সক্রিয় রাজনীতিতে নারী : ১৯২০-১৯২৯

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় সক্রিয় রাজনীতিতে নারী : ১৯২০-১৯২৯ |

সক্রিয় রাজনীতিতে নারী : ১৯২০-১৯২৯

 

১৯১১-তে বঙ্গভঙ্গ রদ-এর মধ্যদিয়ে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন সমাপ্ত হবার পর অবিভক্ত বাংলা তথা সময় বৃটিশভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে কিছুটা স্থবিরতা দেখা যায়।

পরবর্তীকালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে ভারতীয় রাজনীতি পুণরায় সজিনা রূপ পরিগ্রহ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ উপলব্ধি করতে পারলেন যে, বৃটিশ সরকার তাদের প্রতিশ্রুত রাজনৈতিক সংস্কার করবে না এবং স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ভারতবাসীদের দেয়া হবে না।

১৯১৯-এ মন্টেগু-চেমসফোর্ড রিপোর্টের সুপারিশের ভিত্তিতে বৃটিশ পার্লামেন্টে Government of India Act পাশ হয়। এই আইনে ভারতীয়রা বিভিন্ন প্রদেশের জন্য প্রাদেশিক আইনসভা লাভ করে, যে সভা কেবল শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি বিষয়ক সিদ্ধান্ত দেবার অধিকার রাখত।

এই সিদ্ধান্তকে উপনিবেশিক সরকার উপেক্ষা করতে পারত। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এই সংস্কার আইন খুশি মনে মেনে নেয় নি। একই সময়ে রাওলাট এ্যাক্ট পাশ করা হয়, যাতে করে বৃটিশ পুলিশকে কোন প্রকার পূর্ব অনুমতি ছাড়াই যে কাউকে আটক ও বিচার করবার অধিকার দেয়া হয়।

ভারতীয়রা একে মানবাধিকারের লংঘন এবং তাদের জন্য অপমানজনক হিসেবে গণ্য করলেন। স্বদেশী আন্দোলন বাংলায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এবার দেখা গেলো সম্পূর্ণ ভারতবর্ষ জুড়ে প্রতিবাদ-আন্দোলন শুরু হলো। পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে এপ্রিলের ১৩ তারিখে জেনারেল ও ডায়ার নিরন্ন মানুষের এক সমাবেশে গুলি চালিয়ে অসংখ্য মানুষ হত্যা করে।

এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ভারতের সব প্রদেশের নেতৃবৃন্দ সোচ্চার হলেন। বাংলায় রবীন্দ্রনাথ এর প্রতিবাদে নাইট উপাধি বর্জন করেন। এসময়ে সরোজিনী নাইডু ইংল্যান্ডে অবস্থান করছিলেন। তিনি সেখানে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিভিন্ন জনসভায় বক্তব্য রাখেন।

তিনি ভারতসচিব মন্টেগু-এর সঙ্গে এ প্রসঙ্গে বিতর্ক করেন এবং নিজ বক্তব্যের সপক্ষে কংগ্রেস। রিপোর্ট থেকে প্রমাণ উপস্থাপন করেন। ১৯২০-এ কলকাতা কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে এবং নাগপুরের বার্ষিক অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধী প্রস্তাবিত অহিংস-অসহযোগ প্রস্তাব গৃহীত হয়।

এই প্রস্তাব পাশ করার মাধ্যমে বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের নতুন পর্যায় শুরু হয়। বাংলার রাজনীতিও পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। চিত্তরঞ্জন দাস বাংলায় ফিরে আসেন এবং আইন ব্যবসা ছেড়ে গান্ধী প্রবর্তিত অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই প্রেক্ষাপটে বাংলার নারীদের রাজনৈতিকায়নের দ্বিতীয় পর্যায়ের সূত্রপাত ঘটে।

১৯২০-এর বৃটিশবিরোধী এই গান্ধীবাদী আন্দোলনে বাঙালি মহিলাদের যোগদানের ক্ষেত্রে তিনটি পৃথক বৈশিষ্ট উল্লেখ করেছেন ভারতী রায়, প্রথমত, দেশপূজার সঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলনের একাত্মকরণ এবং শক্তি ও নারীশক্তির জাগরণের বন্দনা এই পর্বে এসেও চলতেই থাকে, যার ফলে মহিলাদের যোগদান সহজ হয়ে ওঠে।

যার উদাহরণ হিসেবে দেখা যায় দৈনিক বসুমতীতে ১৯২১-এর ডিসেম্বরে বলা হয় “হিন্দুশাস্ত্রে বলা হয়েছে যে অনাচারের অবসান ঘটাতে যখন দেবশক্তি সক্ষম হয় নি একমাত্র নারীশক্তিই তখন সাফল্য লাভ করেছে।

” এ বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশের কোন অবকাশ নেই যে, বৃটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে ধর্মের সংযোগ ও সহঅবস্থান বাংলার নারীদের জন্য এই আন্দোলনে যোগদানের পথ প্রশস্ত করে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় নেতারূপে গান্ধীর উত্থান মহিলাদের যোগদানকে সাহায্য করে। সুচেতা কৃপালনির সূত্রে ভারতী রায় উল্লেখ করেন, “গান্ধীর চরিত্র ছিল মহৎ।

মহিলারা যখন ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল এবং রাজনীতির মঞ্চে কাজ শুরু করল, পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধতার মুখোমুখি তাদের হতে হয় নি কারণ তারা জনত যে মহিলারা সুরক্ষিত।

” তৃতীয়ত, “আলোচ্য সময়সীমার মধ্যে বাংলাদেশে চিত্তরঞ্জন দাস ও বিপিনচন্দ্র পালের মত জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক নেতা এবং বাসন্তীদেবী ও হেমপ্রভা মজুমদার-এর মত নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক চেতনাসমৃদ্ধ মহিলাদের উত্থান ঘটে। মহিলা নেতৃবৃন্দ নারীদের অন্দরমহলে প্রবেশাধিকার লাভ করেন, তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতার বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করেন।

২ বাঙালি তথা সমগ্র ভারতীয় নারীর রাজনৈতিয়ায়নের দ্বিতীয় পর্যায়ে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে মহাত্মা গান্ধীর উত্থানকে সবচেয়ে কার্যকর সূচক হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। গান্ধীবাদী রাজনৈতিক দর্শন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গান্ধীর উপলব্ধি ছিল অহিংস নীতিকে ভিত্তি করে দেশব্যাপী বিস্তৃত একটি শক্তিশালী
গণআন্দোলন-এর মধ্যদিয়ে জনগণকে সক্রিয় করে বৃটিশ রাজশক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব।

গান্ধীর রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশ্বাস ছিল বৃটিশ শাসন-এর বিপরীতে স্বাধীনতা অর্জন অল্প সময়ে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে সম্ভব হবে না, তাঁর কৌশল ছিল গঠণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করার মধ্যদিয়ে গণমানুষের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ স্থাপন করা।

তিনি যে গঠণমূলক কর্মসূচির ধারণা তৈরি করেন সেই কর্মসূচি মানব জীবনের দুইটি দিককে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করা হয়। একটি তার বহির্জগৎ, যেখানে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, দ্বিতীয়টি ব্যক্তির আধ্যাত্মিক জগৎ যা ব্যক্তির আদর্শ এবং নৈতিকতা নিয়ন্ত্রণ করে। গান্ধীজী প্রবর্তিত অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন ভারতীয়দের এই দুই ধারায় উন্নয়নে সচেষ্ট ছিল।

গঠনমূলক কর্মসূচিকে গান্ধীজী অধিক গুরুত্ব দেন কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন তাঁর প্রণীত গঠনমূলক কর্মসূচি আন্তরিকতার সঙ্গে অনুসরণ করলে বৃটিশবিরোধী প্রত্যক্ষ সংগ্রামের কোন প্রয়োজন হবে না এবং এই আন্দোলনের বিশেষ দিক ছিল এতে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রণের সুযোগ তৈরি করা হয় এবং বাংলাসহ সম্পূর্ণ ভারতের নারীরা এতে সাগ্রহে এবং সানন্দে শরিক হন।

দেশমুক্তির মাধ্যমে নারীমুক্তি এই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে গান্ধীজী মনে করতেন অহিংস আন্দোলন-এ অংশগ্রহণের মাধ্যমে মেয়েরা দেশের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করলে তাদের নিজেদেরও মুক্তি আসবে এর বিপরীতে তাদের মুক্তি না এলে দেশের মুক্তি সম্পূর্ণ হবে না।

তবে এক্ষেত্রে যে বিষয়টি লক্ষণীয় সেটি হলো, মেয়েদের মুক্তি বলতে গান্ধী তাদের গৃহজীবনকে তাৎপর্যময় করে তোলা এক পরিপূরক কর্মজীবনের কথা বলেছিলেন, যে কারণে তাঁর আঠারো দফা গঠনমূলক কর্মসূচীর মধ্যমণি ছিলো চরকা-যা নারীর গার্হস্থ্যকর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এই অহিংস অসহযোগ আন্দোলনেও নারীর ভূমিকা নির্ধারিত হয় সমাজের ঐতিহ্য ও নারীর চিরায়ত ভূমিকা অনুসারে।

গান্ধীজী অভিমত পোষণ করলেন যে সমভাবেই সত্য যে আকৃতিতে উভয়ের মধ্যে জন্মগত পার্থক্য আছে। সুতরাং উভয়ের বৃত্তিও পৃথক হওয়া দরকার। যে মাতৃত্বের দায়িত্ব অধিকাংশ নারীকে গ্রহণ করতেই হবে তার জন্য যে সব গুণের প্রয়োজন তা পুরুষের না থাকলেও চলে। আবার পুরুষ যেখানে সক্রিয়, নারী সেখানে নিষ্ক্রিয়। সে মুখ্যতঃ গৃহকর্ত্রী। পুরুষ আহার্য সংগ্রহ করে নারী তা সংরক্ষণ ও বিভাজন করে। ভাষাগত অর্থেই নারী তত্ত্বাবধায়িকা।

— আমার মতে নারীকে গৃহত্যাগী করে সেই ঘর রক্ষা করার জন্য তাকে বন্দুক ধরতে আহ্বান করা বা প্রবুদ্ধ করা নর ও নারী উভয়ের পক্ষেই লজ্জাকর। এ অসভ্যতায় প্রত্যাবর্তন ও বিনাশের সূচনা করে। যে ঘোড়ায় পুরুষ আরোহন করে আছে তাতে আরোহী হবার চেষ্টায় দুজনেই পড়ে যায়। নিজের সাথীকে তার বিশেষ বৃত্তি ত্যাগ করতে জোর করা বা প্রলুব্ধ করার অপরাধ পুরুষের ওপরেই পড়বে।

