সনাতন ভূমিকার বাইরে নারী : ১৯৩০-৩৯

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় সনাতন ভূমিকার বাইরে নারী : ১৯৩০-৩৯ |

সনাতন ভূমিকার বাইরে নারী : ১৯৩০-৩৯

 

সনাতন ভূমিকার বাইরে নারী

 

শুধু শহর এবং শিক্ষিত মেয়েতেই নিবন্ধ নয়, তিরিশের আন্দোলনের প্রসারতা আরো দূরবিসারী, আরো ব্যাপক তার পরিধি। একুশ সনের আন্দোলনে মেয়েরা যেভাবে এসেছিলেন তার চেয়ে শতগুণে বেশি মেয়েরা এবারের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বাঙলাদেশে জেলায় জেলায় মহকুমায় মহকুমায় বিভিন্ন বয়সী মেয়েরা দলে-দলে পিকেটিং করতে শুরু করেন।

১৪ বছরের বালিকা থেকে ৭০ বছরের বৃদ্ধা, মেয়ে, বউ, ঠাকুমা, নিলিমার দল প্রকাশ্য রাস্তায় মিছিল করে লাঠি খান, পুলিশের অশেষ নির্যাতন সহ্য করে জেলে যান। গ্রাম থেকে এলেন নিরক্ষরা, অশিক্ষিতা ঘরের বউ- ঝিরা যাদের নারীত্বের মর্যাদা প্রতিনিয়তই নির্মমভাবে লাঞ্ছিত হতে লাগল।

সমাজনির্ধারিত প্রথাগত ভূমিকা প্রত্যাখ্যান করে তিরিশের দশকে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি নারীর অংশগ্রহণ এই আন্দোলনে বিশেষ মাত্রা যোগ করে। Geraldine Forbes এই দশকে বাঙালি নারীর এই ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, ‘Women of Bengal came forward this time but their demonstrations were smaller and their activities more radical than those of Bombay women.” কাজেই তিরিশের দশক বাঙালি নারীর নবপরিচয় আবিস্কারের সময় বলা চলে।

১৯২৯-এ জওহরলাল নেহেরুর সভাপতিত্বে কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে ঘোষণা করা হয় ভারতের রাষ্ট্রীয় আদর্শ হবে পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, ১৯৩০-এর ২৬ জানুয়ারি প্রথম স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপিত হবে। এসময়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে দেশব্যাপী আইন অমান্য আন্দোলন বা সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু হবে।

যে বিষয়টি লক্ষণীয়, পূর্ববর্তী অসহযোগ আন্দোলনের মত এক্ষেত্রেও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নারী-পুরুষের ভূমিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পিতৃতান্ত্রিক বৈশিষ্টের বাইরে বের হয়ে আসেন নি।

গান্ধীজী লবণআইন ভঙ্গ করে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সূচনা করলেন এবং এই উদ্দেশ্যে তিনি ১২ মার্চ ১৯৩০ সবরমতী আশ্রম থেকে ডান্ডির উদ্দেশ্যে পদব্রজে যাত্রা করেন। পদযাত্রায় তাঁর সঙ্গী হতে ইচ্ছুক নারীদের তিনি নিবৃত্ত করেন এবং যুক্তি দেখান আইন অমান্য করার উদ্দেশ্যে আমাদের এই অভিযান। পথে পথে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে বিদেশী শাসকের উদ্যত খড়গ।

আমরা আঘাত আমন্ত্রণ করতেই চলেছি। কিন্তু নারীরা যদি সঙ্গে থাকেন তাহলে প্রতিপক্ষের হাত হয়ত একটু কেঁপে যেতে পারে। তাদের দুর্বলতার সুযোগ আমরা নিতে চাই না। অতএব এই অভিযান থেকে নারীরা দূরে থাকুন। তাঁরা আন্দোলন শুরু করুক অন্যত্র।°

একমাত্র নারী হিসেবে সরোজিনী নাইডু এই পদযাত্রায় তাঁর সঙ্গী হন। এপ্রিল ১৯৩০-এ গান্ধীজী লবণআইন অমান্য আন্দোলনে গ্রেফতার হন। এসময়ে তিনি সমগ্র ভারতীয় নারীর উদ্দেশ্যে এক বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যে  তিনি বলেন

এই আন্দোলনে লবন-আইন ভঙ্গ করার চেয়েও বৃহত্তর কার্য আছে। আমি সেই কার্য নির্ণয় করিয়াছি। ১৯২১ সালের এক সময় পুরুষগণ কর্তৃক বিদেশী কাপড় ও মদের দোকানে পিকেটিং আশাতীতরূপে সফল হইয়াছিল বটে, কিন্তু পরে ঐ আন্দোলনের মধ্যে হিংসা প্রবেশ করায় উহা ব্যর্থ হয়। যদি বাস্তবিক আন্দোলন প্রকৃত সৃষ্টি করিতে হয়, তবে পিকেটিং আরম্ভ করিতে হইবে।

যদি উহা শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ থাকে, তবে জনগণকে দ্রুত শিক্ষা দেওয়ার পক্ষে উহাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। হৃদয়ের দ্বারে নারী ভিন্ন আর কে আঘাত দিতে পারে? মদ ও মাদকদ্রব্যে অভ্যন্ত হইলে যে নৈতিক চরিত্র নষ্ট হইয়া যায়, ইহা কে অস্বীকার করিতে পারে? বিদেশী বস্ত্র জাতির অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শিথিল করিয়া দেয় এবং লক্ষ লক্ষ লোককে কর্মহীন করিয়া তোলে।

ইহার পরিণাম কি তাহা নারী জানেন। ভারতের নারীগণ এই দুইটি কার্যে আত্মনিয়োগ করিয়া বৈশিষ্ট্য অর্জন করুন, তাহাই স্বাধীনতা স্বাধীনতা-সংগ্রামে তাঁহাদের দান পুরুষের অপেক্ষা বেশী হইবে।

গান্ধীজীর দুটি বক্তব্যেই সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয়ে ওঠে যে, নেতৃবৃন্দ তিরিশের দশকেও নারীদের বৃটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের জন্য পৃথক কাজের গণ্ডিতে বিশ্বাসী ছিলেন।

অহিংস অসহযোগ আন্দোলন-এর সময় নারীরা এই গণ্ডি মেনে নিয়েছিলেন, তবে এবার নারীরা এই লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেন। ভারতীয় নারীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ Margaret Cousins আন্দোলনে নারী-পুরুষের পৃথক কর্মক্ষেত্র সৃষ্টির প্রতিবাদ করে বলেন

This division of sexes in a non-violent campaign seems to us unnatural and against all the awakened consciousness of modern womanhood. In this stirring critical days for India’s destiny there should be no watertight compartments of service.

Women ask that no conferences, congresses or commissions dealing with the welfare of India should be held without the presence on them of women. Similarly, women must ask that no marches, no imprisonments, no demonstrations organized for the welfare of India should prohibit women from a share in them.”

অবিভক্ত বাংলায় নারীরা কোন প্রতিবাদী বক্তব্য প্রদান না করে লবণআইন ভঙ্গ করার মধ্যদিয়ে কার্যক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্যমূলক ভূমিকা নির্ধারণের প্রতিবাদ করে এবং এই নির্ধারিত ভূমিকা অস্বীকার করে। মেদিনীপুর, চব্বিশ পরগনা, খুলনা, বরিশাল, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে নারীরা আইন ভঙ্গ করে লবণ প্রস্তুতের কাজে নিয়োজিত হন।

আশালতা সেন তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেন ১৯৩০-এর মার্চ মাসে আমি সরমা এবং সরযূ গুপ্তার সাহায্যে ‘সত্যাগ্রহী সেবিকা দল’ গঠন করলাম। এপ্রিল মাসে আমরা কয়েকজন আমার জন্মভূমি নোয়াখালির সমুদ্র তটে লবণ আইন অমান্য করার জন্য গেলাম। সেখান থেকে কিছু নোনাজল ঢাকায় নিয়ে এসে সেখানকার বিখ্যাত বিখ্যাত করোনেশন পার্কে সর্বসমক্ষে নুন তৈরি করে সেই আইন আবার অমান্য করলাম।

ব্রিটিশ আইনের বিরুদ্ধে এই প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ হাজার হাজার লোক দাঁড়িয়ে দেখলো এবং জয়ধ্বনি দিয়ে অনুমোদন জানালো মেয়েদের ভেতর প্রথম গ্রেফতার হলেন সরযূ গুপ্তা, কামিনী বসু, প্রতিভা সেন এবং সুনীতি বসু। তাঁরা সবাই রক্ষণশীল পরিবারের মহিলা। প্রথম তিনজন আবার গোঁড়া হিন্দু বিধাবা। হিন্দু বিধবার নিরামিষ খাবার নিজেরা রান্না করে নেয়ার অধিকার যতদিন জেল কর্তৃপক্ষ না দিলেন ততদিন তাঁরা অনশনে রইলেন।

জাতীয়তাবাদী চেতনায় তিরিশের দশকে বাঙালি নারী এতটাই উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন যে রক্ষণশীল পরিবারের মেয়েরাও সর্বসমক্ষে বের হয়ে এসে লবণআইন ভঙ্গ করলেন এবং কারাবরণ করলেন। মেদিনীপুর, তমলুক অঞ্চলে নিতান্ত কৃষক, তাঁতী পরিবারের অশিক্ষিত মেয়ে-বউরা লবণআইন ভঙ্গ করে দলে দলে কারাবর করেন, এদের মধ্যে মেদিনীপুরের অশিক্ষিতা বিধবা মেয়ে সত্যবালা দেবী পুলিশের হাতে চরম অমর্যাদা সহ্য করে জেলে আসেন।

এর মধ্যদিয়ে একদিকে বাঙালি নারী কর্মক্ষেত্রের মতো নারী-পুরুষের বিভাজনের রেখাটি রাজনীতির ক্ষেত্রেও তৈরি করা হয়েছিল তা প্রকারান্তরে অস্বীকার করলো, অপরদিকে শুধু শহরকেন্দ্রিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা ধনী পরিবারের নয়, প্রান্তিক নারীসমাজও নিজেদের চিরায়ত ভূমিকার বাইরে বের হয়ে আসলো।

গান্ধীজী তার আন্দোলনে পুরুষের সহযোগী হিসেবে নারীর যে ভূমিকা নির্ধারণ করেছিলেন, অবিভক্ত বাংলার নেতা সুভাষ চন্দ্র বোস তা নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি আন্দোলনে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণের পক্ষে মত প্রকাশ করেন। সুভাষ বোস ১৯২৮-এ লতিকা ঘোষের নেতৃত্বে বাঙালি নারীদের রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করবার জন্য ‘মহিলা রাষ্ট্রীয় সংঘ’ নামে মহিলাদের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

