভানেত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

উদ্বোধনী অধিবেশনে সভানেত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ

 

উদ্বোধনী অধিবেশনে সভানেত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ

 

সম্মানিত অতিথিবৃন্দ, আওয়ামী লীগের কাউন্সিলার, ডেলিগেট ভাই ও বোনেরা,

আসসালামু আলাইকুম।

আপনারা আমার প্রাণঢালা অভিনন্দন ও সংগ্রামী শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। একই সঙ্গে আপনাদের মাধ্যমে সমগ্র দেশের অগণিত আওয়ামী লীগ কর্মী, সংগঠক, শুভানুধ্যায়ী এবং দেশবাসীর প্রতি জানাচ্ছি অকৃত্রিম ভালবাসা ও সংগ্রামী শুভেচ্ছা।

ভাই ও বোনেরা,

দেশ ও জাতি এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে, যখন সমগ্র দেশবাসী বিশাল প্রত্যাশা ও স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দিকে তাকিয়ে আছে তখন আমরা আমাদের প্রাণপ্রিয় সংগঠনের ত্রি-বার্ষিক জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে মিলিত হয়েছি। বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে আজকের এই কাউন্সিল অধিবেশন শুধু আমাদের জন্যই নয়, সমগ্র জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ।

আজ এক নতুন পটভূমিতে আমরা এই কাউন্সিলে মিলিত হয়েছি। সুদীর্ঘ একুশ বছর আগে বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচাইতে কলংকজনক বর্বরোচিত রক্তাক্ত ঘটনাবলীর মধ্যদিয়ে জনগণ যে ক্ষমতা হারিয়েছিল; তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ই জুনের অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আবার তা পুনরুদ্ধার করেছে।

অগণিত শহীদের আত্মদান, জনগণের বীরোচিত সংগ্রাম, রক্ত-ঘাম ও ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আবার জনগণের সেবা করার সুযোগ পেয়েছে। স্বৈরশাসকদের দুঃশাসনের অবসান ঘটেছে। এক মুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন।

আজ এই মুহূর্তে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে সর্বপ্রথম স্মরণ করছি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উজ্জ্বল স্মৃতি। মনে পড়ছে তারই সুযোগ্যা সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সহোদর শেখ নাসের, পুত্র ছাত্রনেতা শেখ কামাল, তরুণ সেনা অফিসার শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে।

স্মরণ করছি প্রখ্যাত কৃষক নেতা আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনিকে। শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নৃশংসভাবে নিহত জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এম মনসুর আলী ও এ.এইচ.এম. কামরুজ্জামানকে।

একই সঙ্গে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বিভিন্ন গণ-আন্দোলনে যাঁরা দেশ ও জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন তাঁদের স্মৃতির প্রতি নিবেদন করছি শ্রদ্ধার্থ । আপনারা জানেন, জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সুদীর্ঘ রক্তাক্ত দুর্গমপথ অতিক্রম করতে হয়েছে।

১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সুদীর্ঘ আটচল্লিশটি বৎসর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশের শোষিত-বঞ্চিত, নিগৃহীত-নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য বিরামহীনভাবে আন্দোলন, সংগ্রাম ও লড়াই করেছে, জনগণকে অধিকার সচেতন করেছে, জাগিয়ে তুলেছে,ঐক্যবদ্ধ করেছে, সংগ্রামে নামিয়েছে এবং নেতৃত্ব দিয়েছে।

বাংলা, বাঙালি, বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের জন্য এ সংগঠনের হাজার হাজার নেতা-কর্মী অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা, কষ্ট-ত্যাগ স্বীকার করেছেন, নি নির্যাতন, জেল-জুলুম ভোগ করেছেন, রক্ত-ঘাম-শ্রম মেধা ও জীবন দিয়েছেন। কিন্তু কখনও দেশ ও জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, পিছু হটেননি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছে।

প্রতিষ্ঠার মুহূর্ত থেকে এ’সংগঠন চার দশকেরও অধিককাল নিরস্তর অবিচল লড়াই করে বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশের জনগণের নাড়ীর সাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অবিচ্ছেদ্য রাখী বন্ধন সৃষ্টি করেছে। বাঙালি জাতির হাজার বছরের আরদ্ধ স্বপ্ন-স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জীবনের সর্বস্ব ত্যাগ করে অবিরাম শ্রম-ঘাম-মেধা-সাধনা দিয়ে গ্রাম পর্যায়ে বাংলার ঘরে ঘরে আওয়ামী লীগের শিকড় গেড়েছেন।

 

জ্ঞান-বিজ্ঞান ও চিন্তা-চেতনায় পিছিয়ে পড়া একটি অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সচেতন জাতি সত্ত্বায় বিকশিত ও জাগ্রত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান শুধু তুলনাহীনই নয়, অনন্যসাধারণ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী রেখেছ। বাঙালী করে মানুষ করনি” মিথ্যা প্রমাণ করে বাঙালিকে শুধু মানুষ নয়, বিশ্ব দরবারে অত্যন্ত মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

আপনারা জানেন, মাত্র নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই আমাদের মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। কোন দেশ ও জাতির স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামই হঠাৎ করে একদিনে শুরু হয় না, হতে পারে না। জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রাম এক দীর্ঘস্থায়ী ও বিরামহীন প্রক্রিয়া।

সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, নিপীড়ন-নির্যাতন, জেল-জুলুম-লাঞ্ছনা-গঞ্জনার রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে দীর্ঘ প্রস্তুতির পরই একটি জাতিকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে স্বাধীনতার স্বর্ণ দুয়ারের দিকে অগ্রসর হতে হয়। বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রাম ও হঠাৎ করে একদিনে শুরু হয়নি।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম” এই দৃপ্ত ঘোষণা উচ্চারণ করার জন্য দীর্ঘ চব্বিশটি বছর আন্দোলন করতে হয়েছে, সংগ্রাম করতে হয়েছে, অগণিত সাথীকে জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছে, যৌবনের পনেরটি বছর পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর কারাগারে অমানুষিক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে।

বিদেশী শাসকগোষ্ঠীর সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষের বিষাক্ত ফলের বিষক্রিয়ার বিরুদ্ধে বিরামহীনভাবে চব্বিশ বছর জীবনপণ করে প্রতিমুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঙালিকে স্বাধীনতার জন্য সংগঠিত করতে হয়েছে, প্রস্তুত করতে হয়েছে। এ কাজ শুধু কঠিন ও জটিলই ছিল না, পদে পদে ছিল মৃত্যুর ফাঁদ।

জাতির জনক শুধু নিজেই প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী হননি চব্বিশ বৎসরের অবিরাম শ্রম-ঘাম-ত্যাগ ও সাধনায় প্রায় প্রতিটি বাঙালিকে মৃত্যুঞ্জয়ী চেতনায় উজ্জীবিত করেছিলেন।

সেকারণে তাঁরই ডাকে সাড়া দিয়ে সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে “যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে” শত্রুর বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলেছে মাত্র নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে মাতৃভূমির স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে। তাঁর অবর্তমানে তাঁরই নির্দেশ ও এবং তাঁরই নামে যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে।

বারবার ফাঁসির ঝুঁকি নিয়ে তিনি বাঙালির জয়গান গেয়েছেন মুক্তির কথা বলেছেন। আর সে জন্যই সমগ্ৰ জাতি এই মহামানবকে জাতির জনকের আসনে অধিষ্ঠিত নেতৃত্বে করেছে, হৃদয়ের গভীরে তাকে সমাসীন করেছে। জাতির জনকের সুদৃঢ় নেতৃত্বে সমগ্র জাতি লড়াই করে মাতৃভূমির স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনে তাঁরই সুযোগ্য নেতৃত্বে শুরু করেছিল দেশের পুনর্গঠনের কাজ।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফাঁসির দুয়ার থেকে ফিরে প্রায় শূন্য হাতে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পরিচালনার দায়িত্ব হাতে নিয়ে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে জাতির জনক যেভাবে দ্রুত গতিতে দেশের পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন করছিলেন তা ছিল বিস্ময়কর।

তাঁর এই সাফল্যে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে স্বাধীনতা বিরোধী পরাজিত শক্তি ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট রাতের আঁধারে কাপুরুষের ন্যায় পৈশাচিক উন্মাদনায় সপরিবারে জাতির জনককে নির্মমভাবে হত্যা করে দেশের অগ্রগতির চাকাকে স্তব্ধ করে দেয়।

পরবর্তীতে জেলখানার অভ্যন্তরে গভীর রাতে জাতীয় চার নেতাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে দেশকে নেতৃত্বহীন ও আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চালানো হয়। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, প্রগতি, মানবতা ও মানব সভ্যতা বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল খুনীচক্র রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার মধ্যদিয়ে দেশে শুরু করে হত্যা-ক্যু-ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের রাজনীতি। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দুঃশাসন, দলীয়করণ, সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করে দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রাপ্তে নিয়ে যায়।

ত্রিশ লক্ষ শহীদদের আত্মদান ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত মাতৃভূমির স্বাধীনতার পঁচিশ বৎসর পর আজ যদি আমরা আমাদের দেশের জনগণের দিকে ফিরে তাকাই তাহলে কি দেখি? আমরা কতটা পথ চলেছি, কতদূর অগ্রসর হয়েছি? আমাদের দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম চাহিদা কি নিশ্চিত হয়েছে? না তা হয়নি। শুধু তাই নয়, জনগণ এখনও সেই প্রত্যাশিত লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে রয়েছে। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের কি কোন যুক্তিগ্রাহ্য জবাব আমাদের আছে?

 

উদ্বোধনী অধিবেশনে সভানেত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ

 

আপনারা জানেন, জাতির জনককে হত্যা করে আমাদের দেশের অগ্রগতির চাকা থামিয়ে দেয়া হয়েছে, বিগত বছরগুলোতে আমাদেরকে পিছনে চলতে বাধ্য করা হয়েছে। আমাদের জাতীয় বীরদের বীরত্ব গাঁথা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা ও বীরত্বের স্মৃতি মুছে ফেলা হয়েছে।

ইতিহাস বিকৃতি ও সত্য ভুলিয়ে, আমাদের সন্তানদের দিকভ্রান্ত করা হয়েছে। সৃষ্টির প্রতিযোগিতায় নয়, ধ্বংসের প্রতিযোগিতায় খুব সমাজের মেধা ও শক্তি ক্ষয় করা হয়েছে। চিন্তা-চেতনা, মন ও মননে আধুনিকতা নয়, পশ্চাৎপদতা, ঐকা নয় বিভেদের বিষবাষ্প ছড়িয়ে কলুষিত করা হয়েছে।

Leave a Comment