পরবর্তী সময়ে দেখা যায় একজন আমেরিকান মহিলার প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “নারীর উপযুক্ত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আমি বিশ্বাস করি। এও আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে নারী পুরুষের সঙ্গে দৌড়ের প্রতিযোগিতা করে বা তার ভাবভঙ্গি নকল করে জগতে কোন অবদান করতে পারবে না। প্রতিযোগিতা সে করতে পারে কিন্তু পুরুষের ভাবভঙ্গির নকল করে সে তার অধিগম্য শীর্ষস্থানে পৌঁছুতে পারবে না। তাকে পুরুষের পরিপূরক হতে হবে।

দেখা যাচ্ছে যে, মহাত্মা গান্ধী সমাজে নারীর অবস্থান সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের বিরোধী ছিলেন। তবে নারীর অবস্থান উন্নয়নের জন্য গঠনমূলক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেও নারীর কাজের নির্দিষ্ট গণ্ডিতে তিনি বিশ্বাস করতেন।

কাজেই তিনি ভারতীয় নারীদের কাছে সীতার উদাহরণ তুলে ধরলেন এবং তাদেরকে সীতার আত্মত্যাগ ও স্বামীর প্রতি আনুগত্যের প্রেরণায় নিজেদের জীবন পরিচালনা করবার জন্য উৎসাহিত করলেন। ৪ সেপ্টেম্বর ১৯২০-এ ডাকোর অঞ্চলে মহিলাদের এক সমাবেশে গান্ধী তাদের উদ্দেশে বলেন

We can set ourselves free this very day if India adopts swadeshi, if all women take to the good old spinning-wheel and if they put on clothes made only with yarn spun by themselves. To the women of the past, virtue was beauty. — what is our image of Sta and Damyanti, whom we adore? Is it that of women clad in finery?

We revere Damayanti who wandered in the forest, half-clad, and Sita who suffered vanavasa for fourteen years. if you want to follow your dharma, you must first understand the swadeshi dharma. It consists in using cloth made with yarn spun by yourselves and woven by your menfolk. singing as they work. — when the women in the country have woken up, who can hinder Swaraj? Dharma has always been preserved through women.

Nations have won their independence because women had brave men for sons. By preserving purity of character, they have kept dharma alive. There have been women who sacrificed their all and saved the people. When women, who have done all this, have become alive to the suffering of the country, how long can that suffering last? *

গান্ধী বিশ্বাস করতেন নারী প্রকৃতিপ্রদত্ত নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এবং দুঃখ গ্রহণের অসীম ক্ষমতার অধিকারী আর তাই বৃটিশবিরোধী অহিংস আন্দোলনে নারীর এই আত্মত্যাগের শক্তিকে ব্যবহার করার কথা তিনি বলেন, তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল

to call women the weaker sex is a libel; it is man’s injustice to women. If by strength is meant brute strength, then indeed is a women less brute than man. If by strength is meant moral power then women is an immeasurably man’s superior. Has she not great intuition, is she not more self-sacrificing, has she not great powers of endurance, has she not great courage? Without her, man could not be. If non-violence is the law our being, the future is with women.

এভাবে দেখা যায় ধর্মীয় ব্যাখ্যা প্রদান এবং নারীর প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসূচি প্রদানের কারণে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনে মহিলাদের অংশগ্রহণ সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে যেমন বৃদ্ধি পায় তেমন অংশগ্রহণের প্রকৃতিও সক্রিয় হয়।

অসহযোগ আন্দোলনের সবচাইতে বড় সাফল্য ছিল এতে বিভিন্ন প্রদেশের নারীদের সম্পৃক্ততা। তারা একদিকে মিছিল-মিটিং-এ যেমন অংশ নেয়, তেমন খাদি ও চরকা প্রচলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ঐতিহ্য অনুসারে নির্ধারিত নারীর ভূমিকার নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ কর্যক্রম দেয়া স্বত্ত্বেও একথা অনস্বীকার্য যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে গান্ধীজীর নেতৃত্ব নারীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করে। এ প্রসঙ্গে অরুণা আসফ আলী বলেন

Gandhiji’s appeal was something elemental. At last, a women was made to feel the equal of man; that feeling dominated us all, educated and non-educated. The majority of women who came into the struggle were not educated or westernised. — The real liberation or emancipation of Indian women can be traced to this period,—- No one single act could have done what Gandhiji did when he first called upon women to join and said:

“They are the better symbols of mankind. They have all the virtues of a satyagrahi. All that puffed us up enormously and gave us a great deal of self- confidence.

কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পটভূমিতে গান্ধীজীর অনুপ্রেরণা প্রসঙ্গে বলেন, “and from the time Gandhiji’s leadership arose, I became much more attracted towards the political question. Before that of course I was reading so much about the other leaders and about the political question — but there was a difference in the message that he bought to me.”

বিশ শতকের বিশের দশকে বাঙালি নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রকৃতি বিশ্লেষণে যে ধারাগুলি দেখা যাবে তা হচ্ছে-

১. কংগ্রেসের নেতৃত্বে নিয়মতান্ত্রিক অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনে নারীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় অংশগ্রহণ।

২. ভোটাধিকারের দাবীতে নারীর আন্দোলন।

৩. লীলা রায়ের নেতৃত্বে “দিপালী সংঘ’-এর প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে নারীর বিপ্লবী আন্দোলনে অংশ নেয়ার পথ প্রশস্ত হয়।

৪. এই পর্যায়ে ছাত্রী সংগঠনের অধীনে ছাত্রীরা আন্দোলনে এগিয়ে আসে।

৫. এই পর্যায়ে খিলাফত আন্দোলন শুরু হবার ফলে মুসলিম সমাজ বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হলে স্বল্প মাত্রায় হলেও মুসলিম নারীর রাজনৈতিকায়ন শুরু হয়।

৬. কমিউনিষ্ট পার্টি গঠিত হবার পর এই দশকে শ্রমিক আন্দোলনে বাংলার নারীর সীমিত আকারে অংশগ্রহণ ।

রাজনৈতিকায়নের দ্বিতীয় পর্যায়ে বাঙালি নারীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ন্ত্রিত হয় কংগ্রেসের মাধ্যমে। ১৯২০ সালের কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলীর নেতৃত্বে গঠিত হয় “নারী স্বেচ্ছাসেবিকা বাহিনী”।

সংঘবদ্ধভাবে বাঙালি নারীর প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এই প্রথম। ১০ ১৯২০-এ কলকাতায় গান্ধীর বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হন রেনুকা রায় সহ ডায়োশেসান কলেজের ছাত্রীরা। তাঁরা তাঁদের অলংকার গান্ধীকে প্রদান করেন এবং রেনুকা রায়সহ তাঁদের অনেকে কলেজ ত্যাগ করে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন।” বাংলায় অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্ব চিত্তরঞ্জন দাস গ্রহণ করলে তাঁর সাথে এগিয়ে আসেন তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবী।

বাসন্তী দেবীর রাজনীতিতে যোগদান বাংলার নারীদের রাজনৈতিকায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। অসহযোগ আন্দোলনের সময় বাংলায় মেয়েদের আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ-এর স্ত্রী বাসন্তী দেবী ও বোন উর্মিলা দেবী। বাসন্তী দেবী স্বামীর সঙ্গে অবিভক্ত বাংলার বহু জেলা ভ্রমণ করেন এবং সর্বত্রই মেয়েদের নিয়ে সভা, শোভাযাত্রা করেছেন, সুতোকাটা এবং স্বদেশী জিনিস প্রচারে উদ্বুদ্ধ করেছেন, একই সঙ্গে মেয়েদের কংগ্রেসে যোগদানের জন্য আহ্বান জানাতেন।

কলকাতায় বিভিন্ন বিদেশী পণ্য বিক্রয়কেন্দ্রে মেয়েদের পিকেটিং-এ নেতৃত্বও দেন বাসন্তী দেবী। এ সময়ে কলকাতায় স্বেচ্ছাসেবকবাহিনী নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় এবং স্বেচ্ছাসেবকদলের নেতা-কর্মীরা কারারুদ্ধ হতে থাকে ।

নারীরা পুরুষের স্থান পূরণে এগিয়ে আসে, ১৯২১ সালের ৭ ডিসেম্বর কলকাতার রাস্তায় আইন অমান্য করে খদ্দর বিক্রি করবার সময় বাসন্তী দেবী, উর্মিলা দেবী ও সুনিতী দেবীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। আইন অমান্য আন্দোলনে বাংলায় নারীদের গ্রেফতার হবার ঘটনা এই প্রথম। তাঁদের লালবাজারে নেয়া হলে তাঁরা কোনোরকম মুচলেকা দিতে অস্বীকার করেন এবং জামীনে মুক্ত হতেও অস্বীকৃতি জানান।

১২ জনগণের তীব্র বিক্ষোভে পুলিশ তাদের সেই রাত্রেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এ প্রসঙ্গে উর্মিলা দেবী মন্তব্য করেন, “আমাদের মনে হয়েছিল লড়াইয়ের মধ্যে মেয়েদের অন্তর্ভুক্তি ও একে কিছুটা গতি দেওয়া উচিত…। অবশিষ্ট মেয়েদের সামনে আমরা একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করলাম, আমাদের গ্রেফতার প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়াটিকে জন্ম দেয়।

১৩ এই বক্তব্য থেকে বলা যায় এই পর্যায়ে এসে নারীর বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের নেপথ্যে রাজনৈতিক আন্দোলনকে গতিশীল করবার সাথে সাথে নারীদের আন্দোলনে নিয়ে আসা এবং তাদের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন একটি মুখ্য প্রণোদনা হিসেবে কাজ করেছে।

অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনে বাংলার নারীদের এই গ্রেফতার ও কারাবরণের ঘটনা সমগ্র ভারতবাসীর কাছেও একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলার নারীরা অসহযোগ আন্দোলনে তাদের জন্য নির্ধারিত এবং প্রত্যাশিত ভূমিকাকে অতিক্রম করলো এই গ্রেফতার হবার মাধ্যমে এবং পুরুষের বিকল্প বা সহযোগী হিসেবেই কেবল নয় বরং সমান ভূমিকায় নিজেদের নিয়ে আসতে সক্ষম তা প্রমাণিত হয় এবং নেতৃবৃন্দও তা মেনে নিলেন।