প্রতিষ্ঠানটি আইন অমান্য আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এর প্রতিষ্ঠাতা লতিকা ঘোষ স্কুল-কলেজে ছাত্রদের পিকেটিং-এর বিষয়টি তত্ত্বাবধান করতেন। এর সদস্য অরুবালা সেনগুপ্ত-এর নেতৃত্বে এই সংঘের কর্মীবৃন্দ স্বেচ্ছাসেবিকা দল গঠন করেন। দলটি কলকাতার শ্যামবাজার, বৌবাজার বড়বাজার অঞ্চলে বিদেশী বস্ত্র ও মদের দোকানে পিকেটিং করতেন।

১৯৩০ সালের মার্চে কংগ্রেসকর্মী ও নেত্রীরা কলকাতায় গঠন করেন ‘নারী সত্যাগ্রহ সমিতি’। এর নেতৃত্বে ছিলেন উর্মিলা দেবী, মোহনী দেবী, জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী, নিস্তারিণী দেবী, অশোকলতা দাস, হেমপ্রভা দাসগুপ্ত, শান্তি দাস (কবীর), বিমল প্রভা দেবী, ইন্দুমতি গোয়েঙ্কা, সরলাবলা সরকার প্রমুখ।

এই সমিতির কর্মধারাও ছিল ‘মহিলা রাষ্ট্রীয় সংঘ’-এর অনুরূপ বিদেশী বস্ত্রের দোকান এবং মদের দোকানে পিকেটিং করা সভা ও শোভাযাত্রা পরিচালনা করা। এই সমিতিও বড়বাজারের সদাসুখ কাটরা, মনোহরদাস কাটরা, পচাগলি, সূতাপট্টি, গ্রান্ট স্ট্রীট, চাঁদনী চক, ক্রস স্ট্রীট, বৌবাজার, নিউমার্কেট প্রভৃতি স্থানে পিকেটিং করত।

১৯৩০ এর মে মাসে অমৃতবাজার পত্রিকায় এই সমিতির পিকেটিং প্রসঙ্গে বলা হয়, “For the first time in the annals of Calcutta the game of football had to be abandoned on Saturday owing to lady picketers making their appearance at club tents.

“১২ কাজেই নারী সত্যাগ্রহীরা তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছিল তা সুনিশ্চিত ভাবে বলা যায়। তাদের পিকেটিং-এর ফলে সাময়িকভাবে বিদেশী পণ্যের বিপনন বন্ধ হয়ে যায়, বিদেশী পণ্যব্যবসায়ীদের মালামাল গুদাম, কুঠী ও গদীতেই বস্তাবন্দী হয়ে পড়ে।

১০ এমনকি এসময়ে বড়বাজারের বিলেতী দ্রব্যের বাজার পুলিশ ও মিলিটারির ছাউনিতে পরিণত হয়, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নারী সত্যাগ্রহীরা পুলিশের নজরদারীতে পিকেটিং করত এবং পুলিশ তাদের দলে দলে গ্রেফতার করত।” ১৯৩০ এর জুলাইতে বড়বাজারে পুলিশ পিকেটিংরত নারীদের গ্রেফতার করলে সহিংসতা সৃষ্টির ভয়ে সেখানকার সকল দোকান বন্ধ করে দেয়া হয় ।

১৫ আইন অমান্য আন্দোলনে বাঙালি নারীর এই প্রথাবিরুদ্ধ আচরণ একদিকে বাঙালি সমাজে নারীকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে এবং বৃটিশ প্রশাসন ও পুলিশবাহিনীর জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করে। বিশের দশকে অসহযোগ আন্দোলনে বাঙালি নারীদের সম্পৃক্তি বৃটিশ প্রশাসনকে উদ্বিগ্ন করেছিল। আইন অমান্য আন্দোলনে বৃটিশ প্রশাসন-এর জন্য এই নারীসমাজ বৃহৎ সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। নারী তাঁর ভূমিকাকে যত প্রতিবাদী করে তোলে বৃটিশ পুলিশও তত কঠোর হতে থাকে।

১৯৩০-এর ২২ জুন কলকাতা শহরে ১৪৪ ধারা জারী ছিল। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ‘নারী সত্যাগ্রহ সমিতির সদস্যরা শোভাযাত্রা বের করেন। কমলা দাশগুপ্তের বর্ণনায়
শোভাযাত্রা চলেছিল কলেজ স্ট্রীট থেকে দেশবন্ধু পার্ক পর্যন্ত। অসংখ্য পুলিশ, সার্জেন্ট ও ঘোড়সাওয়ার বেষ্টিত বিরাট শোভাযাত্রা সেদিন রণাঙ্গনের সৃষ্টি করেছিল।

কলিকাতা শহরের বুকের উপর নারী তখন রণরঙ্গিনী মূর্তি ধারণ করে সত্যাগ্রহীদের পদদলিত করতে উদ্যত ঘোড়াকে রুখেছেন তার লাগাম ধরে ঝুলে পড়ে… পুলিশের নির্মম অত্যাচার থেকে জনসাধারণকে রক্ষা করতে সবিক্রমে আটকাচ্ছেন তাঁরা পুলিশের লাঠিকে, ঘোড়াকে ও বেটনকে ।… ক্রমে শোভাযাত্রা এসে পৌঁছল দেশবন্ধু পার্কে। সেখানেও পার্ক ঘেরাও করে দাঁড়িয়ে আছে ব্রিটিশ শক্তি।

জীবন তুচ্ছ ক’রে অগণিত নরনারী ১৪৪ ধারা ভেঙে পার্কেও ভিতর প্রবেশ করলেন জলস্রোতের মত। সার্জেন্ট, ঘোড়সাওয়ার ও পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ল তাঁদের উপর। নারী সেদিন অকুতোভয়ে কখনো ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হচ্ছেন, কখনো শুয়ে পরে ঘোড়ার অগ্রগতি ব্যর্থ করছেন, কখনো পুলিশের বেটনে আহত হচ্ছেন।

১৯৩১-এর ২৬ জানুয়ারি ভারতের স্বাধীনতা দিবসে কলকাতার সমস্ত বড় বড় পার্ক এবং মনুমেন্ট বৃটিশ পুলিশ ঘিরে রাখে যাতে করে কেউ সেখানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে না পারে। কিন্তু পুলিশ ও ঘোড়সাওয়ার বাহিনীর বেষ্টনী অগ্রাহ্য করে অসংখ্য নারী মনুমেন্টের কাছে পৌঁছবার জন্য অগ্রসর হন। পুলিশের লাঠিচার্জ ও ঘোড়ার পদাঘাতে অনেকে আহত হন।

এরমধ্যে মেয়েদের কয়েকজন মনুমেন্টের নীচে পৌঁছে যান এবং পতাকা উত্তোলন করেন।” আবার ছাত্রীদের এক শোভাযাত্রার উপর ঘোড়সাওয়ার পুলিশ সার্জেন্ট ঘোড়া চালিয়ে ছত্রভঙ্গ করতে চাইলে ইলা সেন (তখন ছাত্রী) ছুটে এসে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরেন।
বাঙালি নারীর এই অপরিচিত রূপ কেবল কলকাতা শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

১৯৩০-এর ২৪ মে পূর্ববঙ্গের মফস্বল শহর পটুয়াখালীতে হরতাল ডাকা হয়। ঐ দিন ভোরে সেখানকার মহিলারা রাস্তায় নেমে পড়েন যাতে সরকারী কর্মচারীরা কার্যালয়ে যেতে না পাড়েন। শহরের মুন্সেফ যখন কোর্টে যাচ্ছিলেন তখন মহিলারা ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। একজন জমিদার তাঁকে উদ্ধার করতে এলে মহিলারা তার পা ধরে আটকে রাখেন।

১৯ এর দু সপ্তাহ পরে ৪ জুন ১৯৩০-এ নোয়াখালীর মহিলারা দলবদ্ধভাবে বের হয়ে কোর্টে যাবার সব রাস্তা আটকে রাখেন। এখানে মহিলারা সামনের সারিতে দাঁড়ান এবং পুরুষ সত্যাগ্রহীরা তাঁদের পেছনে জড়ো হন। উপনিবেশিক কর্মকর্তারা কোর্টে যাবার পথ খুঁজে পান যেখানে শুধু পুরুষ সত্যাগ্রহীরা অবরোধ করেছিল সেখান থেকে পুলিশ তাদের হঠিয়ে দিলে।

২০ এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন ছিল না। অবিভক্ত বাংলার প্রত্যেক অঞ্চলে নারীকে এই ভূমিকায় দেখা যায়। বরিশালের বানরিপাড়া এলাকায় নারীবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ইন্দুমতি । মেয়েরা পিকেটিং-এ নামলে প্রথম প্রথম রক্ষণশীল সমাজের আপত্তি ওঠে। ইন্দুমতি তাদের সকল আপত্তি ইপেক্ষা করে পিকেটিং-এ নেতৃত্ব দেন এবং নেতৃস্থানীয় পুরষকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকদল কারারুদ্ধ থাকা অবস্থাতে তাঁর একক নেতৃত্বে এই অঞ্চলে আইন অমান্য আন্দোলন সফল করেন।

২১ এ সময়ে তাঁকে কয়েক মাসের জন্য স্বগৃহে অন্তরীন করে রাখা হয়। ২২ পরবর্তী সময়ে বানরীপড়া বাজারে বিদেশী বস্ত্রের দোকানের সামনে ইন্দুমতি ও সরযুবালা সেন আমরণ অনশন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তাদের অনশনের সপ্তম দিন দোকানীরা সমস্ত বিদেশী কাপড় বের করে দিলে তাতে আগুন লাগানো হয়।

২৩ পূর্ণাঙ্গ দলিল পত্রের অভাবে আইন অমান্য আন্দোলনে যে বিপুলসংখ্যক বাঙালি নারী সক্রিয়ভাবে অংশনেন তার সঠিক পরিসংখ্যান বা তালিকা যেমন পাওয়া যায় না তেমন তাদের বহুমাত্রিক ভূমিকার সামগ্রিক মূল্যায়নও সম্ভব হয় না।

তবে বৃটিশ পুলিশ এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বক্তব্যে যে বিষয়টি প্রমাণিত হয় তা হচ্ছে, আন্দোলনে নারীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং অধিক সক্রিয় ভূমিকা উপনিবেশিক প্রশাসনকে উদ্বিগ্ন করে তুলছিল। পুলিশ প্রশাসনের এক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়

Organized attempts, seldom successful were made to hoist the Congress Flag on Government buildings in the mofussil. An increasing share of the work was taken up by women, both because it was becoming more difficult to find male recruits and because the presence of women folk was calculated to prove an embarrassment to the police.

