সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ – যা রাজনৈতিক আন্দোলনে বাংলার নারী |

সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ

 

সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ

নারীবাদী এলিসন জগার সমাজতান্ত্রিক নারীবাদকে বিশ্লেষণ করেছেন এভাবে : উদার নারীবাদীরা বিশ্বাস করেন যে নারীরা নিপীড়িত হয় কারণ তারা অন্যায় বৈষম্যের শিকার; গতানুগতিক মার্কসবাদীরা বিশ্বাস করেন যে নারীরা উৎপাদন পক্রিয়া থেকে বঞ্চিত বলে নিপীড়িত হয়; প্রগতিবাদী নারীবাদীরা মনে করেন যে নারীর যৌন ও প্রজনন ক্ষমতার ওপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণের ফলে নারীরা নিপীড়িত হয়;

কিন্তু সমাজতন্ত্রী নারীবাদীরা মার্কসীয় বিচ্ছিন্নতা তত্ত্বের সংশোধিত ভাষ্যের পরিপ্রেক্ষিতে নারী নিপীড়ন ব্যাখ্যা করেন। কাজেই বলা যায় যে, মার্ক্সীয় মতবাদের মূল বিষয়গুলি গ্রহণ করে তাতে সংযোজন, সংশোধন, পরিমার্জন করে সমাজতান্ত্রিক নারীবাদের উদ্ভব ঘটে।

সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীদের মতে পিতৃতন্ত্র কেবল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত নয় বরং এর সাথে আরো অনেক কার্যকারণের যোগসূত্র রয়েছে। মার্কসবাদে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভবের সাথে পিতৃতন্ত্রের উদ্ভব ঘটে বলে যে মত প্রকাশ করা হয় সমাজতন্ত্রীরা তার বিরোধিতা করেন বরং তারা মনে করেন মার্কসবাদীরা, পরিবার, প্রজনন ও গার্হস্থ্য শ্রমের মত ক্ষেত্রগুলিকে উপেক্ষা করে গেছেন।

সমাজতাত্ত্বিক জিলা আইজেনস্টাইন নারীশোষণের দু’টি মুখ্য উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন পুরুষ আধিপত্য ও পুঁজিবাদকে। সমাজে অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন ঘটলেও পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোয় নারীশোষণ অব্যাহত থাকে বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেন।

 

সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীরা নারী নিপীড়নকে ব্যাখ্যা করার জন্য দুটি তত্ত্ব প্রদান করেছেন, একটি দ্বৈত ব্যবস্থা তত্ত্ব ও অপরটি একীভূত ব্যবস্থা তত্ত্ব। দ্বৈত-ব্যবস্থা তাত্ত্বিকেরা বলেন পুঁজিবাদ ও পিতৃতন্ত্র এ দুটি কাঠামো যখন পরস্পর সংযুক্ত হয় তখন চূড়ান্তভাবে নারীনিপীড়ন ঘটে। তাঁরা অভিমত প্রকাশ করেন যে, নারীর ওপর শোষণ ও বৈষম্যের উৎস হচ্ছে দুটি : বস্তুগত কাঠামো (অর্থনৈতিক); উপরি কাঠামো (পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো)।

আর দু’টির কোনটির উপরই নারীর নিয়ন্ত্রণ নেই। সমাজতান্ত্রিক নারীবাদী জুলিয়েট মিশেল মনে করেন কিছুটা অর্থনৈতিক, কিছুটা দৈহিক-সামাজিক এবং কিছু আদর্শিক উপাদানের সংমিশ্রনে নারীজীবন গঠিত। তিনি নারীমুক্তির জন্য উৎপাদনের ধরণ পরিবর্তনের সাথে সাথে দৈহিক, সামাজিক ও আদর্শগত উপাদানের পরিবর্তনের উপরও জোর দিয়েছেন।

মিশেল এমন একটি সমাজ গঠনের কথা বলেছেন, যে সমাজের ভিত্তি হবে নানামুখী সম্পর্ক, যেখানে যৌনতা ও প্রজনন পরস্পরের সম্পর্কিত নয় এবং যেখানে শুধু যৌনতার কারণেই চিরাচরিত বিবাহপ্রথার প্রয়োজন অনুভূত হবে না। মিশেল মনে করেন অর্থনৈতিক বিপ্লবের মতো বিপ্লব না ঘটলে নারীর অবস্থানের পরিবর্তন হবে না, কেননা নারীর নিপীড়নের মূল কারণ মানবসমাজের মনস্তত্ত্বে নিহিত রয়েছে।

মিশেল পুরুষতন্ত্র ও পুঁজিবাদ-দুইয়ের উচ্ছেদ কামনা করেছেন। তাত্ত্বিক হিডি হার্টম্যান এর মতে নারীবাদী বিশ্লেষণের মূল বিষয় হচ্ছে নারী-পুরুষ সম্পর্ক, যা মার্কসবাদে অনুপস্থিত। মার্কসবাদের আলোচনায় শ্রমজীবি নারী স্থান পেয়েছে, কিন্তু বাস্তবে সব নারী শ্রমজীবি নয় কিন্তু বৈষম্য এবং নিপীড়নের শিকার।

পুরুষতন্ত্রের সংজ্ঞায় তিনি বলেন, ” পুরুষদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের একটি সেট, যার বস্তুগত ভিত্তি আছে এবং যদিও এটা পদক্রমিক তথাপি তা পুরুষদের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও সংহতি প্রতিষ্ঠা ও সৃষ্টি করে, যা তাদেরকে নারীর ওপর প্রভুত্ব করতে সক্ষম করে। ১ তিনি অভিমত দেন শ্রমশক্তির ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণহীনতা নারীনিপীড়নের প্রধান কারণ।

একীভূত ব্যবস্থার তাত্ত্বিকেরা পুঁজিবাদ ও পুরুষতন্ত্রকে এক ও অবিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখেছেন। ইরিস ইয়ং একিভূত ব্যবস্থার অন্যতম প্রবর্তক। তিনি মার্কসীয় তত্ত্বের শ্রেণিবিভাজন অপেক্ষা শ্রমবিভাজনকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

 

তাঁর মতে শ্রেণিবিশ্লেষণ উৎপাদনের উপায় ও উৎপাদন সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করে এবং উৎপাদন ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে। অপরপক্ষে শ্রমবিভাজন উৎপাদনের সাথে জরিত ব্যক্তিদের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।

তিনি মত দেন যে লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজন বিশ্লেষণের মাধ্যমে পুঁজিবাদের প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটন করে নারীনিপীড়নের মূল কারণ উদ্ঘাটন করা সম্ভব।  মার্ক্সীয় নারীবাদ ও সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ বিলোপে সমাজকাঠামোর পরিবর্তনের কথা বলে ।

Leave a Comment