১৫ ডিসেম্বর ১৯২১-এ ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকায় গান্ধীজী স্বয়ং লিখলেন,আমার আশা ছিল যে অন্ততঃপক্ষে প্রথম দিকে মহিলাদের কারাবরণ করার সম্মান থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে।… কিন্তু বাংলা সরকার স্ত্রী-পুরুষের বৈষম্য না করার নিরপেক্ষ উৎসাহে কলকাতার তিনটি মহিলাকে এই সম্মান দিয়েছে। সমস্ত দেশ এই নতুন প্রবর্তনাকে সাদরে গ্রহণ করবে বলে আমি আশা করি। পুরুষের মত ভারতীয় নারীরও স্বরাজ অর্জনে সমান অধিকার আছে।

সম্ভবতঃ এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নারী পুরুষকে অনেক পেছনে ফেলে যাবে।… এখন যখন বাংলা সরকার মহিলাদের সংগ্রামের পুরোভাগে টেনে এনেছে আমি আশা করি যে ভারতের সর্বত্র নারীজাতি এই আহ্বানে সাড়া দেবে, আর নিজেদের সংগঠিত করবে। যাই হোক না কেন পর্যাপ্ত সংখ্যায় পুরুষেরা চলে গেলে মহিলাদের আপন সম্মান রক্ষার জন্য তাদের শূণ্যস্থান গ্রহণ করতেই হতো, কিন্তু এখন পুরুষের সঙ্গে পাশাপাশি থেকে কারাজীবনের কষ্ট ভাগ করে নিতে হবে।

… ভারতীয় নারীদের কাছে আমি এই প্রস্তাব করতে চাই যে তারা যেন নীরবে ও কালবিলম্ব না করে এখুনি সংগ্রামের পুরোভাগে আসতে ইচ্ছুক নারীদের নাম সংগ্রহ করেন। আর বাংলার রমণীদের কাছে যেন তারা তাদের আগ্রহের কথা জানান, যাতে তারা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন যে অন্যত্র তাদের বোনেরা তাদের মহৎ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে প্রস্তুত |

বাসন্তী দেবীদের গ্রেফতারের ঘটনার তিনদিন পরে ১০ ডিসেম্বর ১৯২১ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ গ্রেফতার হন। তাঁর অবর্তমানে বাংলার কথা পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন বাসন্তী দেবী।

স্বামীর অনুপস্থিতিতে ১৯২২-এর এপ্রিল মাসে চট্টগ্রামে যে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তাতে সভাপতিত্ব করেন বাসন্তী দেবী। এই সম্মেলনে মহিলা শ্রোতাদের উপস্থিতির সংখ্যা অতিক্রম করে পূর্বেকার সমস্ত রেকর্ড। পত্রিকায় এ প্রসঙ্গে বলা হলো “এ ঘটনার কারণ কি একজন মহিলার সভাপতিত্ব গ্রহণ না বাঙালী নারীর রাজনৈতিক জাগরণ “১৫ আরো দুটো বৈশিষ্ট্য সনাক্ত করেছিলেন সমকালীন পত্রপত্রিকা –

এক : প্রথমবারের মত কংগ্রেস সম্মেলনে একজন বাঙালি নারীর সভাপতিত্ব।

দুই: পিতৃতান্ত্রিক অবদমনের চিরায়ত সামাজিক কাঠামো ভেঙ্গে আত্মশক্তি অনুধাবনের মনস্তাত্ত্বিক আবেগ। ১৬ তবে বাসন্তী দেবী এই অধিবেশনে তাঁর বক্তব্যে বাংলার নারীদের জন্য বিশেষ কোন কর্মপন্থা নির্দেশ করেছিলেন কিনা সে বিষয়টি জানা যায় না, বরং তিনি গান্ধীর অসহযোগ প্রস্তাব কিছুটা সংশোধন করে কাউন্সিলে প্রবেশকে অসহযোগের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করে বলেন এই সমস্ত কার্যের সুবিধার জন্য চারিদিকে গ্রাম্য সমিতি স্থাপন করিয়া দেশটাকে ছাইয়া ফেলিতে হইবে।

ইউনিয়ন কমিটি, লোক্যাল বোর্ড, জেলা বোর্ড, মিউনিসিপ্যালিটি প্রভৃতি এই সকল সমিতির সাহায্যে নিজেদের হাতে আনিতে হইবে এবং সেইগুলির সাহায্যে জাতীয় ভাব প্রচার করিতে হইবে। আবশ্যক হইলে কাউন্সিল পর্যন্ত দখল করিতে হইবে। কাউন্সিলে আসিয়া অসহযোগ আন্দোলন পরিচালনা করাই আমাদের উদ্দেশ্য হইবে।

যতদিন না আমাদের প্রাপ্য অধিকার স্বীকার করা হয়, ততদিন ভালমন্দ সমস্ত বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে বাধা দেওয়াই হয়ত আমাদের কাউন্সিলের কাজ হইবে। ভরসা করি জাতীয় মহাসমিতির আগামী অধিবেশনে এই বিষয় ভাল করিয়া বিবেচিত হইবে।

এখানে নারীর জন্য সুনির্দিষ্ট কোন কর্মপন্থা দেখা যায় না। তবে সার্বিকভাবে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের এই পর্বে বাঙালি নারীর অংশগ্রহণ বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে একটি ভিন্নমাত্রা যোগ করে এবং ইংরেজ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জন্য এই নারী সত্যাগ্রহীদের মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে ওঠে, কেননা বাঙালি নারীর যে ভূমিকা এতকাল প্রতিষ্ঠিত ছিল এবার তার বিপরীত দেখা গেলো।

নারীর চিরপরিচিত রূপে এই পরিবর্তনকে প্রতিহত করবার উপায় হিসেবে প্রশাসন তাদেরকে বারবার তাদের সনাতন ঐতিহ্য অনুসারে বাঙালি নারীর কর্মকাণ্ড কী হওয়া উচিত তা স্মরণ করিয়ে দিতে থাকে।

১৯২২-এ কলকাতা পুলিশের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা পি. সেন আশা করছিলেন “to get them round and to create a feeling that these processions are not proper and should be abandoned altogether.” • ১৮ তাঁর এই আশা ব্যর্থ হলে তিনি সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী-এর মত উদারপন্থী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে এবং ব্রাহ্ম সমাজের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন যাতে তাঁরা তাঁদের নারীসমাজকে গৃহে অবস্থান করতে বাধ্য করেন।১

৯ ১৯২২ সনেই কলকাতা পুলিশ কমিশনার এক প্রতিবেদনে লেখেন নারীকর্মীদের উপস্থিতি পুলিশের জন্য শৃংখলাজনিত সমস্যা তৈরি করছে এবং “Any attempt made by them to assert authority has been questioned.” একই সাথে তিনি এই আশংকাও প্রকাশ করেন যে, পুলিশবাহিনী যেকোন সময় তাদের ধৈর্য হারাতে পারে, কারণ তা stretched to breaking point. এভাবে বাঙলার রাজনীতিতে নারীসমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ পিতৃতান্ত্রিক প্রশাসনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

এর ফলে বৃটিশ প্রশাসনের দীর্ঘকালীন যে সংস্কার ছিল ভারতবাসীর ব্যক্তিগত জগতে হস্তক্ষেপ না করার, তা এবার দ্বন্দ্বের সম্মুখিন হয়। এভাবে নারীমুক্তি রাজনীতির মুখ্য উদ্দেশ্য না হয়েও এর মাধ্যমে বাংলার চিরন্তন অন্দরমহলে এক পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগল এবং বাঙালি নারী গৃহের বাইরে জন পরিমণ্ডলে প্রবেশাধিকার অর্জন করতে থাকল।

প্রতিদিনকার গৃহকর্ম ও সন্তান লালন-পালনের বাইরে একটি জগৎ বিদ্যমান এবং সেইস্থানে পুরুষের পাশাপাশি নারী হিসেবে অংশগ্রহণ এবং দায়িত্ব পালন করার অধিকার তার আছে এই বোধ বাংলার নারীসমাজের একাশের মনে জাগ্রত হলো।

অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় কর্মী মোহিনী দেবীর বক্তব্যে বাঙালির অন্দরমহলে এই আন্দোলন কীভাবে এবং কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিল তার চিত্র ফুটে ওঠে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ছেলে নারায়ণ বিদ্যারত্নের স্ত্রী সুতোকাটা শেখাতেন মেয়েদের।

আমার বউ, মেয়ে, নাতনী যায় সুতো কাটতে। বলি – আটটার ভেতর ফিরবি, রাত করবিনে কিছুতেই, হাজার হলেও বয়সী মেয়ে সব। তবু ওরা দেরী করে। সুতো কাটতে কখনো এত দেরী হয়? তাই একদিন চললাম ওদের পিছু পিছু। দেখি ওরা ঘরে ঘরে বন্দর ফিরি করে বেড়ায়। একদিন আমিও ওদের দলে ভিড়ে পড়লাম । .