বক্তব্যটি সম্পূর্ণ সত্য নয়। নারী সত্যাগ্রহীরা পুলিশ প্রশাসনকে অসম্মান করতে বা তাদের কর্তব্যে বাধাদানের উদ্দেশে আন্দোলনে যুক্ত হয় নি। পুলিশ প্রশাসনও লিঙ্গবৈষম্য সম্পর্কে সচেতন হয় নি বা নারীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করে নি। যদিও পুলিশ প্রশাসনকে প্রথম পর্যায়ে নির্দেশ দেয়া হয়, “all officers dealing with lady satyagrahis… to be very polite in their manners and to use the minimum of force if possible. এই নির্দেশ পুলিশ প্রশাসন পালন করতে সমর্থ হয় নি। প্রাথমিকভাবে পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসকরা সচেষ্ট ছিলেন নারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন না করতে।

এর পরিবর্তে তাঁরা বাঙালি নারীদের মানসিক ভাবে হেয় করার মাধ্যমে তাঁদের নিবৃত করার চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে তাঁরা প্রমাণ করতে সচেষ্ট হন যে, রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত নারীদের স্বাধীন কোন মতাদর্শ নেই। ২৬ তারা হয় পুরুষদের হীন চক্রান্ত্রের শিকার অথবা পুরুষরা তাদের অধীনতা এবং পর্দাপ্রথা থেকে মুক্ত হবার সুযোগ পাওয়ামাত্র সেটাকে লুফে নিয়েছে।২৭ দুটি ক্ষেত্রেই পুরুষকে প্রত্যক্ষভাবে অভিযুক্ত করে বলা হয়, “.

they have literally thrown their wives and daughters into the streets with the cowardly satisfaction that they can thus cause annoyance and save their own skin.”২৮ চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনারও একই অভিমত পোষণ করে বলেন, “If they do not consider this a most unchivalrous act, I do not see how they can have any reason to resent any action taken against their women.”

চলমান আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি নারীরা প্রমাণ করলেন যে, তাঁদের রাজনৈতিকায়ন সম্পূর্ণ তাঁদের নিজস্ব ইচ্ছায় হয়েছে এবং প্রশাসনের পক্ষে আর পুরুষকে নারীর রাজপথে আন্দোলনের জন্য দায়ী করা সম্ভব হচ্ছিল না।

বাকেরগঞ্জের জেলাপ্রশাসক নারী সত্যাগ্রহীদের প্রসঙ্গে বলেন, “They are not ashamed to prostitute themselves in this way to draw a crowd.” তিনি আরো বলেন যেসব নারীদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না তারা সম্মান পাবার যোগ্য নয় এবং যারা জনসমক্ষে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে গৃহে তাদের ভূমিকা আরো ভয়াবহ হবে।” তিনি তার বাহিনীকে এবং নিজেকে আশ্বস্ত করেন এই বলে যে, তারা এই মহিলাদের স্বামী নন।

বাঙালি নারীদের প্রসঙ্গে উপনিবেশিক প্রশাসনের বক্তব্য থেকে বলা যায় যে নারীরা তাদের প্রথাসিদ্ধ ভূমিকার বাইরে বের হয়ে জনপরিমণ্ডলে তাদের উপাস্থাত জোড়ালোভাবে প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন এবং এর মাধ্যমে সমাজে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, যা প্রশাসনকে পর্যন্ত উদ্বিগ্ন করে তোলে। এই নতুন নারীকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে সেটি পুলিশের জন্য একটি সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়।

প্রথম পর্যায়ে পুলিশ নারীদের গ্রেফতার না করে ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে। প্রচণ্ড গরমে তাদের পানির সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হতো, তাদের অবরুদ্ধ করে রাখা হতো, কখনো কখনো তাদের ধরে নিয়ে যানবাহন পাওয়া যায় না এমন স্থানে ছেড়ে দিয়ে আসত, এমনকি একবার কলকাতায় সত্যাগ্রহী ছাত্রীদের সারাদিন আটকে রেখে রাত্রি বারোটা নাগাদ নির্জন ধাপার মাঠে ছেড়ে দিয়ে আসে।

এ পদ্ধতি নারীদের আন্দোলনে যোগদানে বিরত রাখতে পারে নি। পুলিশকে এ পর্যায়ে আরো কার্যকর পদ্ধতি বেছে নিতে হয় এবং সেপ্টেম্বর ১৯৩০ এ বৃটিশ ভারতের সবকটি প্রদেশের মধ্যে বাংলায় সর্বাধিকসংখ্যক নারী করাবন্দী হন। কারাজীবন বাঙালি নারীর জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে।

অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন স্থানের মহিলাগণ ১৯৩০ সালের লবণ আইন অমান্য আন্দোলন ও ১৯৩২ সালের আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদান করে কারাবরণ করেন, তাঁদের নামের তালিকা কমলা দাশগুপ্ত দিয়েছেন (দ্রষ্টব্য পরিশিষ্ট-২)।

তবে এটি কেবল আইন অমান্য আন্দোলনে বন্দীদের তালিকা এবং তালিকাটি সম্পূর্ণ কিনা তা কমলাদাশগুপ্ত উল্লেখ করেন নি। এর বাইরে ছিলেন বিভিন্ন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত মেয়েরা এবং রাজবন্দী নারী। দু’বছরে এই বিপুলসংখ্যক নারীর কারাবরণ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে বিশেষ মাত্রা যোগ করার পাশাপাশি বাঙালি নারীর জন্য একটি নতুন জগৎ তৈরি করে।

বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদিয়ে নারী যেমন জনপরিমণ্ডলে প্রবেশের অধিকার অর্জন করে, তেমনি কারাগার নারীর জন্য একটি পৃথক ক্ষেত্র তৈরি করে যেখানে নারী নিজেকে পুরুষের সমান্তরালে নিয়ে আসার সুযোগ লাভ করে।

কমলা দাশগুপ্ত প্ৰদত্ত তালিকা অনুসারে মেয়েদের নাম ও পদবী থেকে বলা যায় এদের অধিকাংশ ছিলেন মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের। এদের অনেকেই প্রথম প্রকাশ্যে বের হয়ে এসেছিলেন আন্দোলন করতে।

কমলা মুখোপাধ্যায় তাঁর কারাজীবনের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, “বিশেষকরে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ঘরের মেয়েদের জেলে যাওয়ার ব্যাপারটা খুব সহজ ছিল না। কারণ জেলে শুধু চোর ডাকাত খুনীরাই যায়, মধ্যবিত্ত ভদ্রশ্রেণির মেয়েরা গেলে তাদের ভবিষ্যৎ ঠিক থাকবে কিনা এই নিয়ে নানান ধরনের ভাবনাচিন্তা ছিল।

সব ধরনের ভাবনাচিন্তার অবসান ঘটিয়ে ত্রিশের দশকে আইন অমান্য আন্দোলন ও বিপ্লবী নারীদের একটি বড় অংশ জেলে যান। আবার এসময়েই লীলা নাগ, কমলা দাশগুপ্ত সহ অনেক নেত্রীস্থানীয় নারী হন রাজবন্দী। আইন অমান্য আন্দোলনে বন্দী নারীদের কারাবাস দীর্ঘ ছিল না।

কিন্তু বিপ্লব কাজে সম্পৃক্ত মেয়েদের এবং রাজবন্দীদের দীর্ঘসময়ের জন্য কারাগারে বন্দীজীবন কাটাতে হয়, যার মেয়াদ ছয় থেকে সাত বছর পর্যন্ত ছিল কারো কারো জন্য। কারাগার তাদের জন্য সাময়িক আবাসস্থলে পরিণত হয়ে গৃহপরিমণ্ডল ও জনপরিমণ্ডলকে এক করে তোলে। বীনা দাস জেল জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেছেন, “প্রথম কয়েক মাস জেলটা ঠিক জেল বলে বুঝতে পারি নি।

সঙ্গিনীদের কাউকে ডাকি দিদি, বৌদি; কেউ মাসিমা, কেউ ঠাকুমা। স্নেহে যত্নে আমাদের তিনজনকে সবাই ঢেকে রেখে দিতেন। সবচেয়ে ভাল খাওয়াটা আমাদের জন্য, ঘরের মধ্যে সবচেয়ে ভালো জায়গাটা আমাদের শোবার জন্য এক গেলাস জলও ঢেলে নিতে দিতেন না আমাদের । *৩৬ এভাবে এই কারাবন্দী নারীরা নিজেদের জগৎ তৈরি করে নিয়েছিলেন পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে। Suruchi Thapar Björkert এ প্রসঙ্গে অভিমত পোষণ করেন যে

one of the reasons why it was easier for these purdah-clad women to cope with prison life was because imprisoned women often came from large joint family households and carried over domestic functions such as giving moral support to other women, participating in discussion and disseminating information and sharing a communal space.