…. কলকাতার সব ঘরে ঘরে আমরা খদ্দর ফিরি করেছি, একটি বাড়ীও বাদ দিইনি। সে কি যুগ তখন, হাজারে হাজারে মেয়ে বউ সব গা-ভর্তি গহনা খুলে দিয়েছে, অজস্র টাকাকড়ি দিয়েছে আমাদের, আমরা আঁচল ভরে এনে পৌঁছে দিয়েছি কংগ্রেস আপিসে। চরকার কথা বিলেতি কাপড় বর্জনের কথা মেয়ে বউদের কেমন করে বলতাম জানো? বলতাম-‘তোমরা যেমন রান্না করে স্বামী পুকুরকে খাওয়াতে ভালবাস তেমনি নিশ্চয় তোমরা ভালবাসবে স্বামী-পুত্তুরকে নিজে হাতে সুতো কেটে সেই কাপড় পরাতে।

২১ এভাবে বাঙালি সাধারণ একজন নারী যে ভাষা বুঝতে সক্ষম সেই ভাষায় তাদের বোঝানো হতো। অনেক সময় নারীরা তাদের নিজেদের মতন করে আয়োজন করেছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠান, যার মধ্যেদিয়ে তাঁরা সংযোগ স্থাপন করতে চেয়েছেন আন্দোলনের সঙ্গে।

বরিশাল অঞ্চলের মনোরমা বসু যিনি পরবর্তী জীবনে মাসিমা নামে পরিচিত হয়েছেন এবং বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছেন, তিনি ১৯২০-২১ সনে গান্ধীবাদী আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে প্রথম পর্যায়ে যুক্ত করেছিলেন ভিন্ন উপায়ে। তাঁর স্মৃতিকথায় জানা যায় আমাদের গ্রামেও মিছিল এল- ‘চরকা ধর, খদ্দর পর”- ধ্বনি দিতে দিতে মানুষ এগিয়ে চলল। সময়টা হল ১৯২১-২২ সাল। হঠাৎ মনে হল এতো আমরাও করতে পারি। মেয়েদের নিয়ে সমিতি করে চরকা চালাতে পারি।

কিন্তু স্বদেশী করতে মেয়েরা আসবে কি? আচ্ছা, আমরা যদি মেয়েরা মিলে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের উৎসব করি? এই শুরু হল। পরপর তিনবার এই উৎসব করলাম। এই হলো আমাদের একত্রিত হবার জায়গা। এখানে আমরা আলোচনা করি আমাদের অধিকারের কথা, চরকা চালানোর কথা, আরও কত কিছু। ইতিমধ্যে সাহস করে একটা কাজ করে ফেললাম।

আমি জমিদার বাড়ির বউ। কোথাও আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যেতে হলে পাল্কীতে করে যেতে হতো। পাল্কীর বেহারা কাঁধে করে নিতে নিতে দর দর করে ঘামতো আর হাঁপাতো। খুব খারাপ লাগতো। একদিন বলে বসলাম, ‘আমি আর পাল্কীতে চড়বো না, আমার খুব খারাপ লাগে।” আশ্চর্য সহায়তা পেলাম আমার স্বামীর কাছ থেকে। আমার দেখাদেখি গ্রামের অন্য বউরাও পাল্কী চড়া বন্ধ করল। ২২

ধর্মীয় উৎসবের মধ্যদিয়ে মেয়েদের বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে অন্তর্ভুক্ত করবার প্রচেষ্টা বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনেও দেখা যায়। এবারে ব্যতিক্রম হিসেবে মনোরমা বসুর স্মৃতিচারণায় যা পাওয়া যায় তা হচ্ছে তিনি উল্লেখ করেছেন যে এই উৎসব মেয়েদের একত্রিত হবার একটি সুযোগ করে দেয়, এখানে তারা চরকা চালানোর কথা আলোচনার পাশাপাশি আলোচনা করেন নিজেদের অধিকারের কথা, যদিও অধিকার শব্দের অর্থ এখানে তিনি সুনির্দিষ্ট করেন নি।

তবে তিনি নিজে পাল্কী চড়ে বাইরে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং স্বামীর সম্মতি অর্জন করেছেন এবং অন্য নারীদের অনুপ্রাণীত করেছেন। এই ঘটনার মধ্যদিয়ে অধিকার আদায়ের একটি নিদর্শনের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে তিনি কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং স্থায়ীভাবে বরিশাল শহরে বসবাস করতে শুরু করেন। কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য মুখ্য করে একজন নারীর বাসস্থান পরিবর্তনের এটি প্রথম উদাহরণ।

এপর্যায়ে তিনি কয়েকজন মহিলাকে নিয়ে মহিলা সমিতি গঠন করেন যাদের দায়িত্ব ছিল চাঁদা তোলা, মুষ্টিভিক্ষা, মিছিল করা, ভলান্টিয়ারদের খাওয়ানো। ২০ এছাড়া তাদের কর্মকাণ্ডের তালিকায় বিলেতী কাপড়ের দোকানে পিকেটিং এবং প্রতি মাসের শুরুতে মদ, গাঁজা, আফিম এর আবগারী অফিসে পিকেটিং এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

বিশ শতকের শুরুতে স্বদেশী আন্দোলনে নারীর জন্য যে কর্মসূচি নির্ধারিত হয়েছিল তা ছিল ধর্মীয় সংস্কারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বাইরের জগতে নারীর প্রবেশাধিকারে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তাতে কোন প্রকার বিঘ্ন না ঘটিয়ে। এক দশকের ব্যবধানে বিশ-এর দশকে এসে নারী যুক্ত হলো পিকেটিং-এর মতো কর্মসূচিতে।

বিশেষভাবে মাদকতা নিবারণের জন্য মদের দোকানে পিকেটিং-এর ক্ষেত্রে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করতে গান্ধীজী উৎসাহিত করেন। কারণ হিসেবে দেখা যায়, পরিবারে পুরুষের মাদকাসক্তির ফলে ভূক্তভোগী হয় নারী। প্রথমতঃ পুরুষরা তাদের আয়ের একটি বড় অংশ ব্যয় করে মাদকের জন্য, যার পরিণামে পরিবারগুলো দারিদ্র্যের শিকার হয়। দ্বিতীয়তঃ নেশাগ্রস্থ পুরুষ পরিবারে নারীর উপর শারীরিক নির্যাতন করে থাকে, অতএব নারী মাদকতার পরোক্ষ শিকার।

কাজেই সমাজের নৈতিকতা পুনরুদ্ধারের জন্য নারীকে গান্ধীজী আহ্বান জানালেন মদের দোকানে পিকেটিং করবার জন্য। তিনি আরো যুক্তি দেখান, “বিদেশী বস্ত্রের ব্যবসায়ী ও ক্রেতা, পানাসক্ত ও মদের কারবারীদের প্রতি মহিলাদের আবেদন তাদের হৃদয় বিগলিত না করে পারে না। আর যাই হোক না কেন, এই চার শ্রেণির প্রতি হিংসামূলক আচরণ করবে বা করবার ইচ্ছা থাকবে, নারীজাতির সম্বন্ধে এরকম সন্দেহ কোনক্রমেই করা যায় না।

এরকম প্রতিরোধহীন ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সরকারও বেশীদিন উপেক্ষা করতে পারে না। ২৪ এভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যদিয়ে নারী সামাজিক মানোন্নয়নের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয় এবং তার চিরাচরিত নির্ধারিত গণ্ডির বাইরে বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়।

এইপর্যায়ে বৃটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত সাধারণ গৃহিনী নারীরা কতটা নারীমুক্তি অথবা নারীর অধিকার সম্পর্কে সচেতন ছিলেন কিংবা তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এই লক্ষ্য দ্বারা কতটা প্রভাবিত হয়েছিল সে বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে।

এ বিষয়ে মোহিনী দেবী বলেন, “আমরা তো মহিলা আন্দোলনের কথা বলি নি, মেয়েদের কাছে অবশ্য বলেছি কিন্তু সেটা বন্দরের কথা, আমাদের চরকার কথা। ২৫ কাজেই বলা যায় মুখ্যত দেশমুক্তির লক্ষেই বাঙালি নারী তাদের প্রথাগত ভূমিকার বাইরে বেরিয়ে আসলো এবং বিশ-এর দশকে অসহযোগ আন্দোলনের নানা ক্ষেত্রে বাঙালি মেয়েদের ভূমিকা কখনো কখনো সনাতন ঐতিহ্যের বিরোধী হলেও নারীমুক্তির আদর্শ ছিল অনুপস্থিত।

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও আন্দোলনে নারীদের যুক্ত করেছিলেন আন্দোলনের প্রয়োজনে। নারীর সামগ্রিক উন্নয়ন তাদের লক্ষ্য ছিল না। এর একটি ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায় ১৯২৩-এ%, যখন গান্ধীজী বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের বরিশাল অধিবেশনে আসেন। এই সম্মেলনে যোগদান করতে এসে গান্ধীজী শুনতে পেলেন যে এই ছোট্ট শহরটিতে প্রায় তিনশত পতিতা নারী বাস করে।

তিনি সেইসব নারীদের বিশেষভাবে আমন্ত্রণ করে সভায় নিয়ে আসেন এবং তাদের বসবার জন্য মঞ্চের কাছাকাছি স্থানে আলাদা ব্যবস্থা করেন। তিনি তাদের উদ্দেশে বলেন, “তোমরা পতিতা নও – নারী, মাতৃজাতি । তোমরা দেশের কাজে আত্মদান কর-আমি তোমাদের জীবিকার দায়িত্ব নেব।”২৭ মণিকুন্তলা সেন-এর বর্ণনায় জানা যায়যখন তিনি ডাক দিলেন, ‘তোমরা যারা আসবে আমার কাছে এস’ তখন সত্যিই তাদের মধ্য থেকে পনের কুড়ি জনের মতো উঠে এলো।

সেদিন থেকে এই মেয়েরা কংগ্রেসকর্মী হয়ে গেলেন।… শহরে তখন কংগ্রেসের নেতৃত্বে অনেক চরকা ও খাদির কুটির শিল্পাশ্রম খুলে গেছে। ঐসব আশ্রমে এরা স্থান পেলেন।… এদের একজনের সঙ্গে আমাদের বিশেষভাবে পরিচয়ের সুযোগ ঘটেছিল। নাম ছিল সরোজিনী। সবাই সরোজদি বলে ডাকত। সরোজদি স্থান পেলেন জগদীশচন্দ্রের আশ্রমে। পূজাঘরের কাজ করার ভার পেলেন।

জগদীশচন্দ্র তাকে লেখাপড়া শেখাতেন। সরোজদির হাতের রান্নাও খেতেন। ঐ আশ্রমের অন্যান্য সেবিকা মেয়েদের সঙ্গে সরোজদিও থাকতেন। শহরে বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল।

ঘটনাটি সমাজের অস্পৃশ্য এবং পতিত এই নারীদের বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে সংযুক্ত করার মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রা পরিবর্তনের এই প্রচেষ্টা বরিশাল অঞ্চল ছাড়া অন্য কোন এলাকায় দেখা যায় না।

বরিশাল অঞ্চলে এই কর্মসূচির উল্লেখ মনিকুন্তলা সেন ব্যতীত আভা সিংহ রচিত বিস্মৃত বীরাঙ্গণা ইন্দুমতি গ্রন্থেও পাওয়া যায়। বরিশালে বিশ শতকের ত্রিশের দশকের স্বদেশী নেত্রী ইন্দুমতির আন্দোলনে সম্পৃক্ত হবার পটভূমি আলোচনা করতে গিয়ে আভা সিংহ বলেন পতিতাদের মধ্যে স্বদেশী প্রচারের একটা কর্মসূচী নিয়েছিল শরৎ ঘোষের দল।

নিন্দিত পাড়ায় তারা বেরতেন। স্বাধীনতার কথা, সুন্দর জীবনের কথা বলতেন। তাদের অনলস প্রচারের ফলে পতিতাদের মধ্যে কেউ কেউ এগিয়ে এসেছিলেন নতুন করে জীবন গড়ে নিতে। দেহবিক্রির ঘূর্ণিত পেশা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন পাঁচ-ছয়জন মহিলা।

তারা সুতা কাটা ও ভাতবোনা ইত্যাদি শিখে গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করেছিলেন। এঁদের স্বাবলম্বনের হাতেখড়ি হল যদ্দর বুনেই। এঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন সুশীলা। তিনি খন্দরের বোঝা কাঁধে বাড়ি বাড়ি ফিরি করতেন। সুশীলাদির তেজস্বিনী মূর্তিখানি বড়মনু-ছোটমনুর মনে গভীর ছাপ রেখেছিল।

রাজনীতির মাধ্যমে নারীমুক্তির এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার এই প্রচেষ্টা বৃহৎ আন্দোলনে রূপ নেয় নি, কিংবা বলা চলে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন নি, এমনকি অসহযোগ আন্দোলনে সম্পৃক্ত নারীনেত্রীবৃন্দও এ বিষয়টি উপেক্ষা করেছেন। Geraldine Forbes, Women in Colonial India : Essays on Politics, Medicine, and Historiography গ্রন্থে এ বিষয়টি ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন এভাবে

Actually, Gandhai had no answer. Unable to present a viable alternative, he reiterated platitudes about the spinning wheel: ‘The wheel is a kind of wall for the protection of women.

I cannot think of any other thing which may serve as a support for such sisters in India. But this was no solution for either the women engaged in prostitution or for activists who wanted the freedom to move without opprobrium. …. Gandhi wanted the “right kind” of women to lead the movement.

As he had said in his earliest speeches, he wanted women from the higher classes to take the swadeshi vow because they could be models for other women. And the participation of women from “respectable families” was possible only if they could engage in protests without creating scandal.”

দেখা যাচ্ছে মহাত্মা গান্ধী এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন অসহযোগ আন্দোলন বাংলার নারীকে গৃহের চারদেয়ালের বাইরে একটি বৃহত্তর পরিসরে পা রাখবার সুযোগ করে দিলেও তখন পর্যন্ত তা ছিল পিতৃতান্ত্রিক সমাজের চিরাচরিত রীতিনীতির গণ্ডিতে আবদ্ধ।

অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের আস্থা সুনিশ্চিত রাখবার তাগিতে এপর্যায়েও নারীর জন্য কোন বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত যেমন গ্রহণ করা হয় নি, একইসাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার তাদের দেয়া হয় নি। নারী নেতৃবৃন্দও পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বিধিনিষেধ এবং পুরুষ নেতৃত্ব মেনে নিয়েই আন্দোলনে যোগ দেয়।

কংগ্রেস নিয়ন্ত্রিত নিয়মতান্ত্রিক অসহযোগ আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা হিসেবে এতে অভিজাত শ্রেণির নারীদের বা যে পরিবারে অভিভাবক শ্রেণি (বাবা, ভাই, স্বামী, পুত্র প্রমূখ) এই রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন সেই পরিবারের নারীদের মুখ্য ভূমিকাগ্রহণকে চিহ্নিত করা যায়।

অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবার এক বছর পর একটি সহিংস ঘটনাকে কেন্দ্র করে মহাত্মা গান্ধী এই আন্দোলন বন্ধ করবার ঘোষণা দিলেন। ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর প্রদেশের চৌরিচৌরায় পুলিশের অত্যাচারে উত্তেজিত জনতা পুলিশ স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন পুলিশ অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়। এই সন্ত্রাসী ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন ।

এই পর্যায়ে পদ্ধতিগত দিক থেকে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন ব্যর্থ হয়। এর পরিবর্তে গান্ধীজী পুনরায় গঠনমূলক কর্মসূচিতে প্রত্যাবর্তন করেন। অহিংস অসহযোগ আন্দোলন-এর সময় থেকেই এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নারী সংগঠন গড়ে উঠতে শুরু করে।

১৯২০-এর পূর্বে বাংলায় নারীর জীবনের মানোন্নয়নের লক্ষে প্রতিষ্ঠিত নারী সংগঠনগুলো ছিল সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক চেতনা বহির্ভূত। বিশের দশকে প্রাথমিকভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গঠিত, এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত নারীদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত এই নারী সংগঠন সমূহের উদ্দেশ্য ছিল নারীদের মধ্যে :

১) রাজনৈতিক জ্ঞান প্রচার
২) চরকার প্রচলন
৩) বাড়ি বাড়ি ঘুরে খদ্দর বিক্রি

এই উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত প্রথম সংগঠন ১৯২১ সালে গঠিত নারী-কর্মমন্দির, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস- এর বোন উর্মিলা দেবী। নির্ধারিত লক্ষের বাইরে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে বহু নেতা এবং পুরুষকর্মী গ্রেফতার হলে নারী কর্মমন্দির বেআইনি ঘোষিত সভা এবং আন্দোলন পরিচালনার ভার গ্রহণ করে।

১ অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে গান্ধীজী গঠনমূলক কর্মসূচি দিলে ঢাকার আশালতা সেন ফরিদপুরে খদ্দরের কাজ শিখতে যান এবং ফিরে এসে ঢাকায় নিজ বাড়িতে ‘শিল্পাশ্রম’ নামে মেয়েদের তাঁত ও চরকার কাজে প্রশিক্ষিত করবার একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

২ কমলা দাশগুপ্তের বর্ণনা অনুযায়ী, মহিলাদের নিজেদের হাতে তাঁত বোনার কাজ দেখতে পাওয়া তখনকার দিনে দুর্লভ ছিল এবং পাড়ার মহিলাগণ এই খন্দর বোনার কাজ দেখতে ভিড় করে এসে দাঁড়াতেন।

পরবর্তী সময়ে ত্রিশের দশকে আইন অমান্য আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এবং কারাবরণ করা আশালতা সেন বিশের দশকে গান্ধীবাদী দর্শনে দিক্ষিত হন এবং কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গঠণমূলক কর্মসূচির কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন, তবে সরাসরি নারীর সার্বিক মানোন্নয়ের জন্য সরাসরি কোন পদক্ষেপ তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে নেন নি।

১৯২২-এ জাতীয় কংগ্রেসের গয়া অধিবেশনে প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান শেষে ফিরে এসে তিনি সুশীলা সেন, গিরিবালা দেবী, সরমা গুপ্তা ও সরযু গুপ্তার সহায়তায় গড়ে তোলেন ‘গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি।

এই সমিতির উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি লিখেছেন স্থানীয় মেয়েদের মধ্যে সক্রিয় দেশপ্রেম ও গান্ধীজীর বাণী এবং কর্মপন্থা প্রচার করা। সমিতির সভ্যরা খন্দরের বস্তা নিয়ে দূর-দূরান্তর যেতেন আর খদ্দর বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে গান্ধীজীর বাণী প্রচার করতেন। সমিতির পক্ষ থেকে প্রত্যেক বছর আমাদের বাড়ির মাঠে একটা শিল্পমেলার অনুষ্ঠান করা হতো। এই মেলায় একটা ‘গান্ধীমণ্ডপ বানানো হতো।

 

সেই মণ্ডপে গৌতম বুদ্ধ থেকে মহাত্মা গান্ধী পর্যন্ত ভারতীয় ধর্ম ও জন-নেতাদের জীবন ও কর্ম নিয়ে মূর্তি এবং ছবির প্রদর্শনী করা হতো। দর্শকদের বোঝানো হতো বুদ্ধদেব এবং অন্য মহাপুরুষদের শিক্ষার সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর বাণীর কী সাদৃশ্য রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বিশ্লেষণে বলা চলে যে, এর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতক আদর্শ প্রচার এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা। প্রত্যক্ষভাবে নারীমুক্তির কোন কার্যক্রম এই প্রতিষ্ঠানটি গ্রহণ করে নি।

তবে যেহেতু মেয়েরা খদ্দরের বস্তা নিয়ে বিভিন্ন স্থানে যেতেন বিক্রির জন্য, এর মাধ্যমে একদিকে যেমন মেয়েরা গৃহের বাইরে যেতেন স্বাধীন ভাবে এবং নারীর নিজের উপর আস্থা অর্জনে এটি একটি কার্যকর পদক্ষেপ, অন্যদিকে পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে তারা অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত হয় যা তাদেরকে স্বাবলম্বী হবার পথ তৈরি করে দেয়।

কাজেই রাজনৈতিক উদ্দেশে গঠিত হলেও এ ধরনের নারী সংগঠনগুলো যেমন নারীদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য তৈরি করেছে তেমন ভাবেই তাদের মধ্যে নারী হিসেবে আত্মশক্তিকে উপলব্ধি করবার সচেতনতা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় আশালতা সেন ১৯২৫ সালে ‘নিখিল ভারত চরখা সঙ্ঘের সভ্য নির্বাচিত হন, ১৯২৭ সালে গড়ে তোলেন ‘কল্যাণ কুটির’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান, যার উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যৎ গান্ধীবাদী আন্দোলনের জন্য মহিলা কর্মী তৈরি করা।

নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত নারী সংগঠনগুলোর মধ্যে, বিশ শতকের বিশের দশকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং নারীমুক্তি এই দুই লক্ষের সমন্বয়ে গঠিত প্রথম নারী সংগঠন ‘দীপালী সঙ্ঘ’- যার প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী লীলা নাগ (রায়)। লীলা নাগ(রায়)-এর প্রস্তুতিপর্বটি সম্পন্ন হয় কলকাতার বেথুন কলেজের ছাত্রী থাকা অবস্থাতে।

এসময়ে তিনি তাঁর বাবার কাছে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আমার ক্ষুদ্রশক্তি যদি একটি লোকেরও উপকার করতে পারতো তবে নিজেকে ধন্য মনে করতুম। সত্যি বলছি-এ আমার বক্তৃতা নয়, এটা আমার প্রাণের কথা, এই আমার ideal. লীলা রায়ের জীবনীকার দীপংকর মোহান্ত বেথুন কলেজে লীলা নাগের কার্যাবলী প্রসঙ্গে বলেন
সে সময়ে কলেজে নানারূপ কাজের মধ্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়