কারাগারে একই সঙ্গে বিভিন্ন বয়স, শ্রেণি, গোষ্ঠী, দলের নারীরা একসঙ্গে থাকতেন। এদের মধ্যে যেমন ছিলেন শিক্ষিত মহিলারা আবার ছিলেন নিতান্ত গ্রাম্য অশিক্ষিত নারী। কারাগারে একসঙ্গে থাকবার ফলে দুই ভিন্নপ্রান্তের নারীদের মধ্যে পরস্পরকে জানবার সুযোগ হয়। শহরের একজন শিক্ষিত নারী গ্রামের একজন অশিক্ষিত নারীর সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন, তাদের সমস্যাসমূহ উপলব্ধি করেন।

কংগ্রেসের আওতায় নির্ধারিত গণ্ডিতে আবদ্ধ রাজনীতি শহুরে নারীকে এভাবে প্রান্তিক নারীর কাছে নিয়ে যেতে পারে নি। নারী হিসেবে অন্য নারীর প্রতি সহমর্মিতাবোধের সৃষ্টি হয় এই কারাজীবনে। বীনা দাস তাঁর উপলব্ধি থেকে বলেন সুদূর পল্লী থেকে ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চা বুকে নিয়ে কত যে মেয়ে চলে এসেছে- স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিতে।

কতজনের কপালে পিঠে লাঠির দাগ, আরো অন্য ধরনের অত্যাচারের চিহ্নও রয়েছে শরীরে, দেশের জন্য সমস্ত লাঞ্ছনাই একান্ত সহজভাবেই গ্রহণ করে নিয়েছে এরা।… তবু ভারী শ্রদ্ধা করতাম ওদের মনে হত ওদের জেলে আসা আমার চেয়ে কত শক্ত, কত দুঃখের। একই বক্তব্য পাওয়া যায় শান্তিসুধা ঘোষের বক্তব্যেও।

তিনি কারাগারে সাধারণ কয়েদিদের দেখে উপলব্ধি করেছেন এত বছর আমি অথবা আমার মতো আরো কয়েকজন মেয়ে যারা দেশের কাজ করছি বলে আত্মপ্রসাদে তৃপ্ত, তারা সমাজের কোথায় বাস করতে অভ্যন্ত হয়ে এসেছি? সমাজ থেকে দূরে, শুভ্র গজলন্তমিনারে? যাদের আজ হঠাৎ একসঙ্গে দেখছি তাদের তো চিনি না! এরাও যে অনেকেই কারার বাইরে বহির্জগতে মাতা কন্যা বা বধূ রূপে সংসার রচনা করে সুখে দুঃখে ও হাসি কান্নায় জীবন কাটিয়েছে, সে কথা তো মনে পড়ল না।

এরাও যে আমাদেরই মতো মানুষ, সে আত্মীয়তা অনুভব করবার বদলে যেন শঙ্কিত ও বিমূঢ় হয়ে পড়েছি একটা দুস্তর ব্যবধান বোধে। আশ্চর্য! হয়তো এদর সান্নিধ্যে এসে, একই আলো বাতাসে, একই নির্মম পরিবেশে, একই অবাঞ্ছিত রূঢ় আচরণের তলায় নিষ্পেষিত হতে হতে ধীরে ধীরে এ ব্যবধান ঘুচবে। দেশের বৃহত্তর সমাজকে বাস্তবরূপে চিনব-যে সমাজেরই আমিও একটি অংশ। ৩

কাজেই কারাগার শুধু নারীকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পুরুষদের সমান্তরালেই নিয়ে আসে নি, নারী হিসেবে আরেক নারীর কাছাকাছি নিয়ে এসে নারীদের মধ্যকার ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, পারিবারিক অবস্থার পার্থক্য খুঁচিয়ে দিয়ে একাত্মতাবোধের সৃষ্টি করে। পাশাপাশি পারিবারিক জীবনের বাইরে এই জীবনযাত্রায় নারী খুঁজে নেয় এক নতুন মাত্রা। দীর্ঘ কারাজীবনে মহিলা কারাবন্দীদের আত্মমগ্ন হবার প্রধান অবলম্বন ছিল বই এবং সৃজনশীল জ্ঞানের চর্চা।

কমলা মুখোপাধ্যায় তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেন
বীনাদি ও কল্যাণীদির বাড়ি থেকে বেশ বইপত্র, রবীন্দ্র, নজরুল, কনকদাস প্রভৃতির পানের অনেক রেকর্ড যা তখন পর্যন্ত বার হয়েছিল, তা সবই এসে যাওয়ায় গান শোনা ও শেখার খুব সুবিধা হয়েছিল। খবরের কাগজ তো ছিন্নভিন্ন অবস্থায় আসত… তবে বহু ভালো ইংরেজি বই পরতে পেরেছিলাম।

জা ক্রিস্তফ তো সকলেই পরেছিলাম, কিন্তু কয়েকজনের বাড়ি থেকে রোমা রোল্যার Soul Enchanted ৬ খণ্ডই এক একটা করে ভেতরে এসে গিয়েছিল -তাতে ইউরোপের ফ্যাসিজমের খবরাখবর কিছু পেতাম। কীভাবে যেন And Quiet Flows the Dawn s Virgin Soil Upturned বইগুলি, Upton Sinclair-এর Jungle ও Oil পড়ে রাশিয়ার খবর কিছুটা জেনেছিলাম।

কারো কারো কাছে বুখারিন ও হেগেলের বই ছিল।… সঙ্গীতচর্চা, বিশেষ করে রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চা খুব বেশিই হতো। তাছাড়া শান্তিনিকেতনের ইহুদি ছিলেন বলে ঐ বিষয়ে আরও একটু সুবিধা হয়েছিল। কারাজীবন নারীকে আলোকিত হতে সহায়তা করেছিল। প্রত্যেক নারীবন্দির স্মৃতিকথায় এ প্রসঙ্গটি উঠে আসে। কমলা দাশগুপ্ত তাঁর স্মৃতিকথায় বলেন

১) বীনা ও শান্তির কাছ থেকে আসে নতুন হাওয়া। তাছাড়া বীনা ছিল কবি এবং সাহিত্যিক। যখন মনটা ভারী হয়ে আসে, ওর কাছে গেলে কত রকমের আলোচনা করে। মনটা যেন নতুন ছোঁওয়া পায়। ভারী মনটা কথায় কথায় কখন ক্ষয়ে হালকা হয়ে যায়। জেলখানাটা ছিল মরুভূমি, তার মধ্যে বীনা আর শাস্তি ছিল ওয়েসিস্। ওইখানে যেন একটা ইনটেলেকচুয়াল হাওয়া বইত, তার ছিল চুম্বকের মত আকর্ষণ। ৪১

২) জেলখানাটা এমন জায়গা যে, মানুষ সেখানে গিয়ে নিজের মনকে নিয়ে কেবলই হয়রান হয়। অফুরন্ত সময় সেখানে। চিন্তায় ডুবে যাওয়ার, সমস্ত জীবনকে তলিয়ে ভাববার, অনাদি অনন্ত বিশ্বকে কল্পনায় খুঁজে ফিরবার, জগতের আদিঅন্তকে জানতে চাইবার, সত্যকে আবিস্কার করবার একটা দুর্নিবার আকর্ষণ তাকে অহরহ টানতে। চিন্তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। চিন্তা যে কত নির্মম কত নিষ্ঠুর শিকারি হতে পারে সেকথা জেনেছি জেলখানায়। ৪২

একই চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায় বীনা দাসের বক্তব্যেও বন্দীজীবনের নিজস্ব ক্ষতিপূরণও অনেক কিছু আছে বৈকি! মানুষকে অন্তর্মুখী করে তোলবার এমন উপযুক্ত স্থান বুঝি আর নেই। চিন্তা আর কল্পনা, স্মৃতি আর স্বপ্ন, সমালোচনা আর আত্মবিশ্লেষণ- এ সবের অবকাশ বাইরে থেকে মানুষ কতটুকুই বা পায়? অথচ এদের দিয়েই বন্দীজীবন বিধৃত হয়ে থাকে। কাজেই বন্দীর মন অনেকখানি গভীরতা লাভ করে-জীবনটা নিজের অজ্ঞাতসারেই অনেকখানি রসঘন হয়ে উঠতে চায়। বাইরের জগতের কার্পণ্য যত বেড়ে চলে, নিজের দাবী-দাওয়া সব-কিছু নিজের কাছেই করতে হয়, আর তা মেটাতে নিজের মন সবসময়ে নিরাশও করে না।

80 কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থাতে চট্টগ্রামের বিপ্লবী অনন্ত সিংহের বড়বোন ইন্দুমতি সিংহ লীলা রায়ের তত্ত্বাবধানে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করেন, যার ফলে বন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে বীমা কোম্পানিতে চাকুরী নেন। কল্যাণী দাস, রেনু সেন জেলে বসে এম এ পরীক্ষা দেন। কমলা মুখোপাধ্যায়, সুশীলা দাশগুপ্ত, প্রমীলা গুপ্ত পাশ করেন বি.এ.।

যে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য যে প্রত্যেকের জন্য তার ছোটদের পড়াশুনায় সাহায্য করা বাধ্যতামূলক ছিল।” কারাবন্দী জীবন একদিকে নারীকে আত্মপোলব্ধির সুযোগ তৈরি করে দেয়, পাশাপাশি কারাজীবনে নারী জেলকর্তৃপক্ষের সঙ্গে লড়াই করে তাদের বিভিন্ন দাবি ও প্রাপ্য অধিকার আদায় করে নেয়। এর জন্য তারা অনশন পর্যন্ত করে। কেবল নিজেদের অধিকার নয়, জেলে সাধারণ বন্দি নারীদের সঙ্গে যে অনিয়ম হতো তার বিরুদ্ধেও তারা সোচ্চার হয়।

বীনা দাসের ভাষ্যে জানা যায় জেলের ফিমেল ইয়ার্ডে ঢুকে জেলার নানারকম অনাচার আরম্ভ করল। ওর স্পর্ধা দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম। সুপারিনটেন্ডেন্টকে জানালাম। উত্তর না দিয়ে চলে গেল। ম্যাজিস্ট্রেট একদিন জেল দেখতে এল, তাকে বললাম, “চোখের সামনে এ-সব আমরা সহ্য করতে পারছি না।” ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাঙলায় হাত নেড়ে ম্যাজিস্ট্রেট বলে গেল, “না দেখতে পার চোখ বন্ধ করে থাকবে।” বুঝলাম এরা গোলমাল না করিয়ে ছাড়বে না।

শান্তি ততদিনে আমাদের কাছে ফিরে এসেছে, তিনজনে মিলে পরামর্শ করে স্থির করলাম, অনশন আরম্ভ করতে হবে। সাধারণ কয়েদিরা শুনে বলল, ঠিকই তো, এসব তো থামানোই উচিত। ৪৫

রাজনৈতিক নারী বন্দীদের অনশনের ফলে জেলারকে ওই জেল থেকে সড়ানো হয় এবং অনশনকারীরা অনশন ভঙ্গ করেন। কমলা মুখোপাধ্যায়-এর বর্ণনায় জানা যায়, “জমাদারনীরা যারা আমাদের একটু ঘনিষ্ঠ ছিল, তাদের কাছে জেনেছি যে ‘স্বদেশীওয়ালী’রা আসার পর জেল কর্তৃপক্ষ জেলের নিয়মকানুন একটু মেনে চলতেন। আগে নাকি দেখতে ভালো অল্পবয়সী মেয়েরা বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের আবাসে প্রেরিত হতো- ‘স্বদেশী’রা যাবার পর তা বন্ধ হয়।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে সব জিনিষেরই একটা ভাল দিকও আছে বোধহয়। ‘নারী হিসেবে নারীর প্রতি অন্যায় ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বাঙালি নারীর জন্য একটি নূতন অভিজ্ঞতা। প্রতিবাদী বাঙালি নারী উপলব্ধি করলো যে নারীর অধিকার ও সম্মান আদায়ের জন্য নারীকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