১. কলেজের বিভিন্ন কাজকে গতিশীল করার জন্য বেগুনে ‘ছাত্রী ইউনিয়ন’ নামক সামাজিকতার তিনি প্রবর্তক।

২. চরমপন্থী নেতা লোকমান্য তিলকের মৃত্যুতে ছাত্রীরা অধ্যক্ষার প্রতিবাদ সত্ত্বেও লীলা নাগের নেতৃত্বে ধর্মঘটের মধ্যদিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।

৩. প্রথা অনুযায়ী কলেজের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান সভায় বড়োলাট-পত্নী আমন্ত্রিত হয়ে এলে ছাত্রীরা নতজানু হয়ে শ্রদ্ধা জানাত। লীলা নাগ অসম্মানজনক এই রেওয়াজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠান বয়কটের সিদ্ধান্ত অধ্যক্ষাকে জানিয়ে দেন। বহু বাদানুবাদের পর এ প্রথার বিলুপ্তি ঘটে। ৪. ১৯২০ সালে অসহযোগের প্রভাব বেথুন কলেজেও লাগে।

গান্ধীজীর উদাত্ত আহ্বানে বেগুনের কিছু ছাত্রী কলেজ ত্যাগের উদ্যোগ নেয়। জুনিয়র ছাত্রীদের সিদ্ধান্তে অধ্যক্ষা প্রতিবাদ করলে তারা তাঁর ওপর আক্রমণ চালায়। লীলা নাগ ছাত্রীদের তাৎক্ষনিকভাবে নিবৃত্ত করে বুঝিয়ে দেন-‘পড়াশুনা বা কলেজ ছেড়ে দিলে-ই স্বাধীনতা আসবে না।

বলা যায়, ভবিষ্যৎ নেত্রী লীলা রায় তৈরি হয়েছিলেন কলেজের এইসব ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতায়। এই পর্বে বাঙালি নারীর একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার অধিকার অর্জন করা।

এই অর্জনটি সম্ভব হয়েছিল লীলা নাগের একক প্রচেষ্টায়। তাঁর অনঢ়-অবিচল সংকল্পের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নতি স্বীকারে বাধ্য হয় এবং মেয়েরা সহশিক্ষার অধিকার লাভ করে। লীলা নাগ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীত্ব অর্জন করেন তখন বাংলার নারীরা আরেকটি অধিকার আদায়ের লক্ষে আন্দোলন করছে। সেটি ছিল মেয়েদের ভোটাধিকার আদায়ের আন্দোলন।

এই আন্দোলনেও লীলা নাগের যোগসূত্র পাওয়া যায়। লীলা নাগের উদ্যোগে এবং ইডেন স্কুলের অধ্যক্ষা স্বর্ণলতা দাসের সভানেত্রীত্বে ঢাকায় মহিলাদের এক সভার আয়োজন করা হয়, পাশাপাশি অন্য একটি সভায় কেন্দ্রীয় পরিষদে মেয়েদের ভোটাধিকার সম্পর্কে বিরূপ আলোচনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে লীলা নাগ প্রস্তাব গ্রহণ করেন।

” লীলা নাগ প্রতিষ্ঠিত প্রথম সংগঠন ‘ঢাকা মহিলা কমিটি’। ১৯২২ সালে উত্তরবঙ্গেও বন্যাত্রাণে সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিকে সহায়তার লক্ষে তিনি এই সংগঠনটি গড়ে তোলেন এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে অর্থ ও বস্ত্র সংগ্রহ করেন।

১৯২৩ সালে মেয়েদের জন্য গড়ে তোলেন ‘দীপালি সঙ্ঘ’। সংগঠনটির উদ্দেশ্য জানবার পূর্বে লীলা নাগের রাজনৈতিক আদর্শটি মনে রাখতে হবে। রাজনৈতিক আদর্শই তাঁর এই সংগঠনটির মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯২১-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময়ে লীলা নাগ বিপ্লবী অনিল রায়ের সংস্পর্শে আসেন। অনিল রায় ছিলেন বিপ্লবী সংগঠন শ্রীসংঘ-এর সদস্য।

এই সময়ে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে অহিংস ও সহিংস দুটি ধারাই বর্তমান ছিল, যদিও সহিংস ধারাটি প্রকাশ্য ছিল না। লীলা নাগ রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে সহিংস পথটি বেছে নেন। যদিও “অন্যান্য গোপন বিপ্লবী দলের মতো ‘শ্রীসংঘ’তেও নারী অন্তর্ভুক্তির বিপক্ষে ছিল সবাই। কিন্তু শীর্ষস্থানীয় নেতা অনিল রায়ের মত ছিল, নারীদের পূর্ণ সংযুক্তি না ঘটলে গোটা বিপ্লব কতক পুরুষ দিয়ে সফল করা অসম্ভব ।

৪০. বহু বাকবিতণ্ডার পর লীলা নাগ দলের সদস্য হলেন। একমাত্র শ্রীসংঘ ছাড়া অন্য কোন বিপ্লবী দলে তখন মহিলা সদস্য নেয়া হয় নি। এই সদস্যপদ প্রসঙ্গে ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী বলেন, “শ্রী লীলা রায়ের বিপ্লবী আন্দোলনে যোগদান একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা যাহার ফলে শিক্ষিতা মেয়েদের মধ্যে এক নতুন প্রেরণা আসে।”৪২ বিপ্লবী আদর্শে দীক্ষিত লীলা নাগ যখন নারী সংগঠন গড়ে তোলেন তখন অন্যান্য নারী সংগঠনের চাইতে তা কিছুটা ব্যতিক্রমী হতে বাধ্য।

শুধুমাত্র চরকাকাটা, খদ্দর বোনার মধ্যে এবং রাজনৈতিক আদর্শ বিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দীপালি সঙ্ঘ বাঙালি নারীর জীবনের সামগ্রিক মানোন্নয়ের লক্ষে কাজ করে, যে কারণে দেখা যায় সংঘের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক হলেও মহিলাদের বিকাশশীল জীবনের পক্ষে সহায়ক ও অগ্রযাত্রার কর্মীরূপে গড়ে তুলতে পরিকল্পিত কার্যাবলী নেয়া হয় যা ছিল

১. কুটিরশিল্প শিক্ষা

২. স্বাস্থ্য শিক্ষা

৩. শিশু পালন ও পরিচর্যা

৪. বই/পত্রিকা দলগত পাঠ

৫. বয়স্ক শিক্ষা

৬. শিশু শিক্ষা

৭. আমোদ-প্রমোদ-চিত্তবিনোদন

৮. খেলাধূলা

৯. মহিলা পাঠাগার স্থাপন

১০. ব্যায়াম শিক্ষা

১১. সঙ্গীত শিক্ষা।

১২. অভিনয় শিক্ষা

১৩.সমস্যামূলক রাজনৈতিক বিষয়ে ক্লাস

কর্মসূচির মধ্যে লক্ষণীয় বিষয় হিসেবে দেখা যায় নারীদের জন্য যে বিনোদন প্রয়োজন এ ভাবনাটিও লীলা নাগ করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে সঙ্গীত, অভিনয় শিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নারীর মানসিক বিকাশের জন্য পাঠাগার এবং দলগত বইপাঠের কর্মসূচি রাখা হয়এই সঙ্ঘে, পাশাপাশি নারীকে বিপ্লবীমন্ত্রে দীক্ষিত করবার প্রাথমিক শিক্ষা হিসেবে ব্যায়াম শিক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

কুটিরশিল্প শিক্ষার মাধ্যমে নারীকে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হবার দীক্ষা দিয়েছে দীপালি সঙ্ঘ। এর উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে স্বয়ং লীলা রায় বলেন জগত জুড়িয়া আজ যে নূতনের বোধন আসিয়াছে নারী জাগরণ তাহার একটি বিশেষ সুর। নারী আজ তাহার হারান স্বরূপটি ফিরিয়া পাইবার জন্য ভাবিবার, মিলিত হইবার ও কার্য্য করিবার প্রয়োজন অনুভব করিতেছেন। অচলায়তনের পাষাণ কারা ভেদ করিয়া মুক্তির আলোক শত অবগুণ্ঠনের অন্তরালে বাঙ্গালার নারীকেও আজ চঞ্চল করিয়া তুলিয়াছে।

বিশ্বপ্রাণের এই মুক্তির আহ্বানকে সার্থক করিয়া ভুলিতে বঙ্গনারীও উন্মুখ হইয়া উঠিয়াছেন। অজ্ঞানতার পাষাণতার হইতে মাতৃহৃদয়কে মুক্ত করিতে শতবর্ষের জড়তা ঝারিয়া বিশ্বের কর্মক্ষেত্রে নিজের স্থান করিয়া লইতে, রূদ্ধ কারার নিরানন্দতা ছাড়িয়া মুক্তির আশ্বাস পাইতে নারী দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইয়াছেন। নারী-প্রাণের জাগরণের এই ইচ্ছাকে সফল করিবার উদ্দেশ্য লইয়াই “দীপালি” সংগঠিত হইয়াছে।

ঢাকায় ইহাই একমাত্র মহিলা সমিতি। উদ্দেশ্য ঃ- জ্ঞান, কর্ম ও আনন্দহীন নারী সমাজকে জ্ঞানে ও কর্মে প্রতিষ্ঠিত করিয়া সজীব, সতেজ ও আনন্দময় জীবন গঠন করিতে সহায়তা করাই দীপালির উদ্দেশ্য। দুই বৎসর পূর্বে ১২জন বন্ধু মিলিত হইয়া এই ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্রতর সূচনা করা হইয়াছিল।

সহানুভূতি নাবীর স্পর্ধা বা সাহায্য ভিক্ষার সাহস এই দুইয়েরই তখন অভাব ছিল। আশা-নিরাশার এই দ্বন্দ্বের মধ্যে দীপালি দুই বৎসর অতিক্রম করিয়াছে। বর্তমানে তাহার সভ্যা সংখ্যা একশতের উর্দ্ধে। এই সফলতায় গর্বিত হইবার কিছু নাই আশান্বিত হইবার যথেষ্ট কারণ রহিয়াছে। ঢাকার সর্ব্বসাধারণ মহিলাদের মধ্যে ক্রমশই অধিকতর প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়া দীপালি তাহার অস্তিত্বেও প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করিয়াছে।