ফলস্বরূপ দেখা যায় পরবর্তী সময়ে এই নারীরা অধিকাংশই (কমলা দাশগুপ্ত, কল্পনা দত্ত, বীনা দাস প্রমুখ) তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হন। আবার এই অধিকসংখ্যক নারীর কারাবরণ সমাজকে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পালটাতে এবং নারী ভাবনায় পরিবর্তন আনতে সহায়তাও করে। ১৯৩০-এর নভেম্বরে হিন্দি ম্যাগাজিন Chand মতামত প্রকাশ করে

Our readers would be surprised to know that the number of women who have gone to jail for taking part in the freedom movement is maximum in Bengal…. Now all those people who opposed education for women and who spoke against their liberation can gain some lessons from this heavenly sight.”
সার্বিক বিচারে বলা যায় কারাজীবন ছিল নারীর জন্য বৃটিশ প্রশাসন তথা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের পক্ষ থেকে চ্যালেঞ্জ স্বরূপ এবং বাঙালি নারী কেবল এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নি, নারীশক্তির প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজচিন্তনে পরিবর্তন আনতে সমর্থ হয়, একই সঙ্গে নারীর আত্মবিকাশেও কারাজীবন সহায়তা করে।

আইন অমান্য আন্দোলনে মুসলিম নারীর অংশগ্রহণ সংখ্যাগতভাবে বৃদ্ধি পায়। যদিও এই সংখ্যা অপর সম্প্রদায় হিন্দুদের তুলনায় বলা চলে ছিল নগণ্য, তথাপি সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ত্রিশের দশকে বাঙালি মুসলিম নারীরা রক্ষণশীল মুসলিমসমাজের ধর্মীয় গোড়ামি আর কুসংস্কারকে অগ্রাহ্য করার সাহস দেখিয়েছিলেন।

শুধু মুসলিমসমাজের রক্ষণশীলতা নয়, বাঙালি মুসলিমদের জন্য দ্বিতীয় সমস্যা ছিল প্রতিবেশী ধর্ম হিন্দুধর্মাবলম্বী লোকেদের মুসলমানদের সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা ও উপেক্ষার মনোভাব, যা ছিল অনেকটাই অজ্ঞতাবশত এবং যার কারণে গোঁড়া হিন্দুসমাজ মুসলমানদের হীন চোখে দেখতো। মূলত উপনিবেশিক ভারতে অবিভক্ত বাংলায় মুসলিমদের পশ্চাদপদতা এবং বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে সীমিত আকারে অংশগ্রহণের এটি একটি কারণ ছিল।

জোবায়দা খাতুন চৌধুরী, যিনি পথিকৃৎ মুসলিম নারী রাজনৈতিক, তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন এখনকার বাংলাদেশী কোন মুসলমান একথা চিন্তাও করতে পারবেন না যে, প্রতিবেশীর ধর্ম্মের প্রতি কোন প্রতিবেশী অমুসলমান খোঁজাই রাখত না যে মুসলমানরা কি। ওরা শুধু গরুই খায় আর গুন্ডামি করে।

নীচু জাতের ওরা। সিলেট মহিলা সংঘের সভায় একদিন বলেই ফেললেন একজন মহিলা যাঁর কাছে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তার পাড়ার মেয়েদেরকে সঙ্ঘের মেম্বার করার ও অন্যান্য বিষয়ের। তিনি কিছুই করেননি। কৈফিয়ৎ দিলেন যে “আমাদের পাড়ায় তো ভদ্রলোক নেই। সবাই মুচলমান।” অথচ ওই পাড়ায় শিক্ষিত মুসলমান আর হিন্দুও আছেন অনেক।

আর বস্তিও আছে মুসলমানদের। তখন আমি প্রশ্ন করেছিলাম ঐ সভায়ই উক্ত ভদ্রমহিলাকে, তাহলে আমিওতো মুসলমান অভদ্রলোক, উচিত হয় নি আপনাদের, আমাকে প্রেসিডেন্টের পদে নির্ব্বাচিত করার। সভাস্থলে সকলের মুখে চুনকালি পড়ল, সকলেই এই উক্তির জন্য ক্ষমা চাইলেন এবং মহাত্মা গান্ধীর আদর্শের অবমাননা করার অর্থাৎ মানুষের প্রতি মানুষের ঘৃণার জন্য অনুতাপ করা হলো।

বাঙালি মুসলিমসমাজ তাদের মেয়েদের পর্দাপ্রথা অমান্য করে প্রকাশ্য রাজপথে বা সভাসমিতিতে দেখতে নারাজ ছিল। “সাম্প্রদায়িক গোঁড়া কাঠমোল্লাদের কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রচারণার জন্য ২/১ খানা সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ সরকারের দৌলতে।’

জোবায়দা খাতুন চৌধুরী রাজনীতিতে যোগ দিলে সেইসব পত্রিকা তিনি ইসলামি শরিয়তবিরোধী কাজ করছেন বলে কুৎসা ও অপপ্রচার চালাত, এমনকি তার পিতা খান বাহাদুর শরাফত আলী চৌধুরীকেও সমাজের কটূক্তি শুনতে হয়। জোবায়দা খাতুনের স্মৃতিতে জানা যায় তৎকালীন ভারতের প্রখ্যাত মওলানা হোসেন আহমদ মদনী প্রতি রমজান মাসে সিলেট অবস্থান করতেন এবং ‘খতমে তারাবী’র নামাজ জামাতে পড়াতেন। তাঁর পিতা সেই নামাজে শরীক হতেন।

নামাজে ক্ষণিক বিরতির সুযোগ নিয়ে ধর্মান্ধ লোকেরা মওলানা সাহেবকে বোঝাতেন, “ডিপুটি সাহেব, উনার মেয়েরা পর্দ্দা মানে না, বোর্খা পড়ে না, সভায় যায়, মিছিলে যায়, বক্তৃতা দেয়, ইসলামি শরিয়তবিরোধী কাজ করে।

 

১ তিরিশের দশকে আইন অমান্য আন্দোলনে প্রথম কারাবরণকারী মুসলিম নারী হোসনে আরা মোদাব্বের জেল থেকে মুক্তি পেয়ে গ্রামে গেলে তাঁকে গ্রহণ করতে তাঁর আত্মীয়-স্বজন অসম্মতি জানায়, তার স্বামী মোহাম্মদ মোদাব্বের এ বিষয়ে বর্ণনা করেছেন এভাবে কলকাতায় মাসখানেক রেখে হোসনে আরাকে গ্রামের বাড়ীতে রেখে এলাম। গ্রামে আমাদের উপর শুরু হল কুসংস্কারে অন্ধ লোকদের অত্যাচার। পড়শীরা সকলেই প্রায় আমাদের বয়কট করে বসলো।

আমার এক দূর সম্পর্কের বড় ভাই, প্রকাশ্যে বলে বেড়াতে লাগলো যে, এই বউকে বাড়ীতে থাকতে দেব না। মুসলমানের মেয়ে বেপর্দা হয়ে মিটিং করবে, জেল খাটবে, এ অনাচার আমরা সইব না। মা ত মাথায় করাঘাত করে চীৎকার করে কাঁদেন, ছেলেকে ঘরমুখো করবো বলে বিয়ে দেওয়ালাম আর সেই বউ ছেলেকে ঘর থেকে টেনে বের করলো। আরো কত রকম অত্যাচার যে আমাদের উপর দিয়ে চলল, তা বর্ণনা করলে আর একখানা বিরাট গ্রন্থ হয়ে যাবে।

সকল বাধা-প্রতিবন্ধকতার বিপরীত চিত্রও ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা যায়। মওলানা হোসেন আহমদ মদনীর নিকট যখন জোবায়দা খাতুনের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হচ্ছিল, তখন এর সমাধান হিসেবে সিলেট মহিলা সংঘের সেক্রেটারি সরলাবালা দেব এবং জোবায়দা খাতুন চৌধুরী পরামর্শ করে কার্যনির্বাহী পরিষদের এক সভা আহ্বান করে। সভায় বক্তব্য প্রদানের জন্য মওলানা হোসেন আহমদ মদনীকে আমন্ত্রণ জানানো হলে, তিনি সম্মত হন।

” যদিও সভায় জোবায়দা খাতুন ব্যতীত অন্যকোন মুসলিম মহিলা উপস্থিত ছিলেন না, তথাপি মওলানা হোসেন আহমদ মদনীর বক্তব্যটি মুসলিম নারীর রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগদানের পক্ষে মূল্যবান ভূমিকা পালন করে। তিনি বক্তব্যে বলেন আমার সম্মানিতা মা বোনেরা।

আমি সিলেটে এসে দেখলাম, স্বাধীনতা সংগ্রামে আপনারা নারী হয়েও ইংরেজ সরকারের ভয়ভীতি প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে যে ভাবে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাদের সাম্রাজ্যবাদী নির্যাতন উপেক্ষা করে জেল খেটেছেন, লাঠির গুতা খেয়েছেন কামান বন্দুকে ভীত না হয়ে জাতীয় পতাকা উন্নত রেখেছেন, দেখে আমি গৰ্ব্ব অনুভব করছি।

ভারতের সর্ব্বত্র অমুসলমান মহিলারা শোভাযাত্রা, পিকেটিং করছেন। বড় আফসোস কোন মুমি মহিলা এসবে নেই..। সিলেটের পাক জালালাবাদে মুসলিম মহিলারা মাতৃভূমির স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেওয়ায় শরিয়তের কোন বরখেলাপ তো হবেইনা, শরিয়তের নির্দেশানুযায়ী কার্যই হবে। প্রাণ যাবে, বিসর্জন দেবেন জীবন, শাহাদত বরণ করবেন তথাপি পতাকার সম্মান রক্ষা করবেন। আমি আল্লাহতায়ালার নিকট দোয়া করছি তিনি যেন আপনাদেরকে আরো শক্তি দেন। ৫৫

মওলানা হোসেন আহমদ মদনী ছিলেন স্বনামখ্যাত এবং সর্বজনশ্রদ্ধেয় একজন ব্যক্তি। এমন একজন ধর্মপরায়ণ মওলানা যখন মুসলিম নারীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণের পক্ষে মত ব্যক্ত করেন, তখন সাধারণ মানুষ বিরোধিতা করতে পারে না।

আবার হোসনে আরা মোদাব্বের যেমন নিজ গ্রামে লাঞ্ছিত হয়েছেন, আবার তাকে কেউ কেউ সাদরে বরণ করে নেয়ার চিত্রও পাওয়া যায় জেলখানা থেকে বিদায় নিয়ে স্টেশনে এলাম। ট্রেনের মধ্যে অনেক যাত্রী গায়ে-পড়ে আলাপ করতে এল। হোসনে আরাকে দেখিয়ে বললো ইনি কি স্বদেশী করেন? ইনি কি জেল থেকে বেরিয়ে এলেন।

যখন জানলো যে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ী ফিরছেন, তখন হিন্দু যাত্রীদের অনেকে এসে দুইহাত জোড় করে নমস্কার করলো। কেউ কেউ লক্ষ্মী বলে সম্বোধন করতে লাগলো। শিয়ালদহ স্টেশনে হৈ হৈ ব্যাপার। হোসনে আরাকে নেয়ার জন্য কয়েক শতলোকের সমাবেশ হয়েছে, সবাই হিন্দু এবং কংগ্রেস নেতা ও কর্মী। ৬

তবে এঘটনাগুলো ছিল ব্যতিক্রম। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলিমসমাজ নারীপ্রসঙ্গে রক্ষণশীল মনোভাবই পোষণ করত। মুসলিম মহিলাদের বৃটিশবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সকল প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও যে কয়েকজন মুসলিম নারী রাজনীতিতে যোগ দেন তারা প্রত্যেকে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আনোয়ার হোসেন উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৩০-৩২ সালে কলকাতায় ১৭৬ জন মহিলা সত্যাগ্রহীকে গ্রেপ্তার করা হয়, এদের মধ্যে অন্ততপক্ষে ৬ জন মহিলা ছিলেন মুসলিম।” তবে তাদের নাম বা পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি।

কমলা দাশগুপ্ত উল্লেখ করেছেন ঢাকার চারজন মহিলার নাম, যারা আইন অমান্য আন্দোলনে সহায়তা করতেন। এরা হলেন, সামছুননেছা বেগম (ঢাকার গোলাম জিলানীর মা); রওশন আরা বেগম (ঢাকার গোলাম জিলানীর স্ত্রী); রাইসা বানু বেগম (ঢাকার আসফ আলি বেগের স্ত্রী) এবং বদরননেছা বেগম (ঢাকার আকতারউদ্দীন হোসেন চৌধুরীর স্ত্রী)।”

গোলাম জিলানী ছিলেন আইন অমান্য আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। আইন অমান্য আন্দোলন করার অপরাধে তিনি কারাবরণ করেন এবং জেলে থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। কাজেই তার মা, স্ত্রী এবং অপর দুই মুসলিম নারী পারিবারিক প্রেক্ষাপটে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। সহায়ক ভূমিকায় নয়, বরং প্রকাশ্য রাজনীতিতে অংশনিয়ে নেতৃত্বের আসনে যিনি চলে আসেন তিনি জোবায়দা খাতুন চৌধুরী।

হেনা দাসকে উদ্ধৃত করে জোবায়দা খাতুন চৌধুরীর জীবনীকার তাজুল মোহাম্মদ বলেন জোবায়দা খাতুন চৌধুরী হলেন সেকালে প্রথম ও একমাত্র মুসলিম মহিলা, যিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাকে কঠোর অবরোধ প্রথার শৃঙ্খল ছিঁড়ে প্রকাশ্যে রাজপথের শোভাযাত্রা ও সভা-সমিতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।

তিনি মহিলা সংঘের সভানেত্রীর পদ অলংকৃত করার মতো যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সারা বাংলায় কংগ্রেসী মহিলা নেতৃত্বের প্রথম সারিতে জোবায়দা খাতুনের অবস্থান ছিল একটি বিস্ময়কর ও অসাধারণ ঘটনা।

মুসলিম নারী হিসেবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্বের আসনে প্রথম দেখা যায় জোবায়দা খাতুন চৌধুরীকে। জোবায়দা খাতুন চৌধুরী কংগ্রেসে যোগদান করেন ১৯২৮-এ, ১৯৩০-এ সিলেটে প্রতিষ্ঠিত হয় কংগ্রেসপন্থী নারীদের একটি সংগঠন।

অনেকে অভিমত পোষণ করেন যে এটি মহিলা কংগ্রেসের প্রথম জেলা কমিটি, তবে এ বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আবার কমিটির নাম নিয়েও রয়েছে মতভেদ। কেউ কেউ উল্লেখ করা হয়েছে মহিলা সংঘ, অনেকে বলেছেন কংগ্রেসের মহিলা শাখা।

গবেষক তাজুল ইসলাম দুটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠার সাল কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে নামের ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকলেও সংগঠন ছিল একটিই।” জোবায়দা খাতুন চৌধুরী তাঁর অপ্রকাশিত আত্মকথায় ‘সিলেট মহিলা সংঘ’ বলে সংগঠনটির নাম উল্লেখ করেছেন।

৬২ তাঁর স্মৃতিকথায় আরো উল্লেখ রয়েছে যে তিনি এই সংগঠনটির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং সেক্রেটারি ছিলেন সরলাবালা দেব। ৬০ একজন রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের নারী কংগ্রেসের মহিলা সদস্যদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠানের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে জোবায়দা খাতুন নিজ আত্মশক্তির পরিচয়ই শধু দেন নি, তিনি বাংলার পশ্চাদপদ গোঁড়া মুসলিম নারীসমাজের জন্য উদাহরণ তৈরি করলেন।

তবে দুঃখজনক বিষয় হলো তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সিলেটের অন্যান্য মুসলিম মহিলারা এগিয়ে আসার মতো সাহসিকতা দেখালেন না। ব্যতিক্রম হিসেবে একজনের নাম পাওয়া যায়, তিনি হলেন সিলেট বারের আইনজীবি সিরাজউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী মুহিবুন্নেসা চৌধুরী। মুহিবুন্নেসা চৌধুরী স্বামীর উৎসাহে রাজনীতিতে আসেন।

জোবায়দা খাতুন চৌধুরী মুহিবুন্নেসা চৌধুরীর রাজনীতিতে যোগদান প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন
ঘোর রক্ষণশীল অভিজাত জমিদার পরিবারের কন্যা বিয়ে হয়ে আসলেন যার ঘরে, তিনি মুসলমান সমাজে অত্যাধুনিক রবীন্দ্রভক্ত, সাহিত্যানুরাগী, মজলিশি, তার্কিক, অপ্রিয় সত্যবাদী, যুবসমিতির সভাপতি ইত্যাদি।

তিনি মেয়েদের পর্দ্দা বা অবরোধের বিরোধী আশ্চৰ্য্য ঘটনা, অথচ বিয়ে করলেন গোড়া সংস্কারবাদা পারবারের মেয়ে। কিন্তু হলে কি হবে? প্রথম থেকেই সহধর্মিনীকে এমন দীক্ষা দিলেন, জোবেদা খাতুন চৌধুরীর পাশে আর একজন সঙ্গিনী মুহিবুন্নেসা চৌধুরী। আর কি উৎসাহ উদ্দীপনায় তিনি সাথী বান্ধবী হয়েছেন জোবেদা খাতুনের। অথচ আমাদের দু’বান্ধবীর ঘর বলতে উল্টো পরস্পর বিপরীত। যেমন আমার স্বামী রক্ষণশীল হলেও আমি অধিকার আদায় করেছি প্রথমে ঘরে সংগ্রাম করে।

আর মুহিবুন্নেসা চৌধুরী মুক্তি পেয়ে গেছেন স্বামীর আধুনিক মতবাদ আর উদারতায়। ৬৪
বাঙালি মুসলিম সমাজের অল্পসংখ্যক নারী পরিবার এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ত্রিশের দশকে রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত হলেও তাদের অংশগ্রহণ ছিল সক্রিয় এবং তাৎপর্যপূর্ণ।

জোবেদা খাতুন সিলেটে মহিলা সংঘের নেতৃত্বে এসে আইন অমান্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৩১-এর ২৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে উৎসব এবং শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এই শোভাযাত্রায় মহিলাদের সংগঠিত করেন জোবায়দা খাতুন। মিছিলটি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে গোবিন্দ পার্কের সামনে আসলে বাধা দেয় পুলিশ। জোবায়দা খাতুন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলেন যেখানে পুলিশ বাধা দিয়েছে সেই স্থানে অবস্থান করেই তাঁরা স্বাধীনতার শপথ নেবেন।

এরপর পুলিশ পরিবেষ্টিত হয়ে প্রকাশ্য রাজপথে শপথবাক্য পাঠ করান জোবায়দা খাতুন চৌধুরী। পরবর্তী বছরেও তাঁর উদ্যোগে স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয়। তাঁর সভাপতিত্বকালে সিলেট মহিলা সংঘের উদ্যোগে সুরমা উপত্যাকায় একটি রাষ্ট্রীয় সম্মেলন করে, যে সম্মেলনে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী, উর্মিলা দেবীসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

তাঁর নেতৃত্বে মহিলা সংঘ সিলেটের মনিপুরী কৃষকদের জমিদারদের নির্যাতনের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ভানুবিল আন্দোলনে সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান করে । ‘সত্যেন সেন জোবায়দা খাতুনের মূল্যায়নে বলেন তাঁকে দেখা যেত মিছিলের পুরোভাগে, সভামঞ্চে সামাজিক কোনো বাধাই তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।

তখনকার দিনের সিলেটের মুসলিম সমাজের কোন শরিফ পরিবারের মহিলার পক্ষে এভাবে সাধারণ নরনারীর সঙ্গে সমান হয়ে প্রকাশ্য রাজপথে বেরিয়ে আসা-এ যে কতো বড় সাহসের পরিচায়ক, সে কথা আজকের দিনের ছেলেমেয়েদের বলে বোঝানো যাবে না। সে সময়কার রক্ষণশীলতার বেড়া ভেঙে ওদের মতো গুটিকয়েক মহিলা সেদিন ন্যায়ের জন্য আদর্শের জন্য, মুক্তির জন্য প্রথম পদক্ষেপটি নিয়েছিলেন।

জোবায়দা খাতুন চৌধুরী পিকেটিং-এর কাজেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, তবে তাঁকে অন্যান্যদের মতো গ্রেফতার বা কারাবরণ করতে হয় নি। উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার পিতা এবং পাবলিক প্রসিকিউটর স্বামীর কারণে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে থানায় নিত না, পরিবর্তে তাকে তাঁর পিতার জিম্মায় ছেড়ে দিত।

মুসালম মাহলাদের মধ্যে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে কারাবরণের সম্মান প্রথম অভান করেন হোসনে আরা মোদাব্বের। তিনি ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাতুষ্পুত্রী এবং রাজনীতিবীদ ও সাংবাদিক মোহাম্মদ মোদাব্বেরের স্ত্রী।