” বক্তব্যে স্পটত প্রতিয়মান যে ‘নূতন বোধন’ অর্থে তিনি রাজনৈতিক আন্দোলন বুঝিয়েছেন, এবং একই সঙ্গে নারী জাগরণ যে এই আন্দোলনের একটি অংশ সেটি তিনি উপলব্ধি করেছেন। নারী সংগঠনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আন্দোলন এবং নারীমুক্তির সমন্বয় সাধনের এই ভাবনাটি প্রথম সামনে নিয়ে আসলেন লীলা নাগ। কংগ্রেসভিত্তিক অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের নেতাদের কর্মসূচিতে এই ধারণাটি ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

লীলা নাগের নারী বিষয়ক চিন্তাধারার পরিচয় তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, দীপালি সঙ্ঘের একটি প্রধান কর্মসূচি ছিল ঢাকায় নারীদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের লক্ষে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠাসমূহের মধ্যে ‘নারীশিক্ষা মন্দির’ টি অধিক পরিচিত।

লীলা নাগ এই ‘নারীশিক্ষা মন্দির’ প্রসঙ্গে বলেন… অধিকাংশের এই মত যে – যে শিক্ষা বালিকাগণকে ভবিষ্যতে আদর্শ মাতারূপে পড়িয়া তুলিবে তাহাই প্রকৃত শিক্ষা। কিন্তু এরূপ উক্তির কোনো যুক্তি বা মূল্য নাই। যদি মানুষের অন্তরস্থিত সকল শক্তির বিকাশ দ্বারা তাহাকে পূর্ণ মনুষ্যত্বেও অধিকারী করাই শিক্ষার উদ্দেশ্য হয় তবে বিশেষ করিয়া মেয়েকে মাতা, কন্যা, জায়া বা ভগিনীর কর্তব্য ভিন্নভাবে শিক্ষা নিবার প্রয়োজন থাকে না।

কী নারী কী পুরুষ মনুষ্যত্ব যাহার মধ্যে বিকাশ লাভ করিয়াছে- সে – সকল অবস্থায় জীবনের সকল স্তরেই গৌরবের সহিত বিরাজ করিবে।… শিক্ষার মধ্য হইতে যদি জাতীয়তাবাদকে বাদ দিতে হয়, যদি দেশের সকল আশা-আকাঙ্খাকে বিযুক্ত করিয়া শিক্ষাদান কার্য সমাধা করিতে হয় তবে যাহারা শিক্ষালাভ করিবে তাহারা আর যাহাই হউক- দেশের পূত্রকন্যারূপে জাতির আশা-আকাঙ্খাকে মূর্ত করিবে কী করিয়া? ‘নারীশিক্ষা মন্দির’ এ অভাব দূর করিতে সচেতন থাকিবে।

এই উদ্দেশ্য সাধনার্থে শিক্ষা মন্দিরে একটি Students Union বা ছাত্রী সঙ্ঘ আছে। ইহার উদ্দেশ্য ছাত্রীদিগকে সকল চিন্তাধারার সহিত পরিচিত করাইয়া ভবিষ্যৎ কর্মীরূপে গড়িয়া তোলা । ৪৫ লীলা নাগ নারীকে তার শক্তির সম্পূর্ণ বিকাশের মাধ্যমে পূর্ণ মানুষে পরিণত করবার ব্রত নিয়েছিলেন। একই বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যায় ১৯২৬-এ ঢাকা যুব সম্মেলনে।

নারীর জন্য সমানাধিকার প্রশ্ন উত্থাপন করে লীলা নাগ এই সম্মেলনে বলেন আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও স্যোশিওলজিও প্রমাণ করেছে যে মস্তিস্কের (Intellect) ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীতে পার্থক্য নেই; অনুভূতির (Emotion) ক্ষেত্রে যদিও পার্থক্য কিছুটা রয়েছে তার জন্য তাদের কর্মক্ষেত্রের একটি কৃত্রিম ভাগাভাগির কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।

বরং দুজনের মানসিক গঠনে যে সাদৃশ্য রয়েছে তারই জন্য তাদের কর্মক্ষেত্র একই প্রকার হওয়া প্রয়োজন আত্মবিকাশের দিক দিয়ে পুরুষের পক্ষে যা প্রয়োজন নারীর পক্ষেও অন্যরূপ নয়।…

সমাজ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর পটভূমির উপরই গৃহের অবস্থান, কাজেই গৃহকে নারীর ব্যক্তিত্বের বিকাশের উপযুক্ত করে গঠন করবার জন্যও সমাজ ও রাষ্ট্রে তার প্রভাবের প্রয়োজন রয়েছে। অতএব গৃহের মধ্যেই কর্মকে সীমাবদ্ধ রাখা নারীর পক্ষে এবং কাজে কাজেই জাতির পক্ষেও কল্যাণের নয়। যেহেতু নারী ও পুরুষের সুষ্ঠু ও পরিপূর্ণ বিকাশের উপরই জাতির মঙ্গল নির্ভর করছে। ৬

শিক্ষাক্ষেত্র ও কর্মক্ষেত্র দুই ক্ষেত্রেই লীলা নাগ তাঁর বলিষ্ঠ মতবাদ প্রকাশ করেছেন নারীর জন্য সমান অবস্থান দাবির মধ্যদিয়ে। এই পর্যায়ে নারীর জন্য সমান অধিকারের বলিষ্ঠ দাবি লীলা নাগ প্রথম ব্যক্ত করেন।

লীলা নাগ-এর কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯২৬-এ ঢাকা শহরে ঐতিহাসিক রবীন্দ্র-সংবধর্নায় এসে ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজের প্রাঙ্গণে এক বিশাল মহিলা সমাবেশ দেখে কবি মন্তব্য করেন যে তিনি এশিয়ায় এতো বড় মহিলাসমাবেশ আর কখনও দেখেন নাই।

তাঁর বক্তব্যে তিনি বলেন কালে কালে অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে কর্মক্ষেত্র নব নব পরিণতি সাধন করতেই হয়। তখন পুরাতন অভ্যাসের জায়গায় নতুন উৎসাহের দরকার হয়। নতুন যুগের আহ্বান উপস্থিত হলে তবু যারা অপরিচিতের পথের দুর্গমতা এড়িয়ে পুরাতন কালের কোটরে প্রচ্ছন্ন হয়ে থাকতে চায়, মৃত্যুর চেয়েও তাদের বড় শান্তি তাদের শাস্তি জীবন মৃত্যু।..

স্বভাবতই মেয়েদের উপর ছিল আতিথ্যের ভার। পূজার ফুলের সাজি সেদিন তারাই সাজিয়েছেন, গৃহকে তারা সুন্দর করেছলে, পূর্ণ করেছিল। কিন্তু সে সুরক্ষিত সীমার মধ্যে এটি সম্ভব হয়েছিল, সেই সীমা আজ ভেঙ্গে গেছে।

আজ যুগসঙ্কটের দিকে ঘরের চেয়ে বাইরের দিকের ডাক বড় হয়ে উঠেছে। সে ডাকে সাড়া দিতে না পারলেই অসম্মান, আজ আমাদের আশ্রয় একান্তভাবে গৃহের মধ্যে আর নয়…বিশ শতকের প্রারম্ভে বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে জাতীয় নেতৃবৃন্দ তাদের আন্দোলন সফল করবার লক্ষে বাংলার নারীদের সুরক্ষিত সীমার মধ্যে রেখে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করেছিলেন। বিপরীতে এক দশকের ব্যবধানে আজ যুগসঙ্কটের দিকে ঘরের চেয়ে বাইরের দিকের ডাক বড় হয়ে উঠেছে।

সে ডাকে সাড়া দিতে না পারলেই অসম্মান, আজ আমাদের আশ্রয় একান্তভাবে গৃহের মধ্যে আর নয়……বিশ শতকের প্রারম্ভে বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে জাতীয় নেতৃবৃন্দ তাদের আন্দোলন সফল করবার লক্ষে বাংলার নারীদের সুরক্ষিত সীমার মধ্যে রেখে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করেছিলেন।  বিপরীতে এক দশকের ব্যবধানে রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে সেই সীমা ভেঙ্গে গেছে এবং নারীদের জন্য বাইরের ডাকে সাড়া দেওয়াটা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

এই উপলব্ধি সম্ভব হয় তখন, যখন নারী তার নিজ কার্যাবলীর মধ্যদিয়ে যোগ্যতা প্রমাণ করে তার অবস্থানটি সুনির্দিষ্ট করতে পারে। রাজনৈতিক আন্দোলনে নারীর প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে ওঠা একটি বৃহৎ অর্জন বলে পরিগণিত হবার দাবি রাখে, যার ধারাবাহিকতায় সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারী তার অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়।

বাঙালি নারীর রাজনৈতিকায়নের দ্বিতীয় পর্যায়ে ভোটাধিকার অর্জনকে সামগ্রিকভাবে বাঙালি নারীসমাজের জন্য বৃহৎ অর্জন বলে গণ্য করা হয়। তবে ভোটাধিকার আদায়ের সংগ্রামে যে সকল নারীনেত্রী সম্পৃক্ত ছিলেন এবং তাঁদের সংগঠন ‘বঙ্গীয় নারীসমাজ’ যার মাধ্যমে তাঁরা এই আন্দোলনটি গড়ে তোলেন তার প্রকৃতি বিশ্লেষণে নিঃসন্দেহে বলা চলে যে, এই আন্দোলনটি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সীমিত প্রয়োজনের তাগিদে ছিল, বৃহত্তর নারীসমাজের স্বার্থ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না।

এক্ষেত্রে নারী গবেষক ভারতী রায় অভিমত ব্যক্ত করেন যে ভোটাধিকার দাবী, অভিজাত শ্রেণীর মহিলাদের কাছে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা-কাঠামোয় স্থানলাভের অতিরিক্ত কিছু ছিল না এবং এভাবেই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেই গোষ্ঠীর একাধিপত্যকে শক্তিমান করে তোলা যেত।

বীনা মজুমদারের স্বীকৃতি অনুযায়ী, এ দাবার স্বপক্ষে তারাই মুখর হয়েছিল যাদের কাছে সেই সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোতে নারাদের নারা হিসেবে অংশগ্রহণে বিরত রেখেছে। সেই সময়কালের নিয়ন্ত্রক শ্রেণী থেকেই তারা আগত যে শ্রেণী তাদের অপকৃষ্ট বিশেষণে ভূষিত করেছে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায় অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বকরণ থেকে বঞ্চিত রেখেছে। ৪৮