মোহাম্মদ মোদাব্বের বিপ্লবপন্থী হলেও স্ত্রী হোসনে আরা কংগ্রেসের আদর্শে বিশাবাসী ছিলেন। ত্রিশের দশকে আইন অমান্য আন্দোলন চলাকালে সাধারণ গৃহিনী মেয়েরা যাতে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে সেজন্য কুটিরশিল্পের বিকাশে সচেষ্ট হন। এই উদ্দেশ্যে তিনি কলকাতার বস্তিতে বস্তিতে ঘুরে চরকায় সূতা কাটা, সেলাই-এর কাজ এবং মেয়দের লেখাপড়া শেখানোর জন্য প্রচারণা চালাতেন।

তিনি অল্পবয়স্ক মুসলিম মেয়েদের নিয়ে সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন এবং হিন্দু মেয়েদের সাথে প্রকাশ্য সভাসমিতিতে যোগ দিতেন। ১৯৩২-এর ২৬ জানুয়ারি কলকাতার ময়দানে জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলীর নেতৃত্বে এক জনসভার আয়োজন করা হয়। জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী গ্রেফতার হলে হোসনে আরাকে সেই জনসভায় সভাপতিত্ব করার ও পতাকা উত্তোলনের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তিনি অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন এবং গ্রেফতার হন। গবেষক আনোয়ার হোসেন উল্লেখ করেছেন হোসনে আরা ছিলেন কংগ্রেসের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যা।

মোহাম্মদ মোদাব্বের উল্লেখ করেছেন, “১৯৩০ সালের ২৫শে মে বিয়ে করে ফেললাম। বাচ্চা গৃহিনী ঘরে এলো।”* ১৯৩২-এ হোসনে আরা ছিলেন নিতান্ত অল্পবয়স্ক একজন নবীন গৃহবধূ। কাজেই তিনি যে কংগ্রেসের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যা ছিলেন তা যথার্থ হওয়া সম্ভব। মুসলিম রাজনৈতিক নারীদের স্মৃতিকথা পাওয়া যায় না।

যদিও হোসনে আরা সাহিত্য রচনা করতেন, দৌলতননেছা খাতুনও ছিলেন সাহিত্যিক, তথাপি নিজেদের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁরা লিখে রেখে যান নি। মুসলিম রাজনৈতিক নারীদের সকলের নামও প্রামাণ্য দলিলে অনুপস্থিত। কারাজীবন মুসলিম পর্দানশীন নারীর জীবনে কী ধরনের তাৎপর্য বহন করে এনেছিল তা আমাদের কাছে অস্পষ্ট থেকে যায়। হোসনে আরার স্বামী মোহাম্মদ মোদাব্বের তাঁকে দেখতে যেতেন প্রেসিডেন্সি জেলে।

তিনি বর্ণনা করেছেন কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেলে প্রায় সত্তরজন রাজবন্দিনীকে এক বিরাট ওয়ার্ডে রাখা হয়। প্রতি পনের দিন অন্তর আমি জেলে দেখা করতে যাই। প্রতিবারই কিছু কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করি হোসনে আরার মধ্যে।

জেল জীবনের দুঃখ- বেদনার ছাপ তার চোখেমুখে নেই, তার জায়গায় দেখতাম একটা শান্ত সমাহিত ও আনন্দোচ্ছ্বল চেহারা। পরে জেনেছিলাম যে, রাজবন্দিনীদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠা মেয়ে বলে সে আর সব মেয়ের আদরের পাত্রী হয়ে পড়েছে। তার কল্যাণী দিদি তাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুমায় আর লেখাপড়া শেখায়।

শান্তি ও সুনীতি তাকে হাতে করে ভাত খাওয়ায়। যেন ও সবার আদরের দুলালী। কোনদিন জেলে দেখা করতে গিয়ে দেখি ফুলের মালা পরে, হাতে ফুলের কাঁকন, মাথায় ফুলের টোপর পরে সে আমার সামনে হাজির।…

জেল অফিসে বোসে আলাপের মধ্যে হোসনে আরা বলল : জানো, আমার দিদিরা আমাকে এত হাসি-খুশির মধ্যে রাখে যে, আমি বাড়ির কথা ভাববারও সময় পাইনে। তাছাড়া পড়াশুনার মধ্যে আমি কিছু কবিতা লিখেছি। নিদিরা বলেছে ভাল হচ্ছে। তুমি একটা ফাউন্টেন পেন, খাতা ও রবীন্দ্রনাথ নজরুলের কিছু বই আমাকে দিয়ে যেয়ো।

বর্ণনা অনুসারে যে বিষয়টি বলা যায়, কারাজীবন নারীদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক পার্থক্য মিটিয়ে তাদের মধ্যে নারী হিসেবে সহমর্মিতাবোধকে জাগ্রত করেছিল। হোসনে আরা যে তাঁর মেধা-মননের চর্চার মাধ্যমে নিজেকে পরিপূর্ণ করে তুলছিল কারাজীবনে বর্ণনাটিতে তাও ব্যক্ত হয়েছে।

প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের মতো মুসলিম নারীও অনেকক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজনীতি যুক্ত হয়েছেন। গাইবান্ধার দৌলতননেছা খাতুন যেভাবে রাজনীতিতে যোগদেন তার বর্ণনা গোলাম কিবরিয়া পিনু দিয়েছেন এভাবে এক নাটকীয় ঘটনার মধ্যদিয়ে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন।

সেদিন বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে বিক্ষুব্ধ জনতা জনতা মিছিল করছে—মিছিলটি তাঁর বাসভবনের পাশ দিয়ে যাবার সময় হঠাৎ করে বেরিয়ে এসে সোজাসুজি মিছিলটায় যোগ দিলেন এবং মিছিল শেষে এক জনসভায়ও বক্তৃতা দিলেন। তখনকার সামাজিক অবস্থানে একজন মহিলা হিসেবে এই ভূমিকা ছিল এক বিদ্রোহীর ভূমিকা। এরপর ক্রমাগত গভীরভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

তবে তিনি স্কুলের ছাত্রী থাকাকালেই বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং গাইবান্ধার নেত্রী মহামায়া ভট্টাচার্যের সংস্পর্শে আসেন। এর ফলেই তিনি মিছিল মিটিং-এ যোগদানের ও বক্তৃতা প্রদানের সাহস অর্জন করেন।

২ ১৯৩২-এ আইন অমান্য আন্দোলনের সময় তিনি অন্যান্যদের সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘গাইবান্ধা মহিলা সমিতি’। এই সমিতির তিনি ছিলেন সম্পাদিকা, সভানেত্রী ছিলেন মহামায়া ভট্টাচার্য, সহ-সভানেত্রী দক্ষবালা দাস।

আইন অমান্য আন্দোলনের সময় এই সমিতি সভা, শোভাযাত্রা, পিকেটিং সহ আন্দোলনের কার্যক্রম পরিচালনা করত। পার্শ্ববর্তী গ্রাম বামুনডাঙ্গা, সুরতখালি, নলডাঙ্গা, বিজয়ডাঙ্গা, ফুলছড়ি, কূপতলা, তুলসীঘাট প্রভৃতি গ্রামে দৌলতননেছা বক্তৃতা দিতেন এবং হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলেই তাঁর বক্তৃতা শুনতে আসতো। * গোলাম কিবরিয়া পিনু উল্লেখ করেছেন, তিনি লবণআইন অমান্য আন্দোলনে গ্রেফতার হন এবং তাঁর বাড়ি ক্রোক করে তাঁর স্বামীকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়।

আনোয়ার হোসেন উল্লেখ করেছেন, তাঁর পরিবার ইংরেজবিদ্বেষী হওয়ায় তাঁর স্বামীকে গাইবান্ধা থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাঁর স্বামীর অনুপস্থিতিতে পুলিশ বাড়ি বাজেয়াপ্ত করতে আসলে তিনি তাঁর দেবরসহ অন্যএক বাড়িতে আশ্রয় নেন। অবশেষে পুলিশ তাঁকে ফুলছড়ি গ্রাম থেকে গ্রেফতার করে। * দু’টি তথ্যেই যে বিষয়টি স্বীকৃত তা হলো দৌলতননেছা খাতুন কেবল গ্রেফতার ও কারাবরণই করেন নি, পারিবারিকভাবেও উপনিবেশিক সরকার কর্তৃক নিগৃহীত হন।

এ পর্যায়ে গাইবান্ধায় দৌলতননেছা খাতুনের সঙ্গে তাঁর আত্মীয় জিয়াউন্নেসা রকিনা খাতুন এবং শামসুন্নাহার রোকেয়া খাতুন আইন অমান্য আন্দোলনে অংশনেন।” ত্রিশের দশকে আইন অমান্য আন্দোলনে কারাবরণকারী আরেক মুসলিম নারীর পরিচয় পাওয়া যায়, তিনি ফুলবাহার বিবি। তিনিও ১৯৩২-এ গ্রেফতার হন এবং ছয়মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করেন।

ময়মনসিংহের রাজিয়া খাতুন এবং হালিমা খাতুনও এসময়ে কারাবরণ করেন। *এছাড়া পূর্ণাঙ্গ তথ্যের অভাব সত্ত্বেও সামগ্রিক বিবেচনায় বলা যায় ত্রিশের দশকে বাঙালি মুসলিম নারীও তাঁর প্রথাসিদ্ধ ভূমিকার বাইরে বের হয়ে আসেন, যদিও তাদের সংখ্যা ছিল কম। তবে তাদের কর্মকাণ্ড নেতৃত্ব পর্যায় থেকে শুরু করে কারাবরণ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ত্রিশের দশকে রাজনীতিতে এই বহুমাত্রিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে একদিকে বাঙালি মুসলি নারী প্রমাণ করলেন যে তাঁরা অগ্রসর হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীদের সমকক্ষ হবার যোগ্যতা রাখেন, অপরপক্ষে মুসলীম নারীদের গ্রেফতার করার মধ্যদিয়ে বৃটিশ প্রশাসনও তাদের কর্মকাণ্ডের পরোক্ষ স্বীকৃতি প্রদান করলো।

“Bengali nationalism had always valorized violence and this ethos profoundly influenced the participation of Bengali women in the freedom struggle.” বিপ্লববাদ বলা চলে অবিভক্ত বাংলার উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ শতকের প্রথম থেকে শুরু করে ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিপ্লববাদ বাংলার তরুণ সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করে সবচাইতে বেশি।

প্রথম পর্যায়ে বিশ শতকের শুরু থেকে বিশের দশক পর্যন্ত বিপ্লববাদের ধারণা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিকতার প্রভাবে প্রভাবিত ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ এসময়ে তরুণসমাজকে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত হতে অনুপ্রাণিত করে। এপর্যায়ে বিপ্লবদলের আদর্শ অনুসারে নারীদের বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত হতে অনুৎসাহিত করত।

এমনকি বিপ্লবীরা মা বোন ও এরকমের নিকটাত্মীয় সম্পর্কের নারী ব্যতীত অন্য নারীদের সংস্পর্শে আসা নিষিদ্ধ মনে করতেন, কারণ তাদের ধারণা ছিল বিপ্লবের পথটি কঠিন এবং নারীদের সংস্পর্শ তরুণদের আবেগপ্রবণ করে তুলতে পারে, যা বিপ্লবপন্থায় কাম্য নয়। কাজেই এপর্যায়ে বাঙালি নারীরা সরাসরি বিপ্লবী দলে যুক্ত হতে পারে নি। বিপ্লবীদের মা, মাসী, বোন প্রভৃতি সম্পর্কের নারীরা তাদের আশ্রয়দান, তাদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখা ইত্যাদি সহায়ক ভূমিকা পালন করতেন।

বিশ শতকরে বিশের দশকে এসে বাঙালি নারী রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় অংগ্রহণ করার মধ্যদিয়ে জনপরিমণ্ডলে প্রবেশ করে। এসময়ে দেখা যায় লীলা নাগ ‘শ্রীসংঘ’ নামের বিপ্লবী দলের সদস্যপদ লাভ করেন এবং ‘দীপালি সংঘ’ নামে নারীদের সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনটি মেয়েদের ব্যায়ামচর্চা, লাঠি খেলা সহ শরীরচর্চার মধ্যদিয়ে মেয়েদের বিপ্লবকাজের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়। এরপর বিশের দশকের শেষ পর্যায়ে কলকাতায় গড়ে ওঠে ‘ছাত্রী সংঘ’।

এই সংগঠন দুটি তিরিশের দশকে মেয়েদের বিপ্লবী দলে সক্রিয় কর্মীর ভূমিকা পালনের জন্য উপযুক্ত করে তৈরি করে, বলা চলে এই সংগঠন দু’টি ছিল বাঙালি মেয়েদের বিপ্লবীমন্ত্রে দীক্ষিত করবার সৃজনক্ষেত্র । ১৯৩০-এর কিছু আগে থেকেই প্রায় সমস্ত বিপ্লবী দলে মেয়েরা সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু করে। যে বিষয়টি লক্ষণীয়, সেটি হচ্ছে এপর্যায়ে যেসকল মেয়েরা বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকেন তাঁরা অধিকাংশই ছিলেন ছাত্রী, বিপ্লবীদের পরিবারভুক্ত নিকটাত্মীয় নারীরা নয়।

বিশ শতকের শুরু থেকেই বিপ্লবী আদর্শ খুব সাধারণভাবেই তরুণসমাজকে আকৃষ্ট করত। যেহেতু বাঙালি নারীকে ঐতিহ্যিকভাবে নম্র, বিনয়ী হবার শিক্ষা দেওয়া হতো এবং তারা সামাজিকভাবে স্বাধীন ছিলো না, তাই তাদের জন্য বিপ্লবী দলে যোগ দেয়া সহজ ছিল না, প্রথম পর্যায়ে তারা ছিলেন বিপ্লবীদের পরিবারভুক্ত সদস্য হিসেবে সহায়ক ভূমিকায়।

বিশ শতকের বিশের দশকের শেষ পর্বে এসে এই চিত্রে কিছু পরিবর্তন আসে। দিপালী সংঘ এবং ছাত্রী সংঘের মাধ্যমে ছাত্রীরা বিপ্লবীভাবাদর্শে দীক্ষিত হতে থাকেন এবং এই সংস্থা দু’টির সদস্যরাই ত্রিশের দশকে বিভিন্ন বিপ্লবী দলে যোগদেন।

এক্ষেত্রে নারীশিক্ষা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ছবি বসুর মতে বিপ্লববাদ মূলতই শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সৃষ্টি।` এই সাধারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের জন্য লেখাপড়া শেখাটা খুবই সাধারণ হয়ে উঠল। এই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা ক্রমশ রাজনীতিতে আকৃষ্ট হন । এদের একাংশ যোগদেন বিপ্লবী দলগুলিতে। Geraldine Forbebes এপসঙ্গে বলেন

At the same time as these women were picketing and joining processions, other women were recruited by revolutionary organizations. In some cases women, initially attracted to Gandhi, joined the revolutionaries because they craved action or were appalled by police violence. Kamala Das Gupta (b. 1907) wanted to join Gandhi’s ashram in 1929 but he told her she must first obtain her parents’ permission. Her parents would not allow her to go.

By her account she became depressed,… Kamala spoke to her lathi-fighting instructor, Dinesh Majumdar, who was a member of the revolutionary group Jugantor. She met his senior colleague and was given books to read. At last Kamala found what she had been yearning for, a way to sacrifice herself for India. She joined Jugantor.”

কেবল কমলা দাশগুপ্ত নয় বিপ্লবীদলের সদস্য নারীরা প্রত্যেকে অনুভব করেছেন ভারতবর্ষে স্বাধীনতার জন্য তাঁরা আত্মত্যাগে প্রস্তুত এবং এভাবেই শিক্ষিত ও রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন মেয়েরা মনের দিক থেকে বিপ্লব আন্দোলনে অংশ নেবার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে ।

প্রথম পর্যায়ে যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ বিপ্লবীদের উদ্বুদ্ধ করে, তেমনি এপর্যায়ে শরৎচন্দ্রের পথের দাবী তরুণদের বিপ্লবীমন্ত্রে দীক্ষা দেয় বিপ্লবীদলগুলিতেও তখন পরিবর্তন দেখা যায়। এসময়ে বিপ্লবী দলের নেতৃত্বে চলে আসেন নতুন প্রজন্মের তরুণরা। প্রবীণদের প্রভাব দলে ধীরে ধীরে কমতে থাকে।

এই নবীণ নেতৃত্ব বাইরের নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই নূতনভাবে সংগঠন সাজাতে থাকে, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের মত বিপদজনক আক্রমণের পরিকল্পনা তৈরি করে, পাশাপাশি তারা নারী সদস্যদের দলে অন্তর্ভুক্ত করে। নারীদের বিপ্লবী দলে অন্তর্ভুক্ত করবার ব্যাপারে যে বিধিনিষেধ ছিল তা এই নবীন নেতৃত্ব অনেকাংশে অস্বীকার করে।

১৯৩১-এ বোম্বাই শহরে সরোজিনী নাইডুর নেতৃত্বে একটি সভা ডাকা হয়। বাংলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মহিলা সমিতি নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলনের সঙ্গে যোগদান করে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সের সাব- কমিটির কাছে স্মারকলিপি পেশ করে, তাতে যেসকল সুপারিশ করা হয় তা হলো

(১) স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সমস্ত নাগরিককে সমান অধিকার ও দায়িত্বভার অর্পণ।

(২) অফিস দফতরে, সাধারণ নিয়োগ ব্যবস্থায়, অধিকারে গৌরবে, জাতি ধর্ম স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে নিয়োগ ব্যবস্থা।

(৩) গণভোট।

(৪) স্ত্রী-পুরুষের সমান দাবির ভিত্তিতে যুক্ত-নির্বাচন।

(৫) মেয়েদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট আসন অথবা বিশেষ নমিনেশনের ব্যবস্থা না রাখা ১৯৩১-৩২-এর নারী-পুরুষের সমঅধিকারের দাবির এই আন্দোলন তাৎক্ষনিকভাবে ব্যর্থ হলেও এই পর্বে বাংলা তথা সমগ্র ভারতে নারীনেত্রীদের একাংশের মনে নারীর মুক্তি এবং সমঅধিকার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি হয়।

তাঁদের সমঅধিকার আদায়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে এবং ১৯৩৬-এ নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলন সমস্ত সভাসমিতিতে জোর প্রচার চালায় যাতে করে আইনসভায় আনীত সংস্কার বিলগুলি আইনে পরিণত হয়। এই বিলসমূহের মধ্যে ছিল

(১) সম্পত্তিতে হিন্দু মেয়েদের অধিকারের ভিত্তিতে ডাক্তার দেশমুখের হিন্দু আইন সংস্কার বিল।

(২) ডাক্তার বি. দাসের সর্দা আইন সংশোধনী বিল ।

(৩) ডাক্তার ভগবান দাসের অসবর্ণ বিবাহ কার্যকরী করার বিল।

(৪) ডঃ হাফিজ আবদাল্লার মুসলিম পার্সোনাল ল’ এপ্লিকেশন বিল।

নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলনের আওতায় সমঅধিকার দাবিতে এই আন্দোলন চলমান থাকে, পাশাপাশি মধ্য ত্রিশের দশক থেকে বাংলায় সমাজতান্ত্রিক দলে নারীর অন্তর্ভুক্তির ফলে দেশমুক্তির পাশাপাশি নারীমুক্তির প্রশ্নটি রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িত নারীদের সামনে চলে আসে এবং পরবর্তী দশকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ও বাংলায় ১৯৪২-এর দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক আন্দোলন ও নারীমুক্তি আন্দোলন সমান্তরালভাবে প্রভাহিত হয়।

 

সনাতন ভূমিকার বাইরে নারী

 

পরিশেষে বলা যায়, বিশের দশকে অসহযোগ আন্দোলন বাঙালি নারীর জন্য বাইরের জগতে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। তিরিশের দশকে আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদান ও কারাবরণের মধ্যদিয়ে বাঙালি মেয়েরা কেবল জনপরিমণ্ডলে ব্যপকহারে অংশগ্রহণ করলো না, তারা বাঙালি নারীর ঐতিহ্যিক, প্রথাসিদ্ধ ভূমিকাকে অস্বীকার করতে শুরু করে। আর এই অস্বীকার করবার মধ্যদিয়েই তারা সমাজে নারীর নতুন ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত করে।

একই সাথে বিপ্লবী দলে এবং মধ্য তিরিশের দশক থেকে সমাজতান্ত্রিক দলে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মেয়েদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এই মেয়েদের ঘরের দেয়ালের অন্তরাল ঘুচিয়ে দেয় এবং ক্রমশ মেয়েদের জন্য বাইরের জগতের পরিচিত নিষেধের ঘেরাটোপগুলিও বিলুপ্ত হতে থাকে। চল্লিশের দশকে উপনিবেশিক শাসনমুক্ত হবার সময় পর্যন্ত এই নব্যদর্শনে দীক্ষিত নারীই বাঙালি নারীকে মুক্তির পথ দেখায়।

Leave a Comment