বৃহত্তর নারীসমাজের স্বার্থ সম্পৃক্ত না থাকলেও ভোটাধিকারের দাবির মধ্যদিয়ে বাঙালি নারী পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোয় তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ রাখে।

১৯২১ সালের ১৩ আগস্ট কলকাতার কলেজ স্কয়ারে স্টুডেন্ট হলে এক সভায় কামিনী রায়, মৃণালিনী সেন ও কুমুদিনী মিত্র-এর নেতৃত্বে ‘বঙ্গীয় নারী সমাজ’ নামে সংগঠনটির সৃষ্টি হয় যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভোটাধিকার আদায়।” এই সংগঠনটির নেতৃেত্বে যাঁরা ছিলেন তাঁরা সকলেই সুপ্রতিষ্ঠি সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্ম সমাজের অন্তর্ভুক্ত।

এই সংগঠনের পক্ষ থেকে নারীর ভোটাধিকারের পক্ষে যে যুক্তি দেখানো হয় তা ছিল এই যে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিশু কল্যাণের মতো বিষয়গুলোতে শিক্ষিত মেয়েদের মতামত জানাবার ও আইনি সংস্কার সম্বন্ধে সুপারিশ করবার অধিকার থাকা প্রয়োজন। ব্রাহ্ম নেতা আনন্দমোহন বসুর পুত্র সুধাংশুমোহন বসু বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় মেয়েদের ভোটাধিকারের পক্ষে যুক্তি পেশ করে বলেন যে মেয়েরা রাজনীতিতে যোগ দিলে সমাজ সংস্কারমূলক কাজের অনেক সুবিধা হবে।

নারীর ভোটাধিকারলাভের পক্ষে যে যুক্তি পেশ করা হয় তাতে নারীকল্যাণ বা মুক্তির কোন বক্তব্য দেওয়া দেওয়া হয় নি বা নারীর জন্য বৈপ্লবিক কোন ধারণা সেখানে প্রতিফলিত হয় নি, পক্ষান্তরে দেখা যায় সমাজে প্রতিষ্ঠিত নারীর ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নারীর ভোটাধিকারের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়। নারীর ভোটাধিকারের পক্ষে কুমুদিনি বোস বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখেন, যা পরবর্তীতে লিফলেট আকারে প্রচার করা হয়। বারবারা সাউথার্ড এই সকল লেখা বিশ্লেষণ করে মন্তব্য করেন

An Analysis of Mrs. Bose’s writings show that she shared the social feminist outlook that was typical of the women’s movement in India in this period. She sought to broaden Indian concepts of women’s role rather than to mount a direct challenge to tradition.

She accepted the traditional concept that the role of women in society differs from that of men, because women are mothers and responsible for the home. But she did not accept the corollary that women were, therefore, less suited to public life. 

বিপরীতে দেখা যায়, নারীর ভোটাধিকারের পক্ষে বাংলার মুসলিম নেতা এ. কে ফজলুল হক যে যুক্তি উপস্থাপন করেন তা অধিক বলিষ্ঠ ও নারীমুক্তির চেতনাযুক্ত। তিনি যুক্তি দেখান নারীরা ভোটের অধিকার চায়, কেননা আপনারা যেমন মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য লালায়িত, তেমনি এটা স্রস্টার ইচ্ছা যে, যাঁদের আমরা শৃংখলে ও দাসত্বে বেঁধে রাখি তাঁরা ঐ শৃংখল থেকে মুক্তি চায়। নারীরা ভোট চায়, কেননা যে স্বাধীনতা আপনাদের কাছে প্রিয়, সেটা তাঁদের কাছেও প্রিয়।

নারীরা ভোট চায়, কেননা আপনারা যদি হন ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং কামনা করেন স্বাধীনতা, তেমনি নারীরাও ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং তাঁদেরও একই রকম অধিকার রয়েছে স্বাধীনতা ও মুক্তি চাইবার এ. কে ফজলুল হক তার বক্তব্যে একদিকে বাঙালি নারীর পরাধীন অবস্থার কথা যেমন মেনে নিয়েছেন একই সঙ্গে তাদের মুক্তির যৌক্তিকতাও তুলে ধরেছেন।

তবে এখানে তিনি নারী বলতে বাঙালি নারীসমাজের সময় অংশকে বোঝান নি, বরং ভোটাধিকারের দাবির পক্ষের অভিজাত শ্রেণিকেই বুঝিয়েছেন। নারীর ভোটাধিকারের দাবি ১৯২১ সনে বঙ্গীয় আইনসভায় প্রথম উপস্থাপন করা হয়।

বঙ্গীয় নারীসমাজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে নারীর ভোটাধিকারের দাবিতে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ এবং পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করতে থাকে, পাশাপাশি তারা মুক্তচিন্তা ও উদারনৈতিক ভাবধারার পুরুষ বুদ্ধিজীবিদের সমর্থন আদায়েও সচেষ্ট হয়। ” সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে ১৯২১ সনে বঙ্গীয় আইনসভায় নারীর ভোটাধিকারের প্রস্তাবটি নাকচ করে দেওয়া হয়।

বিশ শতকের বিশের দশকে বাঙালি নারীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে ভারতী রায় প্রশ্ন করেছেন, “দেশের চিরাচরিত সাংস্কৃতিক কাঠামোতে মেয়েদের প্রতি যে অবিচার করা হয়, তার সম্বন্ধে এ’রা কতটা সজাগ ছিলেন? এই কাঠামো ভাঙ্গবার লক্ষ্য কি নিয়ে তাঁরা আন্দোলনে নেমেছিলেন? তাঁদের রাজনৈতিক অবদান কি তাঁদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক মুক্তির পথ প্রশস্ত করেছিল?

প্রশ্নসমূহ বিবেচনার সময় এ প্রসঙ্গে যে কয়েকটি বিষয় মনে রাখতে হবে তা হলো, ১৯২০-২৯ এই সময়কালে বাঙালি নারীর রাজনৈতিকায়নের দ্বিতীয় পর্যায়টির সূত্রপাত ঘটে পুরুষদের উৎসাহ এবং সহযোগিতায়; এই পর্যায়ে নারীর রাজনৈতিকায়নের প্রক্রিয়াটি সবচাইতে বেশী প্রভাবিত হয় মহাত্মা গান্ধী প্রবর্তিত কর্মসূচির মাধ্যমে, যেহেতু গান্ধীজী নারীর ভূমিকার সমাজ নির্ধারিত গণ্ডিতে বিশ্বাসী ছিলেন কাজেই তাঁর প্রবর্তিত কর্মসূচিতে নারীর সার্বিক মুক্তির জন্য কোন বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া হয় নি।

এপর্যায়ে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নারীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত অধিকাংশ সংগঠনের প্রধান লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক চেতনা প্রসার-নারীমুক্তি নয়,ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করা যায় দীপালি সংঘ-এর নাম। এই সীমাবদ্ধতাসমূহ  বিবেচনায় রেখে বলা যায় যে, নারীমুক্তি নারীর রাজনৈতিকায়নের উদ্দেশ্য না হলেও এই সময়কালে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবার ফলে নারীর জীবনযাত্রায় এক ধরনের পরিবর্তন আসে।

সুরক্ষিত গৃহকোণ থেকে বাইরে বের হয়ে আসার ফলে মেয়েরা বৃহত্তর জগতের মুখোমুখি হয়, যা এতদিন পুরষের একক অধিকারে ছিল। রাজনীতি প্রথম বাঙালি নারীকে পুরুষ অধিকৃত জগতে সমঅধিকার না দিলেও প্রবেশাধিার দেয় এই পর্বে।

ফলে ধীরে ধীরে নারী সম্পর্কিত প্রচলিত ধ্যানধারণায় যেমন কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসতে শুরু করে, নারীরাও নিজের আত্মশক্তি উপলব্ধি করতে শুরু করে এবং তাদের ভেতর কিছুটা হলেও পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামোয় নারীর প্রতি যে বৈষম্য তার প্রতি সচেতনতা তৈরি হয়।

পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে নারীরা তাদের সমাজনির্ধারিত ঐতিহ্যিক যে ভূমিকা তা প্রত্যাখ্যান করতে থাকে। এ পর্বে একদিকে যেমন লীলা নাগ, লতিকা ঘোষ-এর মত শিক্ষিত নারীনেতৃত্ব তৈরি হয়, অপরদিকে আশালতা সেন, মনোরমা বসু মাসিমার মতো সাধারণ গৃহবধূরাও রাজনীতিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নেতৃত্বে চলে আসেন এবং তাদের মাধ্যমে যে নারীকর্মী বাহিনী তৈরি হয় তারাও সাধারণ বাঙালি গৃহবধূ বা মেয়ের দল।

এই দশকের শেষ পর্যায়ে দেখা যায় বাঙালি ছাত্রীসমাজের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে ব্যাপক হারে, এই শিক্ষিত ছাত্রীসমাজ ভবিষ্যতে নারী আন্দোলনের ধারক ও বাহক হয়ে ওঠে। ভারতী রায় উল্লেখ করেন, “একথা বলা যায় যে রাজনৈতিকভাবে সচেতন মেয়েরা বুঝেছিলেন যে, এই পুরুষপ্রধান সমাজে এক ধরনের অন্যায় ও অবিচার, সর্বক্ষেত্রেই প্রসারিত হতে পারে। তবে এটি চেতনার পর্যায়ে ছিল, তখনও পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা সরব প্রতিবাদ নারীর কাছ থেকে পাওয়া যায় না।

 

পরিশেষে বলা যায় যে, জাতীয়তাবাদী চেতনার উদ্ভব হবার ফলে বিশ শতকের প্রথম দশকে বাঙালি নারীর রাজনৈতিকায়নের পটভূমি সৃষ্টি হয়েছিল তারই ধারাবাহিকতায় এই শতকের বিশের দশকে বাঙালি নারী সক্রিয় রাজনীতিতে তার অবস্থান সুদৃঢ় করে তোলে।

এই পর্যায়ে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সন্দেহাতীভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হন বাঙালি নারীরা। প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী দশকে একদিকে কংগ্রেসের আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদিয়ে বাঙালি নারীর কারাবরণের ঘটনা স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। একই সাথে বামপন্থী আন্দোলনে বাঙালি নারী সম্পৃক্ত হয়ে প্রাপ্তিক নারীর কাছে মুক্তির বার্তা বহন করে নিয়ে যায়।

Leave a Comment